যখন দাঙ্গা থামল

সুজিত রায়

আমরা শিক্ষিত সমাজের কাছে কী করে মুখ দেখাব? এখন অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে মনে হচ্ছে যে, হিন্দু এবং মুসলমানেরা বোধ হয় আর পারস্পরিক সৌহার্দ্যের বাতাবরণের মধ্যে বসবাস করতে পারব না। যদি এই বিষয়টির অবিলম্বে সমাধান না হয় তাহলে তা আমাদের কাছে আরও এক অভিশপ্ত ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত থাকবে।… এখন একপক্ষকে অকারণে দোষারোপ করে লাভ নেই। যে ঘটনা ঘটে গেছে তা রোমন্থন করা উচিত নয়।… আমরা এমন একটা পন্থা নির্ধারণ করব যা সকলের ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য হবে। …

—এ. কে. ফজলুল হক, বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে প্রদত্ত ভাষণ

.

I will certainly hold responsible Mr Suhrawardy, Chief Minister who lost his mental balance when he made that statements from Bombay that he was going to declare Bengal to be an independent state. He knew that troubles were ahead. If you analyse his speeches, it would would appear clear that he knew that troubles were ahead. I am not raising this question as to how many Hindus or Muslims had lost their lives. The question is, have Government succeeded in protecting lives and properties, no matter, to which the community believes?

-Shyamaprasad Mukhopadhyay in his speech ‘Calcutta killings’ on the floor of the Bengal Legislative Assembly.

.

দাঙ্গা যখন থামল, তখনও কলকাতার আকাশ থেকে চিল, শকুনেরা উধাও হয়নি। প্রায় ৭ হাজার মানুষের মৃতদেহ। আহতর সংখ্যা ২৪ হাজার। শহরের কোণে কোণে তখনও পচা মাংস, শুকিয়ে যাওয়া চাপ চাপ রক্তের দুর্গন্ধ। কে তাড়াবে ওই বিশালবপু দু-পাশে তালপাতার মতো ছড়ানো ডানায় ভর করে ছুটে আসা তীক্ষ্ণ বাঁকানো ঠোঁটওলা নরমাংসভোজীদের। ১৬ অগাস্টের সেই যবনদের মারণাত্মক আক্রমণের পর চারদিন ধরে চলা নরসংহার পালা কিংবা নরমেধ যজ্ঞের পর মনে হচ্ছিল গোটা শহরটাই পরিণত হয়েছে পারসিদের ‘টাওয়ার অফ সাইলেন্স’ বা ‘মৌন মৃত্যুশিখর’-এ, যেখানে শুধু চিল, শকুনেরাই বাঙ্ময়। আর, ছুঁক ছুঁক করে ঘোরে কিছু বেড়াল, কুকুর তাজা মাংসের লোভে। বালিগঞ্জ, গড়িয়াহাট, শিয়ালদার কোথাও কোথাও ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল দু-একটি শিয়াল কিংবা লুকিয়ে থাকা বাঘরোল। সকলেই ছিল নিঃশব্দ হিংসার প্রতীক। অফিস-কাছারি বন্ধ তখনও। যানবাহন চলাচলও স্বাভাবিক নয়। ছুটি স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়েও।

কিন্তু, আর কতদিন?

জীবন তো থেমে থাকে না। তাল কাটে। লয় কমে। ছন্দপতন হয়। তবুও জীবন একদিন আবার তালে ফেরে, লয়ে ফেরে। ছন্দে ফেরে।

‘৪৬-এর কলকাতাও ফিরেছিল স্বাভাবিকতায় প্রিয়জনদের হারানোর শোক আর যুদ্ধের মতো ধ্বংসচিত্র নিয়েই।

.

৩১ অগাস্ট।

রাজ্যে মুসলিম লিগের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস সর্বভারতীয় পর্যায়ে দলীয় কর্মপরিষদের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করে। সেই প্রস্তাবের মুখবন্ধে ১৬ অগাস্টে ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’ উপলক্ষে মুসলিম লিগের যে রাজনৈতিক পরিকল্পনা ছিল সেটিকেই দায়ী করে কংগ্রেস এবং প্রত্যক্ষভাবে দোষারোপ করা হয় বাংলার মুসলিম লিগ সরকার এবং সরকারি প্রধান হোসেইন সুরাবর্দিকে। প্রস্তাবনায় লেখা হয়—

…সরকারি সাহায্য এবং বদান্যতা ছাড়া এমন ব্যাপক হিংসাত্মক কার্যকলাপ চালানো কোনোমতেই সম্ভব হত না। যারা ওই জনসভায় (মনুমেন্ট ময়দানের জনসভা) যোগ দিয়েছিল, তাদের হাতে ছিল বাঁশের খণ্ড, উন্মুক্ত তরবারি, ছুরি এবং অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র। কিভাবে এত অস্ত্র তাদের হাতে পৌঁছে গেল?… অনেকক্ষেত্রে দোকান লুণ্ঠিত হয়। দোকানের মালিককে হত্যা করা হয়। নির্বিচারে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে। ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গে লুঠতরাজ শুরু হয়ে যায়। ঐসব দুর্বৃত্ত নানাজাতীয় ভয়ঙ্কর অস্ত্র ব্যবহার করে ত্রাস ও আতঙ্কের বাতাবরণ সৃষ্টি করে। একটির পর একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে যায়। অসংখ্য বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ৩/৪ দিন ধরে আইনের কোনো শাসন ছিল না। কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি নষ্ট হয়। সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ঘটে গেছে একের পর এক হত্যার নারকীয় ঘটনা। [সূত্র : ১৯৪৬ কলকাতা হত্যা এবং নোয়াখালি গণহত্যা, প্রকাশক: হিমাংশু মাইতি, কলকাতা 2022]

কংগ্রেসের প্রত্যক্ষ অভিযোগ ছিল, সেদিন কোনো ঘটনায় পুলিশ হস্তক্ষেপ করেনি। ট্র্যাফিক পেট্রোলিং ছিল ১৬ অগাস্টেও। কর্তব্যের খাতিরে কোথাও কোথাও রাস্তায় হাজির ছিল পুলিশ কিন্তু দুর্বৃত্তদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেনি। প্রকৃতপক্ষে মহরমে যেমন হয়, সেইভাবেই ঘোড়সওয়ার পুলিশ নিরাপত্তা দিয়ে দুর্বৃত্তদের মিছিলকে সাহায্য করেছে। কংগ্রেস আরও অভিযোগ তোলে, কারফিউ আইন ঠিকভাবে বলবৎ করা হয়নি। প্রথম দু-রাত কলকাতা ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। পরিবহণ বলতে যা ছিল তা হল মুসলিম দাঙ্গাবাজদের বহনকারী লরি। তাদের হাতে হাতে ছিল বিনামূল্যে পেট্রোল তোলার কুপন। মৃতদেহগুলি নর্দমায় ফেলে দেওয়া হয়। শত শত মৃতদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

কংগ্রেসের বক্তব্য ছিল— ভারতবর্ষে এর আগে কখনো কোথাও এরকম ঘটনা ঘটেনি। তাই কংগ্রেস কার্যনির্বাহক কমিটি চায় একটি নিরপেক্ষ তদন্ত। সরকারকেও মানুষের জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলা বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রায় একইরকম বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছিল দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায়। যেমন লেখা হয়েছিল—

The sum of tragedy known at the time of writing is over 270 killed, more than 1600 injured and 900 buildings on fire, much looting in many parts of the city. Direct Action Day has given the city two days of horror… Ministers were dubious. The degree of their failure to think and act rightly is visible all over Calcutta today… The bands of ruffians rushing about in lorries, stopping to assault and attack and generally spreading fear and confusion, found the conveyances they wanted. [ref. Aug. 18, 1946-editorial]

ফের ২০ অগাস্ট, ২১ অগাস্ট এবং ২২ অগাস্ট তীব্র ঘৃণা বর্ষণ করে দ্য স্টেটসম্যান-এর সম্পাদকীয়গুলি।

The verdict we repeat. … we believe the worst communal rioting in India’s history, was a political demonstration by the Muslim League… The bloody shamples to which the country’s largest city has been reduced is an abounding disgrace which owing to the Bengal Ministry’s prominance as a League Ministry has inevitably tarnished seriously the All India reputation of the League itself.

আরও কড়া ভাষায় সমালোচনা বর্ষিত হয় ২২ অগাস্টের সম্পাদকীয়তে—

The group of incompetents, or worse, who owing to their office necessarily bear primary responsibility for the communal carnage in Calcutta, a castastrophe of scope unprecedented in Indian History, have been insufficiantly seen or heard in those grim days. We mean our ministry.

এত ঘৃণা, এত বিদ্বেষ, এত উষ্মা প্রকট হওয়ার পরেও মুসলিম লিগ একবারের জন্যও লজ্জা বা অন্যায় স্বীকার করেনি। মুখ্যমন্ত্রী সুরাবর্দি বুক ফুলিয়ে বঙ্গ প্রাদেশিক সভায় বিধানসভার অন্দরে প্রধানমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসে বিরোধীদের বক্তব্যের মুখোমুখি হবার মতো যুক্তি জিভের ডগায় না থাকায় অকথ্য ভাষায় গলাবাজি করেছেন। ঠিক কেমন ছিল সেই সুরাবর্দির আচরণ? আসুন দেখে নিই।

সুরাবর্দি শ্যামাপ্রসাদকে ‘গুন্ডা’ বললেন

—আপনি নিজেই তো একজন গুন্ডা।

একটু গলা নামিয়ে কথাটা বলেছিলেন সুরাবর্দি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লক্ষ করে।

শ্যামাপ্রসাদের কান ছিল খাড়া। সুরাবর্দির ওই অস্পষ্ট কণ্ঠস্বরও এড়িয়ে যায়নি তাঁর শ্রবণশক্তি। সেকেন্ডের মধ্যে বুলেটের মতো ছুটে আসে শ্যামাপ্রসাদের জবাব—

—আমি যদি গুন্ডা হই, তাহলে আপনি সুরাবর্দি হলেন গুন্ডাদের সর্দার। আপনি জবাব দিন, যাদের লুণ্ঠিত সম্পদ সমেত গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তারা সকলেই মুসলমান কেন? কেন একজনও হিন্দু নেই? মুসলমানরা গ্রেপ্তার হল, আর দশ মিনিটের মধ্যে সুরাবর্দি নিজে গিয়ে তাদের ছেড়ে দিলেন। এ তো বানানো অভিযোগ নয়। এটা রেকর্ডের্ড— নথিভুক্ত।

বিরোধী বেঞ্চ থেকে জোরালো আওয়াজ উঠল ‘শেম শেম! “ কিন্তু, নির্লজ্জের আর লজ্জা হয়েছে কবে, কোথায়?

সুরাবর্দি কী বললেন?

বললেন, ‘লুণ্ঠন? কোথায়? ওই লরিটায় শুধু চাল আর ডাল পাওয়া গিয়েছিল। সেটা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল চিৎপুরের এক মুসাফিরখানায়। যদি ওইভাবে খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ না করা হত তাহলে অনেকেই অনাহারে মারা যেত। আর গ্রেপ্তার? ওসব কিছুই জানি না।’

কিন্তু, মানুষটার নাম শ্যামাপ্রসাদ— শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। আপোশের রাস্তায় হাঁটা তাঁর চরিত্রবিরোধী। অতএব, বলে চললেন—

‘কলকাতায় যে ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেছে, তা কিন্তু তাৎক্ষণিক বিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, প্রশাসন তার নিষ্ক্রিয়তা এবং সাম্প্রদায়িক মনোভাবের দ্বারা এই সুন্দর সুস্নাত বঙ্গভূমিকে রক্তাক্ত করেছে।… যে প্রদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল অটুট, তাকে একেবারে শেষ করে দিয়েছে।’

শ্যামাপ্রসাদ লিগ নেতাদের মনে করিয়ে দিলেন—

‘আপনারা বোম্বে অধিবেশনে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? বলেছিলেন, যদি ক্যাবিনেট মিশন ভারতীয় মুসলিমদের স্বার্থরক্ষায় অপারগ হয়, তাহলে দেশব্যাপী ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি করা হবে। তার ওপর সুরাবর্দি বলে বসলেন, অদূর ভবিষ্যতে তিনি বঙ্গভূমিকে স্বাধীন স্বতন্ত্র বঙ্গদেশ বলে ঘোষণা করবেন। সুরাবর্দির এই বক্তব্যে আমার মনে তিনি মানসিকভাবে সুস্থ কি না, তা নিয়ে সন্দেহ জাগছে। এর মানে তো ভারত থেকে বাংলাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। নিঃসন্দেহে তাঁর ভাষণের মধ্যে অভিসন্ধি লুকিয়ে রয়েছে। দাঙ্গায় কতজন মুসলিম বা কতজন হিন্দু মারা গেলেন, সেটা বিচার্য নয়। বিচার্য যে, সরকার কেন নাগরিকের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করতে পারল না?’

দাঙ্গা থামার পর বিধানসভার বাগযুদ্ধে সুরাবর্দি শ্যামাপ্রসাদকে ‘গুন্ডা’ বলেছিলেন। জবাবে শ্যামাপ্রসাদ বলেছিলেন, “আমি যদি গুন্ডা হই, আপনি হলেন গুন্ডাদের সর্দার।’

দাঙ্গা থামার পর বিধানসভার বাগযুদ্ধে সুরাবর্দি শ্যামাপ্রসাদকে ‘গুন্ডা’ বলেছিলেন। জবাবে শ্যামাপ্রসাদ বলেছিলেন, “আমি যদি গুন্ডা হই, আপনি হলেন গুন্ডাদের সর্দার।’

এই সময় সুরাবর্দি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—

—বেলা বারোটা নাগাদই বুঝেছিলাম, অবস্থা আয়ত্তের বাইরে যাচ্ছে।

—তাহলে তখন দাঙ্গা থামাতে কী কী ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেন? কেন আপনি কলকাতার শাসনভার সাময়িকভাবে সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দিলেন না? নিজে কাউকে রক্ষা করতে পারলেন না, তার ওপর নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে রইলেন। কেন আপনি সঙ্গেসঙ্গে গোটা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করলেন না? নির্ভেজাল চিত্তে শহরটাকে ছেড়ে দিলেন দুর্বৃত্তদের হাতে! অবস্থা আয়ত্তে নেই জেনেও তার ওপর ময়দানে সভা করার অনুমতি দিলেন! রাজ্যের মুখ্য প্রশাসক হয়েও একাজ করতে পারলেন? শুক্রবার দাঙ্গার সূত্রপাত। শুক্রবার রাতেই আপনি সংবাদসংস্থা API কে বললেন, শহরের অবস্থার উন্নতি হয়েছে? উন্নতি হলে ওইদিন রাতে কারফিউ জারি করলেন কেন? সেই কারফিউ পরেরদিনও বহাল থাকল, তার পরেও কীভাবে লালবাজার থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে অজস্ৰ দোকান লুঠ হল, পথচলতি মানুষ আর দোকানদারদের টেনে টেনে নির্মমভাবে কোপানো হল ধারালো অস্ত্র দিয়ে? পুলিশ সব জানল, দেখল। কিন্তু, এক অজ্ঞাত কারণে তারা কাঠপুতুলের ভূমিকা পালন করল।

শ্যামাপ্রসাদের প্রশ্নবাণের মুখে অস্থির সুরাবর্দি তখন পালানোর পথ খুঁজছেন। কিন্তু, থামছেন না শ্যামাপ্রসাদ—

‘২৩ অগাস্ট আপনি বিদেশি সংবাদপত্রকে যে খবর পাঠিয়েছিলেন, তাতে লিখেছিলেন, হিন্দুরাই এই দাঙ্গা বাধিয়েছে। সেইসঙ্গে দায়ী করেছেন ব্রিটিশ নিষ্ক্রিয়তাকেও। আজকে আপনি যা বলছেন, তার সঙ্গে এবং সত্যের সঙ্গে আপনার সেদিনের বার্তার কোনো মিল নেই। আপনি প্রশাসনিক প্রধান হয়ে শহরের পুলিশ কমিশনারকে বাগে আনতে পারেননি, সেটা আপনার ব্যর্থতা। পার্ক স্ট্রিটে এক ইউরোপীয় সার্জেন্টকে কিন্তু দেখা গিয়েছিল একজন গুন্ডাকে লুণ্ঠিত সামগ্রীসহ পার্ক স্ট্রিট থানায় ধরে এনেছে।’ শ্যামাপ্রসাদ যত প্রশ্ন তুলছেন, ততই ম্লান হচ্ছে সুরাবর্দির মুখের বলিরেখা। ‘বলুন তো মুসলিম লিগ বাংলার সরকারের কাছ থেকে- ৫০০ গ্যালন পেট্রোল চেয়েছিল কেন? সে-আবেদন নাকচ হবার পরে একজন মন্ত্রীর নামে বিনামূল্যে পেট্রোল পাওয়ার কুপন বিলি হল কীভাবে? কেন সুরাবর্দি আপনি হাওড়ায় প্রশাসনিক আধিকারিকদের বলে এলেন, মুসলমান দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিতে?’

মুসলিম লিগের সদস্যরা ‘হো হো’ আওয়াজ তুলছেন সমানে যাতে শ্যামাপ্রসাদের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু, হিন্দু বাঙালির জন্য যিনি লড়াই করতে পারেন জওহরলাল, জিন্নার মুখোমুখি, তিনি ডরাবেন সুরাবর্দি আর তার পারিষদদের?

গলার স্বর আরও উঁচুতে উঠল শ্যামাপ্রসাদের। সেই বজ্রগম্ভীর কণ্ঠস্বরে চাপা পড়ে গেল ‘হো হো’ ধ্বনি। বিধানসভার দেওয়ালে দেওয়ালে তখন শ্যামাপ্রসাদের চ্যালেঞ্জ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—

‘সব সত্যি এখনও বলিনি। এই সভাগৃহে বাকি সত্যিগুলো ফাঁস করে দিলে লিগের আমার বন্ধুরা বড্ড অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে যাবেন। তাঁরা হঠাৎ জেগে উঠবেন দিবাস্বপ্ন ভেঙে। পরিকল্পিতভাবে সুরাবর্দি সাহেব তাঁর পরস্পরবিরোধী সত্তার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। কিন্তু, এসব করে পার পাওয়া যাবে না। মানুষ জানতে চাইছে, আপনি কি এইভাবেই মানুষের জীবন ও সম্পত্তি অসুরক্ষিত রেখে দেশ চালাবেন? আপনি কি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন, চরম অসফলতার পরও আপনি ক্ষমতার সিংহাসন আঁকড়ে বসে থাকবেন? পারবেন না, মানুষ বলছে, নির্মমতম কলকাতা দাঙ্গার পর আপনার আর একমুহূর্ত প্রশাসনিক প্রধানের পদ আঁকড়ে বসে থাকার নৈতিক বা আইনগত অধিকার নেই।

আইন পরিষদে প্রশ্ন তুলেছিলেন এ কে ফজলুল হকও। বললেন— মুসলিম লিগের মুখপাত্র এবং লিগপন্থী কিছু পত্রপত্রিকা ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য ধর্মের প্রতি বিষোদগার করে গেছে। ধর্মীয় বিভাজনে ইন্ধন জুগিয়েছে। কেন শহর কলকাতার শাসনভার দুর্বৃত্তদের হাতে চলে গেল? দুষ্কৃতীরা এমন কিছু স্লোগান দিচ্ছিল যা অত্যন্ত আপত্তিকর। তাদের হাতে পৌঁছে গিয়েছিল প্রচুর পেট্রোল। একটির পর একটি লরিতে উঠে তারা সশস্ত্রভাবে শোভাযাত্রা করেছে। বেনিয়াপুকুর অঞ্চলে সমস্ত হিন্দুকে বাধ্যতামূলকভাবে পাকিস্তানের প্রস্তাবে সই করতে বলা হয়েছিল।… এমনকী অনেককে জোর করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরণ করা হয়। প্রশ্ন হল, পুলিশ কী করছিল? তাদের চোখের সামনে কী করে এমন অপরাধ সংগঠিত হল? ক্রিমিনাল ইনটেলিজেন্সের সদস্যরা কেন সক্রিয় হননি? সশস্ত্র শোভাযাত্রাগুলিকে শহর পরিক্রমার অনুমতি দিল কারা? কীভাবে এত দীর্ঘসময় ধরে লুঠ এবং হত্যার ঘটনাগুলি ঘটে গেল?… শহর জুড়ে নির্বিচারে লুঠ, হত্যা, ধর্ষণ, নারীহরণের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের কাছে গেলে পুলিশ বলেছে, অ্যাকশন নেবার কোনো নির্দেশ নেই।… এই নিষ্ক্রিয়তার পিছনে কি কোনো ষড়যন্ত্র ছিল? কার ষড়যন্ত্র সরকার জানাক। জেলাশাসক থেকে থানার আধিকারিক— প্রায় সবাই মুসলমান। এইভাবেই পুলিশের মধ্যেও সরকার বিভাজন এনেছে। মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করছি আপনি জবাব দিন— ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট কতজন হিন্দু আর কত মুসলমান? পুলিশ আধিকারিকদের কত মুসলিম, কত হিন্দু? থানা আধিকারিকদের কতজন হিন্দু? সমস্ত মুসলমান আধিকারিকরাই অপদার্থ। তাই কোনো হিন্দুর প্রাণের কোনো নিরাপত্তা এরাজ্যে থাকছে না। এভাবেই হিন্দুদের উৎখাত করার পরিকল্পনা পাকা করা হচ্ছে।

সুরাবর্দির ‘সত্যকথন’

ফজলুল হক সুরাবর্দির পক্ষে কথা বলবেন না, তা সুরাবর্দি ভালোভাবেই জানতেন। তবে, বুঝতে পারেননি একজন মুসলমান আর একজন মুসলমানকে পুরোপুরি শ্যামাপ্রসাদের ভাষাতেই আক্রমণ করবেন।

একবার গোটা সভাঘরের সদস্যদের ওপর চোখ বুলিয়ে নিলেন। বুঝতে পারছেন না, বক্তব্য আক্রমণাত্মক রাখবেন, নাকি, সহজসরলভাবে বুঝিয়ে দেবেন। তিনি কিছু ভুল করেছেন, কিন্তু সব ঘটনার দায় তাঁর নয়। তবে মুসলিম লিগের মধ্যে আরও কেউ কেউ ফজলুল হক হয়ে উঠলে মুশকিল।

মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ চেয়েছিলেন পাকিস্তান আর জওহরলাল নেহেরু চেয়েছিলেন স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার। দু-জনের মধ্যে শত্রুতার অবসান হয়েছিল এই রফাসূত্রের মাধ্যমেই।

মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ চেয়েছিলেন পাকিস্তান আর জওহরলাল নেহেরু চেয়েছিলেন স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার। দু-জনের মধ্যে শত্রুতার অবসান হয়েছিল এই রফাসূত্রের মাধ্যমেই।

চালাক মানুষ সুরাবর্দি। বুঝলেন, যা সবার সামনে ঘটেছে তাকে আড়াল করে লাভ নেই। কিন্তু, এখন সব দায় তাঁর এটা মেনে নিলে জিন্নাহ্ তাঁকে ‘খোঁয়াড়ের শুয়ার’ বলেই গালাগাল দেবেন। তাই কণ্ঠে ভারসাম্য বজায় রেখে বললেন-

‘একটা কথা প্রথমেই বলে নিই। আমার মনে হিন্দুদের সম্বন্ধে কোনো অসন্তোষ নেই। তবে, যে ঘটনা ঘটে গেছে তার জন্য আমি যদি দায়ী হই, তাহলে আংশিকভাবে হলেও দায়ী হিন্দুদের একাংশ, কংগ্রেস এবং ব্রিটিশ আধিকারিকরা।… একটা কথা ভুললে চলবে না, হিন্দু এবং মুসলমানের রাজনৈতিক সংঘর্ষ নতুন ঘটনা, এমন নয়। পাকিস্তান এবং হিন্দুস্তান দুই আদর্শবাদের মধ্যেই হিন্দু এবং মুসলমানের ভাবাবেগ জড়িয়ে রয়েছে।… মুসলমানরা সংঘবদ্ধভাবে পাকিস্তান সৃষ্টির সপক্ষে ভোট দিয়েছে। আর, কংগ্রেস অবিভক্ত ভারতবর্ষের ধারণাকে সামনে রেখে জয়লাভ করেছে।… কিন্তু, ক্যাবিনেট মিশন মুসলিম লিগের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে অসহযোগিতা করেছে। মুসলিম লিগ প্রতারিত, প্রবঞ্চিত হয়েছে।… মুসলমান সমাজ এখন একটি শ্বাসরুদ্ধকারী অবস্থায় আটকে পড়েছে। মুসলমানরা এখন কী করবে? ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে? কংগ্রেস ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গড়তে চলেছে। আশ্চর্যের কথা, এই সরকারে কোনো মুসলমান থাকবে না। মুসলিম লিগ এটা মানতে চাইছে না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতের বুকে বিভাজনের রাজনীতি করছে। হিন্দু-মুসলমানকে এক হয়ে এর প্রতিবাদ করতে হবে। মুসলমান আর কতকাল অন্যায়ভাবে সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করবে?… প্রত্যক্ষ সংগ্রামের দিনটি এসেছে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে। একথা সত্য, প্রত্যক্ষ সংগ্রাম অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়েছে। কিন্তু, উৎসের কথাটা সকলের ভাবা উচিত। যা ঘটেছে তার জন্য একটি সম্প্রদায়কে দায়বদ্ধ করা উচিত নয়। এর জন্য অন্যান্য সম্প্রদায়ও দায়বদ্ধ।’

কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার সদস্যরা সম্মিলিতভাবে এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। তবু সুরাবর্দি নিজের কোলেই ঝোল টেনে একের পর এক মিথ্যা কাসুন্দির পাহাড় উগরে দেন। যেমন, ‘পুলিশ যথেষ্ট কাজ করেছে। পরিবহণ ব্যবস্থা চালু ছিল। খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে যথাযথভাবে।’… আমরা চেয়েছিলাম শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে। তাই ১৫ অগাস্ট কলকাতার পুলিশ কমিশনার সমস্ত পুলিশ আধিকারিকদের কর্মরত অবস্থায় থাকার নির্দেশ জারি করেছিলেন। রাজ্য মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তও তাই ছিল। কিন্তু, ১৬ অগাস্ট সকাল ৫টা থেকে যেসব ঘটনা ঘটতে শুরু হল তা নিবারণের ক্ষমতা আমাদের ছিল না।’

সুরাবর্দি বললেন—

‘১৬ অগাস্ট সকালের দিকে যা ঘটেছে সবই বিক্ষিপ্ত ঘটনা, এগুলি সাম্প্রদায়িক ঘটনা ছিল না। সকাল ৮টার পর বুঝতে পারি, অবস্থা ক্রমশ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। বেলা দুটোর মধ্যে আমি লালবাজার পুলিশ কন্ট্রোল রুমে পৌঁছে যাই। বেলা ২.৪৫-এর মধ্যে গোটা শহর পুলিশের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। তখন মিলিটারিকে তৈরি থাকতে নির্দেশ পাঠাই। বিকেল সাড়ে চারটার পর পুলিশ আধিকারিক এবং সামরিক বাহিনীর আধিকারিককে ডেকে নেওয়া হল সিভিল পুলিশকে সাহায্য করার জন্য।’ সভায় প্রশ্ন ওঠে, গোটা শহর যখন অরক্ষিত তখনও ময়দানে সভা তিনি স্থগিত করলেন না কেন? কেন তিনি সভাপতির আসনে বসে পাকিস্তান সৃষ্টির ডাক দিলেন? কেন উত্তেজক ও ভয়ংকর সব শব্দ ব্যবহার করে মুসলমান সমাজকে উত্তেজিত করে তুললেন? ময়দানের সভায় মুসলমানরা লাঠি, ছোরা হাতে যোগ দিয়েছিলেন কেন? তার মানে কি আগে থেকে হত্যা এবং লুণ্ঠনের পরিকল্পনা পাকা ছিল?’

সুরাবর্দি অভিযোগ করলেন—

‘বহু জায়গায় মুসলিম শোভাযাত্রায় হিন্দুরা বাধা দেয়। কিন্তু, কোথাও ইউরোপীয়রা বাধা দেয়নি। তবে, সেসব ঘটনা ছিল ছোটোখাটো। পরে দুর্ঘটনার মাত্রা বাড়তে থাকে। লালবাজার কন্ট্রোল রুম থেকে আমি সবদিকে নজর রেখেছিলাম। পুলিশ প্রচুর পরিশ্রম করেছে শান্তি বজায় রাখতে। পুলিশের সামনে লুঠপাট হয়েছে— এটা আমি মানতে পারব না। যেখানে যেমন দরকার, পুলিশ তেমনই পদক্ষেপ নিয়েছে।… পুলিশকে নিষ্ক্রিয় থাকার কোনো আদেশ কোনোদিনও দেওয়া হয়নি। তবে হ্যাঁ, পুলিশের সংখ্যা অপ্রতুল হওয়ায় কোথাও কোথাও ঠিকমতো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।… লালবাজারে বসে আমি অনেক আবেদনে সাড়া দিয়েছি। পুলিশ পাঠিয়েছি। আমি কাজে তৎপরতা আনার জন্যই কন্ট্রোল রুমে বসে ছিলাম দিনরাত। বিকেল থেকে সামরিক বাহিনী নেমে পড়ে পুলিশকে সাহায্য করতে।

হোসেইন সুরাবর্দির এই ‘সত্যকথন’ বিধানসভায় উপস্থিত কারো কাছেই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি। কারণ, মুসলমানরা নিজেরাই জানতেন, কোথায় কী হয়েছে কোন পরিকল্পনার ভিত্তিতে এবং তাঁদেরও কেউ কেউ জড়িয়ে দিলেন সেইসব চক্রান্তে। আর, হিন্দুরা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মাশুল দিয়ে জেনেছেন— সত্যটা আসলে কী ছিল। তাই বিরোধী নেতাদের দাবি— ‘তদন্ত কমিশন’ বসাতে শেষমেষ রাজি হতে বাধ্য হয়েছিল মুসলিম লিগ সরকার। অবশ্যই ব্রিটিশের প্রশাসনিক চাপে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%