শৈলেন ঘোষ
আর ক’দিন পরে শীত আসবে। আসবে, সাদা-ঝকঝকে তুষারের ওড়না গায়ে জড়িয়ে এইখানে, এই পাহাড়ের গায়ে। আসবে, ওই ছোট্ট নদীর জলে, জঙ্গলে, গাছে-গাছে। আর আসবে, ওই বুড়ো-আপেলগাছটার শুকনো ডালে। সত্যি, শীত এলে কী ভীষণ কষ্ট হয় ওই বুড়ো-আপেলগাছটার। শীতের নখগুলো যেন বড্ড খোঁচা-খোঁচা। আহা, বড্ড লাগে তার!
আপেলগাছের যখন বয়স ছিল, যখন অগুনতি সবুজ পাতা ঝুমঝুমি বাজিয়ে তার ডালে-ডালে নাচত, তখন কি আর সে ভয় পেত শীতকে! তখন কনকনে ঠাণ্ডা হিমেল বাতাসই বয়ে যাক, কী ঝুরঝুরে তুষারই ঝরে পড়ুক, মাথা উঁচিয়ে আপেলগাছ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ভেংচি কেটে দিত শীতটাকে। নয়তো মাথা ঝাঁকিয়ে শীতটাকে দিত রাগিয়ে।
হায় রে! এখন আপেলগাছের সে দিন কি আর আছে! এখন সে বুড়ো। না আছে গা-ভর্তি সবুজ পাতা, না ডালে-ডালে টুকটুকে আপেল। যাও-বা দু-একটি ছিটেফোঁটা পাতা এ-ডালে ও-ডালে ফুরফুর করছে, সে থাকাও যা, না-থাকাও তা। এখন শুকনো ডালপালাগুলো হাড়-জিরজিরে ভূতের মতো, হাত-পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কী বিচ্ছিরি দেখতে লাগে!
বিচ্ছিরি বলে বিচ্ছিরি! কেউ ফিরেও তাকায় না। কী আর করবে! আপেলগাছ ওই বিচ্ছিরি চেহারা নিয়েই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে একলাটি। ভারী নিঃসঙ্গ। মনে-মনে ভাবে, সে যেন পৃথিবীর একটা বোঝা, কেউ তাকে ভালবাসে না, কেউ তার কাছে আসে না। অথচ আগে যখন ডালে-ডালে ফুল ফুটত, ফুলের বুকের ভেতর থেকে যখন কাঁচা-সবুজ আপেলগুলি উঁকি মারত, তারপর সেই সবুজ আপেল যখন টুকটুকে লাল হয়ে গাছের গায়ে দুলে উঠত, তখন কিন্তু সবাই আসত। আসত কত পাখি, কত ভোমরা, কত কাঠবিড়ালি, নাম-না-জানা আরও কত অতিথি। রঙিন-পাখিরা তখন সবুজপাতার ফাঁকে-ফাঁকে নাচত, গান গাইত, লুকোচুরি খেলত। কাঠবিড়ালি এ-ডালে ও-ডালে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে খেলা করত। কিংবা পাকা আপেলে টুক করে কামড় দিয়ে, তুড়ুক-তুড়ুক ছুট দিত। উঃ! কী মজা, কী মজা! তখন কী ভালই না লাগত আপেলগাছের। ভাবত, আহা! তার কত সুখ!
এখন আর কেউ আসে না। কোনও মানুষ আসে না তার কাছে, তার ডাল থেকে আপেল পাড়তে। কোনও পাখি আসে না তার ডালে, তাকে গান শোনাতে। আসে না কোনও কাঠবিড়ালি, তার ডালে-ডালে খেলা করতে। তাই ভারী দুঃখে একলাটি দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বুড়ো-আপেলগাছ ভাবে, আমার সুখ গেল কোথায়? তবে কি সুখ শুধু ক’দিনের?
শীত আসছে। হঠাৎ ঠিক শীতের আগে, আপেলগাছের শুকনো পাতা-ঝরা ডালে একদিন একটি পাখি এসে বসল। হয়তো বা অজান্তে, কিংবা আনমনে। পাখিটি এ-ডালে ও-ডালে লাফিয়ে লাফিয়ে নাচতে লাগল। নাচতে নাচতে নরম সুরে গান জুড়ল। শিউরে উঠল বুড়ো-আপেলগাছ। আঃ! কতদিন পর পাখি এসেছে। তার ডালে বসে গান গাইছে! কী ভাল লাগছে তার! বুক যেন খুশিতে ভরে যায়! আনন্দে উপচে উঠল তার শুকনো ডালপালা। দুলে উঠল। কেঁদে ফেলল বুড়ো-আপেলগাছ।
পাখি যেন থতমত খেয়ে থমকে যায়! তাই তো, গাছের ডালপালাগুলো যেন থেকে-থেকে দুলে উঠছে! চমকে থেমে জুল-জুল করে দেখতে লাগল পাখি এদিক-ওদিক। ভাবতে লাগল, কে দোলা দেয়! কেন দুলছি!
পাখিকে থামতে দেখে, হঠাৎ সেই বুড়ো-আপেলগাছের শুকনো খটখটে গলার ভেতর থেকে খসখসে শব্দ বেরিয়ে এল। ভাঙা-ভাঙা, অস্পষ্ট সেই শব্দ, “ভয় পাস না পাখি, ভয় পাস না। তোর গানের সুরে আমার বুকটা দুলে উঠেছে। তুই আবার গা, আমি শুনি! আমি কতদিন গান শুনিনি। শুনিনি তোর মতো ছোট্ট পাখির গান।”
গাছের কথা শুনে পাখির ধড়ে যেন প্রাণ এল। হেসে উঠল পাখি। হাসতে-হাসতে বলল, “তাই বলো, তুমি! আমি ভাবলুম, বুঝি আকাশ থেকে বাতাসে ঝাপটা দিল।”
পাখির এই কথায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সেই বুড়ো-আপেলগাছ। অনেক দুঃখ-জড়ানো গলায়, অনেক কষ্টে সে সয়ে-সয়ে বলল, “আমার কাছে বাতাস আসে না রে পাখি, আকাশ আমার দিকে চেয়ে দেখে না।”
“কেন?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল পাখি।
“আমি যে বুড়ো হয়ে গেছি। আমার ফুল নেই, ফল নেই। রূপ নেই, রঙ নেই। আছে শুধু ক’টা শুকনো ডাল। আমাকে কেউ ভালবাসে না, কেউ না।”
বুড়ো-আপেলগাছের কথা শুনে কেমন যেন দুঃখে ভার হয়ে গেল পাখির মন। বলল, “আপেল-বুড়ো, দুঃখ কোরো না! আমার সব খুশি দিয়ে তোমায় আমি সুখ দেব। কেউ না থাক, আমি তোমার বন্ধু হব।”
“সত্যি,” গাছের সেই খসখসে ভাঙা গলাটা দুরন্ত আনন্দে চিৎকার করে উঠল। তারপর খুশিতে উদ্বেল হয়ে গাছ দুলতে লাগল। দুলতে-দুলতে বলল, “পাখি, আমার কাছে তুই রোজ আসবি তো?”
পাখি বলল, “আসব, নিশ্চয়ই আসব।”
“গান শোনাবি তো পাখি?”
পাখি বলল, “নিশ্চয়ই শোনাব। গান শোনাব, নাচ দেখাব।”
“কিন্তু তার বদলে তোকে যে আমি কিছুই দিতে পারব না। আমার যে সব ফুরিয়ে গেছে।” কথাটা বলতে ভারী কষ্ট হল আপেলগাছের।
পাখি বলল, “না, আপেলগাছ, না, তোমার কিছু ফুরোয়নি। তোমার বয়স ফুরোলেও তোমার মনটা তো এখনও হারিয়ে যায়নি।”
পাখির এইকথা শুনে বুড়ো-আপেলগাছের বুকের ভেতরটা আনন্দে থরথর করে কেঁপে উঠল। মনে হল, বুঝি-বা এখনই পাখিটাকে জড়িয়ে ধরে সে আদর করে। কিন্তু না, তা সে করল না। শুধু জিজ্ঞেস করল, “তোর নাম কী পাখি, তোর নাম?”
“আমি জয়,” পাখি উত্তর দিল।
“তুই এত রঙ কোথায় পেলি পাখি?”
পাখি উত্তর দিল, “তা তো জানি না। আমি যখন বাতাসে ডানা মেলে উড়ে যাই, তখন নীল আকাশে আমার নীল পালকের রঙ ঢেউ তোলে। সবাই বলে সুন্দর।”
বুড়ো-আপেলগাছের ভাঙা গলা খুশিতে উছলে উঠল, “সুন্দর! পাখি তুই সত্যিই সুন্দর! তুই গান গা পাখি, আবার গা। আমি শুনি।”
পাখি গান গাইল।
আবার গাইল।
রোজ গাইল।
হ্যাঁ, সেদিন থেকে পাখি রোজ বুড়ো-আপেলগাছের কাছে আসত। তার সঙ্গে কত গল্প করত। অনেক গান শোনাত, নাচত। খুশিতে দুলে উঠত আপেলগাছ। ভাবত, রূপ তার নাই থাক, খুশি তো ফিরে এসেছে। সে-খুশি তার ওই একটি পাখি। সেই পাখির নাম জয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন