প্রভাতী

অমিতাভ চক্রবর্তী

আমার ছোটোবেলা এত দুঃখে কষ্টে কেটেছে যে বলতে গেলে একটা বই লেখা হয়ে যাবে। আমার বাড়ি ছিল বনগাঁ, তিনমাস বয়সে বাবা মারা যায়, মায়ের তখন বয়স ছিল পনেরো। আমার বাবার বাড়ির লোকেরা ওই পনেরো বছরের মেয়েটাকে, যার আবার কোলে একটা বাচ্চা, তাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলেছিল, আমাদের ছেলে মরে গেছে, তোমাদের দায়িত্ব কে নেবে, এই বলে। মা তবু যুদ্ধ করে আরও ছ’বছর ওখানেই ছিল, তারপর চলে আসে আমার পিসির বাড়ি। ওইসময় আমাকে একটা অনাথ আশ্রমে ভর্তি করে দেওয়া হয়, যেখানে আমি লেখাপড়াও করতে পারব আবার থাকতেও পারব, একজন চেনা মানুষ আমাদের অবস্থা দেখে দয়া করে আমার ভর্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। অনাথ আশ্রমে আমি মোটামুটি ভালোই ছিলাম, কিন্তু যত বাচ্চার থাকার কথা তার চেয়ে অনেক বেশি বাচ্চাকে রাখতে হত, তাই টানাটানি হত সবকিছু নিয়েই। তবে জিনিসের অভাব থাকলেও আমরা কিন্তু সব মিলিয়ে ভালোই ছিলাম। আশ্রমে আমরা থাকতাম, খেতাম, নানা কিছু শিখতাম, ইস্কুলেও যেতাম, ভালোই ছিলাম।

তারপর মাধ্যমিক পরীক্ষার পর বাড়ির লোক বলতে লাগল মেয়ে বড়ো হয়ে গেছে এবার বিয়ে দিতে হবে, তখন আমার মোটে সতেরো বছর বয়স। একেবারেই বিয়ের ইচ্ছে ছিল না, যে ছেলের সঙ্গে দেখাশোনা হয়েছিল তাকেও ভালো লাগেনি, বরং আশ্রমের মাসিদের যে নীতি সেইটা আমার খুব মনে ধরেছিল, ওরা যেভাবে অনাথ বাচ্চাদের দেখাশোনা করত, পড়াশোনা করাত, গান, নাচ, আঁকা, হাতের কাজ সব শেখাত আমাদের, সেটা আমার ভালো লাগত। আমি ওদের মতো হতে চেয়েছিলাম, বিয়ে না করে আমি ওই আশ্রমেই জীবন কাটাতে চেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম ব্রহ্মচারী হয়ে সমাজ সেবার কাজ করব। কিন্তু মা কিছুতেই শুনল না, ওই যে মায়ের সংসারের সাধ পূরণ হয়নি, ছোটবেলায় স্বামী মরে গেছে, আমাকে দিয়ে সেই আশা পূরণ করতে চেয়েছিল। তারপর আত্মীয়স্বজন সবাই বলতে লাগল মেয়ে বড়ো হচ্ছে, এখনই বিয়ে না দিলে কিছু একটা ঘটে গেলে কী হবে, মাথার ওপর বাবা নেই, এইসব বলে-বলে জোর করে আমার বিয়ে দিয়ে দিল। আশ্রমের মাসিরা মাকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মা শুনল না, ওই ছেলের সঙ্গেই আমার বিয়ে হয়ে গেল। ছেলেটা খুব খারাপ কিছু না, কিন্তু আমার মনের সঙ্গে মিল হয়নি, আজও হয়নি। একে তো আমাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ, তার ওপর যদি মনের মিলও না হয় তাহলে কতটা ভালো আর থাকতে পারি?

যে ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ে দেওয়া হল তাকে বিয়ে করতে চাইনি কারণ এদেশে তার আত্মীয় বলতে কেউ ছিল না। আমার মনে হয়েছিল যদি বিয়ে করে বাচ্চা করে তারপর আমাকে ছেড়ে চলে যায় তাহলে আমার অবস্থা আমার মায়ের থেকেও খারাপ হবে, বাবা মারা গেলেও বাবার দিকের লোকেরা তো মাকে দেখেছে, আমাকে কে দেখবে? একথা আমি গুরুজনদের বলেছিলাম, বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম যে বিয়ে করতে হয় করব, মার প্রতি আমার কর্তব্য আছে জানি, কিন্তু কিছুদিন পরে করব, আরেকটু বুঝেসুঝে করব, ঘর-পরিবার আছে এমন কাউকে করব। আমি তো ছোটবেলা থেকে কখনো পরিবার পাইনি, আমি সেইটা চেয়েছিলাম, কেউ আমার কথা শুনল না, আমার কথার কোনও দাম কেউ দিল না। আর আশ্রমে থাকলে আমি কত কাজ করতে পারতাম, লেখাপড়া তো শিখেইছিলাম, হাতের কাজও অনেক শিখেছিলাম, গান গাইতে পারতাম, কীর্তন করতাম। এসব করেও আমি নিজের জীবন চালাতে পারতাম, মাকেও দেখতে পারতাম। আঠেরো পেরোলে ব্রহ্মচারী হয়ে যেতাম, তাহলে ওখানেই থাকার ঘর পেতাম, আমার সারাজীবনের ভার আশ্রমই নিয়ে নিত। কোনোটাই হল না।

বিয়ের পর অবশ্য ওর বাংলাদেশের পরিবারের লোকজন এখানে এসেছে, আমিও গেছি, একরকম করে মানিয়ে-গুছিয়ে নিয়েছি, কিন্তু মন থেকে মিল হয়নি, আজও সেভাবে হয়নি। তবে জনমানসের ট্রেনিং করে করে কিছুটা ওকে বোঝাতে পেরেছি, একটু হলেও কাজ হয়েছে। রাগ আমারও আছে, খুব রাগ, আগে তো বুঝতাম না এত রাগ কেন, এখন জনমানসের সেশনগুলো করতে-করতে বুঝেছি যে ছোটবেলা থেকে এত না-পাওয়া, এত কষ্ট, সেই দুঃখগুলোই রাগ হয়ে বেরোয় ভেতর থেকে। প্রথম দিকে আমি মানিয়ে নিতেই পারতাম না, বিয়ের পরেও বেশ কয়েকবার পালিয়ে গেছি আশ্রমে, কাউকে কিছু না বলেই চলে গেছি, মাসিরাই বুঝিয়ে-বাঝিয়ে আবার পাঠিয়ে দিয়েছে। এমন কি প্রথম মেয়েটা জন্মাবার পরেও ভাবতাম চলে যাব, আশ্রমে আমার মেয়েকে দেখার লোক আছে, আমি কাজ করব আর ও ওখানেই থাকবে পড়াশোনা করবে, ঠিক বড়ো হয়ে যাবে। এরকম ভাবতাম, কারণ আমার সংসার করতে ভালোই লাগত না, শুধু শারীরিক সম্পর্ক দিয়ে কি আর সংসার হয়? মনের মিল যদি না থাকে? আর মা যে এত করে বিয়ে দিল, এখন আমার অবস্থা দেখে সারাক্ষণ কাঁদে, আজও মা লোকের বাড়িতেই কাজ করে খায়, সেখানেই থাকে, আমার কাছে থাকেও না।

একটা সময় আমি এমনকি মরবার চেষ্টাও করেছিলাম, বর আমাকে এত সন্দেহ করত, ঘর থেকে বেরতেই দিত না, বাঁচার ইচ্ছে চলে গেছিল আমার। তারপর আস্তে-আস্তে আমিও বুদ্ধি করে একটু-একটু বেরোতে লাগলাম, পৌরসভার সঙ্গে কাজ করতে লাগলাম, পাড়ায় সমাজসেবার কাজ শুরু করলাম। ও কিন্তু তাও মহিলা সমিতির মিটিঙেও গিয়ে উপস্থিত হত, দেখতে যেত আমি কোথায় যাচ্ছি, কী করছি। ওই পৌরসভা থেকেই জনমানস ট্রেনিঙের কথা প্রথম বলেছিল আমাদের, কী ট্রেনিং প্রথমে তো কিছুই বুঝিনি তারপর দুখু মিয়াঁ মঞ্চে যখন গেলাম, শুনলাম মনকে চিনুন, মনকে জানুন, নিজের মনের যত্ন নিন। এসব শুনে মনে হল যদি এই ট্রেনিংটার মাধ্যমে এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারি, আমি বোধহয় একটু হলেও নিশ্বাস নিতে পারব। তখন আমিও যে কখনো জনমানসের কাজ করতে পারব, কাজের বিনিময়ে কিছু পাব, এসব কথা মনের কোনাতেও আসেনি। এইটাই ভেবেছিলাম যে এরকম একটা সংস্থা আছে যারা শুধু মন নিয়েই কাজ করে? আমার মনের দুঃখকষ্টের কথা আমি তো কাউকেই প্রকাশ করে বলতে পারিনি, আর যদিও বা বলার চেষ্টা করেছি কেউ সে কথা শোনেওনি, এখানে হয়ত সেই কথাগুলো এবার বলতে পারব। যখন ট্রেনিং শুরু হল, যা বলা হত, করানো হত, সেসব শুনে আমার যে কী মনে হত আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না, মনে হত কেউ যেন আমার কথা শুনছে-বুঝছে, আমার মনের গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তখন বর যে অতসব বাজে কথা বলত, সন্দেহ করত, সেসব আর যেন গায়েই লাগত না। মনের মধ্যে কেবল ট্রেনিংএর কথাগুলো ঘুরত, কোন কথার পর কোন কথা হল, কীভাবে কিসের সঙ্গে কোনটাকে জোড়া হল, এইসব ভাবতাম আর মেয়েদের সঙ্গে সেই কথাগুলো বলতাম, যেভাবে বললে ওরা বুঝবে সেভাবে বলার চেষ্টা করতাম।

তারপর তো সেই ট্রেনিং শেষ হল, পরীক্ষা দিলাম, সিলেক্ট হলাম, কাউন্সেলিং ট্রেনিং হল তারপর, তখনও ভাবিনি এরপর কী হবে। কাউন্সেলিং ট্রেনিং চলছে যখন একদিন রত্নাদিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—এই যে আমরা এত ট্রেনিং নিচ্ছি, এই নিয়ে কি আমরা কাজটা করতে পারব? নিজের ইনকাম হবে? আমার নিজের ইনকাম করা খুব প্রয়োজন। আমি যদি নিজে কিছু করতে যাই, এমনকি মেয়েদের সাজার জিনিসও যদি কিছু কিনতে লাগে তাহলে ওকে বলতে হয়, ও বললে তবে সে পয়সা আমি খরচা করতে পারি। এইটা আমার ভালো লাগত না, মনে হত যদি আমি নিজে কিছু ইনকাম করতে পারি তাহলে বোধহয় আমার এই পরাধীনতাটা থাকবে না। আমি তো সারাজীবনই পরাধীন, আশ্রমে যখন ছিলাম তখনও ঘণ্টা ধরে সব করতে হত, না হলেই শাস্তি পেতাম, বেশি কিছু করলে আশ্রম থেকে তাড়িয়ে দেবে। আমার তো কেউ ছিল না মা ছাড়া, তাড়িয়ে দিলে যাব কোথায়? সেইজন্যে কোনোদিন একটু প্রেম করতেও সাহস পাইনি, কারও মুখের দিকে সোজাসুজি তাকাতেও ভয় পেতাম। জনমানসের কাজ করতে এসে শুনলাম যে আই কনট্যাক্ট রাখতে হবে, নইলে কাজ ঠিক হবে না, সেইটা আমি পারতাম না প্রথম দিকে।

আজ আমার কাছে টাকা থাকে, খরচ সংসারের কাজেই হয়, পয়সাটা বরের কাছেই থাকে, কিন্তু খরচের হিসাব আমি চাই, আমার টাকার হিসাব আমি চাই। আমি জানি যে আমি ইনকাম করছি তাই আমি বলতে পারছি যে এই টাকাটা দিয়ে এই কর, এইভাবে খরচ কর, এটা আমার টাকা, সারা মাস কষ্ট করে, খেটে আমি এই টাকাটা রোজগার করেছি। বর কিন্তু এখনও সন্দেহ করে, আগে তো প্রচুর পরিমাণে ফোন করে বিরক্ত করত, এখন যেহেতু ট্রেনিং নিয়েছি, মানুষকে কীভাবে কনভিন্স করতে হয় সেটা জানি, সেই হিসাবে কথা বলে-বলে একটু সহজ হয়েছে। আমি মনে করি আমার বর একজন ক্লায়েন্ট আর আমি তার কাউন্সেলর, সেইভাবে কথা বলে একটু এগিয়েছি। এরকম ক্লায়েন্ট তো আছে সত্যিই, এইরকম সমস্যা নিয়েই আসে অনেকে, তাদের যেভাবে বোঝাই, যেভাবে কথা বলি, বরের সঙ্গেও সেটা করেছি।

আমার নিজের রাগও কমেছে, সে ধরনের চরম রাগ আর হয় না। সিনেমা দেখতে খুব ভালবাসি আমি, যাত্রা, সিনেমা, এইসব বরকে সঙ্গে নিয়েই যেতে চাইতাম যাতে সন্দেহ না করে, কিন্তু ও আবার এইসব পছন্দ করে না, বলে ঘরোয়া মেয়েছেলেরা এসব জায়গায় যায় না। এই করে-করে আমার আর দেখা হত না কিছু, তখন আমি ঘরে টিভি কিনে নিয়েছি নিজের টাকায়, বাইরে যদি দেখতে যেতে না পারি তো ঘরে বসেই দেখব। আশ্রমে থাকতে গান শিখেছিলাম তো, এখন যা মনে আসে তাই গাই, নানাদিকের দুশ্চিন্তা যখন মাথায় আসে তখন একা-একা যা পারি তাই গান করি। জনমানসের সব কাজ করতে আমার ভালো লাগে, যখন মুখোমুখি বসে কাউন্সেলিং করি সেটাও ভালো লাগে, কিন্তু ওটা তো সম্পূর্ণ পেরে উঠি না, তাই একটু দুর্বলতা অন্তরে থেকেই যায়। কিন্তু বাইরের যে কাজ, মানুষের বাড়ি ভিজিট করা বা ক্যাম্প করা, সেগুলো করতে আমার খুবই ভালো লাগে। এখানে তো যে মনে করবে সে আসবে, আর ওখানে তো আমরা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে প্রতিটা মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারি, বোঝাতে পারি, তারা আবার এখানে, আমাদের সেন্টারেও আসে। অনেকেই বলে আমাদের ঘরে এরকম সমস্যা নেই, তখন আমরা বলি আপনার নেই হয়ত, কিন্তু জানাশোনা কারও তো থাকতে পারে। তারপর সমস্যাগুলো তাদের বুঝিয়ে বলি, সব সময় তো রোগটাই সমস্যা নয়, ধর মন খারাপ করে থাকা, সবসময় ঘরের মধ্যে সেঁধিয়ে থাকা, ছেলেরা হয়ত হঠাৎ করে খুব ড্রিংক করছে খুব, এগুলোও সমস্যা। তখন তারা অনেকে বলে—হ্যাঁ, এরকম তো হয়। এই রকম যখন কেউ বলে তখন খুব ভালো লাগে, যে একটা বড়ো কিছু ঘটে যাবার আগে আমরা সাহায্য করতে পারছি, যেটাকে কেউ সমস্যা বলে চিনতেই পারে না সেটাকেও ধরিয়ে দিতে পারছি, যাতে বাড়াবাড়ি রোগের পর্যায়ে চলে না যায়। এইটা আমার মনে হয় বড়ো একটা কাজ। তারপর এমন মহিলার সঙ্গেও কাজ করেছি যে একেবারে মানসিক রুগী হয়েই গেছিল, তাকে ওষুধ খাইয়ে, চিকিৎসা করে সুস্থ করতে পেরেছি, আগের জীবনে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি, তাতেও খুব ভালো লেগেছে। সব মিলিয়ে জনমানস আমাকে একটা নতুন মানুষ বানিয়ে দিয়েছে।

প্রভাতী রায়, বয়স চুয়াল্লিশ, দশম শ্রেণী, জনমানসে যোগ দিয়েছেন মে, ২০০৮।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%