সুজিত রায়
দেশবিভাগের সময়কার দাঙ্গাগুলি গোটা উপমহাদেশের দুটি প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বিশাল বিভাজন ও দূরত্ব তৈরি করে তা পরবর্তী প্রায় পঞ্চাশ বছরে এখানকার সমাজ ও রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও বামপন্থী বৈপ্লবিক আন্দোলন খণ্ডিত আকারে এই পঞ্চাশ বছরে কিছু আলোড়ন তুললেও তা সামগ্রিকভাবে গোটা রাষ্ট্রের আপামর জনগণকে প্রভাবিত করেনি। ধর্মীয় বিভাজন থেকে শুরু করে জাতপাতের বিভেদ, বিভিন্ন সংস্কৃতির বৈচিত্র্য, অতি প্রাচীন রীতিনীতির আবর্তে ভরা জটিল এই সমাজকে সাময়িকভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো গণতান্ত্রিক বা বৈপ্লবিক আন্দোলন তখনও গড়ে ওঠেনি এই উপমহাদেশে।
—সাম্প্রদায়িকতা ও জাতিসত্তার প্রশ্ন, নাজেস আফরোজ, অনুষ্টুপ, সপ্তবিংশ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ২২
.
‘I have suggested that there was a change over time in the character of communal rioting in Bengal- a gradual shift of relative emphasis from the expression of class interest to aggressive communalism based on vertical solidarities which cut across class lines.’
—prof. Suranjan Das in Communal Riots in Bengal 1905-1947, Chap. 4. pg 103, pub. Oxford India, paperback 2022
.
অবিভক্ত ভারতবর্ষের বঙ্গপ্রদেশে কীভাবে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষ ঘটল তার নেপথ্যে রয়েছে বেশ কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমিকা যা সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে পরবর্তীকালে দাঙ্গার পথে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।
১৮৭২ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতবর্ষে জনগণনা কার্যক্রম রূপায়িত হয়েছিল। তাতে দেখা গিয়েছিল, বাংলায় হিন্দু ও মুসলমান ধর্মাবলম্বীর মানুষের সংখ্যা প্রায় আধাআধি। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস ছিল মূলত পূর্ববঙ্গের চাষ-আবাদ, খালবিল ও বনাঞ্চলে, যা আজ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ হিসেবে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের বাস ছিল তুলনামূলকভাবে অনেকটাই উন্নত। হিন্দুদের মধ্যে শিক্ষার হার ছিল বেশি এবং তুলনামূলকভাবে ধর্মীয় সংস্কার ছিল কম। কিন্তু, মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের জীবনে মুখ্য ভূমিকা ছিল চাষ- আবাদের এবং শিক্ষার হার ছিল তলানিতে। জীবনধারার গতিপ্রকৃতি নির্ণীত হত ধর্মীয় সংস্কার ও কুসংস্কারের বেড়াজালে।
হিন্দুদের মধ্যে যেমন বাংলা ভাষাভাষী মানুষ ছিলেন, তেমনই ছিলেন ভিন প্রদেশের ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষজনও যেমন বিহারি, মাড়োয়ারি, ওড়িয়া এবং নেপালিও।
অর্থকরী দিক থেকেও হিন্দু সমাজের ভিত ছিল মুসলিম সমাজের থেকে অনেক বেশি শক্ত। কারণ, হিন্দু সমাজের একটা অংশের পেশা ছিল ব্যাবসা এবং চাকুরি। পাশাপাশি ছিল বড়ো বড়ো জমির মালিকানা স্বত্ব যেখানে দিনমজুর হিসেবে দৈনিক ভাতায় অথবা শুধুমাত্র পেটভাতায় মুসলমান চাষিরা ফসল ফলাত। তাই সমাজের রক্ষক হিসেবে বেশিরভাগ অঞ্চলেই মুসলমানদের এবং গরিব ভূমিহীন হিন্দুদের প্রজা বানিয়ে জমিদার হয়ে বসেছিল পয়সা ও ক্ষমতাওয়ালা হিন্দুরাই। মুসলিমরা নিজেদের জমিজায়গা চাষের জন্য এইসব মহাজনদের কাছে ঋণ করত চড়া সুদে। এই সুদের হার ছিল কমপক্ষে বার্ষিক ২৪ শতাংশ, সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ। ফলত, কালক্রমে মুসলিম সমাজ একসময় হিন্দু জমিদারদের কাছে মাথা বিকিয়ে দিতে বাধ্য হত। সুদসহ ঋণের টাকা মেটাতে না পেরে উৎপাদিত ফসল জমিদারকেই বেচতে বাধ্য হত বাজারদরের চেয়ে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কম দরে এবং একটা সময় আসত যখন স্বল্প জমিটুকুও গ্রাস করে নিত হিন্দু মহাজন তথা জমিদাররা।

১৯০৫ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে অবিভক্ত বাংলার মূলত পাঁচটি জেলা বার বার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার হয়েছে। জেলাগুলি হল মৈমনসিংহ, পাবনা, ঢাকা, নোয়াখালি, চট্টগ্রাম এবং বাখরগঞ্জ।
সামাজিক সাম্যতার এই অভাব এবং সেইসঙ্গে মৌলভি নির্ভর মুসলিম সমাজের ভবিষ্যৎ দূরদৃষ্টির অভাব যুগের পর যুগ তাদের পিছিয়ে পড়া সমাজভুক্ত করে রেখেছে। ১৯১১ সালের সংখ্যাতত্ত্বে দেখা যাচ্ছে, সেসময় জনসংখ্যা বেশি ছিল মুসলমানের, কিন্তু শিক্ষার হার ছিল মাত্র ৪.১৪ শতাংশ। হিন্দু জনসংখ্যা ছিল কম, অথচ শিক্ষার হার ছিল ১১.৪ শতাংশ।
শিক্ষা আনে চেতনা। শিক্ষা শেখায় সংস্কৃতি। হিন্দু জনসমাজ সেই সচেতন মনোভাব থেকেই এগিয়েছে উত্তরণের পথে। কিন্তু, মুসলিমরা সংকীর্ণতার আগল থেকে বেরোতেই পারেনি। ১৯৪১ সালের সংখ্যাতত্ত্বে দেখা যাচ্ছে সেসময় বাংলায় মুসলমান জনসংখ্যা ছিল ৩৩,০০৫,৪৩৪। শিক্ষার হার ছিল ১১.৭৭ শতাংশ। অপরদিকে, হিন্দু জনসংখ্যা ছিল অনেকটাই কম ২5,059,024। কিন্তু, শিক্ষার হার ছিল 22.97 শতাংশ। ফলত, সরকারি চাকরি, স্কুল শিক্ষকতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কলকাতার মতো শহরে যখন সবটাই প্রায় হিন্দুরা দখল করে বসে, তখনও, সেই ১৯৪০ সালেও, কলকাতার মুসলমান সমাজের জীবিকা ছিল দিনমজুরি, কসাইয়ের কাজ, ছুতোর, গাড়োয়ান, কোচম্যান, আস্তাবলের মজুর, দর্জি, মাঝি, লশকর, বই-বাঁধাই এবং অতি ক্ষুদ্র ব্যাবসানির্ভর। বংশপরম্পরায় চলত সেই একই ধারার জীবিকা। উন্নত সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারার পরিণতি ভুগতে হত মুসলমান সমাজকেই। সবচেয়ে লক্ষণীয় ছিল ভারতবর্ষ তথা বাংলার রাজনীতি মুখাপেক্ষী সমাজব্যবস্থায় যে সীমিত সংখ্যক মুসলমান নাগরিক শিক্ষিত ও প্রগতিশীল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন, তাঁরাও পিছিয়ে পড়া মুসলমান সমাজকে সংকীর্ণতা ও সংস্কারমুক্ত করে চেতনার আলোয় উজ্জীবিত করতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেননি সীমিত দু-চারজন ছাড়া। বরং, ধর্মীয় ইসলামিক নেতাদের প্রাধান্যই মুসলমান সমাজের ওপর ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই পরিস্থিতিতেই ধর্মীয় বিন্যাস অতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল ধর্মীয় বিভাজনে। ‘হিন্দুদের কাছে মুসলমানরা অচ্ছুত, কারণ ওরা গোরুর মাংস খায়’ জাতীয় চিন্তাভাবনা এক অর্থে ধর্মবিদ্বেষকে পরিণত করেছিল বর্ণবিদ্বেষে। এমনকী শিক্ষিত প্রগতিশীল মুসলমানদেরও এই বিদ্বেষ থেকে রেহাই ছিল না। মন্দির-মসজিদের বিভাজন হিন্দু-মুসলমান ভ্রাতৃত্ববোধের শিকড়ে আঘাত হেনেছিল। ফলে, একথা বলা ঠিক হবে না, শুধু অর্থনৈতিক অসাম্যই হিন্দু-মুসলিমকে পরস্পরের শত্রু করে তুলেছে। এর জন্য অনেক বড়ো দায় ছিল সামাজিক অসাম্যের, যার জন্য দায়ী ছিলেন দু-পক্ষেরই তৎকালীন ধর্মীয় গুরু তথা পুরোহিত সম্প্রদায় এবং অবশ্যই দেশের জনজীবনের নিয়ন্ত্রক তৎকালীন অপরিপক্ব ব্রিটিশ অনুশাসিত রাজনীতি। সর্বনাশের শিকড় প্রসারিত হতে শুরু করেছিল সেদিন থেকেই যেদিন দু-পক্ষেরই ধর্মীয় নেতৃত্ব আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মদতপুষ্ট ধর্মীয় নেতারা হিন্দু ও মুসলিমদের বোঝাতে সক্ষম হল— তোমরা কেউ কারো ভাই না। তোমরা একে অপরের শত্রু। অতএব, প্রয়োজনে পরস্পরের গলা কাটো। সেদিনের হিন্দু মুসলিমরা বোঝেননি, ওই গলা কাটাকাটির খেলায় এককভাবে লাভের কড়ি ঘরে তুলবে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদই।
দুই ধর্মাবলম্বীর মানুষকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার রাজনীতি থেকেই জন্ম নিয়েছিল দাঙ্গা।
দাঙ্গা মানেই মানুষ খুন, রক্তপাত, অবাধ লুঠ, সম্পত্তি দখল এবং নারীধর্ষণ! দাঙ্গা মানেই একটি জাতির সামগ্রিক অবনমন এবং জীবনোন্নয়নের সমস্ত সূত্রগুলিকে হাতছাড়া করা। হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ কিন্তু বারে বারেই ওই দাঙ্গার ফাঁদেই পা দিয়েছে। বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ভিতটাকেই নড়িয়ে দিয়েছে দাঙ্গার রাজনীতি।
১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গা ছিল সবচেয়ে অভিশপ্ত একটি ঘটনা। কিন্তু, ‘৪৬-এর এই দাঙ্গার পটভূমিতে রয়েছে অতীতের বহু দাঙ্গার বীজ, যা বিষ ফুলে বিষ ফুলে পল্লবিত হয়ে আছড়ে পড়েছিল ১৯৪৬- এর ১৬ অগাস্ট।
বাংলায় দাঙ্গার প্রথম বীজ প্রোথিত হয়েছিল ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ আইন প্রণয়নকালে। এই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল শুধুমাত্র বাংলায় জাতীয় উন্মেষের লক্ষণগুলিকে শৈশবাবস্থায় গলা টিপে মারতে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব হারবার্ট হোপ রিসলে মন্তব্য করেছিলেন: “Bengal United is a power, Bengal divided will pull in several different ways. This is one of the merits of the (partition) scheme.’ The Swadeshi Movement by S Sarkar, p 17) ব্রিটিশ শাসকরা সেইসময় মুসলমানদের জন্য পৃথক রাজ্যের একটা স্বপ্নময় ‘খুড়োর কল’ ঝুলিয়ে ব্রিটিশবিরোধী ভারতীয়দের স্বাধীনতার আন্দোলনকে ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। মুসলমানদের লোভ দেখানো হয়েছিল, পৃথক রাজ্য মানেই সংখ্যাগুরুর সম্মানপ্রাপ্তি, সরকারি চাকরিপ্রাপ্তি। ফলে, মুসলিম আবেগ বশীভূত হয়েছিল। হিন্দুরা ব্রিটিশের এই আইনকে সম্পূর্ণ চাতুরি হিসেবে প্রচারে নামলেও মুসলমানদের নির্বুদ্ধিতায় তাদেরই বিরোধী হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার প্রকৃত সাম্প্রদায়িক রূপটা প্রথম প্রকাশ পেল ১৯১৮-র ক্যালকাটা রায়ট-এ। এই দাঙ্গার পিছনে ছিল বাংলার মুসলমান নেতৃত্বের তুখোড় রাজনীতি, যাঁরা মব ভায়োলেন্স তথা জনহিংসাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ঐতিহাসিক জে ব্লুমফিল্ড (J Broomfield) The Forgotten Majority: The Bengal Muslims and September 1918 শীর্ষক রচনায় লিখেছেন :
(1918 Calcutta riot ) was an attempt to use the mob violence as a political weapon (by Bengal Muslim leaders to make the British and Hindu bhadrolok to) pay more serious attention to Muslim demands.
তিনি আরও লিখেছেন :
… (the riot provided) a model for many of the vicious techniques which were later brought to perfection by Calcutta mobsters. : Soundings in Modern South Asian History, ed D A Low (London 1968 p 211 and 196-7)]
ঐতিহাসিকদের এই পর্যবেক্ষণে যে সত্যটা ধরা পড়েছে, তার পিছনে ছিল কতকগুলি সমসাময়িক ঘটনা যেগুলি হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের হিংস্রতাকে বাড়িয়ে তুলেছিল। প্রথম কারণটা হল— তৎকালীন কলকাতার মাড়োয়ারি সমাজের প্রতি মুসলমানদের জাতক্রোধ। এমনিতেই বাঙালি হিন্দুর চেয়ে অবাঙালি হিন্দু, বিশেষ করে রাজস্থানের মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী হিন্দুদের অনেক বেশি অপছন্দ করত মুসলমানরা। কলকাতায় সেসময় মুসলমান সমাজ ছিল মূলত আর্থিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে নিম্নস্তরের সমাজভুক্ত। মূলত দরিদ্র গায়ে-গতরে খেটে বেঁচে থাকা মানুষের দল। মাড়োয়ারি সমাজের নাক-উঁচু মনোভাব এবং মুসলমানদের প্রতি তাদের অশুচি মনোভাবে বরাবরই অসন্তুষ্ট ছিল মুসলমানরা। তার ওপর ইন্ধন জুগিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বাজার-অর্থনীতিতে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের অসৎভাবে মুনাফা লোটার মনোবৃত্তি। ১৯১৮ সালের আগে থেকেই যেন বাজারে আগুন লেগে গিয়েছিল। মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী— চাল, ডাল, তেল, নুন এবং বস্ত্রাদির দাম আকাশ ছুঁয়েছিল। তুলনায় মজুর শ্রেণির মানুষের দৈনিক মজুরি একপয়সা বাড়েনি। সেই সময়কার ট্রেড ইউনিয়নগুলি বিভিন্ন জাতি সমন্বিত হিন্দুদের থেকে অনেক বেশি একত্রিত করতে পেরেছিল দরিদ্র দিনমজুর মুসলমানদের। এই মুসলমানরা নিয়মিত বিভিন্ন মসজিদে একত্রিত হত এবং সেখান থেকে গড়ে উঠত একত্রে লড়াই করার মানসিকতা। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এই দরিদ্র মুসলমানশ্রেণির চোখে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা ছিলেন সুযোগসন্ধানী এবং মজুতদার। তাঁরা বাজারে কৃত্রিম অভাব তৈরি করে নিজেদের তবিল (তহবিল) বৃদ্ধি করতেন।
অবৈজ্ঞানিক এবং অবিবেচনাপ্রসূত মূল্যবৃদ্ধির সূচক পৌঁছেছিল এমন একটি মাত্রায় যে, ইদের দিন মুসলমানরা সন্তানসন্ততিদের একটা নতুন জামা কিনে দিতে পারেনি। একইভাবে মধ্যবিত্ত হিন্দুসন্তানরাও বঞ্চিত হয়েছে দুর্গাপুজোয় নতুন জামাকাপড় পরার আনন্দ থেকে।
সেইসময়কার সংবাদপত্রে মানুষের ক্ষোভ নিয়মিত প্রকাশিত হত এবং তা ধূমায়িত আগুনকে উসকে দিয়েছিল অনেকটাই। যেমন, হিতবাদী পত্রিকা সেসময় কলকাতায় একটি প্রতিবাদ সভার প্রস্তাব রেখেছিল যেখানে বলা হয়েছিল, প্রতিবাদী সভায় অংশগ্রহণকারীরা আসুন শুধুমাত্র ৫/৬ হাতি ধুতি পরে খালিগায়ে, খালিপায়ে। কিন্তু, এসব প্রতিবাদও গায়ে মাখেনি মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা। সেসময়ের সরকারি রিপোর্টেই বলা হয়েছিল: ‘As a community the Marwaris are always the object of mob- hatred for much the same reasons that the Jews are in Russia and the Armenians in Turkey, namely that they possess certain attributes which enable them to amass wealth at the expense of the less astute people among whom they live. They have been in particularly bad odour in recent times owing to high prices which are generally attributed to their machinations.’ [Source : Home (Pol) Nov. 1918 Nos. 164-201, NAI. p 17]
মুসলমান সম্প্রদায় অভিযোগ তুলেছিল যে, মাড়োয়ারিদের এই ব্যাবসায়িক দুর্নীতির সঙ্গে সরকারেরও যোগসাজশ ছিল। ১৯১৮-র দাঙ্গার পিছনে আরও বড়ো কারণ ছিল— কলকাতা শহরের বিভিন্ন মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় ক্ষমতার জোরে কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের বস্তি উচ্ছেদ পরিকল্পনার রূপায়ণ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বর্মন বস্তি, কালিঙ্গা বস্তি এবং পার্ক স্ট্রিট এলাকার মুসলমান বস্তি। হিসেবমতো, বস্তি উচ্ছেদের ফলে বৰ্মন বস্তিতে ৪৩ শতাংশ, কালিঙ্গায় ৩২ শতাংশ এবং পার্ক স্ট্রিটে ১৩ শতাংশ মুসলমান পরিবার মাথার ওপর ছাদ হারিয়ে খোলা আকাশের নীচে এসে দাঁড়িয়েছিল। এর ফলে চরম ক্ষোভ ছিল ক্ষতিগ্রস্ত মুসলমান সমাজের। তা রোষানলে পরিণত হল যখন দেখা গেল, শুধুমাত্র অর্থবলে বলীয়ান কিছু চিহ্নিত মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী যেমন রাম প্রতাপ ভিমানী, বলদেও দাস বিড়লা, যুগলকিশোর বিড়লা প্রমুখ জ্যাকেরিয়া স্ট্রিটের আশেপাশের উচ্ছেদকৃত বস্তির জমিগুলি সরকারের কাছ থেকে নামমাত্র দামে কিনে সব বড়ো বড়ো প্রাসাদ বানাচ্ছে নিজেদের বসবাসের জন্য। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মুসলমান পরিবারদের ঘরভাড়া না দেওয়ার হিন্দু প্রবৃত্তি। ১৯১০ সালে বকরি-ইদের দিনে যে দাঙ্গা হয়েছিল, তার পিছনে ছিল ঘরভাড়া না দেওয়ার জন্য মাড়োয়ারিদের বিরুদ্ধে মূলত মুসলমান ঘোড়ায় টানা টাঙা বা ফিটন গাড়ির চালক, কোচম্যান ও সহিসদের চরম ক্ষোভ। মুসলিম সমাজের কুরবানি বা পশুহত্যা বিশেষ করে গোবধের তীব্র বিরোধী ছিল মাড়োয়ারি সমাজ। ১৯১০ সালের দাঙ্গার পিছনে মাড়োয়ারিদের এই বিরোধিতা ছিল অন্যতম কারণ। ফের ১৯১৮ সালে একই ইসু ফিরে এসেছিল যখন শহরের বুকে একটি বৃহৎ কসাইখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয় মুসলমান সমাজ। সমস্যা আরও তীব্র হয়েছিল কারণ বড়োবাজার এবং চিৎপুর এলাকায় ঘিঞ্জি পরিবেশে একইসঙ্গে বসবাস ছিল মাড়োয়ারি এবং মুসলমানদের। শত্রুবেষ্টিত পরিবেশে দু-পক্ষই বেঁচেছিল বাহুবলের জোরে।
এই সময়ে মুসলমান সমাজ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই রাজনৈতিকভাবেও সংগঠিত হওয়ার লক্ষ্যে কলকাতা শহরের বুকে টানা তিনদিন— ৮, ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর লম্বা লম্বা মিছিল বের করে। সেইসব মিছিলের স্লোগানের মুখ্য বিষয় হয় বেশ কিছু জাতীয় এবং কিছু স্থানীয় ইসুও। সরকারিভাবে এই ধরনের মিছিল অশান্তি তৈরি করবে এই অজুহাত দেখিয়ে মিছিল বন্ধের উদ্যোগ নিয়ে জনঅসন্তোষ তীব্র হয়। ক্ষুব্ধ মুসলমানদের একটি বিশাল মিছিল রাজভবনের উদ্দেশে বেরোলে পুলিশ পূর্ণ শক্তিতে বাধা দেয়। এখান থেকে শুরু হয়ে যায় ক্ষুব্ধ মুসলিমদের আক্রমণ ও লুঠতরাজ। প্রাথমিকভাবে সরকারি অফিস-আদালত ভাঙচুর এবং তারপর রাজপথে ধাবমান গাড়িঘোড়ার ওপর তীব্র আক্রমণ হানে প্রতিবাদীরা। পুলিশ এবং সেনাবাহিনীও এই আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি। তারা পালটা আক্রমণ করে নাখোদা মসজিদের অভ্যন্তরে।

১৯১৮ এবং ১৯২৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চল, মূলত উত্তর কলকাতা এবং মধ্য কলকাতার বহু অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর মধ্যে মধ্য কলকাতা এবং খিদিরপুর সন্নিহিত এলাকা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
৯ সেপ্টেম্বর জ্যাকেরিয়া স্ট্রিটের একটি মাড়োয়ারি ভবন থেকে দাঙ্গাবাজ মুসলমানদের লক্ষ করে গুলি চালালে একজন মুসলমান হামলাবাজ মারা যাওয়ায় আক্রমণ তীব্র হয়ে ওঠে। ওই ভবন ঘিরে ধরে ভাঙচুর চালায় মুসলমানরা। ভবন থেকে আবার গুলি চলে এবং ফের একজনের (কেউ কেউ বলেন দু-জন) প্রাণ যায়। এই ঘটনা মুসলিম দাঙ্গাবাজদের লক্ষ্য বদলে দেয়। সরকারের নীতির প্রতিবাদ হয়ে ওঠে হিন্দু-বিরোধী দাঙ্গা। গোটা শহর জুড়ে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ৪৩ জন নাগরিকের মৃত্যু হয়। ৩৬ জন মুসলমান ও ৭ জন হিন্দু। ৬ জন পুলিশকর্মী ছুরিকাহত হন। আরও ১৪ জন আক্রমণে আহত হয়। দাঙ্গা চলে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা তিনদিন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল চিৎপুর রোড, হ্যালিডে স্ট্রিট, জ্যাকেরিয়া স্ট্রিট, হ্যারিসন রোড এবং মেছুয়াবাজার স্ট্রিট। মূল লক্ষ্য ছিল মাড়োয়ারি ভবন এবং তাদের ব্যাবসায়িক ক্ষেত্র। মাড়োয়ারিদের জামাকাপড় এবং শাড়ির দোকান এবং বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের দোকান লুঠ হয় বেছে বেছে। লুঠের পর দোকানগুলিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। বিক্ষিপ্তভাবে আক্রমণের শিকার হয় মধ্য ও উত্তর কলকাতার বিভিন্ন বাজারও।
.
১৯১৮-র দাঙ্গায় কয়েকটি বিষয় ছিল বেশ লক্ষণীয়।
১. বহু এলাকায় বস্তিবাসী হিন্দু বা দিনমজুর হিন্দুরা সমজাতীয় মুসলমান দাঙ্গাবাজদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে আক্রমণ করেছে। এর কারণ অবশ্যই অর্থনৈতিক সহাবস্থান।
২. বাঙালি হিন্দুরা আক্রমণের শিকার হয়নি। এমনকী বাঙালি হিন্দু পুলিশকর্মী-অফিসাররাও কেউ আহত হননি।
৩. অবাঙালি হিন্দু মূলত— গোয়ালা, কোচম্যান, মুচি, খবরের কাগজের হকাররা কোথাও কোথাও আক্রমণের শিকার হয়েছে।
৪. শ্রমিকশ্রেণির মানুষের ঐক্যবদ্ধ হবার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। প্রমাণ গার্ডেনরিচের তিনটি শিল্পক্ষেত্রে ১০ হাজার শ্রমিক ১০ সেপ্টেম্বর কাজে যোগ দেয়নি। পরে ওই শ্রমিকরাই একজন ইউরোপিয়ান ফোরম্যানকে আক্রমণ করে। তারপর প্রায় দু-হাজার মানুষের এক সশস্ত্র মিছিল গায়ে কাদা মেখে উদ্বাহু নৃত্য করতে করতে এবং ড্রাম বাজাতে বাজাতে গার্ডেনরিচ থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে শহরে ঢোকে। সেনাবাহিনীর বাধায় মিছিলের চোদ্দোজনের মৃত্যু হয় স্পটেই। পরে আহতদের দশজনের মৃত্যু হয় হাসপাতালে। একই ধরনের শ্রমিক-প্রতিবাদ হয় হাওড়ায় জুটমিল এলাকায়, মেটিয়াবুরুজে এবং বেলেঘাটায়।
পরবর্তীকালের ইতিহাস ছানবিন করার সময় জানা যায়, ১৯১৮-র এই দাঙ্গার পিছনে মুসলমান জননেতা ফজলুর রহমন, মৌলভি নাজিমুদ্দিন আহমেদ, মহম্মদ দাউদ, বহু মুসলিম ব্যবসায়ী এবং সাংবাদিকরা (বাংলার এবং বাংলার বাইরে থেকে আসা) ঘৃণ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।
১৯১৮-র এই দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। কিন্তু, পরিণতি হিসেবে কলকাতাকে ভুগতে হয়েছে অনেকদিন। বহু মাড়োয়ারি পরিবার সাময়িকভাবে শহর ছেড়েছিল। মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা না আসায় স্টক এক্সচেঞ্জ প্রায় বন্ধ হবার মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। বড়োবাজারের মতো ব্যবসায়ী এলাকা থমকে দাঁড়িয়েছিল। যানবাহন চলাচলও স্বাভাবিক ছিল না। বাজার-হাট বসেনি অনেকদিন। ফলত, গোটা শহরবাসীকেই চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হয়।
১৯১৮-র দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে আসার পর ১৯১৯ সালে হিন্দু-মুসলিম সংহতি স্থাপনে অনুষ্ঠিত হয় রাউলাট সত্যাগ্রহ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল – এই সত্যাগ্রহে সবচেয়ে বেশি উদ্যোগ নিয়েছিলেন অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী মুসলমানরা। যাঁরা চেয়েছিলেন, রক্তক্ষয়ী, মারণমুখী দাঙ্গা যেন কলকাতায় আর না হয়। দুই সম্প্রদায়ের আন্তরিক সহাবস্থানই ছিল এই সত্যাগ্রহের মূল লক্ষ্য।
কিন্তু, ১৯২১ সালের একটা হিসেব চমকে দিল সমাজতাত্ত্বিক ও গবেষকদের। কলকাতা শহরের একটি এলাকাভিত্তিক সমীক্ষায় দেখা গেল, ১৯১১ থেকে ১৯২১ অর্থাৎ ১৯১০ সালের দাঙ্গা এবং ১৯১৮ সালের দাঙ্গার পর পর্যন্ত মাঝের দশ বছরে শহরের বিভিন্ন অঞ্চল ছেড়ে স্থানান্তরে চলে গেছে ৯০ হাজার মানুষ, যাদের অধিকাংশই হল মুসলমান এবং বস্তিবাসী। (সূত্র : Census of India 1921 vol. VI (Part I & II pg 2 para-8)। আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল সত্যাগ্ৰহী পত্রিকা। পত্রিকা ১৯২৬ সালে লিখেছিল, কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট কলকাতার উন্নয়নে যথেষ্ট ফলপ্রসূ ভূমিকা নিয়েছে, কিন্তু একইসঙ্গে শহরকে মুসলিম- শূন্য করে তুলছে।
কলকাতা শহর থেকে সরে যাওয়া এই মুসলমান সম্প্রদায়ের সিংহভাগই ছিল অবাঙালি মুসলমান ( upcountry muslims)। ১৯১৮-র দাঙ্গাতেও এদের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। বাঙালি মুসলমান সমাজ খুব অল্পসংখ্যায় দাঙ্গায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়েছিল।
কিন্তু, ১৯২৬-এর দাঙ্গায় দেখা গেল, সংখ্যায় কম হলেও বাঙালি অর্থাৎ বঙ্গবাসী এবং বঙ্গভাষী মুসলমানরাও (যারা মূলত মুসলমান জমানায় হিন্দু থেকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে বাধ্য হয়েছিলেন) দাঙ্গায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিতে শুরু করেছেন।
‘২৬-এর দাঙ্গাতেও মুসলমানদের মূল আক্রমণ ছিল হিন্দু মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। এর জন্য অবশ্য মুসলমানদের চেয়ে মাড়োয়ারিদের দায় ছিল বেশি। কারণ, যেজন্য ১৯১৮-র দাঙ্গায় আক্রমণের শিকার হয়েছিল মাড়োয়ারিরা, সেই মাড়োয়ারি সমাজের মুসলিম-বিদ্বেষে কোনো ঘাটা পড়েনি। এবং, উত্তরোত্তর তা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ১৯১৮-র দাঙ্গায় হামলার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল মুসলমানরা একথা সত্য, কিন্তু এটাও সত্য যে, সবচেয়ে বেশি মার খেয়েছিল তারাই। জীবন গিয়েছিল সবচেয়ে বেশি মুসলমানদেরই। কারণ, মাড়োয়ারি সমাজ আক্রমণ রুখেছেন সম্মিলিতভাবে এবং বহু জায়গায় ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ ও সেনামদতে। পিছনে ছিল অর্থের খেলা। তা ছাড়া, মাড়োয়ারিরা থাকতেনও কলকাতার কতকগুলি নির্দিষ্ট এলাকায় সংগঠিতভাবে। প্রতিরোধ কিংবা প্রতি-আক্রমণও হয়েছে সম্মিলিতভাবেই।
১৯১৮-র দাঙ্গার পর মাড়োয়ারি সমাজ কার্যত মুসলমান সমাজকে অচ্ছুতই করেছিল। মাড়োয়ারির দোকান বা অন্য ব্যাবসাক্ষেত্রে মুসলমানের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে গেল। মাড়োয়ারি জামাকাপড়ের দোকান থেকে মুসলমানরা জামাকাপড় কিনতে পারবে না, মুদির দোকান থেকে চাল, ডাল, তেল ইত্যাদি মুসলমানদের বিক্রি করা হবে না— নীতিগতভাবে এইসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হল। এবং, যেখানে যেখানে মুসলমান কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছিল, তাদেরও ছাঁটাই করা হল। বাড়িভাড়া দেওয়া তো আগেই বন্ধ হয়েছিল। মাড়োয়ারি সমাজ সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, মুসলমানদের ছোঁয়া থেকে মুক্ত থাকাটা হল তাদের ধর্মীয় কর্তব্য।
তার সঙ্গে ছিল ঊর্ধ্বমুখী বাজারদরের চাপ। ১৮৭৫ সালকে ভিত্তিবর্ষ হিসেবে ধরলে দেখা গিয়েছিল শুধুমাত্র চালের দামের সূচক ১৯২৪ থেকে ১৯২৬-এর মধ্যে পৌঁছেছিল ২২১ থেকে ২৮৮-তে। বেকারত্ব বাড়ছিল হু-হু করে। ফলত, বাংলার শিল্পক্ষেত্রে শ্রমিক অসন্তোষ বাড়ছিল। সামাজিক ক্ষেত্রে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছিল বহুগুণে। মনে রাখা দরকার, সেসময় বাংলার পাটকল, চালকল বা শিল্পক্ষেত্রে অসংগঠিত শ্রমিকের সিংহভাগই ছিল মুসলমান এবং বেশিরভাগই বিহার বা উত্তরপ্রদেশের মুসলমান। শিল্পক্ষেত্রে হিন্দু শ্রমিক যারা ছিল তারাও প্রকৃতপক্ষে জীবন ও জীবিকার তাগিদে মুসলমান শ্রমিক নেতৃত্বকেই স্বীকার করে নিয়েছিল কারণ তাদের সংখ্যাধিক্য।
কলকাতায় যখন পরিস্থিতিটা এমন, সেইসময়েই ঢাকা ও পাবনা জেলায় জল গড়াচ্ছিল বিপরীত দিকেই। দুটি জেলাতেই বাঙালি হিন্দুরা তীব্রভাবে মুসলমান বিরোধী ছিল। তার ফলে, মুসলমানরাও হিন্দু বিরোধী হয়ে উঠছিল। কলকাতায় যখন মাড়োয়ারি সমাজ মুসলমানদের বয়কট করে চলছিল, তখন ঢাকা ও পাবনায় হিন্দু ব্যবসায়ী সাহা পদবিধারী পরিবারের জমিতে দিনমজুরের কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল মুসলমানরা। এই সাহারাই ছিল মহাজন বা সুদখোর। চড়া সুদে টাকা দিত বলে এমনিতেই মুসলমান প্রান্তিক চাষিরা সাহা সম্প্রদায়কে মানুষের শত্রু মনে করত। এর সঙ্গে মিশেছিল মুসলিম মোল্লাদের উত্তেজক হিন্দুবিদ্বেষী প্রচার ও আঞ্জুমান ইসলামিয়ার মতো তীব্র সাম্প্রদায়িক সংগঠনের হিন্দু বিদ্বেষী মনোভাব দরিদ্র ও অশিক্ষিত মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীরভাবে গেঁথে দেওয়ার অবিরাম প্রচেষ্টা। বাংলায় অতীতে দেখা যেত, হিন্দু বা মুসলমান যেকোনো সম্প্রদায়ের সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে দুই সম্প্রদায়ের মানুষই আন্তরিকভাবে অংশগ্রহণ করত। কিন্তু, ১৯১৮-র দাঙ্গার পর থেকেই লক্ষ করা গেল, বিহার ও উত্তরপ্রদেশ থেকে ধর্মীয় ইন্ধন ও পরামর্শ আমদানি করা হচ্ছে বাংলায়। তা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে লক্ষ্ণৌ, দেওবন্দ এবং বেরিলির উলেমারা নির্দেশ পাঠাচ্ছেন— হিন্দুদের জন্মাষ্টমীর উৎসবে মুসলমানরা যেন যোগ না দেয়। তা হবে ইসলাম ধর্মবিরোধিতা। মাদ্রাসা এবং মসজিদগুলিতে প্রতিদিন জমায়েত শুরু হল এবং সেখানে প্রতিদিন ধর্মীয় নেতারা মুসলিমদের কানে বিষ ঢালতে শুরু করল। তাদের উপদেশ তথা বাণীর মধ্যে খুব সূক্ষ্মভাবে মিশে থাকত কাফের বিরোধিতা এবং প্রতিহিংসা নেবার নির্দেশ। এসব দিন দিন বাড়ছিল।
মুসলমানদের এই ধর্মীয় উত্তাপকে মোকাবিলা করার জন্য হিন্দু সমাজে ও বাড়তে শুরু করেছিল হরিসভা এবং আর্য ধর্ম প্রচারিণী সভার মতো উগ্র ধর্মীয় সংগঠনের যজ্ঞ ও কীর্তন অনুষ্ঠান; যাতে ধর্মের টানে হিন্দুদের একত্রিত করা যায়। মাইক বাজিয়ে অষ্টম প্রহর কীর্তনের পালটা ২৪ ঘণ্টার ইসলামিক কাওয়ালি বা ভজন শুরু হয়ে গিয়েছিল মসজিদে মসজিদে। বোঝাই যাচ্ছিল, সাম্প্রদায়িক মনোভাব প্রতিদিন ধর্মীয় উন্মাদনায় জারিত হচ্ছে যার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। গোটা বাংলা জুড়েই পুনরুত্থান ঘটল হিন্দুসভার। হিন্দুসভা কখনো সাম্প্রদায়িক ভাবনাকে প্রাধান্য দিত না। কিন্তু, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেখা গেল, হিন্দুসভাও যুব সম্প্রদায়কে হিন্দু ধর্মীয় ভাবনায় জারিত করছে। এবং, এও লক্ষ করা গেল, দু-পক্ষই দু-পক্ষের ধর্মীয় মিছিলের বিরোধিতা করছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান অথবা বিবাহ অনুষ্ঠানে গান-বাজনা, ব্যান্ডপার্টি ব্যবহারের বিরোধিতা করছে। এমনকী পরস্পর পরস্পরের অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ বয়কট করছে। ঢাকা ও পাবনার পরিস্থিতি যখন এমন, তখন কলকাতা শহরেও জামিয়ত-ই-উলেমা এবং তাঞ্জিম-উল-মুসলমান-এর মতো উগ্র ধর্মীয় ইসলামিক সংগঠনের বাড়বাড়ন্ত চোখে পড়ল বেশ ভালোভাবেই। শুধু কলকাতায় নয়, নদিয়া, দিনাজপুর সহ নানা মুসলমান অধ্যুষিত জেলায় জেলায় সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি ক্রমাগত হিন্দুধর্মের বিরোধিতায় উদ্ধত প্রচারে অংশ নিল। পিছিয়ে রইল না হিন্দুরাও। বাঙালি হিন্দুরা যতটা নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি উগ্র ভূমিকা নিল মাড়োয়ারি সমাজের নেতৃত্ব। আর্য সমাজ, কাউ প্রোটেকশন লিগ বা গোরক্ষা লিগ কলকাতা শহরে গোরু বেচা-কেনার হাট বসানোর তীব্র বিরোধিতায় নামল।
তবে, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোয় সেইসময় অত্যন্ত নিন্দনীয় ভূমিকা নিয়েছিল কয়েকটি ইরানি পত্রপত্রিকা। অসর-ই-জাদিদ (Asr-e-Jadid) এবং মহম্মদী (Mohammadi), দৈনিক সলতান (Dainik Saltan)-এর মতো সম্পূর্ণ ইসলামিক পত্রিকাগুলি আন্তর্জাতিক স্তরের মুসলিম প্রচারের ধারাকে ছড়িয়ে দিচ্ছিল বাংলায়। এইসব পত্রিকায় লেখা হচ্ছিল :
‘মুসলমানদের মনে রাখতে হবে, তারাই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে হিন্দুদের শাসন করে এসেছে। এখন পৌত্তলিকতাবাদীদের পক্ষ থেকে যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে তাকে প্রতিহত করতে হবে সম্মুখসমরে।’
‘হে লৰ্ড মেডিনা, (মেডিনা হল সৌদি আরবের এক অতি প্রাচীন পবিত্র ইসলামিক ভূমি) তুমি কিছুদিনের জন্য ওমর ও খালিদকে পাঠাও আমাদের মধ্যে নতুন শক্তি জোগাতে। আমাদের প্রকৃত মুসলমান করে তোলার জন্য এবং আমাদের পথ দেখানোর জন্য যে মুসলমান আসলে কে বা কারা এবং কীজন্য তাদের পৃথিবীতে জন্ম হয়েছে।’ (অসর-ই- জাদিদ, কলকাতা, ২১ এপ্রিল ১৯২৬)
‘মুসলমানরা প্রমাণ করেছে, সংখ্যায় তারা যতই নগণ্য হোক না কেন, তার থেকে ১০।১১ গুণ বেশি মানুষের সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা তারা ধারণ করে।’ (The Mohammadi, Calcutta, 29 January 1926)
দ্য মহম্মদী সরাসরি ডাক দিয়েছিল— বাংলা, আসাম এবং বার্মার এক লক্ষ মসজিদকে একসূত্রে বাঁধতে হবে এবং এইসব অঞ্চলের চার কোটি মুসলমানের মধ্যে ধর্মীয় প্রভাবকে তীক্ষ্ণধী করে তুলতে হবে। এই মহম্মদী পত্রিকাতেই ‘গ্র্যাজুয়েট হিন্দু গুন্ডা’দের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে দেবারও ডাক দেওয়া হয়েছিল প্রকাশ্যেই।
দৈনিক সলতান ছিল আরও উগ্র প্রচারক। ‘মাড়োয়ারিদের খারাপ উদ্দেশ্য’, ‘মালব্যদের বদ উদ্দেশ্য’ এবং ‘কলকাতার দাঙ্গায় আমরা দেখেছি এবং কি শিখেছি’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশ করে এই পত্রিকাটি মুসলমান সমাজকে সরাসরি হিংসায় প্ররোচিত করেছিল। হিন্দুদের সরাসরি ‘বাঁদর’ বলে গালাগাল দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই পরিচিত প্রবাদ— ‘বাঁদরকে লাই দিলে মাথায় চড়ে বসে।’ এজন্য সরকারিভাবে দৈনিক সলতানকে শাস্তির বিধান দেওয়া হয়েছিল।
রৌশন হেদায়ত পত্রিকায় বলা হয়েছিল— ‘গোটা পৃথিবী এবং স্বর্গের মালিকানা (কর্তৃত্ব) হল মুসলমানের।’
কিছু হিন্দু পত্রিকাও রোষ ছড়াতে কম নিন্দনীয় ভূমিকা নেয়নি। যেমন, মতওয়ালা পত্রিকায় লেখা হয়েছিল: ‘মালব্যজীর এক ইঙ্গিতে হিন্দুরা সমস্ত মুসলমান গুণ্ডার দাড়ি একটা একটা করে উপড়ে ফেলতে পারে।’
৫ মে ১৯২৬, আনন্দবাজার পত্রিকা-র সম্পাদকীয়তেও হিন্দুদের উদ্দেশে লেখা হয়েছিল— আর কতকাল হিন্দুরা মাথা নিচু করে থাকবে? কতকাল আর মৌনী ভূমিকা নেবে? এবার হিন্দু যুবকদেরও পথে নামতে হবে। এইসব খবরগুলোই মসজিদে মসজিদে, মাদ্রাসায় ইসলামিক ধর্মীয় নেতারা পড়ে শোনাতেন, বোঝাতেন নিজেদের উগ্র ভাষায়। কারণ, বেশিরভাগ মুসলমান ছিল সেসময় নিরক্ষর। এর প্রভাব ছিল অপরিসীম। পাশাপাশি পাড়ায় পাড়ায় ছড়ানো হত লিফলেট। হিন্দুদের প্রচারপত্রের যেমন শিরোনাম ছিল— ‘গোমাংসখোর মুসলমান’। তেমনই মুসলমানদের প্রচারপত্রের শিরোনাম ছিল— ‘সাবধান, নয়তো হিন্দুরা মুসলমানদের গিলে খাবে।’ একটি উর্দু লিফলেটে ভয়াবহ ভাষায় লেখা হয়েছিল: ‘একটা মুসলমানের মৃত্যু হলে একশো কাফের (হিন্দু)-এর জীবন কাড়তে হবে। একটা মাড়োয়ারি, বাঙালি কিংবা উপদেশীয় হিন্দুকে দেখলেই কোতল করো। তোমার ব্যক্তিগত শক্তিতে যতজন হিন্দুকে হত্যা করা সম্ভব, সেটা করো।’
এসব কিছুর প্রভাব হিন্দু এবং মুসলমান— দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্রমশ গাঢ় করে তুলেছিল সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদকে। ভ্রাতৃত্ববোধ দ্রুত অপসারিত হচ্ছিল। দুই সম্প্রদায়ই পরস্পরকে শত্রু মনে করছিল। হিন্দু এবং মুসলমান নেতারা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে এই ভেদাভেদকে আরও তীব্র করে তুলেছিল। বোঝাই যাচ্ছিল, আবহাওয়া ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল গোটা কলকাতা শহর এক আসন্ন কালবোশেখির প্রাক্-মুহূর্তে। যে কালবোশেখি শহরবাসী প্রত্যক্ষ করেছে মাত্র বছর আটেক আগে।
.
২ এপ্রিল ১৯২৬।
মধ্য কলকাতায় তখন পথ পরিক্রমা করছে আর্য সমাজের একটা লম্বা শোভাযাত্রা। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমপক্ষে ৫০০। গমগম করে বাজছে সংগীত। হইহই করে এগোচ্ছে গেরুয়া শোভাযাত্রা। এতক্ষণ পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। সমস্যা হল একটা মসজিদের সামনে আসতেই। মসজিদের সামনেই তখন মুসলমানদের একটি জমায়েত। আজানের সময়। মুয়াজ্জিন প্রস্তুত। মসজিদে প্রার্থনায় অংশ নিতে আসা মুসলিম জমায়েত থেকে দাবি উঠল, শোভাযাত্রার সংগীত বন্ধ করে মসজিদের সামনে দিয়ে যেতে হবে আর্যসমাজকে। প্রথমে মৃদু বাদ-প্রতিবাদ। তাই থেকে বিতর্ক এবং জেদাজেদি। আবহাওয়া গরম হয়ে উঠতেই শুরু হয়ে গেল দু-পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি, মারামারি। সেখানেই যদি থেমে যেত দু-পক্ষ, তাহলে মিটে যেত। কিন্তু, আসলে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতার মন্ত্র ততদিনে আত্মস্থ হয়ে গেছে দু-পক্ষের মধ্যেই। ধর্মীয় ইন্ধনে টগবগ করে ফুটছে দু-পক্ষই। অগত্যা যা হবার, তা-ই হল। আর্যসমাজের হাতে হাতে ধরা পতাকাবাহী দণ্ড দ্রুত ডান্ডা হয়ে আছড়ে পড়ল মুসলমান জমায়েতের ওপর। আর, মসজিদের ভিতর থেকে আছড়ে পড়ল সশস্ত্র ধারালো আক্রমণ হিন্দু শোভাযাত্রার ওপর। পথ ভাসল একই বৃত্তে দুইটি কুসুম হিন্দু-মুসলমানের তাজা রক্তে! মুহূর্তে উৎকট দুর্গন্ধের মতো ছড়িয়ে পড়ল দাঙ্গা আশপাশের অঞ্চলে। তড়িঘড়ি পুলিশ নামিয়েও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। প্রথম পর্বের ১২ দিনের দাঙ্গা যখন কিছুটা স্তিমিত হল ততক্ষণে মৃত্যু হয়েছে ৪৪ জনের, আহতের সংখ্যা ৫৮৪। গ্রেপ্তার ৫০০। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এই হিসেবের মধ্যেই ছিলেন মৃত দুই পুলিশকর্মী এবং আহত ৯১ জন পুলিশ যাঁদের মধ্যেই ছিলেন ডেপুটি কমিশনার কার্টলে। আটদিন পর ২২ এপ্রিল আবার জিগির দিয়ে উঠল দাঙ্গা। এবার উপলক্ষ্য কয়েক জন মদ্যপ মুসলমান যুবকের সঙ্গে একজন হিন্দু দোকানদারের উত্তপ্ত বচসা। প্রথম পর্বের মতোই দ্বিতীয় পর্বে ৮মে পর্যন্ত বিক্ষিপ্তভাবে দু-পক্ষের হামলাবাজি চলল। সরকারি হিসেবে ফের মৃতের সংখ্যা ৬৫, আহত ১৯১, গ্রেপ্তার ৫৬৭। আশা করা গিয়েছিল, এবার বুঝি থামল মারদাঙ্গা-রক্তপাত। কিন্তু না, প্রথম পর্বের মতোই মসজিদের সামনে গান-বাজনা করতে করতে ভ্রাম্যমাণ হিন্দু শোভাযাত্রার ওপর মুসলমানদের হামলা আবার। রেশ গড়াল ২৫ জুলাই পর্যন্ত। নানা জায়গায় বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে মৃত ২৮, আহত ২২৬, গ্রেপ্তার ৩৬৩।
২ এপ্রিল থেকে ২৫ জুলাই— প্রায় চার মাস যাবৎ একটি জনবহুল শহরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এর আগে কখনো হয়নি। একটি দাঙ্গার একাধিক পর্বে এত মৃত্যুও এর আগে কখনো হয়নি। নিহত এবং আহতর সংখ্যাই প্রমাণ করেছিল, পারস্পরিক আক্রমণের ধার বাড়ছিল। আরও লক্ষণীয়, ১৯২৬-এর দাঙ্গাও সংগঠিত হয়েছিল কলকাতার একই দাঙ্গাপ্রবণ অঞ্চলে। উত্তরে বিডন স্ট্রিট এবং সংলগ্ন অঞ্চলে, দক্ষিণে বউবাজার ও সন্নিহিত অঞ্চলে। পূর্বে কলেজ স্ট্রিট এবং আশপাশে। পশ্চিমে স্ট্র্যান্ড রোড ও বড়োবাজার অঞ্চলে। এর কারণও স্পষ্ট। এই এলাকাগুলি মিশ্র জনজাতিতে ঘনবসতিপূর্ণ এবং কলকাতা শহরের ব্যাবসায়িক প্রাণকেন্দ্র। ফলত, পর পর দু-বারের দাঙ্গায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই এলাকাগুলি ও সন্নিহিত অঞ্চল। শহরতলিতে ১৯২৬-এর দাঙ্গার কোনো প্রভাব পড়েনি।

১৯২৬ সালের পর ১৯৪১ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আবার ছড়িয়ে পড়ে মৈমনসিংহ, পাবনা এবং ঢাকা জেলায়।
একটি নির্দিষ্ট লোকালয়ে বার বার দাঙ্গা হওয়ার বাকি কারণগুলোও অস্পষ্ট নয়। প্রথমত, কিছু এলাকায় কাঁচা টাকার ব্যাবসাকেন্দ্র। খাদ্যদ্রব্য থেকে পোশাক-আশাক সব কিছুর আড়ত এবং খুচরো বিক্রির বাজার। এবং, ব্যবসায়ীরা বেশিরভাগ মাড়োয়ারি। মুসলমান দাঙ্গাবাজদের জন্য আদর্শ এলাকা। প্রথমত, মাড়োয়ারি সমাজের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা এবং দ্বিতীয়ত, দারিদ্র্যের কারণে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের অভাবে জর্জরিত মুসলমানরা দাঙ্গা বাধাত যাতে অবাধে লুঠপাট চালাতে পারে তারা আর ক্ষতি করতে পারে মাড়োয়ারিদের এবং ভাটিয়াদের।
আনন্দবাজার পত্রিকা-র ৩০মে তারিখের একটি সংবাদে জানা গিয়েছিল, মুসলমানরা বাঙালি হিন্দুদের আশ্বস্ত করেছিল— আপনাদের সঙ্গে আমাদের কোনো ঝগড়া নেই, লড়াই নেই। আমরা আপনাদের কোনো মন্দিরও ভাঙব না। কিন্তু, মাড়োয়ারিদের এ শহর থেকে তাড়িয়ে পাঠিয়ে দেব বিকানির এবং যোধপুরে।
স্বাভাবিকভাবেই অবাঙালি হিন্দুদেরই বাড়ি ও দোকান বেশি লুঠ হয়েছে। মাড়োয়ারি পরিবারের মুসলমান কোচম্যান নিজেই মাড়োয়ারি মালিকের পেটে ভোজালি বসিয়েছে। এমনকী পথে-ঘাটে মাড়োয়ারি মহিলাদের লক্ষ করে ইট, পাথরও ছুড়েছে মুসলমানরা। উপদ্রুত এলাকায় অবাধে লুঠ হয়েছে খাবারদাবার আর জামাকাপড়ের দোকান, পেট্রোল পাম্প, রাজাবাজার এলাকার সোনার দোকান। পেশোয়ারি বা কাবুলি শুকনো ফল বিক্রেতার রসদ। ওইসব ব্যাবসায় লিপ্ত মুসলমান কর্মচারীরাও উগ্র মুসলিম অত্যাচার থেকে রেহাই পায়নি। মার খেয়েছে মাড়োয়ারি বাড়ির শিখ দারোয়ানরা। হিন্দু ধোপা, ট্রাম কনডাক্টর, গোয়ালা, শিখ ট্যাক্সিচালক, পানীয় জল সরবরাহকারীরা অবাধে মার খেয়েছে। আক্রমণকারীরা সেখানে দেখেওনি কে হিন্দু, কে মুসলমান।
আক্রমণের শিকার হয়েছে ট্রাম, বাস, ট্যাক্সি, রিকশা, পোস্টাল ভ্যান। আর, গোটা শহর বারে বারে শিকার হয়েছে অসংগঠিত গুজবের। তবে, ১৯২৬-এর দাঙ্গার কয়েকটি বিশেষত্ব ছিল লক্ষণীয়। এবারই প্রথম বাঙালি হিন্দু আক্রমণের লক্ষ্য না হলেও প্রচুর পরিমাণ হিন্দু দেবদেবীকে মুসলমান দাঙ্গাবাজরা আক্রমণ করেছিল। ভাঙচুর হয়েছিল প্রায় এগারোটা মন্দির আর বেশ কয়েকটি শিখ গুরুদ্বারা। কিন্তু, তুলনামূলকভাবে হিন্দুরা আক্রমণকারীদের রেহাই না দিলেও তাদের মসজিদ আক্রমণ করেনি। আক্রমণ ঠেকাতে যে হিন্দুরা আগে থেকেই তৈরি ছিল যখন দেখা গেল, আক্রমণকারীরা ব্যাপক মাত্রায় আহত হয়েছে ইট-পাথরের টুকরোয় আর লাঠির ঘায়ে। অর্থাৎ, আগে থেকেই বাড়ির মধ্যে ইট, পাথর, লাঠি সব জমা করা হয়েছিল। বিশেষ করে হিন্দু ব্যবসায়ী ও হিন্দু মহাসভার নেতাদের বাড়িতে।
সেইসঙ্গে হিন্দু সংগঠনগুলির একাংশ বেশ কিছু কৌশল নিয়ে হিন্দুদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করেছিল। যেমন, আর্যসমাজের কিছু যুবক মুসলমান সেজে হিন্দুদের আক্রমণ করে। তেমন জোরালোভাবে নয়, কারণ উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি হিন্দুদেরও বিক্ষোভে নামানো। কোথাও কোথাও টাকাপয়সা বা খাবারদাবারের লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন বস্তি থেকে লুকিয়ে থাকা মুসলমান আক্রমণকারীদের বার করে এনে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। একটা লিফলেটও ছড়ানো হয়েছিল যে, কোনো হিন্দু যেন মুসলমান ড্রাইভারের ট্যাক্সিতে না ওঠে। এই সমস্ত অ্যাকশনের পিছনে কাজ করছিল পাকামাথার পরিকল্পনা ও আর্থিক সহযোগ। সম্ভবত, মাড়োয়ারি সমাজই এই আর্থিক সহযোগ জুগিয়েছিল।
পাশাপাশি মানবিকতার উদাহরণও প্রতিষ্ঠা করেছিল কোথাও হিন্দুরা, কোথাও মুসলমানরা। যেমন, হিন্দু নলিনী সেন ও মুসলমান মৌলভি ওয়াহেদ হোসেন হিন্দু-মুসলিম বাদবিচার না করেই নিজেদের বাড়ির দরজা খুলে দিয়েছিলেন আশ্রয়প্রার্থীদের। বিশেষ করে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার (বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি) বহু আক্রান্ত মুসলমানকে আশ্রয় দিয়েছিল। এর ফল হয়েছিল— অন্য রাজ্যের অবাঙালি হিন্দুরা ঠাকুর পরিবারকেই আক্রমণ করেছিল। আসলে ১৯১৮- র মতো ১৯২৬-এর দাঙ্গাতেও বাঙালি হিন্দুদের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। কিন্তু, পুরোমাত্রায় ছিল অবাঙালি হিন্দুরা যাদের অধিকাংশ ছিল সমাজের নিম্নস্তরভুক্ত— ডাক ও রেল শ্রমিক, গাড়োয়ান, কুলি, জমাদার, দারোয়ান, বড়োলোক পরিবারের পোষা লাঠিয়াল, ধাঙড়, ভিস্তিওয়ালা, গোয়ালা, রিকশাওয়ালা, মেথর, ডোম, ফলবিক্রেতা ইত্যাদি। এইসব হিন্দু দাঙ্গাকারীদের পরিবারের বেশ কিছু মহিলাও বিরোধী আক্রমণকারীদের ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। এর আগে কোনো দাঙ্গায় মহিলাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা দেখা যায়নি। আরও একটি বিষয় এ প্রসঙ্গে বলা দরকার— বাঙালি হিন্দুরা ১৯২৬-এর দাঙ্গায় প্রথম দুটি পর্বে অংশ না নিলেও শেষের দুটি পর্বে কোথাও কোথাও আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করেছিল।
ঠিক একইভাবে সেবারের দাঙ্গার প্রথম পর্যায়ে মুসলমান দাঙ্গাকারীরা ছিলেন মূলত কলকাতার বাবুঘাটের নৌকার মাঝিরা, কসাই, দর্জি, কোচম্যান, পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকানদার, পেশোয়ারি ফলবিক্রেতা এবং মূলত উত্তর ও মধ্য কলকাতার মুসলিম বস্তিবাসীরা। বহু কোচম্যানের বিরুদ্ধে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ তুলেছিলেন যে কোচ রেখে ঘোড়া নিয়ে পালিয়েছিল মুসলমান কোচম্যানেরা। সে-ঘোড়া আর কোনোদিন ফেরত আসেনি।
কিন্তু, এটাই সার্বিক বাস্তবতা ছিল না। গড়পার এলাকায় দাঙ্গায় অংশগ্রহণকারী হিন্দু যুবকদের মধ্যে যেমন শিক্ষিত পশু চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, ব্যাঙ্কের চাকুরে, ছাত্র এবং পিয়োনদের পাওয়া গিয়েছিল, তেমনি মুসলমান হামলাকারীদের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল বিশাল বিশাল জমির যুবক মালিক এবং পেশাদার ব্যক্তিদের। ব্যবসায়ী থেকে মসজিদের ট্রাস্টি সব কিছুই। তবে, দুটি ক্ষেত্রেই এজাতীয় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ছিল নগণ্যই। তখন এইসব ঘটনাবলি ব্যতিক্রমী বলে মনে হলেও পরবর্তীকালে কলকাতার ঐতিহাসিক ‘৪৬-এর দাঙ্গায় দেখা গিয়েছিল ‘ব্যতিক্রমী’দের সংখ্যা বেড়েছে শুধু তাই নয়, হিংস্রতায় এঁরাও কম যেতেন না।
তবে, সব হানাহানিতেই যেমনটা হয়— প্রতিষ্ঠিত গুন্ডাদের রমরমা— ১৯২৬-এ সেটাও ছিল লক্ষণীয়। গুন্ডা ছাড়া রায়ট সবসময়ের জন্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ‘২৬-এর দাঙ্গায় নামজাদা মুসলমান গুন্ডা মীনা পেশোয়ারি, বিশ্বম্ভর চৌবে, নূর মহম্মদ, শিউচরণ ভুর, জগদীপ তেওয়ারি, শাইক ইউসুফ, আল্লা বক্স পেশোয়ারি, বালমুকুন্দ মিসার, বাবুজানদের যেমন খাতির করেছিলেন ইসলামিক নেতারা, ঠিক তেমনি হিন্দু নেতাদের তারিফ পেয়েছিলেন বিহার, উত্তরপ্রদেশ থেকে ভাড়া করে আনা প্রায় ৩০০০ আপকান্ট্রি হিন্দু গুন্ডাও। এদের আনা হয়েছিল বেনারস, মির্জাপুর, ভোজপুর এবং বিহার থেকে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য এবং বিশিষ্ট গবেষক সুরঞ্জন দাস ১৯২৬ সালের দাঙ্গায় জড়িত ৬ জন মুসলিম এবং ৮ জন হিন্দু গুন্ডার পুলিশ ফাইল দেখার দুর্লভ সুযোগ পেয়েছিলেন। তাঁর দেওয়া তথ্য হল: ওই ১৪ জন গুন্ডাই ছিল বাংলার বাইরের ভিন প্রদেশের। একজন ছিল সৌদি আরবের জেড্ডার। এদের প্রত্যেকের ছোটোবেলায় পিতৃবিয়োগ হয়েছিল। ফলে, পড়াশোনার সুযোগ হয়নি কারোরই। শুধু একজন ছিল স্বল্পশিক্ষিত। দারিদ্র্য এবং অস্থিরতার মধ্যে বেড়ে ওঠা এই যুবকেরা যথারীতি খারাপ সঙ্গের পাল্লায় পড়ে এবং অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। চোরাচালান এবং জুয়া খেলাই ছিল ওদের পেশা। এদের বেশিরভাগই ছিল অবিবাহিত এবং তাদের প্রত্যেকের নাম জড়িত ছিল মহিলাঘটিত অপরাধের তালিকায়। মূলত নতুন পেশার খোঁজেই এরা কলকাতায় পা রেখেছিল। কিন্তু, দারিদ্র্য বা অনিশ্চয়তা কোনোটাই দূর হয়নি। হতাশায় ভুগছিল ওই যুবকেরা। ওই হতাশাই তাদের টেনে নিয়ে যায় গুন্ডামির পথে। দাঙ্গায় অংশগ্রহণ করে আত্মপ্রকাশ করে এরা চেষ্টা করেছিল নিজেদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস মুছে ফেলতে।
একই সময়ে ঢাকা ও পাবনায় ঘটে যাওয়া হিন্দু-মুসলিম সংঘাতে অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় এবং আচরণ কলকাতার মতো একইরকম ছিল। কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল পাবনায় হিন্দুদের প্রতিবাদী শোভাযাত্রা, যেখানে বাঙালি হিন্দুদের উচ্চবিত্ত এবং সমাজের উচ্চস্তরের পরিবারের সদস্যরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিলেন সম্ভবত আত্মরক্ষার তাগিদেই। পরবর্তীকালের দাঙ্গায় সেই আত্মরক্ষার তাগিদটাই দাঙ্গার চরিত্র বদল করে দিয়েছিল।
কিন্তু, এই যে শত শত মানুষের প্রাণঘাতী দাঙ্গা ঘটে গেল টানা দু- মাস ধরে, তা কি সত্যিই ছিল একধরনের স্বতঃস্ফূর্ত আক্রমণ ও প্রতি- আক্রমণ? নাকি, নেপথ্যে ছিল কুচক্রী নেতৃত্ব যারা পরিকল্পিতভাবে দাঙ্গাকে ক্রমাগত টেনে নিয়ে গেছেন উত্তেজিত পরিস্থিতির দিকে ছোটোখাটো সংঘর্ষের ঘটনাকে উপজীব্য করে?
ঘটনা পরম্পরা প্রমাণ করে, ক্রমান্বয়ে চরম হিংসার পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া ১৯২৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কখনোই স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। তারও আগে ১৯১০ কিংবা ১৯১৮-তেও দাঙ্গা কখনো নেতৃত্ব ছাড়া পরিপূর্ণতা পায়নি। ‘২৬-এর দাঙ্গায় নেতৃত্বের প্রকট রূপটা স্পষ্ট করে ধরা পড়ে।
ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ করে ‘২৬-এর দাঙ্গায় মুসলমানদের পক্ষে সবচেয়ে ঘৃণ্য ও হিংস্র ভূমিকা নিয়েছিলেন হুসেইন শাহিদ সুরাবর্দি, যিনি কলকাতার মেয়র ছিলেন এবং পরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লিগের অবিসংবাদী নেতা হিসেবে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। চরম সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন সুরাবর্দির ভূমিকা ছিল চরমপন্থী গুন্ডা দাঙ্গাবাজদের চেয়েও ঘৃণ্য। দুই পোষা গুন্ডা মীনা পেশোয়ারি এবং আল্লা বক্স পেশোয়ারিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মুসলিম পল্লিতে, বস্তিতে ক্রমাগত হিন্দুদের বিরুদ্ধে হাতে অস্ত্র তুলে নেবার জন্য নিম্নস্তরীয় অতি সাধারণ মুসলিম সমাজকে উত্তেজিত করে তুলেছিলেন। তিনি তাদের বোঝাতে পেরেছিলেন যে, হিন্দু তথা কাফেরদের নিশ্চিহ্ন করতে না পারলে পাক-ভূমি পাকিস্তান গঠন করা সম্ভব হবে না। বহু জায়গায় লুঠতরাজে তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নির্দেশ দিয়েছেন, তদারকি করেছেন। তাঁকে দেখে বিত্তবান মুসলমানরাও হিন্দুদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বিস্ফোরক বক্তব্য রেখেছেন পথে-ঘাটে। শিক্ষিত মুসলিমদের কেউ কেউ উর্দু বা আরবি কাগজে উত্তেজক প্রবন্ধ লিখেছেন এবং দাঙ্গাকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিয়েছেন। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখব, সুরাবর্দির কুটিল চক্রান্তে কেমনভাবে ১৯৪৬-এর কলকাতা দাঙ্গা সাফল্য পেয়েছিল এবং প্রকৃতঅর্থে কলকাতা শহর পরিণত হয়েছিল চিল-শকুনের ভোজভূমিতে। এই একটিমাত্র চরিত্র সাম্প্রদায়িকতার বিশ্ব ইতিহাসে চরমতম নোংরা রেকর্ড রেখে গিয়েছেন। তাঁর জন্যই বাংলা বিভাজন হয়েছে। বাঙালি বিভাজিত হয়েছে। লাখো লাখো হিন্দু উদ্বাস্তু হয়েছে। অনাহারে, অনাশ্রয়ে প্রাণত্যাগ করেছে। হাজার হাজার শিশু অনাথ হয়েছে। হাজার হাজার যুবতী ধর্ষিতা হয়েছে এবং শেষপর্যন্ত গর্ভে মুসলিম ঔরসে জাত সন্তান ধারণ করে ধর্ম বদল করে ধর্ষকের পরিবারে বহু স্ত্রীর একজন হয়ে বিষময় জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছে।
.
সুরাবর্দির মতো অতখানি ঘৃণ্য না হলেও দাঙ্গায় হিন্দুদের অংশগ্রহণে উত্তেজক ভূমিকায় হিন্দু নেতাদের অবদানও কম ছিল না। বিভিন্ন হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনের ছত্রছায়ায় ধর্মীয় নেতৃত্ব পাড়ায় পাড়ায় আত্মরক্ষার অধিকার এবং হিন্দু জাগরণের বাণী প্রচার করতেন। তাঁরা হিন্দুদের বোঝাতেন, মুসলমানরা গোটা বাংলা ছিনিয়ে নিয়ে পাকিস্তানে যোগ দিতে চাইছে। সেটা হলে বাঙালি শিকড় হারাবে। আশ্রয় হারাবে। মুসলমানদের শিকার হবে এবং বাধ্য হবে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হতে। মূল বাংলার বাঙালির অস্তিত্ব বিনষ্ট হবে। তাঁরা প্রচার করতেন বৃহত্তর ন্যায়বিচারের স্বার্থে, প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হবে। কাপুরুষের মৃত্যু নয়। বরণ করে নিতে হবে পুরুষকারের সম্মিলিত বিজয়কে। বলা যায়, হিন্দু ধর্মীয় নেতাদের কথাতেই হিন্দু যুব সমাজের একাংশ আত্মরক্ষার্থে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়েছিল। অবাঙালিরা তো প্রস্তুত ছিলই। নেতৃত্বের কথায় বাঙালি হিন্দুরাও মুক্তির সন্ধানে পথে নামে। এবং বলা যায়, মুসলমান দাঙ্গাবাজদের যথাযথ শিক্ষা দিয়ে হিন্দুরা বুঝিয়ে দিয়েছিল, মাতৃভূমিকে তারা কাউকে কেড়ে নিতে দেবে না।
১৯২৬-এর দীর্ঘস্থায়ী দাঙ্গা একসময় স্তিমিত হয়ে এল। কিন্তু, চিরস্থায়ী করে গেল একটা কলঙ্ককে। সাম্প্রদায়িকতার কলঙ্ক, যা সভ্যতার ইতিহাসকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। ‘গর্বে যারা অন্ধ সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে’ সেইসব কুটিল মানবিক রূপ বাংলার বুকে গড়ে দিল এক ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’– হিন্দু- মুসলিম আর ভাই ভাই নয়, একই বৃত্তের দুটি কুসুম নয়, সাম্প্রদায়িকতার কাঁটায় জর্জরিত বাংলা মায়ের দুই সন্তান।
অর্থনৈতিকভাবে যা ক্ষতি হওয়ার, তা হয়েছিল। শিল্প ও ব্যাবসাক্ষেত্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল ১৯২৬-এর দীর্ঘস্থায়ী চার পর্বের দাঙ্গা। কিন্তু, সেসবের চেয়েও বড়ো ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল সামাজিক বুনোটের। হিন্দু আর মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের যে জটিল সহাবস্থান, তা পরিণত হয়েছিল পোকায় কাটা পুথির বাক্যে। আর, এই জটিলতাকেই জিইয়ে রেখেছিল ব্রিটিশ শাসক টানা চার দশক ধরে বাংলার সাম্প্রদায়িক ক্ষতটাকে ধরে রাখতে। যাতে বাঙালির সংগ্রামী চেতনা ভারতীয় সনাতনী সংস্কৃতির রং ও রূপে রামধনু হয়ে উঠতে না পারে। বাংলা ভাগ হয়েছে। ভারত ভাগ হয়েছে। কিন্তু, বাঙালির সংগ্রামী চেতনাকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যাজকরা ধ্বংস করতে পারেনি। শত শত বাঙালি শহিদ জীবন দিয়ে প্রতিপন্ন করে গেছেন, বাংলা তাঁদের মা। আর, সেই দৃঢ়তার সামনে বেশিদিন দাঁড়াতে পারেনি ইংরেজ। তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে নিজের দেশে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন