সুদীপ দেব

স্কুল থেকে ফেরার পথে কী মনে হতে বুবুল একবার বাঁশবাগানের সেই জায়গাটায় গেল। দাদুর জন্য ওর খুব চিন্তা হচ্ছে। ওখানে গিয়ে ফিসফিস করে ডাকল, “সেভেন্টিনদা, ও সেভেন্টিনদা।”
কোনও সাড়াশব্দ নেই। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর চলে আসার জন্য যেই বুবুল ফিরেছে তখনই দেখল ঠিক আগের দিনের মতো আবার চারপাশের আলো কমে গিয়ে ঝিঁঝিঁর ডাক শুরু হয়েছে। সামনে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল এক অদ্ভুতদর্শন প্রাণী। লম্বায় বুবুলের প্রায় মাথায়-মাথায়। মাথার ওপর থেকে দুটো অ্যান্টেনার মতো শুঁড় বেরিয়ে এসেছে। তার ডগায় দুটো চোখ। কানগুলো হাতির কানের মতো মাথার দু-পাশে ল্যাতপ্যাত করছে। দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে এ হল ভিনগ্রহের এলিয়েন।
এলিয়েনটা বুবুলের সামনে এসে পরিষ্কার বাংলায় পুতুল পুতুল কণ্ঠস্বরে বলল, “আমি আজকেই তোমার সাথে দেখা করতে যেতাম। ভালোই হল, তুমি এসেছ।”
“সেভেন্টিনদা? তোমায় এরকম দেখতে হল কী করে?”
“এটাই আমাদের আসল রূপ। কালকে এ গ্রহের প্রাণীর রূপ ধরেছিলাম যাতে তুমি ভয় না পেয়ে যাও। এখন তো তুমি অনেকটাই জেনে গেছ। তাই আর খরচা করে ভোল পালটালাম না।”
“পৃথিবীতে বেড়ালের সাইজের বাঘ আছে বলে তো জানি না। বাঘের বাচ্চা হতে পারে। কিন্তু ওরকম কথা বলা বাঘের বাচ্চা দেখলেও তো আমার ভয় পাওয়ার চান্স ছিল। রূপ পালটেই এসেছিলে যখন, মানুষের রূপ ধরেই তো আসতে পারতে। ”
“আরে ওটাই তো মুশকিল হয়েছে। পৃথিবীর সব প্রাণীদের সম্মন্ধে এখনও ভালো করে তথ্য যোগার করা হয়ে ওঠেনি। কুমির যে পুকুরের জলে থাকে না সেটা জানতাম না বলে কাল বেশ গণ্ডগোল হয়ে গেল। আর মানুষের রূপ ধরা বেশ কঠিন। ওটা এখনও গবেষণার স্তরে আছে। অনেক কষ্টে ভাষাটা আয়ত্ত করতে পেরেছি।”
“তোমাদের লিম্বাটু গ্রহের ভাষা কীরকম?”
“খ্যামাগুরু মোচানিস্কু ভুলাক্রক্কাস মিয়েনুতো।”
“এর মানে কী?”
“তুমি কালকে দাদুর ল্যাবে যা যা কাণ্ড করেছ সবটাই বলে দিলাম ওই কয়েকটা শব্দে। এগুলো তোমাদের ভাষায় বলতে গেলে পাঁচ মিনিট সময় লাগবে।”
“তাহলে তো তোমার কিছুই অজানা নেই। তুমি প্লিজ বলো দাদু এখন কোথায় আছে? আমার খুব ভয় করছে।”
“তোমার দাদু খুব সুরক্ষিত জায়গায় আছেন। ওঁর কাছে দেশলাই বাক্সের মতো একটা যন্ত্র আছে যেটা দিয়ে ওঁর ল্যাবের ভেতরে কী হচ্ছে তা অষ্টপ্রহর নজর রাখা হচ্ছে। অনেকটা সিসিটিভি ক্যামেরার মতো, তবে অনেক উন্নত। খটমটি গ্রহের দু-জন বৈজ্ঞানিক তোমার দাদুকে আর ওঁর আবিষ্কারকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এখন ওরা দারোয়ানকে নিয়ে তোমাদের স্কুলের ল্যাবের দিকে চলেছে।”
“আমি তো মহাকালের অমৃতপাত্রটা ভেঙে ফেলেছি। এখন কী হবে?”
“ওটা কোনও ব্যাপার নয়। আসল তো হল ফরমুলা। শুধু তো মহাকালের অমৃত নয়। ওই লাল-সবুজ-হলুদ তিনরকম মিক্সচার ‘কর্মপন্থা’ একসঙ্গে না পেলে কোনও লাভ নেই। তিনটে দ্রবণের ফরমুলা আলাদা আলাদা করে তিন যায়গায় লুকিয়ে রেখেছেন তোমার দাদু। কাজেই ওই ফরমুলা বা মি. সরকারকে না পেলে ওরা কিছুই করতে পারবে না।”
“তোমরা তাহলে ওই কর্মপন্থা না কী বললে ওটা নিয়ে কী করবে?”
“তাহলে তোমাকে একটু আগে থেকেই খুলে বলতে হয়, বুবুল। তোমাদের আকাশগঙ্গা থেকে তোমাদের হিসেবে পঁচিশ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অন্য একটি গ্যালাক্সিতে অন্য এক সূর্যের দুটি যমজ গ্রহ লিম্বাটু আর খটমটি। ঠিক পৃথিবী আর শুক্রের মতো। তফাত একটাই, পৃথিবী আর শুক্রের মধ্যে কেবলমাত্র পৃথিবীতেই প্রাণ আছে। কিন্তু আমাদের ওখানে দুটি গ্রহেই উন্নত প্রাণীরা বাস করে। পৃথিবীতে যেমন শুধু মানুষই হল একমাত্র উন্নত প্রাণী, আমাদের ওখানে কিন্তু তা নয়। লিম্বাটুতে তিন ধরনের আর খটমটিতে দু-রকম উন্নত প্রাণী আছে। আমাদের লিম্বাটুতে সবাই মিলেমিশে থাকি। খটমটিতে কিন্তু ওদের মধ্যে ঝগড়া মারামারি যুদ্ধ লেগেই আছে। এমনকী ওরা লিম্বাটুকেও আক্রমণ করেছে কয়েকবার। খটমটির বিজ্ঞানীরা প্রেতবিজ্ঞান, ডাকিনীবিজ্ঞানেও খুব উন্নত। পৃথিবীতে বিজ্ঞানীরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছে। এরা ভূতের অস্তিস্বই স্বীকার করে না। কিন্তু তোমার দাদু ভূত বা আত্মা নিয়ে গবেষণা করে একটি আত্মাকে আমাদের ওখানে প্রেরণ করেন। তোমাদের বিজ্ঞানীরা জানে আলোর গতি সবথেকে বেশি। তা কিন্তু নয়, আলোর চেয়েও কোটিগুণ বেশি গতিশীল হল মানুষের মন, আত্মা। তাই এত দূরের পথ অতিক্রম করতে আত্মার লাগে এক পলকেরও কম সময়। আমাদের বিজ্ঞানীরা আত্মাকে ব্যাবহার করেই জানতে পেরেছেন মহাবিশ্বে এই তিনটি গ্রহ ছাড়া অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব নেই। তবে পৃথিবীর প্রাণীরা এত অনুন্নত বলেই আমরা পৃথিবী নিয়ে এতদিন মাথা ঘামাইনি। তোমার দাদুর পাঠানো আত্মার কাছ থেকেই আমরা এবং খটমটির বিজ্ঞানীরা ওঁর আবিষ্কার সম্মন্ধে জানতে পারি। এ এমন এক আবিষ্কার যার মাধ্যমে শুধু আত্মার মুক্তিই নয়, ইচ্ছে করলে পরজন্মে সেই আত্মা কোন প্রাণী হিসেবে জন্মাবে সেটাও ঠিক করে ফেলা যাবে। কাজেই বুঝতে পারছ, কী সাংঘাতিক এই আবিষ্কার? খটমটির বিজ্ঞানীরা একে পেলে সারা মহাবিশ্বে শুধু তাদের প্রজাতির প্রাণীই জন্মাবে। এইভাবে তারা প্রথমে লিম্বাটু এবং হয়তো পরে পৃথিবীকেও দখল করে নিতে পারে। পৃথিবীতে আর কোনও মানুষ, বাঘ, বেড়াল, কুমির থাকবে না। শুধু খটমটির প্রাণীরা ঘুরে বেড়াবে।”
“বাস রে!”
“তাই আমরা এসেছি, যাতে সেই ফরমুলা বা মি. সরকারকে তারা না পায় সেই ব্যাবস্থা করতে। কিন্তু অসুবিধে হয়েছে একটাই। খটমটির বিজ্ঞানীদের প্রায় মানুষের মতোই দেখতে। শুধু চোখদুটো খরগোশের মতো লাল, আর ভ্যাম্পায়ারের মতো দুটো ছুঁচলো দাঁত রয়েছে। তাই তারা মুখে কাপড় বেঁধে আর চোখে চশমা পরে অনায়াসেই ঘুরে বেড়াতে পারছে। কিন্তু আমরা তো এই চেহারা নিয়ে প্রকাশ্যে বেরোতে পারছি না। সুবিধের জন্য আমাদের একটা পোর্টেবল গবেষণাগার নিয়ে এসে তোমাদের পুকুরের নীচে রাখা হয়েছে। সেখানে চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু ভয় হচ্ছে তার আগেই না ওরা ফরমুলাগুলো পেয়ে যায়।”
“দাদু কি তোমাদের গবেষণাগারেই আছে?”
“হ্যাঁ বুবুল, তুমি বাড়ি যাও। কোনও দরকার হলে আমি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেব।”
“আর আমার যদি হঠাৎ কিছু দরকার পড়ে?”
“তাহলে তো তোমার হাতে একটা আত্মা আছেই।”
বিকেলবেলা দু-জন কনস্টেবল নিয়ে পুলিশের জিপে করে মোহনপুর গ্রামে এলেন থানার ওসি শ্বেতশুভ্র তপাদার। ওসি বলতেই নাদুসনুদুস ভুঁড়িওলা যে চেহারা চোখের সামনে ভেসে ওঠে শ্বেতশুভ্রবাবুর মোটেও সেরকম চেহারা নয়। বরং বেশ জিমকরা-মুগুরভাজা স্বাস্থ্য তাঁর। লম্বাও প্রায় ছ-ফুট দু-ইঞ্চি। দেখলেই একটা সম্ভ্রম জাগে। কিন্তু সব সম্ভ্রম চলে যায় তাঁর কণ্ঠস্বর শুনলে। অমন চেহারার মানুষের গলা দিয়ে যে এরকম মেয়েদের মতো সরু স্বর বেরোতে পারে সেটা না শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন। তাই পারতপক্ষে শ্বেতশুভ্রবাবু কথা বলেন না। তাঁর হয়ে অনুচর কনস্টেবলরাই সে কাজ সেরে দেয় অধিকাংশ সময়।
ভাঙা বটতলায় তখন শুধু দামুখুড়ো আর চণ্ডীবাবু বসেছিলেন। তাঁদের সামনে এসে জিপ থামল। ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল, “রামনাম ঠাকুরের বাড়িটা কোথায়?”
বিড়িতে একটা লম্বা টান মেরে ধোঁয়া ছেড়ে দামুখুড়ো বললেন, “আপনারা পেছনে ফেলে এসেছেন। স্কুলের পাশে পানাপুকুরের ধারের বাড়িটাই রামনামের।”
শ্বেতশুভ্রবাবু ডানপাশের কনস্টেবলকে কনুই দিয়ে একটা গুঁতো মারলেন। সে গলা বাড়িয়ে বলল, “আর কানাই মণ্ডল?”
“ওই তো দেখা যাচ্ছে।” দু-আঙুলের ফাঁকে বিড়িগোঁজা হাতটা তুলে কানাইয়ের বাড়ি দেখিয়ে দিলেন দামুখুড়ো।
জিপ থেকে নেমে সপার্ষদ হেঁটে কানাইয়ের বাড়ির দিকে চললেন বড়বাবু। দামুখুড়ো আর চণ্ডীবাবুও তাঁদের অনুসরণ করলেন।
কানাইয়ের বাড়ির সামনে গিয়ে একজন কনস্টেবল হাঁক পাড়ল কানাইয়ের নাম ধরে। দামুখুড়ো বললেন, “আরে কানাই তো নিখোঁজ। ওর বউ বাসন্তী আছে।”
আরেকজন কনস্টেবল এবার ডেকে উঠল, “বাসন্তী, আরে এ বাসন্তী!”
“উফ্। ব্যাটা যেন শোলের ধর্মেন্দর।” ফিসফিস করে বললেন চণ্ডীবাবু।
“বাসন্তী কানে শুনতে পায় না।” দামুখুড়োর কথা শুনে বড়বাবু গলায় ঘোঁত ঘোঁত করে আওয়াজ করলেন। এইসময় বাসন্তী দরজা দিয়ে বেড়িয়ে এল।
প্রথম কনস্টেবল বলল, “কানাইকে কখন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না?”
অন্যজন হাত পা নেড়ে মুখভঙ্গী করে বোধহয় সেই কথাটাই বোঝাতে চেষ্টা করল।
চণ্ডীবাবু আবার ফিসফিস করে বললেন, “কোথাকার বোবাকালা বিশেষজ্ঞ এলেন রে!”
“ও কথাও বলতে পারে না।” বললেন দামুখুড়ো।
“ধুত!” বাঁশির সুরের মতো আওয়াজ বেরোল বড়বাবু গলা দিয়ে।
এমন সময় মশলা-বাদামওলা লটাই রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে চেঁচিয়ে বলে উঠল, “আপনারা এখানে? আর ওদিকে স্কুলের মাঠে রামনামের লাশ পড়ে আছে। পরীক্ষার ঘর ভাঙচুর করে গেছে একদল গুন্ডা।”
“সে কী!” বলে ত্বরিতে ছুটে গিয়ে জিপে উঠে বসলেন বড়বাবু। পেছনে পেছনে কনস্টেবল দু-জনও দৌড় লাগাল।
“বলছিলাম, আপনাদের জিপে তো জায়গা আছে। আমাদের দু-জনকে একটু নিয়ে যাবেন?” দামুখুড়োর অনুরোধ শুনে তাঁদের গাড়িতে ওঠার ইশারা করলেন শ্বেতশুভ্রবাবু।
স্কুলে গিয়ে দেখা গেল সেখানে ইতিমধ্যেই বেশ ভিড় জমে গেছে। তবে খুনটুন নয়, রামনাম অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল স্কুলের মাঠে। এখন তার জ্ঞান ফিরে এসেছে। জীবনবাবু, হেডস্যার ও আরও দু-তিনজন মাস্টারমশাইদের বক্তব্য শুনে যা বোঝা গেল তা মোটামুটি এই, স্কুল ছুটির পর যখন স্কুল একদম ফাঁকা হয়ে গেছিল তখন দু-জন দুষ্কৃতি রামনামকে নিয়ে উপস্থিত হয় স্কুলে। তারা টিচাররুম ও আরও কিছু তালাবন্ধ ঘরের তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকে এবং অবশেষে কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরিতে হন্যে হয়ে কিছু খুঁজতে থাকে। রীতিমতো তান্ডব চালায় সেখানে। প্রচুর যন্ত্রপাতি ও বিকার, রসায়নিক বোতল টোতল ভাঙচুর করে। সেই আওয়াজে কয়েকজন স্কুলের মধ্যে ঢুকে এলে তারা রামনামকে ফেলে চম্পট দেয়, রামনাম কী করে অজ্ঞান হল তা বোঝা যাচ্ছে না, কারণ তার জ্ঞান ফেরার পর থেকে শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে আর মাঝে মাঝে ভয়ে কেঁপে উঠছে। তবে যে ছেলেগুলো ভাঙচুরের আওয়াজ শুনে স্কুলে ঢুকে এসেছিল তারা দেখেছে কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা দুটি লোক রামনামকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে বেরিয়ে আসে ও বাইরে অন্য অনেককে দেখতে পেয়ে উল্কার বেগে পালিয়ে যায়। অত জোরে কোনও মানুষ ছুটতে পারে সেটা না দেখলে নাকি বিশ্বাস করা যায় না।
শ্বেতশুভ্রবাবু প্রথমে ল্যাবরেটরিটায় ঢুকে দেখলেন, চারিদিকে ভাঙা কাচ ছড়িয়ে। রাসায়নিকের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ। এরপর তিনি তাঁর কনস্টেবলদের নিয়ে টিচারস রুমে ঢুকে প্রত্যক্ষদর্শী ছেলেদের বয়ান লিখে নিলেন। হেডস্যারের সঙ্গেও আলাদাভাবে কথা বললেন। সবার শেষে টিচারস রুমে এসে ঢুকলেন জীবনানন্দবাবু।
“আমি এই স্কুলের বায়োলজির টিচার।”
বড়বাবু তাঁর চিকনের মতো কণ্ঠস্বরে বললেন, “আমাদের বেশি প্রয়োজন ছিল কেমিস্ট্রির টিচারকে।”
“আজ্ঞে, তিনি তো সদর থেকে আসেন। আজ আর তাঁকে পাবেন না। তবে এই ব্যাপারটা সম্মন্ধে আমি হয়তো কিছু সাহায্য করতে পারি।”
বড়বাবু ইশারায় বললেন, বলে ফেলুন।
“যে দুটি লোক রামনামকে ধরে নিয়ে যায় তারা কাল সন্ধেয় প্রথমে আমার বাড়ি গেছিল। তারা সম্ভবত পৃথিবী থেকে কুনোব্যাঙ ধরে নিয়ে যেতে চায়।”
“কুউউউউউউ...”
“ঠিক কুনোব্যাঙ নয়, কুনোব্যাঙের একটা প্রত্যঙ্গ থাকে—কর্নপটহ, তাদের সেটাই দরকার।”
“অ্যাঁ?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি বলি স্কুলের বায়োল্যাবে একটা খাঁচায় কয়েকটা কুনোব্যাঙ রাখা আছে ছাত্রদের কাটাকুটি করার জন্য। তারা তখন স্কুলে আসতে চায়। আমি তখন বললাম যে স্কুলের চাবি তো স্কুলের দারোয়ানের কাছে থাকে। সেই শুনে তারা আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।”
“সে তো মাঠঘাট থেকে ধরে নিলেই পারে মশাই। তার জন্য এতো হ্যাপার কী আছে।”
“আজ্ঞে তারা বোধহয় গ্রামের লোক নয়। তাই কুনোব্যাঙ ধরা সম্মন্ধে সঠিক জ্ঞান নেই। আমার তো মনে হয় কেমিস্ট্রি ল্যাবকে বায়োলজি ল্যাব মনে করে কুনোব্যাঙ খোঁজার জন্যই ওরা ভাঙচুর করেছে।”
“হুম। তাহলে কানাই মণ্ডল কোথায় গেল?”
“এটা তো আমাকেও ভাবাচ্ছে। বড়বাবু, আমি একটা কথা বলব?”
“হুম।”
“কিছু বহিরাগত দুষ্কৃতি যে মোহনপুরে ঢুকেছে এটা তো ঠিক কথা। এই অবস্থায় আমরা খুব বিপন্ন বোধ করছি। জানি না কতদূর কী কাজ হবে, তবু আপনি যদি কয়েকটা দিন মোহনপুরে একটা রাতপাহারার ব্যাবস্থা করে দেন তাহলে খুব ভালো হয়।”
“ঠিক আছে। এই দু-জনকে আজ এখানে রেখে যাচ্ছি।” বড়বাবু কনস্টেবল দু-জনকে দেখিয়ে বললেন, “তবে এদের রাতের খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারটা একটু ম্যানেজ করে দিতে হবে।”
“আজ্ঞে সে নিয়ে কোনও চিন্তা করবেন না, মোহনপুরে অতিথি আপ্যায়নের লোকের অভাব হবে না।”
বড়বাবু যখন স্কুল থেকে বেরিয়ে জিপে উঠলেন তখন মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রায় সারা গ্রামের লোক ঝেঁটিয়ে চলে এসেছে। জিপ চলে যেতে জীবনানন্দবাবু একটু গলা চড়িয়ে বললেন, “যদিও বড়বাবু দু-জন পুলিশ মোতায়েন করে গেলেন, কিন্তু গোটা গ্রাম পাহারা দেওয়া শুধু দু-জন লোকের কম্মো নয়। কাজেই মোহনপুরের যুবক ছেলেরাও কয়েকজন পালা করে পাহারা দিলে ভালো হয়।”
ভিড়ের মধ্যে থেকে দামুখুড়ো এগিয়ে এসে বললেন, “সে তুমি কিচ্ছু চিন্তা কোরো না। আমার তো এমনিতেই রাতে ভালো ঘুম হয় না। সঙ্গে একজন পেলে আমি একাই একটানা সাতদিন পাহারা দিতে পারি।”
“না, মানে আপনি...”
“কেন হে? তুমি তো যুবক ছেলেদের কথা বললে। মোহনপুরে বেশি যুবক ছেলে কই? সবই তো দুগ্ধপোষ্য শিশু। কী রে নিপাট, ভয় পাচ্ছিস নাকি? এখনও এগিয়ে এলি না যে বড়? গ্রামের সুরক্ষা বলে কথা।”
নিপাটবাবুও এবার বুক চিতিয়ে এগিয়ে এলেন। এরপর একে একে চণ্ডীবাবু ও করালিস্যারও যখন যোগ দিলেন জীবনানন্দবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তাহলে আপনারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করে নিন, কে গ্রামের কোন দিকটা থাকবেন। তবে একা থাকবেন না কেউ। জোড়ায় জোড়ায় থাকবেন।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন