মার্ডার রেপ লুঠ দিনভর

সুজিত রায়

মার্ডার রেপ লুট দিনভর

দাঙ্গা যাদের ধর্ম তারা আমার পক্ষ নয়…
দাঙ্গা যাদের ধর্ম তারা আমার বন্ধু নয়…
দাঙ্গা যাদের ধর্ম তারা আমার সঙ্গী নয়…
দাঙ্গা যাদের ধর্ম তারা আমার পড়শি নয়…

—কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়

.

‘Although economically more backward in comparison to their other coregionalists, the Bengal Muslims were among the first to be organised politically to voice their rights as Muslims, Bengal had one of the worst records of Hindu- Muslim conflict; Bengal was the only state where the Muslim League managed to form relatively stable ministries… An examination of communal riots in Bengal can thus make a significant contribution to our understanding of the evolution and growth of communalism in India.’

—prof. Suranjan Das in Communal Riots in Bengal 1905-1947 pub. Oxford India paperback 2022

.

দাঙ্গার নৃশংসতার একটুকরো ছবি মার্গারেট ব্যুরকে হোয়াইটের ক্যামেরায়

দাঙ্গার নৃশংসতার একটুকরো ছবি মার্গারেট ব্যুরকে হোয়াইটের ক্যামেরায়

১৭ অগাস্ট, ১৯৪৬।

কলকাতা জেগেছে সারারাত।

আতঙ্কের রাত! ওই বুঝি এল ওরা নখ যাদের তীক্ষ্ণ নেকড়ের চেয়ে। ওই বুঝি এল মানুষ মারার দল।

সারারাত দু-চোখের পাতা এক করতে পারেনি হিন্দু নারী-পুরুষ। কচিকাঁচা ছেলেপুলে আর বৃদ্ধ বাবা-মায়েদের আগলে রেখেছিল ঘরবন্দি গৃহবধূরা। আর, পুরুষরা তৈরি ছিল অস্ত্রশস্ত্র, নিদেনপক্ষে একটা লাঠি হাতে, যবনেরা হামলা করলে যাতে সহজে রেহাই না পায়। পাড়ায় পাড়ায় হিন্দুদের ছোটো ছোটো জটলা ছিল রাত-পাহারায়। পরের দিনের আক্রমণ রোখার জন্য সেই ছোটোখাটো সংগঠিত প্রচেষ্টা যে খুব জোরদার প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো শক্তি ছিল, তা নয়। কিন্তু হিন্দুরা বুঝেছিল, ছোবল মারতে না পারা যাক, ফোঁস করা দরকার। আগের দিন সেই ছোটোখাটো প্রচেষ্টা কিছুটা কাজ দিলেও সাংগাঠনিক অভাবে মুসলমানদের আক্রমণ একতরফাভাবেই আছড়ে পড়েছিল দিনভর।

রাধাবাজার, লালবাজার, টেরিটিবাজার, ওয়েলিংটন স্কোয়ারে একতরফা আক্রমণ চালিয়েছিল চাঁদনি চকের মুসলমান পরিবারগুলি। হিন্দু দেখলেই চেনা হোক বা অপরিচিত হোক— ঝাঁপিয়ে পড়েছে দাঙ্গাবাজরা। ধর্মতলা স্ট্রিটে সি সি সাহার গ্রামোফোনের দোকান যেমন আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি, তেমনি ওয়েলিংটন স্কোয়ারের পরিচিত চানাচুরওয়ালাও মুসলমান দাঙ্গাবাজদের আক্রমণ, লুঠপাট থেকে বাঁচতে পারেনি।

দক্ষিণ কলকাতায় সবচেয়ে বড়ো হাঙ্গামা হয় ভবানীপুরে জগুবাবুর বাজারে। মূলত হিন্দু এলাকা ভবানীপুরে দেবেন্দ্র ঘোষ রোডে একটি মসজিদ থেকে জোগান দেওয়া হয়েছিল অস্ত্রশস্ত্র। স্থানীয় কিছু হিন্দু যুবক মুসলমান যুবকদের জটলাকে চ্যালেঞ্জ করার সঙ্গেসঙ্গেই মসজিদের ভেতর থেকে কয়েক জন মুসলমান যুবক ছোরা হাতে বেরিয়ে আসে তৎক্ষণাৎ। এক যুবকের হাতের বন্দুক গর্জে ওঠে। তারপরেই আক্রান্ত হয় আশপাশের বহু এলাকা। কিন্তু, হিন্দু যুবকরাও পিছু হঠেনি। দেবেন্দ্র ঘোষ রোড, শশিশেখর বসু স্ট্রিট, গোবিন্দ বোস লেনসহ কয়েকটি এলাকার মুসলমান বস্তিগুলিতে পালটা হামলা চালায় হিন্দু যুবকরা। এমনকী তাদের আক্রমণ আছড়ে পড়ে প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক কুদরত-ই-খোদার বাড়িতেও। হিন্দু যুবকদের লক্ষ করে যে যুবকটি বন্দুক চালিয়েছিল, সেই ছেলেটির দাদা ড. জামাল হিন্দু আক্রমণ থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিয়েছিলেন হিন্দু মহাসভার নেতা নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে। পরের দিন তিনি রাস্তায় বেরোতেই তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করে হিন্দু যুবকরা। হত্যার শিকার হন ড. আহমেদ নামে এক মুসলিম দত্ত-চিকিৎসকও।

ভবানীপুর অঞ্চলে হিন্দু প্রতিরোধের কথা ছড়িয়ে পড়ে বালিগঞ্জ এলাকায়। ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, পালটা মারমুখী হয়ে ওঠে নৃশংস খুনি বাহিনী। বালিগঞ্জের পাড়ায় পাড়ায় হিন্দু দোকানপাট লুঠ করা শুরু হয়ে যায়। ধারালো ছুরিতে মারাত্মকভাবে আহত হন একজন মুদি। হিন্দু পরিবার পাঠক বাড়িতে মুহুর্মুহু বোমা পড়ে। সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসার পর বড়ো বড়ো মশাল হাতে বেরিয়ে পড়ে দাঙ্গাবাজরা। পদ্মপুকুর এলাকা কেঁপে ওঠে আল্লা-হু-আকবর ধ্বনিতে। শতকণ্ঠের সেই ভয়াবহ ধ্বনির প্রভাব ছিল মৃত্যুদূতের মতো ভয়ংকর।

ওদিকে মধ্য কলকাতাতেও বড়ো মাপের আক্রমণ হয় বিকেলের দিকে। মুসলমানরা হিন্দুদের দোকানে আগুন লাগিয়ে দেয়। এলাকার একটি হিন্দু পরিবারে বন্দুক ছিল। বাড়ির ছাদ থেকে গুলি করলে পিছু হটে মুসলমানরা। এই ঘটনা হিন্দু যুবকদের কিছুটা সাহস জোগায়। তারাও সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের ‘আল্লা-হু-আকবর’ ধ্বনির পালটা আওয়াজ তোলে ‘বন্দেমাতরম’। বাড়ি বাড়ি থেকে নারীরাও গলা মেলান সেই ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনিতে। পালিয়ে যায় মুসলমানরা।

অবাধে লুঠপাট হিন্দু মহল্লায়। ছবি সৌজন্য : ‘লাইফ’ পত্রিকা

একইভাবে কংগ্রেস নেতা বিজয় সিং নাহার নিজে ওইদিনেই স্থানীয় হিন্দু যুবকদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনী। নিজে হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়ান উন্মত্ত মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি।

তৎকালীন গভর্নর ফ্রেডারিক জন বারোজ তাঁর রিপোর্টে লিখেছিলেন—

Communal trouble started as early as at 7 a.m. in Maniktala in north-east Calcutta and has continued and spread throughout the day. Situation upto 6 p.m. is that there have been numerous and widespread communal clashes in Calcutta.

সরকারিভাবে ১৬ অগাস্টেই মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়েছিল ১০০। যদিও অমৃতবাজার পত্রিকা-র রিপোর্টে বলা হয়েছিল— দাঙ্গার প্রথম দিনেই হত্যার শিকার হয়েছিল ১৬১ জন। হিন্দুর সংখ্যাই ছিল বেশি। দু-চারজন মুসলমান।

দাঙ্গা চলেছিল সন্ধ্যা ৭টা-৭.৩০টা পর্যন্ত। কপাল ভালো কলকাতার। রাত ৮টা নাগাদ কলকাতায় মুষলধারে নামে শ্রাবণের বারিধারা। সব আগুন নিভে যায়। সব রক্ত ধুয়ে যায়। শুধু থেকে গিয়েছিল পরদিনের কালান্তক ঘটনাবলির অপেক্ষা

দাঙ্গার দ্বিতীয় দিন এবং তারপর…

১৭ অগাস্ট থেকে আক্রমণ এবং প্রতি-আক্রমণের ধার যে বাড়বে শতগুণ, তা নিয়ে সন্দেহ ছিল না কারোরই। কারণ, দাঙ্গার প্রথম দিন ১৬ অগাস্ট যে প্রতি-আক্রমণ ছিল নিতান্তই বিক্ষিপ্ত ঘটনাবলি, পরদিন থেকে যে তা অনেক বেশি সুসংহত ভূমিকা নেবে তার আঁচ মুসলমানরাও পেয়ে গিয়েছিল আগের দিনই। এমনকী রাজ্যের বিভিন্ন জেলা প্রশাসন থেকেও সেরকম আশঙ্কাই প্রকাশ করা হয়েছিল আর আক্রমণ একতরফা হবে না। আক্রমণ হবে দ্বিমুখী। আল্লা-হু-আকবরের মোকাবিলা করবে বন্দেমাতরম ধ্বনি। ফলে, সংঘর্ষ বাড়বে। সংঘর্ষ তীব্র হবে। অস্ত্রের আমদানি বাড়বে চোরাপথে। মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে। বাড়বে আহতর সংখ্যাও।

ঠিক সেটাই হল। শুধু ১৭ অগাস্টেই নয়, ১৮ অগাস্টেও তার জের রইল একইরকম।

১৭ অগাস্ট প্রথম আক্রমণের খবর এল মেটিয়াবুরুজের বিচালিঘাট থেকে। আগের দিন সর্বত্র বিক্ষিপ্ত গণ্ডগোল হলেও মেটিয়াবুরুজ-গার্ডেনরিচ এলাকা বেশ শান্তই ছিল। কিন্তু, মুসলমান-হিন্দু দাঙ্গায় মুসলমানদের গড় মেটিয়াবুরুজ হাতে শান্তির কপোত নিয়ে বসে থাকবে, এটা আশা করাও তো অন্যায়।

ফলত, ১৭ অগাস্টের সকালেই খবর এল, বিচালিঘাটে খড় বোঝাই ১৫টি নৌকায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুড়িয়ে মারা হয়েছে মাঝিদের। মাঝিরা সকলেই ছিল হিন্দু।

উল্টোডাঙায় খালপাড়ের পূর্বদিকের বস্তি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করে দেওয়া হয়। আগুনের প্রকোপ থেকে বাঁচতে নারী ও শিশুরা বেরিয়ে এলেই তাদের টাঙি আর তলোয়ারের আঘাতে কচুকাটা করে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয় খালের ধারে। এই বস্তিটি ছিল মূলত হিন্দু-অধ্যুষিত। তবে, বেশিটাই অবাঙালি হিন্দু। ব্রিজের অপরপারে রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিটের দুটি বাড়ি— ১১ নম্বর এবং ২৫ নম্বর পুরোপুরি ভাঙচুর লুঠতরাজ চালিয়ে তারপর আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। দুটি বাড়ির মালিকই ছিলেন হিন্দু। মুসলমান আক্রমণকারীদের সংখ্যা ছিল কমপক্ষে ২০০০।

বিবেকানন্দ রোডে সুভাষ রায়ের বাড়ি আক্রমণ করে ৩০০ মুসলমান দাঙ্গাবাজ। আগুন দেওয়া হয় উল্টোডাঙা রোডের এন কে মল্লিকের বাড়িতে। দাসপাড়া, উজির চৌধুরি রোডে একের-পর-এক একই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকে। আক্রমণ এবং অগ্নিসংযোগ। দুপুরের পর মানিকতলা মেন রোড, আপার সার্কুলার রোড, কংক্রিট ব্রিজ সংলগ্ন অঞ্চলে একটি হিন্দু দোকানও আগুনের হাত থেকে রেহাই পায়নি। কাপড়ের দোকান, মুদিখানা থেকে সাবানের কারখানা— সব পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। এমনকী বিবেকানন্দ রোডের ২৬০ নম্বর বাড়ির নীচে একটি কেরোসিনের দোকান থেকে প্রথমে কেরোসিন বোঝাই ড্রামগুলি লুঠ করে নেওয়া হয়। তারপর সেই তেলেই পুড়িয়ে দেওয়া হয় দোকানটি। মানিকতলা, উল্টোডাঙা, বাগমারি এলাকার দুর্বৃত্ত মুসলমান জনতা সালিম ইলিয়াস সালমা, ঘোউসা, আবু জান, গুলাম নবী, আব্দুস হক, কলিমুদ্দিন চৌধুরী প্রমুখর নেতৃত্বে দাপিয়ে বেড়ায় সারাদিন।

দুপুর নাগাদ আক্রমণ করা হয় কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার রায়বাহাদুর এস এন মুখার্জির বাড়ি নারকেলডাঙা মেন রোডে। এ রাস্তা থেকেই উদ্ধার হয় পাঁচটি মৃতদেহ। ষষ্ঠীতলায় ছুরিকাহত হন তিন হিন্দু।

এস এন মুখার্জি যে বার্তা লালবাজারে পাঠিয়েছিলেন সেটি হল : ‘মুসলমানরা বিপুল সংখ্যায় হাজারে হাজারে নারকেলডাঙা অঞ্চলে জমায়েত হয়েছে। তারা হিন্দুদের বাসস্থানের উপর অগ্নিসংযোগ করছে। এমনকী আমার বাড়িতেও আগুন লাগানো হয়েছে, আমার বাড়ির চারপাশে উন্মত্ত জনতা দাঁড়িয়ে আছে।’

গ্যাস স্ট্রিটে বহু হিন্দু পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছিল। ক্ষুরধার তরোয়ালের কোপে ধড়, মুণ্ড আলাদা করে সবক-টি দেহ ছুড়ে ফেলা হয়েছিল পার্শ্ববর্তী খালের জলে। গোটা এলাকা নিমেষে হিন্দুশূন্য হয়ে যায়।

১৭ থেকে ১৯ অগাস্ট এত ঘটনা ঘটে যায় যে, তার সম্পূর্ণ ইতিহাস কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয়। কলকাতা শহরের রাজপথ, অলিগলিতে যে পরিমাণ শব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিল, তা থেকেই অনুমান করে পরবর্তীকালে সরকারি রিপোর্ট, রাজনৈতিক দলের রিপোর্ট এবং দাঙ্গার ইতিহাস লেখকরা তাঁদের মতামত লিখেছিলেন।

আমরা এখন সেইসব তথ্যসূত্র থেকে সংগৃহীত খবরগুলিকে একত্রিত করার চেষ্টা করি। ইতিমধ্যে যা লেখা হয়েছে সেগুলির পুনরাবৃত্তি করছি না।

.

এন্টালি থানার ফুলবাগান অঞ্চলে পথচলতি মানুষকে নানাভাবে অপদস্থ করা হয়েছে। তাদের টাকাপয়সা, আংটি, ঘড়ি সবই কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তার ওপর চলেছে ধারালো অস্ত্রের আঘাত। এই অঞ্চলে মুসলমানদের মুখে স্লোগান ছিল— ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’।

বর্ধমানের কমিশনার তাঁর প্রতিবেদনে বলেছিলেন, ১৮ অগাস্ট মুসলমানরাই লুঠতরাজ ও ব্যাপক হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। পর পর তিনদিনের ঘটনায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়।

হাওড়ার জেলাশাসক জানিয়েছিলেন, ১৬ অগাস্টের একতরফা আক্রমণের পর হিন্দুরা ১৮ তারিখে ব্যাপকভাবে প্রতিশোধ নিতে রাস্তায় নামে। ওলাবিবিতলায় একটি মুসলিম বস্তির ওপর হামলা চালায় হিন্দু জনতা। অপরদিকে প্রায় ২০০ মুসলমান তিরধনুক নিয়ে প্রতিরোধে নেমেছিল।

হাওড়ায় ১৯ অগাস্ট মুসলমান আক্রমণ ছিল সর্বাত্মক। বহু হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রচুর হিন্দু মৃতদেহ পাওয়া যায়। আহত ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল বহু হিন্দুকে।

এই সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল— বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলমানদের এনে হাওড়া এবং কলকাতায় আক্রমণকারীর সংখ্যা বাড়ানো। মুসলিম লিগ নেতাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এ কাজ শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। দাঙ্গা বাধানোর পরিকল্পনা যেদিন থেকে হয়েছে, সেদিন থেকেই। ঠিক একইভাবে হিন্দুরাও বিভিন্ন অঞ্চলে বিহারি এবং ওড়িয়া হিন্দু এবং বিপুল পরিমাণে শিখ সম্প্রদায়ের মানুষকে প্রতি-আক্রমণে শামিল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে, মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের মতো এক ভয়াবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল কলকাতায়।

মেটিয়াবুরুজ-খিদিরপুর এলাকায় সন্ত্রাস ছিল ভয়াবহ। হাজার হাজার দাঙ্গাবাজ বিনা বাধায় দাপিয়ে বেড়িয়েছে এলাকার হিন্দু অধ্যুষিত পাড়াগুলিতে। তারপর বেছে বেছে পুরুষ ও শিশুদের প্রথমে হত্যা করেছে। বেছে বেছে তরুণী, যুবতী কন্যা ও গৃহবধূদের প্রকাশ্যে গণধর্ষণ করা হয়েছে। ইজ্জত লুঠের লালসা মিটিয়ে তাদের পেট চিরে হত্যা করা হয়েছে নির্মমভাবে! রেহাই পাননি গর্ভবতী মহিলারাও। তাঁদের পেট থেকে সন্তানদের বার করে পা দিয়ে থেঁতো করা হয়েছে! তারপর সব মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে গঙ্গায়। হাওড়ার জেলাশাসক ও বর্ধমানের কমিশনারের সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মেটিয়াবুরুজেই ৬০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। কেশোরাম জুট মিলে উড়িষ্যার ৫০০ শ্রমিককে খুন করেছিল দাঙ্গাবাজরা। সবার গলা কেটে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল গঙ্গার জলে! ঘটনার ভয়াবহতা পরিদর্শন করতে উড়িষ্যার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী (তখন মুখ্যমন্ত্রী বলা হত না) নিজে দৌড়ে এসেছিলেন বাংলায়। দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত মৃতদেহগুলিকে মাটিতে পুঁতে ফেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বাংলার সহকারী চিফ ইঞ্জিনিয়ার শ্রীকিনিকে। একদল ডোমকে নিয়ে ২১ থেকে ২৪ অগাস্টের মধ্যে তিনি মাটির ২০ ফুট গভীরে ১১০টি মৃতদেহ পুঁতে দিয়েছিলেন। সন্ত্রাসের ধার ছিল কতটা তা এই ঘটনা থেকেই প্রমাণিত।

বিভিন্ন পাম্পিং স্টেশন এলাকার নালা ও খাল থেকে উদ্ধার হয় দফায় দফায় মৃতদেহ। বালিগঞ্জ সুয়েজ পাম্পিং স্টেশন, দক্ষিণ-পশ্চিম কলকাতা পাম্পিং স্টেশন এলাকায় ভেসে আসা মৃতদেহর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি।

গড়িয়াহাটের বহু দোকানদার নিজেদের দোকান আগলে বসে থেকেও শেষপর্যন্ত না বাঁচাতে পেরেছেন দোকান, না নিজেদের জীবন।

পার্ক সার্কাসের এক জনপ্রিয় হিন্দু ডাক্তারকে এলাকার যেসব মুসলিম পরিবার ভগবান মানতেন, যাঁর কাছ থেকে বছরের-পর-বছর তাঁরা উপকৃত হয়েছেন, তাঁরাই ডাক্তারবাবু এবং তাঁর পুত্রকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে খুন করেন ডাক্তারবাবুর স্ত্রী এবং মেয়ের সামনে। তারপর স্ত্রী ও কন্যাকে সর্বসমক্ষে গণধর্ষণ করার পর খুন করা হয়। দাঙ্গাবাজদের উন্মত্ততা ছিল কোন পর্যায়ে, তা সহজেই অনুমেয়।

প্রখ্যাত স্বনামধন্যা সাম্যবাদী নেত্রী মণিকুন্তলা সেন তাঁর দাঙ্গা, দেশভাগ এবং স্বাধীনতা গ্রন্থে লিখে গেছেন দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলকাতা শহরের খণ্ডচিত্র। তিনি লিখেছেন—

আমরা যখন শহরে প্রবেশ করলাম তখন বুঝতে পারলাম চারিদিকে থমথমে অবস্থা বিরাজমান। আমাদের চোখের সামনে লুঠতরাজের নানা ঘটনা চোখে পড়ল। চারপাশে ছড়ানো আছে মৃতদেহ, মৃতদেহগুলি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত শোয়ানো। পরিষ্কার দেখতে পেলাম যে, একটি প্রাসাদোপম বাড়ির মার্বেলের সোপানে এক ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে আছে। তার মস্তকটি দেহের বাকি অংশ থেকে নির্মমভাবে কর্তিত করা হয়েছে। সেটি কয়েক ফুট দূরে পড়ে আছে। আমি এক শিখকে দেখতে পেলাম। শার্ট এবং শর্টস পরা, পাগড়ি নেই, তাকে তীক্ষ্ণ তরবারি নিয়ে একদল মানুষ তাড়া করেছে। ঠিক যেভাবে আমরা গোরু-ছাগলদের তাড়া করি।

এমন ঘটনা ঘটেছে শয়ে শয়ে। ক্যানিং স্ট্রিটে কয়েকশো মানুষ হিন্দুদের দোকান লুঠ করে। তারপর তেরোজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। ছ-জন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। নিউ মার্কেট এলাকায় মার্কুইস স্ট্রিট, রয়েড স্ট্রিট, এলিয়ট রোড, কর্পোরেশন স্ট্রিট, ওয়েলেসলি স্ট্রিটেও ব্যাপক সংঘর্ষ ও লুঠতরাজ হয় দফায় দফায়। নিউ মার্কেট অঞ্চল পরিদর্শন করেছিলেন কমিউনিস্ট নেতা মোহিত সেন। তিনি তাঁর The Journey of An Indian Communist গ্রন্থে লিখেছেন: (বঙ্গানুবাদ)

…সেখানকার অবস্থা অশান্তিজনক। স্থানীয় পুলিশ মুসলমান দুর্বৃত্তদের কাছে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত হয়েছে। দোকানগুলোতে ব্যাপক লুঠতরাজ চলছে। একটির পর একটি হত্যার ঘটনা ঘটছে। মানুষকে নিগ্রহ করা হচ্ছে। যদি সামরিক বাহিনীকে অবিলম্বে না ডাকা হয় তাহলে উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করা সম্ভব নয়।

একই পর্যবেক্ষণ ছিল কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (উত্তর) খান সাহিব খালিলুর রহমনেরও।

দ্য স্টেটসম্যান সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী: ‘Mass butchery started with the early dawn of Saturday.’ এবং, ১৭ অগাস্টের আক্রমণে মৃত্যুর সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি— ২৭০। আহতের সংখ্যা কত তা জানা বা গোনা ছিল অসম্ভব।

মডার্ন রিভিউ ১৬ অগাস্টে বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রে যে খবর প্রকাশ করেছিল, তাতে বলা হয়েছিল: মেডিক্যাল কলেজ, ক্যাম্পবেল হাসপাতাল, আর কারমাইকেল হাসপাতাল— এই তিনটি হাসপাতালে দাঙ্গায় আহত ভরতির সংখ্যা ছিল ৫৮৩। এর মধ্যে হিন্দু ছিল ২৫৪, মুসলমান ছিল ২৭৭, অন্যান্য ৬২।

এই হিসাব দেখে মনে হতে পারে, মুসলমানদের একতরফা আক্রমণের চেয়ে হিন্দুদের প্রতি-আক্রমণ ছিল বেশি ধারালো। কিন্তু, প্রকৃত ঘটনা অন্য। মুসলমানরা পথে নেমেছিল হাজারে হাজারে। হিন্দু এলাকায় তাদের মূল লক্ষ্য ছিল লুঠপাট আর নারীধর্ষণ। যত বেশি খুনখারাবি করেছে, তার চেয়ে বেশি করেছে সম্পদ লুঠ।

আর, দ্বিতীয় দিনে তারা চূড়ান্ত প্রতিরোধের মুখে পড়ে। তখন হিন্দুরা মার খেয়েছে যত, মার দিয়েছেও তত। যেসব মুসলমান বস্তিতে হিন্দুরা আক্রমণ চালিয়েছে, সেখানে একটা মুসলমানও বাঁচেনি আক্রমণের হাত থেকে। যদিও হিন্দু আক্রমণকারীর সংখ্যা ছিল অনেকটা কম। আক্রমণের ধরনটা ছিল অনেকটা গেরিলা বাহিনীর মতো। বহু হিন্দু পরিবার বাড়ির মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধবৃদ্ধাদের বাড়ি থেকে সরিয়ে দিয়েছিল নিরাপদ স্থানে।

১৬ অগাস্টের অমৃতবাজার পত্রিকা-র প্রথম পৃষ্ঠায় শিরোনাম ছিল : ‘Calcutta Under Mob Rule. Orgy of Looting, Rioting, Stabbing and Incendiarism.’

কিন্তু, ১৭ অগাস্টে দানবীয় দাঙ্গার পর ১৮ অগাস্ট দ্য স্টেটসম্যান-এর শিরোনাম ছিল : “The sum of tragedy known at the time of writing is over 270 killed, more than 1600 injured, about 900 buildings on fire.’

১৮ এবং ১৯ অগাস্টও শহরের বুকে যখন রক্তপাত হচ্ছে অবিরাম, তখন ২০ অগাস্টের হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড-এ লেখা হয়েছিল: ‘Three days of widespread loot, incendiarism and murder on a scale unprecedented in the history of Calcutta.’ Calcutta Municipal Gazette Aug 24, 1946-এ স্পষ্টতই হিসাব দেওয়া হয়েছিল, ২৬ অগাস্ট পর্যন্ত কলকাতা-হাওড়ার রাস্তা থেকে মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল ৩,৪৬৮টি। সংখ্যাটা যে অবাস্তবিক নয়, তার প্রমাণ ‘দ্য স্টেটসম্যান’ সংবাদপত্রের ২৩ অগাস্টের হিসাব: মৃত ৪০০০, আহত ১১,০০০। এ হিসাবও যে ভুল ছিল না, তার প্রমাণ সরকারিভাবে ঘোষিত হিসাব: ২৮ অগাস্ট পর্যন্ত মৃত ৪৪০০; আহত ১৬০০০, গৃহচ্যুত ১০,০০০। মৃত্যুর সংখ্যা যত বাড়ছিল সেই তুলনায় মৃতদেহ সৎকারের সরকারি ব্যবস্থাপনা হয়ে উঠছিল অপ্রতুল। কারণ, কলকাতা পুরসভার কাজের লোকেরা ছিল অনেকেই বেপাত্তা। কে বেঁচে আছে আর কে নেই, কে কলকাতা ছেড়ে পালিয়েছে, আর কে নেমে পড়েছে প্রত্যক্ষ দাঙ্গায় তা জানা ছিল না কর্তৃপক্ষের। ফলত, গোটা শহর জুড়েই ছড়িয়ে ছিল ঘরবাড়ি, দোকান লুঠের ধ্বংসাবশেষ, পোড়া ঘরবাড়ি, দোকানের ছাই আর অগুনতি মৃতদেহ! অগাস্টের ভ্যাপসা গরম, মাঝে মাঝে বৃষ্টি আর বেশিরভাগ সময়ই কড়া সূর্যালোকে দ্রুত পচছিল, গলছিল মৃতদেহগুলি। দুর্গন্ধে রাস্তায় হাঁটাই ছিল দায়।

১৬ অগাস্ট থেকে শুরু হয়েছিল হত্যালীলা। ১৯ অগাস্ট পর্যন্ত চলেছে টানা। তারপর নরসংহারের মাত্রা কমলেও চলেছিল পরবর্তী দশদিন ধরে। অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়ে ওঠে যে পুরসভা চিন্তিত হয়ে পড়ে, এখনই মৃতদেহ না সরালে শহরে মহামারি ছড়িয়ে পড়বে। তাই পুরসভা তড়িঘড়ি তৈরি করে ফেলে ‘Corps Removal Committee’। শ্যামবাজারের এস চন্দ, কলেজ স্ট্রিটের গুণেন রায়, ভবানীপুরের ধীরেন রায় প্রমুখকে উদ্ধৃত করে গবেষক সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখে গেছেন :

কলকাতার রাস্তায় সার সার মৃতদেহ আর তার ওপর ঝুঁকে আছে কাক-শকুনের দল, সংবাদপত্রে প্রকাশিত এই ছবি আমরা অনেকেই দেখেছি। ট্রাকে বা লরিতে করে মড়ার গাদা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে— সেদিনের কলকাতার অনেকেই স্বচক্ষে দেখেছেন সেই দৃশ্য। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানাচ্ছেন, ১৮ তারিখে (অগাস্ট) তাঁর দিদির মৃত্যু হয়। উত্তর কলকাতার কাশী মিত্র ঘাটে দিদির মৃতদেহ দাহ করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, লরিতে করে মড়ার গাদা এনে গঙ্গায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে। বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটে এখন যেখানে বিশ্বভারতী আর মনীষার দোকান, সেই ফুটপাথটা মড়ায় বোঝাই হয়ে আছে, এই দৃশ্য দেখেছেন আর একজন। ভবানীপুরে এক মুসলমান যুবক একটা জলের ট্যাঙ্কের মধ্যে পুরো একদিন লুকিয়ে বসে ছিল। খবর পেয়ে তাকে টেনে বের করে এনে মারা হয়। বাগমারী কবরখানায় গিয়ে বীরেন রায় দেখতে পান, মৃতদেহ স্তূপ করে রাখা হয়েছে— জায়গার অভাবে গোর দেওয়া যাচ্ছে না। অকল্পনীয় সেই নিষ্ঠুরতার কথা আজও ভুলতে পারেন না প্রত্যক্ষদর্শীরা।

দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর থেকেই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান রেড ক্রশ কিছু এলাকায় আর্তদের সেবার কাজ শুরু করেছিল। বিশেষ করে আহতদের চিকিৎসা, তাদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার মতো কাজ তারা সাধ্যমতো করছিল। কিন্তু, আচমকাই একদিন মির্জাপুর স্ট্রিটের কাছে একটা সন্দেহজনক জিপ ধরা পড়ল পুলিশের হাতে। সরকারি আর্কাইভের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, জিপ গাড়িটির নম্বর BLB7536। জিপটির একপাশে উড়ছিল

রেড ক্রশের পতাকা। অন্যদিকে মুসলিম লিগের পতাকা। পুলিশ জিপটির মধ্যে তল্লাশি করে দুটি ধারালো চপার খুঁজে পায়। বোঝাই যায়, আক্রমণকারীরা এইভাবে ছদ্ম পরিচয়ে বিভিন্ন জায়গায় অস্ত্র পাচার করছিল। ফলে, কলকাতা ও শহরতলির একপ্রান্ত থেকে আর একপ্রান্তে দাঙ্গার প্ররোচনা যেমন ছড়াচ্ছিল, তেমনই দাঙ্গার অবিরাম বিস্তার ছড়াচ্ছিল দিনের-পর-দিন।

নিজের রিকশাতেই খুন

নিজের রিকশাতেই খুন

আপার সার্কুলার রোডে অঙ্কের খ্যাতনামা শিক্ষক যাদব চক্রবর্তীর বাড়ির সামনে ১৫ অগাস্ট থেকেই ছোটোখাটো ঝামেলা পাকাচ্ছিল দাঙ্গাবাজরা। কিন্তু, ১৭ অগাস্ট আচমকাই অকল্পনীয় ঘটনা ঘটে যায়। প্রায় পাঁচ-ছ-শো মুসলমান বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ে। ওদের লক্ষ্য ছিল বাড়ির মহিলাদের অলংকার। সমস্ত অলংকার নির্দয়ভাবে কেড়ে নেয়। কানের লতি ছিঁড়ে কেড়ে নেয় সোনার কানের দুল। গলা থেকে জোর করে ছিঁড়ে নেয় মোটা মোটা সোনার হার। এখানেই থামেনি দাঙ্গাবাজরা। এক দাঙ্গাবাজ যাদববাবুর পরিবারের এক মহিলা সদস্যকে টেনে একটা ঘরের ভিতর নিয়ে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে নির্বিবাদে বলাৎকার করে!

১৭ অগাস্ট বাগমারি এলাকায় মানিকতলা থানার ওসি এ কে এস ফজলুল কবীর চৌধুরীর প্রত্যক্ষ মদতে রীতিমতো ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গোটা এলাকা জুড়ে আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যায় স্লোগানে স্লোগানে— লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান, মারকে লেঙ্গে পাকিস্তান, কাফের লোগোঁ কো মার ডালো! এলাকার গর্ব ছিল প্রাসাদোপম অট্টালিকা বাগমারি ভিলা। স্বয়ং মানিকতলা থানার ওসির প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় সেই বাগমারি ভিলায় আগুন ধরানো হয়। তিনদিন ধরে ব্যাপক হত্যা ও লুঠ চলে। অসাধারণ সৌন্দর্যমণ্ডিত বাগমারি ভিলা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। কলকাতার বিভিন্ন সংবাদপত্রে স্পষ্টতই ওসি কবীর চৌধুরীকে এই ঘটনার নায়ক ও ঘৃণিত লুঠেরা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। আপার সার্কুলার রোডে রাজাবাজারের কাছে একদা বিখ্যাত মিহির প্রেসের ভিতরে ঢুকে মুসলমান গুন্ডারা একজন হিন্দু কর্মচারীকে সরাসরি হত্যা করে। প্রেসেই উপস্থিত এক নারীও গণধর্ষিতা হন।

বেনিয়াপুকুর এলাকার দাঙ্গাপীড়িত পথগুলি তিনদিন ধরে ভরে ছিল মানুষের মৃতদেহে। বেনিয়াপুকুর রোড, বেনিয়াপুকুর লেন, লিন্টন স্ট্রিট, ক্রিমেশন স্ট্রিট ইত্যাদি অঞ্চল হিন্দুশূন্য হয়ে যায়। প্রায় ৪০০০ হিন্দু পালিয়ে আশ্রয় নেয় স্থানীয় থানায়। ঠিক একই অবস্থা ছিল এন্টালির এবং ফুলবাগান অঞ্চলের। উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণ কলকাতা— গোটা শহর জুড়ে যে তাণ্ডব চলেছিল ১৬ অগাস্ট থেকে ১৯ অগাস্ট— তার অন্যতম শিকার ছিলেন বিশিষ্ট হিন্দু ব্যক্তিদের বাড়ি ও পরিবার। আক্রমণে বিধ্বস্ত হয় পার্ক সার্কাসের এস কে ব্যানার্জি, এইচ এল বসুর বাড়ি। নির্মমভাবে খুন করা হয় বিচারক বি কে রায়কে। ভয়ংকর লুঠ এবং তীব্র অপমানের মুখে পড়েন মেডিক্যাল কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডাক্তার দেওয়ান বাহাদুর হীরালাল বসু, ডা. ইউ পি বসু, আই সি এস পি সি দে, বিশিষ্ট আইনজীবী বি সি দত্ত, ডা. শচীন বোস, ক্যাপ্টেন বি কে সেনগুপ্ত, অধ্যাপক এস সি বি মহলানবিশ, জে সি গুপ্ত প্রমুখ। এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন কলকাতার বিশিষ্ট নাগরিক এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারভুক্ত। পার্ক স্ট্রিট এবং পার্ক সার্কাস এলাকায় চরম সন্ত্রাসের ঝড় নামিয়ে এনেছিল দুই স্থানীয় দুর্বৃত্ত লালমিঞা এবং সালেম। আক্রান্ত হন ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলামের বাসিন্দা কিরণশঙ্কর রায়, দিলখুসা স্ট্রিটের বিশিষ্ট চলচ্চিত্র অভিনেতা ছবি বিশ্বাস।

বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লিগের সভাপতি মৌলানা আক্রম খানের বাড়ি ছিল পার্ক সার্কাসের মৃগেন্দ্রলাল মিশ্র রোডে। তাঁর বাড়ির ঠিক উলটোদিকে বাস করতেন সাবজাজ বি কে রায়। দাঙ্গা শুরুর দিনেই বি কে রায় বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন। আক্রম খান তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন, ‘চিন্তা করবেন না। আপনি আমার প্রতিবেশী। কিছু হবে না।’ কিন্তু, সেই বি কে রায়ের বাড়িতেই পাঁচশো সশস্ত্র মুসলমান আক্রমণ করল। বি কে রায়কে বাড়ির মধ্যেই কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করল! আর, আক্রম খান নিজের বাড়ির বারান্দায় বসে তারিয়ে তারিয়ে তা উপভোগ করলেন। একবারও দাঙ্গাবাজদের নিরস্ত্র করার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন না। পরে জানা যায়, ওইদিনেই বি কে রায়ের দুই সন্তান শিশির কুমার রায় ও লেফটেন্যান্ট এ কে রায়কেও ছুরি মেরেছিল দুর্বৃত্তরা। তড়িঘড়ি চিত্তরঞ্জন নিয়ে গেলে তাঁরা প্রাণে বেঁচে যান।

এই অধ্যায়েই লিখেছি, রেড ক্রশ পরিচয় দিয়ে সংখ্যালঘু দুর্বৃত্তরা একটি জিপে করে অস্ত্র পাচার করার পথে ধরা পড়েছিল। একইভাবে আরও একটি ছদ্ম রেড ক্রশ বাহিনী ধরা পড়ল মল্লিকবাজার অঞ্চলে ১৮ অগাস্ট সকালে। রেড ক্রশের পতাকা লাগানো বি এল এল ১৫২ নম্বর প্লেট লাগানো। একটা ট্রাকে করে মল্লিকবাজারে আসে সাত দুষ্কৃতি। এরা ছিল: ট্রাকের ড্রাইভার মহম্মদ ইউনিস, আলি হোসেন, সঈদ গীরজান, মহম্মদ রউফ, কাদির, আবদুল মাজিদ খান এবং সাইদ মহম্মদ ইসাক। এদের প্রত্যেকের হাতে বাঁধা ছিল রেড ক্রশের ব্যান্ড। তারা মৃতদেহ সৎকারের কাজ করবে— এই পরিচয় দিয়ে মল্লিকবাজারের বিভিন্ন দোকানে ঢুকে বস্তা বস্তা চাল, ডাল, আটা, ময়দা, চিনি ও অন্যান্য সামগ্রী লুঠপাট করে ট্রাকে করে পালাবার চেষ্টা করেছিল। একজন পুলিশ অফিসার তাদের গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যান। থানায় তখন উপস্থিত মুখ্যমন্ত্রী সুরাবর্দি। পুলিশ অফিসারের কথায়, ‘তিনি আমায় ডেকে নিলেন। সব ঘটনা শুনলেন এবং তার পরেও আমার উপস্থিতিতেই পুলিশ ভেহিকেলস বিভাগের ডেপুটি কমিশনার এইচ এস ঘোষকে আদেশ দিলেন— সবাইকে ছেড়ে দিন!’

নাম-না-জানা ওই পুলিশ অফিসার অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু, ১৮ অগাস্ট সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ আর হ্যারিসন রোডের সংযোগস্থলে ডিউটিরত এক পুলিশকর্মী সাহসে ভর করে দুর্বৃত্তদের লক্ষ করেই গুলি চালিয়ে কলাবাগান বস্তির মর্গের সামনে থেকে নয় মহিলা ও এগারোজন পুরুষকে উদ্ধার করে বউবাজারে নিয়ে যান। দুর্বৃত্তদের লক্ষ্য ছিল, মর্গের ভিতরেই তাদের হত্যা করে মর্গের লাশ বানিয়ে দেওয়া। তবে, কলাবাগান বস্তি ছিল মুসলিম দুর্বৃত্তদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কলকাতার অন্যতম ভয়ংকর বস্তি বলে পরিচিত এই কলাবাগানের কাছেই ছিল কলকাতার সবচেয়ে বড়ো জেনারেল স্টোর ভারতকলা ভাণ্ডার। বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৫টা— টানা পাঁচ ঘণ্টা ধরে শয়ে শয়ে লুঠেরা ভারতকলা ভাণ্ডারকে লুটে শূন্য করে দেয়। তারপর বিশাল ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

ভারতকলা ভাণ্ডার লুঠের পর দাঙ্গাবাজরা আক্রমণ করে ১০০নং হ্যারিসন রোডের বাড়িটিতে। এই বাড়িটিতে বাস করতেন বহু হিন্দু পরিবার। সেখানে অবাধে লুঠতরাজ চলে। একদল দুর্বৃত্ত মেছুয়াবাজারে যায়। সেখান থেকে দলের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে প্রচুর পরিমাণে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হানা দেয় কেশব সেন স্ট্রিটে। সেখান থেকে কর্নওয়ালিস স্ট্রিট। কুমিল্যা ইউনিয়ন ব্যাঙ্কে সমস্ত মজুত টাকাপয়সা লুঠ করে দাঙ্গাবাজরা। তারপর ব্যাঙ্কে আগুন লাগিয়ে দেয়। এলাকার হিন্দুরা সচেতন ছিলেন। তাঁরা অগ্নিদগ্ধ ভবন থেকেই প্রায় ১০০ হিন্দুকে উদ্ধার করেন অক্ষত অবস্থায়। তাঁরা একটি ঘরের মধ্যে নিজেদের তালাবন্দি করে রেখেছিলেন। আগুন তাঁদের ছুঁতে পারেনি।

ব্ল্যাক স্পট : রাজাবাজার-কলাবাগান-জ্যাকেরিয়া স্ট্রিট- মেটিয়াবুরুজ- পার্ক সার্কাস

দাঙ্গা হয়েছিল গোটা কলকাতা জুড়েই। খুব কম এলাকাই মুসলমান দাঙ্গাবাজদের বিষনজর থেকে রেহাই পেয়েছিল। বেঁচেছিল শুধু সেইসব হিন্দু এলাকাই, যেখানে হিন্দুরা সম্মিলিতভাবে দাঙ্গাবাজদের মোকাবিলা করতে পেরেছিল। পালটা টাঙি, তলোয়ারের ঘা বসাতে পেরেছিল। হিন্দু রক্তের প্রবাহের পাশাপাশি বইয়েছিল মুসলিম রক্তের স্রোত। হিন্দুদের সেই প্রতিরোধ কাহিনিগুলি যেন এক-একটা বীরগাথা। সে-গাথাগুলি অবশ্যই শোনাব। কিন্তু, তার আগে সংখ্যালঘু দাঙ্গাবাজদের নৃশংসতার শেষ পর্যায়ের আরও কিছু পরিচয় লিখে যাই একথা প্রমাণ করতে যে, সরকারি মদতে, পুলিশি নিস্পৃহতায় আর ইসলামিক রাজনৈতিক উল্লাসে পাক-ই-স্তানের স্বপ্নে মশগুল সংখ্যালঘুরা এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে কোন ঐতিহাসিক আত্মলিপি লিখে রেখে গিয়েছিল।

মধ্য কলকাতার কলাবাগানে নৃশংস হত্যা
ছবি সৌজন্য : লাইফ পত্রিকা

মধ্য কলকাতার কলাবাগানে নৃশংস হত্যা  ছবি সৌজন্য : লাইফ পত্রিকা

এযাবৎ যত ঘটনার উল্লেখ করেছি, তা সহজেই চিনিয়ে দেয় শহরের সেইসব নির্দিষ্ট কয়েকটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা, যেখান থেকেই দাঙ্গার উদ্‌গিরণ হয়েছিল। সবার প্রথমেই নাম করতে হয় রাজাবাজারের; কারণ, ১৬ অগাস্টের প্রথম আক্রমণ হয়েছিল যেখানে সেই মানিকতলায় জড়ো হয়েছিল লুঠেরা এবং খুনিবাহিনীর স্বর্গরাজ্য বলে পরিচিত রাজাবাজার থেকেই। মধ্য কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যেখানে যেখানে প্রাথমিক আক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল সেই শিয়ালদা, মৌলালি, কলেজ স্ট্রিট, বউবাজার থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত সর্বত্র হাজারে হাজারে রাজাবাজারের মুসলমান ছড়িয়ে পড়েছিল ছারপোকার মতো। উত্তর কলকাতার জ্যাকেরিয়া স্ট্রিট, কলাবাগান বস্তি থেকে আক্রমণ ছড়িয়েছিল চিৎপুর, মেছুয়াবাজার, নাখোদা মসজিদ সংলগ্ন অঞ্চল, মাড়োয়ারি অধ্যুষিত বড়োবাজার, গণেশ টকিজ, চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ হয়ে শোভাবাজার, শ্যামবাজারেও। ক্যানিং স্ট্রিট, এজরা স্ট্রিট, টেরিটিবাজারের দাঙ্গায় মূলত অংশ নিয়েছিল চিৎপুরের মুসলমানরাই। দক্ষিণ কলকাতায় যাবতীয় ঘটনার মূলে ছিল পার্ক স্ট্রিট-পার্ক সার্কাস এলাকার মুসলমান সমাজের মারণমুখী হিন্দু-বিদ্বেষ। এমনকী প্রাথমিক পর্যায়ে মেটিয়াবুরুজেও। অবশ্য, অচিরেই মেটিয়াবুরুজ-গার্ডেনরিচ এলাকা থেকেই দাঙ্গাবাজরা দাঙ্গা ছড়িয়ে দেয় হাওড়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। শিবপুর থেকে সালকিয়া সর্বত্র।

তখন মোবাইল ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না। তাতেই মুসলমানরা হিন্দু কোতলের মহান দায়িত্ব গোটা শহরে ছড়িয়ে দিতে বেশি সময় নেয়নি। তার ফলেই দ্রুত শহর হয়ে উঠেছে দাঙ্গাকবলিত।

‘৪৬-এর অগাস্টের দাঙ্গার শেষ পর্যায়ে মুসলমানরা আক্রমণ হেনেছিল এমন কয়েকটি হিন্দু পরিবার ও প্রতিষ্ঠানে যা প্রকৃতপক্ষে হিন্দু সংস্কৃতির মূলে আঘাত হেনেছিল।

হ্যারিসন রোডের ভারতকলা ভাণ্ডার ধ্বংসের ঘটনার ভয়াবহ পরিণতি আমরা জেনেছি। ঠিক একইভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল আরও একটি এমনই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান লক্ষ্মী স্টোরকে। কলেজ স্ট্রিট ও হ্যারিসন রোডের মোড়ে লক্ষ্মী স্টোরটি ছিল বাঙালি সমাজের নিত্যপ্রয়োজনীয় যাবতীয় সামগ্রীর একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। ভারতকলা ভাণ্ডারের মতো লক্ষ্মী স্টোরেও লুঠপাট করে ফাঁকা করে দেওয়া হয়। তারপর তীব্র আক্রোশে আগুনও ধরিয়ে দেওয়া হয় যাতে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পুনর্জন্ম হতে না পারে। এখান থেকেই পর পর হামলা চলতে থাকে মধ্য কলকাতা ও বড়োবাজার সংলগ্ন মাড়োয়ারি পরিবারের বাড়ি হিসেবে চিহ্নিত অট্টালিকাগুলি। একের-পর-এক বাড়িতে লাগানো আগুনের লেলিহান শিখা ছুঁয়ে যায় আকাশ। কিন্তু, ফায়ার ব্রিগেডের দেখা মেলেনি। মিলবেই-বা কী করে? গোটা শহরের আগুন নেভানোর পরিকাঠামোই-বা তখন কোথায়? তার ওপর ছিল সরকারি নিস্পৃহতা!

ধনী মাড়োয়ারি পরিবারগুলিতে এরা তেমন খুনখারাবি করেনি। কারণ, এসব জায়গায় এদের লক্ষ্য ছিল নগদ অর্থ আর সোনা, রুপোর গহনা। কারণ, ওইসব পরিবারগুলির সিংহভাগই ছিল ব্যবসায়ী পরিবার। যে বাড়িতেই ঢুকেছে দাঙ্গাবাজরা, সে-বাড়ি থেকেই বেরিয়েছে লাখপতি হয়ে।

তারাচাঁদ দত্ত স্ট্রিটে বাস করতেন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র আনন্দীলাল পোদ্দার। তাঁর পিতৃপুরুষ ছিলেন বিখ্যাত ব্যবসায়ী দয়ারাম পোদ্দার। সেই বাড়ি থেকে দাঙ্গাবাজ দুর্বৃত্তরা ছিনিয়ে নিয়েছিল ৫০ লক্ষ টাকার গহনা, রুপোর বাসনপত্র, মায় গৃহলক্ষ্মীর গয়নাও। তা ছাড়া ছিল লাখো টাকা নগদ। সব সাজানো ছিল একটা মস্ত বড়ো লোহার সিন্দুকে। পাঁচ থেকে ছ-মণ ওজনের গয়না ও রুপোর জিনিসপত্র বোঝাই ওই সিন্দুকটি বাড়ির দোতলা থেকে বার করে খোলা বারান্দা থেকে নীচের রাস্তায় ঠেলে ফেলা হয়। বাড়ির মহিলারা ওই বারান্দা দিয়েই পাশের বাড়ির বারান্দায় লাফিয়ে পড়ে নিজেদের ইজ্জত বাঁচিয়েছিলেন। কিন্তু, তারপরেও পুনরায় আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য এক পুলিশ সার্জেন্টের হাতে গুঁজে দিয়েছিলেন পাঁচ হাজার টাকা। টাকার বিনিময়ে এই পরিবারের মহিলাদের তিনি গার্ড দিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

চিৎপুর এলাকায় সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারগুলিকেও রেহাই দেয়নি হত্যাকারীরা। রাজা দেবেন্দ্র মল্লিক, কুমার কার্তিকচন্দ্র মল্লিক এবং ক্লক টাওয়ার হাউসের মালিক তারাচাঁদ মল্লিকের বাড়িতেও ব্যাপকভাবে লুঠপাট চালানো হয়েছিল।

সিন্ধুরিয়াপট্টির মুসলমানেরা পাঞ্জাবি হিন্দু হোটেল এবং বাঙুর ভবনের ওপর গুলিও চালিয়েছিল বলে অভিযোগ করেছিল বাসিন্দারা।

মেছুয়াবাজার স্ট্রিট, বর্মন স্ট্রিটে বহুল পরিমাণে আগুনে দগ্ধ বাড়ি ও রক্তাক্ত সামগ্রী পাওয়া যায়। কিন্তু, আশ্চর্যজনকভাবে একজন মহিলার মৃতদেহ ছাড়া কিছু মেলেনি। মধ্য কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হিন্দুরা যত পিছু হঠেছে পলায়নপর মনোবৃত্তি নিয়ে, তত বেশি বেড়েছে লুঠতরাজ আর আগুন লাগানোর জোর।

নাখোদা মসজিদের কাছেই বাস করতেন কলকাতার বিশিষ্ট নাগরিক পুলিন সেন। চিৎপুর রোডের বাড়িতেই তাঁকে হত্যা করে দাঙ্গাবাজরা। এখানেই থামেনি তারা। বাবার মৃতদেহ জড়িয়ে শোকসন্তপ্ত পুলিন সেনের মেয়েকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে সেই মৃতদেহের পাশেই তাঁকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ করে শয়তানের দল!

আশ্চর্যের ব্যাপার লালবাজারের অতি নিকটেই অবস্থিত টেরিটিবাজার, রাধাবাজার এলাকায় অসংখ্য হিন্দু মানুষ খুন হন। কোথাও কোথাও পুলিশ নগদ অর্থের বিনিময়ে কোনো কোনো ব্যক্তিকে সুরক্ষা দিয়েছে। যেমন দিয়েছে কোনো কোনো দাঙ্গাবাজও আর্ত মানুষের হাত থেকে ঘুস নিয়ে।

অমৃত বাজার পত্রিকা। তারিখ ১৭ অগাস্ট ১৯৪৬

মেটিয়াবুরুজের লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরে মূর্তি ধ্বংস করে আগুন লাগিয়ে দেয় দাঙ্গাবাজরা। রাধু সরকার লেনে নিস্তারিণী হোস্টেলে মাড়োয়ারি লেনে ছাত্রদের সবাইকে মেরে ফেলে দাঙ্গাবাজরা। সংখ্যায় ১৮। রিপন হোস্টেলে খুন হন দুই হিন্দু বাঙালি ছাত্র কীর্তিভূষণ গুপ্ত এবং পরিমল দত্ত। রাজনারায়ণ স্ট্রিটের সায়েন্স কলেজের ছাত্র হোস্টেলেও ঢোকার চেষ্টা করেছিল মুসলমানরা, কিন্তু তারা প্রথমে সফল হয়নি। ছাত্ররা যখন মোটামুটি জীবন বাঁচানো নিয়ে নিশ্চিত হয়ে যায়, তখনই মুসলমানরা চোরাগোপ্তা পথে হোস্টেলে ঢোকে। চারজন ছাত্রকে প্রাণঘাতী আঘাত করে। দু-জন ঘটনাস্থলেই মারা যায়।

সায়েন্স কলেজের ভিতর দাঙ্গাবাজরা ঢুকতে পারেনি। চরম আক্রোশে তারা বাইরে থেকেই পাথর ছুড়ে ব্যাপক ক্ষতি করে। একইরকমভাবে ভাঙচুর চালায় ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ে।

বাংলা প্রাদেশিক আইনসভার প্রাক্তন স্পিকার সৈয়দ নওসের আলি মুসলমান হয়েও দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে রেহাই পাননি। তাঁর বাড়িতে হামলা চালায় প্রায় ৩০০ দাঙ্গাবাজ। খবর পেয়ে সেখানে যান মোটর ভেহিকলস বিভাগের ইনস্পেকটর এ এফ কিচিন। তিনি সেখানে পৌঁছে দেখেন নওসের আলির বাড়ির সমস্ত জানলা, দরজা ভাঙা। সমস্ত আসবাবপত্র ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তাঁর বাড়ির মাথা থেকে কংগ্রেসের পতাকা নামিয়ে দাঙ্গাবাজরা মুসলিম লিগের পতাকা উড়িয়েছে। পরিষ্কারভাবে শাসানো হয়েছে নওসের সাহেবকে যে, ওই বাড়ি থেকে চলে যেতে হবে। নাহলে, মুসলমান হলেও তাঁকে সপরিবার খুন করা হবে। শ্রীকিচিন তাঁদের সুরক্ষা দিয়ে আমহার্স্ট স্ট্রিট থানায় পৌঁছে দেন।

মল্লিকবাজার অঞ্চলে এর আগে ১৯ অগাস্টেই লুঠ হয়েছিল মহিষাদল রাজবাড়ি। মুসলমান দাঙ্গাবাজরা প্রকাশ্যে পুলিশের উপস্থিতিতে রাজপরিবারে লুঠের মূল্যবান জিনিসপত্র ভাগবাটোয়ারা করছিল মহানন্দে। স্বচক্ষে দেখা সেই দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতা এ কে ফজলুল হক, যিনি পূর্ববঙ্গের রাজ্যপাল ছিলেন। তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন, লুঠেরাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছে পুলিশকর্মীরাও আর ব্যবস্থাপক সভার এক প্রাক্তন সদস্যকে দেখলেন লুঠেরাদের কাছ থেকে চেয়ে নিলেন একটা রুপোর ট্রে। তারপর হাঁটা দিলেন বাড়ির পথে। তিনি মন্তব্য করে গেছেন— ‘It seemed to me that during those days, not only the British rule had ended, but that some learned Nadir Shah had come over Calcutta and has let look his hordes of plunder and loot.’ অর্থাৎ, ‘এইসব দিনগুলোতে বোধ হয় ব্রিটিশের কোনো শাসন দেশে ছিল না। মনে হচ্ছিল, নাদির শাহ ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসেছেন। তিনি ভারতবর্ষে আবার ব্যাপক লুঠতরাজ শুরু করেছেন।’ [সূত্র : বাংলা প্রাদেশিক আইনসভার মিনিটস]

প্রকাশ্য রাজপথে ঠেলাগাড়িতে মৃতদেহের স্তূপ। সৎকারের লোক নেই। ছবি সৌজন্য : ‘লাইফ’ পত্রিকা

প্রকাশ্য রাজপথে ঠেলাগাড়িতে মৃতদেহের স্তূপ। সৎকারের লোক নেই। ছবি সৌজন্য : ‘লাইফ’ পত্রিকা

চরমতম ঘৃণ্য এই যবনিক আচরণের শিকার হয়েছিলেন জগৎখ্যাত ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের পুত্র। তাঁকে দাঙ্গাবাজরা খুন করেছিল। তাঁর নাতি কোনোরকমে জীবন বাঁচিয়েছিলেন বলে, স্যার যদুনাথ সরকারের ঐতিহ্যবাহী বংশের ধারা রক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু, প্রাণ দিয়েছিলেন কলকাতার অন্যতম মিষ্টান্ন পরিবেশক ভীম নাগের এক সন্তান।

হিন্দু সম্ভ্রান্ত পরিবার এবং হিন্দু সংস্কৃতির পরিচয়বাহী প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের ওপর মুসলমানদের এই আগ্রাসন যেন প্রমাণ করে শুধু লুঠ নয়, শুধু হত্যা নয়, শুধু হিন্দু জনজাতিকে খতম করাই নয়, ‘৪৬-এর দাঙ্গার রূপায়ণকারী মুসলমান জনসমাজ এবং তাদের নিয়ন্ত্রক রাজনৈতিক বাহিনী চেয়েছিল— শেষ হোক হিন্দু সংস্কৃতি, বাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। বাংলার মনন ও ধীশক্তি। বাঙালির প্রাণশক্তি। যেন পরিকল্পনাই করা হয়েছিল— আঘাত হানো এমনভাবে যাতে কালনাগিনীর ছোবলের দুঃস্বপ্ন বাংলার হিন্দুরা কোনোদিন ভুলতে না পারে। আতঙ্ক ছড়িয়ে দাও ইবলিশের মতো নারীমনে, শিশুমনে। যেন আর কখনো সাহস সঞ্চয় করে ঘুরে দাঁড়াতে না পারে বাঙালি। হীনম্মন্য করে তোলে বাংলা তথা বাঙালিকে। বাঙালির শিক্ষাদীক্ষা, মানমর্যাদার শিকড়ে আঘাত হানো। বাংলার বীরাঙ্গনাদের সম্ভ্রমকে মাটিতে মিশিয়ে দাও। ইবলিশ বাহিনীর সঙ্গে বাঙালিকেও ঠেলে দাও দোজখের পথে। বাংলার আকাশে জ্বলুক আগুন। মাটিতে মাথা তুলুক সরীসৃপ। বাংলার বাতাসে বাঁশি না বাজুক— বাজুক বিষের অসুর!

শেষ আশ্রয় শ্মশানের চিতা ছবি সৌজন্য : ‘লাইফ’ পত্রিকা

শেষ আশ্রয় শ্মশানের চিতা ছবি সৌজন্য : ‘লাইফ’ পত্রিকা

কলকাতা দাঙ্গার ভয়াবহ চিত্রে সবচেয়ে খুশি হয়েছিল ব্রিটিশ শক্তি। ব্রিটিশ শক্তির ভারতীয় নিয়ন্ত্রকরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন— যাক বাবা, ইউরোপিয়ানদের ওপর কোনো আক্রমণ হয়নি, তাদের দোকান অক্ষুণ্ণ এবার ভারত বিভাজনের কাজটি অনেক সহজ হয়ে গেল বোধ হয়।

অদূর ভবিষ্যতে ব্রিটিশ রাজশক্তির সেই ভাবনাই সফল হয়েছিল। ভারত বিভাজিত হয়েছিল। ভারতমাতার দেহ বিভাজিত হয়েছিল শিরদাঁড়ার ঠিক মাঝখান দিয়ে, যাতে ভারত এবং পাক-ই-স্তান কোনোদিনই আর মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে না পারে।

সেকথাই বড়ো মর্মান্তিক ভাষায় লিখে গেছেন লিওনার্ড মোসলে (Leonard Moseley) তাঁর বিখ্যাত ঐতিহাসিক গ্রন্থ The Last Days of the British Raj-এ। তিনি লিখেছেন :

The filthy and dreadful slaughter changed the shape of India and the course of history. The corpses of men, women and children lay stinking in the gutters of Chowringhee Square until the only reliable garbage collectors of India– ‘the vultures’– picked them clean; and with every mouthful, they picked away the fabric of Unitary India, which Britain had painstakingly built up over more than a century and a half and finally tore it into two.

বর্ণনাটি নিখুঁত। কলকাতার বুকে পাশাপাশি শুয়ে আছে বাবা, মা, সন্তানেরা। ঘৃণ্য এবং ভয়ংকর কসাই ভারত-ইতিহাসের ধারা এবং চেহারাকেই বদলে দিয়েছে। ওই সময়ে হাজির একমাত্র বিশ্বস্ত জমাদার শকুনির সভা। কারণ, সৎকার করার জন্য শহরে তখন মানুষেরও অভাব। অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন আজ মলিন। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ষড়যন্ত্র সফল। দেড়শো বছরের প্রয়াস হল ফলপ্রসূ।

লিওনার্ড মোসলের এই অনুভবই বোধ হয় ‘৪৬-এর দাঙ্গার মূল শিক্ষা, যা ভারতের বুকে চিরকালের মতো একটা জলছবি এঁকে দিয়ে গেছে, যার নাম— সাম্প্রদায়িকতা!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%