মন্বন্তরের ছায়া ’৪৬-এর কলকাতায়

সুজিত রায়

মন্বন্তরের ছায়া ’৪৬-এর কলকাতায়

১৯৪৬-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কোনো সমস্যারই সমাধানের পথ দেখায়নি। পরবর্তীকালের ইতিহাস ও রাজনীতি প্রমাণ করেছে, দাঙ্গা না হলেও বঙ্গ বিভাজন হতই। এবং সেই বিভাজনের বিরুদ্ধে না হিন্দু মহাসভা, না হিন্দু কংগ্রেস নেতারা কোনো আন্দোলনে নামতেন।… রাজ্য বিধানসভায় মুসলিম লিগের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের উত্থাপিত অনাস্থা প্রস্তাবের বিতর্কে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল— তা হল পাকিস্তান সৃষ্টির পক্ষে হিন্দু এবং মুসলিম— দুই সম্প্রদায়ের স্পষ্ট বক্তব্য।

Source: Communal Riots in Bengal 1905-1946: Dr Suranjan Das. OUP. pg 190

.

In the period between August 1946 and August 1947, if you were a Hindu, you believed in one narrative that blamed Suhrawardy and the Muslim League entirely, and saw the violent acts by Hindu crowds as simply a matter of self defence, and you could quote plenty of ‘witnesses’ to support your claim. If you were a Muslim, you tended to adopt a discourse of victimization and to point to the fact that most of the victims were Muslims hinting at a dark Hindu plot to wipe of Muslims in Calcutta.

Source: The Calcutta Riots of 1946, Violence de masse et Resistance-Reseau de recharcha, Author: Markovits Claude

দাঙ্গার পর মন্বন্তর কবলিত শহর কলকাতার একটি খণ্ডচিত্রছবি সৌজন্য : ‘লাইফ’ পত্রিকা

রাজ্য বিধানসভায় ‘কলকাতা দাঙ্গা’ বিতর্কে দু-পক্ষের বিস্তারিত আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল: প্রথমত, দাঙ্গার পরিকল্পনা ছিল মুসলিম লিগের। দ্বিতীয়ত, প্রথম হিন্দুদের দোকান লুঠপাট এবং মারধর শুরু করে মুসলমানরা। তৃতীয়ত, হিন্দুরা ইট পাটকেল ছুড়ে তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছিল। চতুর্থত, শেষপর্যন্ত খুন ও লুঠ এবং ধর্ষণ-এর ঘটনা যখন মাত্রা ছাড়াচ্ছিল, তখন হিন্দুরাও পথে নামে আত্মরক্ষা এবং নিজেদের সম্পত্তিরক্ষার তাগিদে। পঞ্চমত, তাতে প্রাণ গিয়েছিল মুসলিমদের বেশি। কিন্তু, সম্পত্তি ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছিল হিন্দুদেরই।

বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশনের দাবি যখন তুঙ্গে উঠল, তখন আর সুরাবর্দি তা ধামাচাপা দিতে পারলেন না। ব্রিটিশ প্রশাসনও চাইছিল— তদন্ত কমিশনের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হোক এই কালান্তর ঘটনার।

অবশেষে অগাস্ট ১৯৪৬-এই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার প্যাট্রিক স্পেনস (Sir Patrick Spens)-এর নেতৃত্বে শুরু হল তদন্ত কমিশনের কাজ। এই তদন্ত কমিশনে হাজির ছিলেন বাংলার রাজ্যপাল এফ বারোজ ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে। মুসলিম লিগের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন হোসেইন সুরাবর্দি। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল, মুসলিম লিগ পাকিস্তানের দাবিকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। সেটা লিগ করতে পেরেছে। সেখানে কিছু অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটে গেছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস এবং হিন্দুরা মুসলিম আক্রমণের ওপরই বেশি জোর দিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছিল।

তবে, এই কমিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কলকাতার পুলিশ কমিশনার ডোনাল্ড রস হার্ডউইকের সাক্ষ্য, যা তিনি কমিশনে দিয়েছিলেন ১৯৪৬-এর ১৮ নভেম্বর। ১৬ অগাস্ট থেকে ২০ অগাস্ট পর্যন্ত পূর্ণোদ্যমে চলা দাঙ্গার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন। তাতে তিনি দাঙ্গার দিনগুলিতে তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। কিন্তু, অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নই তিনি নানা অজুহাতে এড়িয়ে যান। তবে, তাঁর লিখিত প্রতিবেদনে তিনি স্বীকার করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী সুরাবর্দির বাধাতেই কারফিউ জারি করা এবং সেনাবাহিনীকে নামাতে দেরি হয়েছিল। কারণ, তখন রমজান মাস চলছিল।

The Calcutta Riots of 1946 শীর্ষক দীর্ঘ প্রবন্ধে লেখক মার্কোভিটস ক্লড (Markovits Claude) প্রকৃতপক্ষে এই তদন্ত কমিশনকে একটি অসমাপ্ত অধ্যায় হিসেবেই বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন :

In August 1946, the Government of Bengal appointed an enquiry commission presided by the Supreme Justice of India Sir Patrick Spens. Although the Commission interrogated many witnesses, its conclusions were never published.

যদিও লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্যার ফ্রান্সিস টুকের তাঁর The Memory Serves গ্রন্থে অনেকটাই সবিস্তার লিখেছেন, কিন্তু গোটা লেখাটাই মূলত ব্রিটিশদের প্রতি পক্ষপাতিত্বে দুষ্ট। সেইসঙ্গে ছিল বেশ কিছুটা মুসলিম লিগের পক্ষে লেখা, সিংহভাগটা ঘোরতর কংগ্রেস বিরোধিতা।

মার্কোভিটস লিখে গেছেন, এ ছাড়া ব্যক্তিগত স্তরে আর কেউ সেইভাবে দাঙ্গার দিনগুলির কথা লিখে রেখে যাননি, যেখানে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে।

‘Narratives of the event became very much part of identity politics in a city which remained seriously divided until the middle of 1947 when Gandhi’s “Peace Mission” brought in a respite which eventually became lasting.’

হিন্দু বা মুসলমান কোনো পক্ষ থেকেই তৎকালীন ঐতিহাসিক সত্যকে সেইভাবে ধরে রাখার উদ্যম নেওয়া হয়নি। ব্রিটিশরা তো ১৯৪৭-এর পর এদেশে তাঁদের অস্তিত্বই হারিয়ে ফেললেন। হিন্দুদের চোখে বিশ্বাসযোগ্য ন্যারেটিভ হয়ে উঠল সুরাবর্দি ও মুসলিম লিগের অনৈতিক রাজনীতি আর মুসলমানদের কাছে সত্য হয়ে জেগে রইল সেই ন্যারেটিভ যাতে বলা হয়েছিল, আত্মরক্ষার নামে মুসলমানদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল হিন্দুরা। এবং, আশ্চর্যের ব্যাপার— দু-পক্ষেই হাজির করা হয় প্রচুর সাক্ষ্য— যাঁরা দাঙ্গার সাক্ষ্য ছিলেন কি না সন্দেহ। দেশবিভাগের সঙ্গেসঙ্গে বঙ্গবিভাজন হল এবং দেখা গেল গোটা বাংলাই একটা শান্তির বাতাবরণে অবগাহন করছে যে শাস্তির প্রলেপে ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর মতো ঘটনাও কবরে প্রোথিত হয়েছে।

দাঙ্গার পরে

আমি বইয়ের প্রথম অধ্যায় শুরু করেছিলাম দাঙ্গাক্লিষ্ট কলকাতার রাজপথের এক বিবমিষা উদ্রেককারী বর্ণনার মাধ্যমে। সার সার পচাগলা মৃতদেহর ওপর ভিড় জমেছে বুভুক্ষু শকুন আর চিল আর তাদের তাড়াতে তাড়াতে চলেছেন LIFE পত্রিকার বিখ্যাত মহিলা ফোটোগ্রাফার মার্গারেট ব্যুরকে হোয়াইট। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ছেন। ক্যামেরা ফোকাস করে শাটার টিপছেন।

সেটাই ছিল কলকাতা দাঙ্গার প্রকৃত কলকাতার ছবি।

কিন্তু, দাঙ্গা শেষ হবার পর? কেমন ছিল শহর কলকাতা?

শহর কলকাতার জনজীবনে নেমে এসেছিল শ্মশানের স্তব্ধতা। তিন বছর আগে ১৯৪৩-এর মন্বন্তরে শহরবাসী যা প্রত্যক্ষ করেছিল, যা অনুভব করেছিল, এবারের নৈঃশব্দ্য তার চেয়েও অসহনীয়। কারণ, এবার মায়ের চোখের সামনে খুন হয়েছে ছেলে! ছেলের চোখের সামনে একত্রে ধর্ষিতা হয়েছে মা, বোন, স্ত্রী! এর চেয়ে ভয়াবহ আর কী হতে পারে! ফলে, নৈঃশব্দ্যের সঙ্গে মিশেছিল গুমরে ওঠা কান্না— মায়ের, সন্তানের।

ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরছিল শহর। কিন্তু, জনজীবনটা যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। মানুষ অফিসে গেছেন। পাশের সহকর্মীটিকে আর কোনোদিন দেখেননি। ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে গেছে। খুঁজে পায়নি প্রিয় বন্ধুকে — প্রিয় বান্ধবীকে। প্রেমিক হারিয়েছে প্রেমিকাকে— প্রেমিকা হারিয়েছে প্রেমিককে। কেউ হয়েছে সম্পূর্ণ অনাথ। কেউ হয়েছে সর্বসন্তানহারা। কারো ব্যাবসা বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ, কোমরটাই ভেঙে দিয়ে গেছে দাঙ্গা। দোকান পুড়েছে। কারখানা পুড়েছে। ঘর পুড়েছে। দালান পুড়েছে। প্রাণে বাঁচতে ব্যাবসার পুঁজি ভাঙিয়ে দাঙ্গাবাজদের হাতে তুলে দিতে হয়েছে হাজার হাজার টাকা। ছোটো দোকানদারের মাথায় দেনার বোঝা। তার ওপর ধারে খেত যারা তারা কে কোথায় কেউ জানে না। চাষি জানে না, কেমন করে বীজধান, বীজ আলু কিনবে। কামার জানে না, কয়লা জুটবে কীভাবে? হাপর টানবে কে? তাঁতি জানে না, তাঁতের সুতো কেনার টাকা আসবে কীভাবে? শ্রমিক জানে না, বন্ধ কারখানা খুলবে কবে? কার চাকরি থাকবে আর কে খোয়াবে চাকরি।

বাজারে চাল নেই, আলু নেই, গম নেই। দোকানপাট কোথাও খোলা, কোথাও বন্ধ। খোলা থাকলেও বহু দোকানেই মালপত্র নেই। যা পাওয়া যায়, তা ছুঁতে গেলে হাতে গরম ছ্যাঁকা লাগে। সরকারি হিসেবে মাত্র একসপ্তাহে মূল্যবৃদ্ধির হার ছুঁয়েছিল ২৩৩ থেকে ৩০০ শতাংশ। লক্ষ লক্ষ মানুষের ঘরে একটা দানাও খাবার ছিল না। লুঠ হয়ে গেছে সব। নয়তো পুড়ে গেছে পোড়াবাড়ির আগুনে। পূর্ববঙ্গে প্রচুর খাদ্যশস্য সরবরাহ হত পশ্চিমবঙ্গ থেকে। সেই সরবরাহ বন্ধ। পূর্ববঙ্গের বহু এলাকায় নিদারুণ খাদ্যসংকট। বড়োবাজারে শাড়ি ও জামা-প্যান্টের বাজারে আকাল। দাঙ্গার ক-দিনে প্রায় ৪ লক্ষ ঘণ্টার তাঁত বোনার সময় নষ্ট হয়েছে। শহরের ঘরে ঘরে পেটের রোগ, বমির অসুখ। কারণ, মৃতদেহর গন্ধ তো অত সহজে শহরের বাতাসকে মুক্তি দেবে না!

কলকাতার বহু এলাকায় ততদিনে কমতে শুরু করেছে জনসংখ্যা। আবার যদি আক্রমণ হয়— এই ভয়ে অন্তত ১০ হাজার মানুষ ভিটে বা বাসা ছেড়ে পালিয়েছে। মুসলিম এলাকা ছেড়েছে হিন্দুরা। হিন্দু এলাকা ছেড়েছে মুসলিমরা। অন্তত, একলক্ষ শহরবাসী হারিয়েছে মাথার ছাদ। তার ওপর পড়শির প্রতিও বিশ্বাস হারিয়েছে মানুষ। যেকোনো সময় অতর্কিত আল্লা-হু-আকবর অথবা বন্দেমাতরম স্লোগান-এর সঙ্গে নেমে আসবে ধারালো তরোয়াল, তীক্ষ্ণ বর্ণা— এমন একটা চাপা আতঙ্ক তখনও গ্রাস করে রয়েছে শহরকে। ভয়টা অচিন্তনীয় ছিল না। কারণ, দাঙ্গার অনেক পরে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে একদিনে ২২ জনকে কুপিয়ে মেরেছিল দাঙ্গাবাজরা। কারণ, তখন হিন্দু- মুসলমান দু-পক্ষই ব্যক্তিগত ক্রোধ পুষে রেখেছে বুকের ভিতর। সুযোগ পেলেই প্রতিশোধ নেবে পালটা খুনের মাধ্যমে।

পরিস্থিতি বুঝে জওহরলাল নেহরু ভাইসরয়কে ২২ অগাস্ট ১৯৪৬-এ লিখেছিলেন :

Calcutta has been a terrible shock to you and to all of us. And yet may I say that it has a personal significance for us which it cannot have even for you? Our friends and relatives are involved in these bloody murders, and our children and dear ones may have to face the assasin’s knife at any time… but we are not going to shake hands with murderers or allow it to determine the country’s policy. We shall still continue to reason with Hindu and Muslim and Sikh and others and try to win them over to the path of friendly cooperation, for there is no other way for the advancement of India… We may have rough weather ahead. We must have a strong and stable ship…[ref. Select works of Jawaharlal Nehru vol. 15, p 315]

কিন্তু, ‘Memory Continues to fan the primordial passion (for revenge)’ লিখেছিল হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা ২১ অগাস্ট ১৯৪৬-এ। এলিট অথবা মধ্যবিত্ত— দুই সম্প্রদায়ের মানুষের সব শ্রেণির মধ্যেই মজ্জাগত হয়ে গিয়েছিল স্বজন হারানোর যন্ত্রণার সঙ্গে পড়শিকে মেরেও প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। ফলত, রাজনৈতিক বা সামাজিক— কোনো দিক দিয়েই কলকাতা দাঙ্গা কোনোরকম ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। তাই communal settlement বা সাম্প্রদায়িক সমঝোতার উপায় ছিল একটাই— ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রদর্শিত পথ— হিন্দু ও মুসলিমের শান্তিতে থাকার রাস্তা এখন একটাই— জনসংখ্যা বিনিময় (মুসলমানরা যাক পূর্ববঙ্গে, হিন্দুরা থাক পশ্চিমবঙ্গে)। এ ছাড়া, দুটি গোষ্ঠীরই নিজ নিজ অধিকার ও বিচারবোধ সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর গড়ে উঠবে না। প্রকৃতপক্ষে দাঙ্গার পর রাজ্য বিধানসভায় সুরাবর্দি সরকারের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব বিতর্কেও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ভারতবর্ষে হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি বা ভ্রাতৃত্ববোধের আর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ধর্ম এবং রাজনীতি দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পুরোপুরি মেরুকরণ করে দিয়েছিল যেখানে দুই পক্ষের পুনর্মিলন আর কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।

‘৪৬-এর দাঙ্গায় আরও বড়ো দুটি লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। প্রথমত, দাঙ্গার আগে হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় খড়্গহস্ত কংগ্রেস নেতৃবর্গ— নেতাজি সুভাষচন্দ্রর মেজদা শরৎচন্দ্র বোস, কিরণশঙ্কর রায় প্রমুখ যেভাবে উঠে-পড়ে লেগেছিলেন দুই বঙ্গকে ভারতবর্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন করিয়ে স্বাধীন বঙ্গদেশ স্থাপনের জন্য, সেই প্রচেষ্টাও বানচাল হয়ে গিয়েছিল। কারণ, কংগ্রেসের কিছু রাজ্যনেতা এ ব্যাপারে হাত মিলিয়েছিলেন মুসলিম লিগ নেতা সুরাবর্দির সঙ্গে যাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, অদূর ভবিষ্যতে স্বাধীন বঙ্গদেশকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়া এবং কালক্রমে ইসলামিক ফাঁদে বন্দি করে হিন্দু বাঙালিদের ধর্মান্তর করে তাঁদের অস্তিত্বই বিলুপ্ত করে দেওয়া।

স্বাধীন বঙ্গদেশের প্রবক্তারা বলতেন, হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির বাঁধন দৃঢ় করার জন্যই তাঁরা এই উদ্যোগ নিয়েছেন। এটাও একটা অছিলামাত্র। কারণ, যে কাজ গান্ধীজি করতে ব্যর্থ হয়েছেন, সেকাজ শরৎচন্দ্র বোস, কে এস রায়রা করে দেবেন, এত বড়ো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাঁরা ছিলেন না। আসলে তাঁরা চেয়েছিলেন, একটি স্বাধীন রাজ্যের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী হতে। বোঝেননি, সুরাবর্দির কোন ভয়ানক চালে তাঁরা হিন্দু বাঙালিদেরই বিলুপ্ত করার পথে এগোচ্ছেন।

সেটা বুঝেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। তাই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাংলা এবং বাঙালি হিন্দুদের বাঁচাতে। বুঝেছিলেন যে, আয়নায় ফাটল ধরলে তাকে আর জোড়া লাগানো যায় না। তাই প্রস্তাব দিয়েছিলেন, পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তান হোক মুসলমানদের বাসভূমি। পশ্চিম হোক হিন্দুর বাসভূমি। এই পরিকল্পনাকে সফল করে তুলতে পূর্ণ সময়ের সঙ্গে জন বিনিময় হোক। পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুরা আসুক পশ্চিমবঙ্গে, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা চলে যাক পূর্ব পাকিস্তানে। যে যার নিজ বাসভূমে শান্তিতে বাস করুক।

‘৪৬-এর কলকাতা দাঙ্গা প্রমাণ করে দিয়েছিল, শ্যামাপ্রসাদই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তা না হলে এতদিনে ‘হিন্দু বাঙালি’ এই শব্দগুচ্ছই অস্তিত্বহীন হয়ে উঠত। বাঙালিকে ভুলতে হত তার সনাতনী ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি। ভুলতে হত গীতা, উপনিষদ, বেদ, রামায়ণ, মহাভারত, ভুলতে হত সংস্কৃত।

‘৪৬-এর দাঙ্গায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যে ভয়াবহ রোষানল হিন্দুদের ওপর আছড়ে পড়তে দেখেছেন ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’-র প্রবক্তা কংগ্রেস নেতারা, তারপর আর তাঁরা এ ব্যাপারে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। করলে কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেন তাঁরা, তা সহজেই অনুমেয়।

দাঙ্গার পর শ্মশানেই শেষশয্যা

দ্বিতীয়ত, একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, ভারত বিভাজন হবেই। সৃষ্টি হবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের। সনাতনী হিন্দু সংস্কৃতির রাষ্ট্র ভারতবর্ষের নিকটতম পড়শি হবে একটি মুসলিম বা ইসলামিক রাষ্ট্র যা ভারতবর্ষের শান্তিকে কিছুতেই অক্ষুণ্ণ রাখতে দেবে না। আজ বিংশ শতাব্দীতে পা রেখেও ওই বাস্তবতার সম্মুখে একদিকে পাকিস্তান, অন্যদিকে আর একটি মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশের যৌথ অনুপ্রবেশের চাপে (অবশ্যই ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলির প্রশ্রয়ে) যেভাবে ভারতবর্ষে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটেছে গত ৭৭ বছরে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যে, তাতে শ্যামাপ্রসাদদের হিন্দু বাঙালির পশ্চিমবঙ্গ ‘৪৬-এর আগের পশ্চিমবঙ্গে পরিণত হতে বেশি সময় লাগবে না। সেদিন আরও একটা ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ হবে কি না, সেকথা বলবে সেদিনের ইতিহাস। কিন্তু, একটা কথা ভুললে চলবে না, সেদিনও একটা জিন্নাহ্ থাকবেন, একটা সুরাবর্দি থাকবেন। স্বস্তির কথা হবে, সেদিন যদি একটা মৌলানা আবুল কালাম আজাদও থাকেন যিনি ‘৪৬-এর দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন :

The 16th August was a black day not only for Calcutta for the whole of India. The turn that events had taken made it almost impossible to expect a peaceful solution by agreement between the Congress and the Muslim League. This was one of the greatest tragedies of Indian history. [ref. India wins Freedon. p 160]

দাঙ্গার পরেও মুসলিম সংহার

দাঙ্গার আগুন নিভেছিল।

কিন্তু, মুসলিম মানসিকতায় তখনও ধিকিধিকি জ্বলছিল হিন্দুদের প্রতি প্রতিশোধের স্পৃহা। কারণ, তারা ভেবেছিল, কলকাতা দাঙ্গাই হবে হিন্দুদের শেষ কবর। কিন্তু, হিন্দুরা ঘুরে দাঁড়ানোর পর যে ধাক্কা ইসলামিক ফ্রন্ট খেয়েছিল, তা তারা ভুলতে পারছিল না। তাই ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে যাবার আগে এবং ভারতবর্ষে স্বাধীনতার পতাকা ওড়ার আগেই মুসলমানরা শেষ কামড় দিতে শুরু করল ‘৪৭-এর মার্চ-এপ্রিল মাসে।

এর আগে কলকাতা দাঙ্গার পর পরই পূর্ববঙ্গের নোয়াখালিতে মুসলমানরা একইরকম দাঙ্গা করেছে। সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি। তাতেও তাদের তৃপ্তি হয়নি। অগত্যা ফের আক্রমণ ১৯৪৭-এ। যদিও সত্য হল, ‘৪৭-এর মার্চ-এপ্রিলে গণহত্যা হয়নি। যা হয়েছে, সবই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এখানে সেইসব ঘটনাগুলির একটি তালিকা দেওয়া হল :

৩১.৩.৪৭ : পাঠান সশস্ত্র পুলিশের সমর্থনে ১৫০ জন মুসলমানকে দেখা গেল হাওড়ার ঘুসুড়ি থেকে সালকিয়ার দিকে যেতে। অব্যবহিত পরেই জানা গেল, মালিপাঁচঘরা থানার ভোটবাগান এবং গোঁসাইঘাট এলাকার ১৫টি বাড়িতে আগুন লাগানো হয়েছে। পুলিশ অপরাধীদের না ধরে হিন্দুদের বাড়ি সার্চ করে বিনা প্রমাণে হিন্দুদেরই গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে।

৩১.৩.৪৭ : বেলেঘাটা কসাইখানার কাছে কাটুয়াকল বাজারে আক্রমণ হানে মুসলমানরা। পাঠান পুলিশের সামনেই দাঙ্গাবাজরা মহিলাদের ভয় দেখায়। একটা বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বাড়ির ছাদ থেকে মহিলারা চিৎকার করলে, পাঠানরা রাইফেল তুলে ভয় দেখায়।

১.৪.৪৭ : বেলেঘাটার শীতলা লেনে মেসার্স বি. পি. ভার্মা অ্যান্ড কোম্পানির মালিক এস ও ভার্মাকে পাঠান পুলিশ বন্দুক রাখার লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও গ্রেপ্তার করে মিথ্যা অজুহাতে যে, তাঁর বন্দুকের গুলিতে একজন পুলিশ আহত হয়েছে। যদিও ভার্মার দাবি ছিল, এরকম কোনো ঘটনাই ঘটেনি। কারণ, তাঁর সঙ্গে বন্দুকই

১.৪.৪৭ : অকল্যান্ড স্কোয়ারে ৬ জন হিন্দু গোয়ালা আক্রান্ত হয়। দু-জনকে ছুরিকাহত করা হয়। ছুটে পালাতে গিয়ে থিয়েটার রোডে পড়ে যায় তারা।

১.৪.৪৭ : কলকাতা কর্পোরেশনের কাউন্সিলর হিরণ গাঙ্গুলি অভিযোগ দায়ের করেন, এদিন ৪০০/৫০০ পাঠান পুলিশ টালা অঞ্চলের ঘোষবাগান বস্তি ঘিরে ফেলে যথেচ্ছভাবে গুলি চালায়। তারপর মুসলমান গুন্ডারা লুটপাট ও শারীরিক নির্যাতন চালায়। তারা দু-জন মহিলাকে অপহরণের চেষ্টা করেছিল কিন্তু স্থানীয় মানুষের বাধায় ব্যর্থ হয়।

১.৪.৪৭ : ট্যাংরার পিলখানায় একটি বস্তিতে ঢুকে পাঠান পুলিশ গুলি চালায়। বেশ কয়েক জনের মৃত্যু হয়। স্থানীয় মানুষ বস্তি থেকে বিপন্ন ৩৫ জনকে উদ্ধার করে। পাঠানরা মৃতদেহগুলি টেনে কাছেই একটি পুকুরে ফেলে দেয়।

১.৪.৪৭ : কলকাতার এজরা স্ট্রিটে গুডলাক পিকচার্সের অফিসে ঢুকে পাঠান পুলিশ একজন দারোয়ানকে খুন করে। মালিক কোনোরকমে জলের পাইপ বেয়ে নীচে নেমে পালান।

১.৪.৪৭ : বড়ো ঘটনা ঘটে যায় এদিন রাতে পাইকপাড়ায়। সামসুদ্দিন নামে এক মুসলমান যুবক সশস্ত্র পুলিশের সামনেই একজনকে ছুরি মারে। পুলিশ বাধা দেয়নি। অথচ, রাতে পুলিশ এসে এলাকা থেকে ৬ জন হিন্দুকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। রাত তিনটের পর মুসলমানরা পাশেই দত্তবাগান বস্তিতে ডা. সুধীর দাস নামে এক হিন্দু চিকিৎসককে গুলি করে মারে। তারপর বস্তিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। এদিনই সকালে মণীন্দ্র রোড ও অনাথবাবু লেনের সংযোগস্থলে একজন ছুরিকাহত হন।

১.৪.৪৭ : পাঠান পুলিশ কলেজ স্ট্রিটে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ লাইব্রেরিতে ঢুকে হিন্দু পড়ুয়াদের বেছে বেছে মারধর করে। পরে রাত ৯টায় আচমকাই তারা হামলা চালায় কলেজ স্কোয়ারের ভিতরে পরিভ্রমণরত নাগরিকদের ওপর

২.৪.৪৭ : বেলেঘাটা রেশন অফিস থেকে দু-জন নেপালিকে অপহরণ করে একটি মুসলিম গোষ্ঠী। হিন্দুরা আপত্তি করলে তাদের ওপর চড়াও হয় মুসলমানরা। পুলিশ এসে অবস্থা আয়ত্তে আনে। কিন্তু, রাতে মুসলমানরা আবার ফিরে এসে হিন্দুদের শাসিয়ে যায়।

২.৪.৪৭ : দক্ষিণ কলকাতার সাদার্ন অ্যাভিনিউর জনৈক সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, ৩০.৩.৪৭ থেকে তাঁর শ্যালক বাবু দেবেন্দ্রনাথ মুখার্জি (৭০)-কে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি উল্টোডাঙার গোরাচাঁদ বোস স্ট্রিটে থাকতেন। ৩০ এপ্রিল তিনি রাজা রাজকিসেন স্ট্রিটের একটি বাড়ি থেকে বেরিয়ে উল্টোডাঙার দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ মাঝপথে একটা গণ্ডগোল শুরু হয়। বৃদ্ধ দেবেনবাবু ছুটে পালাতে না পারায় মুসলমানরা তাঁকে ঘিরে ধরে। তাঁকে পাশের একটা গলিতে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর থেকে তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

২.৪.৪৭ : মুসলমান দাঙ্গাবাজদের একটি বিশাল গোষ্ঠী, একটি লরি বোঝাই পাঞ্জাবি মুসলমান সশস্ত্র কনস্টেবল একজন মুসলমান ইনস্পেকটরের নিরাপত্তায় জ্যাকেরিয়া স্ট্রিট ও চিৎপুর রোডের সংযোগস্থলের কাছে একটি তপশিলি মানুষের বস্তিতে হামলা চালায়। বস্তির বাসিন্দারা বাধা দিলে পাঞ্জাবি মুসলমান পুলিশবাহিনী যথেচ্ছভাবে গুলি চালায়। বহু নারী, পুরুষের মৃত্যু হয়।

২.৪.৪৭ : পুলিশের কাছে অভিযোগ আসে মুসলমান গুন্ডা ইসা, ইয়াসিন, কালু প্রমুখ এন্টালির গোপ লেনে একটি বাড়ি দখল করে সেখান থেকে প্রতিনিয়ত হিন্দুদের ওপর অত্যাচার চালায়। এলাকার শান্তি বিপর্যস্ত।

গোটা কলকাতা এবং হাওড়া শহর জুড়ে এধরনের আক্রমণ চলছিলই। রাজ্য প্রশাসনও সেই থ্রি মানকিজ-র ভূমিকাই পালন করে চলেছিল।

এসবই ছিল সুরাবর্দির মস্তিষ্কপ্রসূত পরিকল্পনা। হিন্দুদের উত্ত্যক্ত করতে থাকো, যতদিন এদেশে আছে। এই ছিল সুরাবর্দির নির্দেশ। ভারত হারিয়েছ, পশ্চিমবঙ্গ হারিয়েছ, কিন্তু পাকিস্তান তো পেয়েছ। এবার অত্যাচারে অত্যাচারে হিন্দুদের দীর্ণবিদীর্ণ করে পালিয়ে যাও পাকিস্তানে। সেখানে তোমরা থাকবে নিরাপদ আশ্রয়ে।

যত মুসলমান তখনও দেশ ছাড়েনি, তারা সেটাই করত। আর, হিন্দুর প্রাণ যেত। কারণ, বিভিন্ন সমীক্ষা প্রমাণ করেছে, কলকাতা দাঙ্গায় সূত্ৰপাত করেছিল মুসলিম গুন্ডাবাহিনী। দাঙ্গা মিটে যাওয়ার পরেও সেই গুন্ডাবাহিনী আতঙ্ক ছড়িয়ে রেখেছিল শহর জুড়ে সরকারি মদতে।

আক্রমণ যত বাড়ছিল, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কাছে তত আক্রান্তর ভিড় বাড়ছিল। কলকাতা দাঙ্গার নথিপত্রে দেখা গেছে, ব্যক্তি হিন্দু থেকে শুরু করে হিন্দু ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান, এমনকী কলকারখানার মালিকপক্ষও শ্যামাপ্রসাদের কাছে মুসলমানদের অত্যাচারের বিহিত চাইছেন।

স্বভাবতই বারে বারে কলকাতার বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে হিন্দু মহাসভার নেতারা কলকাতার পুলিশ কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কিন্তু, অত্যাচার বাঁধ মানেনি। এমনকী কংগ্রেস নেতা সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ৮ এপ্রিল ১৯৪৭ মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে শহরের বিভিন্ন এলাকায় মুসলমান দাঙ্গাবাজদের আক্রমণের ঘটনাগুলি কলকাতা পুলিশ প্রশাসনের সামনে তুলে ধরেন এবং স্পর্শকাতর সাতটি অঞ্চলে দ্রুততার সঙ্গে পুলিশ পিকেট বসানোর দাবি জানান।

কিন্তু, কাকস্য পরিবেদনা!

কলকাতা থেকে গিয়েছিল কলকাতাতেই ততদিন পর্যন্ত যতদিন না ভারতের তেরঙা পতাকাধারী তরুণ ও যুব সম্প্রদায় স্বাধীনতার দিন থেকে পথে নামে এবং আওয়াজ তোলে— ‘মুসলমান দূর হটো।’ ‘মুসলমানরা পাকিস্তানে যাও।’ পশ্চিমবঙ্গ ‘হিন্দুদের জন্য, কেবল হিন্দুদের জন্য।’ পশ্চিমবঙ্গে যবনদের কোনো ঠাঁই নেই।

মুসলমানরা কি আশঙ্কা করেছিলেন হিন্দুরা আবার ঘুরে দাঁড়াবে? সেই ভয় তো ছিলই। তার প্রমাণ তাঁরা পেয়েছেন ১৬ থেকে ২৩ অগাস্ট পর্যন্ত। অতএব, তাঁরা সংযত হয়ে গিয়েছিলেন। হয়তো সুরাবর্দির পরামর্শেই।

দাঙ্গার জন্য কলকাতাকে বেছে নেওয়া হল কেন?

এ প্রশ্নটা কলকাতা দাঙ্গা ১৯৪৬-এর পরে বারে বারে ফিরে এসেছে বিভিন্ন বিতর্কে, বিভিন্ন সমীক্ষায়, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি রিপোর্টে।

মূলত যে উত্তরটা বিভিন্ন মহল থেকে দেওয়া হয়েছে, তা হল: যেহেতু সেইসময় কলকাতাই ছিল অবিভক্ত বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর, তাই পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবিকে গোটা দেশের মানুষের নজরবন্দি করতেই মুসলিম নেতৃবৃন্দ কলকাতা শহরটাকেই কসাইখানায় পরিণত করতে চেয়েছিলেন।

প্রখ্যাত সাংবাদিক ভবানীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘One reason might be the fact that staging the bloodbath in Calcutta would have attracted the attention of the whole world to the might of the Muslim League, since at that time Calcutta was the most important city in India, indeed the second city in the British Empire. [ref. My People Uprooted by prof. Tathagata Roy]

খুবই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সন্দেহ নেই।

কিন্তু, এটাই একমাত্র লক্ষ্য ছিল না। আরও অনেকগুলি কারণও ছিল দাঙ্গার জন্য কলকাতাকে বেছে নেওয়ায় মুসলিম লিগের কৌশলী চাতুর্যের। প্রথমত, মুসলিম লিগের নেতৃত্বে ছিলেন বাংলার মুসলমানরাই। সুরাবর্দিসহ সব লিগ নেতারই লক্ষ্য ছিল বাঙালি হিন্দুদের ‘সবক’ শেখানো। কারণ, পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতায় বাংলা ছিল সবার আগে। দেশ বিভাজন বিরোধী আন্দোলন ও সংগ্রামের পথ দেখিয়েছেন এপার বাংলার নেতৃত্ব। দ্বিতীয়ত, মুসলিম লিগ নেতৃত্ব জানতেন, বাংলার কংগ্রেস নেতৃত্বর মাথা না ঝোঁকাতে পারলে, বাংলায় রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা অদূর ভবিষ্যতে সংকটগ্রস্ত হয়ে পড়বে। আর, কংগ্রেস নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলে বাঙালি হিন্দুরাও ঝিমিয়ে পড়বে।

তৃতীয়ত, অন্য শহরে ভারতবর্ষ ও তার সনাতনী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে প্রবল ইচ্ছা বাঙালিদের মধ্যে প্রতিভাত, অন্য প্রদেশের ভারতীয়দের মধ্যে তা নেই। তাই হিন্দু বাঙালিকে শায়েস্তা করতে পারলে গোটা ভারতকে মুসলমান রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যও সম্ভব হতে পারে।

চতুর্থত, মুসলমানরা জানত, হিন্দু বাঙালি মারকুটে নয়। বাঙালি মায়েরা চান না, তাঁদের সন্তানরা মুসলমান নির্মমতার মুখোমুখি হোক। তাঁরা জানেন, মুসলমানদের মধ্যে যে পিতৃহন্তারক, ভ্রাতৃঘাতী, স্ত্রী-নির্যাতনকারী হিংসাত্মক চরিত্র জিনগতভাবে লুকিয়ে আছে তার বহিঃপ্রকাশ কতটা মারাত্মক। তাই হিন্দু তরুণ ও যুবকরা মুসলমান দাঙ্গাবাজদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস দেখাবে না। পঞ্চমত, সবচেয়ে বড়ো লক্ষ্য ছিল, কলকাতা শহরকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা। কারণ, পাকিস্তানের প্রধান দাবিদার মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ বারে বারে বলেছেন, কলকাতা ছাড়া পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন অসমাপ্ত থেকে যাবে। সুতরাং, মুসলিম চেয়েছিল হিন্দু বাঙালিকে শায়েস্তা করে বঙ্গ বিভাজন রুখে পৃথক স্বাধীন বঙ্গভূমি গঠন করতে যেখানে জনসংখ্যার নিরিখে মুসলমান সম্প্রদায়ই হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারপর কলকাতাসহ গোটা বঙ্গভূমিকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়াটা তো বাঁয়া হাত কা খেল।

 দাঙ্গার পর শহর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা গলিত শবদেহ উদ্ধারের কাজে নামল ডোমেরা

দাঙ্গার পর শহর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা গলিত শবদেহ উদ্ধারের কাজে নামল ডোমেরা

অর্থাৎ, মুসলিম লিগ অনেক দূর পর্যন্ত ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কলকাতাকে দাঙ্গায় ধ্বংস করে দিতে। হিন্দু বাঙালির কোমর ভেঙে দিতে। শহরের অর্থনীতিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে এবং বাঙালি হিন্দুর মান, সম্মান, গরিমা, সংস্কৃতি, রাজনীতি সব কিছুকে হাজার হাজার মৃতদেহর সঙ্গে কবরে পাঠিয়ে দিতে। অচিরেই লুপ্ত করে দিতে হিন্দু বাঙালির অস্তিত্ব। কিন্তু, মাথামোটা সুরাবর্দি আর তার পোষ্য ভিনরাজ্যের যবনবাহিনী বুঝতে পারেনি বাঙালি বাঙালিই। হিন্দু হিন্দুই। লড়াই বাঙালির রক্তে, তন্ত্রীতে- তন্ত্রীতে, প্রতিটি বাঙালির নিশ্বাসে-প্রশ্বাসে। তাকে লুপ্ত করার সাধ্য কি জিঘাংসার জিনে তৈরি মুসলমানদের!

অতএব, প্রথমদিন একচেটিয়া হিন্দুদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট লুঠ করা এবং একের পর এক হিন্দু হত্যার পরদিন সকাল থেকে মুসলমান দাঙ্গাবাজরা দেখেছিল এক নতুন সকাল। সেদিন সকালের রোদে ঝলমল করছিল হিন্দুদের হাতের তরোয়াল, ছুরি, ছোরা, তেলমাখানো বাঁশের চকচকে লাঠি, লোহার রড, বোমা, পিস্তল।

‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান, মারকে লেঙ্গে হিন্দুস্তান’ স্লোগান নিমেষে চাপা পড়েছিল ‘বন্দেমাতরম, ভারতমাতা কি জয়’ স্লোগানে। পাড়ায় পাড়ায় শুরু হয়ে গিয়েছিল যবন সংহার।

১৭ অগাস্ট বিকেল গড়াতে-না-গড়াতেই সুরাবর্দির হাত-পা কাঁপতে শুরু করে দিয়েছিল। সেই শরৎচন্দ্রের ছিনাথ বহুরূপী মেজদার মতো চিৎকার করতে শুরু করেছিলেন— ‘বন্দুক লাও, সড়কি লাও।’ তড়িঘড়ি নির্দেশ জারি করেছিলেন, সেনাবাহিনী নামুক এবার। পুলিশ দিয়ে হিন্দু বাঙালিকে রোখা যাবে না।

তাতেও থামেনি। হিন্দুর নরসংহার মূর্তি সুরাবর্দিকে দেখতে হয়েছিল ২০ অগাস্ট পর্যন্ত। ‘ত্রাহি, ত্রাহি’ রব উঠেছিল মুসলমান বস্তিতে বস্তিতে। হিন্দুর রক্তের প্রতিশোধে মুসলমানের রক্তের স্রোত বয়ে গিয়েছিল শহর কলকাতায়।

একমাত্র মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ জানতেন হিন্দু বাঙালির শক্তি কতখানি। তাই দাঙ্গা চলাকালীন তিনি একবারও কলকাতার দিকে ফিরে তাকাননি, কোনো বিবৃতি দেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, হিন্দু বাঙালির হাত থেকে কোনোদিনই কেড়ে নেওয়া যাবে না শহর কলকাতা; যে কলকাতা সাহসীর কলকাতা। যে কলকাতা সংগ্রামীর কলকাতা। যে কলকাতা আগুন জ্বালাতে জানে। আগুন নেভাতেও জানে। তাই স্বাধীনতা প্রাপ্তি হল যখন দেশ বিভাজনের মধ্যে দিয়ে, তখনও জিন্নাহ্ কলকাতা নিয়ে ছিলেন নীরব। যক্ষ্মা রোগে বিদীর্ণ তাঁর ফুসফুসও বোধ হয় বলে দিচ্ছিল— তোমার এবার বিদায় নেবার পালা। বাংলার আশা ত্যাগ করে শান্তিতে চিরনিদ্রায় যাও।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%