সাত

সুদীপ দেব

রাত বারোটার কিছু পরে বুবুল তার শোবার ঘরের জানালায় ঠকঠক আওয়াজ শুনে দরজা খুলে বেরিয়ে এল। অন্ধকারের মধ্যে এগিয়ে এলেন জীবনস্যার ও নিতাইদা।

জীবনস্যার বললেন, “নিতাইকে নিয়ে এলাম তুই কোন ঘরে ঘুমোস সেটা জানতাম না বলে। তা ছাড়া ল্যাবেরটরির বাইরেও একজন পাহারা দেওয়ার লোক চাই।”

দাদুর ল্যাবরেটরির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে এল বুবুল আর জীবনানন্দবাবু। নিতাই দরজা বন্ধ করে বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।

ভেতরে ঢুকে লাইট জ্বেলে বুবুল বলল, “দাদু লিম্বাটুর স্পেসশিপে আছে। আমাদের পুকুরে জলের নীচে।”

“তুই কী করে জানলি?”

“বিকেলে সেভেন্টিনদার সঙ্গে দেখা করতে গেছিলাম বাঁশবাগানে।”

“কাজটা তুমি মোটেও ঠিক করোনি বুবুল। তোমাকে আমি বারণ করেছিলাম। আমরা জানি না লিম্বাটুর প্রাণীদের উদ্দেশ্য কী?”

“না স্যার, ওরা ভালো। ওরা এসেছে পৃথিবীকে খটমটির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য।” বুবুল এরপর সংক্ষেপে ঘটনাটা খুলে বলল।

“হুম। আজ বিকেলে স্কুলে কী হয়েছে নিশ্চয়ই শুনেছিস। খটমটির লোকদুটোর এই ল্যাব খুঁজে পেতে আর বেশি দেরি হবে না। তাহলে সমূহ বিপদ। সরকারবাবুর সঙ্গে যে করে হোক আজ রাতেই যোগাযোগ করতে হবে। দুটো তালপাতার সেপাই আর অশীতিপর বৃদ্ধদের ক্ষমতা নেই ভিনগ্রহি প্রাণীদের সঙ্গে লড়ার।”

“তাহলে প্রাণগোবিন্দবাবুকে বের করি?”

“হ্যাঁ, কোথায়?”

বুবুল জীবনস্যারকে নিয়ে গেল সেই জারটার কাছে। তার ভেতরে লাল রঙের ‘আত্মামেব জয়তে’ মিক্সচারে কালকের মতোই ভেসে রয়েছে একটা কিম্ভুতদর্শন প্রাণী। এবার বুবুল ঢাকনা খুলে সবুজ মিক্সচারটা আবার ফোঁটা ফোঁটা করে ফেলতেই বোতলের ভেতর ঘূর্ণি তুলে বাইরে বেরিয়ে এল প্রাণগোবিন্দের আত্মা। উত্তেজনার চোটে জীবনবাবু বুবুলের হাতটা খামচে ধরলেন।

“তুমি দেখছি ব্যাপারটা রাষ্ট্র না করে ছাড়বে না। আজ আবার কাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছ?” খনখনে গলায় বলে উঠল আত্মা।

“ইনি জীবনস্যার। আমাদের বায়োলজির টিচার। খটমটির বিজ্ঞানীরা কাল ওঁর বাড়িতে প্রথমে হানা দিয়েছিল।”

“হ্যাঁ, ওরা কুনোব্যাঙের কর্নপটহ খুঁজছিল কেন বলতে পারবেন?”

“কর্নপটহ? দূর দূর! কর্ণপটহ হতে যাবে কেন? ওরা খুঁজছে ‘কর্মপন্থা’।”

“কর্মপন্থা! কীসের কর্মপন্থা?”

“আরে সরকারবাবু আত্মাশুদ্ধির এই যে তিনরকম ওষুধ আবিষ্কার করেছেন, লাল রঙেরটা হল আত্মা ধরে রাখার জন্য। এর নাম ‘আত্মামেব জয়তে’। সবুজটা পুনরায় আত্মাকে জাগ্রত করার জন্য, ‘উঠিস্তিতঃ জাগ্রত’, আর হলুদ—যেটা তুমি বুবুল ফেলে ভাঙলে, ‘মহাকালের অমৃত’। এই তিনের একসঙ্গে নাম হল ‘কর্মপন্থা’।”

“ইশ। তাহলে মিছিমিছি রামনামকে ওরা হেনস্থা করল।”

জীবনবাবু এই কথা বলা মাত্র একটা ‘খোঁইয়্যাঁক’ করে আওয়াজ করে সারা ঘরময় ছোটখাটো একটা ঝড় তুলে প্রাণগোবিন্দের আত্মা আবার ‘আত্মামেব জয়তে’র বোতলে সেঁধিয়ে গেল।

জীবনানন্দবাবু হতচকিত হয়ে বললেন, “কী হল ব্যাপারটা!”

বুবুল কিছুটা ধাতস্থ হয়ে বলল, “স্যার, আমার মনে হয় দারোয়ানের নামটা বলা আপনার উচিত হয়নি।”

“ঠিক বলেছ!” জীবনস্যার চমৎকৃত হয়ে বললেন, “হাজার হলেও ভূত তো। ওই নাম কি তেনাদের সহ্য হয়! ঠিক আছে, মাথায় থাকবে। তুমি আরেকবার ওঁকে জাগাও।”

প্রাণগোবিন্দবাবু আবার ‘প্রাণ’ ফিরে পেয়ে বেরিয়েই বললেন, “বারবার আমাকে বিরক্ত করছ কেন, শুনি?”

জীবনানন্দবাবু বললেন, “দেখুন, আপনি ছাড়া এখন আমাদের উপায় নেই। আত্মা তো শুনেছি সর্বত্রগামী। আপনি একবার সরকারবাবুদের পুকুরের তলায় লিম্বাটুর মহাকাশযানে গিয়ে সরকারবাবুকে বলুন অবিলম্বে এখানে আসতে। কারণ, খটমটির বিজ্ঞানীরা যে কোনও সময় এসে পড়লে আমাদের সবার প্রাণসংশয় হতে পারে।”

“সে তো উনি সবসময় নজর রাখছেন এখানে।”

“সেটা শুধু এই ল্যাবরেটরির ভেতরে। এর বাইরে কী হচ্ছে সে খবর তাঁর কাছে পৌঁছচ্ছে না। আপনি প্লিজ একবার যান। তারপর ওঁর যা মনে হয় উনি করবেন।”

বুবুল বলল, “মহাকালের অমৃতটাও তো আবার তৈরি করতে হবে। নইলে আপনার মুক্তিটা হবে কী করে?”

“আচ্ছা, ঠিক আছে।”

প্রাণগোবিন্দ হুশ করে অদৃশ্য হয়ে যেতে জীবনানন্দবাবু আর বুবুল ল্যাবরেটরির বাইরে বেরিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিল।”

নিতাই বলল, “বাবুর চিঠি পেলেন?”

“চিঠি?”

“হ্যাঁ স্যার, আপনি বললেন যে, বাবু নাকি কী এক দরকারি কাগজ রেখেছেন ওই ভূতঘরে। আপনাকে সেটা কলকাতায় পাঠাতে বলেছেন কাল সকালে।”

“ও হ্যাঁ, পেয়েছি।”

ঠিক এইসময় একটা জোরালো টর্চের আলো এসে পড়ল জীবনানন্দবাবুর মুখের ওপর।

“কে ওখানে? কারা?” টর্চের পেছনের ঘন অন্ধকার থেকে জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল। বক্তা এগিয়ে আসতে বোঝা গেল করলিস্যার আর তাঁর সঙ্গে দামুখুড়ো।

“ও আপনারা!”

“এ কী! জীবন! নিতাই! তোমরা এত রাতে এই বাচ্চা ছেলেটার সঙ্গে এখানে কী করছ? এ কে?”

“বুবুল। সরকারবাবুর নাতি।”

“অ। তা এত রাতে...” বলতে না বলতেই পেছন থেকে ষণ্ডামার্কা দুটো লোকের আবির্ভাব হল। মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। অন্ধকারে লাল চোখদুটো দপদপ করে জ্বলছে।

“আঁ... আঁ... আঁ...” দামুখুড়ো ধপ করে পড়ে গেলেন।

লোকদুটো কাছে এসে সবার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিল। এরাই কাল জীবনানন্দবাবু ঘরে হানা দিয়েছিল। একজন পকেট থেকে একটা মোবাইলের মতো যন্ত্র বের করে ওদের চারজনের দিকে তাক করল। বুবুল বুঝতে পারল তাদের হাত-পাগুলো কেমন অসাড় হয়ে গেল। নড়াচড়ার কোনও ক্ষমতা রইল না। একদম স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সবাই।

লোকদুটি ধীরে সুস্থে ল্যাবরেটরির ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

আকাশে কাস্তের মতো একাদশীর চাঁদ উঠেছে। সেই আলোয় বরং অন্ধকার আরও বেশি রহস্যময় হয়ে উঠেছে।

বুবুল হঠাৎ বলে উঠল, “দাদু নিশ্চয়ই এবার দেখতে পাবেন তাঁর ল্যাবরেটরির ভেতরে কারা ঢুকেছে।”

“তুই কথা বলতে পারছিস বুবুল? আরে! আমিও তো পারছি।”

বোঝা গেল শুধু তাদের নড়াচড়ার ক্ষমতাই লোপ পেয়েছে। কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়নি।

নিতাই হাঁউমাউ করে কেঁদে উঠল। করালিস্যার চেঁচিয়ে উঠলেন, “বেয়াদপ ছেলের দল! আমার হাতের বাঁধনটা শুধু খুলে দে। সবকটাকে পিটিয়ে সিধে করে দেব। এই তোদের শিক্ষা দিয়েছি!” উনি বোধহয় ভিনগ্রহের প্রাণীদের নিজের ছাত্র বলে ধরে নিয়েছেন।

দামুখুড়োও জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন। উঠে বসে বললেন, “পালিয়েছে? জানতাম। আমার চেহারা দেখেই ভয় পেয়ে গেছে ব্যাটারা।”

হই-হট্টগোলে বাড়ির লোকেরাও জেগে উঠেছে। ভেতর থেকে বৈজয়ন্তীদেবী “ডাকাত! ডাকাত! বাঁচাও বাঁচাও!” করে চিৎকার করছেন। পাশের বাড়ি থেকে পাঁচুর মা বেরিয়ে এসেছে, “এত হট্টগোল কেন? এর মধ্যে সকাল হয়ে গেল?”

ল্যাবরেটরির দরজা খুলে বেরিয়ে এল লোকদুটি। তাদের হাতে লাল ও সবুজ দ্রবণের দুটি বোতল।

ঠিক সেই সময় চারদিক আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। ঠিক যেন সন্ধের আলো। পুকুরের দিক থেকে এগিয়ে আসছেন সরকারবাবু। তাঁর হাত ধরে কানাই। আর তাঁদের সঙ্গে অদ্ভুদ দর্শন একটি প্রাণী। দেখেই বোঝা যায় সে এই গ্রহের কেউ নয়।

“সেভেনটিনদা!” বুবুল উল্লাসে চিৎকার করে উঠল।

দামুখুড়ো “আঁ... আঁ...” করে আবার অজ্ঞান হয়ে গেলেন।

বুবুলের সেভেন্টিনদা মিহি গলায় বলে উঠল, “গান গাও কানাই, গান গাও। এরা সুর সহ্য করতে পারে না। এদের হারানোর একটাই উপায়। সেটা হল গান। আমাদের দুই গ্রহে গান নেই, পাখি নেই। পৃথিবীকে বাঁচাতে, মহাবিশ্বকে বাঁচাতে, তোমাদের মোহনপুরকে বাঁচাতে গান গাও কানাই।”

কানাই অলৌকিক আবেশে মোহাবিষ্ট হয়ে সারাজীবনের শিক্ষা, তার একমাত্র সম্পদ রবিঠাকুরের গান গেয়ে উঠল, “মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে, আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে ভ্রমি বিস্ময়ে...”

কী সুরেলা সে কণ্ঠস্বর। কী স্পষ্ট উচ্চারণ! সমস্ত চরাচর যেন স্তব্ধ হয়ে মজে উঠল সেই সুরে।

খটমটির লোকদুটি আর্তনাদ করে উঠল। তারপর তাদের হাতের পাত্রদুটি ফেলে উল্কাবেগে ছুটে চলল।

প্রাণগোবিন্দবাবু উড়ে এসে কানাইকে উড়িয়ে নিয়ে ধাওয়া করল তাদের পেছনে। বুবুলের সেভেনটিনদা বলে উঠল, “গান বন্ধ কোরো না কানাই...”

কানাইয়ের গানের আওয়ার ক্রমে ক্ষীণ হতে হতে মিলিয়ে গেল। একটু পরে পশ্চিমাকাশে দেখা গেল রক্তাভা। তারপর আবার সব আগের মতো অন্ধকার।

বুবুলরা এতক্ষণে নড়াচড়ার ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। বুবুল ছুটে গিয়ে দাদুর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দাদু পরম স্নেহে তার মাথার চুলগুলি এলোমেলো করে দিলেন।

“বুবুল, এবার যে আমাদেরও যেতে হবে।”

“কিন্তু সেভেন্টিনদা, ওরা যদি আবার ফিরে আসে?”

“ওরা ফিরে গেছে খটমটিতে। ওই যে লাল আলো দেখলে? ওরা যাতে আর না আসে সেইজন্য আমি তোমাদের স্মৃতি থেকে এই দু-দিনের ঘটনার কথা সব মুছে দেব। সরকারবাবুও ভুলে যাবেন তাঁর আবিষ্কারের কথা। ফরমুলার কথা। এই জিনিস যা প্রকৃতিবিরুদ্ধ, তা কোনও প্রাণীর হাতে আসা ঠিক নয়। খটমটির বিজ্ঞানীরাও তাই আর চেষ্টা করবে না সুরেলা এই পৃথিবীতে ফিরে আসতে।”

“বাঃ! তাহলে আমার মুক্তির কী হবে?” কানাইকে নিয়ে প্রাণগোবিন্দ ফিরে এসেছে ততক্ষণ।

“আগামীকালই যে আপনার লিম্বাটুতে আমাদের প্রজাতির প্রাণী হিসেবে জন্মানো পূর্বনির্ধারিত হয়ে আছে। মহাকালের নিয়মকে কি কেউ বদলাতে পারে? আসুন আমাদের সঙ্গে।”

“দাঁড়ান দাঁড়ান। অত তাড়া কীসের। নাতির ঘরের পুতিকে একটু আশীর্বাদ করে যেতে দিন।” প্রাণগোবিন্দ এগিয়ে গেল নিতাইয়ের দিকে। ভুতে-মানুষে সে এক মধুর মিলন!


সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%