ঝর্ণা

অমিতাভ চক্রবর্তী

খুব ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে গেছিল আমার, চোদ্দো বছর বয়সে, সবে ক্লাস এইটে উঠেছি, তখনই। কাটোয়ায় বাড়ি আমাদের, যেহেতু আমরা চার বোন, ঠাকুমা বলত বাবাকে—চার চারটে মেয়ে, সেয়ানা হবার আগেই পার করে দে। সেইভাবেই বিয়ে হয়ে গেল, কিন্তু এমন ছেলের সঙ্গে বিয়ে হল সে একেবারেই সুবিধাজনক নয়। মেদিনীপুরে শ্বশুরবাড়ি, তাদের বাড়িঘর মোটেই ভালো নয়। আমার বাবা রেশনের ডিলার ছিল, খাওয়া-পরার কোনও অভাব বুঝিনি বাপের বাড়িতে। এখানে এসে কিছুই মানিয়ে নিতে পারতাম না, তার মধ্যেই ছেলে পেটে এসে গেল, সেও তো প্রথমে বুঝতেই পারিনি কী হয়েছে। ছেলে হবার পর কলকাতায় চলে এলাম বরের কাছে, এসে দেখি অথৈ জল, কী করব, সংসার কেমন করে চালাব, ছেলে বড়ো করব কী করে, বুঝতেই পারতাম না। স্বামী পাম্প সারাবার কাজ করত, চারদিন ঘরে থাকত তো দশদিন থাকত না। এও বুঝিনি তার তলায়-তলায় অন্য মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। ছ’বছর বয়স হতে ছেলেকে খড়দায় রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনে ভর্তি করে দেওয়া হল, মিশনের অনাথ আশ্রমে রাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল আমার বাবাই। আমারও মনে হয়েছিল ভালোই হল, ওর বাবা তো কিছুই দেখাশোনা করে না, আর আমিও এত কিছু বুঝি না, ওখানে থাকলে লেখাপড়াও করবে, ভালো দেখাশোনা হবে, খরচও লাগবে না। আমি কলকাতা থেকে হপ্তায় হপ্তায় ছেলেকে দেখতে যেতাম, ওর বাবা কোনোবার যেত বা যেত না। আমি সেই সময় ঘরে বসে টুকটাক কাজ করতাম, পেনের মুখ লাগানো, এরকম সব ছোটখাট কাজ। বাবাও মাঝে মাঝে টাকা পাঠাত, কোনোমতে চালাতাম। আজ মনে হয় এইরকম যে জীবনটা হল আমার কে তার জন্যে দায়ী? কখনো মনে হয় বর দায়ী, ও ভালো লোক নয়, আমাকে দেখেনি, কোনও সাহায্য করেনি। আবার বাবা-মাকেও দায়ী করি মাঝে মাঝে, কেন তোমরা এমন ঘরে আমার বিয়ে দিলে, নিজে তো কিছুই বুঝতাম না, বিয়ে দিচ্ছে করেছি, হ্যাঁ বা না কিছুই বলিনি।

এইভাবে বেশ অনেকদিন চলেছিল তারপর আমি বাবাকে বলি আমাকে একটা ঘর করে দাও, এইভাবে ভাড়া ঘরে আমি থাকব না। বর তো কিছুই করবে না, গয়নাগুলো অবধি বেচে খেয়েছে। বাবা তখন কিছু টাকা দেয়, সব মিলিয়ে তেঘরিয়ার ভেতর দিকে জায়গা দেখে একটা পুরানো ভাঙা বাড়ি কিনে দেয়। ততদিনে আমার ছোটো বোনের বিয়ের হয়েছে, ওর বরের সাহায্যে আমি সিটি গোল্ডের ব্যাবসা শুরু করেছিলাম, একদিকে নিজের জায়গা হয়েছে, এই বাড়ি বাবা আমার নামেই করে দিয়েছিল, ছেলেও বড়ো হয়েছে অনেকটা, আমার মনে জোর হয়েছিল। কিন্তু বাড়িটা হবার পর থেকে বর যেন আরও অশান্তি বাড়িয়ে দিল, আমি সিটি গোল্ডের গয়না ডোর টু ডোর বিক্রি করতাম, ভালো রোজগার হত, আর ও সমানে ঝামেলা করত, এই তুই কোথায় যাচ্ছিস, কী করছিস, ঝাচ্ছেতাই কাণ্ড করত, তখন পাড়ার মহিলা সমিতি খুব হেল্প করেছে। পার্টির থেকেও ওকে শোধরাবার অনেক চেষ্টা করেছিল, কিছুতেই কিছু হল না। আমি মাঝে-মাঝে ভাবতাম এই লোকটার সঙ্গে থেকে কী হবে, কিন্তু বেরিয়ে যাবার সাহস পাইনি, ওই যে লোকে বলবে বর ছেড়ে দিয়েছে, সেটা তো লজ্জার কথা, ওই জন্য করে উঠতে পারিনি। নইলে ও যা অত্যাচার করেছে আমার ওপর, অন্য মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তো করেইছে, তার ওপর মারধর, কী না করেছে, কোনও খরচা অবধি দিত না। শেষ পর্যন্ত যখন জানলাম যে অন্য জায়গায় ওর বৌ আছে, মেয়ে আছে, ঘর-সংসার আছে, তখন পার্টির লোকেরাই ওকে বার করে দিল। আমার ততদিনে আরেকটা বাচ্চা হয়ে গেছে, প্রথমটার তেরো বছর পরে আরেকটা ছেলে হয়েছিল। আমাকে অনেকে বলেছিল কেস করতে, আমার মনে হল কী হবে? ওতো আর সরকারি চাকরি করে না যে আমি কিছু আদায় করে নিতে পারব, ঘাড় থেকে নামুক, এই ঢের। আমি ওকে একটু ভয়ও পেতাম, যদি খারাপ কিছু একটা করে, মেরে-টেরে দেয়, কি বিক্কিরি করে দেয়, এইসব ভাবতাম!

সিটি গোল্ডের ব্যবসা বেশ ভালোই চলছিল আমার, খুব খাটতাম, বাড়ি-বাড়ি ঘুরে বিক্কিরি তো করতামই, ঘরেও একটা শোকেস সাজিয়ে রেখেছিলাম, লোকে বাড়িতেও আসত। মহিলা সমিতি করতাম, পৌরসভার সঙ্গেও ছিলাম, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য হয়েছিলাম, এমনি করে চলছিল। পাড়ায় খুব পরিচিতি হয়েছিল, ডোর টু ডোর বিক্কিরি করতে-করতে ভালো জানাচেনা হয়ে গেছিল, তখন কাউকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, বাচ্চা হবে হঠাৎ ব্যথা উঠেছে, এসব খুব করতাম। ভালো লাগত, মনে হত বেশ একটা কাজের কাজ করছি, মানুষের কাজে লাগছি, সবাই ভালো বলছে, পরের উপকার করতে পারলে আমার দিনটা যেন ভালো যায়। বর তখনও মাঝে-মাঝে আসত, একটু হম্বি-তম্বি করত, পার্টির কাজে হয়ত রাত ন’টা বেজেছে, অমনি বলত—কার সঙ্গে কী করছিলে, কোন দাদার সঙ্গে তামাশা করছিলে না চা খাচ্ছিলে? আমিও ততদিনে শক্ত হয়ে গেছি, বলতাম—তামাশাও করতে পারি, চাও খেতে পারি, কাজও করতে পারি, তোমার তাতে কী? তখন চুপ করে যেত। আমি তখন খুব মহিলা সমিতির কাজ করতাম, পার্টির কাজ করতাম, সেখানে অনেকেই কথা বলত, চা-বিস্কুট খাওয়াত, গল্প আড্ডা হত, কিন্তু কারও সঙ্গে কিছু করতে মোটে ইচ্ছেই করেনি। ব্যাটাছেলের প্রতি যেন ঘেন্না এসে গেছিল। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে, সে যদি চাইত তাহলে কারও সঙ্গে সম্পর্ক করতেও পারত, তাতে কোনও দোষ দেখি না আমি। এতে তারও খিদে মিটত, আর অন্য লোকটাও তাকে ভালোবেসে ভালো থাকত। কিন্তু আমার জীবনে এরকম হয়নি, আমার ভেতর থেকেই কাউকে চায়নি, ভেবেছিলাম ছেলেদুটোকে নিয়েই জীবন কাটিয়ে দেব।

এমনি করে পৌরসভা থেকে একদিন আমার নামে চিঠি এল যে জনমানস ট্রেনিং হবে, সাত মাসের ট্রেনিং। তখনও জানি না, কিসের ট্রেনিং, কী বৃত্তান্ত, তার আগে আমাদের একটা জুটের ট্রেনিং এসেছিল, আর মোমবাতি বানাবার। সেগুলোতে আমি যাইনি, তখন ভালো ব্যবসা হচ্ছিল, আমার অত সময়ও ছিল না। কিন্তু কপাল আমার যাবে কোথায়, আমার বড়ো ছেলেটা মাধ্যমিক পাশ করে ওর বাবার পাম্প লাইনের কাজ শুরু করেছিল, সেই কাজ করতে যাচ্ছিল, এমন সময় একটা লরির সঙ্গে ওর বাইকের ধাক্কা লেগে বড়ো অ্যাকসিডেন্ট হয়ে গেল। বাঁচার আশা ছিল না, সেই ছেলেকে ভালো করতে গিয়ে আমার সর্বস্ব গেল, ওর বাবা তো একটা পয়সাও ঠেকাল না, আমার বাপের বাড়ি, আমি আর আমার পার্টির লোক মিলে ছেলেটাকে মরণের মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলাম। ওইসময় থেকেই ব্যবসাটা পড়ে গেল, মূলধন নষ্ট হয়ে গেল, আমিও হাসপাতাল বাড়ি করতে-করতে সময় দিতে পারছিলাম না। এখন টুকটাক করছি আবার, কিন্তু সেই যে ভালো করে ফেঁদে বসেছিলাম, সে আর হল না। এর মধ্যে আমার স্বামীও মারা গেল, এখানেই ছিল সেসময়, ও তো কখনো-কখনো আসত এখানে, তারমধ্যেই আচমকা স্ট্রোক হয়ে গেল, মারা গেল। ওর অন্য যে সংসার ছিল, সেই বৌ, সেই মেয়ে, তারাও এসেছিল, সেও তো কিছু জানত না আমাদের কথা, আমার বর যেমন আমাকে অন্ধকারে রেখেছিল, তেমনি তাদেরকেও।

জনমানসের ট্রেনিংটা নিতে নিতেই আমি কিছু-কিছু কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম, আমি তো আগে থেকেই ডোর টু ডোর যেতাম সিটি গোল্ডের জিনিস বেচতে, অনেক মানুষকে চিনতাম, তখন যদি কাউকে দেখতাম ‘পাগল’, তখন তো অতো জানতাম না যে পাগল বলা যায় না বা কী, ওইভাবেই ভাবতাম, তো তাকে নিয়ে হাসপাতালে যেতাম। এরকম করে অনেক কাজ করেছি, দু-তিনজনকে এভাবে খানিকটা ভালোও করেছি। চাকরি করত কেউ, সে চাকরি ছেড়ে ঘরে বসে ছিল, হাসপাতালে দেখাতে, ওষুধ খাওয়াতে, বেশ সুস্থ হয়ে গেল, তখন খুব ভালো লাগত। জনমানসের প্রথম ট্রেনিং শেষ হল, সব কিছু যে তখনই খুব ভালো বুঝেছিলাম তা নয়, অনেক সময় দিদিদের জিজ্ঞেস করতাম, এটা কেন হচ্ছে, ওটা কেন করছি। একটু-একটু করে বুঝতে-বুঝতে গেছি, ক্যাম্পের কাজ, ফিল্ডের কাজ, সচেতনতার কাজ, এগুলো আস্তে-আস্তে বুঝতে-বুঝতে গেলাম। কোথায় ক্যাম্প করলে কতটা কাজ হবে, কার সঙ্গে কথা বললে কাজ হবে, কীভাবে মানুষকে সচেতন করতে হবে, প্রচার করতে হবে, মানসিক স্বাস্থ্য জিনিসটা কী, কেন সেটা জানা জরুরি, যেমন স্বাস্থ্যকর্মীরা বাচ্চাদের পোলিও দিতে যায়, তেমনি আমরাও যাচ্ছি, এগুলো নিজেও যেমন বুঝতে-বুঝতে গেছি তেমনি আরও মানুষকে বলতে বলতে গেছি। বাড়ি-বাড়ি ঘুরে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি কারও মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে এসেছে কারও সঙ্গে কথা বলে না, ঘরের মধ্যে ঢুকে বসে থাকে, অন্যরকম আচরণ করছে, তবু তারা ডাক্তার দেখাবে না, পীরবাবার কাছে নিয়ে যাবে, জলপড়া খাওয়াবে, তবু ডাক্তার-হাসপাতাল করবে না। তখন বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সেই মেয়েকে পাভলভ হাসপাতালে দেখিয়ে তাকে ভালো করে ঘরে নিয়ে এসেছি।

এইভাবেই জনমানসের কাজ করে যাচ্ছি। আমার বাড়ি-বাড়ি ঘুরে কাজ করতে ভালো লাগে আর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, ডাক্তার দেখানো, এগুলোও। তাছাড়া যখন ক্যাম্প করা বা মোবাইল কিওস্ক করবার জন্যে অন্যান্য ওয়ার্ডে গিয়ে কথা বলতে হয়, ওয়ার্ড কাউন্সিলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সব ব্যবস্থা করতে হয়, সেটাও আমি ভালো পারি, কারণ আমাকে তো অনেক লোক আগের থেকেই চেনে, পার্টি করতাম, মহিলা সমিতি করতাম, তারপর সিটি গোল্ডের কাজের জন্যও অনেক চেনাশোনা আছে, এসব কাজ আমি পারিও ভালো, আর করতে ভালও লাগে। আমি কিওস্কের সেন্টারেও বসি, কাউন্সেলিংএও বসি, তবে বেশি কথা বলি না, শুনি বেশি। এইটা জনমানসে এসে হয়েছে, আগে তো লোকের কথা পুরো শুনতাম না, বিশেষ করে যেসব কথা শুনতে ভালো লাগত না সেসব শুনলেই রেগে যেতাম, চিৎকার চেঁচামেচি করে ফেলতাম। এখন কিন্তু সব কথা শুনি, ভালো লাগুক না লাগুক, মন দিয়ে শুনি, বোঝার চেষ্টা করি। রাগ তো অনেকটাই কমে গেছে এখন। আগে যেমন মহিলা সমিতি করতাম তাতে লোক ডাকত, চিনত, সাহায্য চাইত—এখন জনমানস কর্মী হিসেবেও লোক চেনে, সাহায্য চায়, এটা আমার খুব ভালো লাগে। যদি ফান্ড নাও থাকে, টাকা যদি নাও পাই, এই কাজ আমি কিন্তু করে যাব। লোকে আমার ওপর নির্ভর করে, তাদের আমি বলতে পারব না যে আমাদের ফান্ড নেই তাই সেন্টার বন্ধ হয়ে গেছে, আর কাউকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারব না। মানুষ আমার ওপর ভরসা করে, শুধু মানসিক রোগ বলে তো নয়, কারও বাড়ি ঝগড়া-অশান্তি হলেও আমাকে ডাকে কথা বলার জন্য, মিটিয়ে দেবার জন্য, এটা কি কম কথা? এর মধ্যেও তো মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপার আছে। জনমানসের কাজের বিচার তো শুধু সেন্টারে ক’জন ক্লায়েন্ট এল সেইটা ধরে হবে না, পাড়ায়-পাড়ায় যতক্ষণ না প্রচার হচ্ছে, মানুষজন যতক্ষণ না সচেতন হচ্ছে ততক্ষণ আমাদের সাফল্য হবে না। আর রাজারহাট খুব বড়ো জায়গা, সব জায়গায় পৌঁছনো সহজ নয়, আরও অনেক সময় লাগবে আমাদের।

ঝর্ণা দে, বয়স তিপ্পান্ন, অষ্টম শ্রেণী, জনমানসে যোগ দিয়েছেন মে, ২০০৮।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%