সুদীপ দেব

বিছানায় শুয়ে দু-চোখের পাতা এক করতে পারছে না বুবুল। বাড়িতে যথারীতি দাদুর খোঁজ পড়ে গেছে। তবে বুবুল সবাইকে বলেছে যে দাদু একটা বিশেষ কাজে হঠাৎ কলকাতা গেছেন। কাজটা এমনি জরুরি এবং আকস্মিক যে উনি কাউকে না বলেই চলে যাচ্ছিলেন, নেহাত কপালজোরে বাসে ওঠার সময় বুবুলকে দেখে ফেলেন, আর তাকে বাড়িতে খবর দিয়ে দিতে বলেছেন। আরও বলেছেন কাউকে কোনও চিন্তা না করতে, ওঁর গবেষণার একটি বিশেষ দরকার মিটে গেলেই ফিরে আসবেন।
বুবুল ছোট হলেও তার একটা ব্যক্তিত্ব আছে, যার জেরে তার যে কোনও কথা বড়রা বেশ গুরুত্ব দিয়ে শোনে। আর সাধারণত বুবুল কখনও মিথ্যে কথা বলে না। তাই আপাতত বাড়ির সবাইকে শান্ত করে রাখা গেছে। নাহলে এতক্ষণে আবার কুরুক্ষেত্র বেধে যেত।
কিন্তু বুবুলের খুব চিন্তা হচ্ছে দাদুকে নিয়ে। আর ওই সব অদ্ভুত ঘটনা—যা আজ ঘটে গেল। অনেক ভেবে বুবুল বুঝেছে এ নিশ্চয়ই ভিনগ্রহের প্রাণীদের ব্যাপারস্যাপার, যা আজ পর্যন্ত শুধু বইয়ের পাতাতেই পড়ে এসেছে এবং সিনেমাতেই দেখে এসেছে। কিন্তু তারা হঠাৎ এই মোহনপুর গ্রামেই নেমে এল কেন? তবে কি দাদু তাঁর গবেষণাগারে অন্য গ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার কোনও উপায় খুঁজে পেয়েছেন? এ ছাড়া তো আর কোনও সমাধানসূত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
বুবুল বিছানা ছেড়ে দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। উঠোনের পুব দিকের ল্যাবরেটরিতে আজ আলো জ্বলেনি। বুবুল পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল ল্যাবরেটরির দিকে। দরজা বন্ধ। বাইরে কড়াতে তালা ঝুলছে। কী মনে করে তালাটা ধরতেই চমকে উঠল বুবুল। তালাটা মোটে একটা কড়ায় লাগানো। অর্থাৎ দাদুর ল্যাবরেটরি খোলা।
ভেজানো দরজাটা আস্তে ঠেলে ভিতরে ঢুকে এল সে। উত্তেজনায় তার বুক ধড়াস ধড়াস করছে। আলো না জ্বললেও একদম নিকষ কালো অন্ধকার নয় ভেতরটা। কারণ দু-একটি মেশিনের গায়ে লাল-হলুদ-সবুজ ছোট-ছোট আলো জ্বলছিল। সেই আলোতে বুবুল দেওয়ালে সুইচবোর্ডটা দেখতে পেল। একটা সুইচ টিপতেই নীল একটা নাইটল্যাম্প জ্বলে উঠল। এবার ভেতরটা বেশ ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছে। তাই সে আর বড় আলো জ্বালানোর চেষ্টা করল না।
ল্যাবরেটরির ভেতরটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে বুবুল বুঝল, ল্যাবটা মোটামুটি দু-রকম ভাগে ভাগ করা আছে। একদিকে মেকানিক্যাল কিছু যন্ত্রপাতি। আরেকদিকে রসায়নিক বয়ামটয়াম ইত্যাদি। যন্ত্রগুলো তো দেখে কিছু বুঝতে পারছে না, বরং কেমিক্যাল দিকটা বেশ ইন্টারেস্টিং। কয়েকটা আচারের বয়ামের মতো বড়-বড় কাচের ঢাকনাওলা জারে তরলের মধ্যে বিছে, সাপ ও এরকম দেখতে আরও কিছু প্রাণী চোবানো আছে। ওই তরলের নাম ফর্ম্যালিন, বুবুল জানে।
কিন্তু ফর্ম্যালিনের তো কোনও রঙ নেই। সবক-টি বয়ামে জলের মতো স্বচ্ছ তরল থাকলেও একটি জারে কালচে রঙের তরল দেখতে পেল বুবুল। তার মধ্যে অদ্ভুদ দেখতে একটি প্রাণী ডোবানো। অনেকটা মুরগির ছানার মতো, কিন্তু মুখটা আবার বানর বা মানুষের মতো। একটা লম্বা লেজও আছে। আর পিঠের ওপর স্টিগোসোরাসের মতো তিনকোণা তিনকোণা কাঁটা উঁচিয়ে আছে।
ভালো করে দেখবে বলে বুবুল সুইচ টিপে টিপে টিউব লাইটটা জ্বালাল। উজ্জ্বল আলোয় প্রথমে চোখটা ধাঁধিয়ে গেল। সয়ে আসতে বুবুল দেখল, কালচে নয়, বয়ামের তরলটার রঙ গাঢ় লাল। নীল রঙের নাইটল্যাম্পের আলোয় ওটা কালচে দেখাচ্ছিল।
বয়ামটার সামনে দুটো বিকারে সবুজ আর হলুদ রঙের তরল রাখা আছে। বিকারগুলোর মধ্যে একটা করে কাচের নলও আছে।
বুবুল এবার একটা দুঃসাহসিক কাজ করল। বয়ামের কাচের ঢাকনাটা আসতে আসতে খুলে ফেলল। কাচের নলের একপ্রান্ত আঙুল দিয়ে টিপে ধরে সবুজ তরল খানিকটা তুলে নিয়ে ফোঁটা ফোঁটা করে বয়ামের তরলে ফেলতে লাগল। উঁচু ক্লাসের দাদারা স্কুলে কেমিস্ট্রির ল্যাবে এরকম করে, দেখেছে বুবুল।
বেশ কয়েক ফোঁটা ফেলার পর ধোঁয়ার মতো বেরোতে লাগল বয়ামটা থেকে। এই রে! আগুণটাগুণ লেগে যাবে নাকি। এবার বেশ ভয় করতে লাগল বুবুলের। বয়ামের গায়ে হাত দিয়ে দেখল বয়ামটা বরফের মতো ঠাণ্ডা। তার গায়ে বাইরের দিকে জল জমে গেছে ঠাণ্ডায়।
ভেতরের তরলটা থেকেও বুদবুদ উঠছে। তবে ফুটে ওঠার বুদবুদ নয়। যেন ভেতর থেকে কেউ হাওয়া ছাড়ছে একটু একটু করে।
আরে! ভেতরের প্রাণীটা একটু একটু নড়ছে না? হ্যাঁ। যেন ঘুম থেকে উঠল—এরকম আড়মোড়া ভাঙছে। তারপরই যেন বয়ামের ভেতর ঝড় বয়ে গেল একটা। আর প্রাণীটা বাইরে বেরিয়ে এসে সারা ল্যাবরেটরিময় উড়ে বেড়াতে লাগল।
ভীষণ ভয়ে বুবুল লাফিয়ে উঠতেই তার হাত লেগে হলুদ বিকারটা মাটিতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল।
“হায় হায় হায় হায়! এ কী করলে!”
কে কথা বলে?
“বলি করলেটা কী শুনি? এখন আমার মুক্তি হবে কী করে? অ্যাঁ?”
“কে? কে?”
“কে আবার? আমি প্রাণগোবিন্দ পরামানিক। তোমার যে চুল কাটতে আসে সেই নিতাই প্রামাণিকের বাবার বাবা তস্য বাবা। এইমাত্র তুমি আমায় বোতল থেকে ঘুম ভাঙিয়ে ঠেলে তুললে।”
“অ্যাঁ? তার মানে এই চামচিকের মতো উড়ে বেড়াচ্ছেন আপনি?”
“চামচিকে! তোমার এতবড় আস্পদ্দা আমাকে চামচিকে বললে?”
প্রাণীটা উড়ে উড়ে বুবুলের সামনে এসে হাওয়ায় ভেসে রইল। কেমন যেন অর্ধস্বচ্ছ লাগছে এখন। ওর ভেতর দিয়ে ওপাশের জিনিসও দিব্বি দেখা যাচ্ছে।
“আ-আপনি কি ভূত?”
“ওসব ফালতু নামে আমাকে ডাকবে না। আমি হলুম গে পবিত্র আত্মা।”
“আমাকে ভয় দেখাবেন না। আমি ভূত টুত বিশ্বাস করি না। মনে হচ্ছে আপনিও ওই ভিনগ্রহ থেকে এসেছেন। কী যেন নাম... লিম্বাটু।”
“কী নাম বললে? লিম্বাটু? তুমি এ নাম কোথায় শুনলে?”
“ওই তো সেভেন্টিনদা বলল।”
“এই রে! তার মানে ওরা সবাই এসে গেছে? তোমার দাদু কোথায়?”
“সে তো আমি জানি না, তবে সেভেন্টিনদা বললেন যে দাদু নাকি নিজেই লুকিয়ে আছেন। সময় হলেই বেরোবেন।”
“কী সর্বনাশ! মানে খটমটি থেকেও ওরা এসে গেছে।”
“কী খটোমটো কথা বলছেন? কিছুই তো বুঝতে পারছি না।”
“তোমার তো বোঝার কথাও নয়। তুমি তো পুঁচকে ছেলে। বলি এই ঘরে কী করছ, অ্যাঁ? না বলে দাদুর জিনিস ধরেছ কেন? মহাকালের অমৃতপাত্রটা ফেলে ভেঙে দিলে, এখন আমার মুক্তিটা হবে কী করে, শুনি? সরকারবাবু কত কষ্ট করে ওই অমৃতটুকু বানিয়েছিলেন। আমি কত ত্যাগ স্বীকার করে সাতবচ্ছর এই বোতলে আলাদিনের দৈত্যির মতো বন্দি রইলুম শুধু ওই মুক্তির আশায়। তুমি সব জল ঢেলে দিলে?”
“তা তোমায় তো আমি মুক্ত করে দিয়েছিই। তুমি তো বোতল থেকে বেরিয়ে গেছ। এখন যাও না যেদিকে খুশি।”
“আরে দূর! এই মুক্তি কে চায়। মানুষ মরলেও আত্মা মরে না, জানো? সবাই বলত আত্মার নাকি মুক্তি নেই। কিন্তু ওই মহাকালের অমৃত দিয়ে আত্মারও মুক্তি সম্ভব। প্রায় তৈরিই হয়ে এসেছিল রে! আর কয়েকটা দিন পরেই চিরমুক্তি পেয়ে যেতুম। জন্মান্তর জানো? জন্মান্তর? তুমি তো পুঁচকে ছেলে, এসব ভারী ভারী কথা জানবেই বা কী করে?”
“হ্যাঁ, আমি জানি। জন্মান্তর জানি। জাতিস্মর জানি। সোনার কেল্লায় মুকুল ছিল জাতিস্মর।”
“তাহলে তো অনেকটাই জানো দেখছি। তবে এটা তো জানো না, মানুষ শুধু পরের জন্মে যে মানুষই হবে তার কোনও মানে নেই।”
“হ্যাঁ, সেটাও জানি। কেউ জল চাইলে জল না দিলে মরে গিয়ে পরের জন্মে চাতকপাখি হয়ে জন্মাতে হয়।”
“বাঃ, বাঃ। আজকালকার বাচ্চারা সবকিছুতে বেশ এগিয়ে গেছে দেখছি। তোমার মতো বয়েসে আমি এসব কিছুই জানতাম না। তবে এটাও নিশ্চয়ই জানো, পরের জন্মে যে এই গ্রহেরই প্রাণী হয়ে জন্মাতে হবে তারও কোনও মানে নেই। লিম্বাটুতেও জন্মাতে পারো, খটমটিতেও জন্মাতে পারো, আবার ক্রেনিয়াস গ্রহের অ্যাং হয়েও জন্মাতে পারো।”
বুবুল সবিস্ময়ে বলল, “বঙ্কুবাবুর বন্ধু!”
“নাঃ, তোমায় যতটা বোকা ভেবেছিলাম ততটা বোকা তুমি নও।”
“সবাই বলে।”
“আবার যতটা চালাক ভেবেছিলাম ততটা চালাকও নও।”
“কেন?”
“নাহলে মহাকালের অমৃতপাত্রটা ভেঙে ফেলতে কখনও?”
“কী করব? আপনিই তো হুটোপাটি করে বোতল থেকে বের হতে গিয়ে এমন ভয় পাইয়ে দিলেন।”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে। আত্মা দেখে বড়-বড় লোকেদেরই আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে যায়, আর তুমি তো পুঁচকে ছোঁড়া।”
“বারবার আমায় পুঁচকে পুঁচকে বলবেন না বলে দিচ্ছি।”
“ঠিক আছে বলব না। কিন্তু তোমার দাদুর সামনে যে ঘোর বিপদ সেটা বুঝতে পারছ কি?”
“কিছু একটা হতে চলেছে সেটা বুঝেছি। কিন্তু গোটা ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছে না।”
“মহাকাশে তিনটি মোটে গ্রহ আছে যেখানে যেখানে আত্মা নবজন্ম লাভ করতে পারে।”
“মানে প্রাণ আছে, তাই তো?”
“হ্যাঁ, একটা পৃথিবী, দুই লিম্বাটু আর তিন খটমটি। এর পরের জন্মে যেমন আমার লিম্বাটুতে জন্মানোর কথা ছিল। সরকারবাবু সাত বছর আগে আত্মা ধরার ওষুধ ‘আত্মামেব জয়তে’ আবিষ্কার করলেন। ওই বয়ামের মধ্যে রাখা লাল জলটাই হল আত্মামেব জয়তে। সেই সময় সৌভাগ্যক্রমে কাছাকাছি ওই কাঁঠালগাছের ডালে পা ঝুলিয়ে আমি বসেছিলাম। তাই প্রথমেই আমায় খপাত করে ধরে নিলেন। তারপর ওঁর গবেষণার ব্যাপার স্যাপার সব বুঝিয়ে বলতে আমিও গিনিপিগ হতে রাজি হয়ে গেলুম। সফল হলে তো প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত আত্মা হিসেবে আমার নামটাই সোনার জলে লেখা থাকবে, নাকি? তা তোমার জ্বালায় সে আরও কতদিন পিছিয়ে গেল কে জানে।”
“কিন্তু দাদু গেলেন কোথায়?”
“বললাম না, খটমটি আর লিম্বাটুতে সরকারবাবুর এই আবিষ্কারের কথা জানাজানি হয়ে গেছে। তাই ওই দুই গ্রহ থেকে বিজ্ঞানীরা এসেছেন ওষুধগুলোর পেটেন্ট কিনতে। তারাই হয়তো কেউ সরকারবাবুকে ধরে নিয়ে গেছে।”
“আচ্ছা, আপনি তো ছিলেন নাপিত। মানে, চুলটুল কাটতেন। আপনার নাতি নিতাইদাদাই তো মাধ্যমিক পাশ করতে পারেনি। আপনি এসব শক্ত শক্ত কথা বুঝতে পারলেন কী করে?”
“ওরে বাবা সে তো একবার জন্ম নিয়ে নিলে সব ভুলে গিয়ে শুরু থেকে শুরু করতে হয়। আত্মা তো সবজান্তা। কিন্তু ধরো আমি যদি এখন একটা টিকটিকি হয়ে জন্মাই তাহলে কি পোকা ধরে খাওয়া ছাড়া আর কিছু বুঝব?”
“তা বটে।”
“কিন্তু আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি তোমার মতো এক পুঁচকে ছোঁড়ার সাহস দেখে। চোখের সামনে আত্মা ভেসে বেড়াচ্ছে, আর তুমি ভয় না পেয়ে দিব্বি গপ্পো করছ।”
“বললাম না, আমি ভূতটুত বিশ্বাস করি না, তাই ভয়ও পাই না।”
“ইশ, ওই বিচ্ছিরি নামে আমায় ডাকবে না বলে দিচ্ছি আবার।”
“আপনিও আমাকে পুঁচকে বলবেন না বলে দিচ্ছি।”
“আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন সরকারবাবুকে আগে খুঁজে বের করতে হবে। নইলে ঘোর বিপদ। আমার তো মুক্তি হবেই না, বরং এই পৃথিবীরও বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে। কারণ খটমটির বিজ্ঞানীরা সাংঘাতিক বদমাশ। তারা মহাকালের অমৃতের জন্য সবকিছু করতে পারে।”
“আর লিম্বাটুর এলিয়েনরা?”
“ওরা নিপাট ভদ্দরলোক। এরা বুদ্ধিমান ও বহুরূপী হলেও লিম্বাটুর বিজ্ঞান খটমটির থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। আর পৃথিবীর বিজ্ঞান তো এদের কাছে হামা দেওয়া ছেলের সমান। কাজেই আমাদের যা কিছু করতে হবে সব বুদ্ধি দিয়ে। গায়ের জোরে পেরে উঠতে পারবে না। সরকারবাবু মনে হয় খটমটির বিজ্ঞানীদের হাতেই বন্দি।”
“আমার তা মনে হয় না। কারণ সেভেনটিনদা বলেছেন দাদুর জন্য চিন্তা না করতে। উনি স্বেচ্ছায় কোথাও গেছেন।”
“তাহলে লিম্বাটুর বিজ্ঞানীরা সরকারবাবুকে লুকিয়ে রেখেছে, তাঁকে আর মহাকালের অমৃতকে খটমটির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন