অমিতাভ চক্রবর্তী
আমার জন্ম বাংলাদেশে। মায়ের কাছে শুনেছি আমার যখন বছর দেড়েক বয়স তখন আমরা ওদেশ থেকে এদেশে আসি। প্রথম থেকেই দেখেছি বাবার খুব রাগ, একটু কিছু হলেই মারধর করত, কেমন একটা আতঙ্কের মধ্যে আমার দিন কাটত, এই বুঝি কিছু ভুল হয়ে গেল। একবার কী একটা গণ্ডগোলে বাবাকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেল, জেল হয়ে গেল। মা তখন একটা পুতুলের কারখানায় কাজ নিয়েছিল, আমাকে তখন ইস্কুলেও ভর্তি করে দিয়েছিল। বোধহয় বছর চারেক পরে বাবা ছাড়া পেয়েছিল, কিন্তু তার রাগের কোনও পরিবর্তন হয়নি। সবসময় বলত—আমি বাড়ির কর্তা, আমি যা বলব তাই হবে, মায়ের বা আমার কারও কিছুই বলার অধিকার ছিল না। বাবা ফেরার পরেও মা কাজ করা ছাড়েনি, সেই নিয়েও মাঝে মাঝেই অশান্তি মারপিট হত। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—বাবা এত মারে কেন? মা বলেছিল—তোর তো ভাই নেই সেই দেখে তোর বাবা আমার সাথে এরকম করে।
আমার বারো বছর বছর বয়সে সেই ভাই হল, মা তখন খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, সেই থেকে ভাইকে দেখতে হত আমাকে, ভাইয়ের তখন মোটে তিন মাস বয়স। তারপর যখন মা ভালো হয়ে আবার কাজ শুরু করল, ভাইকে সেই আমার কাছেই রেখে যেতে হত। বাবার মেজাজের জন্য বেশি কাজ তো পেত না, তাই মাকে কাজে যেতেই হত, কিন্তু ভাইকে দেখবে কে? তাই আমার স্কুল ছাড়িয়ে বাড়িতে রেখে দিল, ভাইকে দেখতে, রান্না করতে, সংসার চালাতে, বাবার ভাত দিতে, আমার তখন তেরো বছর বয়স, সিক্সে উঠেছি সবে। কীভাবে আমি সব সামলাব সেইটা কেউ ভেবেও দেখেনি। এরমধ্যে এমনও হত যে বাবা একদিন একগাদা চুনো মাছ নিয়ে এসেছে আর আমি সেই মাছ কাটতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছি, এত কষ্ট হচ্ছিল। আর বাবা অমনি চিৎকার করতে শুরু করেছে—হ্যাঁ, ছেলেকে রাখতে তোর কষ্ট হচ্ছে, কাঁদছিস? আজ ওকে পুকুরে ছুঁড়েই ফেলে দেব আমি। এই বলে ভাইকে নিয়ে সত্যি পুকুরে ফেলতে গেছিল, তারপর তো আমি কেঁদেকেটে লোক জড়ো করে বাবাকে থামালাম, এইরকম ছিল আমার বাবা। আরেকবার, তখন ভাই একটু বড়ো হয়েছে, বছর তিনেক হবে, আমি রান্না করছি আর শীতের দিন বলে ভাই আগুনতাতে ঘেঁষে এসেছে, আমি ওকে বলেছিলাম সরে বসতে, উনুনটা ভাঙামতো ছিল, কখন এক্কেবারে ভেঙে গায়ে পড়ে, তাই সরে বসতে বলেছিলাম। বলতে-বলতেই কী হল, উনুন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল, ফুটন্ত ভাতের হাঁড়িশুদ্ধ সব এসে ওর গায়ের ওপর! আমি টেনে নিয়ে খানিকটা সরাতে পেরেছিলাম, তাও পায়ের ওপর অনেকটা পড়েছিল, চামড়া তক্ষুনি গুটিয়ে গেল। ভাই তখন বলছে—ও দিদি গো, আমার কিছু হয়নি, তুমি আগে ভাতগুলো তোল, বাবা ভাত না পেলে তোমাকে তো মেরেই ফেলবে। এইরকম অবস্থা ছিল আমাদের।
এইরকম জীবন কাটাতে-কাটাতে মনে হত আমি বোধহয় কোনোদিন স্বাধীন হব না, আমার ভাবনার কোনও গুরুত্ব কেউ কোনোদিন দেবে না, কেউ বুঝবে না আমাকে। মা হয়তো আমাকে বুঝত, কিন্তু মায়ের তো কিছু করার ছিল না, মাকে আমি দোষ দিই না তাই। ষোলো বছর বয়স নাগাদ আমার বিয়ের দেখাশোনা শুরু হল, সেখানেও আমার কিছুই করার ছিল না, সতেরোতে বিয়ে হয়েও গেল, ছেলে আমার পছন্দ ছিল কি ছিল না সেই নিয়ে কেউ জিজ্ঞেসও করেনি। শ্বশুর বাড়ি হল বাগুইহাটি, খড়দা থেকে সেখানে এলাম। সেখানেও খুব চেপেচুপে থাকতে হত, একগলা ঘোমটা দিয়ে, এখানে যাবে না ওটা করবে না, বাঁধন সেই থেকেই গেল। একটাই ভালো জিনিস হয়েছিল যে বরকে যখন বলেছিলাম আমি পাঁচ বছরের মধ্যে বাচ্চা নিতে চাই না, এতদিন তো ভাইকে মানুষ করেছি, একটু দম ফেলতে চাই, সেটা উনি শুনেছিলেন। এইটা ভালো লেগেছিল, একটা মানুষ আমার অন্তত একটা কথা শুনেছে। ছেলে হয়েছিল তিন বছর পর, পাঁচ বছর নয়, তবু সেটাও ভালোই বলতে হবে।
আরও কিছুদিন পরে, ছেলের তখন পাঁচ বছর বয়স হবে, তখন কী করে যেন আমার নাম মহিলা সমিতিতে উঠে যায়, আমি মহিলা সমিতিতে যেতে শুরু করি। আমার খুব ভালো লাগত, পার্টি-পলিটিক্স আমি বুঝি না, কিন্তু ওই যে লোকের মধ্যে যেতে পারতাম, লোকের সঙ্গে যোগাযোগ হত, ঘর-সংসারের বাইরের একটা জগত, ওইটা ভালো লাগত, ওইটুকু সময় মনে হত আমি স্বাধীন। ওখান থেকে নাম গেল পৌরসভার স্বনির্ভর গ্রুপে। স্বনির্ভরগোষ্ঠী থেকে অনেক ট্রেনিং এসেছিল, তার মধ্যে এই জনমানস ট্রেনিংটাও ছিল। প্রথমে আমার নাম ওঠেনি, যাদের উঠেছিল তারা প্রথমদিন ট্রেনিং করার পর এসে বলল যে এখানে মন নিয়ে কাজ করা হবে, মানুষের ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, আমি তখন ভাবলাম যে এইটাতে আমাকে ঢুকতেই হবে, জানতে হবে এটা কী বিষয়। আমি গিয়ে পৌরসভার লোকজনকে ধরে অনেক করে বলে ট্রেনিঙের দলে গিয়ে ঢুকেছিলাম, ওরা প্রথমে দিতে চাইছিল না এই বলে যে আমার তো একদমই কোনও এডুকেশন নেই, তাও আমি জোর করে ঢুকেছিলাম। ভাগ্যিস ঢুকেছিলাম, ট্রেনিঙের প্রথম দিনেই আমার মনে আছে, একটা পাখি তুলে নিয়ে বলেছিলাম আমি মুক্ত আকাশে স্বাধীনভাবে উড়তে চাই। স্বামীর সঙ্গে যে খুব খারাপ ছিলাম বা আছি তা নয়, সংসার তো করছি, জীবন তো কাটাচ্ছি, প্রেম যাকে বলে সেটা নেই, তবে চলে তো যাচ্ছে। কিন্তু আরেকরকম জীবনও চেয়েছিলাম, স্বাধীন জীবন, যেখানে আমার কথার দাম থাকবে, রোজগার করব, মাথা তুলে বাঁচব, জনমানস সেটার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
এত কিছুর পরেও কিন্তু আজও আমি সেই শাড়ি পরেই চালাচ্ছি, সবে ক’দিন হল নাইটি পরছি বাড়িতে, তাতে ছেলে বলল—মা এসব কী, ঠিকঠাক জিনিস পর, এসব পরে মা-মা লাগছে না। আমি ওকে বলে ফেললাম—আমাকে তো বলছ, বউকে বাধা দিতে পারবে তো? তারপরই মনে হল বউকে যদি বাধা দেয় তাহলেও কি আমার ভালো লাগবে? আমি আমার না পাওয়ার কষ্ট কি আরেকটা মেয়েকে দিতে যাচ্ছি? আমি পরতে পাইনি বলে সেও পাবে না? এইভাবেই তো আমার শাশুড়ি, তার শাশুড়ি, তার শাশুড়ি করে এসেছে। এই ভাবনাটা কিন্তু জনমানস ট্রেনিং করার আগে ভাবিনি, বুঝিইনি কখনো যে আমি অন্যের ওপর আমার না পাওয়ার ঝাল ঝাড়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

এই জনমানসের ট্রেনিং চলাকালীনই আমি একজন মানুষকে নিয়ে মেন্টাল হাসপাতালে গেছিলাম, চিকিৎসা করাতে, কবিতাদি আর আমি মিলে গেছিলাম, সেটাও একটা বড়ো পাওনা, আমি তো আগে ভাবিইনি যে এটা আমি করতে পারব। আমার নিজের মধ্যেই কত দ্বন্দ্ব ছিল, মেয়েরা এটা পারে না, সেটা পারে না, এটা করা উচিত, ওটা নয়, আমি নিজেই এভাবে ভাবতাম। সেগুলো কাটছিল আস্তে-আস্তে, বুঝতে পারছিলাম যে আমার অনেকগুলো অধিকার আছে, নিজেকে ভালো রাখার দায় সম্পূর্ণ আমার, তাই নিজের অধিকার নিজেকেই ছিনিয়ে নিতে হবে, অন্যকে ভালো রাখতে গিয়ে সেটা নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। আমার আশেপাশের লোক, পাড়ার লোক, চেনা লোক, অনেকের মধ্যেই দ্বন্দ্ব আছে যে দূর ও পাগলের কাজ করে। এটা বোঝাতে চেষ্টা করি তাদের, এটা পাগল বা মানসিক রোগীর বিষয় নয় শুধু, আমরা যেমন তাদের অধিকার আদায় করতে সাহায্য করছি, তেমনি নিজের অধিকারও।
আমি তো পরিষ্কার বুঝতে পারি এই নিয়ে আমার স্বামী বা ছেলের সঙ্গেও কথা বলার দরকার, বিশেষ করে ছেলের সঙ্গে। মানুষের অধিকার, বা মেয়েদের অধিকার নিয়ে ওকে একটু সচেতন করতেই হবে। এখনও সেটা শুরু করতে পারিনি, তবে পারব নিশ্চয়। তবে স্বামী আমাকে প্রচুর বিশ্বাস করে, অনেক স্বাধীনতা দিয়েছে, কাজের ব্যাপারে বাইরে যেতে দেওয়া, দেরি করে বাড়ি ফেরা, এসব নিয়ে সমস্যা করে না একেবারেই। কিন্তু আমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে পারিনি এখনও, আমাকে কত কষ্ট দিয়েছে, কত অত্যাচার করেছে, তাতে আমার যে কতটা মানসিক সমস্যা হয়েছে, এসব বলা হয়নি। আর বাবার আচরণ আজও বদলায়নি, মা আজও বাবার তলায় আছে।
দিল্লীতে যে অ্যাওয়ার্ড পেলাম, সিআইআই, মানে কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রান্তিক নারী স্বাস্থ্যকর্মী হিসাবে, তার আগে তিন মাস ধরে আমার ইন্টারভিউ চলেছিল, কত রকম প্রশ্ন করেছিলেন, জনমানসের ফিল্ডে ঘুরে-ঘুরে আমার কাজ দেখেছিলেন। তার মধ্যে একটা প্রশ্ন ছিল রত্নাদি কেমন? তা আমি বলেছিলাম—এটা ঠিক প্রশ্ন নয়, উত্তর চাইলে প্রশ্ন ঠিকভাবে করতে হবে। রত্নাদি মানুষটা কেমন? রত্নাদির কাজ কেমন? নাকি আমি রত্নাদিকে কীভাবে দেখি বা বুঝি? এতে তারা খুব সন্তুষ্ট হয়েছিল যে পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে থেকেও মানুষ কত গভীরে গিয়ে ভাবতে পারে। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের হাত থেকে পুরস্কার পেলাম, যেন স্বপ্নের মতো, ভাবিইনি যে এরকম কখনো হতে পারে। ওখানে তো আমাকে ছাড়া আরও পনেরোজন মানুষ সিলেক্ট হয়েছিল, সবাই কত পড়াশোনা জানা, আমি যে তার মধ্যে পুরস্কারটা পেতে পারি এইটা নিজেরই বিশ্বাস হয়নি। এমন কি যখন আমার নাম লেখা কার্ড হাতে দিয়েছিল তখনও তো পড়তে পারিনি, ইংরেজিতে লেখা, আমি তো পড়তে পারি না। যখন রত্নাদি বললেন—তুমিই জিতেছ, আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না কিছুতেই। এত ট্রেনিং করার পর, এত কাজ করার পরও নিজের ওপর এই বিশ্বাস তৈরি হয়নি দেখলাম, কেবল মনে হচ্ছিল আমি লেখাপড়া জানি না, হিন্দি অবধি বলতে পারি না ভালো করে, ইংরেজি তো জানিই না, এঁরা কি আমার কথা শুনবেন, আমার কাজ বুঝবেন? শেষ পর্যন্ত সেটাই হল, এঁরা শুনলেন, বুঝলেন। আমার যে কী আনন্দ হয়েছিল তা বুঝিয়ে বলতে পারব না। এই কাজের জন্য কত বদনাম শুনতে হয়েছে, জনমানসের কাজের তো কোনও ধরাবাঁধা টাইম নেই, কিওস্কের টাইম আছে, কিন্তু তারপরেও অনেক সময় কোথাও যেতে হতে পারে, বাড়ি-বাড়ি গিয়ে কাজ করতে হয়, সেখানে অত সময় রাখা যায় না। তাতে লোকে বলেছে, নিজের লোকেরাই বলেছে, আমার নাকি চরিত্রের ঠিক নেই। আমার ঘরেরই একজন পিছনে লোক লাগিয়ে রেখেছিল দেখত যে আমি কারোর সঙ্গে সম্পর্ক করছি কিনা। অ্যাওয়ার্ড পাবার পর বড়ো ফুলের তোড়া নিয়ে সেই আবার এসেছিল, কী আর বলব!
জনমানস আমাকে এইভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখিয়েছে। আমি যখন কাউন্সেলিং করি, যখন মানুষকে বোঝাবার চেষ্টা করি যে অন্যকে দোষারোপ না করে নিজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াও, যার কথা কেউ শোনে না আমরা, জনমানসের কর্মীরা, তার কথা শুনি। আমি নিজেও তো সারাজীবন জেনে এসেছি এটা কোরো না, ওটা বোলো না, ওখানে যেও না, কেবল না আর না। আজ যখন ক্লায়েন্টদের এটা বোঝাতে পারি যে এই ‘না’ গুলো দিয়ে আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, তখন খুব ভালো লাগে। প্রত্যেক মানুষের ভাবনার যে একটা গুরুত্ব আছে এইটা সবথেকে বড়ো কথা, এমনকি সে যদি ভুলও করে, দেখতে হবে কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে সে ভুলটা করল। এরকম কথাও শুনেছি, একটি ছেলে বলেছিল, আপনাদের কাছে কাউন্সেলিংএ কী করে বসব, আপনি তো আমার মা বা কাকিমার মতো, তো আমি বলেছিলাম যখন কাউন্সেলিং করি তখন আমি না নারী না পুরুষ, না মা না কাকিমা, আমি তোমার বন্ধুর মতো হতে পারি, তার বেশি কিছু নয়। একজন তো প্রেম নিবেদন করে বসেছিল, একজন পুরুষ, তাকেও সামলাতে হয়েছে, রাগ না করে, বিরক্ত না হয়ে, ধৈর্য না হারিয়ে। এইটাই জনমানস, আমরা টর্চ ফেলছি মানুষের জীবনের অন্ধকার গলিতে, জীবনটা যার সিদ্ধান্ত কিন্তু সেই নেবে।
মনিকা মজুমদার, বয়স বিয়াল্লিশ, ষষ্ঠ শ্রেণী, জনমানসে যোগ দিয়েছেন মে, ২০০৮।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন