সংবিধান নয়— চাই পিস্তল : জিন্নাহ্

সুজিত রায়

সংবিধান নয়— চাই পিস্তল : জিন্নাহ্

‘আজ আমরা কি করতে চলেছি!

আজ আমরা বীরত্বব্যঞ্জক কাজ করে আমাদের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করবো। এর আগে আমরা এমন কাজ কখনো করিনি। আমরা এতদিন পর্যন্ত সাংবিধানিক বিষয়গুলিকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলাম। কিন্তু আমরা আর সংবিধান মানবো না, আমরা সাংবিধানিক পদ্ধতির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করবো।

এখন সময় এসেছে একটি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র সৃষ্টি করা। সেজন্য আমাদের প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হবে। আমি এখন আর নীতিকথার কথা বলবো না। আমাদের একটি পিস্তল আছে, এখন সেই পিস্তলটি ব্যবহার করতে হবে।’

সূত্র: ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ প্রস্তাব উত্থাপনের বিষয়ে মুসলিম লিগের কর্মপরিষদের সভায় মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ ভাষণ।

.

‘It is unworthy of responsible statesmen to indulge in wild talks of joining their ends by “Direct Action” and of abandoning constitutional activities at the moment when their country stands on the threshold of new and decisive developments. The Muslim League would have served the cause of the community for better if it had protested in dignified terms at the provocative tone adopted by certain Congress Party spokesman and had plainly stated that its participation in the Constituent Assembly depended on the observance of the agreed terms of the plan of May 16th except in so far as they might be notified by consent.’

Source: A setback in India (editorial), The Times, London, 30 July 1946.

কলকাতার মনুমেন্ট ময়দানে মুসলিম লিগের বিশাল সমাবেশ। ১৬ অগাস্ট ১৯৪৬-এর এই সমাবেশ থেকেই সুরাবর্দিসহ অন্য লিগ নেতারা হিন্দু নিধনের ডাক দিয়েছিলেন।

কলকাতার মনুমেন্ট ময়দানে মুসলিম লিগের বিশাল সমাবেশ। ১৬ অগাস্ট ১৯৪৬-এর এই সমাবেশ থেকেই সুরাবর্দিসহ অন্য লিগ নেতারা হিন্দু নিধনের ডাক দিয়েছিলেন।

প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ঘোষণা

১৯৪৬। ২৯ জুলাই।

বোম্বাই শহরে বসল মুসলিম লিগের সর্বভারতীয় সম্মেলন। ঘোষিত উদ্দেশ্য, ভারতের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে ক্রিপস মিশনের প্রস্তাবের সমালোচনা করা এবং একই পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেসের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া।

এটা ছিল ঘোষিত উদ্দেশ্য। কিন্তু, পাশাপাশি আর একটি উদ্দেশ্য নিয়েই এগোচ্ছিল মুসলিম লিগ। তা হল, আন্দোলনের নামে কলকাতা শহর জুড়ে অনাসৃষ্টি তৈরি করা এবং হিন্দু নিধন যজ্ঞ সম্পন্ন করা।

এর প্রমাণ হল, অনেক আগে থেকেই বাংলার মুসলিম নেতা আবদুল হাসিম সম্ভাব্য প্রত্যক্ষ সংগ্রামের দিনটি নির্ধারণ করেছিলেন। ১০ এপ্রিল, ১৯৪৬-এ দিল্লিতে বিধায়কদের সম্মেলনে হাসিম তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘যখন সুবিচার এবং সাম্যের পরাজয় হয়, তখন তরবারির দ্বারাই ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।’ [সূত্র : Report of Star of Indial আর, বাংলার মুসলিম লিগের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন আরও এক পা এগিয়ে হুংকার দিয়েছিলেন, ‘মুসলিম লিগ ১৫০টি উপায়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করতে পারে, এই বিষয়গুলি কিন্তু অহিংস থাকবে না।’ [সূত্র: Communal Riots in Bengal (1905 – 47 ) : Suranjan Das. OUP 1993]

জুলাই মাসে মুসলিম লিগের মূল কর্ণধার এবং পাকিস্তানের মূল দাবিদার মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ তাঁর বোম্বাই শহরের বাড়িতে বসে একটি সাংবাদিক সম্মেলনে প্রায় একই কথা বলেন: Muslim League was preparing to launch a struggle. They have chalked out a plan. Until Muslims were granted a separate Pakistan then they would launch ‘direct action’.

৪ অগাস্ট তারিখে কলকাতায় মহল্লা সর্দার ও স্থানীয় মুসলমান নেতৃবৃন্দকে একটি ঘরোয়া বৈঠকে ডাকা হয়। সেখানে ছিলেন মুসলমান ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ও কর্মীরা। তাঁরা প্রত্যক্ষ সংগ্রামের দিনটি কীভাবে পালিত হবে সে-ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে মতামত বিনিময় করেন।

ড. সুরঞ্জন দাস তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা গ্রন্থ Communal Riots in Bengal 1905-1947-এ লিখেছেন: দাঙ্গা শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ আগে থেকেই মুসলমান বস্তিগুলোতে ছোরা, বর্শা ইত্যাদিতে শান দেওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গিয়েছিল। পার্ক থেকে রেলিংগুলির অংশবিশেষ তুলে এনে সুচালো মুখ অস্ত্র তৈরির হিড়িক শুরু হয়েছিল। কলকাতার পুলিশ কমিশনার এবং গোয়েন্দা বিভাগের অফিসাররা বলেছিলেন, বেকার, কারমাইকেলসহ বিভিন্ন হোস্টেলে ঘুরে ঘুরে লিগ নেতা-কর্মীরা মুসলিম ছাত্রদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারা যেন নিজেদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণে মেথিলেটেড স্পিরিট, কেরোসিন, ছোরাছুরি জোগাড় করে রাখে এবং ১৬ অগাস্ট ট্রামে বাসে, সামরিক বাহিনীর গাড়ি আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। হবিবুর রহমান নামে এক নেতা একটা প্যামফ্লেট ছাপিয়ে গোপন নির্দেশ প্রচার করেছিল যে, দরকার পড়লে জাতীয়তাবাদী মুসলমান ও কংগ্রেসিদের ধরে ধরে হত্যা করতে হবে। প্রস্তুতি ছিল এতটাই চরমে যে, পাকিস্তান অ্যাম্বুলেন্স কর্পসকে তৈরি করে রাখা হয়েছিল। মনুমেন্ট ময়দানে গড়ে তোলা হয়েছিল একটি ফার্স্ট এইড সেন্টার এবং শহরের বড়ো হাসপাতালগুলিতে তৈরি রাখা ছিল মুসলমান তরুণদের যাতে তারা আহত মুসলমানদের প্রয়োজনভিত্তিক সহযোগিতা করতে পারে।

অনেক আগে সেই এপ্রিল থেকেই হিংসাত্মক আক্রমণের উসকানি দিয়ে এসেছিলেন মুসলমান নেতারা। লিগ নেতা ফিরোজ খান নূর প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘মুসলমানদের এমন বিদ্রোহ ঘোষণা করতে হবে যাতে হালাগু খানও লজ্জিত হয়।’ হালাগু খান ইতিহাসের নির্মমতম মোঘল প্রশাসক হিসেবে কুখ্যাত, যিনি গেনঘিস খান বা চেঙ্ঘিস খানের নাতি ছিলেন। হালাগু চরম নির্মম অত্যাচারের মাধ্যমে বাগদাদ, সিরিয়াসহ গোটা পশ্চিম এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করেছিলেন। এ ছাড়া, সর্দার আবদুর রাব নিস্তার নামে এক খল লিগ নেতা লিখিতভাবে প্রচার করেছিলেন, “এবার মুসলমানদের হাতে তরবারি উঠে আসুক। কারণ পাকিস্তানের স্বপ্ন সফল করতে হলে অন্য ধর্মের রক্ত ঝরাতেই হবে। মুসলমানরা কখনোই অহিংস মন্ত্রে বিশ্বাস করে না।’ [সূত্র: দ্য ট্রিবিউন, লাহোর, ১৮ অগাস্ট ১৯৪৬]

বিশিষ্ট সাংবাদিক শংকর ঘোষ তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘হস্তান্তর স্বাধীনতার অর্ধশতক’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ১২ নম্বর অধ্যায়ে লিখে গেছেন: ‘কলকাতায় ১৯৪৬ এত ঘটনাবহুল একটি বছর যে তার সব ঘটনার উল্লেখ সম্ভব নয়। হয়তো অবিভক্ত বাংলা প্রদেশ যে বিরাট পরিবর্তনের দিকে অনিবার্য গতিতে এগিয়ে চলেছিল তারই প্রকাশ পাচ্ছিল একটির পর একটি ঘটনায়, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অনিশ্চয়তা প্রবেশ করেছিল তারই প্রকাশ এই অস্থিরতায়। সমাজের প্রতিটি অংশ চাইছিল অনাগত ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের শক্তি সংহত করতে, যদিও সে ভবিষ্যৎ কী সে সম্বন্ধে কারও কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না।’ এমনই দুটি যুগান্তকারী ঘটনা হল ১১ জুলাই পোস্টম্যান ও লোয়ার গ্রেড স্টাফ ইউনিয়নের ১৬ দফা দাবির ভিত্তিতে ডাকা ধর্মঘট যা কার্যত গোটা দেশের ডাক ও তার কর্মীদের সার্বজনীন ধর্মঘটেই পরিণত হয়েছিল। এবং, তারই রেশ ধরে ঘটে যাওয়া ২৯ জুলাইয়ের হরতাল ও সাধারণ ধর্মঘট যা গোটা কলকাতাকে সেদিন স্তব্ধ করে দিয়েছিল। শংকর ঘোষের কলমে সেই স্তব্ধ কলকাতার বর্ণনা হল: ‘কলকাতা শহরে সেদিন একটি গাড়ি চলেনি। একটি দোকান খোলেনি, স্কুল-কলেজে কোনো ছাত্র-শিক্ষক হাজিরা দেননি, বৃহত্তর কলকাতার একটি কারখানাতেও কাজ হয়নি। সেটিই ছিল কলকাতার এবং সারা প্রদেশের প্রথম বন্ধ…।’ হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড দৈনিক সংবাদপত্রের সিনিয়র সাংবাদিক কিরণচন্দ্র ঘোষ তাঁর রিপোর্টে লিখেছিলেন, এই ধর্মঘটের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, এর কেউ বিরোধী ছিলেন না, There was no scoffer ।

শংকর ঘোষ লিখেছেন : “ধর্মঘটি ডাক-তার কর্মীদের সমর্থনে ২৯ জুলাইয়ের বাংলা প্রদেশ বনধে ধর্ম ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে যে ঐক্য দেখা দিয়েছিল তাতে বোঝার উপায় ছিল না যে মাত্র কয়েক মাস আগের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটদাতারা কার্যত ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে ভোট দিয়েছিলেন, মুসলমানরা ভোট দিয়েছিলেন মুসলমান লিগকে, হিন্দুরা ভোট দিয়েছিলেন কংগ্রেসকে। হিন্দু-মুসলমানে এই রাজনৈতিক বিভাজন ২৯ জুলাইয়ের সাধারণ ধর্মঘটের ধাক্কায় ধুলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল, মনে হয়েছিল হিন্দু-মুসলমান সাধারণ নাগরিক বুঝতে পেরেছেন তাঁদের প্রকৃত সংগ্ৰাম অর্থনৈতিক শোষকদের বিরুদ্ধে, পরস্পরের বিরুদ্ধে নয়। বাস্তবে যে তা নয়, হিন্দু-মুসলমান বিভেদ যে আমাদের অন্তঃকরণকে বিদ্ধ করেছে, দিন পনেরো পরেই বোঝা গেল মুসলিম লিগের প্রত্যক্ষ সংগ্রামকে উপলক্ষ্য করে কলকাতার দাঙ্গায় যা দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার একটি বিখ্যাত সম্পাদকীয়-র নামানুসারে ইতিহাসে বর্ণিত হয়ে আছে The Great Calcutta Killing বলে।’ সন্দীপ মুখোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইতিহাসের দিকে ফিরে ছেচল্লিশের দাঙ্গা-য় লিখেছেন : ৩১ জুলাই অমৃতবাজার পত্রিকা-র শিরোনাম : General strike by All Communities; লেখা হয়েছে, দুশো বছরের ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসে ‘বৃহত্তর সাধারণ ধর্মঘট’ পালিত হয়েছে কলকাতায়।… সলিল চৌধুরির সেই বিখ্যাত গান ‘ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে’ লেখা হয়েছিল এই দিনটি নিয়েই। সাম্প্রদায়িক মৈত্রীর এ এক অভূতপূর্ব প্রকাশ— ঘটনাটাকে এইভাবেও দেখতে চেয়েছিলেন কেউ কেউ।… ২৯ জুলাইয়ের পর ১৬ অগাস্টের কথা বলতে গিয়ে অনেকেই, বিশেষত কমিউনিস্টরা, বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পরিণতি যে এরকম হবে, তা তাঁরা আগে বুঝতে পারেননি। কুমুদ বিশ্বাসের কথায়: ১৬ অগাস্টের আগে বুঝতে পারিনি যে এরকম হবে। সমর মুখোপাধ্যায়ের স্বীকারোক্তি: যদিও আগের দিন মুসলিম এলাকায় প্রচার করি, বৈঠক করি, কিন্তু এত বীভৎস দাঙ্গা হবে তা ভাবিনি।’

না, সত্যিই কেউ ভাবেনি একথাও যে, ২৯ জুলাই-ই ডাক-তার ধর্মঘটের অভূতপূর্ব সাফল্যের দিনই বোম্বাইতে বসে মুসলিম লিগ প্রধান মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ ঘোষণা করছেন সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত— ধর্মঘট নয়, হবে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম।

কোন সংগ্রাম? কাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম?

আগেই লিখেছি। আবারও লিখি— জিন্নাহ্র সেই বিখ্যাত উক্তি :

‘এতদিন ব্রিটিশ মেশিনগান আর কংগ্রেসের অসহযোগের অস্ত্র দিয়ে আমাদের শাসিয়েছে, এবার আমাদের হাতে পিস্তল এসে গেছে। Today we have also forged a pistol and are in a position to use it.’

অর্থাৎ, প্রত্যক্ষ সংগ্রাম কংগ্রেসের একরোখামি আর ব্রিটিশের বেইমানির বিরুদ্ধে— “intransigence of Congress on one hand and the breach of faith with the Muslims by the British Government on the other.’

সারা ভারত মুসলিম লিগ কাউন্সিলের উত্তপ্ত সভায় ঘোষণা হচ্ছে : “This Council directs the working committee to prepare forthwith a programme of direct action to carry out the policy initiated above and to prepare the Muslims for the coming struggle as and when necessary.’

বাংলার লিগ সভাপতি নাজিমুদ্দিন ওই মঞ্চেই ঘোষণা করেছেন, “The time for the test has come.’ আর বাংলায় শেখ মুজিবর রহমানের (পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি) নেতৃত্বে মুসলিম ন্যাশনাল গার্ড গঠন করে উদ্দীপিত বাংলার লিগ প্রধানমন্ত্রী হোসেইন সুরাবর্দি মুসলমান যুবসমাজকে সর্বশক্তি নিয়ে প্রস্তুত হবার আহ্বান জানাচ্ছেন: ‘Marshal all your forces under the banner of the Muslim League.’

‘৪২-এর আন্দোলনে কংগ্রেসের স্লোগান ছিল ‘করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে’। মুসলিম লিগ সেই ধাঁচেই প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দেয়— হয় এবার, নয়তো নেভার (Now or Never)। কংগ্রেসের স্লোগানই যেন ফিরে আসে লিগের ঘোষণায়— কংগ্রেসের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সরকার যদি হিন্দু সরকার গঠন করে, তাহলেই শুরু হয়ে যাবে মুসলিমদের সশস্ত্র সংগ্রাম। ‘That will be the signal for Muslims to do or die’— লিখে গেছেন অনিতা ইন্দর সিং তাঁর The Origins of the Partition of India, pg 181-তে।

প্রস্তাবনা

আর প্রত্যক্ষ সংগ্রামের প্রস্তাবনায় কী লিখেছিলেন লিগ নেতারা বোম্বাইয়ের সেই পরিষদীয় সভায়? দেখে নেওয়া যাক।

—Whereas the League has today resolved to reject the proposal embodied in the statement of the Cabinet Delegation and the Viceroy of May 16, 1946, due to the intransigence of the Congress on the one hand and with the breach of faith with the Muslims by the British Government on the other, and whereas Muslim India has exhausted without success all efforts to find a peaceful solution of the Indian problems by compromise and constitutional means whereas the Congress is bent upon setting up a caste Hindu Raj in India with the connivance of the British; and whereas recent events have shown that power politics and not justice and fair play are the deciding factors in Indian affairs; whereas it has become abundantly clear that the Muslims of India would not sit content with anything less than the immediate establishment of an independent and full sovereign state of Pakistan and would resist any attempt to impose any constitution, long term or short term, of the setting up of an Indian Government at the centre without the approval and consent of the Muslim League, the Council of All India Muslim League is convinced that the time has now come for the Muslim nation to resort to direct action to achieve Pakistan and assert their just rights and to vindicate their honour and get rid of the present slavery under the British and the contemplated future of caste Hindu domination.

‘The Council calls upon the Muslim nation to stand as a man behind their sole representative organisation the All India Muslim League and be ready for every sacrifice.’

অর্থাৎ, বাংলায় এই প্রস্তাবনার অনুবাদ যা দাঁড়ায় তা হল:

‘ক্যাবিনেট প্রতিনিধিবৃন্দ এবং ভাইসরয় দ্বারা প্রকাশিত ১৯৪৬ সালের ১৬ মে-র প্রস্তাবনাকে আজ মুসলিম লিগ সর্বতোভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। আমরা এই উপস্থাপনা প্রকাশ্যে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে বাধ্য হচ্ছি কারণ, এই ব্যাপারে কংগ্রেস যথোপযুক্ত সহযোগিতা করেনি এবং ব্রিটিশ সরকার ও মুসলমান সমাজের প্রতি বার বার বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ভারতবর্ষে বসবাসকারী মুসলমান সমাজ দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি অবলম্বন করে চলেছেন। তাঁরা চেয়েছিলেন, ভারতের সমস্যা যাতে সাংবিধানিক পদ্ধতিতেই নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সবক্ষেত্রে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগরূক থাকে। কিন্তু দেখা গেল, কংগ্রেস ভারতবর্ষে হিন্দুরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। এই লক্ষ্যে পৌঁছোতে কংগ্রেস প্রত্যক্ষ এবং অপ্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশ সরকারকেই সাহায্য করে চলেছে। আমরা যদি মোহমুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সমসাময়িক ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করি তাহলে সহজেই বুঝতে পারব যে, ভারতবর্ষে এখন রাজনীতিকে কেন্দ্র করে এক বিসদৃশ ও নিন্দাজনক পদ্ধতি পালন করা হচ্ছে। এর ফলে ভারতের সমস্যাগুলির দ্রুত সমাধান করা যাচ্ছে না। মুসলমান সম্প্রদায় অনন্তকালব্যাপী এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে পারে না। মুসলমান জাতিসত্তার আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ভারতের ভূখণ্ডেই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করা প্রয়োজন। এই দাবি পূরণে আমরা কোনো বাধার কাছে মাথা নত করব না। মুসলমান সমাজ এমন কোনো সংবিধানকেই মান্যতা দেবে না যা এই রাষ্ট্রের পরিপন্থী। আজ অথবা আগামীকাল ভারতবর্ষে একটি স্বাধীন দেশ ও স্বাধীন সরকার গঠিত হবে। কিন্তু, মুসলিম লিগ ও সর্বভারতীয় মুসলিম লিগের কর্মপরিষদ সেক্ষেত্রে স্পষ্টতই ঘোষণা করছে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের গঠনের সপক্ষে লিগ প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দিতে বাধ্য হবে। এই প্রস্তাব আমরা গ্রহণ করছি কারণ আমরা চাই মুসলমান সমাজ যথেষ্ট সম্মান ও সমৃদ্ধির সঙ্গে বাঁচুক। মুসলমান সমাজ আর ব্রিটিশের ক্রীতদাস হিসেবে বেঁচে থাকতে রাজি নয়।

‘লিগের কর্মপরিষদ তাই গোটা মুসলমান সম্প্রদায়কে আজ সংঘবদ্ধ হতে আহ্বান করছে। সব মুসলিম একত্রিত হোন। সর্বভারতীয় মুসলিম লিগ সমস্ত মুসলমানকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।’

পাখির চোখ: কাফের ও কংগ্রেস

এই আহ্বানের অর্থ ছিল একটাই— ব্রিটিশ সরকার নয় কারণ সে তো ভারত ছেড়ে চলে যাবার জন্য পা বাড়িয়েই দিয়েছে, মূল আক্রমণ আসবে হিন্দুদের ওপর আর কংগ্রেসের ওপর। কারণ, মুসলমানদের কাছে হিন্দু মানেই কাফের। আর, কংগ্রেস সেই কাফেরদের রক্ষাকর্তা, অন্তত মুসলমানদের চোখে।

অতএব, তৈরি হয়ে গেল প্রত্যক্ষ সংগ্রামের নামে এক তীব্র ও ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক অভিঘাতের ঝড়কে ভারতবর্ষের বুকে আছড়ে ফেলার প্রস্তুতি। স্টার অফ ইন্ডিয়া পত্রিকায় একটি সুবৃহৎ প্রতিবেদনের মাধ্যমে মুসলিম লিগ গোটা ভারতবর্ষে পৌঁছে দিল সেই অভিঘাতের যোজনা। ছয় দফা কার্যক্রম ঘোষণা করা হল লিখিতভাবে।

১। ১৬ জুলাই সারাদিনব্যাপী সর্বাত্মক ও সার্বজনীন বন্ধ ও হরতাল পালন করা হবে। কেবলমাত্র জরুরি পরিষেবা ছাড়া কোনোরকম পরিষেবা সেদিন মানুষ পাবে না।

২। গোটা শহর জুড়ে বাদ্যযন্ত্র ও ট্যাবলোসহ শোভাযাত্রা ও কাফেলা পরিক্রমা করবে। শুধু কলকাতা নয়, এই কার্যক্রম পালিত হবে হাওড়া, হুগলি এবং মেটিয়াবুরুজসহ ২৪ পরগনার সর্বত্র। বিকেল ৩টে থেকে ৬টার মধ্যে এইসব শোভাযাত্রা পৌঁছে যাবে এসপ্ল্যানেডের অক্টারলোনি মনুমেন্ট ময়দানে।

৩। মনুমেন্ট পাদদেশে একটি বিরাট সভা হবে। সেই জনসভায় সভাপতির পদে আসীন থাকবেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লিগের সংসদীয় দলের প্রধান ও বাংলার প্রধানমন্ত্রী জনাব হোসেইন সুরাবর্দি।

৩। নির্যাতিত ও নিপীড়িত সংখ্যালঘুরা এবং যেসব ফ্যাসিবিরোধী শক্তিগুলি বারে বারে অত্যাচারিত হয়েছে, তারা ময়দানে হাজির হবেন। লিগের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণকারী সমস্ত মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, তপশিলিভুক্ত জাতি, উপজাতি ও আদিবাসীরা যাঁরা মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে চান তাঁদের সকলকে লিগ স্বাগত জানাচ্ছে।

৫। প্রতিটি ওয়ার্ডের মসজিদগুলির তালিকা তৈরি করবেন লিগ কর্মীরা। ১৬ অগাস্ট প্রতিটি মসজিদে তিনজন করে লিগ কর্মী নির্দিষ্ট দায়িত্বে হাজির থাকবেন। তাঁরা এলাকার মুসলমান জনসাধারণকে সেদিনের কর্তব্য সম্বন্ধে অবহিত করবেন। এই কাজ সেরে ফেলতে হবে জুমা প্রার্থনার আগেই। কর্তব্য পালন সম্বন্ধীয় রিপোর্ট লিগ নেতৃত্বের কাছে জমা দিতে হবে। একটি প্রচারপত্র এই ব্যাপারে প্রকাশিত হবে। তা পাওয়া যাবে ৮ নম্বর জ্যাকেরিয়া স্ট্রিট থেকে।

৬। ভারতীয় মুসলমানদের স্বাধীনতার স্বার্থে প্রত্যেক মসজিদে মোনাজাতের অনুষ্ঠান হবে। মোনাজাতটিও পাওয়া যাবে ৮ নম্বর জ্যাকেরিয়া স্ট্রিট থেকে। রাজ্যের সমস্ত মুসলমান ভাইদের কাছে আবেদন তাঁরা প্রত্যক্ষ সংগ্রামের দিনটিকে যেন যথাযথ গুরুত্ব সহকারে উদ্যাপন করেন যাতে দিনটি ঐতিহাসিক দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। এখন রমজান মাস। এই মাসটিকে আমরা জিহাদি মাস হিসেবে উদ্যাপন করব। কারণ, এই সময়ে আমরা যে কাজ করব তাতেই আল্লার দোয়া মিলবে। আমরা এখন একটি নতুন জাতি গঠনের জন্য আধ্যাত্মিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত হব। আমরা এবার চাইব চরম বিচার। সাহসী মুসলমানরা বৃষ্টিকে উপেক্ষা করবেন। সমস্ত বাধাবিপত্তিকে উপেক্ষা করবেন এবং প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ দিবসের সত্যকে স্মরণীয় করে রাখবেন। মিল্লাতের অধীর আনন্দে সকল মুসলমানদের আমরা আহ্বান করছি।

এই রমজান মাসেই বদরের যুদ্ধ হয়েছিল। এই যুদ্ধে লড়াইটি ছিল পৌত্তলিকতা বনাম ইসলাম-এর। এই যুদ্ধে ৩১৩ জন মুসলমান জয়ী হয়েছিলেন। আবার এই রমজান মাসেই ১০ হাজার মুসলমান পয়গম্বরের নেতৃত্বে মক্কা জয় করেছিলেন। এখানে স্বর্গের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আরবের বুকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামি শাসন। মুসলিম লিগ গর্বের সঙ্গে জানাচ্ছে যে এমন একটি পবিত্র মাসেই আমরা এই মহাসংঘর্ষের ডাক দিয়েছি।

ময়দানের সমাবেশের পরই শুরু হয়ে যায় গোটা কলকাতা জুড়ে হিন্দু নিধন পর্ব ছবি সৌজন্য : লাইফ পত্রিকা

ময়দানের সমাবেশের পরই শুরু হয়ে যায় গোটা কলকাতা জুড়ে হিন্দু নিধন পর্ব ছবি সৌজন্য : লাইফ পত্রিকা

সেদিন এই ব্যবস্থাপনার আয়োজনের জন্য নির্দেশাবলিতেই থেমে যায়নি মুসলিম লিগ। অত্যন্ত গোপনে জারি করা হয়েছিল আরও একটি নির্দেশনামা। সেই নির্দেশনামা ছিল মূলত হিন্দু বিনাশের নির্দেশনামা। সেই নির্দেশনামার প্রতিটি লাইন হিন্দু বিরোধী এবং চরম উসকানিমূলক যা গোটা মুসলমান সমাজকে উত্তেজিত করে তুলেছিল। গোপনীয় ওই নির্দেশনামায় বলা হয়েছিল :

১। পাকিস্তান-এর দাবিতে সব মুসলমান জীবনদানে তৈরি থাকবেন। ২। পাকিস্তান স্থাপিত হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে ভারতের বুকে মুসলমান আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

৩। ভারতে বসবাসকারী সমস্ত মানুষকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হবে।

৪। বিশ্বের সমগ্র মুসলমান সমাজ যেন এই কাজে শামিল হন। এ ছাড়া, বিশ্ব থেকে অ্যাংলো-আমেরিকান শোষণকে নিঃশেষ করতে হবে।

৫। প্রতিটি মুসলমানকে ৫ জন হিন্দুর মোকাবিলা করতে হবে।

৬। পাকিস্তান এবং ভারতীয় সাম্রাজ্য স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত যে বিষয়গুলির প্রতিটি মুসলমানকে অনুসরণ করতে হবে সেগুলি হল :

ক. হিন্দু মালিকানাধীন সমস্ত কারখানা ও দোকান লুঠ করে পুড়িয়ে দিতে হবে। লুঠের মাল জমা দিতে হবে মুসলিম লিগের অফিসে।

খ. লিগের সমস্ত সদস্য সবসময় সশস্ত্র থাকবেন।

গ. জাতীয়তাবাদী মুসলমানরা এর বিরোধিতা করলে গুপ্তচর বাহিনী তাদের হত্যা করবে।

ঘ. হিন্দুদের বেশি সংখ্যায় হত্যা করে তাদের সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে।

ঙ. সমস্ত মন্দির গুঁড়িয়ে দিতে হবে।

চ. মুসলিম লিগের গুপ্তচর বাহিনী সমস্ত জেলার গ্রামে গ্রামে সক্রিয় থাকবেন।

ছ. অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সমস্ত কংগ্রেস নেতাদের নিকেশ করতে হবে।

জ. কংগ্রেসের সমস্ত কার্যালয় গুপ্তচর বাহিনী ধ্বংস করে দেবে।

ঝ. মুসলিম লিগের স্বেচ্ছাসেবকরা করাচি, বোম্বে, কলকাতা, মাদ্রাজ, গোয়া ও বিশাখাপত্তনম শহরকে ১৯৪৬-এর ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে রাখবে।

ঞ. হিন্দু শাসনাধীন সামরিক বাহিনী বা ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সংস্থায় মুসলমানরা চাকরি করতে পারবেন না।

ট. গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে মুসলমান বাহিনী অরাজকতা সৃষ্টি করবে। বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেস পরিচালিত সরকারকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে হবে।

ঠ. ভারতে মুসলিম সাম্রাজ্য স্থাপনের লক্ষ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক উৎসের দখল নেবে। এজন্য নিজাম পরিচালিত প্রদেশগুলির কমিউনিস্টদের ও কিছু ইউরোপীয়র সহযোগিতা পাওয়া যাবে। পাঞ্জাব, সিন্ধু এবং বাংলাকে পুরোপুরি অস্ত্রাগারে পরিণত করা হবে।

ড. কেন্দ্রীয়ভাবে মুসলিম লিগ বোম্বাই, কলকাতা, দিল্লি, মাদ্রাজ, ব্যাঙ্গালোর, লাহোর ও করাচিতে ওইসব অস্ত্র বিলি করবে।

ঢ. হিন্দুদের প্রাণ ও সম্পত্তি বিনষ্ট করতে প্রত্যেক মুসলিম সদস্য অস্ত্র, নিদেনপক্ষে একটা ছোটো ছুরি সঙ্গে রাখবেন। হিন্দুদের ভারত থেকে বিতাড়িত করাই হবে মুসলমানদের লক্ষ্য।

ণ. গোটা পরিবহণ ব্যবস্থাকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যবহার করতে হবে।

ত. সংখ্যাগুরু মহিলা এবং নাবালিকাদেরও ধর্ষণ করতে হবে, অপহরণ করতে হবে এবং ১৮ অক্টোবর থেকে তাদের বলপূর্বক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে হবে। হিন্দু সংস্কৃতি তাদের মন থেকে মুছে দিতে হবে।

থ. হিন্দু মানেই শত্রু— লিগ সমর্থকরা তাই হিন্দুদের প্রতি সর্বদাই নির্মম আচরণ করবেন ও সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করবেন।

দ. হিন্দু ব্যবসায়ীদের তৈরি সব কিছু বর্জন করতে হবে।

দাবার ছক প্রস্তুত

হিন্দু নিধন এবং পাকিস্তান সৃষ্টি— এই দুটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ধাবমান মুসলিম লিগ কীভাবে সাজাচ্ছিল তাদের লড়াইয়ের দাবার ছক, তা স্পষ্ট করে দিল মর্নিং নিউজ পত্রিকা। ৩১ জুলাই থেকে ১৬ অগাস্ট পর্যন্ত মর্নিং নিউজ-এর পাতার মূল খবরগুলির ওপর দৃষ্টিপাত করলেই স্পষ্ট হয়ে যায়, নিজেদের স্বার্থ পূরণে বাংলা তথা কলকাতার মুসলমান সমাজ কতখানি ভয়ংকর পদক্ষেপ নিতে চলেছিল।

১ অগাস্ট: মুসলিম লিগ নেতা নাজিমুদ্দিন মুসলিম যুবকদের আহ্বান করলেন, অবিলম্বে মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডে যোগ দিতে। [এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ (পূর্ববর্তী পূর্ব পাকিস্তান)- এর রূপকার শেখ মুজিবর রহমান ছিলেন মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের নেতা এবং মুসলিম লিগের সক্রিয় সদস্য। তিনি তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে সেইসময় পাকিস্তান সৃষ্টির স্বার্থে সুরাবর্দির সাহচর্যে তাঁর সাম্প্রদায়িক ক্রিয়াকলাপের বিবরণ রেখে গেছেন। কিন্তু, ১৯৪৬-এর দাঙ্গার ইতিহাস বিবৃত করার ক্ষেত্রে তিনি অনেক ক্ষেত্রেই সততা এবং সত্যতা বজায় রাখতে পারেননি। তার প্রমাণ কলকাতা দাঙ্গা সম্পর্কিত বহু গবেষণাপত্র যা আকরগ্রন্থ হিসেবে পরিচিত এবং এই গ্রন্থেও উল্লিখিত।]

২ অগাস্ট: প্রত্যক্ষ সংগ্রামের রূপ কেমন হবে? এ প্রশ্নের জবাবে মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ বলছেন, তিনি নীতিশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা চান না।

৪ অগাস্ট: মৌলানা আক্রম খান ঘোষণা করেছেন, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে।

৫ অগাস্ট: মুসলিম ইনস্টিটিউটে মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের সমাবেশ। পবিত্র কোরহান এবং ইসলামের নির্দেশ অনুসরণের জন্য নাজিমুদ্দিন আহ্বান জানাচ্ছেন।

 ‘৪৬-এর কলকাতা দাঙ্গার অন্যতম দুই সংখ্যালঘু নেতা অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শাহিদ হোসেইন সুরাবর্দি এবং তৎকালীন মুসলিম ন্যাশনাল গার্ড-এর তরুণ নেতা শেখ মুজিবর রহমান যিনি পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন।

‘৪৬-এর কলকাতা দাঙ্গার অন্যতম দুই সংখ্যালঘু নেতা অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শাহিদ হোসেইন সুরাবর্দি এবং তৎকালীন মুসলিম ন্যাশনাল গার্ড-এর তরুণ নেতা শেখ মুজিবর রহমান যিনি পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন।

৬ অগাস্ট: ১৬ অগাস্ট সাধারণ ধর্মঘট ও হরতাল পালনের ডাক।

৮ অগাস্ট: ১৬ অগাস্ট ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত।

৯ অগাস্ট : প্রত্যক্ষ সংগ্রামে কর্মসূচি ঘোষণা লিগ নেতা ও কলকাতার মেয়র মহম্মদ উসমানের। মিছিল যাবে ময়দানে। জমায়েত হবে দুপুরে। সমস্ত শক্তি নিয়ে সমবেতভাবে জমায়েতকে সফল করতে হবে। জানা যাচ্ছে, ১৬ অগাস্ট শহরের সমস্ত মসজিদে মুসলিম লিগ প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন।

১১ অগাস্ট : প্রত্যক্ষ সংগ্রামের প্রস্তাবনায় বলা হচ্ছে— লিগের এটা পরম সৌভাগ্য যে, এই রমজান মাসেই সংগ্রাম শুরু হবে, কারণ এই রমজান মাসেই তো আল্লাহ্ জিহাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

১৪ অগাস্ট : মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যদের ১৬ অগাস্ট সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে মুসলিম ইনস্টিটিউটে সমবেত হতে হবে। তাদের পরনে থাকবে খাকি পোশাক, মাথায় শোলার টুপি।

১৫ অগাস্ট : রেলওয়ে কর্মীদের নিয়ে গঠিত হবে মুসলিম ন্যাশনাল কোর। মুসলিম লিগের নেতা নুরুল হুদা ঘোষণা করেছেন— আর স্লোগান নয়, চাই অ্যাকশন।

১৬ অগাস্ট : সম্পাদকীয় আহ্বান : আজ প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস। দুনিয়াকে দেখিয়ে দিতে হবে, মুসলমানরা পাকিস্তানের দাবিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ [সূত্র: ইতিহাসের দিকে ফিরে ছেচল্লিশের দাঙ্গা: সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন]

১৭ অগাস্ট ১৯৪৬– দ্য স্টেটসম্যান দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠা

স্টার মর্নিং নিউজের এই দৈনন্দিন খবরগুলির পরিণাম যে স্বাভাবিক আন্দোলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে না, তা ছিল স্পষ্ট। যদিও মুখোশের আড়ালে ছিল শান্তির বাতাবরণ বজায় রাখার আহ্বানও। বলা হয়েছিল, ১৬ অগাস্টের ধর্মঘট পালনে কাউকে জোরজুলুম করা হবে না। সুরাবর্দি আশ্বাস দিচ্ছিলেন হিংসা বা হুমকির আশ্রয় নেবে না আন্দোলনকারীরা। জিন্নাহ্ বলেছিলেন— আন্দোলন করতে হবে শান্তিতে সুশৃঙ্খলভাবে। কিন্তু, পাশাপাশি চলছিল উত্তেজক প্রচার মুসলিম মহল্লায় মহল্লায়। মেয়র মহম্মদ উসমান উত্তেজক প্রচারপত্র বিলি করছিলেন হাজারে হাজারে মুসলিমদের কাছে।

একটি প্রচারপত্রে ছবি ছাপা হয়েছিল— মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ তরোয়াল হাতে দাঁড়িয়ে। আর লেখা হয়েছিল, ‘তরোয়াল তুলে নাও। ওহে কাফের, তোমার ধ্বংসের দিন বেশি দূরে নয়।’ অন্য একটি প্রচারপত্রে লেখা ছিল, ‘আল্লার ইচ্ছায় পাকিস্তান লাভের জন্য নিখিল ভারত মুসলিম লিগ এই রমজান মাস ঠিক করেছেন। কারণ, এই রমজান মাসেই ইসলাম ও কাফেরদের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল।’

প্রথম প্রচারপত্রটির উল্লেখ রয়েছে শীলা সেনের Muslim Politics in Bengal-এর ২১৩ পৃষ্ঠায়। দ্বিতীয় প্রচারপত্রটির উল্লেখ রয়েছে প্রবাসী পত্রিকার ১৩৫৩-র আশ্বিন সংখ্যায়।

হিংসাত্মক প্রচার এতটাই তীব্র ছিল যে, বঙ্গীয় আজাদ ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আনিসুজ্জামান প্রবাসী, আশ্বিন, ১৩৫৩ সংখ্যায় লিখেছিলেন, ‘ধর্মের দোহাই দিয়া এই দাঙ্গায় মুসলমানগণকে উত্তেজিত করানো হইতেছে।’

ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারছিল— একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে চলেছে। কারণ, লিগের বোম্বাই অধিবেশনের প্রস্তাবনা শহরে শহরে যে সাম্প্রদায়িক অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলবে, তা নিশ্চিত ছিল। বড়োলাট লর্ড ওয়াভেল তাই তড়িঘড়ি একটা সরকার গঠন করতে উদ্বিগ্ন। তিনি জওহরলালকে বলছেন— লিগের সঙ্গে আলোচনা করে নিন। ওরা রাজি হলে ভালো। নাহলে লিগকে বাদ দিয়েই এগিয়ে যান।

নেহরু তখন বাংলা বা কলকাতা নিয়ে ভাবছেনই না। ভাবার সময়ও তাঁর নেই। ১৩ অগাস্টেও তাই বলছেন: We shall try to unite these knots. But if those knots prove obstinate, we will cut them. [Amrita Bazar Patrika, Aug. 11, 1946]

১৫ অগাস্ট নেহরু-জিন্নাহ্-র মধ্যে কথা হল আশি মিনিট ধরে। কী কথা হল— দু-জনের কেউই ভাঙলেন না। ওদিকে কলকাতা জুড়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। ভীতির সঞ্চার হচ্ছে হিন্দুদের মনে। সর্বত্র ‘কী হয়, কী হয়’ ভাব। বিশেষ করে ১৬ অগাস্ট ছুটির দিন ঘোষণা হওয়ায় শঙ্কা বেড়েছে আরও। হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেস পৃথকভাবে মুসলিম লিগের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক এবং ছুটি ঘোষণার তীব্র বিরোধিতা করেছে। বামপন্থী ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়ন লিগের ডাকা ধর্মঘটকে সমর্থন করে এবং কেউ কেউ লিগের সমাবেশ ও মিছিলে অংশ নেবার প্রস্তাবও উত্থাপন করে। যুক্তি ছিল, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম ও শ্রমিক ঐক্য অটুট রাখার স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত। বিরোধিতা করলে দাঙ্গা লেগে যেতে পারে।

বামপন্থী নেতৃত্বের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ইউনিয়নের মধ্যে মতভেদ ছিল। এবং, দেখা গেল, যাঁরা বলেছিলেন, দাঙ্গা এড়াতে মিছিলে যোগ দেওয়াই শ্রেয়, তাঁরা যে ডাহা ভুল পথে হেঁটেছিলেন তা ১৬ অগাস্ট দুপুরেই প্রমাণিত হয়ে গেল, যখন শহরের বুকে আছড়ে পড়ল মুসলিম আক্রমণ কালবোশেখির মতো।

বামপন্থীরা দাঁড়াল মুসলিম লিগের পাশে

তখন বামপন্থীদের শক্তি ছিল সীমিত। নেতৃত্বের সংখ্যাও বেশি নয়। কংগ্রেস তখন বামপন্থীদের প্রধান রাজনৈতিক শত্রু। তাই কোনোভাবেই কোনো ইসুতে কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলানো যাবে না। অতএব, হাত মেলাও মুসলিম লিগের সঙ্গে। কারণ, তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। সরকার গড়ার সংখ্যা রয়েছে তাদের হাতেই।

ঠিক এই কারণেই ১৯৪৩ সালে মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবি মেনে কমিউনিস্টরা মুসলিম লিগের ‘বন্ধু’ হয়ে উঠেছিল। লিগ ও কমিউনিস্টদের হাতে হাত রেখেই এগোচ্ছিল। ১৬ অগাস্টের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরুর আগেই বাংলার লিগ সরকার জেলবন্দি বামপন্থী বিপ্লবীদের মুক্তিদানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ডের ১৬ অগাস্টের পাতায় তা বড়ো খবর হয়েছিল। পারস্পরিক পিঠ চাপড়ানোর এই যে খেলা, তা ছিল বাংলার হিন্দুদের জন্য যথেষ্ট ক্ষতিকর। সেটা সেদিন বাংলার কমিউনিস্টরা বোঝেননি। অথবা, বুঝেও নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতেই যে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেটা নিয়েছেন। কারণ, তাঁদের কাছে দলের অস্তিত্ব বজায় রাখাটা ছিল বড়ো চ্যালেঞ্জ। অতএব, সুযোগসন্ধানী হতে বাধা কোথায়?

এই সময়কার একটি ঘটনা খুব উল্লেখযোগ্য। ব্রিটিশ সরকারের সেনাবিভাগে তখন কাজ করতেন নামজাদা অধ্যাপক ডব্লিউ মাহমুদ। অগাস্টের গোড়াতেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাঁকে তাঁর দক্ষিণ কলকাতার বাসা থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন ইংরেজপাড়া চৌরঙ্গিতে। হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত কেন জানতে চাওয়ায় অধ্যাপক মাহমুদকে কর্তৃপক্ষ বলেছিলেন, ‘আপনাকে আমরা জ্যান্ত পুড়ে মরতে দিতে পারি না।’

ব্রিটিশ বাহিনীর এই সিদ্ধান্ত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল যে, ১৬ অগাস্ট কলকাতা জ্বলবে সাম্প্রদায়িকতার আগুনে। আর, সে- আগুনে তারা হাত পোড়াবে না। তাই ব্যারাকপুরের সেনা ব্যারাকে অফিসারদের এক সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, ‘When the riot begins, we will not interfare. If the people want swaraj ( self rule ) let them fight for it.’ [সূত্র : প্যারেলাল লিখিত মহাত্মা গান্ধী গ্রন্থের ২৫৩-৫৪ পৃষ্ঠা]

বাড়তি রসদ কমিউনিস্টদের সমর্থন

একদিকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর নীরব থাকার সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে কমিউনিস্টদের সক্রিয় অংশগ্রহণ মুসলিম লিগকে বাড়তি এনার্জি জোগাল। ১৯৪২ থেকেই কমিউনিস্ট পার্টি মুসলিম লিগের পাকিস্তান গঠনের দাবিকে সমর্থন করে এসেছে। ‘ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠন সম্ভব এমন একটা অবাস্তব তত্ত্বকে মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তুলতে কমিউনিস্টদের ভূমিকা ছিল যথেষ্ট। প্রশ্ন হল, কমিউনিস্ট পার্টি কেন এমনটা করল এবং করে পার্টির লাভই-বা কী হল?’ এই প্রশ্ন তুলে বিশিষ্ট গবেষক সৌম্য বসু তাঁর দাঙ্গা থেকে দেশভাগ প্রথম খণ্ডের ২৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘ প্ৰথম প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় যে, মুসলমানদের মধ্যে আপন প্রভাব আরও দৃঢ় করতে পার্টি এমন কৌশল গ্রহণ করে। এই করে, ডা. রণেন সেনের মতে, “কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলন প্রভূত সংখ্যায় মুসলমান যুবককে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়, বিশেষ করে শ্রমিক আন্দোলনে। কলকাতায় পার্টি মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। তাছাড়া প্রচুর মুসলিম শ্রমিক বাঙালি ও অবাঙালি শহরাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলনের মারফত পার্টির প্রতি আকৃষ্ট হয়।” পার্টি নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে কমিউনিস্টরা কংগ্রেসের ভেতর প্রবেশ করে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করেছিল। বাংলার বহু কংগ্রেস কমিটির কার্যনির্বাহী সমিতির সদস্যপদও লাভ করতে সক্ষম হয় তারা। ফলে কংগ্রেসীদের সঙ্গে তাদের সংঘাতও বেধে যায়। উদাহরণ, বর্ধমান ও কুমিল্লা। অনুরূপভাবে পার্টি চাইছিল মুসলিম লিগেও প্রবেশ করে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে। এক্ষেত্রে লিগে তাদের প্রধান সহায়ক ছিলেন বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লিগের সম্পাদক আবুল হাশেম। আবুল হাশেম প্রধানমন্ত্রী সুরাবর্দীর স্নেহধন্য হলেও আক্রম খাঁ নাজিমুদ্দিনের ছিলেন চক্ষুশূল। আক্রম খাঁ-রা কমিউনিস্টদের ঘৃণা করতেন এবং লিগে কমিউনিস্ট অনুপ্রবেশ মোটেও বরদাস্ত করবেন না বলে মাঝেমধ্যেই হুঙ্কার ছাড়তেন। একা একা হাশেমের পক্ষে বাংলা লিগের একটা বৃহৎ অংশের মোকাবিলা করা সম্ভবপর ছিল না। তাই মুসলিম লিগের মধ্যে কমিউনিস্টরা তেমন সুবিধা করতে পারেনি।

তা ছাড়া, কমিউনিস্টদের কোনো ইমান নেই— লিগের একাংশ এটা ছড়িয়ে দিয়েছিল। কমিউনিস্টদের ঘায়েল করার জন্য তারা সভাসমিতিতে প্রচার করত— কোনো মুসলমান কখনো কমিউনিস্ট হতে পারে না। তবুও পিছু হটেননি কমিউনিস্টরা। এমনকী ১৬ অগাস্ট তাঁরা নিজেদের মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’র প্রকাশও বন্ধ রেখেছিলেন। শহরের বহু অঞ্চলে মুসলিম লিগের হাত ধরে মিছিলেও অংশ নিয়েছিলেন কমিউনিস্টরা। আরও লক্ষণীয় এবং ইতিহাস সাক্ষী যে, কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পি সি যোশীর একটি বিরাট প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল পাকপন্থী ডন পত্রিকায়। যোশীর বক্তব্য ছিল— বিদেশি শাসন উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের উচিত পাকিস্তান দাবি মেনে নেওয়া। অর্থাৎ বামপন্থীরা, মুসলিম লিগের হিন্দুর বিনাশ সাধনের যে লক্ষ্য, তার দিকে পিছন ফিরে রইলেন। মুসলিম লিগকে সমর্থনের কারণ হিসেবে অজুহাত খাড়া করলেন বিদেশি ঔপনিবেশিক শত্রুর বিরুদ্ধে মুসলিম লিগের আন্দোলনকে। এটা কি মেনে নিতে আমরা বাধ্য হব যে, কমিউনিস্টরা মুসলিম লিগের মুখ্য উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন না?

কোনো কোনো কমিউনিস্ট নেতা অবশ্য শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করেছিলেন এই বলে যে, ‘১৬ অগাস্টের আগে বুঝতে পারিনি এমন হবে’ (কুমুদ বিশ্বাস), অথবা, ‘যদিও আগের দিন মুসলমান এলাকায় প্রচার করি, বৈঠক করি, কিন্তু এত বীভৎস কাণ্ড হবে তা ভাবিনি’ ( সমর মুখোপাধ্যায়)। অথচ, পার্টির মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’-তে আগেই লেখা হয়েছিল যে, ১৬ অগাস্ট ‘ঘরোয়া লড়াই এবং ব্যাপক দাঙ্গা’-র আশঙ্কা রয়েছে। এর বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সংগ্রাম প্রয়োজন।

গবেষক সৌম্য বসুর বিশ্লেষণ: এই পদক্ষেপের ফলে কমিউনিস্টদের লাভের থেকে লোকসান বেশি হয়েছে। সাময়িকভাবে কমিউনিস্টরা লিগের কয়েকটি পদ লাভ করেছিলেন, এই যা! মূল ক্ষতি হয়েছিল— অমুসলিমদের মধ্যে কমিউনিস্টদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণা জন্মে গিয়েছিল। ‘স্বাধীনতা আন্দোলনে কাটোয়া মহকুমা’-য় বঙ্কিমচন্দ্র ঘোষ লিখেছিলেন— কমিউনিস্টদের সবচেয়ে বড়ো বোকামি ছিল মুসলিম লিগের মধ্যে প্রগতিশীল অংশ খুঁজতে যাওয়া। ঠিক একই ভুল ছিল মুসলিম লিগের নীতি অনুসরণ করে ‘৪২- এর আন্দোলনকে বয়কট করা। এর ফলে জনগণের মনে যেমন কমিউনিস্ট বিচ্ছিন্নতার মানসিকতা জন্মেছিল তেমনই, কমিউনিস্টরা কংগ্রেসিদের চোখেও অবজ্ঞার পাত্র হয়ে উঠেছিলেন।

মুসলিম লিগের প্রতি অতিভক্তির সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ ছিল ১৬ অগাস্টে মনুমেন্ট ময়দানে লিগের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের সভায় যখন সুরাবর্দি ঘোষণা করছেন, ‘তোমাদের ২৪ ঘণ্টা সময় দেওয়া হল। পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য তোমরা যা করার তাই করো,’ তখনও মঞ্চ আলো করে বসে আছেন কমিউনিস্ট শ্রমিক নেতা জ্যোতি বসু। অবশ্য, কিছুক্ষণ পরে অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি মঞ্চ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। হয়তো দাঙ্গা শুরু হয়ে গেলে বাড়ি ফেরাই হবে সমস্যা— এই ভেবেই। ভালোই করেছিলেন। কারণ, ওইদিন কলকাতায় দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর কমিউনিস্টরাও আক্রান্ত হন লিগ দাঙ্গাকারীদের হাতে। বিশেষ করে, কলকাতার পর নোয়াখালির দাঙ্গাতেও শহিদ হন কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য ও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামী লালমোহন সেন। চট্টগ্রামে পার্টির অফিসে আগুন লাগাবার চেষ্টা করেছিল দাঙ্গাবাজরা। পাকিস্তান সৃষ্টির পরেও ওপার বাংলায় কমিউনিস্টরা মুসলমানদের হাতে চরমভাবে নিপীড়িত হয়েছেন, তারও নজির রয়েছে।

মুসলিম লিগের সামগ্রিক চক্রান্তের শরিক যে বামপন্থীরা ছিলেন, তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ— ১৯৪৭ সালে বঙ্গীয় আইনসভায় ভারত-বিভাজনের পক্ষে ও বিপক্ষে যে ভোটাভুটি হয়েছিল তাতে কমিউনিস্ট পার্টির তিন প্রতিনিধি— জ্যোতি বসু, রতনলাল ব্রাহ্মণ ও রূপনারায়ণ রায় দেশভাগের পক্ষেই রায় দিয়েছিলেন মুসলিম লিগের হাত ধরে।

যদিও দাঙ্গা যখন মারাত্মক চেহারা নিয়েছে, বামপন্থীরা তখন তা দমন করতে বড়ো ভূমিকা নিয়েছিলেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%