অমিতাভ চক্রবর্তী
আমি কেকা, আমি ছিলাম একটা বড়ো পরিবারের মেয়ে, ঠাকুমা, দাদু, খুড়তুতো, জ্যাঠতুতো ভাইবোন সব মিলিয়ে সংসার ছিল। ছোটবেলায় শরীর মোটে ভালো থাকত না, স্কুলে পড়তে-পড়তে সব মিলিয়ে পাঁচবার অপারেশন হয়েছিল আমার, তাই লেখাপড়া ভালো করে হয়নি। মাধ্যমিকের পর আর পড়তে পারিনি, সেইটা আজও আমার সবথেকে বড়ো দুঃখ আর আপশোসের জায়গা। বিয়ের আগে টাকাপয়সার টানাটানি কাকে বলে বুঝিনি, মাথার ওপর বাবা ছাড়াও দাদারা ছিল, রোজগার করত, ভালোই ছিলাম। তেইশ বছর বয়সে গিয়ে বিয়ে হল, তখনও বাবা-মা-দাদাদের মুখের ওপর বলতে পারিনি এ ছেলে আমার পছন্দ নয়, বিয়ে করব না। এমন বংশের মেয়ে আমি যেখানে গুরুজনদের সম্মান করা, তাদের কথা মেনে চলাটাই শেখানো হয়েছিল, আপত্তি করার কোনও জায়গাই ছিল না। তখনকার কালে মানুষের একটাই কথা ছিল যে সৎ ছেলে, মানে নেশা করে না আর ক্রিমিনাল নয়, ব্যাস, তাহলেই হল। আমার ব্যক্তিগত মত যদি বলতে চাই তাহলে পিয়ারলেসের এজেন্ট জিনিসটাই আমার ভালো লাগত না, আমার বর যে তখন রোজগার খারাপ করত তা নয়, কিন্তু ওই অ্যাটাচি নিয়ে ঘোরা এজেন্ট বিষয়টাই আমার ভালো লাগত না। কিন্তু আমার কথা তো কেউ শোনেনি, সৎ ছেলে বলে বিয়ে দিয়ে দিল।
তারপর তো ছেলে হল চুরানব্বই সালে আর পঁচানব্বই সাল থেকে স্বামীর কাজ বন্ধ হয়ে গেল, পিয়ারলেস ফিনান্স বন্ধ হয়ে গেল। তখন বিশাল একটা ঝড় এল, ছেলে ছোট, স্বামীর কাজ চলে গেল, টুকিটাকি নানা কিছু করে উনি সংসারের হাল ধরার চেষ্টা করতেন, খুব কষ্টে দিন কেটেছে। এর মধ্যে আমার শাশুড়ির কথা আমাকে বলতেই হবে, উনি আজ মারা গেছেন, কিন্তু ওনাকে আমি আমার নিজের মায়ের থেকেও বেশি ভালবেসেছিলাম, উনিও আমাকে কী চোখে যে দেখেছিলেন সে বলার কথা নয়। ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আর ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি আত্মহত্যার কথা ভেবেও পিছিয়ে এসেছি, মনে হয়েছে আমি চলে গেলে এদের কী হবে, এরা তো আমাকে ভালবাসে। সত্যি আমি সে সময় মরার কথা ভাবতাম, একদিকে লোকের কাছে হাত পাতা যে কী লজ্জার সে আর কী বলব, অন্যদিকে এত টানাটানি, সংসার আর চলে না। ওদিকে এত কঞ্জারভেটিভ ফ্যামিলি যে হাজব্যান্ড গেটের বাইরে একলা যেতে দিত না, আর ছেলেটাও ছোটো, আমি যে ঘুরে-দেখে কাজের চেষ্টা করব তাও সম্ভব ছিল না। উনি বাড়ির বড়ো ছেলে আমি বড়ো বৌ, আমি বাইরে গেলে বংশের অসম্মান হবে, ছোটো দেওররা আর কেউ আমাকে মানবে না, এরকম বলতেন আমার হাজব্যান্ড, বলতেন—মহিলাদের জায়গা তো বাড়িতে, ঘরের মধ্যে। নিজের মাকেও তো উনি অ্যাকচুয়ালি ঘরবন্ধ করেই রেখেছিলেন। আমার শ্বশুর মারা গেছিলেন হাজব্যান্ডের চোদ্দো বছর বয়সে, সেই থেকে উনি সংসার টেনেছেন, মাকে ঘরের বাইরে যেতে দেননি। আমি কিন্তু জানি আমাকে যদি সেদিন বাইরে বেরোতে দেওয়া হত, তাহলে তখন যে পার্টি ক্ষমতায় ছিল তাদের সঙ্গে কাজ করে আমি একটা চাকরি ঠিক জোগাড় করে ফেলতে পারতাম। কিছুতেই পারমিশন দেয়নি, এমনকি ছেলেকে দূরের ইস্কুলে পাঠাতে পর্যন্ত কী যুদ্ধ করতে হয়েছে! আমি ছেলেকে পাড়ার ইস্কুলে পড়াতে চাইনি, এখানে তো কম্পিটিশন নেই, বনগাঁয়ের শিয়াল রাজা হয়ে কী হবে? কোথাও পৌঁছোতে পারবে? সেই নিয়েও কত অশান্তি হয়েছে ঘরে, ওই যে দেওয়া-নেওয়া করতে হবে, বাইরে যেতে হবে। ওইখানে আমি বেঁকে দাঁড়িয়েছিলাম, আমি যাব, করব, পারব, ওইসময় থেকেই বাইরে বেরোতে শুরু করেছিলাম।
খুব কমবয়সে তো আমার বিয়ে হয়নি, তবু তখনও আমার বিয়ের ইচ্ছে ছিল না, শুধু পিয়ারলেসের এজেন্ট বলে নয়, এমনিও আমার বিয়ের ইচ্ছে ছিল না। বাবাকে বলেওছিলাম—বিয়ের জন্য যে টাকা খরচা করবে সেটা আমাকে দাও, আমি কোনও একটা ব্যবসা করব, স্বাধীন থাকব। মা বলল—আমি মরে গেলে তোকে কে দেখবে, দাদাদের বউরা যদি ভালো ব্যাবহার না করে, এইসব কত কিছু। তারপর ওই যে ইঞ্জেকশন দেওয়া হয় মেয়েদের, বাপের বাড়ির অট্টালিকার থেকে শ্বশুরবাড়ির আস্তাঁকুড়ও ভালো! আজ হয়ত আমার মেয়ে থাকলে আমি এ কথাটা শেখাতাম না, কিন্তু আমাকে তো এটাই শেখানো হয়েছিল, আর ছেলেকে নিয়েও এইটার মধ্যে দিয়েই যাচ্ছি এখন, ছেলে অলরেডি বলছে বিয়ে কেন করতেই হবে। ওর বাবা ওকে বলেছিল—তুই আমার একটামাত্র ছেলে, তোর ওপরেই আমাদের বংশ নির্ভর করছে, তুই ভাল করে দেখেশুনে বিয়ে করিস। ছেলে অমনি বলে দিল—তার দায় আমার কেন হবে? বংশ রাখার দরকারটা কী? ব্যাস বাপ-ছেলেতে লেগে গেল! আমি একটা কথাই পরিষ্কার বুঝি যে যার জীবন তার, আমি জোর করে তার ঘাড়ে কিছু চাপালে সে ভালো নাও থাকতে পারে, আমি চাই ছেলে ভালো থাক। কীভাবে থাকবে ভালো সেটাও ওই বুঝবে, কারণ ভালো থাকাটা তো এক-একটা মানুষের ওপর নির্ভর করে, কে কিসে ভালো থাকবে সেটা সেইই বলতে পারে, অন্য কেউ নয়। এইটা আমার জনমানসের শিক্ষা।
ছোটবেলা থেকেই দেখেছি আমার বাপেরবাড়িতে অনেকে পার্টি করে, আমি ছোটবেলা থেকে সেসব দেখেই বড়ো হয়েছি, কিন্তু এখানে যখন আমাকে পার্টিতে ঢোকাবার চেষ্টা করছিল এখানকার পার্টির লোকজন, তখন দেখেছিলাম এরা অন্যরকম, আমার ছোটবেলার সেই পার্টির যে আদর্শ ছিল সেসব কিছুই আর এখন নেই, খুব স্বার্থান্বেষী এরা, কেবল আখের গুছিয়ে নেবার তাল। এটা আমার ভালো লাগত না একেবারেই, কিন্তু যখন পৌরসভা থেকে আমাকে ডাকল ওদের স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে যোগ দেবার জন্য, সেখানে আমি গেছিলাম, কারণ ওইটা আমার বাইরে বেরোবার একটা উপায়। সেখানেও আমার স্বামী ঝামেলা করেছিল—তোমাকে ডাকল কেন, তোমার কথা জানল কী করে, এইসব। সেটা ২০০৫ সাল, আমি ততদিনে ঠিক করেছি আমি কাজ করব, পৌরসভা হোক, যেখানে হোক। তাতেও গণ্ডগোল হয়েছিল, ওখানেও যে যার নিজের লোককে জিনিস পাইয়ে দিত, পাড়ায় বিপিএল কার্ড দেওয়া হবে, হঠাৎ দেখলাম রাতারাতি নিজেদের পছন্দমতো ফ্যামিলিগুলোর নাম তুলে দিয়েছে, তারা অনেকে বিপিএল নয় মোটেই, সেই নিয়েও আমি ঝামেলা করলাম, কেন আমাদের সঙ্গে কথা না বলে লিস্ট তৈরি হবে। ওখানে এইসব নানারকম হত, বিপিএল কার্ডের লোভ দেখিয়ে স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে আনা হত।
ওই পৌরসভা থেকেই জনমানস ট্রেনিংএর ব্যবস্থা হয়, আমার নামে চিঠি এসেছিল, সেই চিঠি নিয়ে দুখু মিয়াঁ মঞ্চে গেছিলাম, কিন্তু তখনও জানতাম না জিনিসটা কী, কিসের ট্রেনিং, কী হবে। ওখানে গিয়ে শুনলাম মনকে চিনুন, মনকে জানুন, নিজের মনের যত্ন নিন, মনে হয়েছিল এইটাই বোধহয় আমার পথ, এই পথেই আমার নিজের মনকে ভালো রাখতে হবে। কারণ আমার মন সবসময় খারাপ থাকত, নিজের মধ্যে হীনমন্যতা ছিল খুব, টাকাপয়সার দিক থেকে যেমন, লেখাপড়ার দিক থেকে যেমন, তেমনি আরও নানাকিছু নিয়ে। স্বামীকে অনেক করে বুঝিয়েও ঘুরে দাঁড় করাতে পারিনি, উনি আমার কথা শোনেন নি। ছেলেকে নিয়ে ভাবনা হত খুব, ইস্কুলের পর যদি কলেজে পাঠাতে না পারি তো কী হবে, এইসব ভাবতাম। ছেলের ওপর আমার সব আশা আটকে ছিল, ওকে দাঁড় করাতেই হবে, ওটাই একমাত্র লক্ষ্য বলে মনে হত। আজ বুঝি যে আমার জীবনের যা কিছু সাধ ছিল, যা কিছু দুঃখ ছিল, যত না মেটা আশা ছিল—সব যেন ওর ওপর দিয়ে পূরণ করতে চেয়েছিলাম, সে জন্য ওকে অনেক চাপও দিয়েছি না বুঝে। ও এই সবে এমএসসি দিয়েছে, দিয়েই একটা কাজে ঢুকে গেল, আমি এটা চাইনি, কিন্তু বল তো গড়িয়ে চলে গেছে হাত থেকে, আজ আমি চেয়েও তাকে ফিরাতে পারব না। আজ আমি যতই বলি না কেন—তুই মন দিয়ে পড়াশোনা কর, নেট যখন পেয়েছিস তখন পিএইচডি শেষ কর, আরও পাঁচ বছর আমরা চালিয়ে নেব ঠিক, ও সে কথা শুনবে না আর।

জনমানসের কাজে না ঢুকলে হয়ত এই বিষয়টা বুঝতেই পারতাম না, মানসিক স্বাস্থ্য না বুঝলে এটা জানতেই পারতাম না আমার মনের মধ্যে কী আছে, আর কেন আমি এরকম করছি বা করেছি। একদিকে নিজের মনকে বোঝা, অন্যদিকে মনের মধ্যে জোর আনা, আমি একটা মানুষ, একজন নারী, আমার অধিকার আছে, আমাকে প্রতিবাদী হতে হবে, এইটাও জনমানস ট্রেনিং থেকে শিখেছি। এই যে সন্ধ্যের আগে আমাকে বাড়ি ঢুকতে হবে, এটা কেন? এই প্রশ্নটা করতেও হবে, আর এটাকে বদলাবার জন্য যে মানসিক জোর দরকার সেটাও আমাকে অর্জন করতে হবে। জনমানসের কাজ করতে-করতে আমার কিন্তু ধৈর্যও অনেক বেড়েছে, মানুষকে বোঝার ব্যাপারটাও অনেক ভালো হয়েছে, আগে আমার আবেগ-অভিমান এত বেশি ছিল যে সেসবের বাইরে কিছু দেখতেই পেতাম না, এখন তাদের সরিয়ে রেখে অনেক কিছু দেখতে শিখেছি। আমি ঘরের গণ্ডির মধ্যে থাকলে এসব কিছু বুঝতেই পারতাম না। যেমন আমি চিরদিনই প্রতিবাদী, কিন্তু ঘরের মধ্যে, সেই প্রতিবাদটাই কেমন করে বাইরে বেরিয়ে এসে করতে পারি, কী নিয়ে করতে পারি, কীভাবে করতে পারি, নিজেকে বুঝে, অন্যকে বুঝে কোন কোন বদল আনতে পারি, এইটাই জনমানস দেখিয়ে দিয়েছে। ছোটবেলা থেকে আমাকে শেখানো হয়েছে পতিদেবতা, জনমানসে এসে জেনেছি আমিও মানুষ, সেও মানুষ, কাউকে দেবতা বানিয়ে কোনও উপকার হয় না, তার যতটা গুরুত্ব, ততটাই আমারও। এইটা আমার জনমানসের কাছ থেকে সবচেয়ে বড়ো পাওয়া। এই বোধটা, এই বিশ্বাসটা, যে আমারও গুরুত্ব আছে।
আমাদের কাছে যে ধরনের মানুষ আসে, ক্লায়েন্ট হিসাবে, তাদের বেশিরভাগই নিজেদের গুরুত্বহীন মনে করে, মনে করে তাদের কোনও অধিকার নেই, বিশেষ করে মেয়েদের কথা বলছি এখানে। একটি মেয়ে আমাদের কাছে এসেছিল তার বিবাহিত দিদির মাধ্যমে, মেয়েটি বেশ অসুস্থ ছিল। তাকে আমরা ভালো করে তুলি, ডাক্তার-ওষুধ সবই হয়েছিল, কিন্তু দেখা গেল তার দাদা চায় না বোন ভালো হোক কারণ সম্পত্তির ভাগ দিতে হবে যে। আবার ওই দাদাটাই এই মেয়েটির দিদির নামে মামলা করার চেষ্টা করেছিল যে ও নিজে বোনের সম্পত্তি মেরে দিতে চাইছে। তখন আবার আমরাই ভালো উকিলের সঙ্গে দিদিটির যোগাযোগ করিয়ে দিই, যাতে দিদিরও কোনও ক্ষতি না হয়, আর মেয়েটিও তার ন্যায্য প্রাপ্য পায়। এরকম নানা কিছু আমরা জনমানস কর্মী হিসাবে করি। এখানে যে কাউন্সেলিং হয়, আমরা যেটা করি সেটা সাময়িকভাবে কাজ করে, যে ভাবে কাউন্সেলিং করলে রোগ সেরে যাবে, সেটা করতে হলে অনেক এডুকেশন লাগে, সে তো আমাদের নেই, বিশেষ করে আমার এখানে খামতি আছে, আমি জানি। বরং ফিল্ডে আমি ভালো কাজ করি, আমাদের অনেকগুলো মোবাইল কিওস্ক চলে, মানে এক-এক সময় এক-এক অঞ্চলে সেন্টার বসানো হয়, সেগুলোর জায়গা আমি জোগাড় করেছি, জনসংযোগটা আমি ভালো পারি। বারো বছর আমি কাজ করছি জনমানসের হয়ে, এইটা বুঝে গেছি যে আমি বাড়ি-বাড়ি ঘুরে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার কাজ বা ক্যাম্প বসিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনার কাজগুলোই ভালো পারি। আর রাজারহাট এত বড়ো একটা জায়গা যে শুধু একটা কিওস্ক চালিয়ে সব মানুষকে সাহায্য করা যাবে না, বারো বছরে আমরা চল্লিশ পারসেন্ট মানুষকে সচেতন করতে পেরেছি কিনা সন্দেহ, তাই আমাদের আরও ছড়িয়ে যেতে হবে যতদূর পারি।
কেকা মজুমদার, বয়স পঞ্চাশ, মাধ্যমিক পাশ, জনমানসে যোগ দিয়েছেন মে, ২০০৮।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন