সন্ধ্যা

অমিতাভ চক্রবর্তী

আমার বাবার কাছে মেয়ে হয়ে জন্মানোটাই পাপ। খুব অভাবের সংসার ছিল আমাদের, পূজোয় একটা নতুন জামা পর্যন্ত পেতাম না। কোনোমতে মাধ্যমিক অবধি এগোতে পেরেছিলাম, তারপর যেই ব্যাক পেলাম, ব্যাস পড়া বন্ধ হয়ে গেল। ছোটবেলায় এমনকি খেলতে অবধি দিত না বাবা, ছেলেদের সঙ্গে মেশার তো কথাই নেই, মেয়েদের সঙ্গেও মিশতে দিত না, কেবল বলত খারাপ হয়ে যাব। এমন মারত চ্যালাকাঠ দিয়ে যে গা থেকে রক্ত বেরিয়ে যেত। মাও কোনোদিন বাবার ওপরে কথা বলতে পারত না, মাকেও মারত বাবা, কোনও কিছু পছন্দ না হলেই মারত, বাবার সামনে মা কথাই বলতে পারত না। আমার ওপরে আমার এক দাদা ছিল, আর দিদি। দিদি আমার থেকেও কালো, তাই বাবা ওকে আরও বেশি মারত, ওকে যেন একেবারেই সহ্য করতে পারত না।

এর মধ্যেই বাবা আমার বিয়ে দিয়ে দিল, আঠেরো তখনও হয়নি। প্রথমে ভেবেছিলাম ভালোই হয়েছে, বাবার হাত থেকে তো বাঁচব, কিন্তু যার সঙ্গে বিয়ে দিল তার মানসিক রোগ ছিল। তখন তো এত কিছু জানতাম না, পাগলই ভাবতাম, আট বছর সংসার করি ওই নিয়েই। মনে হত বাবার হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে আরও গভীর গর্তের মধ্যে পড়ে গেছি। একদিকে ওইরকম মানুষের সঙ্গে থাকার যন্ত্রণা, অন্যদিকে ওর মা-বাবার অত্যাচার, যেন ও যা-কিছু করে সেসব আমার দোষ। চোখের জল ছাড়া ভাত খাইনি কোনোদিন, অথচ সংসারের সমস্ত কাজ আমার ঘাড়ে ছিল। আর আমার বাবা তো কোনও খোঁজও রাখত না, বিয়ে দিয়েছে মানেই যা করার করে দিয়েছে, সব দায়িত্ব শেষ।

আমার বিয়ের কিছুদিন পরেই দাদা অ্যাকসিডেন্টে মারা গেল, কিন্তু আমার শ্বশুরবাড়ির লোক তখনও আমাকে ওবাড়ি যেতে দিতে চায়নি, ওদের বাড়ির ঝি তো আমি, ছাড়লে খাটবে কে? আমি জিদ করে চলে গেছিলাম, মার পাশে থাকার মতো কেউ তো ছিল না, ততদিনে দিদির বিয়ে হয়ে গেছে, ভাই ছোটো, দাদার বৌ আমার বয়সী হলেও একটু জড়সড় মানুষ। আর বাবা কেবল হম্বিতম্বি করতে পারে, আসলে কিছুই করে না। এমনিতে এখন আমার যতটা সাহস, তখন ততটা ছিল না, কিন্তু সেইসময় কেমন একটা জোর এসে গেছিল মনের মধ্যে যে আমি পারব, ঠিক কিছু একটা করে মায়ের পাশে দাঁড়াতে পারব। তখন একটা মন্টেসরি স্কুলে কাজও জোগাড় করেছিলাম, কিন্তু এই নিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোক খুব অশান্তি করে, এমনকি সালিশি সভাও বসায়। আমার বাবাও ওদেরই দলে ছিল, আমাকে দিয়ে জোর করে ক্ষমা চাওয়ায়, কিন্তু কাজটা তবু আমি ছাড়িনি। কেউ যদি তখন আমার পাশে থাকত, একটু সাহস দিত, তাহলে অনেক আগেই আমার জীবন ঘুরে যেতে পারত। কেউ তো ছিল না, মাও ওইভাবেই তৈরি, সব মুখবুজে মেনে নিতে চায়, আর দিদি তো আরও বেশি ভীতু, ওকে একটা চড় মারলে চুপ করে বসে-বসে কাঁদবে, কোনও কথা বলবে না। ওর বিয়ের পর থেকে জামাইবাবু ওর ওপর অত্যাচার করে, এখন দুটো বাচ্চাও হয়ে গেছে, তবু অবস্থা কিচ্ছু ভালো হয়নি।

সব মিলিয়ে যা চলছিল তা আর সহ্য করতে না পেরে এক সময় মনে হয়েছিল এই মানুষটাকে যেভাবে হোক ঠিক করতে হবে, ও যা করছে সেগুলো তো স্বাভাবিক নয়। ওর মা বাবা বলত ও ইচ্ছে করে এসব করে, কিন্তু আমার মনে হত এগুলো ইচ্ছে করে করার জিনিস নয়। যখন দেখলাম আমার শ্বশুরবাড়ির কেউ ওর চিকিৎসা করাবে না, কারণ ওরা তো রোগ বলে মানছেই না, আমি নিজেই ওর চিকিৎসার চেষ্টা করেছিলাম। এইসময় আমাদের পাড়ার মধ্যেই একজনের খোঁজ পাই যে তার মায়ের জন্য জনমানস সেন্টারে গেছিল। তার কাছ থেকে খবর জেনে আমি সেন্টারে আসি।

আমি অত মানসিক স্বাস্থ্য না কী, ওসব বুঝতাম না, ভেবেছিলাম পাগল মানুষকে ঠিক করা যায় কিনা এটা জানতে হবে, সেই জন্যেই এসেছিলাম। দিদিরা আমাকে ভালো করে সব বুঝিয়েছিল, মানসিক স্বাস্থ্য কাকে বলে, রোগ কাকে বলে, এইসব বুঝিয়েছিল। তখন আমার নিজেরই মনে হল আমি তো এসেছি বরকে যদি ভালো করা যায় সেই জন্যে, কিন্তু এই যে আমি ছোটো থেকে বড়ো হয়েছি, আমার তো সেভাবে কোনও মানসিক অসুখ হয়নি, কিন্তু মন খুলে কথা বলতে পেরেছি কি? না বাপের বাড়িতে, না শ্বশুরবাড়িতে, না বরের সাথে, আমার কষ্টের কথা কখনো কাউকে বলতেই পারিনি, মন যেন জমে পাথর হয়ে গিয়েছিল, দম বন্ধ হয়ে থাকত। সেদিনের কথা ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয় যে কোন স্টেজে ছিলাম আমি, দিদিদের সামনে হড়হড় করে কথা বলেছিলাম আর কেঁদেছিলাম। তারপর প্রতি শনিবার বরকে নিয়ে যেতাম, তারপর হাসপাতাল-ডাক্তার সব করেছিলাম। ওইরকম করে-করে মানুষটাকে সুস্থ করে তুলেছিলাম, কাজকর্ম করতে শুরু করেছিল, ওষুধ খেত বলে ঘুমটা একটু বেশি হত, বাকি সব ঠিকঠাক হয়ে গেছিল। শুরুতে ওর বাড়ির লোকদের রাজি করিয়েই ডাক্তার-ওষুধ এসব করা হয়েছিল, কিন্তু যেই একটু ভালোর দিকে যেতে লাগল, ওরা রামদেববাবা বলে কার একটা কী ওষুধ খাওয়াতে শুরু করল, হাসপাতালের ওষুধ বন্ধ করে দিল, উলটে আমাকেই দোষারোপ করতে লাগল।

এইসময়ই আমি জনমানসের সঙ্গে ট্রেনিং শুরু করেছিলাম, দিদিরা আমাকে বুঝিয়েছিলেন যে নিজে ভালো না থাকলে কিচ্ছু হবে না। একদিকে বাড়িতে এরকম চলছে, অন্যদিকে আমাদের ট্রেনিং সেশন হচ্ছে, দিদিরা নানারকম রাস্তা দেখাচ্ছেন, জিজ্ঞেস করছেন আমি কী চাই, কোনপথে যেতে চাই। তখন মনে হত, আচ্ছা তাহলে আমার চাওয়ারও দাম আছে, আমিও নিজের পথ বেছে নিতে পারি। অনেক কিছু ভেবেছিলাম সেই সময়ে, যে সম্পর্কে জড়িয়ে আছি তাতে দুঃখ ছাড়া, যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছুই নেই, আমার স্বপ্ন ছিল সংসার হবে, সন্তান হবে, কিছুই হয়নি। জনমানস ট্রেনিং থেকে যে মনের জোর পেয়েছিলাম তাতে মনে হয়েছিল আমিও একটা মানুষ, আমারও বাঁচার অধিকার আছে, সেইটাই সম্বল ছিল কেবল। সেইটার ওপরে ভর করে একদিন মাকে আর ভাইকে সব কথা বলেছিলাম, কী রকম কষ্টে আছি, শ্বশুরবাড়িতে কী কী হচ্ছে, সব কথা। ওদের বলেছিলাম যে এই জীবন আমি আর চাই না। বাবা কিন্তু সেসময়ও আমার কথা শোনেনি, তবে তখন আমার আর কিছু যেত-আসত না। মা অবশ্য ওইসময় সাহস করে বলেছিল—তুই বাড়িতেই এসে থাকবি, নিজে রোজগার করবি, নিজে খাবি, কাউকে কৈফিয়ত দিতে হবে না। দাদা মারা যাবার পর থেকেই মায়ের মধ্যে একটু-একটু পরিবর্তন এসেছিল, মা আগের থেকে বেশি সাহস দেখাত।

ওবাড়ি থেকে চলে আসার পরে আমি ডিভোর্সের জন্য মামলা করি, দুবছর আগে ডিভোর্স হয়ে যায়, কিন্তু এই কথাটা ভাবলে দুঃখ হয় যে আমার বরকে অনেকদূর পর্যন্ত চেষ্টা করে সুস্থ করে তুলেছিলাম, কিন্তু ওর বাড়ির লোকেরা চিকিৎসা চালাল না, ও আবার পুরো খারাপ হয়ে গেল। ডিভোর্সের পরে আরেকজনের সঙ্গে সম্পর্ক হয়, প্রথমে আমি একে বিশ্বাস করতে পারতাম না। আসলে জীবনে এত খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে যে তারপর সব কিছুই খারাপ হবে বলে মনে হত। তবে আস্তে-আস্তে ভরসা বেড়েছে, এই ছেলেটিকে এখন বিয়েও করেছি। আমার এখনকার স্বামী সব কথা জানে, আমার কাজের কথাও জানে, আমি এই মানুষটাকে নিয়ে ভালো আছি। ঘর সংসারের কাজে ও আমাকে সাহায্য করে, কোনও কাজে বাধা তো দেয়ই না, বরং মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাপারটা বুঝতে চায়। শুধু ওর বাড়িটা খুব গ্রামের দিকে বলে আমার ডিভোর্সের ব্যাপারটা তাদের জানানো হয়নি, ওরা এটা মেনে নিতে পারত না।

জনমানসের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিলই, থেকেছে, ওটা কখনো বন্ধ হয়নি, ওটাই আমার সাহসের জায়গা, ভরসার জায়গা। ট্রেনিংএর একটা কথা আমার মনে গেঁথে গেছিল, নিজেকে ভালো রাখার দায় আমার নিজের, সবাইকে ভালো রাখতে যদি নাও পারি, অন্তত নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা করতেই হবে। জনমানসের সেন্টারে তো আগে থেকেই নিয়মিত যেতাম, তারপর কিছু-কিছু কাজ করতে শুরু করি, সার্ভে, তারপর ক্যাম্প, তারপর বাড়ি-বাড়ি ঘুরে ক্যাম্পেন, এসব শুরু করি দিদিদের সঙ্গে। আমার কেবল মনে হয় আরও কত মেয়ে আছে আমার মতো, যাদের কথা কেউ শুনতে চায়না, তারা মনের কথা বলার জায়গা পায়না, নিজের মন নিয়ে ভাবতে যে হয় তাইই জানে না। আমার মতোই পাথর হয়ে বসে থাকতে-থাকতে কত মেয়ে মরেই যায়, সুইসাইড করে। এখানে কাজ করার সুযোগ পেয়ে এইটা আমি সবাইকে বলি, মন খুলতে হবে, গুমরে থাকলে চলবে না, নিজেকে ভালো রাখার দায়িত্ব আমার নিজের। আর বদলেছে আমার বাবা, দাদা মারা যাবার পর থেকে বাবার একটু-একটু সমস্যা হচ্ছিল, কেমন যেন হয়ে গেছিল। বাবাকেও পাভলভে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছিলাম, আস্তে-আস্তে ভালো হয়েছে। বাবা এখন অনেক বদলে গেছে, আমাকে এখন খুব মানে, কথা শোনে, আমার এই বরকে পছন্দ করে, এমনকি জনমানসের যে ফ্যামিলি মিট হয় বাবা সেখানেও এসেছিল মায়ের সঙ্গে। আজ মনে হয় বাবাও আমাদের সঙ্গে যা করেছে তাতে পুরোপুরি বাবারও দোষ ছিল না, সমাজ বাবাকে দিয়ে ওগুলো করিয়েছে। বাবার জায়গায় দাঁড়িয়ে আজ দেখতে পাই আমাদের কষ্ট দিয়ে বাবাও ভালো থাকেনি।

জনমানসের কাজের মধ্যে আমার সব থেকে ভালো লাগে বাড়ি-বাড়ি ঘুরে অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্পেনের কাজ, এখান থেকে অনেক প্রশ্ন উঠে আসে, কথা বলা শুরু করা যায়। ঘরে-ঘরে ঢুকে যখন কাজ করি তখন অনেক ভেতরের কথা শুনতে পাই, মেয়েরা আমাদের সঙ্গে খুলে কথা বলে। একদিনে বলে না, প্রথমেই বলতে চায় না, চাইলেও হয়ত পারে না, কিন্তু কয়েকদিন যাবার পর আস্তে-আস্তে খোলে, কথা বলে। এইভাবে মানুষ যে আমাদের কাছে আসতে পারে, একদিনে না হোক দুদিন-তিনদিনের মাথায় এসে কথা বলতে পারে, এইটা আমার খুব ভালো লাগে। আমরা এই জায়গাটা তাদের দিতে পারি। এক তো এরা জানেই না মানসিক স্বাস্থ্য কাকে বলে, তার যে স্বাস্থ্যের অভাব আছে সেইটাই জানে না, তারপর কথা বলায় পরিবারের বাধা রয়েছে, সে মন খুলে কথা বলার সুযোগই তো পায় না। অনেক মেয়ে পর্দার আড়ালে থাকে, তাদের বেরোবারই অধিকার নেই, সেই ক্ষেত্রে তাদের বাড়ির মধ্যে ঢুকেই আমরা কথা বলি, তারপর তারা যখন আমাদের কিওস্কে মানে জনমানসের সেন্টারে আসে তখন আরও ভালো লাগে, মনে হয় কিছু একটা করতে পেরেছি, একটু উপকার পেয়েছে।

একটা কথা ভাবি মাঝে-মাঝে, যদি আমার প্রথম স্বামীর মানসিক অসুস্থতা না থাকত, যদি ওকে ভালো করার জন্যে আমি খুঁজে-খুঁজে জনমানসের দিদিদের কাছে এসে না পৌঁছতাম, তাহলে আমার দিদির যেমন জীবন তেমনি জীবন আমারও হত। জামাইবাবুর তো মাথার দোষ নেই, কিন্তু নেশা-ভাং করে, দিদিকে মারে, যেমন আমার বাবা মাকে মারত অত্যাচার করত, তেমনি। নিজের মনকে চেনার, নিজেকে ভালো রাখার যে সুযোগ আমি পেয়েছি সেসব কোনোদিন হত না, নিজেও ভালো থাকতাম না, আর কাউকে সাহায্যও করতে পারতাম না। দেওয়ালে পিঠ লেগে গেল বলেই হয়ত বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তার আগে আট বছর সহ্যও তো করেছি, বলতে গেলে জন্ম থেকেই সহ্য করে চলছিলাম, জনমানস না থাকলে আরও কত বছর সহ্য করে যেতাম কে জানে।

সন্ধ্যা সরকার, বয়স তিরিশ, মাধ্যমিক পাশ, জনমানসে এসেছেন ফেব্রুয়ারি, ২০১৭।

অধ্যায় ৭ / ৭
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%