জাপানী

অমিতাভ চক্রবর্তী

আমার ছোটবেলা এমনিতেই আনন্দেই কেটেছে, কিন্তু আমার মা খুব রাগী ছিলেন, বাবা জাহাজে চাকরি করতেন ফলে মাকে একলাই সংসার সামলাতে হত, আমাকেও খুব রেসট্রিকশনে থাকতে হত। অথচ অনেক ছোটো থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল স্বাধীনভাবে চলব, আমি বিধিনিষেধ মানতাম না। আমাকে আমার মতো থাকতে দিলে কোনও সমস্যা হত না, কিন্তু মা যেহেতু খুব রাগী, খুব শাসন করত, আমাকে সব কিছুতে মানা করত, তাইতে আরও বেশি ঝামেলা হয়ে যেত। শুনেছি আমি খুব দুরন্ত ছিলাম, মা ভয় পেত যে কখন কোন বিপদ হয় তাই হয়ত এত শাসন করত, আমার ভাইও খুব দুরন্ত ছিল কিন্তু মারটা আমি বেশি খেয়েছি, হয়ত বড়ো বলে, কিম্বা মেয়ে বলেও হতে পারে। আর ভাইয়ের মধ্যে তো জন্ম থেকেই অ্যাবনর্মালিটি ছিল সেইজন্য মা ওকে নিয়ে খুব চিন্তায় থাকত। জনমানস ট্রেনিং করতে গিয়ে নিজেদের জীবন নিয়ে ভেবেছি যখন, তখন বুঝেছি হয়ত মায়ের নিজের জীবনটা এতই খারাপ ছিল যে সেইজন্যই আমার ওপর মায়ের অন্যরকম রাগ ছিল, হয়ত মেয়ে জিনিসটার ওপরেই মায়ের বিতৃষ্ণা ছিল।

ক্লাস সিক্স নাগাদ আমি একটা কাজ শুরু করি, আমাদের একটা পোলট্রি ছিল, বাবা একজন আত্মীয়কে সেটা দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিল, সে কিছুই করত না, তো আমি সেই পোলট্রি দেখাশোনা শুরু করেছিলাম। আমার বয়স তখন বারো হবে, ইস্কুল যেতাম, পোলট্রিও করতাম। সবাই সাহায্য করত, নইলে পড়াশোনা আর ব্যবসা একসঙ্গে চালাতে পারতাম না। ক্লাস টেন পর্যন্ত এটা চালিয়েছিলাম, মাও আস্তে আস্তে আমার ওপর ভরসা করতে শুরু করেছিল। আমার কিন্তু এরপরেও মায়ের প্রতি রাগ না বিরক্তি জানিনা, একটা কিছু অসুবিধা থেকেই গেছিল, কোনও কথা আমি মায়ের সঙ্গে শেয়ার করতে পারতাম না, যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু সামনে থাকতাম, মায়ের কাছ থেকে সরে যেতে পারলেই যেন আমি বাঁচি। মায়ের তুলনায় বাবা এইটুকু ভালো ছিল যে মারত না, তার বেশি কোনও সম্পর্কই তো হয়নি। মনের কথা বলার মতো কোনও জায়গাই ছিল না, আর বলার মতো কথাও আমার কিছু থাকত না, এত পরিশ্রম করতাম সারাদিন যে তারপর আর ভাবার মতো বলার মতো কিছুই থাকত না। বিছানায় পড়তাম আর ঘুমোতাম। তবে বাবা জাহাজ থেকে ভালো ভালো জামাকাপড় আনত, সব ছেলেদের ড্রেস, কিন্তু আমার সেগুলো খুব পছন্দ ছিল। বাবা আনত বলে মা আপত্তি করতে পারত না, পাড়ার লোক কথা শোনাত কিন্তু আমি সেসব এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বার করে দিতাম। ছেলেদের ড্রেস আমার খুব ভালো লাগত। যদি কোনোদিন মা খুব অশান্তি করত, কি মারতে আসত, আমি তখন পালিয়ে গিয়ে আমাদের পাড়া পেরিয়ে যে ধানক্ষেত ছিল, সেইখানে চলে যেতাম। ধানের শিষের ওপর দিয়ে হাওয়া বইত, সবুজ গাছগুলো মাথা দোলাত, ওই দেখতে খুব ভালো লাগত, মন ভালো হয়ে যেত। কিম্বা আমগাছে চড়ে, মোটা একটা ডালের ওপরে চুপচাপ শুয়ে থাকতাম, মন শান্ত হয়ে যেত একেবারে। আমি কোথায় শুয়ে আছি, কতক্ষণ, কখন বাড়ি ফিরব, ফিরলে কী হবে, এসব কথা মনেই আসত না। আমার জীবন এরকম আগাছার মতো ছিল, আমি জীবনকে গোছাতে শিখিনি, সেদিনও না, বোধহয় আজও না।

উচ্চমাধ্যমিক অবধি পড়েছি আমি, মাধ্যমিকের সময় থেকেই পোলট্রির ব্যবসা উঠে গেল, আমি আর পরিশ্রম করতে পারছিলাম না। কিন্তু হাত খরচ কোথা থেকে আসবে? কোচিংএর খরচ কোথা থেকে আসবে? তখন শুরু করলাম টিউশনি, বাড়িতে কয়েকজনকে পড়াতে শুরু করলাম, ওই দিয়ে নিজের পড়ার খরচ চালাতাম। কারণ মা পরিষ্কার বলেই দিয়েছিল—তুমি দিগ্‌গজ হবে আর আমি খেটে মরব? তাই বাড়ির কাজ, গরুর কাজ, সব করতে হত, নিজের খরচও নিজেকে জোটাতে হত। তারপর আরও একটা কান্ড হল, মাধ্যমিকের সময়ও পরীক্ষার ঠিক আগের দিন মায়ের শরীর খারাপ হয়ে হাসপাতালে গেল, উচ্চমাধ্যমিকের সময়ও ঠিক তাই হল, আর উচ্চমাধ্যমিকে আমি ইংরেজিতে ব্যাক পেয়ে গেলাম। কী যে রাগ হয়েছিল তখন, মনে হল ধুত্তেরি, আর পড়বই না। ওটা যে কত বড়ো একটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল সে তো তখন বুঝিনি! এর মধ্যেও আমি টিউশনির টাকা জমিয়ে শর্টহ্যান্ড টাইপিং শিখছিলাম, কিন্তু তখন আত্মীয়স্বজন মিলে বাবাকে বলতে লাগল—মেয়ের বিয়ে দাও, পড়াশোনা তো আর করছে না, বয়সও হয়েছে, এবার বিয়ে দিয়ে দাও। আমাকে বলত—কীরে তোর মা কি তোকে শাড়ি পরাবে না? আমি মেয়েদের জামাও পরতাম, কিন্তু কেমন যেন বাধ-বাধ লাগত, গেঞ্জি-প্যান্ট পড়লে যে রকম সহজ লাগে সেরকম লাগত না, তো ওরা ওইসব তুলে কথা বলতে লাগল। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিল, একজনের সঙ্গে তার মধ্যেই একটু বেশি ভাব ছিল, কিন্তু তার মানে তাকে বিয়ে করব বা প্রেম, ওসব কিছু না। আমরা পুকুরপাড়ে বসে পা দুলিয়ে খুব গল্প করতাম, সেইটা ভালো লাগত, তাতেও কথা হতে লাগল। শুরু হল সম্বন্ধ দেখা, এক জায়গায় বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। আমি একেবারেই বিয়ে করতে চাইনি, আমি ছেলেদের ওপর সবসময় খুব বিরক্ত হয়ে থাকতাম, মনে হত ওরা সব করতে পারে, সব জায়গায় যেতে পারে, মেয়েদের শতেক বাধা, বাপের বাড়িতেই এত বাধা আর শ্বশুরবাড়ি গেলে তো আর কথাই নেই। আমি ওই বাধাবন্ধ চাইনি, কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে তো কিছু একটা করতে হবে, সেই সময়টা আমাকে কেউ দিল না, বিয়ে হয়ে গেল।

বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে গিয়েও আমার একেবারেই ভালো লাগেনি, টালির বাড়ি, বস্তির মধ্যে, আমি খুব দুঃখ করে মাকে বলেছিলাম—এইরকম বাড়িতে আমার বিয়ে দিলে কেন? তাতে মা বলেছিল—তোর না পায়ে সাদা দাগ, কোনও ভালো বাড়িতে তোর বিয়ে হত? আমার শ্বেতি আছে, সেইটা তুলে মা এইকথা বলেছিল। সেই অবধিও মানিয়ে নিয়েছিলাম কিন্তু যার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল অন্য মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল, সেইটা আমি মেনে নিতে পারিনি। সেটাও নিজেদের পরিবারের মধ্যেই, আমার শ্বশুরবাড়ির লোক এ কথা জানত, তার ওপর প্রলেপ দেবার চেষ্টা করত। ওদিকে আমার বাপের বাড়িতে সবাই বলত আমি এত ডাকাবুকো যে সংসার করা আমার দ্বারা হবে না, শ্বশুরবাড়ির লোক আমাকে এই দরজা দিয়ে ঢোকাবে তো ওই দরজা দিয়ে বার করে দেবে। আমারও কেমন জেদ চেপে গেল যে সংসার করেই দেখাব, যা হয় হোক, আমি এই বাড়িতেই থাকব, তাছাড়া ততদিনে পেটে বাচ্চাও তো এসে গেছে। আমি থেকে গেলাম বটে, কিন্তু স্বামীর সঙ্গে মনের যোগ একেবারেই কেটে গেল, কিছুই ছিল না আর। তখন আমি কোনও কাজও করতাম না, শ্বশুর চাইতেন না, আর বাবা তো আগে থেকেই চাইত না, এখানে থাকত না বলে আমি স্বাধীনতা পেয়েছিলাম খানিকটা। এদের সেই এক কথা মেয়েরা ঘরে থাকবে, রান্না করবে, সংসার করবে, বাচ্চা দেখবে, ব্যাস। আমি তখন আর নিজের কথা না ভেবে ওই পরিবারের মধ্যেই নিজেকে ঢুকিয়ে দিলাম, ওদের নিয়েই আমার দিন কাটতে লাগল, বাইরে থেকে সব ভালো, সব ঠিকঠাক, ভেতরটা ফাঁকা। মনের মধ্যে এত কষ্ট পুষে চলতে চলতে আমার শরীরেও নানা রোগ ধরে যাচ্ছিল। এইভাবেই চলছিল, এর মধ্যে টাকাপয়সার টানাটানি তো ছিলই, স্বামীকে দুটো সংসার চালাতে হত, তাছাড়া আমি ওর টাকায় হাত দিতে পারতাম না, মনে হত মানুষটাই তো আমার নয়, তার টাকা কেন নেব?

এর মধ্যে আমার বাবা মারা গেছিলেন, তারপর মায়ের একটা সেরিব্রাল অ্যাট্যাক হয়ে গেল, তখন আমাকে মায়ের কাছে চলে আসতে হল ভাইয়ের আর মায়ের দেখাশোনার জন্য। আমার স্বামীর সেই সম্পর্কটা ততদিনে ছুটে গেছে, যদিও আমার সঙ্গে রিলেশন কখনোই আর ভালো হলনা। তবু আমি ওকে নিয়ে আর ছেলেকে নিয়ে মায়ের বাড়িতে চলে এলাম। এখানে এসে ওইসময়েই পৌরসভার স্বনির্ভর গোষ্ঠীতেও যোগ দিলাম, সেই সূত্রেই জনমানসের ট্রেনিং নিয়েছিলাম। আমার তো ভাই প্রথম থেকেই অন্য রকম, আর ভাইয়ের সঙ্গে থাকতে থাকতে মাও যেন পরের দিকে কেমন হয়ে গেছিল, কেবল প্যানিক অ্যাট্যাক হত। এখন বলছি প্যানিক অ্যাট্যাক, তখন তো এসব জানতাম না, হার্ট অ্যাট্যাক ভাবতাম, আর পিজিতে নিয়ে যেতাম কেবল। জনমানসের ট্রেনিং চলতে চলতে এই ব্যাপারটা বুঝলাম, আর শুধু এই একটা ব্যাপারই না, এই ট্রেনিংটা করতে করতেই মনে হয়েছিল এইটাই আমার কাজ, এইটা দিয়েই আমি নিজেকে বাইরের জগতে বার করে আনব, কারণ আমার দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আমি আর পারছি না, এইটাই আমার সুযোগ। সেই প্রথম, ২০০৮ সালে জনমানসের ট্রেনিং নিতে বসে আমি আমার জীবনের সব কথা উগরে দিয়েছিলাম, আমার বিয়ে হয়েছে ১৯৯৩ সালে, সেই থেকে ২০০৮ অবধি সব কথা আমার মধ্যে জমে ছিল, আমি ভাবলাম আমার একটু হালকা হবার দরকার আছে, মন খোলার দরকার আছে।

এরপর অঞ্জলি থেকে যে ট্রেনিংগুলো আমাদের দিয়েছে, জনমানস কর্মী হিসাবে কাজ করার জন্য, এর মাধ্যমে আমার যে গ্রুমিং হয়েছে, যে প্লাটফর্ম তৈরি হয়েছে আমার পায়ের তলায়, সেখানে দাঁড়িয়ে আমি যেমন অন্য মানুষের জন্য কাজ করছি, তাদের সাহায্য করছি, তেমনি নিজেও তো ঘুরে দাঁড়িয়েছি। অনেক বদলে গেছি আমি, একেবারে ভেতর থেকে। এখন কেউ বাধা দিলেও আমি তো আর শুনব না, কারণ কাজে নামার পর বাধা এসেছিল, মা নিজেই বাধা দিয়েছিল, এত বেশি সময় বাইরে দিচ্ছি কেন, কী আর এমন রোজগার হয়, এইসব বলেছিল। আসলে আমার জ্ঞানচক্ষু যে খুলে গেছে এইটাতে লোকের অসুবিধা হচ্ছিল, মা নিশ্চয় ফিল করেছিল যে সেই মেয়ে আর এই মেয়ে আলাদা, আর সেটা আমার বরও বুঝতে পারছিল। তবে এই ট্রেনিংএর মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে মায়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেক অন্যরকম হয়ে গেছিল, ওখানে যা শিখতাম, যা বুঝতাম, যেভাবে পারতাম সেগুলো মায়ের ওপর প্রয়োগ করতাম, মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য, আমার মানসিক স্বাস্থ্য দুটোকেই কীভাবে ভালো রাখা যায় এক সঙ্গে সেই রাস্তা বার করার চেষ্টা করতাম। মায়ের প্যানিক অ্যাট্যাক এখন আর হয়না বললেই চলে। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কও আগের থেকে ভালো হয়েছে, এখন একসঙ্গে বসে কথা বলি, ছেলের ব্যাপারে হোক বা কাজের ব্যাপারে হোক, কিছু আলোচনা হয়, তবে স্বামীস্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে যে ভালবাসা বা ঘনিষ্ঠতা থাকে আমাদের মধ্যে সেটা নেই, সেটা হবেও না আর। কিন্তু এইটা বাদ দিলেও তো আমার জীবন আছে, সেখানে আমার ভালোলাগা আমাকেই খুঁজে নিতে হবে, জনমানস আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে তোমার দায়টা তোমারই। জনমানস কিওস্কে আমি পাঁচশ টাকার জন্য কাজ করতে বসিনি, বসেছি ভালোলাগার জন্য, যে কাজ করতে আমার ভালো লাগছে, যে কাজটার একটা মানে আছে, সেই কাজ করার জন্য বসেছি। মানুষের কথা শুনতে আমার ভালো লাগে তাই মন দিয়ে শুনি, আমার কথা মন দিয়ে শোনার কেউ ছিল না, আর ডোর টু ডোর গিয়ে জনসংযোগ করতেও খুব ভালো লাগে। কারণ মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টা এত কম লোক জানে বা ভাবে সেটা নিয়ে, যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বুঝিয়ে না বললে হয় না।

মানুষ যেমন অন্ধকারে চোখ বন্ধ করে মা-বাবাকে খোঁজে তেমনি আমি জনমানসকে খুঁজি, অঞ্জলিকে খুঁজি, আর আমি চাই যেন আমিও এমন কাজ করতে পারি যাতে মানুষ এভাবেই চোখ বন্ধ করে আমাকে খুঁজবে। যেমন করে অঞ্জলি আমার জীবনে টর্চ ফেলেছে, তেমনি আমিও আর কারও জীবনে টর্চ ফেলতে চাই, আমি যেমন আমার রাস্তা খুঁজে নিয়েছি, সেও যেন তেমন সেই টর্চের আলোয় পথ দেখতে পায়।

জাপানী দাস, বয়স পঞ্চাশ, উচ্চমাধ্যমিক, জনমানসে যোগ দিয়েছেন মে, ২০০৮।

অধ্যায় ১ / ৭
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%