সুদীপ দেব

জীবনবিজ্ঞানের মাস্টারমশাই জীবনানন্দবাবু বড় একা মানুষ। স্কুলের সময়টুকু যা একটু ছাত্রদের সঙ্গ পান। অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গেও তার খুব একটা পটে না। বাবার আমলের একটা ক্যাসেট প্লেয়ার আছে তাঁর। সেটাই সবসময়ের সঙ্গী। মান্না দে-র সেই গানটা খুব প্রিয় জীবনানন্দবাবুর, “বড় একা লাগে এই আঁধারে।”
আজও স্কুল থেকে ফিরে আলুসেদ্ধ-ভাত চাপিয়ে দিয়ে আপনমনে গুনগুন করছিলেন। এমন সময় দরজায় বেশ জোরে জোরে কে কড়া নাড়ল।
এই মোহনপুর গ্রামের সবাই জানে জীবনানন্দবাবু একা থাকতে ভালোবাসেন। তাই খুব দরকার না পড়লে তাঁর বাড়িতে কেউ আসে না। তাঁর সাত কুলে কেউ নেই। কলকাতায় মেসে থেকে পড়াশুনা করে স্কুল মাস্টারির পরীক্ষা দিয়ে এই অজ পাড়াগাঁয়ে স্কুলের চাকরিটা পেয়েছেন। পরীক্ষায় তাঁর স্থান বেশ ওপরের দিকেই ছিল। অনায়াসে কলকাতারই কোনও নামী স্কুলে পেয়ে যেতেন। তবু তিনি মোহনপুর গ্রামের এই স্কুল বেছে নিয়েছিলেন শুধুমাত্র শান্তিতে একা থাকবেন বলে। তাঁর এখনও কোনও মোবাইল ফোন নেই যে কেউ তাঁকে ফোন করবে। সরকারবাবু প্রায়ই তাঁকে বলেন, “এ তোমার খুব অন্যায় জীবন। দরকার-অদরকারের জন্যও তো ফোনটা রাখতে পারো। একদম একা থাকো গ্রামের এক প্রান্তে।”
কাজেই বিশেষ কোনও দরকারেই হয়তো কেউ এসেছে এই ভরসন্ধেবেলা। জীবনবাবু উঠে দরজার আগল খুলতেই এক ঠেলায় বাকি দরজা খুলে দু-জন মুশকোমতো লোক ঢুকে পড়ল ঘরের মধ্যে। দু-জনেরই কাপড় দিয়ে নাক থেকে মুখের নীচের অংশ ঢাকা। আর চোখদুটি একদম খরগোশের মতো লাল। মনে হয় কন্টাক্ট লেন্স পড়েছে। জীবনানন্দবাবু একটু আগে পর্যন্ত জীবনে কাউকে লাল রঙের কন্টাক্ট লেন্স পড়তে দেখেননি। এই প্রথম দেখলেন।
লোকদুটি ঘরে ঢুকেই জীবনানন্দবাবুকে চেপে ধরল। একজন মনে হয় বিদেশি কোনও ভাষায় কিছু জিজ্ঞাসা করল। যার এক বর্ণও বোধগম্য হল না। তারপর লোকটি ওড়িয়া বা অসমীয়া ভাষায় কিছু জিজ্ঞেস করল, কারণ এর কিছু কিছু শব্দ চেনা লাগল জীবনবাবুর। একদম শেষে পরিষ্কার বাংলায় বলে উঠল, “বলি কর্ণপটহটা কোথায় রেখেছিস, শুনি?”
“ইয়ে কর্ণপটহ? সে তো কুনোব্যাঙের থাকে।”
“কুনোব্যাঙের বাড়ি কোথায়?”
“অ্যাঁ?”
“বলছি কুনোব্যাঙবাবুর বাড়ি কোনটা চিনিয়ে দিতে পারবি?”
“স্কুলের ল্যাবে একটা খাঁচায় রাখা আছে কয়েকটা, ডিসেকশানের জন্য।”
“তাহলে স্কুলে নিয়ে চল আমাদের। নইলে তোর মরণ অনিবার্য।”
“তা নিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু স্কুল তো বন্ধ এখন। চাবি দারোয়ানের কাছে। দারোয়ান তো স্কুলে থাকে না।”
“কোথায় থাকে?”
“বাড়িতে।”
“তাহলে দারোয়ানের বাড়িতে আগে নিয়ে চল।”
“বলছিলাম কি, ভাতটা চাপিয়েছি। ফুট এসে গেল বলে। ফ্যানটা গেলে দিয়ে যাই?”
“আচ্ছা ঠিক আছে। বুঝলি, আমরা তেমন একটা খারাপ লোক নই। তবে ওই কর্ণপটহটা না পেলে কিন্তু তোর রেহাই নেই।”
“আজ্ঞে আপনাদের নামধামটা কি জানতে পারি?”
“কী দরকার?”
“কোনও দরকার নেই। তবে আলাপটালাপ হল তো। যদি হঠাৎ ডাকতে ইচ্ছে করে তাহলে কী বলে ডাকব সেটা জানার জন্যই বলছিলাম আরকী।”
“কেন? ডাকতে ইচ্ছে করবে কেন?”
“তার তো কোনও ঠিক নেই। কখন কী দরকার পড়ে। তা, নামধাম না জানলেও চলবে।”
জীবনানন্দবাবুকে আজ যেন কথায় পেয়েছে। আসলে তিনি লক্ষ করছিলেন তখন থেকে একটা লোকই কথা বলে যাচ্ছে। অন্যজন একদম চুপ। একটাও কথা বলেনি। বোবা নাকি কে জানে। যে লোকটা কথা বলছে তার গলার স্বরটাও কেমন যেন যান্ত্রিক যান্ত্রিক। যেন রেকর্ড করা কথা বাজছে। লোকদুটো অনেক্ষন তাঁকে ছেড়ে দিয়েছে। কথা-বলা লোকটা বিছানায় বসেছে। বোবা লোকটা ঘরের এটা ওটা নেড়েচেড়ে দেখছে। বোধহয় কিছু খুঁজছে। তাকের ওপর তাঁর ক্যাসেট প্লেয়ারটা ছিল। সেটা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে ওপরের বোতামগুলোর একটায় চাপ দিল।
সোঁ করে বোধহয় ফাস্ট ফরোয়ার্ড বা রিউইন্ড কিছু একটা চালু হল। লোকটা যন্ত্রটা চোখের কাছে এনে ভালো করে দেখল। তারপর আরেকটা বোতামে চাপ দিল। মান্না দে গেয়ে উঠলেন, “নিশিরাতে বাঁশি তার সিঁদকাঠি হয়ে, চুপি চুপি ঘরে এসে বাজে রয়ে রয়ে।”
বিকট একটা শব্দ করে লোকটা ক্যাসেট প্লেয়ারটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। অন্য লোকটাও তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। পলক ফেলতেই দরজা খুলে দু-জনেই ভোঁ-উধাও।
জীবনানন্দবাবু বজ্রাহতের মতো বসে রইলেন। মান্না দে তখনও গেয়ে চলেছেন, “ওকে আজ চলে যেতে বল না।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন