দুই

সুদীপ দেব

রবিঠাকুরের কৃপায় আজ ভালোই ভিক্ষে জুটেছে কানাইয়ের। ঝুলি একেবারে উপচে উঠেছে রে। পাঁচুর মা দিলই যদি কুমড়োর সঙ্গে একটু পুঁইশাক দিতে পারল না? ঘ্যাঁটটা তাহলে দারুণ জমত।

সেই ছোটবেলা থেকেই কানাই শুধুমাত্র রবিঠাকুরের পুজোয় বিশ্বাসী। অন্য কোনও ঠাকুর তার কোনও কাজে লাগে না। রবিঠাকুর কানাইকে এত ভালোবাসেন যে কানাইকে নিয়ে তিনি কবিতাও লিখেছেন। শুধু হাটের নামটা মোহনপুর হাট না করে কুমোরপাড়ার হাট করে দিয়েছেন। তা ঠাকুরদেবতারা ওটুকু করতেই পারেন।

আলু-কুমড়োর ঘ্যাঁট দিয়ে পান্তাভাতের সোয়াদটা দারুণ লাগছে। আর একটু ঝাল হলে একেবারে জমে যেত। রবিঠাকুরের কৃপায় কানাইয়ের বউয়ের হাতের রান্নাটি বেশ ভালো।

রাতে খাওয়াদাওয়ার পরে কানাইয়ের আবার একটু প্রাতঃভ্রমণের অভ্যাস আছে। কথায় আছে না, অন্ধের কি বা দিন কি বা রাত! তাই কানাই ওই রাত্তিরবেলাতেই প্রাতঃভ্রমণের কাজটা সেরে নেয়। তাহলে সকালে অনেকটা সময় বাঁচে।

কানাইয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে দক্ষিণে পঁচাত্তর পা হেঁটে গেলেই ভাঙা বটতলা। সকাল-বিকেল গ্রামের বুড়োদের আড্ডার ঠেক।

ভাঙা বটতলার সামনে থেকে বাঁয়ে গেলে সরকারবাবুদের পুকুর, ডানদিকে হাটের মোড়। হাটের মোড় থেকে আবার বাঁয়ে গেলে মোহনপুর হাট, ডানদিকে মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয়। ইস্কুলের সামনের রাস্তাটা সোজা গিয়ে মিশেছে বড় রাস্তায়। সেখান দিয়ে কলকাতার বাস যায়। আর যায় বড় বড় সব ট্রাক। মোহনপুর গ্রামের ম্যাপ, পথঘাট, খানাখন্দ নিজের হাতের লাঠিটার মতো চেনে কানাই। চোখওলা লোকেরাও বুঝি এত ভালো চেনে না। একটা জায়গা থেকে আরেকটা জায়গা ঠিক কত সময় ধরে কত পা এগিয়ে গেলে পৌঁছনো যায় তা হিসেব করতেও হয় না। এমনিই বুঝতে পারে কানাই।

তবে আজ যেন হাটের মোড়টা আসতে একটু দেরি করছে। আজ ঠিক করেছিল, হাটের মোড় থেকে ফিরে এসে শুয়ে পড়বে। কিন্তু এ কেমন হল! এতক্ষণে তো হাটের মোড়ের ঢালু জায়গাটা এসে যাওয়া উচিত ছিল, সঙ্গে কিশমিশের গন্ধ। একেকটা জায়গার একেক রকম গন্ধ পাওয়া যায়। সেটা সবাই পায় না, কানাই জানে, সে পায়। ঠিক এই সময়ে কানাইয়ের নাকে কোনও গন্ধ পাচ্ছিল না। রাস্তাটাও কেমন যেন মোলায়েম মোলায়েম। মোহনপুরে এমন যায়গা তো কোথাও নেই! কিন্তু তা-ই বা হবে কী করে! কানাইয়ের হিসেবমতো এখন তার হাটের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা উচিত। আর একটু এগোলেই ধাক্কা খাবে জীবনানন্দ মাস্টারের বাড়ির দরজায়। সে এগিয়ে চলল, কিন্তু কোনও বাধা পেল না। রাস্তাটা যেন লম্বা হয়ে গেছে।

নাঃ, মনে হয় শরীরটা ঠিক জুতের নেই। বাড়ি গিয়ে ঘুমোতে হবে। কানাই পিছু ফিরে বাড়ির পথ ধরল।

কিছুদূর আসার পর কানাইয়ের বদ্ধমূল ধারণা হল যে সে বেপথে চলেছে। গাঁয়ের রাস্তা এত মোলায়েম হতেই পারে না। এ যেন সিমেন্টে বাঁধানো চণ্ডীমণ্ডপের চাতালের ওপর দিয়ে হাঁটছে সে।

কানাই একটা গান ধরল। পরক্ষনেই একটা হিমশীতল ভয়ের হাওয়া বয়ে গেল তার মেরুদণ্ডের ওপর দিয়ে। এবার কানাই জোরে চিৎকার করে উঠল, “কে আছ গো?”

নাহ্‌। সে চিৎকার করল ঠিকই, কিন্তু নিজের চিৎকারের কোনও আওয়াজ তার কানে এল না। সে কি তাহলে কালা হয়ে গেল? অ্যাঁ?

“ভয় নেই কানাই, চিৎকার করেও কোনও লাভ নেই। তুমি এখন আমাদের উড়োজাহাজের মধ্যে আছ। একটা বিশেষ দরকারে তোমাকে নিয়ে আসতে হল। চিন্তা কোরো না, তোমার কোনও ক্ষতি হবে না।”

এই তো একটা মিহি যন্ত্রের মতো গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, তার মানে কানাই কালা হয়ে যায়নি।

“উড়োজাহাজ মানে? আমি কি এখন তবে আকাশে?”

“না, আমাদের উড়োজাহাজটা মোহনপুর গ্রামে নেমেছে। এখন মাটির ওপরেই আছে। তবে জলের তলায়।”

“অ্যাঁ? সে কী গো? জলের তলায় নেমে এলুম আর বুঝতে পারলুম না?”

“সে আমাদের কিছু জাদু জানা আছে, ব্যাপারটা তুমি ঠিক বুঝবে না। এখন কাজের কথায় আসা যাক।”

“কাজের কথা? কী কাজ গো?”

“তোমাকে আমাদের একটা কাজ করে দিতে হবে। তার পরিবর্তে তুমি যা চাও, পাবে। এমনকী যদি চোখের দৃষ্টি ফিরে পেতে চাও, তাও পাবে।”

“অ্যাঁ? ফিরে পাবো কী গো? আমি তো জন্মান্ধ। দেখা জিনিসটা যে কী, তা-ই তো জানি না।”

“কেন? দেখতে ইচ্ছে করে না? আর সবাইয়ের মতো?”

“করে না আবার? খুব করে। এই যে ঝড়ের সময় কত জোরে জোরে বাতাস বয়ে যায় সেটা কেমন দেখতে। জুঁইফুলের গন্ধ, পাঁঠার মাংসের গন্ধ, লুচিভাজার গন্ধ, এইসব আলাদা আলাদা গন্ধদের কেমন দেখতে। তারপর ধরো-না কেন, গরমকালের রোদ্দুর, বর্ষাকালের রোদ্দুর আর...”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, সব দেখতে পাবে। পৃথিবীর সাধারণ মানুষ যা দেখতে পায় না, তাও দেখতে পাবে। শুধু একটা ছোট্ট কাজ করে দিতে হবে। সেটা তুমি ছাড়া আর কেউ পারবে না।”

“কী কাজ গো?”

“তোমাকে একটা গান গাইতে হবে।”

“হে হে! এটা আবার কোনও কাজ হল? সে তো আমি এমনি এমনিই গাই সারাদিন।”

“তোমার এই গানের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। আমাদের একজন গান জানা লোকের বড় দরকার।”

“গান গাওয়ার ওপর তো আমার জীবনটাই নির্ভর করে আছে গো। গান গেয়েই তো দুটি জোটে।”

“এ শুধু তোমার জীবনের ব্যাপার নয় কানাই। তোমাদের পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীজগতের ভবিষ্যৎ এখন তোমার গানের ওপর। তাই তো সরকারবাবুর কথামতো তোমাকে আমাদের উড়োজাহাজে নিয়ে আসা হয়েছে।”

“সরকারবাবু?”

“হ্যাঁ কানাই, তুমি তানসেনের নাম শুনেছ? তিনি গান গেয়ে বৃষ্টি নামাতে পারতেন, প্রদীপ জ্বালাতে পারতেন।”

“সে কী গো?”

“হ্যাঁ, বিলেতে গান গেয়ে অনেকে কাচের গ্লাস ভেঙে ফেলতে পারেন। কাজেই গানের শক্তি সম্বন্ধে তুমি হেলাফেলা কোরো না।”

“বড় অবাক লাগছে গো আপনার কথা শুনে।”

“তোমাকে আমরা সেই শক্তি দেব। গান গেয়ে তুমি যা চাও করতে পারবে। তবে হ্যাঁ, তোমার মনে যদি কোনও অসৎ উদ্দেশ্য থাকে তাহলে এই জাদু কোনও কাজ করবে না।”

“না না, আমি কোনও জাদুটাদু দেখাতে চাই না। আমাকে দয়া করে আপনি ছেড়ে দিন।”

“কেন কানাই? তুমি চাও না পৃথিবীকে রক্ষা করতে? তুমি চাও না এই মোহনপুর গ্রামকে এক বিশাল অমঙ্গল থেকে বাঁচাতে?”

“অমঙ্গল? মোহনপুরের? আমি জানতাম। সরকারবাবুদের পুকুরে আজ কুমির দেখা গেছে। এ নিশ্চয়ই কোনও অমঙ্গলের লক্ষণ।”

“সেই কুমির অবশ্য অমঙ্গল থেকে রক্ষা করতেই এসেছে। আসল ঘটনা তো এখনও ঘটেনি। সেটা ঘটবে আগামী একাদশীর রাতে। কাস্তের মতো চাঁদ যখন তোমাদের মাঝ আকাশে উঁকি দেবে, তখন। আর ঠিক সেইসময় তোমায় গান গেয়ে আগুন জ্বালাতে হবে।”


সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%