কবিতা

অমিতাভ চক্রবর্তী

আমার বছর তিনেক বয়সে মা মারা গেছিল, তার কথা কিছুই আমার মনে নেই। বাবা আবার বিয়ে করে, নইলে সংসার কে দেখবে। এই মা এমনি খারাপ ছিল না, তবে বাবা যা বলত তাই করত, নিজের যে একটা মত বা স্বাধীনতা, সেসব কিছু ছিল না। আমার জন্ম তো বাংলাদেশে, সেখানে পাঠশালায় পড়াশোনা করতাম। আমার একটা বড়ো দাদা ছিল, সে যখন ক্লাস সেভেনে পড়ে তখন এক আত্মীয়ের সঙ্গে ভারতে চলে এসেছিল কাউকে কিছু না জানিয়ে। তাতে বাবা খুব রেগে গেছিল, বড়ো ছেলে না বলে চলে গেল! সেই থেকে বাবা বলতে শুরু করল—আর কাউকে বাড়ি থেকে বেরতেই দেব না, লেখাপড়াও করতে হবে না, কিছু না। আমি তখন ফাইভে পড়ি, পড়া বন্ধ করে দিল আমার। তখন খুব কেঁদেকেটে বাবাকে বললাম, পড়তে দাও বলে খুব কাকুতিমিনুতি করলাম, বাবার সেই এক কথা, মেয়েমানুষ, দুদিন পরে বিয়ে দিয়ে দেব, পরের ঘরে যাবে, এত লেখাপড়া কিসের? এদিকে আমার তো খুব পড়াশোনার ইচ্ছা, সেই ছোটো বয়স থেকেই আমার খুব পড়াশোনার ইচ্ছা ছিল। বাবা রেগেমেগে বলল বেতন দেবে না, ইস্কুলে যদি যাও তো নিজের খরচ নিজে জোগাড় কর। ভেবেছিল আমি ছোটো মানুষ কোথা থেকে খরচা জোগাড় করব, আমি কিন্তু ইস্কুলের মাস্টারদের সঙ্গে কথা বলে, বেতন না দিয়ে, পাড়ায় আমার যে বন্ধুরা ছিল তাদের কাছ থেকে বইখাতা জোগাড় করে পড়া চালিয়ে গেছি। এমন কি মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্যে যে রেজিস্ট্রেশন করাতে হয়, টাকা লাগে, সেও আমাদের ইস্কুলের হেডস্যার দিয়েছিলেন, এমনি করে পড়া চালিয়েছিলাম। উঁচু ক্লাসে উঠে যাবার পরে পাঠশালায় বাচ্চাদের পড়াতাম, সেখান থেকে যা পেতাম সেই দিয়ে বইখাতা কিনতাম। এত কান্ড করে মাধ্যমিক পাশ করেছি, তারপর পশুচিকিৎসক হবার জন্যে এন্ট্রাস পরীক্ষাও দিলাম, সারা জেলার মধ্যে আমি প্রথম হয়েছিলাম।

কিন্তু এর মধ্যেই বাবার এক চেনা মানুষ তার ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ের সম্বন্ধ করল, সেই নিয়ে ঘরে খুব অশান্তি হল। পাড়ার লোক বলল আমি ছেলেটার সঙ্গে সম্পর্ক করেছি, ছেলের বাবা যেহেতু বাবার চেনা, তাই আমি নাকি সেই ছেলের সঙ্গে আগে থেকেই কিছু করেছি। বাবা তো মাথাগরম লোক, সেই নিয়ে খুব অশান্তি করতে লাগল, আমাকে দাদার কাছে কলকাতায় পাঠিয়ে দিল, ততদিনে দাদার সঙ্গে আমাদের ফিরে যোগাযোগ হয়েছে। এবার সেই ছেলেটাও তো কলকাতাতেই থাকত, সে এসে এখানে দাদার সঙ্গে যোগাযোগ করল, খুব আসা-যাওয়া করতে লাগল, আমারও মনে হল তবে বিয়েই করেইনি, ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। সেই করতে-করতে আমার বিয়ে হয়ে গেল, পড়াশোনা আর হল না। এত কিছু যে ভেবেছিলাম, লেখাপড়া করে দাঁড়াব, কাজ করব, সব নষ্ট হয়ে গেল। ছেলেটা অবশ্য প্রথম দিকে খুবই ভালো ছিল, আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করত, সংসারে আমরা দুজনই শুধু ছিলাম, ভালোই ছিলাম। কিন্তু বিয়ের পাঁচ বছর অবধি আমার বাচ্চা হয়নি, সেই নিয়ে কিছুদিন পরে ও খুব অশান্তি শুরু করল, বাচ্চা কেন হচ্ছে না বলে। এখন তো অনেক কিছু জানি, বাচ্চা যে পুরুষের দোষেও না হতে পারে সেসব জানি, অনেক কিছু বলতে-করতে পারি, তখন তো কিছু জানতামও না, জানলেও বলতে পারতাম না, কেবল কান্না করতাম। এক তো বাচ্চা হচ্ছে না বলে ভিতরে যা জ্বালা-পোড়া সে হতই, আবার ভাবতাম বাইরের লোক কিছু বোঝে নাকি, জানে নাকি, ঘরের অশান্তি বাইরে চলে যায় নাকি। কান্না এলেও মুখে কাপড় দিয়ে ভেতরে বসে থাকতাম, ভাবতাম কার কাছে কাঁদব, না আপন বলতে আমার কেউ আছে, না ওর। এমনি করে তিন বছর কেটেছিল, তারপর আমার ছেলে হতে একটু ঠিক হল, তার পরপর আরও দুটো মেয়ে হল। তখন আবার সংসারে অভাব দেখা দিল, তিনটে বাচ্চা পরপর বড়ো হচ্ছে, চালাতে পারছে না, সেই নিয়েও অশান্তি হতে লাগল। কিন্তু সে তো আমাকে বাইরে কোনও কাজ করতে দেবে না, ঘরে বসে একটু টিউশন করতাম আমি, তাতে আর কী আয় হয়, ওর সেই এক কথা ছিল—যা আনব, তাই খাবে, ঘর থেকে বেরোবে না। আমি মনে-মনে কেবল ভাবতাম ছেলেমেয়েগুলোকে মানুষ করব কেমন করে? ওদের তো লেখাপড়া শেখাতেই হবে, কী করে করব? শেষে আমাদের যে পৌরসভার কাউন্সিলার ছিল তাকে বললাম আমাকে কোনো একটা কাজ দিন, ছোটোখাটো যা হোক কাজ, আমাকে টাকা রোজগার করতেই হবে। তখন আর আমি অত বরের কথা মানি না, সংসার চালানো, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানো, এইটাই বড়ো হয়ে উঠেছে তখন। কাউন্সেলার আমাকে টুকটাক কাজ দিয়েছিলেন, মাঝে-মাঝে সর্বশিক্ষা অভিযানের কাজ করতাম, বয়স্ক শিক্ষার কাজ করতাম আর স্বনির্ভর গোষ্ঠীতেও ভর্তি করে দিয়েছিলেন।

আমি তো এমনিতেই সামাজিক কাজে থাকতাম, পৌরসভার থেকে অনেকগুলো ট্রেনিং পেয়েছিলাম, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বাচ্চাদের দেখাশোনার ট্রেনিংও একটা নিয়েছিলাম অলকেন্দু বোধ নিকেতন থেকে, আমার বর ওই কাজ করতে দিতে চায়নি। এমনি করে চলছিল। যখন এই জনমানসের ট্রেনিংএর ডাক এল তখন চেয়ারম্যান স্যার আগে থেকেই আমাকে একটু বুঝিয়েছিলেন ট্রেনিংটার বিষয়ে, সেইটা আমি বরকে বলেছিলাম। আমার বর প্রথম থেকেই এই কাজটার ব্যাপারে রাজি ছিল, ওর খুব সায় ছিল, বলেছিল—এইটা বেশ ভালো কাজ, অন্যরকম কাজ বলে মনে হচ্ছে। তারপর তো ট্রেনিং শুরু হল, ট্রেনিং করতে-করতেই দেখছিলাম আমার মনের মধ্যেকার যে দুঃখ, চিন্তা, উদ্বেগ, সব যেন কেমন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে, মন খুব হালকা লাগত, তখন কিন্তু আর পয়সার কথা ভাবতাম না, ট্রেনিং করে কাজ পাব কিনা, রোজগার হবে কিনা, তখন আর সেসব মনে আসত না। মনটা এত ভালো হয়ে গেছিল, মনে হত যেন কী একটা দারুণ জিনিস পেয়ে গেছি, মনে হত যা হয় হোক, এই ট্রেনিংটা আমাকে ভালো করে করতেই হবে, আর কিছু হোক না হোক আমি নিজেকে তো ভালো রাখতে পারছি। ট্রেনিং নিতে-নিতেই, সেই প্রথম অবস্থাতেই, আমার চোখের সামনে ভেসে উঠত পাড়ার কয়েকজন মানুষের মুখ, তারাও তো এইরকমই, এইরকমই আচার আচরণ করে, সবাই তাদের দূরদূর করে, অত্যাচার করে, পাগল বলে, তারা তো একদম অবহেলিত, কী পরিবারে আর কী সমাজে, তাদের কোনও জায়গা নেই। মনে হয়েছিল এদেরও তো তাহলে সারিয়ে তোলা যায়, কেউ তো এদের মানুষ বলে গণ্যই করে না, ভাবেই না যে এটা একটা রোগ, চিকিৎসা করলে ভালো হয়ে যাবে। তখন আমাদের পাড়ার মহিলা সমিতির সঙ্গে আলোচনা করে, আমি আর আমার সঙ্গেই জনমানসের ট্রেনিং নিচ্ছে যারা তেমন কয়েকজন মিলে পাড়ার এই কজন মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। এটা একেবারে প্রথম দিকের ট্রেনিং চলাকালীনই হয়েছিল, তখনও আমি কাউন্সেলিং কী সেসব জানিনা, সবে মানসিক রোগের বিষয়টা একটু-একটু বুঝছি, বেশি কিছু শিখিওনি। তবু মনে হয়েছিল এমন একটা কাজ আমাদের করতে হবে যাতে সমাজের মানুষের চোখ খুলে যায়। যাকে প্রথম পাভলভে নিয়ে যাই চিকিৎসার জন্য তার খুবই খারাপ অবস্থা ছিল, কিন্তু ওষুধ পড়তে আস্তে-আস্তে সে ভালো হয়ে উঠেছিল, তাতে পাড়ার লোকেরও খুব বিশ্বাস জন্মেছিল যে এরা ভালো হয়। আমাদের ওপরেও ভরসা হয়েছিল পাড়ার লোকের, যে আমরা এরকম কিছু একটা কাজ ভালো করে করতে পারি। পৌরসভার কাউন্সিলার দাদা তখন আমাদের অ্যাম্বুলেন্স গাড়ি দিয়েছিলেন, নইলে ওই রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যেত না। কাউন্সেলারকে আমরাই বোঝাই, যেটুকু শিখেছিলাম সেটুকু দিয়েই বুঝিয়েছিলাম, এটা একটা রোগ, চিকিৎসা হয়, এই মানুষদের চিকিৎসা পাবার অধিকার আছে। উনিও বুঝেছিলাম যে কাউন্সেলার হিসাবে এটা ওনার কর্তব্য, তাই সাহায্য করেছিলেন। এই কাজটা করতে পেরে আমার খুব ভালো লেগেছিল, মানুষ যেখানে চোখ অন্ধকারে বুজে বসেছিল, সেই মানুষ যে চোখ খুলে তাকিয়েছে, এইটা খুব বড়ো পাওনা আমার। এই কাজটা সমাজে খুবই দরকার, এইটা আর পাঁচজনকেও বোঝাতে পেরেছি।

এখন তো অনেকেই জানে জনমানস কী কাজ করে, আমি কী কাজ করি, এখন তো অনেক সময় লোকে বাড়িতে চলে আসে যে এরকম কেউ আছে তাকে হাসপাতালে নিতে হবে, বা চিকিৎসা করাতে হবে, সাহায্য চাই বলে। এখন আশের-পাশের লোকও অনেক সচেতন হয়েছে, আমরাই করেছি। বাড়ি-বাড়ি গিয়ে, তারপর ক্যাম্প করে, অনেক সচেতনতা করেছি। লিফলেট বিলি করি তো আমরা, সেখানে ফোন নম্বর থাকে, লোক সেখানে ফোন করেও কথা বলে, খবর দেয়। আমরা যখন জনমানসের ট্রেনিং নিয়েছিলাম একশজনের বেশি, তার মধ্যে কিওস্কে কাজ করার জন্যে প্রথমে বেছে নেওয়া হয়েছিল ছ-জনকে, তারপর আরেকজন এসেছে। কিন্তু আমি বলব এই যারা কিওস্কে কাজ করছে না, যারা শুধু ট্রেনিংটাই পেয়েছে, তাদের জন্যও কিন্তু এই ট্রেনিংএর দাম আছে। এটা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে, নিজের দিকে তাকাতে শিখিয়েছে, অধিকারের কথা শিখিয়েছে, নিজেকে ভালো রাখব কীভাবে, অন্যকে ভালো রাখতে গেলে আগে কেন নিজেকে ভালো রাখা জরুরি, এসব শিখিয়েছে। ছেলেমেয়ে মানুষ করার কথাই যদি বলি, আমার নিজের মনের জোর না হলে সেটাই বা কেমন করে করব? দরকার হলে স্বামীর ওপরেও তো কথা বলতে হবে, নিজের অধিকারের বিষয়টা না বুঝলে সেটাই বা কেমন করে বলব? মনের মধ্যে সবসময় উদ্বেগ থাকলে তো হবে না। আর আমি যে সময় থেকে অসুস্থ মানুষগুলোকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে শুরু করেছিলাম তখন তো জানতামও না আমাকে কী কাজ করতে দেবে, আদৌ আমাকে কিওস্কে কাজ করার জন্যে বাছা হবে কিনা, টাকাপয়সার কথা তখন কিছু ভাবিইনি, নিজের তাগিদেই যা করার করেছি। টাকার দরকার আমার ছিল, সে তো থাকবেই, কিন্তু এত ভালো একটা ট্রেনিং, এত ভালো কাজ, কোনও জায়গায় আমি এরকম জিনিস পাইনি, কেউ এরকম কথা বলেনি, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টা নিয়ে কেউ কোনোদিন কিছু বোঝায়নি। আমাকে কিওস্কে না নিলেও আমি এই কাজ করে যেতাম, যতদূর সাধ্য করতাম। এখন তো আমার অবস্থা একটু ভালো হয়েছে, ছেলে কাজ করছে, এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছি, ছোটো মেয়ে ইতিহাসে অনার্স নিয়ে পড়ছে, আমিও রোজগার করছি জনমানসের থেকে, স্বামী মারা গেলেও সংসার ঠিক চলছে।

জনমানসের সঙ্গে যবে থেকে যুক্ত হয়ে কাজ করছি, আমার মনে অনেক জোর এসেছে। আমি তো একটা সময় কিওস্কে যাবার আগে এক বাড়িতে রান্নার কাজ সেরে তবে অফিসে ঢুকতাম। সেই নিয়ে স্বামী যা খুশি বলত, শুনতাম না আর, ততদিনে মনে জোর এসে গেছে, নিজেকে ভালো রাখার দায়িত্ব নিজের। সেই সঙ্গে মনে-মনে ঠিক করে নিয়েছিলাম যেভাবে হোক ছেলেমেয়েদেরও মানুষ করতে হবে, যে কষ্ট আমি পেয়েছি, ওরা যেন পড়াশোনা করতে গিয়ে এত কষ্ট না পায়। স্বামী বেঁচে থাকতে নানা সমস্যা করত, আমার বেরোনো নিয়ে, মেয়েদের বেরোনো নিয়ে অনেক অশান্তি হত। বড়ো মেয়ের অতো মাথা ছিল না, আঠেরো হতে বিয়ে হয়ে গেল, ছোটো মেয়ে কিন্তু মাধ্যমিকে পাঁচটা লেটার পেয়েছে, একটা টিউশনি লাগেনি। তাকে লেখাপড়া করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায়? আমি রোজগার করে ওকে পড়াব, যতদূর যাওয়া যায়, যাব।

কবিতা মণ্ডল, বয়স পঁয়তাল্লিশ, মাধ্যমিক পাশ, জনমানসে যোগ দিয়েছেন মে, ২০০৮।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%