সুজিত রায়
গুণ্ডামি ঠিকই, কিন্তু তা সাম্প্রদায়িক গুণ্ডামি। এক সম্প্রদায়ের নিরীহ মানুষের ওপর অন্য সম্প্রদায়ের গুণ্ডাদের তাণ্ডব। এতটা জানার পরেও কলকাতার দাঙ্গাকে নিছক গুণ্ডামির বেশি কিছু বলতে রাজি নন অনেকেই। তাঁদের জানা উচিত, সাম্প্রদায়িক গুণ্ডামিই আসলে ‘দাঙ্গা’।
—সম্পাদকীয়, অনুষ্টুপ, দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িকতা বিষয়ক বিশেষ সংখ্যা, ১৯৯৩
.
দাঙ্গার একটা বিশেষ মনস্তত্ত্ব আছে। নানাভাবে তা পুষ্ট, পোষিত হয়। এক গুণ্ডা যখন দাঙ্গা করে একটা অঞ্চলকে বাঁচায়, অঞ্চলের মানুষের চোখে সে তখন আর গুণ্ডা থাকে না। কলকাতার গুণ্ডাসমাজ নিয়ে একটা সমীক্ষায় ঠিকই বলা হয়েছে, ১৯৪৬-৪৭-এর দাঙ্গা বীরের আসনে বসিয়েছিল কলকাতার গুণ্ডাদের।
—ইতিহাসের দিকে ফিরে, ছেচল্লিশের দাঙ্গা,
সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, র্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন, অগাস্ট ২০১৯
.

সেই বিখ্যাত ভ্যান্সিটার্ট রো, যেখান থেকে ছিনতাই হয়েছিল রডা কোম্পানির বিস্তর অস্ত্রভাণ্ডার
.
২৬ অগাস্ট, ১৯১৪।
বুধবার।
ব্যস্ত অফিসপাড়া ডালহাউসি স্কোয়ারের ভিড় ঠেলে এগোচ্ছিল গোরুর গাড়িটা। রীতিমতো কেতাবি ঢঙে গোরুর লেজ মুড়িয়ে, কখনো-বা হাতের ছিপটি বলদের পিঠে আছড়ে মুখে নানা বিচিত্র শব্দ তুলে যেভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন হিন্দুস্থানি গাড়োয়ান যে কে বলবে— উনি গাড়োয়ান নন। পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগুন সেঁকা বিপ্লবী মুক্তিসংঘ তথা বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের দমদার কর্মী হরিদাস দত্ত।
গোরুর গাড়ির একটু আগেভাগেই দ্রুতপায়ে হাঁটছেন শ্রীশচন্দ্র পাল। আর, গাড়ির একটু তফাতে পিছন থেকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে এগোচ্ছিলেন আর এক ভলান্টিয়ার খগেন দাস। অনেকটা ওই পাইলট কার আর কনভয়ের টেইল কারের মতো। ঠিক যেমনভাবে আজকাল ভি আই পি- দের কনভয় ছোটে রাজপথ দিয়ে। সামনে, পিছনে দু-জনের পকেটে লোডেড রিভলভার। যদি কোনো কারণে পুলিশ পথ আটকায়, তাহলে শ্রীশ সামনে থেকে আর খগেন গুলি চালাবে পিছনে থেকে। আর, গাড়োয়ান হরিদাস কাঠের বাক্স ভেঙে হাতে তুলে নেবে পিস্তল। তিনজনের অগ্নিবর্ষণকারী হাতের মহিমায় এগিয়ে যাবেন নির্দিষ্ট পথে।
পর পর ছুটছিল সাতটা গাড়ি। প্রতিটিতেই ডাঁই করে রাখা কাঠের বাক্স। একটার-পর-একটা। শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা। পাঁচ ও ছয় নম্বর গাড়ির মাঝে হেঁটে যাচ্ছেন হাবু মিত্তির। কলকাতার অস্ত্র ব্যবসায়ী আর বি রডা কোম্পানির কাস্টম সরকার।
ভ্যান্সিটার্ট রো আসতেই প্রথম ছ-টা গোরুর গাড়ি হাবু মিত্তিরের নির্দেশে রাজপথ ছেড়ে আচমকাই ঢুকে গেল ডান দিকে গলির মধ্যে। সাত নম্বর গাড়িটা ছিল অনেকটা পিছনে। দূরত্ব বজায় রেখেই হরিদাস দত্ত গোরুর লেজ মোচড়াচ্ছিলেন। সে-গাড়ি একে একে ম্যাঙ্গো লেন, ব্রিটিশ ইন্ডিয়া স্ট্রিট, বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট নির্বিঘ্নে পেরিয়ে ঢুকে গেল ওয়েলিংটন স্কোয়ারের উত্তর- পশ্চিমের কোণে মলঙ্গা লেনে। নিঃশব্দে ৩৯ নম্বর মলঙ্গা লেনে আত্মোন্নতি সমিতি-র কর্ণধার অনুকূল চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে ঢুকে গেল দশ-দশটা কাঠের বাক্সবন্দি ৫০টা লার্জ সাইজ ৩০০ বোরের মাউজার পিস্তল আর ৭.৬৩ মিমি × ২৫ মিমি মাপের ৪৬০০০ রাউন্ড কার্তুজ। বরাতটা ছিল তিব্বতের বিপ্লবী ধর্মগুরু দলাই লামার।
কলকাতার জাহাজঘাটায় ট্যাকটিয়ান জাহাজে ‘মাল’গুলো পৌঁছেছিল ২৪ অগাস্ট, সোমবার। রডা কোম্পানির কর্ণধার মি. প্রাইক মোটামুটি নিশ্চিন্ত ছিলেন, কোম্পানির কাস্টম সরকার দায়িত্ব নিয়ে সাত-গাড়োয়ানের গোরুর গাড়িতে ঠিক পৌঁছে দেবেন সব মাল ভ্যান্সিটার্ট রোডের গুদামে। নিজেই গুনছিলেন একটার-পর-একটা গাড়ি যে যখন পৌঁছাচ্ছিল। কিন্তু, সাত নম্বরটার টিকিও দেখা যাচ্ছে না তখনও।
—কী হল হাবু মিত্তির? আর একটা গাড়ি কোথায়?
ঠোঁটের কোণে চিপকানো পাইপ থেকে ঘন ঘন ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলেছিলেন মি. প্রাইক।
হাবু মিত্তিরের মুখে নকল চিন্তার ভাঁজ।
—কী আর বলব, সাহেব! হয়তো কোথাও গাঁজা-টাজা টেনে পড়ে ছিল। আমি এক্ষুনি দেখে আসছি। একদম চিন্তা করবেন না। হুঁ-হুঁ বাবা! আমি হচ্ছি হাবু মিত্তির।
বলেই দৌড়। আর ফেরেনি বিপ্লবী অনুকূলচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নিজের হাতে তৈরি ভাবশিষ্য হাবু। অনুকূলবাবুই হাবুর চাকরিটা করে দিয়েছিলেন রডা কোম্পানিতে। মি. প্রাইক কি সেদিন জানতেন, হাবু এত বড়ো বিশ্বাসঘাতক!

রডা অস্ত্র লুণ্ঠনের দুই সংগ্রামী নায়ক— শ্রীশ চন্দ্র মিত্র এবং অনুকূলচন্দ্র মুখার্জী
বিদেশি অস্ত্র লুণ্ঠনের মূল ভাবনাটা ছিল বিপ্লবী নেতা বাঘাযতীনের। যাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল জ্যোতিন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগেই তাঁর ও রাসবিহারী বসুর যৌথ উদ্যোগে ‘হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্র’ পেকে উঠেছিল। সশস্ত্র অভ্যুত্থানের হাতে অস্ত্র ছাড়া ব্রিটিশ উপনিবেশ খতম করা ছিল অসম্ভব। কিন্তু, অস্ত্র কেনার টাকা কোথায়? অতএব, লুঠ করতে হবে। হয় বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবসায়ীর গুদাম, নয়তো জাহাজঘাটা থেকে গুদামের পথে।
রডা কোম্পানির মাল আসছে অনেক— পাহাড়প্রমাণ, সে-খবরটা দিয়েছিল হাবুই। আর, যেহেতু কাস্টমস থেকে সেসব অস্ত্র ছাড়াবেন তিনিই এবং গোরুর গাড়িতে বোঝাই করার তদারকি করবেন নিজেই, সেহেতু একটা গাড়িকে বেহাত করতে পারলেই কাম ফতে! কারণ, অস্ত্রের জোগান তখন নিয়মিত ছিল না। আর, অনির্ভরযোগ্য সংস্থার কাছ থেকে অস্ত্র কেনাও ছিল বিপজ্জনক। ব্রিটিশ পুলিশের শ্যেনদৃষ্টি তখন বিপ্লবীদের ওপর।
রডা কোম্পানির মাল লুঠের পরিকল্পনাটা করেছিলেন মুক্তিসংঘের শ্রীশচন্দ্র পাল। আর, হাবুর খবর মতো মাউজার পিস্তলগুলো ছিল অসাধারণ। একবার ট্রিগার টিপলেই দশ-দশটা বুলেট আগুনের ঝলক নিয়ে ছুটত লক্ষ্যবস্তুর দিকে। অটোমেটিক এই পিস্তলের বক্স ম্যাগাজিনে একাধিক স্ট্রিপ লোড করা যেত। একটা স্ট্রিপ শেষ হলেই আর একটা স্ট্রিপ আপনা থেকেই সঠিক জায়গায় চলে যেত। আর, মাউজার পিস্তলের ব্যারেল লম্বা হওয়ায়, সেগুলোকে রাইফেলের মতোও ব্যবহার করা যেত। মাস্টারমাইন্ড শ্রীশচন্দ্র পাল, অনুকূল মুখার্জী, হরিদাস দত্ত, হাবু মিত্র, খগেন দাস, নরেন ভট্টাচার্য (পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী মানবেন্দ্রনাথ রায়), নরেন ঘোষচৌধুরি, সুরেশ চক্রবর্তী, জগৎ বাবু, বিমান চন্দ্ৰ প্রমুখের উপস্থিতিতে ৪-৩ মলঙ্গা লেনে গিরীন ব্যানার্জীর বাড়িতে (কেউ কেউ বলেন ছাতাওয়ালা গলির পার্কে হয়েছিল মিটিংটা) গোপন বৈঠকে পুরো পরিকল্পনাটা ছকেছিলেন। দিনের আলোয় এতবড়ো অস্ত্র লুণ্ঠন হবে আত্মঘাতী— এই মতামত দিয়ে সভা ছেড়েছিলেন নরেন ভট্টাচার্য ও নরেন ঘোষচৌধুরি। কিন্তু, পরে দ্বিতীয় দফার বৈঠকে ওই পরিকল্পনাতেই অনুমোদন দিলেন বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী, হেমচন্দ্র ঘোষ, জ্যোতিন্দ্রনাথ (বাঘা যতীন)-এর মতো পাকামাথার বিপ্লবীরা। তাঁদের এই কাজে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করেছিলেন আদতে ভাগলপুরের বাসিন্দা বিপিন বিহারী গাঙ্গুলীর মন্ত্রশিষ্য প্রভুদয়াল হিম্মতসিংকা। মার্কাস স্কোয়ারের পশ্চিম দিকের মাড়োয়ারি হোস্টেলে থাকতেন। লুঠের অস্ত্র অনেকটাই লুকিয়ে রেখেছিলেন তিনি শিবঠাকুর লেনের গুদামে এবং শহরের একটা মাড়োয়ারি কোয়ার্টারে। এ ছাড়া কটন স্ট্রিট, চন্দননগর, কলকাতার জেলেপাড়া ইত্যাদি অঞ্চলে বিভিন্ন বাড়িতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মজুত করা হয়েছিল।

বিখ্যাত ব্যবসায়ী প্রভুদয়াল হিম্মতসিংকা যিনি রডা অস্ত্র লুণ্ঠনের ঘটনায় পূর্ণ মদত দিয়েছিলেন
পরবর্তীকালে এই লুণ্ঠিত অস্ত্রেই দুই বছরের কম সময়ে সাতাশজন রাজনৈতিক প্রতিবন্ধককে হত্যা করা হয়। আহত হয়েছিলেন পঁয়তাল্লিশজন। ওইসব অস্ত্র ব্যবহার করেই বিপ্লবীরা ৩,৬৭,৪৮০ টাকার সম্পত্তি লুঠ করেছিল বিভিন্ন অঞ্চল থেকে।
ইতিহাসপ্রসিদ্ধ এই রডা কোম্পানির অস্ত্র লুণ্ঠনকে দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকা “The Greatest Day Light Robbery’ শিরোনামে ভূষিত করেছিল। আর, তাবড় ব্রিটিশ পুলিশপ্রধান চার্লস টেগার্ট মহাবিস্ময়ে বলে উঠেছিলেন— ‘এ তো রীতিমতো পুকুর চুরি!’ একদিকে রাইটার্স বিল্ডিং, অন্যদিকে লালবাজার, অদূরে রাজভবন। সেখান থেকে দিনের আলোয় অস্ত্র লুঠ! চোখ কপালে তুলেছিলেন টেগার্ট। তারপর হুংকার ছেড়েছিলেন— ‘দ্রুত খুঁজে বার করতে হবে অস্ত্রগুলো। Do whatever it takes. I won’t take any excuses this time.’

রডা অস্ত্র লুণ্ঠনের নায়কদের স্মৃতিসৌধ। মধ্য কলকাতায়।
কিন্তু, ততদিনে সব অস্ত্র বণ্টন হয়ে গেছে হিসাব করে।
যতীন মুখার্জির ভাগে পড়েছিল ২৩টা মাউজার পিস্তল, ৪০০০ রাউন্ড কার্তুজ। চন্দননগরের মতিলাল রায়ের দল পেয়েছিল ৯০০০ রাউন্ড গুলি। পাবনায় অবিনাশ রায়কে পাঠানো হয়েছিল ২টো পিস্তল, ৭০০ রাউন্ড গুলি। বরিশালে নরেন ঘোষচৌধুরী পেয়েছিলেন ৫টা পিস্তল আর কিছু কার্তুজ। আলমবাজার আর বরানগরের বিপ্লবীদের ডাকাতির জন্য দেওয়া হয়েছিল একটা পিস্তল, ১০০০ রাউন্ড গুলি। বাকি সব ছিল বিপিনবিহারী গাঙ্গুলির হেফাজতে।
বাকিটা ইতিহাস।
মাসখানেকের মধ্যেই পুলিশ বাংলার আনাচকানাচ খুঁজে উদ্ধার করে ফেলে ৩৩টা পিস্তল এবং ২৬,৭৯৯ রাউন্ড গুলি। গ্রেপ্তার হন সীতানাথ চক্রবর্তী, ফণীন্দ্র চক্রবর্তী, হীরালাল বিশ্বাস, নিরঞ্জন দাস, পতিতপাবন ঘোষ, রাধাচরণ প্রামাণিক, যতীন হুই, অন্নদাপ্রসাদ চৌধুরি, সত্যেন্দ্ৰ সেন, বিজয় মিত্র, রাধিকা গাঙ্গুলি, নরেন্দ্র মোহন ঘোষচৌধুরি, দেবেন্দ্র চৌধুরি, সুধীর সোম, যুগলকিশোর দত্ত, অন্নদাচরণ চক্রবর্তী, সীতানাথ চক্রবর্তী, তিনকড়ি ব্যানার্জি, দুকড়িবালা দেবী (ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতবর্ষে ইনিই ছিলেন প্রথম অস্ত্র আইনে দণ্ডিতা নারী) প্রমুখ।
তবে, এই হাজারো ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি হল, বালাসোরের চষাখণ্ডে বিপ্লবী বাঘাযতীনের নেতৃত্বে লুণ্ঠনের অস্ত্র নিয়ে ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনা। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেন চিত্তপ্রিয় রায়। গুরুতর জখম বাঘাযতীন পরদিন হাসপাতালে মারা যান। ফাঁসি হয় দু-জনের— নীরেন ও মনোরঞ্জনের। আর, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন যতীন পাল। তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হয় আন্দামানে।
.
কিন্তু, গ্রেপ্তারির তালিকায় হাবু মিত্তির তো কোথাও নেই! রডা অস্ত্র লুণ্ঠনের ঐতিহাসিক ঘটনায় হাবু মিত্তিরের নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা আর এক ইতিহাস। শুধু ইতিহাসই নয়, রীতিমতো জমজমাট থ্রিলার।
১৬ অগাস্ট দিনেদুপুরে লুঠ হল অস্ত্র। আর, সেদিনই বিকেলে শ্রীশ পাল হাবু মিত্তিরকে বগলদাবা করে উঠে পড়লেন দার্জিলিং মেলে। দু-জনের কোমরে দুটো মাউজার পিস্তল আর শার্টের পকেটে কিছু বুলেট। তারপর সোজা রংপুর (বর্তমানে বাংলাদেশের একটি জেলা)। সেখানে গিয়ে উঠলেন নাগেশ্বরী গ্রামের ডাক্তার এবং মুক্তিসংঘের আঞ্চলিক প্রধান ডা. সুরেন্দ্র বর্ধনের বাড়িতে। সেদিন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি হচ্ছে। সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। এতে হাবু মিত্তিরদের সুবিধাই হয়েছিল পুলিশের শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়া। হাবু মিত্তির সেখানে সুরেন্দ্র বর্ধনের মাসতুতো ভাই সুধীর মিত্র হিসেবেই বাস করতে শুরু করলেন। সুরেন্দ্রবাবু তাকে বাড়ির বাইরে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু, তরুণ মন। তাঁকে কি ঘরের বাঁধনে আটকে রাখা যায়! স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করলেন। বেশ স্মার্ট। গ্রামের লোকের মতো নয়। ফলে, পুলিশের নজরে পড়লেন।
একদিন নাগেশ্বরী থানার সহকারী দারোগা সুরেন্দ্রবাবুকে গোপনে জানিয়ে গেলেন, কলকাতা থেকে ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের ইনস্পেকটররা আসছেন। তাঁর বাড়িতে রেইড হতে পারে। সুরেন্দ্রবাবু চটজলদি অনুগত কর্মী যামিনী দত্ত আর নীলকমল দাস বৈরাগীর সঙ্গে হাবুকে পাঠালেন আসাম সীমান্তে মিত্রগোষ্ঠী রাভা উপজাতিদের কাছে।
হাবু পালালেন। আর, পরদিনই এল আই বি। চাপ সৃষ্টি করলেও সুরেন্দ্রবাবুর পেট থেকে কিছুই না পেয়ে হতাশ আই বি ফিরে গেল কলকাতায়।
এরপর থেকেই হাবু মিত্তিরের অস্তিত্ব নিয়ে গড়ে ওঠে নানা রহস্য। একদল বলেন, আসাম থেকে হাবু মিত্তির ফিরে এসেছিলেন চন্দননগরে। কিন্তু, তাঁর সমকালীন সহযোদ্ধারা এই তথ্যের কোনো প্রমাণ পাননি। শোনা গিয়েছিল তিনি রয়েছেন পণ্ডিচেরিতে অরবিন্দ আশ্রমে। কিন্তু, সেরকম কোনো তথ্য আশ্রম সূত্রে পাওয়া যায়নি। ডাক্তার বর্ধন পরে রাভা উপজাতির কাছে খোঁজ নেন। তারা বলেছিল, হাবু রাভাদের মোষ তাড়ানোর কাজ করতেন। সেই সময়েই এক দুঃসাহসিক যুবকের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। বরাবরের অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় এই আবেগী বিপ্লবী যুবক সম্ভবত ওই যুবকের সাহায্য নিয়ে পার্বত্যপথে নর্থ ইস্ট ফ্রন্টিয়ারের তুষার পেরিয়ে চীন দেশে যেতে চেয়েছিলেন। কারণ, তিনি নাকি প্রায়শই চীনের কথা, চীন বিপ্লবের কথা, চীনের কমিউনিস্ট নেতা মাও জে দঙের কথা বলতেন। হয়তো তখনই কোনো দুর্ঘটনায় কিংবা কোনো বন্যপ্রাণীর আক্রমণে অথবা সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে তিনি প্রাণ হারান। তবে, এ তথ্যও অনুমিত।
ফলত, হাবু মিত্তিরের সেই ডালহাউসি স্কোয়ারে সাত গাড়োয়ানের কনভয়ে লুণ্ঠিত অস্ত্রসম্ভার নিয়ে দিনের আলোয় হেঁটে চলার জলছবিটাই বেঁচে রইল আবর্তমান। অথবা, জেগে রইলেন জীবিত হয়ে বাঙালির মণিকোঠায়।
.
পাঠকের মনে হতে পারে, ‘৪৬-এর দাঙ্গার কথকতা শোনাতে গিয়ে মলঙ্গা লেনের এ কাহিনি কেন?
সেটাই স্বাভাবিক। কারণ, ১৯১৪ সালের এই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বত্রিশ বছরের পরের কলকাতা দাঙ্গার মিল খুঁজে পাবেন না অনেকেই। যদিও ইতিহাস যাঁরা ঘাঁটাঘাঁটি করেন, তাঁরা জানেন, ‘৪৬-এর দাঙ্গায় বত্রিশ বছর আগেকার সেই মলঙ্গা লেন, সেই বউবাজার, সেই ফিয়ার্স লেন, সেই অনুকূল মুখার্জির যোগাযোগ বড়ো নিবিড়। সেই মলঙ্গা লেনের কাহিনি এড়িয়ে গেলে অসমাপ্ত থেকে যাবে ১৯৪৬-এর কলকাতা দাঙ্গার ইতিহাস। এমনকী একবছর বাদে বঙ্গভাগ, দেশভাগের ইতিহাসও থেকে যাবে অপূর্ণ।
.
মলঙ্গা লেনকে লক্ষ করে প্রায় দৌড়োচ্ছে গোপাল। বয়স বছর বত্রিশ। মাথার বড়োচুল ঝুঁটি বাঁধা। মধ্যকপালে সিঁদুরের লাল টকটকে তিলক। হাতে খোলা তরোয়াল। গোপাল মুখার্জি। বউবাজারে পাঁঠার মাংসের দোকান। দোকানে পূজিত মা কালীর মূর্তির সামনেই ঝটকা পদ্ধতিতে প্রতিদিন পাঁঠা কাটেন গোপাল। তাঁর দোকানে লেখা বিখ্যাত বাঙালি পাঁঠার মাংসের দোকান। সেই থেকেই গোপালেরও এলাকায় নাম দাঁড়িয়েছিল ‘গোপাল পাঁঠা’ হিসেবে।
৩২/১, মলঙ্গা লেনে নিজের বাড়ির সামনে পৌঁছে দেখলেন বাড়ির মূল দরজার সামনে মুসলমানরা শুকনো কাঠ, গাছের শুকনো ডাল, শুকনো ঘাস ইত্যাদি জড়ো করছে আগুন লাগাবে বলে। একবার আগুন লাগলে বাড়ি থেকে আর কেউ বেরোতে পারবে না। সব পুড়ে মরবে। তখনই রাস্তার উলটোদিকে নজর পড়ল। পানের দোকান ভাঙছে একজন মুসলমান। দোকানটা একজন হিন্দুর। গোপাল একমুহূর্ত দেরি করলেন না। ঝাঁপিয়ে পড়ে দু-টুকরো করে দিলেন হামলাকারীকে। তারপর তড়িঘড়ি নিজের বাড়ির সামনে থেকে ঠেলে সরালেন জঞ্জাল। কয়েক জন মুসলমান যুবক এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখছিল গোপালকে। দলের একজনকে মরতে দেখে একজন তরোয়াল নিয়ে এগিয়ে এল গোপালের মাথা লক্ষ করে। কিন্তু, রীতিমতো ব্যায়াম করা পেটাই শরীরে পালটা তরোয়াল চালাতেই আক্রমণকারী পিছু হটল। গোপালের দু-চোখ দিয়ে তখন আগুন ঝরছে আর মুখ দিয়ে হুংকার— ‘এগিয়ে আয়! এগিয়ে আয় দেখি কত রক্ত আছে তোর শরীরে!” পালটা আক্রমণে তরোয়াল গিয়ে লাগল লাইটপোস্টে। আর, সঙ্গেসঙ্গে তরোয়াল দু-খান। ত্বরিৎগতিতে সামনেই পড়ে থাকা একটা লোহার রড হাতে তুলে নিলেন গোপাল। সম্ভবত ওই আক্রমণকারীদেরই রড। তারপর লাঠিখেলায় পটু গোপালের হাতে লোহার রড ঘুরতে শুরু করল চরকির মতো। গোপাল এগোয়। মুসলমানরা পিছোয়। তারা বুঝে গেছে গোপালের ওই চরকি-রড মাথায় লাগলে খুলিসুদ্ধ উড়িয়ে দেবে। অগত্যা, পৈতৃক প্রাণ হাতে নিয়ে হামলাবাজরা পগার পার। বাড়িতে ঢুকলেন গোপাল। নিজে বিয়ে করেননি। পরিবারের অন্য সদস্যদের নিষেধ করলেন, ‘কেউ বাইরে বেরোবে না।’
একটু আগেই সকালে বলির মাংস সাজিয়ে দোকান খুলে বসেছিলেন গোপাল। আগেই খবর পেয়েছিলেন, ১৬ অগাস্ট গণ্ডগোল হতে পারে। মুসলমানরাই খবর দিয়েছিল। কারণ, গোপালের দোকান থেকে কাটা পাঁঠার ছাল, নাড়িভুঁড়ি ইত্যাদি প্রতিদিনই কম দামে কিনে নিয়ে যায় মুসলমানরা। তারাই খবর দিচ্ছিল। টুকরো টুকরো শহরের নানা প্রান্তে মসজিদে মসজিদে অস্ত্রসম্ভার জড়ো করা হচ্ছে। পাকিস্তানের দাবিতে এবার গোটা কলকাতায় হাঙ্গামা বাধাবে মুসলিম লিগ। ওদের সঙ্গে নাকি কমিউনিস্টরাও আছে। এইসব।

‘৪৬-এর দাঙ্গায় হিন্দুদের পরিত্রাতা বলে খ্যাত গোপাল মুখার্জী ওরফে গোপাল পাঁঠা
স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিপ্লবী এবং রডা কোম্পানির অস্ত্রলুণ্ঠনের অন্যতম মস্তিষ্ক অনুকূলচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভাগনা গোপাল এসব যত শোনেন, ততই শরীরের রক্ত গরম হয়ে উঠছিল। বুঝতে পারছিলেন, এবার একটা রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হবে। তাই আগে থেকেই সতর্ক হতে শুরু করেছিলেন গোপাল।
কলকাতা শহরের সাহেবপাড়ায় বসবাস কিছু আমেরিকান সৈনিকদের। ১৯৪২-এর আন্দোলনের সময় এবং বিশ্বযুদ্ধের সময় এসেছিলেন তাঁরা। এঁদের কিছু ঘাঁটি ছিল। গোপাল মাঝে মাঝে সন্ধ্যার পর ওখানে যেতেন দু-একজন সঙ্গীকে নিয়ে। ওই সঙ্গীদের হাতে থাকত দু-তিনটে বড়ো বড়ো বাক্স। প্রায়ান্ধকার ঘাঁটিগুলিতে গোপালকে দেখেই দু-একজন আমেরিকান সৈন্য এগিয়ে আসতেন। তাঁদের হাতেও দু-তিনটে বড়ো বড়ো বাক্স। এবার নিরাপদ দূরত্বে বাক্সগুলির হাতবদল হত। টর্চের আলোয় সৈন্যরা বুঝে নিত হুইস্কির বোতল। আর, গোপাল বুঝে নিতেন বাক্স বোঝাই ফোর পয়েন্ট ফাইভ পিস্তল। এগুলোর দাম মেটানোই থাকত। তারপরেও কিছু টাকা গুঁজে দিতেন সৈনিকদের হাতে। অ্যাডভান্স হিসেবে যাতে পরেরবার এলে খালি হাতে ফিরে যেতে না হয়। জলের দরে মার্কিনি অস্ত্রগুলো এসে যেত গোপালের জিম্মায়। এটা শুধু গোপালই করতেন এমন নয়, ভারতবর্ষ স্বাধীনতা পেতে চলেছে এবং সে-স্বাধীনতা হবে বিভাজিত, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হবে ভারতবর্ষের বিভাজিত অংশ মুসলমানি পাকিস্তান— এটা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। শুধু ভারতবর্ষই নয়, বিভাজিত হবে বঙ্গপ্রদেশও। মুসলমানরা যাবে পূর্ব পাকিস্তানে। হিন্দুরা ফিরে আসবে ভারতবর্ষে— এটাও প্রায় নিশ্চিত হয়ে উঠছিল। এমতাবস্থায় যে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতা চরমভাবে মাথাচাড়া দেবে রাজনৈতিক উসকানিতে সেটা সচেতন বাঙালি বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারছিল। তাই অনেকেই আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়াও বাড়িতে তরোয়াল, টাঙি, বল্লম, ছুরি, ভোজালি, লোহার রড ইত্যাদি সংগ্রহ করে রাখছিল অন্তত আত্মরক্ষার অস্ত্র হিসেবে। গোপালও সেটাই করছিলেন। ১৯১৪ সালের রডা কোম্পানির অস্ত্র লুঠের ঘটনা বড়ো হয়ে শুনেছিলেন গোপাল। ১৯৪৬-এও সেই ঘটনাই অনুপ্রাণিত করেছিল গোপালকে।

মধ্য কলকাতার বউবাজারে গোপাল মুখার্জীর সেই বিখ্যাত বাঙালি পাঁঠার মাংসের দোকান
.
২৯ জুলাই কমিউনিস্টরা ধর্মঘট ডেকেছিল। সে-ধর্মঘট সফল হয়েছিল এক-শো শতাংশ। তারপর থেকেই মুসলমানদের নানারকম খবর কানে আসতে থাকে। নেতাদের বিবৃতিও বেরোচ্ছিল দৈনিক সংবাদপত্রগুলিতে। সেসব বিবৃতি যথেষ্ট উত্তেজক।
গোপাল নিজে মুসলিম বিরোধী ছিলেন না। কিন্তু, সেইরকম সময়ে গোপালের মনে হচ্ছিল, মুসলিম লিগ নেতারা হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়কে চূড়ান্ত পর্যায়ে সাম্প্রদায়িকতার বলি করতে চাইছে।
১৬ অগাস্ট সকালে দোকান খুলে বসার পরই গোপাল দেখলেন, তাঁর দোকানের সামনে দিয়ে বেশ কিছু মুসলিম যুবক মুসলিম লিগের পতাকা হাতে নিয়ে মার্চ করতে করতে এগোচ্ছে। প্রত্যেকের হাতে বড়ো বড়ো লাঠি। শহরের সর্বত্র নানা কানাঘুসো। তারই মধ্যে শোনা গেল, মুসলমানরা দু-জন বিহারি হিন্দু গোয়ালাকে টাঙির আঘাতে দু-ফালা করে দিয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় মুসলমানরা বেরিয়ে পড়েছে শহরের আনাচেকানাচে। শহর ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
গোপাল কখনো মুসলমান বিদ্বেষী ছিলেন না। যদিও হিন্দু হিসেবে গভীর ভক্তিতে প্রতিদিন পুজো করতেন কালিকা মাতাকে। তিনি মার্চ করতে যাওয়া দু-একজন মুসলমান যুবককে ডাকলেন। বললেন, “শোনো, এই এলাকায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কোনো ঝগড়া নেই। সবাই ভাই ভাইয়ের মতো করে শান্তিতে বাস করে। তোমরা যেন লুঠ বা খুনখারাবি কোরো না।’
ছেলেগুলো কথাগুলোকে পাত্তাই দিল না। গোপাল একটু অবাক হলেন। এলাকার কোনো মুসলমানই তো তাঁকে কোনোদিন অপমান করে না। তাহলে এইসব ছেলেগুলো কি অন্য জায়গার!
গোপালের একটি সংগঠন ছিল। নাম ‘ভারতের জাতীয় বাহিনী’। মূলত সমাজসেবী এই ক্লাব মড়া পোড়ানো, অসুস্থ অসহায়দের হাসপাতালে ভরতি করা, এলাকার মানুষের সবরকম বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোর সেবা দিত। তা ছাড়া, জাতীয় বাহিনীর মূলমন্ত্র ছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্রর সংগ্রামী আদর্শ। সেই দেশপ্রেমের আদর্শকে স্মরণ করেই নানা অনুষ্ঠানের আয়োজনও করত জাতীয় বাহিনী। তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য শরীরচর্চার ব্যবস্থাও রেখেছিলেন গোপাল। নিজেও রোজ কুস্তি, লাঠিখেলা, ব্যায়াম করতেন। অন্যদেরও শেখাতেন। সাম্প্রদায়িকতা তাঁর জীবনকে পরিচালনা করত না। জাতীয়তাবাদই ছিল তাঁর জীবনের মূল পরিচালন শক্তি।
মুসলমান ছেলেগুলোর আচরণ দেখে প্রমাদ গুনলেন গোপাল। কারণ, ক-দিন আগেই বয়োবৃদ্ধ হরেন ঘোষের কাছ থেকে একটা মারাত্মক খবর পেয়েছিলেন গোপাল— মুসলমানরা হাওড়া ব্রিজ (বর্তমানে রবীন্দ্র সেতু) উড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা করছে।
কংগ্রেস নেতা হরেনবাবু থাকতেন গোপালের পাড়ারই মদন বড়াল লেনে। বাংলার সংস্কৃতি জগতের পরিচিত মানুষ। তাঁর অফিস ছিল ধর্মতলা স্ট্রিটের ওয়াছেল মোল্লা ম্যানসনে। সেসময় ওয়াছেল মোল্লার বিশাল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ছিল কলকাতার গর্ব। ওই বাড়িতেই ভাড়া থাকতেন এক বাইজি। কলকাতায় তখনও বাইজি-সংস্কৃতি বজায় ছিল অনেকটাই। বিশেষ করে বউবাজার অঞ্চলে। ওয়াছেল মোল্লা ভবনে ওই বাইজির বাড়িতে ঘন ঘন যাতায়াত ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ বাংলার প্রধানমন্ত্রী (তখন মুখ্যমন্ত্রী বলা হত না) সুরাবর্দি সাহেবের। সঙ্গে যেত মুসলিম লিগের অন্য কর্মকর্তারাও। একদিন ওই বাইজির ঘরেই তাকিয়ায় হেলান দিয়ে মদ্যপান করতে করতে নিজেদের মধ্যে জোরদার কীসব পরিকল্পনা হচ্ছিল আর তা লেখা হচ্ছিল টুকরো টুকরো কাগজে। মাঝরাতে সবাই যখন নেশায় টং তখন বাড়ি ফেরার তাড়ায় আর কাগজগুলো নিতে পারেননি ষড়যন্ত্রকারীরা। নিরক্ষর বাইজির একটু সন্দেহ হয়েছিল কথাবার্তা শুনে। সেই কাগজগুলো সযত্নে সাজিয়ে পরদিন নিয়ে যায় হরেন ঘোষের কাছে কী লেখা আছে জানতে।
হরেন ঘোষ কাগজগুলোয় চোখ বোলাতেই বিস্ময়ে চোখ কপালে। কিন্তু, বাইজির সামনে কিছু বললেন না।
‘ওসব বাজে কাগজ,’ বলে বাইজির সামনেই কাগজগুলো ওয়েস্ট পেপার বিনে ফেলে দিলেন। বাইজিও তা মেনে নিয়েই চলে গেলেন নিজের ঘরে।
আর হরেন ঘোষ সবক-টা কাগজ গুছিয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি ছুটলেন গোপালের দোকানে।
—দেখো তো গোপাল কাগজগুলো।
গোপাল দোকান ছেড়ে হরেন ঘোষের সঙ্গে একটু সরে গিয়ে দেখেন— কাগজে লেখা আছে, ‘গঙ্গার ওপারে হিন্দুস্থান আর এপারের পশ্চিমবঙ্গ পাকিস্তান। ডিনামাইট দিয়ে হাওড়া ব্রিজ ওড়াব আমরা।’ চমকে উঠলেন গোপাল।
—হরেনদা, এ তো মারাত্মক পরিকল্পনা!
—সাংঘাতিক। আমি এখুনি জওহরলাল নেহরুকে চিঠি দিয়ে সব জানাচ্ছি। গোপাল একটু সন্ত্রস্ত। বললেন,
—হরেনদা, আপনি এখন বাড়ি চলে যান। আর, আগামী কয়েক দিন ওয়াছেল মোল্লা ভবনে যাবেন না। আপনার জন্য আমার চিন্তা হচ্ছে।
গোপালকে আশ্বস্ত করলেন হরেন ঘোষ,
—আরে, না না। ওসব ভয় কোরো না। আমার কীসের ভয়?

বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতির বিখ্যাত পৃষ্ঠপোষক হরেন ঘোষ। দাঙ্গার সময় দাঙ্গাবাজরা এঁকে খুন করে টুকরো টুকরো করে কলকাতার রাস্তায় ছড়িয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু, গোপালের আশঙ্কাকেই সত্যি প্রমাণ করে মুসলিম লিগের দুই পোষা গুন্ডা মুন্না পেশোয়ারি আর বোথাইয়া ওয়াছেল মোল্লা ভবনের অফিস ঘরেই হরেন ঘোষকে কুপিয়ে খুন করেছিল। তার মানে, নিশ্চয়ই ওই বাইজিই সুরাবর্দিকে বলেছিল যে, সে কাগজগুলো হরেন ঘোষকে দিয়েছিল।
হরেন ঘোষের থেকে যেদিন ওই ষড়যন্ত্রের কথা জেনেছিলেন গোপাল সেদিনই জাতীয় বাহিনীতে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ঘনিষ্ঠ কয়েক জন সদস্যকে জানিয়েছিলেন,
—শিয়রে শমন। আমাদের এবার তৈরি হবার সময় এসে গেছে। আর দেরি করা যাবে না। সামনেই স্বাধীনতার হাতছানি। ওরা পাকিস্তান নেবেই। আর, শেষ কামড় দেবে গোটা বাংলাকে ছিনিয়ে নিতে। তার আগে ওরা মারণঘাতী আঘাত হেনে পশ্চিমবাংলার হিন্দুদের দুর্বল করে দেবার চেষ্টা করবে। খুন করবে। জখম করবে। ধর্ষণ করবে। গোটা কলকাতায় আগুন লাগাবে। আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে।
সবাইকে নির্দেশ দিয়েছিলেন— পাড়ায় পাড়ায় অস্ত্র মজুত করো। তরুণ ও যুবকদের সংঘবদ্ধ হতে বলো। সবার হাতে অন্তত যেন একটা করে মজবুত লাঠি বা বাঁশ থাকে। ওরা সংখ্যাগুরু। মুখোমুখি লড়াই জিততে না পারি, প্রতিরোধ করতে হবে। আর, চোরাগোপ্তা আক্রমণে শেষ করতে হবে ওদের।
গোপালের নির্দেশে পরদিন থেকেই গোপনে প্রচার শুরু হয়ে গিয়েছিল পাড়ায় পাড়ায়, যাতে কেউ নিরস্ত্র না থাকে। হাতে অস্ত্র থাকলে প্রতিরোধের সাহস বাড়ে।
মুসলিম লিগের সেই প্রাণঘাতী আক্রমণকে কেমন করে রুখেছিল কলকাতা, হাওড়া এবং শহরতলির হিন্দুরা, সে এক গোটা শরীরে শিহরন তোলা কাহিনি। সে-কাহিনিতে আসব। কিন্তু তার আগে দেখে নেব, ৪৬- এর দাঙ্গার পটভূমি কী ছিল? কেমন ছিল?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন