পালটা আক্রমণ পথে হিন্দুরা

সুজিত রায়

মুসলিম লিগের তরফ থেকে এ আন্দোলন (প্ৰত্যক্ষ সংগ্রাম) বা (ডাইরেক্ট) একশন কার বিরুদ্ধে এটা পরিষ্কার ও ভালোভাবে ব্যাখ্যা না দেওয়ার ফলে কলকাতার হিন্দুদের মনে স্বভাবতই ধারণা হয় যে, এই ডাইরেক্ট একশন তাদের বিরুদ্ধেই চালান হবে। তাই ১৬ অগাস্টের বেশ কিছুদিন আগে থেকে তারা মুসলমানদের আক্রমণ প্রতিরোধ করবার জন্য সক্রিয়ভাবে প্রস্তুত হয় এবং এ ধরনের সংঘর্ষে যারা প্রথম আক্রমণ করে তারাই শেষপর্যন্ত জয়ী হয়— এই দর্শন অনুযায়ী ১৫ অগাস্ট ভোর থেকেই হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় মুসলমানদের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ আরম্ভ করে দেয়।

—মো: আবদুল মোহাইমেন-এর প্রবন্ধ ‘কলকাতার দাঙ্গা’ [সৌজন্য : দাঙ্গা থেকে দেশভাগ ‘মুসলমান’ বাঙালির প্রতিক্রিয়া : সংকলন ও সম্পাদনা-সৌম্য বসু, খড়ি প্রকাশনী, ২০২৪]

The Hindu Crowd was initially defensive, as an Intelligence Branch Report indicates. But once they started hunting back their violent acts were no less organised than those of their rivals.

—Communal Riots in Bengal 1905-1947: Suranjan Das, OIP 2022, pp 180

.

‘৪৬-এর কলকাতা কলাবাগান বস্তি ছবি সৌজন্য : ‘লাইফ’ পত্রিকা

.

১৬ অগাস্ট ১৯৪৬।

সকাল থেকে কলকাতা শহরের অলিগলি আর রাজপথ জুড়ে বুকে আতঙ্ক ধরানো আওয়াজ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছিল ইসলামিক মিছিলের সার হতে— ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান। কাফের লোগোঁকো মার ডালো।’ বিক্ষিপ্তভাবে শহরের এপ্রান্তে-ওপ্রান্তে পথচলতি মানুষের পেট চিরে দেওয়া, দোকানপাট লুঠ, হিন্দু বাড়ি ঘিরে ‘মার ডালো, মার ডালো’ আওয়াজ উঠেছিল পাড়ায় পাড়ায়। কিন্তু, সবটাই ছিল বিক্ষিপ্ত ঘটনা। সেই বিক্ষিপ্ত ঘটনা যখন দুপুরের পর হয়ে উঠল একতরফাভাবে মারণঘাতী, তখন হিন্দুদেরও হাতে হাতে উঠে এল তরোয়াল, ছোরা, পিস্তল, বোমা। মারাঠা রাজ শিবাজির মতো। প্রথমে রক্ষণাত্মক ভূমিকা। মারমুখী মিছিলকে ভয় দেখানো। যখন তারপরেও আছড়ে পড়ল মুসলমানদের নৃশংস হত্যার ঝড়, তখন আর রোখা গেল না। হিন্দু আক্রমণের ঝড় আছড়ে পড়ল মুসলমানদের ওপর সর্বগ্রাসী হয়ে। সে-আক্রমণ রোখার ক্ষমতা মুসলমানদের ছিল না।

‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’-এর অছিলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শত্রুর বদলে যে ‘হিন্দু নিধন যজ্ঞ’ শুরু করবে সুরাবর্দির ঘাতক বাহিনী সে-ব্যাপারে প্রায় নিশ্চিত ছিলেন হিন্দু নেতারা— কংগ্রেসের এবং হিন্দু মহাসভারও। বোঝাই যাচ্ছিল— দাঙ্গা আসবেই এবং সেই দাঙ্গা হবে ঐতিহাসিক। অতএব, তলে তলে কংগ্রেস নেতা বিজয় সিং নাহার, দেবেন দে, ইন্দুভূষণ বিদ, হরেন ঘোষ প্রমুখ যেমন আত্মরক্ষার জন্য হিন্দু পাড়ায় পাড়ায় সচেতন থাকার প্রচার চালিয়েছিলেন, তেমনি হিন্দু মহাসভাও হিন্দুদের একত্রিত হয়ে দাঙ্গা রুখতে তৈরি থাকার ডাক দিয়েছিল।

হিন্দু মহাসভারই একটি সামাজিক সংগঠন হিন্দু সেবক সংঘ হিন্দুদের মধ্যে একটি প্রচারপত্র বিলি করে আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেবার আহ্বান জানিয়ে। পাড়ায় পাড়ায় সংঘের তরফে সেঁটে দেওয়া হয় পোস্টার— ‘সাবধান! ১৬ অগাস্ট।’ এটা ছিল জোরদার হুঁশিয়ারি।

কলকাতার বিভিন্ন এলাকার ব্যায়াম সমিতিগুলির ওপর হিন্দু মহাসভার ব্যাপক প্রভাব ছিল। কারণ, এইসব সমিতিগুলিতে মহাসভার যুবক সদস্যরা নিয়মিত শক্তিচর্চা করত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সমিতি তথা আরএসএসের সদস্যদের মতোই। মহাসভা এইসব সমিতিগুলিকে ইউনিফর্ম বা ব্যায়াম করার সাজসরঞ্জামও কিনে দিত মাঝে মাঝে। এইসব সমিতির যুবকরা পাড়ার পুলিশের আড়কাঠি বা চর হিসেবে কাজ করত যারা, তাদের কাছ থেকে মুসলমানরা কী করতে চলেছে, সেসব খবরাখবর সংগ্রহ করে জেনেছিল— আক্রমণের শিকার হবে হিন্দুরা। বাড়িতে বাড়িতে আগুন দেওয়া হবে। আগুন থেকে বাঁচতে রাস্তায় নামলেই শুরু হবে হত্যা, ধর্ষণ, লুঠপাট। অতএব, হিন্দুদের ঘরে ঘরে পাড়ায় পাড়ায় ‘তৈয়ারি’ শুরু হল।

সেদিনের কথা শীর্ষক স্মৃতিচারণায় বিশিষ্ট বামপন্থী নেত্রী মণিকুন্তলা সেন বলেছেন, ‘কিছু একটা অঘটন ঘটবে এটা সবাই অনুমান করেছিল। সুতরাং হিন্দুরাও পাড়ায় পাড়ায় তৈরি হল।’ যদিও ১৬ অগাস্টের মুসলিম লিগের প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অংশগ্রহণ নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থানটা যথেষ্ট স্বচ্ছ ছিল না। হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেস ১৬ অগাস্টের ধর্মঘট ও সার্বজনীন ছুটির তীব্র বিরোধিতা করেছিল বাস্তব সচেতনভাবেই। কিন্তু, বামপন্থীরা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ ও অস্তিত্বরক্ষার তাগিদে সরাসরি মুসলিম লিগের বিরোধিতা করতে পারছিল না।

সমসাময়িক ইতিহাসে দেখা যাচ্ছে, প্রাদেশিক আইন পরিষদে ১৬ অগাস্ট ছুটি ঘোষণার বিরুদ্ধে হিন্দু মহাসভার প্রস্তাব ৩১-১৩ ভোটে নাকচ হয়ে যায়। কিন্তু, দু-পক্ষের মধ্যে যে বিতর্ক হয়েছিল তাও একটা ইতিহাস। ব্রিটিশ প্রশাসকরা বুঝেছিলেন, মারাত্মক কিছু একটা ঘটবে। তাই তৎকালীন গভর্নর লর্ড আর্চিবল্ড পার্সিভাল ওয়াভেল মন্তব্য করেছিলেন, ‘League resolution will certainly increase communal tensions in the towns.’ [Source: The Transfer of Power, ed by N Mansergh vol VIII, pp 154] লর্ড ওয়াভেল চাইছিলেন— জোরদার কিছু সমস্যা আছড়ে পড়ার আগে কংগ্রেসকে দিয়ে মন্ত্রিসভাটা গঠন করে দিয়ে ভারত ছেড়ে পালাবে। দরকারে লিগকে বাদ দিয়েই এগোবে ব্রিটিশ সরকার।

ওদিকে জওহরলাল নেহরু তখন বাংলায় কী হবে তা নিয়ে তেমন কিছু ভাবছিলেন না। তাঁর মাথায় তখন ঘুরঘুর করছে প্রধানমন্ত্রিত্ব। ওটা পেতেই হবে। তাই যতরকমভাবে সম্ভব মুসলিম লিগের বিরোধিতাই করে যাচ্ছিলেন এবং মনে-প্রাণে চাইছিলেন, জিন্নাকে পাকিস্তান দেওয়া হোক। তাঁর কোনো আপত্তি নেই। যদি জিন্নাহ্ বাংলাটা নিতে চায় তো নিক। কিন্তু, ভারত স্বাধীন হোক এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নাম থাকুক উজ্জ্বল হয়ে। অতএব, তিনি অমৃতবাজার পত্রিকা- একটি বিবৃতি দিলেন দাঙ্গা শুরুর পাঁচদিন আগে ১১ অগাস্ট— ‘We shall try to unite those knots (created by Muslim League). But if those knots prove obstinate, we will cut them.’

একদিন পরেই হিন্দু-মুসলিম রক্তের হোরি খেলবে। ১৫ অগাস্ট নেহরু- জিন্নাহ্ মুখোমুখি হলেন। কী কথা হল গোপনই থেকে গেল। নেহরুকে কোনোভাবেই মুখ খোলানো গেল না। একমাত্র কংগ্রেস নেতা মৌলানা আবুল কালাম আজাদ প্রকাশ্যে বিবৃতি দিলেন— ‘মুসলিম লিগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসটি কেমন যেন অন্য ধরনের মনে হচ্ছিল। কলকাতায়, মনে হচ্ছিল, ১৬ অগাস্টে মুসলিম লিগ কংগ্রেসপন্থীদের ওপর আক্রমণ চালাবে এবং তাদের ধনসম্পদ লুণ্ঠন করবে। বাংলার সরকার ১৬ অগাস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণা করায় অধিক মাত্রায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কংগ্রেস আইন পরিষদে এই ধর্মঘটের বিরোধিতা করেছে। ‘কলকাতার মানুষের মনে চরম উদবেগ ছড়িয়েছে কারণ তখনও মুসলিম লিগ সরকার ক্ষমতায় রয়েছে আর প্রধানমন্ত্রী রয়েছেন হুসেন শাহিদ সোহরাওয়ার্দী।’ [Source : India wins Freedom : Abul Kalam Azad, pp 168]

মুক্তি বাম বন্দিদের

‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ উপলক্ষে যখন মুসলিম লিগের বহুমুখী প্রচার তুঙ্গে, তখন কিন্তু পিছিয়ে ছিলেন না কংগ্রেস নেতারাও। বিজয় সিং নাহার শাক দিয়ে মাছ না ঢেকেই বলেছিলেন, ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম আসলে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে।’ আইন পরিষদের ইউরোপিয়ান সদস্য জি মর্গান বলেছিলেন, ‘যে হাঙ্গামার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তা রুখতে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক থাকতে হবে।’ ১৪ অগাস্ট দেশপ্রিয় পার্কে একটি জনসভায় বাংলার কংগ্রেস সভাপতি সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়কে প্ররোচনার ফাঁদে পা না দিতে সতর্ক করে দেন। ১৬ অগাস্ট সকালে অমৃতবাজার পত্রিকা-য় সম্পাদকীয় বক্তব্য ছিল: পরিস্থিতি যা তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র স্বাধীনতা-তেও ওইদিন ঘরোয়া লড়াই এবং ব্যাপক দাঙ্গার আশঙ্কা প্রকাশ করে হিন্দু- মুসলিম মিলিত সংগ্রামের আহ্বান জানানো হয়।

কিন্তু, সমস্যা ছিল বামপন্থীদের মধ্যেই। প্রত্যক্ষ সংগ্রামের মিছিলে অংশগ্রহণ এবং ধর্মঘটকে সমর্থন করা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত মতামত থাকলেও শেষপর্যন্ত শ্রমিক স্বার্থেই ধর্মঘট ও মিছিলে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বামপন্থীরা— বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়নগুলি। বামপন্থীদের এই সিদ্ধান্তের পুরস্কার দিয়েছিলেন সুরাবর্দি। হিন্দু নিধন যজ্ঞ শুরুর ঠিক আগের দিনই ১৫ অগাস্ট লিগ সরকার বন্দি বিপ্লবীদের মুক্তি দেবার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। বন্দিদের মধ্যে ছিলেন মূলত কমিউনিস্টরাই— যেমন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন খ্যাত গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহ, নলিনী দাস প্রমুখ। এই ঘটনা প্রমাণ করে বামপন্থীরা সেদিনও ‘মানুষের স্বার্থে রক্ষণাত্মক ভূমিকা’ নেবার কথা ঘোষণা করলেও আসলে মুসলিম লিগের সঙ্গে আপোশের হাতই বাড়িয়ে দিয়েছিল।

ব্রিটিশ সরকারের কাছে পরিস্থিতিটা ছিল ‘Novel and Serious’। [Ref Transfer of Power, N Monsergh, pp 143] ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর পরিষ্কার অবস্থান ছিল : আমরা কোনো ঝুটঝামেলায় জড়াব না। যারা স্বাধীনতা চায়, তারা তার জন্য সংগ্রাম করুক। হয়তো এই কারণেই গভর্নর দাঙ্গা চলাকালীনই সেনা নামাতে দেরি করেছিল।

কিন্তু, তৈরি ছিল হিন্দু তরতাজা যুবকেরা। আমহার্স্ট স্ট্রিটের একটা শিবমন্দিরে জড়ো করা হয়েছিল প্রচুর লাঠি ও মুগুর। বেশ কয়েকটি বাড়ির ছাদে মজুত করা হয়েছিল ইট ও পাথরের ভাঙা টুকরো যা প্রকৃতপক্ষে পঙ্গপালের মতো আক্রমণ শানাতে পারে।

হিন্দুদের কাছে চর মারফত খবর এসে পৌঁছেছিল— গুন্ডা-অধ্যুষিত মুসলিম মহল্লায় টাকা ছড়াচ্ছিলেন সুরাবর্দি। আর, সেই টাকায় কামারশালায় বিভিন্ন রকমের মারণঘাতী অস্ত্র তৈরির অর্ডার দেওয়া হচ্ছিল। বেকার হোস্টেল, মুসলিম ইনস্টিটিউটের হোস্টেলের ঘরে ঘরে জড়ো করা হয়েছিল কেরোসিন আর মেথিলেটেড স্পিরিট। মাড়োয়ারি ব্যবসাদাররা ঘরে ঘরে প্রচুর পরিমাণে অস্ত্র জড়ো করেছিল, বিলিয়েছিল হিন্দুদের ঘরে ঘরে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলি ছোটো ছোটো কাপড়ের আর কাগজের বল তৈরি করে রেখেছিল। সময়ে যাতে সেগুলো কেরোসিনে ভিজিয়ে আগুন লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে ঠেকানো যায়। সব বাড়িরই ছাদে ছিল প্রচুর ইট-পাথরের টুকরো।

হিন্দুরা রক্ষণাত্মক

সুরঞ্জন দাস তাঁর Communal Riots in Bengal 1905-1947 গ্রন্থে হিন্দুদের প্রস্তুতির বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন :

A considerable section among the Hindus were no less organised on 16 August. Provocative speeches at League rallies had already made the Hindu leaders apprehensive of Muslim moves and encouraged them to adopt precautionary measures. The Marwaris allegedly purchased arms and ammunitions from American soldiers which were later used during the riot; acid bombs were manufactured and stored in Hindu-owned factories long before the outbreak. Most of Calcutta’s blacksmiths were Hindus and they were mobilized for the manufacture of spear heads and other weapons. Inhabitants of Hindu bustees like their Muslim counter parts, were also busy in the pre- riot days in polishing their knives and collecting brickbats, iron rods and missiles, anticipating that something might happen. (pp 180)

দাঙ্গায় মুসলমানদের পক্ষ থেকে অন্য রাজ্য থেকে আক্রমণকারী গুন্ডাদের ভাড়া করে আনা হয়েছিল। হিন্দুরাও একই প্রক্রিয়ায় হিন্দু ভাড়াটে গুন্ডাদের এনে বিভিন্ন পাড়ায় তৈরি রেখেছিল। তৈরি ছিল শিখরাও।

হিন্দুদের এইসব ব্যবস্থাই ছিল আত্মরক্ষার প্রস্তুতি। পালটা মারের ভাবনা তখনই আসে যখন মুসলমান দাঙ্গাকারীরা একতরফাভাবে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হানে। তবে, কিছু প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছিলেন, মুসলমানরা আক্রমণ করার আগেই তাদের মিছিলের ওপর বিভিন্ন হিন্দু বাড়ির ছাদ থেকে ইট ছোড়া হয়। তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে দোকানপাট লুঠ করে মুসলমানরা। এ তথ্য একেবারে উড়িয়ে দেবার মতো নয়। তবে, মুসলিমদের মারমুখী আক্রমণ শুরু হয় মনুমেন্ট ময়দান থেকে ফেরার পথে। কারণ, ততক্ষণে কলকাতা জুড়ে মুসলিম গুজবের বান ভাসিয়ে দিয়েছে যে, হিন্দুরা মুসলমানদের ধরে ধরে কচুকাটা করছে। এই উসকানিতেই স্লোগান জোরদার হয়। সেইসঙ্গে আক্রমণ। সুরঞ্জন দাস তাঁর আগে উল্লিখিত গবেষণাপত্রে লিখেছেন :

সমাজের মাথারা এবং মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসাক্ষেত্র এবং বাড়িও মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণের জন্য ‘দুর্গ’ বানানোর অনুমতি দিয়ে দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই অপারেশন চালানোর জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা পাকা করে ফেলা হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাড়ির ছাদ থেকে মাইক্রোফোনে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছিল মুসলমানদের মুখোমুখি হলে হিন্দুরা কি পদক্ষেপ নেবেন তা জানিয়ে। হিন্দু দাঙ্গাবাজদের যাতে অপারেশন চালাতে অসুবিধা না হয়, তার জন্য কলকাতার এক ধনী ব্যক্তির প্রাসাদের ছাদে লাগানো হয়েছিল জোরালো সার্চ লাইট। মুসলিমরা যেমন মুসলিমদের দোকান ও বাড়ি চিহ্নিত করে রেখেছিল যাতে কেউ ভুল করে আক্রমণ করে না বসে, তেমনই হিন্দুরাও হিন্দুদের দোকান ও ঘরবাড়ি চিহ্ন দিয়ে রেখেছিল যাতে সেইসব বাড়িতেই হিন্দুরা আক্রমণ না করে বসে। ( pp 180 )

মূলত দুপুরের পর থেকেই শুরু হয়ে যায় পালটা আক্রমণ। পাড়ার একপাশে ‘আল্লাহ্-হু-আকবর’ স্লোগান শুনলেই পাড়ার অন্যপ্রান্তে আওয়াজ উঠতে শুরু হল— ‘বন্দেমাতরম’। ভুল করে হিন্দু পাড়ায় ঢুকে পড়লেই মুসলিম মিছিলের ওপর বিভিন্ন বাড়ির ছাদ থেকে শুরু হয়ে যায় ইট- পাটকেল, বোতল আর আগুনের ছোটো ছোটো গোলা ছোড়া। যেসব বাড়ি থেকে জোরালো আক্রমণ হয়েছিল তার মধ্যে ছিল চিৎপুর-মেছুয়াবাজার ক্রসিং-এর বাঙ্গুর ভবন, বিবেকানন্দ রোডের গণেশ কুঠি, বউবাজার মার্কেটের মালিকের কোলে ভবন, বেলেঘাটায় বিধায়ক হেমচন্দ্র নস্করের রাসবিহারী ম্যানসন, কেশোরাম কটন মিল, ভারত মিহির প্রেস ইত্যাদি।

বাম নেতা সোমনাথ লাহিড়ী দাবি করেছিলেন, হিন্দুদের বাড়ি থেকে ইট পাটকেল ছোড়া হচ্ছে মুসলিম লিগ মিছিলের ওপর, তা তিনি নিজে দেখেছেন। যেমন মেছুয়াবাজারে দেখেছিলেন, একজন অবাঙালি মুসলমান মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তৈরি আক্রমণের জন্য। তাঁর মতামত ছিল— হিন্দুরা আক্রমণ না করলে দাঙ্গা এত ভয়াবহ চেহারা নিত না। দু-পক্ষের মধ্যে মারাত্মক ঢিল ছোড়াছুড়ি হয়েছিল হাওড়ায়, কলকাতার রসা রোডে।

নেহি দেঙ্গে পাকিস্তান

১৬ অগাস্ট বিকেল থেকেই মুসলমানদের ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’-এর জবাবে মুহুর্মুহু আওয়াজ উঠেছে ‘নেহি দেঙ্গে পাকিস্তান’। আর পাড়ায় পাড়ায় দেখা যায় হিন্দু যুবকেরা শান দিচ্ছে ছুরিতে, ছোরাতে, তরোয়ালে। তারপরে হিন্দুরা শুরু করে মুসলমানের দোকান লুঠপাট। শ্যামবাজার, হাতিবাগান অঞ্চলের মুসলমানদের লেপ তোশকের দোকানগুলো ফাঁকা করে দেয় হিন্দু লুঠেরারা। যতটা না প্রয়োজনে, তার চেয়ে বেশি প্রতিহিংসায়। প্রতিহিংসার আগুনেই জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যায় কেশবচন্দ্র সেন স্ট্রিটের মোড়ে ডালিয়া স্টোর্স। শোভাবাজারের পর পর সাইকেলের দোকান থেকে সব সাইকেল লুঠ হয়ে যায়। ভবানীপুরে হিন্দুদের সঙ্গে লড়াইয়ে নামে শিখ যুবকরাও। ভবানীপুরে জগুবাবুর বাজারের পশ্চিমে একটা মসজিদ থেকে সমবেত সশস্ত্র হিন্দু যুবকদের লক্ষ করে গুলি ছুটে আসে। প্রতিশোধের আগুনে তপ্ত হিন্দু যুবকরা এরপর দেবেন্দ্র ঘোষ রোড, মদন পাল লেন, শশিশেখর বসু স্ট্রিট ও গোবিন্দ বোস লেনের মুসলমান বস্তিগুলোকে আক্রমণ করে। প্রেসিডেন্সির অধ্যাপক কুদরত-ই খুদার বাড়ি ও ল্যাবরেটরি তছনছ করে দেয় হিন্দু যুবকরা।

এন্টালি থানা এলাকায় একটি হিন্দু বাড়ির ছাদ থেকে মুসলিম দাঙ্গাবাজদের লক্ষ করে গুলি চলে। তারপর ক্ষিপ্ত মুসলমানরা স্থানীয় হিন্দুদের ঘরবাড়িতে আক্রমণ চালায়। যদিও হিন্দুরা সমবেতভাবে আক্রমণ করলে মুসলমানরা পিছু হটে।

তালতলা অঞ্চলে বিজয় সিং নাহার, গোপাল মুখোপাধ্যায় (পাঁঠা), হুগলির মস্তান রাম চট্টোপাধ্যায় এবং অন্যান্য কংগ্রেস নেতৃত্বকে সঙ্গে নিয়ে মুসলমান দাঙ্গাবাজদের মোকাবিলা করেন।

জ্বলল মুসলিম মহল্লা

১৬ অগাস্ট লুঠপাট হয়েছিল বেশি। কিন্তু, পরদিন ১৭ অগাস্ট সকাল থেকেই হিন্দুদের পালটা আক্রমণ তুঙ্গে ওঠে। মুসলমান বস্তিতে বস্তিতে আগুন, লুঠ এবং খুনের পর রক্তগঙ্গা বয়ে যায়। কারণ, ততক্ষণে গোপাল পাঁঠা, জগা বোসদের প্রচেষ্টায় হিন্দুরা অনেক বেশি সংঘবদ্ধ হতে পেরেছে। ছেলেরা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা কলকাতায়। দাঙ্গার দ্বিতীয় দিনে আক্রমণকারীদের অভিমুখ যে নিশ্চিতভাবেই বিপরীতমুখী হয়ে গিয়েছিল তার প্রমাণ মেলে ১৯৪৬-এর সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত রিপোর্টে। সেই রিপোর্টে বলা হয়েছিল, দাঙ্গা যে একটা ব্যাপক গণহত্যার রূপ নেবে, এটা বোধ হয় আগে থাকতে বোঝা যায়নি। প্রথম দিনের ঘটনার পর দুই পক্ষই তাই আরও বড়ো আকারে প্রস্তুতি নিতে থাকে। লাঠি, ছোরা তো ছিলই, এসে যায় পিস্তল ও স্টেনগানও। বোমা বাঁধার কাজ চলে বাড়িতে বাড়িতে সারারাত। মেয়েদের ও বাচ্চাদের নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নিয়ে কেবল শক্তসমর্থ পুরুষ ও যুবকদের নিয়ে গঠন করা হয় সশস্ত্র বাহিনী। দুই সম্প্রদায়ই ‘আত্মরক্ষা করছি’— এমন একটা অছিলায় পরস্পরকে নির্মমভাবে সংহারের চেষ্টায় প্রমত্ত হয়ে ওঠে। যারা ছিল আক্রমণকারী, তারাই দ্বিতীয় দিনে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। হিন্দুরা দল বেঁধে মুসলিম মহল্লায় সশস্ত্র হানা মারে।

পরবর্তী কয়েক দিনেও দাঙ্গা চলেছে— কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে, কোথাও সংগঠিতভাবে। গবেষক সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গ্রন্থ ইতিহাসের দিকে ফিরে ছেচল্লিশের দাঙ্গা-য় ১৯৪৬ সালের The Indian Annual Register vol. II থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন—

শোভাবাজারে হিন্দু যুবকরা বস্তির ভেতর থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে এনে তাই দিয়েই বস্তির মুসলমানদের আক্রমণ করে। নারী- শিশুদেরও রেহাই দেওয়া হয় না। এন্টালিতে আক্রান্ত হয় মুসলমান অধ্যুষিত গ্যাঁজাবাগান এবং মতিঝিল বস্তি।… শ্যামবাজারে ফড়িয়াপুকুরের উলটোদিকে একটি মুসলমান বস্তিতে আগুন লাগানো হয়। লুট হয় প্রচুর মুরগি। স্বতন্ত্র নেতা নওশর আলি প্রত্যক্ষ সংগ্রামে সামিল হননি বলে মুসলমান গুণ্ডারাই তাঁর বাড়ি আক্রমণ করে। কলেজ স্ট্রিটে রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট অঞ্চলে কয়েকজন মুসলমান রাজমিস্ত্রীকে পিটিয়ে মারে পাড়ার কয়েকজন হিন্দু যুবক। বউবাজারের মোড়ে বল্লমে গিঁথে মারা কয়েকটি মুসলমানের দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। গঙ্গায় স্টিমলঞ্চের সারেংরা ডুবিয়ে মারে বহু মাঝিমাল্লাকে। মেটিয়াবুরুজে বিহারী আর ওড়িয়া মজুরদের নৃশংসভাবে হত্যা করে মুসলমান গুণ্ডারা। মধ্য কলকাতার সাগর দত্ত লেনে নিমাইচাঁদ দত্ত, নন্দলাল দত্ত, আশুতোষ মল্লিক, বিহারী পাইন প্রমুখের পরিবার আক্রান্ত হয়। মোমিনপুরে জনৈক পান্না চ্যাটার্জির পরিবারের প্রায় সব পুরুষ সদস্যদেরই হত্যা করা হয়, একজনকে পরে বাথরুম থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল।

মুসলমান দাঙ্গাবাজদের ঠেকাতে কলকাতা শহরের নানা প্রান্তে যেসব তরুণ হিন্দু তুর্কিরা তীব্র আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিয়েছিল, তৎকালীন পুলিশ অফিসার সুধাংশু কুমার মজুমদার তাঁর স্মৃতিকথা— স্মৃতি যখন কথা বলে গ্রন্থে তাদের নাম উল্লেখ করে গেছেন। এই তালিকায় ছিলেন কাশীপুরের শত ঘোষ ওরফে প্রফুল্লকান্তি ঘোষ যিনি যুগান্তর ও অমৃতবাজার পত্রিকা-র অন্যতম মালিক ছিলেন এবং পরবর্তীকালে কংগ্রেসি সরকারের মন্ত্রিসভায় মন্ত্রীও হয়েছিলেন। ছিলেন শোভাবাজারের রণজিৎ সাহা, শ্যামপুকুরের মলয় সরকার, সুকুমার বসু, বাগবাজারের সুখদেও সাহা, উল্টোডাঙার নবজ্যোতি বর্মন, মানিকতলার কাজল মুখার্জি, বটতলার গুরুপদ নন্দী, জোড়াবাগানের ঋষিকেশ চৌধুরী, চিৎপুরের নেপাল রায়, আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাণী মুখার্জি, মুচিপাড়ার বিনয় ব্যানার্জি, জগা বসু ও ভানু, বেনিয়াপুকুরের আশু ঘোষ, শ্যামলাল ঘোষাল, বুলু পাল, কালীঘাটের মলয় ব্যানার্জি, বালিগঞ্জের অমল দত্ত, জোড়াসাঁকোর জগবন্ধু মিত্র, গৌর গোস্বামী, টালিগঞ্জের জে এন ভাদুড়ি, দিলীপ রায় চৌধুরি, বেলেঘাটার ব্যায়ামবিদ বিষ্ণুচরণ ঘোষ।

বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. নারায়ণ চক্রবর্তী ছোটোবেলায় গোপাল পাঁঠার পাড়াতেই থাকতেন। গোপাল পাঁঠাকে চিনতেন ঘনিষ্ঠভাবে। তিনি তাঁর প্রবন্ধ ইতিহাসে উপেক্ষিত নায়ক-এ [স্বস্তিকা পত্রিকার ১৪৩০ পুজোসংখ্যায় প্রকাশিত] লিখেছেন,

বিপ্লবী অনুকূল চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভাগ্না গোপাল সরাসরি রাজনীতি করতেন না। মূলত সমাজসেবী গোপালকে কিন্তু কলকাতার দাঙ্গায় মানুষ চিনল গভীরভাবে। পাঁঠার মাংস ব্যবসায়ী গোপাল মুখোপাধ্যায় ছিলেন শাক্তধর্মে বিশ্বাসী। তাই চিরকালই মহাত্মা গান্ধীর বিপরীত পথেই হেঁটেছেন। তাঁর সম্পর্কে নারায়ণবাবুর বিশ্লেষণ হল, ব্যক্তি গান্ধিজীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেও গান্ধীজির অহিংস আন্দোলনে গোপালের আস্থা ছিল না। তিনি ছিলেন সুভাষচন্দ্র বোসের একনিষ্ঠ সমর্থক। নেতা হিসেবে সুভাষচন্দ্রের মত ও পথকেই বিশ্বাস করতেন। গান্ধীজির অহিংস আন্দোলনকে মুসলিম লিগের হিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে শক্তিহীন প্রয়াস হিসেবে দেখতেন। তারই প্রকাশ ঘটল কলকাতা দাঙ্গায় যেখানে সশস্ত্র মুসলিম লিগের নৃশংস ও বর্বর আক্রমণের জবাবে ‘উচিত শিক্ষা’ দিয়েছিলেন যাঁরা তাঁদের নেতা ছিলেন গোপাল তথা গোপাল পাঁঠা। হিন্দুদের সেই আক্রমণ কতটা তীব্র ছিল তার প্রমাণ ছিল বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর…।

মনুষ্যত্ব: কলকাতা হারায়নি

গোটা শহর জুড়ে তখন চলছে ইতরতার অভিযান। মৃতের সংখ্যা কত? পাঁচ হাজার, নাকি, পঞ্চাশ হাজার? হাসপাতালে মৃত্যুর ক্ষণ গুনছে কতজন? হাজারে, নাকি, লাখে? সঠিক উত্তর ছিল না সেদিন কারো কাছেই। কারণ, আক্রমণের অভিমুখ বিভিন্ন সময়ে ভিন্নমুখী হয়েছে। কখনো মরেছে মুসলমান, কখনো হিন্দু। কখনো হিন্দু মরেছে বেশি। কখনো মুসলমান মরেছে বেশি, কিন্তু তবুও এই ভয়াবহ দাঙ্গার মধ্যেও শহরের বহু অঞ্চলেই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল কলকাতার ঐতিহ্যশীল সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের চেতনা— মনুষ্যত্ব। সে-মনুষ্যত্বের আর এক নাম বুঝি দেওয়া যেতে পারে সাম্প্রদায়িক মিলন।

যখন কলকাতার বিভিন্ন পাড়ায় হিন্দু অথবা মুসলমান ঘরে ঘরে, ঘরের ছাদে, মন্দিরে দেবীমূর্তির পিছনে লুকিয়ে রেখেছে অস্ত্রশস্ত্র, পিস্তল, বোমা একে অপরের ওপর আক্রমণ শানাবে বলে, তখনই কোথাও কোথাও হিন্দু-মুসলমান মিলিতভাবে জড়ো করে ইটপাটকেল, লাঠিসোঁটা দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে লড়বে বলে, কারণ ওই যুবকেরা বিশ্বাস করে দাঙ্গাবাজের কোনো জাত হয় না। দাঙ্গাবাজের কোনো ধর্ম হয় না।

আগেই দেখেছি গোপাল পাঁঠা যাকে ‘৪৬-এর ইতিহাসের দাঙ্গায় আর পাঁচটা হিন্দু বা মুসলমান দাঙ্গাবাজদের মতো ‘গুন্ডা’র লেভেল সেঁটে দিয়ে মহান সেজেছেন সাম্যবাদীরা এমনকী কংগ্রেসের কেউ কেউ, তখন হয়তো অনেকেরই অজানা, হিন্দু পাড়ার মধ্যে বসবাসকারী মুসলমানদের নিরাপদে থানায় পাঠিয়ে দিয়েছেন তাদের জীবনরক্ষার জন্য। বহু মুসলিম নারীকে দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে আড়াল করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন পরিচিত হিন্দু বা মুসলমান পরিবারে সাময়িক আশ্রয় নিতে। তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল দলের ছেলেদের প্রতি-আক্রমণ করা হবে শুধুমাত্র দাঙ্গাবাজ মুসলমানদের ওপর। নিরীহ মুসলমানদের গায়ে হাত দেওয়া যাবে না। মুসলমান হলেও কোনো নারীর হাতও ধরা যাবে না। শিশুদের বাঁচাতে হবে ধ্বংসের পৃথিবী থেকে।

উত্তেজনার বশে হয়তো সর্বত্র তাঁর নির্দেশ মেনে চলা সম্ভব হয়নি। কিন্তু, বহু পাড়ায় হিন্দু বাঙালিরা দফায় দফায় মানবিক মূল্যবোধের সাক্ষ্য রেখে গেছেন।

আলিপুর কোর্টের অতিরিক্ত জেলা জজ মণীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৭ অগাস্ট গুন্ডাদের হাত থেকে একটি ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই ছুরিকাহত হলেন। সেই আঘাত ছিল এতটাই মারণঘাতী যে, ২৫ অগাস্ট মেডিক্যাল কলেজে তিনি মারা গেলেন। বহু জায়গায় এমনভাবেই মানুষ নিজের প্রাণের তোয়াক্কা না করে অন্যের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। নজির তৈরি করেছেন মানবতার।

দাঙ্গা মিটে যাবার পরে ২১-২৮ সেপ্টেম্বরের ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল গেজেটে প্রকাশিত হয় এরকমই কতকগুলি অবিশ্বাস্য কাহিনি যা মানুষকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে— অন্ধকারের সাম্রাজ্যেও আলোটুকু জোনাকি হয়েও জ্বলে থাকে।

দক্ষিণ কলকাতার ৯৩ বছরের বৃদ্ধা স্বর্ণকুমারী দেবীর পরিবারকে আশ্রয় দেন মুসলিম লিগের কাউন্সিলর মহম্মদ ইউসুফ। এর জন্য পরে ইউসুফকে কী শাস্তি দিয়েছিল মুসলিম লিগ তা অজানা। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের হায়দার আলির পরিবারকে বাঁচান প্রতিবেশী হিন্দুরাই। সার্কাস অ্যাভিনিউতে কংগ্রেস নেতা জে সি গুপ্তর বাড়ির ওপর মুসলমানরা আক্রমণ করলে বাধা দিয়েছিলেন স্থানীয় মুসলমানরাই। এমনিভাবেই বেঁচেছেন গোলাম ওস্তাগর লেনের ৩০টি মুসলমান পরিবার। বেনিয়াপুকুরের ৪৩টি হিন্দু পরিবার জাতহীন গোত্রহীন ধর্মীয় পরিচয় কিছুক্ষণের জন্য তুলে রাখা যুবকেরা।

কবি বিষ্ণু দে একটি ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই লাঠির ঘায়ে আহত হন। তাঁর স্ত্রী প্রণতি দে লিখে গেছেন, তাঁরা তখন থাকতেন কালীঘাটে সতীশ মুখার্জি রোডে। ১৬ অগাস্ট সকালে এলাকায় কয়েক জন মুসলমান যুবক ছররা বন্দুক থেকে গুলি ছুড়লে স্থানীয় গোয়ালারা পালটা আক্রমণ হানে। এরপর খোদা-ই খিদমদার গোষ্ঠীর তিনজনের একটি দল শান্তি অভিযানে বের হলে গুন্ডাদের আক্রমণে দু-জন নিহত হন। তৃতীয়জনকে বাঁচাতে গেলে তাঁকে লাঠিপেটা করে গুন্ডারা।

কমিউনিস্ট নেতা ও কর্মীরা দাঙ্গার সময় ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে শান্তি অভিযানে নেমে দুই সম্প্রদায়ের বহু মানুষকে বাঁচিয়ে দেন। ঠিক তেমনি কংগ্রেস নেতারাও একইভাবে বিধর্মী বা স্বধর্মী সকলকেই বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন বহু জায়গায়। আহতও হয়েছেন কিন্তু পিছু হঠেননি।

অবশেষে নামল সেনা

১৭ এবং ১৮ অগাস্ট টানা প্রতিহিংসার আগুনে যখন মুসলমান সম্প্রদায়ের নাভিশ্বাস উঠে গেছে, শহরের দিগবিদিক থেকে যখন ভেসে আসছে হিন্দুদের বিজয়োল্লাস, তখনই সুরাবর্দির জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হল।

‘It was only when the Hindus and Sikhs had come out in retaliation that the Chief Minister had called for millitary aid, afraid for the first time of the enormity of the tragic events which has been set in train.

এর আগে পর্যন্ত সুরাবর্দি বরাবর বাংলার শেষ গভর্নর স্যার ফ্রেডারিক বারোজকে আশ্বাস দিয়ে গেছেন— সব কিছু নিয়ন্ত্রণে আছে। এই ধরনের মিথ্যা প্রচার করে আদতে সুরাবর্দি কী লাভ করেছেন, তা তিনিই বলতে পারবেন। কারণ, এখনও তো তিনি ইতিহাসে বেঁচে আছেন খলনায়ক হিসেবেই। সময়ে সেনা নামালে হয়তো তাঁর কুখ্যাতি কিছুটা হলেও কমত। কিন্তু, সেনা যখন নামল ততদিনে লাশের পাহাড় জমে গেছে শহরের বুকে। তার চেয়েও বেশি ভিড় শকুন আর চিলের। পূতিময় দুর্গন্ধে গোটা শহরের ভ্যাপসা আবহাওয়ায় শ্বাস নেওয়া দায়!

তার ওপর সেনাবাহিনীর যে জিওসি লেফটেন্যান্ট জেনারেলের ওপর নির্ভর করা যেত, তিনি তখন জরুরি ডাকে বিলেতে। সেনাবাহিনীর এই অফিসারটি ছিলেন নির্ভয় এবং নির্দয়। ভারতীয় রাজনীতিবিদ প্রশাসকদের ওপর একেবারেই ভরসা ছিল না সেই নির্ভরযোগ্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফ্রান্সিস টুকেরের। তিনি কারো নির্দেশের তোয়াক্কা করতেন না। দাঙ্গায় যেভাবে খোলা রাস্তায় মানুষ খুন হয়েছে, নারী নির্যাতন হয়েছে, শিশু হত্যা হয়েছে, যেভাবে বাড়ি জ্বলেছে, দোকান জ্বলেছে, কারখানা জ্বলেছে, এসব ঠান্ডা করতে দু-হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে টুকের নিজেই নেমে পড়তেন রাস্তায়। তিনি জানতেন, কীভাবে গুন্ডা-বদমাশদের ঠান্ডা করতে হয়। কিন্তু, যাদের ওপর দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন তাদের সেই যোগ্যতাই ছিল না। ফলত, যা হবার তাই হয়ে গিয়েছিল। ‘Thousands have been brutally hurt, smashed eyes, smashed jaws, smashed limbs of men, women and children — যা নিয়ে বিংশ শতাব্দীতে রাজনৈতিক বিতর্ক চলা উচিত নয়। (The Statesman)

 হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর পর দাঙ্গার আগুনে ভস্মীভূত কলকাতায় শান্তি ফেরাতে অবশেষে নামল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া কামান। ছবি সৌজন্য : ‘লাইফ’ পত্রিকা

হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর পর দাঙ্গার আগুনে ভস্মীভূত কলকাতায় শান্তি ফেরাতে অবশেষে নামল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া কামান। ছবি সৌজন্য : ‘লাইফ’ পত্রিকা

ভাগ্যিস ওয়াভেল জেগেছিলেন

তবে, সেনাবাহিনী নামানোর পিছনে সুরাবর্দির থেকে অনেক বেশি এবং বড়ো ভূমিকা নিয়েছিলেন ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল নিজে। ১৭ অগাস্ট তাঁর ডায়েরিতে তিনি লেখেন— ‘Rioting continues in the most violent lines.’ ১৮ অগাস্টেও তাঁর ডায়েরির পাতা বলছে— কলকাতার অবস্থা আগের মতোই খারাপ। মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ১৯ অগাস্ট ওয়াভেল বলছেন, ‘সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আকিনলেক আমায় বললেন যে চারটি ব্রিটিশ ও দুটি ভারতীয় ব্যাটেলিয়ন ইতিমধ্যেই কলকাতায় রয়েছে এবং আরও একটি ব্রিটিশ ও দুটি ভারতীয় ব্যাটেলিয়ন ও একটি ব্রিটিশ সাঁজোয়া গাড়ির স্কোয়াড্রেন কলকাতায় পৌঁছবার মুখে।’

১৯ অগাস্ট বিকেলেই ভাইসরয় ওয়াভেল মৌলানা আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে একঘণ্টা কথা বলেন। সেখানে আজাদ সুরাবর্দি মন্ত্রিসভার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তিনি ভাইসরয়ের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, মন্ত্রিসভা গোলমালের আশঙ্কা করলেও কোনো আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কারফিউ জারি করা হয়েছে অনেক দেরিতে। তার ওপর সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করতেও কোনো উদ্যোগ আগে নেওয়া হয়নি।

সাংবাদিক শংকর ঘোষ তাঁর হস্তান্তর প্রথম খণ্ডে (পৃষ্ঠা ৯৬) লিখেছেন,

সেনাবাহিনী নামার পর আমাদের এলাকা শান্ত হয়ে যায়… গোরা তখনও টহল দিচ্ছে দেখে সাহস বাড়ল।… মেস থেকে বেরিয়ে কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের ফুটপাত ধরে দক্ষিণমুখে হাঁটা শুরু করলাম… বেশিদূর যেতে হল না। হঠাৎ একজন গোরা সৈন্য রাইফেল বাগিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন এবং ইশারায় আমি যেদিক থেকে এসেছি সেদিকে ফিরে যেতে নির্দেশ দিলেন। আমি বললাম, আমি রিপোর্টার। আমার কাগজের অফিস এদিকে। আমায় যেতেই হবে। তিনি কোনো কথা শুনলেন না, হাতে বন্দুক বাগিয়ে মুখে শুধু ‘ব্যাক ব্যাক’। অগত্যা ফিরতে হল।

শংকর ঘোষের এই বিবরণ নিঃসন্দেহে এটাই প্রমাণ করে যে, প্ৰত্যক্ষ সংগ্রামের দিন ১৬ অগাস্ট থেকে যদি আগেভাগেই সেনা নামানো হত তাহলে সাম্প্রদায়িক হানাহানির এই কলঙ্কের ভার কলকাতাকে বয়ে বেড়াতে হত না। আরও প্রমাণিত হয়, সুরাবর্দি অ্যান্ড হিজ গ্যাং চেয়েছিলেন যে, কলকাতায় দাঙ্গা হোক। হিন্দুরা মরুক। কিন্তু, বুঝতেই পারেননি ওই চরমতম ক্ষমতাপ্রমত্ত মনুষ্য জাতির কলঙ্ক যে, হিন্দুরা এতখানি তৈরি হয়েই ছিল। সুরাবর্দি মুসলমান হয়ে মুসলমানকে বাঁচাতে পারেননি। সুরাবর্দি মুসলমান নারীদের সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারেননি। শিশু, নাবালিকাদের সুরক্ষা দিতে পারেননি। বাস্তব তো ছিল এটাই।

সুভাষচন্দ্রর মেজদা শরৎ বোস শঙ্কর ঘোষকে টেলিফোনে বলেছিলেন, ‘পুলিশ হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানদের পক্ষপাতিত্ব দেখাচ্ছে। কিন্তু, গভর্নর আমায় বলছেন, হতাহতর সংখ্যা মুসলমানদের মধ্যেই বেশি।’

গভর্নর বারোজ সাহেব ভুল বলেননি। হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ই দাঙ্গায় হাত লাগিয়েছে সমানভাবে। দাঙ্গায় দু-পক্ষের তরফ থেকেই অন্য রাজ্য (upcountry) থেকে গুন্ডা আনা হয়েছিল। কিন্তু, শুধু গুন্ডারাই দাঙ্গা করেছে বললে সত্যের অপলাপ হবে। মধ্যবিত্তরাও দাঙ্গায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়েছিল।

শুধুই ভাড়াটে গুন্ডা?

কলকাতার ‘৪৬-এর দাঙ্গায় মৃত্যুর সংখ্যা নিখুঁতভাবে বলা যাবে না। তবে, একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, হিন্দু এবং মুসলমান দু-পক্ষই দাঙ্গায় কাজে লাগিয়েছিল ভাড়া করা গুন্ডা। এটা ছিল একেবারে সূত্রপাত। কিন্তু, দাঙ্গার পরিসর এবং আক্রমণাত্মক চেহারা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত এবং সাধারণের ওপরতলার বিত্তশালীরাও প্রত্যক্ষভাবে হাত লাগিয়েছিলেন দাঙ্গায়। প্রবাসী পত্রিকার ১৩৫৩ সালের আশ্বিন সংখ্যায় আনিসুজ্জমান লিখে গেছেন :

বিহারী ও পাঞ্জাবী মুসলমানেরা গুণ্ডামি ও লুঠতরাজ করিয়া অনেক কিছু লুটিয়া সরিয়া পড়িয়াছে আর হিন্দুর মার খাইয়াছে বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমান। বিড়ি পান সিগারেটওয়ালার, হোটেলওয়ালার, ছোটোখাটো থালাবাসনের দোকানওয়ালার, ছোটো কাটা কাপড়ওয়ালার, ছোটো ফলওয়ালার যথাসর্বস্ব পরে এক এক করিয়া লুণ্ঠিত হইয়াছে।

সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর্যবেক্ষণ:

বোঝা যাচ্ছে, সুপরিকল্পিতভাবেই ভাড়া করা গুণ্ডাদের দিয়ে লিগ আক্রমণ চালিয়েছিল হিন্দু ব্যবসায়ীদের ওপর। হিন্দুরা তার পালটা দেয় পাশের ছোটোখাটো মুসলমানদের দোকান লুট করে। বড়ো ব্যবসাদারদের ওপর আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় বড়বাজারের মাড়োয়ারি এবং দক্ষিণ কলকাতার শিখরাও ঘুরে দাঁড়ায় এবং হিন্দু-শিখের মিলিত আক্রমণে মুসলমানরা কিছুটা কোণঠাসা হয়ে যায় দ্বিতীয় দিনের পর থেকে।

একথা ঠিক, ১৬ অগাস্ট-এর আক্রমণ শানিয়েছিল মুসলিম লিগের ভাড়া করা গুন্ডারাই। ব্রিটিশ প্রশাসনও স্বীকার করে গেছে গঙ্গা পেরিয়ে অবাঙালি মুসলিমরা হাওড়া থেকে কলকাতায় ঢুকেছিল দলে দলে। অর্থাৎ, তৎকালীন ২৪ পরগনা জেলার বিভিন্ন মুসলমান অধ্যুষিত এলাকার অবাঙালি খেটে খাওয়া মুসলমানরাই কলকাতায় ঢুকেছিল দাঙ্গা বাধাতে। আর একটা অংশ এসেছিল বিহার থেকেও যাদের ভাই-বেরাদরদের আমন্ত্রণে ডাকা হয়েছিল ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ আন্দোলনে যোগ দিতে। বিভিন্ন গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, কলকাতার বাঙালি মুসলমানরা খুব বেশি দাঙ্গায় নিজেদের জড়াননি। যাঁরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ময়দানে নেমেছিলেন, তাঁরা অন্য রাজ্যের। বিহারের সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের মুসলমানরাও ছিল অনেক। তবে, মধ্যবিত্তর অংশগ্রহণটা আপাতদৃষ্টিতে বিস্ময়কর মনে হলেও, চোখের সামনে একপক্ষের ধর্মীয় আস্ফালন ও অত্যাচার সেইসময়ের সংগ্রামী বাঙালি হিন্দুরা বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারেনি।

বউবাজারের ‘হিন্দু কসাই’ গোপাল মুখোপাধ্যায়কে কিছু লেখক ও গবেষক ‘গুন্ডা’ হিসেবে তুলে ধরলেও, প্রকৃতপক্ষে গোপাল পাঁঠা নামে পরিচিত মানুষটি ছিলেন একটি বিপ্লবী পরিবারের সন্তান। ছোটোবেলা থেকে মামা বিপ্লবী অনুকূলচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠা গোপাল ছিলেন মধ্যবিত্তই। সংসার চালাতেন মাংস বেচেই। গোপালের হাত ধরেই শুধু বউবাজার নয়, আশপাশের বহু পাড়ার পুরোপুরি মধ্যবিত্ত পরিবারের যুবকরা দাঙ্গা দমনে নেমে পড়েছিল। গোপাল পাঁঠার নির্দেশ ছিল, হিন্দুদের লড়াই হবে ভারতমাতার সন্তান হিসেবে। কোনো সন্তান কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে যে তার মাকে দু-ভাগে চিরে ফেলা হচ্ছে। তাই যতই আওয়াজ উঠুক, ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’, ‘বন্দেমাতরম’ স্লোগানের আওয়াজে আর মঙ্গলশঙ্খের ধ্বনিতে চাপা দিতে হবে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগানকে।

নিঃসন্দেহে, কলকাতার দাঙ্গার স্বরূপ বিশ্লেষণ করতে গেলে মেনে নিতেই হবে— এটা কোনো সংগ্রামী লড়াই ছিল না। পুরোপুরি সাম্প্রদায়িক চরিত্রেই হাজির করা হয়েছিল এই দাঙ্গাকে। এবং, এই সাম্প্রদায়িকতার স্বরূপ উন্মোচন করেছিল মুসলমানরাই। হিন্দুরা তাতে চক্ষুদান করেছিল। মূর্তি সম্পূর্ণ হয়েছিল সাম্প্রদায়িকতার। মুসলিমদের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসাধন এবং প্রশাসনিক সমর্থনে ক্ষমতার বহর দেখানো। আর হিন্দুরা চেয়েছিল, মুসলমান আধিপত্য থেকে বাংলাকে ছিনিয়ে আনতে। অন্নদাশঙ্কর রায় যেমন লিখে গেছেন, টানা দশ বছর ধরে মুসলিম শাসনে বাস করে হিন্দুরা বারুদ হয়ে উঠেছিল। মুসলমানরা দাঙ্গা শুরু করলে হিন্দুরা এটাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছিল যাতে মুসলমানদের বাংলা ছাড়া করা যায়। অধিকাংশ হিন্দুর মনে একটা চেতনা ধামাচাপা অবস্থায় পড়েই ছিল বাংলাকে মুসলমান আধিপত্য থেকে বাঁচাতে হবে। ধনী, দরিদ্র, শিক্ষিত, অশিক্ষিত সবার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছিল এই চেতনার চারাটি।

রাজনৈতিকভাবে কংগ্রেস মুসলিম লিগকে দূরে ঠেলতেই পছন্দ করত। পছন্দ করত বলেই জওহরলাল নেহরু পাকিস্তান সৃষ্টিতে তেমনভাবে বাধা দেননি। বাংলার মুসলমানরা অবশ্য চাইত— ভারতেই থেকে যেতে। কারণ, তাদের ওঠা-বসা, আচার-আচরণ সামান্য কিছু বিষয় বাদ দিয়ে হিন্দু বাঙালিদের মতোই। তারা বিশ্বাস করত, বাঙালি হিন্দুর পাশাপাশি থাকলেই তাদের দুর্দশা ঘুচবে। ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখবে। চাকরি-বাকরি, ব্যাবসাপাতি করবে। শুধু ধর্ম নিয়ে বেঁচে থাকলে পেটের ভাত জোগাবে কে? কংগ্রেস এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েছিল এপার বাংলায়। হিন্দু বাঙালি মানেই মুসলিম লিগ বিরোধী, এটা শুধু হিন্দু মহাসভাই বিশ্বাস করত, তা নয়। কংগ্রেসও সেটাই বিশ্বাস করত। উপরি বিশ্বাস করত মুসলিম লিগ বিরোধী বাঙালি মুসলমানরাও। কারণ, মুসলিম লিগের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ছিল অবাঙালি মুসলমানদের হাতেই বরাবর। সেই জন্মলগ্ন থেকেই।

অতএব, কলকাতা দাঙ্গা একটা বাড়তি অনুপ্রেরণা পেয়ে গিয়েছিল— তা হল রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা। একটা বিষয় খুব লক্ষণীয়। দাঙ্গা চলাকালীন বামপন্থীরা ছাড়া কংগ্রেস বা হিন্দু মহাসভার নেতাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল যথেষ্ট কম। তবু, কংগ্রেস নেতা বিজয় সিং নাহার, কিরণশঙ্কর রায়, হরেন ঘোষ প্রমুখর মুখ দেখা গিয়েছিল। কিন্তু, হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বা অন্য কোনো নেতার কোনো ভূমিকাই সেভাবে চোখে পড়েনি। শুধুমাত্র মুসলিম লিগের ডাকা হরতালের বিরুদ্ধে একটি প্রচারপত্র বিলি করা ছাড়া। তবে, দাঙ্গায় যেসব হিন্দু প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়েছিল, শ্যামাপ্রসাদ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। গঠন করছিলেন হিন্দু ন্যাশনাল গার্ড।

অবশ্য, দাঙ্গা বন্ধ হবার পর আইন পরিষদে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা ছিল অনন্য। সে-আলোচনায় আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে আসব। আপাতত চলুক— দাঙ্গায় গুন্ডাবাজির প্রেক্ষাপট।

সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় গবেষণা করে জেনেছেন— ভদ্র মধ্যবিত্ত পরিবারের বেশ কিছু যুবকের নাম এই দাঙ্গাসূত্রেই বিখ্যাত হয়ে যায়। যেমন বউবাজারের গোপাল মুখোপাধ্যায়, বিপ্লবী অনুকূলচন্দ্রের ভাইপো (আসলে ভাগনে)। ভবানীপুরের যুবক কামাল হিন্দুদের ওপর গুলি ছুড়েছিলেন। তাঁর দাদা জামাল ছিলেন উচ্চশিক্ষিত এবং একজন শ্রদ্ধেয় মানুষ। এ ছাড়া ছিলেন, শিয়ালদহের ভানু বোস, খিদিরপুরের শেখ বাবু, তালতলার বাসু মিঞা, শ্যামবাজারের কালু। এদের আত্মরক্ষার চেতনা প্রতিহিংসা, অমানবিক জিঘাংসায় পরিণত হয়। তিনি গোপাল মুখোপাধ্যায়ের বিবৃতি নজির হিসেবে তুলে ধরেছেন গবেষণাপত্রে: ‘আগে থাকতে কিছু হাতবোমা মজুত রাখা হয়েছিল; কিন্তু এত বড়ো দাঙ্গা হবে ভাবা যায়নি। ১৬ তারিখে (অগাস্ট) পাড়ার কিছু মুসলমান পরিবারকে থানায় পৌঁছে দিয়ে আসা হয়। এক মুসলমান জাদুকর বাড়ি ছেড়ে যেতে চাননি। তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় হিন্দু যুবকরা। কিন্তু ওইদিনই সন্ধ্যার পর থেকে বীভৎস দাঙ্গার খবর আসে। জানা যায়, ফিয়ার্স লেন, সাগর দত্ত লেনে প্রচুর হিন্দু মারা পড়েছে। তখন ঠিক করা হয়, একটা হিন্দুর লাশ দেখলে দশটা মুসলমানের লাশ ফেলতে হবে। এরপর একদিকে চলে হিন্দুদের রেসকিউ করা, অন্যদিকে হিন্দু হত্যার বদলা নেওয়া। গরিব মুসলমানরাই মারা যায় এর ফলে, কারণ তারাই পেটের টানে রাস্তায় বেরিয়েছিল।’ গোপাল মুখোপাধ্যায় ওরফে গোপাল পাঁঠার এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল ১৯৯২ সালের ২৩ জুলাই।

প্রতিহিংসার মনোভাব এতটাই চরমে উঠেছিল যে, কলেজ স্ট্রিটের মির্জাপুর স্ট্রিটে (বর্তমানে সূর্য সেন স্ট্রিট) বিপিএসএফ ইউনিয়ন অফিসে একজন মুসলমানকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল জেনে তাকে ছিনিয়ে নিতে হাজির হয়েছিল হিন্দু যুবকরা। যদিও ইউনিয়ন কর্মীরা তা হতে দেননি। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচেছিলেন ওই মুসলমান ভদ্রলোক। বউবাজারে কয়েক জন ফিটন গাড়ির সহিসকে খুন করার পরিকল্পনা করেছিল হিন্দু যুবকরা যারা পণ করেছিল একে দশের খুন। সেসময় প্রখ্যাত শিল্প প্রযোজক হরেন ঘোষ তাদের প্রাণ বাঁচান। কিন্তু, দাঙ্গার কুফল— মুসলমানরাই পরে অন্য একটি ঘটনায় হরেন ঘোষকে কুচিকুচি করে কেটে রাস্তায় চিল, শকুনের খাবার হিসেবে ছিটিয়ে দিয়েছিল। এ ঘটনা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। হরেন ঘোষের হত্যা ছিল দাঙ্গার প্রকৃত শিক্ষা যেখানে কৃতজ্ঞতা নয়, কাজ করে জিঘাংসা। ঠিক এই কারণেই শ্যামবাজারের সেই পরিচিত মুসলমান ডিম বিক্রেতাকেই হিন্দু যুবকরা খুন করেছিল, যার কাছ থেকে আগের দিনও ডিম কিনেছিল ওই যুবকেরা। এসব তথ্য দিয়েছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং বাম নেতা বিজয় ঘোষ, নিত্যরঞ্জন সেনরা।

দু-পক্ষই চেয়েছিল বিধর্মী খুন

‘৪৬-এর ১৬ থেকে ১৯ অগাস্ট হিন্দু-মুসলিম অবিশ্বাস্যভাবে বিধর্মীদের খুন করাটাকেই কর্তব্য হিসেবে ধরে নিয়েছিল। আগের ঘটে যাওয়া দাঙ্গাগুলিতে এত প্রবলভাবে এই কর্তব্য-সচেতনতা হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে দেখা যায়নি। এন্টালিতে এক মুসলমান ভিখারিকে হত্যা করেছিল এক হিন্দু যুবক ভিখারির লাঠি নিয়েই মাথা চূর্ণ করে দিয়ে। আসলে, লড়াই শুধু প্রতিপক্ষকে হত্যা করাই নয়, একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার উন্মত্ততায় পর্যবসিত হয়েছিল। ঠিক এই কারণেই গোপাল হালদার পরিচয় পত্রিকার ১৩৫৩-র ভাদ্র মাসে লিখেছিলেন, ‘সাম্প্রদায়িক সমস্যা এবার বুঝি গৃহযুদ্ধ বা সিভিল ওয়ারের পর্বে এসে ঠেকেছে।”

হিন্দু যুবকদের এই যে শক্তির বহিঃপ্রকাশ, এর মধ্যে মাতৃভূমির প্রতি যেমন আবেগ ছিল, তেমনি ছিল দৈহিক শক্তিও। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীরা বাঙালি হিন্দুর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটা চেতনা জাগাতে চেয়েছিলেন যে, স্বাধীনতা পেতে গেলে ব্রিটিশকে চলে যেতে বাধ্য করতে হবে। আর তার জন্য প্রয়োজন দৈহিক শক্তি আর মানসিক বল। ফলত, সেই সময়ে পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে উঠেছিল প্রচুর সমিতি। যেখানে নিয়মিত ব্যায়াম, যোগাসন, জিমন্যাস্টিক, লাঠিখেলা, কুস্তি ইত্যাদির প্রশিক্ষণ ও চর্চা চলত। ব্রিটিশ বিরোধিতায় এমন অনেক সমিতির যুবক স্বাধীনতা সংগ্রামে পা মিলিয়ে পুলিশের গুলি খেয়েছেন, শহিদ হয়েছেন এমন উদাহরণ আছে ভূরি ভূরি। সে-আন্দোলন জারি ছিল গান্ধীজির অহিংস নীতিকে অগ্রাহ্য করেই। কারণ, কোনো বাঙালিই বিশ্বাস করতেন না, অহিংসার মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করা যাবে। এমনকী গান্ধীবাদী নেতারাও এটা জানতেন। জানতেন বলেই কংগ্রেস নেতাদের কেউ কেউ এইসব সমিতির সদস্যদের টেনে এনেছিলেন দাঙ্গার ময়দানে। হিন্দু মহাসভা তো হিন্দুত্বকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিত। স্বাভাবিকভাবে তাদের প্রচার ‘জাগো হিন্দু’-র চেতনা সেইসময় বাঙালি হিন্দু যুবকদের ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের ওপর মুসলমানদের দীর্ঘদিনের অত্যাচার, হাজার হাজার পরিবারকে বাস্তুচ্যুত করে তাদের সহায়হীন, আশ্রয়হীন উদ্‌বাস্তু করে তোলা মুসলমানদের ভূমিকা হিন্দুদের জেদি করে তুলেছিল এপার বাংলাকে যবনমুক্ত করে তুলতে।

তবে, অস্বীকার করা যাবে না আবেগমথিত হিন্দু বাঙালি যুবকদের মধ্যেই মিশে গিয়েছিল বিহার, উত্তরপ্রদেশের হিন্দুভাষী হিন্দুরা। তাদের আবেগের চেয়ে বেশি নজর ছিল লুঠপাটে আর মুসলিম-বিতৃষ্ণায়। কারণ, আপকান্ট্রির ইসলামিক সংস্কৃতি যে আজও ভয়ংকর, তা সকলেই জানেন। অতএব, ধরে নিতে অসুবিধা নেই, দাঙ্গা চলাকালীন তাদের ভূমিকা কী ছিল। আসলে, মুসলিম লিগের গুন্ডাগর্দি করার প্রবণতাকে তো লিগ নেতারাই প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। দাঙ্গার সূত্রপাতটাও করেছিল বাংলার বাইরের মুসলিম গুন্ডারা। এদের উদ্দেশ্য ছিল লুঠপাট আর হিন্দু মহিলাদের ধর্ষণ করা, নির্যাতন করা। সেটা রোখার দরকার ছিল বলেই সশস্ত্র হিন্দুরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছিল।

এমনিতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ব্রিটিশ প্রশাসকদের তৈরি ১৯৪৩-এর ম্যানমেড দুর্ভিক্ষ বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে চুরমার করে দিয়েছিল। আলোর উৎস যুবসমাজের সামনে ছিল না। বেকারত্ব কোথাও কোথাও যুব সম্প্রদায়কে পেশাদার গুন্ডাদের শিবিরে টেনে এনেছিল। দুর্ভাগ্য হলেও এটাই সত্যি— মুসলমানদের সঙ্গে হিন্দুদের একটা শ্রেণিকে এই পতন থেকে রক্ষা করা যায়নি। যে কথা অনেক মুসলিম নেতা, লেখক, গবেষকরা বলে থাকেন— দাঙ্গা করেছিল হিন্দুরাই, তাই মুসলমান মরেছে বেশি, ক্ষতি হয়েছে বেশি মুসলমানের তা সর্বাংশে সত্য নয়। কারণ, দাঙ্গাটা শুরু করেছিল মুসলমানরাই, হিন্দুরা নয়। তার প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে রয়েছে যেগুলোকে আমরা আগেই তুলে ধরেছি। তবে এটাও ঠিক, তথ্য বলে, হিন্দুরা ময়দানে নামার পর দাঙ্গাটার অভিমুখই বদলে গিয়েছিল। ১৬ অগাস্ট যেমন মুসলমানরা একচেটিয়া আক্রমণ করেছে, খুন করেছে, লুঠ করেছে, ১৭ অগাস্ট সকাল থেকে হিন্দু বাঙালি পথে নামার পর চেহারাটাই দ্রুত পালটাতে থাকে। তখন আর লড়াই একতরফা ছিল না। বরং, হিন্দু আক্রমণের জোয়ারে ভেসে গিয়েছিল মুসলমানরাই। মাঝে আজাদ হিন্দ ফৌজ দিবস (নভেম্বর ১৯৪৫) এবং রসীদ আলি দিবস (ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬)-এর আন্দোলনেও ইট মারলে পাটকেল ছোড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই জনবিক্ষোভে মিশে গিয়েছিল প্রকৃত গুন্ডাবাহিনীও। রাজনৈতিক পরিচয়টা তখন বড়ো ব্যাপার ছিল না। একদল দাঙ্গা চাইছে, অন্যদল নিয়ন্ত্রণ চাইছে— ব্যাপারটা ছিল এরকমই। কে মারবে আর কে মরবে— বিচার্য হয়ে উঠেছিল সেটাই। তবে, এসবের মধ্যেও একটা আলোর রেখা দেখা গিয়েছিল মুসলিম মহিলাদের আচরণে। বহু মুসলিম মহিলা পরিচিত হিন্দু পরিবারগুলিকে আশ্রয় দিয়েছিল এবং বাঁচিয়ে রেখেছিল ওই চরমতম দিনগুলিতে। দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার ২৭ অগাস্ট ১৯৪৬-এর রিপোর্টে দেখা গেছে, পর্দানশিন মুসলমান মেয়েরা পর্দার ঘেরাটোপ ছেড়ে মুসলমান দাঙ্গাবাজদেরই পথ আটকেছেন। সরাসরি হুমকি দিয়েছেন— ওদের আমরা আশ্রয় দিয়েছি। ওদের খুন করতে হলে আগে আমাদের খুন করতে হবে।

দাঙ্গার বহু সর্বনাশা ইতিহাসের অঙ্গ এমন ইতিহাসও।

সাম্প্রদায়িকতার বিষে নীলকণ্ঠ হিন্দু-মুসলমান

দাঙ্গা শুরুর অনেক আগেই শহরের একটি মঞ্চে অভিনীত হচ্ছিল ‘হামরাহী’ নামের একটি নাটক। হিন্দি ভাষায় লেখা ওই নাটকটির নায়কের চরিত্র ছিল একজন রাজনৈতিক নেতার। নাটকের অংশ হিসেবেই তিনি যখন বক্তৃতা করছেন, তখনই অভিনয়ের অঙ্গ হিসেবে একজন আততায়ী তাঁকে ছুরি মারে। অভিনেতা আততায়ীর পরনে ছিল লুঙ্গি। বেশ স্পর্শকাতর এই বিষয়টিতে মুসলমান দর্শকেরা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, নাটকে ইচ্ছাকৃতভাবেই আততায়ীর ভূমিকার অভিনেতাকে লুঙ্গি পরিয়ে মুসলমান হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রমাণ করতে চাওয়া হয়েছে, মুসলমান মানেই আততায়ী। এরপর মুসলিম, দর্শকরা সংঘবদ্ধভাবে মঞ্চ ভাঙচুর করে। নাটক বন্ধ হয়ে যায়।

আবার উলটোটাও ঘটেছিল। এক মুসলিম ট্রাকচালকের ট্রাকের তলায় চাপা পড়ে একটি হিন্দু শিশু। হিন্দুরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। রটিয়ে দেওয়া হয়, হিন্দু শিশুটিকে ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়েছে ট্রাক ড্রাইভার। তাই নিয়েই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা।

‘৪৬-এর দাঙ্গা শুরুর আগে এমনটাই ছিল কলকাতা শহরের বাস্তব পরিস্থিতি। লিখে গেছেন তৎকালীন ইস্টার্ন কম্যান্ডের হেডকোয়ার্টারের এক অফিসার যিনি While Memory Serves শীর্ষক স্মৃতিকথায় ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শেষ দু-বছর কেমন কেটেছিল তা বিবৃত করেছেন।

আর এক আর্মি কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার এরিক সিক্সস্মিথ লিখে গেছেন যে, পরিস্থিতি সাম্প্রদায়িকভাবে এতটাই গম্ভীর হয়েছিল যে, যেকোনো সমস্যাই হয়ে উঠত সাম্প্রদায়িক— ‘any trouble would be communal . ‘ সুরঞ্জন দাস Communal Riots in Bengal 1905-1947-এ লিখছেন :

By August 1946 the popular expectations of a large section of Hindus and Muslims had been raised concerning the political question of Pakistan. The rioting crowd appears to have been broadly aware of the objective of the violence in which it was participating. It was inspired by the ‘moral duty’ as had motivated the French revolutionary crowd to perform tasks which the magistrates had shown themselves unwilling to do.

স্বরাষ্ট্র দপ্তরের আনুমানিক হিসাব ছিল দাঙ্গায় মৃত্যু হয়েছিল দুই সম্প্রদায়ের ৪০০০ মানুষের আর আহত হয়েছিল ১০ হাজার মানুষ। খবরের কাগজগুলিতে সেই মৃতদেহগুলির বিবরণ প্রকাশিত হত— ‘সমস্ত মৃতদেহ ফুলে ঢোল। যুবক থেকে বৃদ্ধ। পুরুষ এবং নারী— সবাইকে গাদা করে বস্তায় ভরে হয় ফেলে রাখা হয়েছে মাঝরাস্তায় আর নয়তো বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বস্তাবন্দি করে লরিতে বা হাত-ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে গণসৎকারের জন্য। কিছু মৃতদেহ পচে ভেসে উঠেছে খালের জলে। রাস্তা পরিষ্কার করার জমাদাররা নেই। বাজারহাট বন্ধ। ঠিকমতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যও মিলছে না। টেলিফোনগুলি মৃত। যানবাহন উধাও।’ [সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯ অগাস্ট ১৯৪৬]

জনৈক ইংরেজ অফিসার তাঁর Tennyson Papers (pub Centre of South Asian Studies, Cambridge)-এ সেই সময়ের কলকাতাকে বর্ণনা করেছেন, ‘A cross between the worst of London air raids and the Great Plague’ বলে।

স্টেটসম্যান পত্রিকার ২০ অগাস্ট, ১৯৪৬-এর সম্পাদকীয়তে লেখা হল:

On all sides (in the city ) are death, injuries, destruction. Houses have been destroyed with the men, women and children in them. Men have returned in the evening to find neither home or wife nor children. The homeless are lying about unsheltered and staying along the streets in any open space whereever they find room or a little hospitality… In all hospitals the injured lie crowded.

শহরের দিগবিদিকে শুধু মৃত্যু, ধ্বংস আর দগদগে আক্রমণের ক্ষতচিহ্ন। বাড়ির সকলকে নিয়ে— পুরুষ, নারী, শিশুসন্তান সহ গোটা বাড়িগুলিকেই ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। গৃহকর্তা বাড়ি ফিরে দেখেছেন— বাড়ি নেই, স্ত্রী নেই, সন্তানেরা উধাও। যেখানে একটুকরো শোওয়ার বসার জায়গা মিলেছে সেখানেই আশ্রয় নিয়েছে গৃহহারা স্বজনহারা হতভাগ্যরা। খোলা আকাশ‍ই তখন তাদের মাথার ওপরের ছাদ। আর হাসপাতালগুলো উপছে পড়ছে আহতদের ভিড়ে।

[আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: আমি ‘৪৬-এর দাঙ্গা দেখিনি। কারণ তখনও আমি জন্মাইনি। কিন্তু আমি দেখেছি দিল্লির ১৯৮৪ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী হত্যার পর শিখ নিধনের ভয়ঙ্কর কংগ্রেসী রাজনীতি। আমি দেখেছি, তার আগে স্বর্ণমন্দির এবং সন্নিহিত এলাকায় ভারতের সামরিক বাহিনীর তাণ্ডব— অপারেশন ব্লুস্টার। আমি দেখেছি ১৯৮৫-র পাঞ্জাবের অনন্তনাগে কাশ্মীরি পণ্ডিতপল্লীকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেওয়ার মোঘলী জঙ্গিপনা। সেদিন যা দেখেছি, তা যেন সেই ‘৪৬-এর দাঙ্গার প্রতিফলিত প্রতিচ্ছবি। দেখেছি, দিল্লি স্টেশনে অমৃতসর মেলকে ঢুকতে। প্রতিটি কামরার দরজা বন্ধ। বন্ধ দরজার ফাঁক বেয়ে গড়াচ্ছে টাটকা রক্ত। অমৃতসর শহরে স্বর্ণমন্দিরের রাস্তার পাশে সাঁজোয়া বাহিনীর বৈজয়ন্তী ট্যাঙ্কের গোলায় বিধ্বস্ত তিনতলা/ চারতলা উঁচু বাড়িগুলির অর্ধেক ধসে পড়া দেওয়ালে ফাঁকে ঝুলছে ছাদের ফ্যান, আলনায় রাখা কুর্তি, চুড়িদার। দেখেছি অনন্তনাগের বরফঢাকা পণ্ডিতপল্লিতে রাস্তার দুপাশে আগুনে দগ্ধ কাঠের সুদৃশ্য বাড়িগুলি পোড়া কাঠের ইমারত হয়ে দাঁড়িয়ে— কোথাও প্রাণের স্পন্দন নেই। দেখেছি স্বচক্ষে ১৯৯২-এর দাঙ্গার আতঙ্ক-ছাওয়া কলকাতাকে। শহর জেগেছিল তিনদিন তিনরাত। আমরা সাংবাদিকরাও। যেন রাজাবাজার, মেটিয়াবুরুজ জেগে না ওঠে।]

‘৪৬-এর ১৬ থেকে ১৯ অগাস্ট— চারদিন টানা আতঙ্ক কিছুটা হলেও রেহাই দিয়েছিল ২০ অগাস্ট। ২২ অগাস্ট থেকে শান্ত হয়ে যায় শহর কলকাতা। বিক্ষিপ্তভাবে তখনও গণহত্যার রেশ চলছিল ২/১টি খুনখারাবির মধ্যে দিয়ে। শহর জুড়ে দাপাদাপি ছিল দাঙ্গাবাজদের নয়, সামরিক বাহিনীর। ব্রিটিশ সেনার ভারী বুটের রুটমার্চে ভরসা ফিরে পেয়েছিল শহর। আর ভয় নেই। এবার বোধ হয় নতুন দিনের সূর্যোদয় আনবে বাঁচার আশ্বাস মৃত্যুর পরোয়ানাকে ঠেলে সরিয়ে

খুন ধর্ষণ লুঠের অডিট রিপোর্ট

দাঙ্গা-পরবর্তী সমীক্ষায় ধরা পড়েছিল— সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ঘন বসতিপূর্ণ ঘিঞ্জি এলাকাগুলি— দক্ষিণের বউবাজার স্ট্রিট, পূর্বের আপার সার্কুলার রোড, উত্তরের বিবেকানন্দ রোড আর পশ্চিমের স্ট্র্যান্ড রোড সন্নিহিত এলাকাগুলি যেগুলি জোড়াসাঁকো, তালতলা, পার্ক সার্কাস, এন্টালি, আমহার্স্ট স্ট্রিট, বউবাজার ও মানিকতলা থানার আওতায় পড়ে। বস্তি এলাকাগুলি ছিল সবচেয়ে বেশি খতরনক। বিশেষ করে কলাবাগান, রাজাবাজার, ওয়াটগঞ্জ, মেহদিবাগান, শোভাবাজার, নিকারীপাড়া, মানিকতলা, জ্যাকেরিয়া স্ট্রিট, রামবাগান, লালবাগান ইত্যাদি কুখ্যাত এলাকাগুলি। ২৪ পরগনার কিছু অঞ্চলে দাঙ্গা ছড়িয়েছিল খানিকটা শুধু সেইসব মুসলমানদের জন্য যারা কলকাতায় মার খেয়ে ঘরে ফিরে শুরু করেছিল নয়া কিসসা।

ধরপাকড় শুরু করে দিয়েছিল পুলিশ আগেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিসেব অনুযায়ী, ১৬ অগাস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মোট গ্রেপ্তারির সংখ্যা ছিল ২০৪৭। এর মধ্যে হিন্দু ছিল ১২২৭ আর মুসলমান ছিল ১৩০৪। প্রায় সমান সমান।

কিন্তু, মৃত্যু হয়েছিল কতজনের? গণহত্যার শিকার হয়েছিল বেশিমাত্রায় কারা? হিন্দু? নাকি, মুসলিম? সাংবাদিক শংকর ঘোষ তাঁর বিখ্যাত হস্তান্তর গ্রন্থের প্রথম পর্বে লিখেছেন :

কলকাতা দাঙ্গায় হতাহতের সংখ্যা নিয়ে যেমন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনি হতাহতের মধ্যে হিন্দু-মুসলমানের সংখ্যা নিয়েও ঘোর মতভেদ ছিল। আজ এই বিতর্ক অহেতুক মনে হতেই পারে। কিন্তু তখনই সাধারণ শান্তিপ্রিয় নাগরিকের কাছে এই বিতর্ক অকারণ মনে হওয়াই উচিত ছিল। তা হয়নি। এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সঙ্গে দেশের ও প্রদেশের রাজনীতি এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল যে রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন, রাজনীতিতে অনাসক্ত নাগরিকও ভেবেছিলেন দাঙ্গায় যে পক্ষ জিতবে তারই রাজনৈতিক জয় হবে। আর সাধারণ মানুষের কাছে দাঙ্গার জয়পরাজয় নির্ধারণের উপায় কোন সম্প্রদায়ের কতজন নিহত হয়েছেন তার তুলনা করা। হয়তো স্পেনস কমিশন তার তদন্ত শেষ করলে হতাহত সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যেত, কিন্তু সে হিসাব যখন পাওয়া যেত তখন তার ঐতিহাসিক মূল্য ছাড়া আর কিছু থাকত না।

না, সঠিক হতাহতের সংখ্যা কেউই দেননি। কারণ, সরকারিভাবে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে কোনো হস্তক্ষেপ করা হয়নি। ফলত, পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগ কিংবা সেনাবাহিনী কারোরই জানা ছিল না— কলকাতার কোন পাড়ায় কত খুন হয়েছে? কোন সম্প্রদায়ের? আহত কত? কারা কারা? কোথায় চিকিৎসা হল?

দাঙ্গার নানাবিধ বিবরণে স্পষ্ট বোঝা যায়— সব খুন প্রকাশ্যে হয়নি। গুমখুনও হয়েছে। খুনের পর গঙ্গায় অথবা গঙ্গার সঙ্গে যোগ আছে এমন খালের জলে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কলকাতার রাজপথ থেকে কত মৃতদেহ পাওয়া গেছে আর চিল, শকুন, বাজপাখিতে কত মৃতদেহ সাবাড় করে দিয়েছে, সে-হিসাব কে দেবে? মুদ্দোফরাশের দল পচাগলা মৃতদেহগুলি ময়লা ফেলার হাতে-টানা ঠেলা অথবা পুরসভার ট্রাকে তুলে বোঝাই করে হয় পুঁতে দিয়েছে মাটিতে নয়তো গণচিতায় পুড়িয়ে দিয়েছে। কেউ হিসাব চায়নি। হিসাব কেউ দেয়ওনি। পরিস্থিতি এতটাই আয়ত্তের বাইরে চলে গিয়েছিল যে, নিখোঁজেরা নিখোঁজই রয়ে গেছে। কত মহিলার ধর্ম বদলে গেছে, স্বামী বদলে গেছে, দেশান্তরী হয়েছে দাঙ্গাবাজদের হাতে পড়ে, সে-হিসাব কে দেবে? স্বাভাবিকভাবেই যে হিসাব পাওয়া যায় তার কোনো পবিত্রতা নেই। দীনেশ চন্দ্র সিনহা ও তাঁর দুই সহযোগী লেখকের গ্রন্থ ১৯৪৬ কলকাতা হত্যা এবং নোয়াখালি গণহত্যা (ভাষান্তর : পৃথ্বীরাজ সেন)-য় লেখা হয়েছে :

আমরা শহরের বুকে সংগঠিত ওই মর্মান্তিক ঘটনার পূর্ণ বিবরণ দিতে পারবো না। আসলে কোনোভাবেই বোধহয় এই নারকীয় ঘটনাবলির বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। কত মানুষের জীবন চিরকালের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কত কোটি মানুষের সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে, তার হিসাব করা কখনও সম্ভবপর নয়।

তবুও এই গ্রন্থে দাবি করা হয়েছে, অন্তত ৬ থেকে ৮ হাজার মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ হয়েছে আহত ও রক্তাক্ত। যে পরিমাণ অর্থ লুণ্ঠন করা হয়েছে এবং বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে যে পরিমাণ সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করা হয়েছে সেটির আর্থিক মূল্য কম করে ৫ থেকে ৭ কোটি। হিন্দুদের সম্পত্তি লুণ্ঠন করা হল, সেগুলিকে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় পৌঁছে দেওয়া হল। এটা মোট ক্ষতির ৯০ শতাংশ হবে। তবে, হতাহত নিয়ে গুজবও ছড়াচ্ছিল অনেক। যেমন ১৬ অগাস্ট লিগ সমর্থকরা প্রচার করে দেয়, অসংখ্য মুসলমান আহত অবস্থায় ক্যাম্বেল হসপিটালে ভরতি হয়েছে। সেদিনই সন্ধ্যায় প্রচার করা হয়, মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভরতি হয়েছে ৩৫০ জন। তার ৭৫ শতাংশই মুসলমান। খবরের সত্যতা যাচাই করে দেখা গিয়েছিল বিভিন্ন হাসপাতালে ৪০/৪৫ জন আহত মানুষ ভরতি হয়েছিল। তবে, তার মধ্যে মুসলমানই ছিল বেশি।

হাসপাতাল সূত্রে বেশ কিছু বিক্ষিপ্ত খবর পাওয়া গিয়েছিল দাঙ্গার সময় ও পরে। যেমন ১৬ অগাস্ট রাত পর্যন্ত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৪৩৫ জনকে আনা হয়েছিল। ২০৭ জন মুসলমান, ১৭৬ জন হিন্দু, বাকি ৭২ জনের ধর্ম জানা যায়নি। ক্যাম্বেল হাসপাতালে আনা হয়েছিল ১৩২ জন আহত মানুষকে। হিন্দু ৬৭ ও মুসলমান ৬৫ জন। কারমাইকেল হাসপাতালে ১৬ অগাস্ট দুপুর বারোটা পর্যন্ত মোট ১৬ জনকে আনা হয়েছিল— ৫ জন মুসলমান, ১১ জন হিন্দু।

মডার্ন রিভিউ-এর সেপ্টেম্বর ১৯৪৬ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল— ‘সারা কলকাতায় বসবাসকারী হিন্দুদের অবস্থা হয়ে উঠেছে মর্মান্তিক এবং শোচনীয়। শহর চলে গেছে ১০ হাজার সশস্ত্র মুসলমান গুণ্ডাদের হাতে। তারা লুট করার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। নারী দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে। যে কোনো মানুষকে হত্যা করতে এক মুহূর্ত চিন্তা করছে না।’ [সূত্র: ১৯৪৬ কলকাতা হত্যা এবং নোয়াখালি গণহত্যা, পৃষ্ঠা ১৩৬]

দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার হিসেব মতো শুধুমাত্র ১৬ অগাস্টেই কলকাতা শহরে মৃত্যু হয়েছিল ২৭০ জনের। আহতের সংখ্যা ১৬০০। ৯০০ বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। ফের ২২ অগাস্ট দ্য স্টেটসম্যান-এ লেখা হয়েছিল—

একদল নির্বোধ, নিষ্ক্রিয় মানুষের দ্বারা এই ঘটনা পরম্পরা সংঘটিত হয়েছে।… এই শহরে দু/তিনদিন কোনো আইনের শাসন ছিল না। আমরা বাংলার মন্ত্রীসভাকে আরও একবার দায়বদ্ধ করব।… মুসলিম লিগের মন্ত্রীরা কোনো সাহায্য বা সহযোগিতা করেননি। তাঁরা মুসলিম লিগের রাজনৈতিক এজেন্ডাকেই সমস্ত মানবতার ওপরে মর্যাদা দিয়েছেন এবং এই ঘটনার মাধ্যমে মুসলিম লিগের স্ব-যত্ন লালিত স্বপ্নকে সফল করার চেষ্টা করেছেন। ব্যাপক সংঘর্ষের ফলে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ চলে গেছে। অন্তত ১৫ হাজার মানুষকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।…

প্রখ্যাত সাংবাদিক ভবানীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলেছিলেন, কলকাতা দাঙ্গায় মৃতের সংখ্যা প্রায় ৫০০০। আর গুরুতর আহতের সংখ্যা ৫০০০০-এর কম নয়।

লর্ড ওয়াভেল মন্তব্য করেছিলেন, পলাশির যুদ্ধে যত সৈনিকের মৃত্যু হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি মৃত্যু ঘটেছিল কলকাতা দাঙ্গায়। তিনি Pethick Lawrence-কে জানিয়েছিলেন, সবমিলিয়ে মৃত্যু হয়েছিল অন্তত ৩০০০ মানুষের আর আহত হয়েছিলেন ১৭০০০ মানুষ।

মার্কিন ইন্দোলজিস্ট স্ট্যানলি ওলপার্ট (Stanley Wolpert) বেসরকারি সূত্র উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, ১৯৪৬-এর ১৫ থেকে ২০ অগাস্টের মধ্যে ১৬০০০ বাঙালি খুন হয়েছিলেন।

চন্দননগরের জনৈক বাসিন্দা অশোক মিত্রর এক বন্ধু নূর মহম্মদ খান গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে চন্দননগর থেকে কলকাতায় আসার পথে ওয়েলিংটন ব্রিজ, বি টি রোড, শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়, সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ এবং ডানলপ ব্রিজ এলাকায় দেখেছিলেন প্রচুর মৃতদেহ আর মৃতদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খোলা আকাশের নীচে পচছে।

সরকারি একটি তথ্য বলছে: ২০ অগাস্ট কলকাতার হাসপাতালগুলির সামগ্রিক তথ্য ছিল—

মোট ভরতি: ২৯৩১

হাসপাতালে মৃত্যু : ১৬৮

চিকিৎসাধীন: ২১৯৪

মৃত আনা হয়েছিল : ২৭৬

ছেড়ে দেওয়া হয়: ৫৬৯

তবে, সামগ্রিকভাবে মৃত্যুর সংখ্যা ৪৪০০-রও বেশি বলেই এই রিপোর্টে বলা হয়েছিল। আহতর সংখ্যা ১৬০০০। গৃহহারা একলক্ষ মানুষ।

অমৃতবাজার পত্রিকা ১১ অক্টোবর ১৯৪৬-এ প্রকাশ করেছিল : স্যার হেনরি টোয়াইনাম (Sir Henry Twynam), সেন্ট্রাল প্রভিন্সের অবসরপ্রাপ্ত গভর্নর রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন— আসলে দাঙ্গায় মারা গেছেন ৪০০০০ মানুষ। ৪০০০ মানুষের দেহ তো শুধু রাস্তাঘাট থেকে উদ্ধার হয়েছিল। মৃতদেহগুলির সৎকারকারী বিভাগের অফিসার-ইন-চার্জের বিবৃতি ছিল এরকম:

সরকারি প্রতিষ্ঠান দ্বারা সৎকার করা মৃতদেহ: ১০৮২

আঞ্জুমান মফিজুল ইসলাম দ্বারা সৎকার করা মৃতদেহর সংখ্যা: ৭৬১

এর মধ্যে ২২১টি ছিল মুসলমান মৃতদেহ। ৫৪০টি ছিল হিন্দু মৃতদেহ।

হিন্দু সৎকার সমিতির দাহ করা মৃতদেহর সংখ্যা : ১২৩০

এই হিসাবে মৃত্যু হয়েছিল মোট ৩১৭৩ জনের।

বিশিষ্ট শিল্পপতি গগনবিহারীলাল মেহতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে লিখেছিলেন :

অবশেষে আমি বলতে চাই যে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে হতাহতর সংখ্যার অনুপাতে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। যাঁরা বলে বেড়াচ্ছেন যে একজন হিন্দু নিহত হলে তার জায়গায় তিনজন মুসলিম নিহত হয়েছেন তাঁরা ঠিক বলছেন না।… প্রকৃতপক্ষে এতে মুসলিম লিগেরই সুবিধা হতে পারে কেননা লিগ একটা যুক্তি খাড়া করার চেষ্টা করছে যে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী হিন্দুরা মুসলিমদের আক্রমণ করার জন্যই হিন্দুর চেয়ে বেশি মুসলিম নিহত হয়েছেন। [সূত্র : হস্তান্তর, শংকর ঘোষ, আ: প্ৰ: পৃষ্ঠা ১০৮]

কলকাতায় দাঙ্গায় হতাহতর সংখ্যা নিয়ে যেমন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনই হতাহতর মধ্যে হিন্দু-মুসলিমের সংখ্যা নিয়েও ঘোর মতভেদ ছিল।

কলকাতার দাঙ্গায় বহু বিশিষ্ট মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। সকলের কথা জানা না গেলেও কিছু মানুষের কথা জানা যায়। এখানে সেরকম

কয়েক জনের নাম দেওয়া হল :

বিচারক ব্যানার্জি, ধর্মতলা

অঙ্ক বিশেষজ্ঞ যাদব চক্রবর্তী, আপার সার্কুলার রোড

বিচারক: বি কে রায়, মৃগেন্দ্রলাল মিশ্র রোড

পুলিন সেন, চিৎপুর রোড

স্যার যদুনাথ সরকারের বড়ো ছেলে

বিখ্যাত মিস্টান্ন ব্যবসায়ী ভীম নাগের সন্তান

.

যেসব বিশিষ্ট হিন্দু বাঙালির বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় :

মল্লিক পরিবারের বাগমারি ভিলা

বিশিষ্ট চলচ্চিত্রাভিনেতা ছবি বিশ্বাসের বাড়ি, বিশিষ্টা অভিনেত্রী সন্ধ্যারানি দেবীর বাড়ি, কলকাতার প্রাক্তন মেয়র আনন্দীরাম পোদ্দারের বাড়ি।

এস কে ব্যানার্জির বাড়ি

এইচ এল বসুর বাড়ি

বিচারক বি কে রায়ের বাড়ি

বিচারক শ্রী ব্যানার্জির বাড়ি

ডাক্তার দেওয়ান বাহাদুর হীরালাল বসুর বাড়ি

মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ডা. ইউ পি বসুর বাড়ি

আইসিএস পি সি দে-র বাড়ি

আইসিএস বি সি দত্তর বাড়ি

শ্রী জে সি গুপ্তর বাড়ি

ড. শচীন বোসের বাড়ি

বাগমারির তারাপদ ঘোষের বাড়ি

বি কে সেনগুপ্তর বাড়ি

অধ্যাপক শ্রী এস এস বি মহলানবিশের বাড়ি

কলকাতা পুলিশের এস এন মুখার্জির বাড়ি, নারকেলডাঙা

 দাঙ্গার আগুনে গণিত বিশারদ যাদব চক্রবর্তীর ভস্মীভূত বাড়ি

দাঙ্গার আগুনে গণিত বিশারদ যাদব চক্রবর্তীর ভস্মীভূত বাড়ি

হাওড়ার তৎকালীন জেলাশাসকের হিসেব অনুযায়ী, হাওড়ায় ১ অগাস্ট ১৫ জন, ১৭ অগাস্ট ৪০ জন এবং ১৮ অগাস্ট ১৪ জনের মৃত্যু হয় দাঙ্গায়। ২০ তারিখে ১০টি মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল।

মেটিয়াবুরুজ-খিদিরপুর অঞ্চলে দাঙ্গায় অন্তত ১১০০ মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে বিড়লাদের কেশোরাম মিলে ওড়িশার ৫০০ শ্রমিককে গলা কেটে হত্যা করা হয়।

দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ এলাকায় মাটি খুঁড়ে ১১০টি পুঁতে রাখা মৃতদেহ পাওয়া যায় ২০ অগাস্ট। মোমিনপুর থেকে উদ্ধার হয় ২০টি মৃতদেহ। দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়াহাটে বেশ কিছু দোকানদারকে হত্যা করা হয়েছিল।

কলকাতার যেসব অঞ্চল ভয়াবহভাবে আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল :

মানিকতলা, চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, বিডন স্ট্রিট, বউবাজার স্ট্রিট, লোয়ার সার্কুলার রোড, টেরিটি বাজার, এজরা স্ট্রিট, লোয়ার চিৎপুর রোড, শিয়ালদহ, রিপন স্ট্রিট, ওয়েলেসলি স্ট্রিট, মল্লিকবাজার, বটতলা, দমদম রোড, গড়পার, হ্যারিসন রোড বড়োবাজার, কলেজ স্ট্রিট, ওয়েলিংটন স্কোয়ার, মির্জাপুর স্ট্রিট, নারকেলডাঙা মেন রোড, ধর্মতলা স্ট্রিট, ফুলবাগান, টালা, বেলগাছিয়া, মেটিয়াবুরুজ, খিদিরপুর, বালিগঞ্জ, মোমিনপুর, গড়িয়াহাট, পার্ক সার্কাস, কড়েয়া রোড, ক্যানিং স্ট্রিট, কলুয়াটোলা, ওয়েলেসলি স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট, কর্পোরেশন স্ট্রিট, রয়েড রোড, এলিয়ট রোড, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, বেলিয়াঘাটা, রাজাবাজার, বর্মন স্ট্রিট, মেছুয়াবাজার, দীনেন্দ্র স্ট্রিট, তারাচাঁদ স্ট্রিট।

যেসব বিশিষ্ট হিন্দু মালিকানার দোকান ধ্বংস করা হয়: কে সি বিশ্বাসের বন্দুকের দোকান, ধর্মতলা

কমলালয় স্টোর্স, ধর্মতলা

মদবিক্রেতা এ কে ঘোষ লিমিটেড, পার্ক স্ট্রিট

জলযোগ, পার্ক স্ট্রিট

আর কে দত্ত অ্যান্ড ব্রাদার্স, পার্ক স্ট্রিট

দুধের দোকান, পার্ক স্ট্রিট

মিষ্টির দোকান, পরেশনাথ ঘোষ, পার্ক স্ট্রিট

ডালিয়া, কলেজ স্ট্রিট মার্কেট

লক্ষ্মী স্টোর, কলেজ স্ট্রিট মার্কেট

ব্রিস্টল হোটেল

এ ছাড়া রিপন হোস্টেল, লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির, ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়, ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং ছোটো, বড়ো অজস্র মন্দির মুসলমানদের আক্রমণে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

লুঠপাট ক্ষতির পরিমাণ

বিশিষ্ট গবেষক সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হিসাবে, ১৮ অগাস্টেই মৃতের সংখ্যা দু-হাজারে চলে গিয়েছিল।

২৩ অগাস্ট দ্য স্টেটসম্যান হিসাব দেয়— মৃত ৪০০০, আহত ১১০০০। ২৮ অগাস্টের সরকারি নোট : মৃত ৪০০০, আহত ১৩০০০, গৃহচ্যুত ১০,০০০। ২৬ অগাস্ট কলকাতা ও হাওড়ার রাস্তা থেকেই কুড়িয়ে পাওয়া গিয়েছিল ৩৪৬৮টি মৃতদেহ। (ref. Cal. Municipal Gazatte, Aug. 24, 1946)

দাঙ্গা এবং দাঙ্গা পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে ১৯৪৬-এ ইতিহাস সৃষ্টিকারী দাঙ্গায় কী পরিমাণ জিনিসপত্র এবং সম্পত্তি লুঠ হয়েছে বা পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে, তার কোনো আন্দাজ সরকারিভাবে পাওয়া যায়নি। তবে, দাঙ্গার দীর্ঘ পরিসরব্যাপী ভয়াবহতা দেখে আন্দাজ করা যায়, অন্তত সেই আমলে ১০০ কোটি টাকার সামগ্রী লুঠ হয়েছিল।

মৃত্যুর আনুমানিক সংখ্যা ১০ হাজার। যদিও বহু গবেষকের তথ্যেই পাওয়া গেছে— পরিস্থিতি এতটাই ভয়ংকর ছিল যে, মৃতদেহ গোনার মতো লোক পাওয়া সম্ভব ছিল না। বহু পচাগলা মৃতদেহ গঙ্গায় বা শহরের বিভিন্ন খালে ঠেলা বোঝাই করে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। লঞ্চের মাঝিদের হত্যা এবং বিসর্জন সবই ঘটেছে মাঝগঙ্গায়। অনেক মৃতদেহ মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয়েছে।

শ্যামবাজারে প্রমথনাথ মল্লিকের বাড়ির সামনে মড়া জমে আছে। নর্দমা বন্ধ। দেখেছেন অজিত বসু। আবদুর মনসুর দেখেছেন, নাপিত, মুচি, মেথরদের ধরে ধরে হত্যা করা হচ্ছে। এক রিকশাওয়ালা ছুরি খেয়ে তার রিকশার ওপরেই পড়ে আছে— ক্ষতস্থান থেকে তখনও রক্ত বেরোচ্ছে। ভবানীপুরে মোহিনীমোহন রোডে একটি লোকের পেট ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়, সে রাস্তায় পড়ে ‘জল জল’ বলে চিৎকার করে। তারপর নিজেই উঠে টিউবওয়েল পাম্প করতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে মারা যায়।… চিৎপুরে এক হিন্দু ব্যবসায়ীর শরীরে বাইশটি কোপ মারা হয়। বউবাজারে মদন বড়াল লেনে এক বৃদ্ধ মুসলমানকে একটা পার্কের মধ্যে ঢোকায় কাটবে বলে। পাড়ার লোকেদের তারা চিৎকার করে জানিয়ে দেয়— জানলা বন্ধ করে দিন!

এ সমস্ত তথ্য লিখেছেন সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ইতিহাসের দিকে ফিরে ছেচল্লিশের দাঙ্গা শীর্ষক গবেষণাগ্রন্থে।

হিন্দুদের পক্ষ থেকে যেমন গোপাল পাঁঠার নেতৃত্বে জগা বোস, ইন্দুকুমার বিদ প্রমুখ এলাকায় এলাকায় মুসলিম আক্রমণ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন, তেমনি মুসলমানদের পক্ষে হিন্দু ও শিখ নিধনের বরাত পেয়েছিলেন যবন দুর্বৃত্তদের নেতৃত্ব— সালমি ইলিয়াস সালমা, থোউসা, আদুস হক, গুলাম নবী, কালিমুদ্দিন চৌধুরী, ইসাক সর্দার, আবু জান, মীর সাহেব, মহম্মদ ইউনিস, সঈদ গীরজান, মহম্মদ রউফ, কাদির, আবদুল মাজিদ খান, সাইদ মহম্মদ ইসাক প্রমুখ।

সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, কলেজ স্ট্রিটের ধীরেন বন্দ্যোপাধ্যায়, ভবানীপুরের গুণেন রায়ের মৌখিক ভাষ্য অনুযায়ী— বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটে এখন যেখানে বিশ্বভারতী আর মনীষার দোকান, সেই ফুটপাথটা মড়ায় বোঝাই হয়ে আছে। বাগমারি কবরখানায় শ্রমিক নেতা বীরেন রায় দেখেছিলেন— মৃতদেহ স্তূপ করে রাখা। জায়গার অভাবে গোর দেওয়া যাচ্ছে না।

এই বিশাল গণহত্যার পিছনে রাজনীতির বকলমে খুনিরা ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়। পরবর্তীকালে আইন পরিষদে বির্তকের সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় অভিযোগ করেছিলেন, লিগ সরকার শহরটাকে দাঙ্গার ক-দিন গুন্ডাদের হাতে ছেড়ে দিয়ে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন। সুরাবর্দি শ্যামাপ্রসাদকেই গুন্ডা বললে তিনি তাৎক্ষণিক জবাব দেন, “আমি গুন্ডা হতে পারি। কিন্তু, আপনি গুন্ডাদের সর্দার— The prince of goondas। গুন্ডাদের রাজকুমার।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%