পাঁচ

সুদীপ দেব

পরের দিন সকালে মোহনপুরে আবার ধুন্ধুমার পড়ে গেল। স্কুলের দারোয়ান রামনামশরণ আর অন্ধ কানাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

রামনামের বউ বলছে, রাতে দুটো মুখঢাকা ডাকাত এসে রামনামকে তুলে নিয়ে গেছে। কানাইয়ের বউ তো আবার কথা বলতে পারে না, সে খালি কেঁদেই চলেছে।

ভাঙা বটতলায় বুড়োদের আড্ডা জমে উঠেছে। দামুখুড়োর এই সকালবেলাতেই এটা পাঁচ নম্বর কিংসাইজ বিড়ি টানা চলছে উত্তেজনার বশে।

“বুঝলে কিনা, আমার এই আটাত্তর বছর বয়েসে মোহনপুরে ডাকাত পড়ল এই প্রথম। সেই যেবার রণেন দারোগা এলেন, তারপর থেকে ছিঁচকে চোররাও সব কীর্তনের দল খুলে ফেলল। উফ কী দাপট রণেন দারোগার...”

“তুমি থামো, তুমি তো সেদিনের ছোকরা। আদ্যাঠাক্‌রুণ তোমাকে ঝিনুকবাটি করে দুধ খাওয়াতেন দেখেছি।” নিপাটবাবুকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন চণ্ডীপদবাবু, “আর ছোঃ, রণেন একটা দারোগা? এরপর তো বলবে খ্যাঁকশিয়ালও হল সিংহ, বা কী বলে, মোরগও হল গিয়ে একধরণের ময়ূর।”

“উঁহু। উপমাগুলো ঠিক হচ্ছে না রে চণ্ডী। তোর বাবা তারাপদকে কালিপদ স্কুলে এনে আমার কাছে দিয়ে বলেছিল, ‘তোর হাতে আমার ছেলেকে সমর্পণ করে গেলাম, দেখিস।’ তা এই তোদের বাপ-ব্যাটাকে আমি শিক্ষা দিয়েছি? সামান্য একটা উপমাও জুতসই করে লাগাতে পারছিস না!”

“তবে যা-ই বলুন করালিস্যার, আপনিও কি কোনওদিন গ্রামের পুকুরে কুমির দেখেছেন? নাকি মোহনপুর গ্রামে ডাকাত পড়তে শুনেছেন?” বললেন নিপাটবাবু।

“ডাকাত কোথায় রে? এ তো পরিষ্কার ছেলেধরা। রাতের অন্ধকারে এসে দুটো দুধের শিশুকে ধরে নিয়ে চলে গেল।”

“কিন্তু দারোয়ান রামনাম আর ভিখারি কানাইকে ধরে ছেলেধরাদের কী লাভ বলতে পারেন?” জীবনানন্দবাবু পথে যেতে যেতে আলোচনা শুনে দাঁড়িয়ে গেলেন, “এদের ধরে যে মুক্তিপণ আদায় করবে তার তো কোনও উপায় নেই।”

“আরে পেটের ভেতরে কীসব যন্ত্রপাতি আছে, মেটুলি, নাড়িভুঁড়ি, ওগুলো যদি কেটেকুটে বিক্রি করে?”

“ছিছিছিছি চণ্ডী, তোকে আমার ছাত্র বলতেও লজ্জা লাগে। মেটুলি? নাড়িভুঁড়ি? এসব কী ভাষা? অ্যাঁ? বলি কিডনি, পাকস্থলী এসব পড়াইনি? ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র?”

“দেখুন, এ কোনও ছেলেধরার কাজ নয়।” বললেন জীবনানন্দবাবু, “ওই দুটি লোক আমার কাছে প্রথমে এসেছিল। তারা কুনোব্যাঙের কর্ণপটহ খুঁজে বেড়াচ্ছে।”

“সে আবার কী? এটা আবার খোঁজার মতো কোনও জিনিস হল?”

“সেটা তো আমিও বুঝতে পারছি না।”

“খুলে বলো দেখি, জীবন। পেটে কিছু রেখো না। কারা এসেছিল তোমার কাছে?”

জীবনানন্দবাবু এরপর সব ব্যাপারটাই বিস্তারিত বললেন। শুনে ভাঙা বটতলার সব বুড়োরাই একসঙ্গে মাথা নেড়ে বিজ্ঞের মতো ‘হুঁ হুঁ’ করলেন। এদের কাছে কোনও সমাধানসূত্র পাওয়া যাবে না জানতেন জীবনানন্দবাবু। বললেন, “আমি এখন সরকারবাবুর কাছে যাচ্ছি। মনে হয় থানায় একটা খবর দেওয়া উচিত। দেখি সরকারবাবু কী বলেন।”

“তবে তুমি একা কেন? চলো আমরা সবাই মিলেই যাই। হাতে একটা জরুরি কাজ ছিল বটে, তা সে না হয় পরেই হবে।”

সক্কাল সক্কাল গ্রামের মাতব্বরদের একজোটে উপস্থিত হতে দেখে বৈজয়ন্তীদেবী একটু অবাকই হলেন। কুমিরটাকে কি আজও দেখা গেল নাকি?

“সরকারবাবুর সঙ্গে একটু দরকার ছিল। আজ তো ওঁকে সকালে হাঁটতে যেতে দেখলুম না।” বললেন দামুখুড়ো।

“উনি তো কাল গবেষণার কাজে কলকাতা গেছেন।”

“অ। সেইজন্যই কাল কুমির নিয়ে এত হট্টগোল হল, তাও দেখতে পাইনি।” বললেন করালীস্যার, “কী যে ছাইপাঁশ গবেষণা করে!”

“আচ্ছা, উনি কবে ফিরবেন কিছু বলেছেন?” জিজ্ঞাসা করলেন জীবনানন্দবাবু।

“না, মানে উনি তো বাড়িতে বলে বেরোননি। বুবুলের সাথে রাস্তায় দেখা হতে খবর দিয়ে দিতে বলেছেন।”

“তাই? হঠাৎ এমন কী দরকার পড়ল!” জীবনানন্দবাবুকে চিন্তিত দেখাল, “বুবুলকে একটু ডেকে দেবেন?”

“হ্যাঁ, একটু দাঁড়ান মাস্টারমশাই, ডেকে দিচ্ছি।”

বৈজয়ন্তীদেবী বুবুলকে ডাকতে ভেতরে চলে গেলেন। দামুখুড়ো বলে উঠলেন, “আর দাঁড়িয়ে থেকে কী হবে? আমার আবার দুধ-পাঁউরুটি খাওয়ার সময় হয়ে গেল।”

“বয়স তো কম হল না, এখনও খাই খাই।” বলে উঠলেন দামুখুড়োর সহপাঠী করালী স্যার, “সেই স্কুলে পড়ার সময় আমার খাবার চুরি করে খেতিস, এখনও সে অভ্যাস গেল না।”

“আমি চুরি করে খাই না কখনও। তোর খাবার চুরি করত রামপাশোয়ানের ছেলে। কতবার বলব?”

এই সময় বুবুল ঘর থেকে বেরিয়ে এল। জীবনানন্দবাবু তাকে কাছে ডেকে বললেন, “তোমার দাদু কাল কখন গেলেন কলকাতা?”

“ওই তো দুপুরবেলা।”

“তোমার সঙ্গে কোথায় দেখা হল?”

“ওই তো স্কুল থেকে ফেরার পথে, বাসে ওঠার সময়।”

“বাসে গেলেন?”

“হ্যাঁ।”

“হুম্‌। কবে ফিরবেন কিছু বলেছেন?”

“না... তা তো কিছু বলেননি।”

“ঠিক আছে। তুমি আজ স্কুলে যাবে তো?”

“হ্যাঁ স্যার।”

“আচ্ছা, যাও সময় হয়ে গেছে, তৈরি হয়ে নাও। আমরা আসি।”

ফেরার পথে জীবনানন্দবাবুকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। করালীস্যার জিজ্ঞাসা করলেন, “তাহলে এবার কী করবেন?”

“দেখুন, থানায় একটা খবর দিতেই হবে। কারণ যে লোক দুটি এসেছিল তারা মোটেই সুবিধের নয়।”

“তাহলে ভজুয়াকে রামনামের বউয়ের সঙ্গে থানায় যেতে বলি? একটা মিসিং ডাইরি করে আসুক। কতটা কাজ হবে সে তো জানি।”

“হ্যাঁ স্যার, আপনি একটু এদিকটা দেখুন। আমি পারলে স্কুলের পর বিকেলে একবার বড়বাবুর সঙ্গে দেখা করে আসব।” জীবনানন্দবাবু পা চালিয়ে এগিয়ে গেলেন স্কুলের পথে।

টিফিনের সময় বুবুলকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন জীবনানন্দবাবু। টিচারস রুমে বুবুল এলে বললেন, “চল, বাইরে চল।”

স্কুলের মাঠে ছেলেরা সবাই খেলা করছে। চারিদিকে একটা সম্মিলিত হইহই শব্দ। মাঠের একপাশের কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে জীবনানন্দবাবু বললেন, “মোহনপুর গ্রামে কিছু দুষ্কৃতি ঢুকেছে। জানি না তাদের মতলব কী। তবে রামনাম বা কানাইয়ের যে একটা কোনও ঘোরতর বিপদ হয়েছে এ ব্যাপারে আমি মোটামুটি নিশ্চিত।”

বুবুল বুঝতে পারছিল না, এসব কথা স্যার হঠাৎ তার সঙ্গে আলোচনা করছেন কেন। স্কুলের সব স্যাররাই বুবুলকে খুব ভালোবাসে এটা ঠিক, তবে ঘনিষ্ঠতা এই পর্যায়ের নয় কারও সঙ্গেই।

স্যার যেন তার মনের কথা পড়ে ফেলেই বলে উঠলেন, “তোকে এত কথা বলছি কারণ, সরকারবাবুকে আমার একটু দরকার ছিল। আর সরকারবাবু যে কলকাতা যাননি এটা একমাত্র তুইই জানিস।”

বুবুল বিষমভাবে হোঁচট খেল, রাস্তায় নয়, মনে মনে। সম্ভবত সেটা তার মুখের অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠেছে। তাই জীবনস্যার বললেন, “কাল কুমির দেখার জন্য স্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি দেওয়া হয়েছিল। সব ছেলেকে নিয়ে আমিই গেছিলাম তোদের পুকুরপারে। সেটা দুপুর দু-টোর সময়। তারপর চারটের সময় সব ছেলেরা বাড়ি চলে যায়। পুকুরপার থেকে তোদের বাড়ি যাবার পথে বাস রাস্তা পড়ে না। আর বেলা বারোটার পর কলকাতা যাবার কোনও বাস নেই মোহনপুর থেকে।”

বুবুল কী বলবে কিছু বুঝে উঠতে পারছে না।

“দেখো বুবুল। আমি তোমাকে খুব স্নেহ করি। তুমি মিথ্যে কথা বলবে সেটা মেনে নিতেও কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা যখন অন্য কিছুর ইঙ্গিত করছে তখন নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে এর মধ্যে। সরকারবাবু নিজে যদি বলতে বারণ করে থাকেন তাহলে আলাদা কথা, কিন্তু এ ছাড়া যদি অন্য কোনও কারণ না থাকে তাহলে আমাকে বলতে পারো। কারণ সরকারবাবুর গবেষণার কাজের ব্যাপারে একমাত্র আমার কাছেই কিছুটা উনি বলেছিলেন।”

“কিন্তু স্যার, আপনি কি আমার সব কথা বিশ্বাস করবেন?”

“তুই নির্ভাবনায় বলতে পারিস। আমার মনে হয় সেটা তোর পক্ষেও ভালো হবে।”

বুবুল এর পর কালকের বাঁশবাগানের ঘটনা থেকে শুরু করে রাত্রে ল্যাবরেটরির প্রাণগোবিন্দ পর্যন্ত সব কথা স্যারকে বলল। শুনে জীবনানন্দবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “অন্য কেউ তোর একটাও কথা বিশ্বাস করবে না। আমি সরকারবাবু গবেষণার ব্যাপারে কিছুটা জানি বলেই বিশ্বাস করছি। তাই অন্য কাউকে এখনই কিছু বলতে যাস না। আচ্ছা, প্রাণগোবিন্দ এখন কোথায় আছে?”

“দিনের বেলা সূর্যের আলোয় নাকি আত্মাদের গায়ে ছ্যাঁকা লাগে। তাই তাকে আবার ‘আত্মামেব জয়তে’ মিক্সচারে চুবিয়ে রেখেছি।”

জীবনানন্দবাবু চোখ গোল গোল করে বললেন, “একটা জলজ্যান্ত ভূতকে ধরে মিক্সচারে চুবিয়ে দিলি!”

“কী করব? ও নিজেই বলল যে।”

“ঠিক আছে। আজ রাতে আমি সরকারবাবু ল্যাবরেটরিতে যাব। ঠিক বারোটার সময়। তখন বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ে তো?”

“ঘুমিয়ে পড়লে আমি টর্চ জ্বেলে আপনাকে সঙ্কেত দেব।”

“না না, ওসব করতে হবে না। যত সব আলতুফালতু ডিকেক্টিভ গল্প পড়ার ফল। আমি ল্যাবের দিকে নজর রেখে অপেক্ষা করব তুই না আসা পর্যন্ত।”


সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%