তসলিমা নাসরিন
আমি বেশ ক’জন মেয়েকে জানি, ওরা সিগারেটে অভ্যস্ত। এই সমাজে বাস করে মেয়েদের সিগারেটে অভ্যস্ত হওয়া অবশ্য বেশ কঠিন ব্যাপার। তবে যাই হোক, এই নেশায় আক্রান্ত মেয়েদের অপরাধবোধ এত প্রবল যে আমার বড় অবাক লাগে। ওদের নেশা চাপলে টয়লেটে চলে যায়, ওখানে বসে ধূমপান করে, তারপর মুখটুখ ধুয়ে মানুষের সামনে বেরোয়। ওরা না পারে অপরাধবোধ দূর করতে, না পারে নেশা ছাড়তে। ওদের দেখে আমার মায়া হয় বড়। কোনও পুরুষকে তো লুকিয়ে ধূমপান করতে হয় না, নারীর জন্যই রাখঢাক, নারীর জন্যই নিষেধের বেড়া।
কেন একটি মেয়ে ঘরে-বাইরে, খোলামাঠে, রাস্তায় ইচ্ছে করলে ধূমপান করতে পারে না? ধূম যদি খাদ্য হয়— সে নারী-পুরুষ সকলের খাদ্য। ধূম পুরুষের জন্য বাঁধা— এ-কথা কোথাও লেখা নেই। ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, একথা মেনে নিয়েই বলছি, যে নারী ধূমপানে অভ্যস্ত— সে যেন যে-কোনও ধূমপান নিষিদ্ধ নয় এমন এলাকায় ধূমপান করে লজ্জা-ভয় সব বাদ দিয়ে। নারীর ধূমপানের জন্য টয়লেট বা কোনও কিছুর আড়াল যেন প্রয়োজন না হয়। নারীর যেন কোনও আড়ষ্টতা না থাকে তার যা করতে ইচ্ছে করে, সে যেন মেরুদণ্ড শক্ত করে, মাথা উঁচু করে সে কাজটি করে। তাকে যেন কখনও নত না হতে হয়, সমাজের কোনও নষ্ট নিয়মের কাছে সে যেন পরাজিত না হয়। (বি. দ্র.— নারী-পুরুষ উভয়েরই ধূমপান থেকে বিরত থাকা ভাল)।
২. গর্ভ নারীর। এই গর্ভে কিছু ধারণ করতে হলে অথবা গর্ভপাত করতে হলে গর্ভ যার, তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হওয়া উচিত। এই গর্ভের ওপর খবরদারি করবার অধিকার থাকা উচিত নয় কোনও পুরুষের, কোনও সমাজের বা রাষ্ট্রের। গর্ভপাত অথবা গর্ভধারণের স্বাধীনতা যতদিন নারীর হাতের মুঠোয় না আসছে ততদিন পর্যন্ত নারীকে ‘পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত কোনও মাংসের দলা’ বলে ডাকতে আমার কোনও দ্বিধা হয় না।
‘এম আর’ নামের আড়ালে প্রতিদিন এ-দেশে গর্ভপাত ঘটছে। অবিবাহিতা মেয়েরা এম আর করতে হাসপাতালে, ক্লিনিকে লম্বা লাইন দেয় অথচ তাদের মিথ্যে পরিচয় দিতে হয়, বলতে হয় তারা বিবাহিতা, প্রেমিক বা বন্ধুকে দেখিয়ে বলতে হয় স্বামী। কেন এই মিথ্যের আশ্রয়?
কেন তাদের সত্যকথা বলবার স্বাধীনতা দিচ্ছে না এই রাষ্ট্র? কেন গর্ভপাতের জন্য আজ অসংখ্য অবিবাহিতা, ধর্ষিতা নারীকে ‘দিয়ে মিথ্যেকথা বলানো হচ্ছে? রেজিস্টারে লেখা হচ্ছে অনেক মিথ্যে নামধাম। তার চেয়ে গর্ভ যার, গর্ভপাতের অধিকার তার— এই নিয়মটিকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করলে নারীর স্বাধীনতা কিছু রক্ষা হয় আর অযথা মিথ্যের জটলা থেকেও মানুষ বাঁচে।
৩. জগতের কোনও প্রাণীর জরায়ু বাইরে বেরিয়ে আসে না, কেবল মানুষেরই আসে। এর কারণ সম্পর্কে গায়নোকোলজির প্রফেসর আবদুল বায়েছ ভুঞা বলেন— অন্য প্রাণী বা জন্তুর প্রসবের সময় ধাই থাকে না বলে জরায়ু বেরিয়ে আসে না। মানুষের বেলায় ধাই থাকে বলেই মানুষের এত দুর্ভোগ।
বাংলাদেশে অশিক্ষা এবং অন্ধত্ব এত প্রকট যে, আমার আশঙ্কা হয়, যতদিন এ- সব দূর না হবে ততদিন জরায়ু থেকে সন্তান টেনে বের করতে ধাইকে আসতেই হবে আর জগতের প্রাণীকুলের মধ্যে একমাত্র দুর্ভাগা মানুষের ততোধিক দুর্ভাগা নারীর জরায়ুই বেরিয়ে আসবে নীচে। কিন্তু অশিক্ষা এবং অন্ধত্ব কী করে দূর হবে এই দেশ থেকে? দূর করতে কি একা আমি পারি অথবা আমরা মাত্র ক’জন? যদি রাষ্ট্র এই দায়িত্ব না নেয় তবে আমাদের সাধ্য মেই, কেবল লিখে বা মিছিল করে যাবতীয় অশিক্ষা ও অন্ধত্ব দূর করি।
৪. ওভারসিজ কল বুকিং’ নম্বরে ডায়াল করে যদি কোনও নারী কল বুক করতে চায়, অপারেটর তাকে জিজ্ঞেস করে— আপনার নম্বর কত? ফোন নম্বর বলা হল। তার পরের প্রশ্ন হবে— কলার কে? যদি বলা হয় শামিমা, নাসিমা, খালেদা, নমিতা, রোকেয়া— এই জাতীয় কিছু। অপারেটর তবে প্রশ্ন করবেই— মিস না মিসেস?
মিস না মিসেস, না জেনে অপারেটর কিছুতেই স্বস্তি পাবে না। কারণ তাকে লিখে রাখতে হয় নামটি, নামের আগের সম্বোধনটুকু তার প্রয়োজন হয় তাই। এক্ষেত্রে বিবাহিত ও অবিবাহিত পুরুষের বেলায় যেমন Mr. সম্বোধনটি খাটে, তেমনই বিবাহিত ও অবিবাহিত দুই নারীর জন্যই Ms. সম্বোধনটি খাটে। আর বুকিংয়ের সময় নারী বিবাহিত কি বিবাহিত নয়— তা জানা জরুরি নয় মোটে।
নারীকে বিবাহিত এবং অবিবাহিতের পরিচয়ে চিহ্নিত করলে এ-রকম মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, বিবাহই নারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিবাহকে নারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় করলে নারীর অমঙ্গল ছাড়া কখনও মঙ্গল হবে না। কারণ নারীর কর্মক্ষমতা, নারীর মেধা, প্রতিভা, সকলই ধূলিসাৎ হবে বিবাহ নামক ধ্বংসযজ্ঞে। এর মানে কিন্তু এই নয় যে, বিবাহকে আমি নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় বলে রায় দিচ্ছি। বিবাহ প্রয়োজনীয় বটে। কিন্তু বিবাহকে নারীর পরিচয়ের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করবার ঘোর বিরোধী আমি, নির্বোধ নারী ছাড়া আমার বিশ্বাস, সকলেই বিরোধী হবে বিবাহ নামক মুকুটটিকে মাথায় চড়াতে।
৫. সংসদে কিছু ‘অলংকার’ বসে। এই অলংকারের সংসদে বসবার আদৌ কোনও প্রয়োজন আছে কী? আমার মনে হয় নেই। ওঁরা সংসদের শোভাবর্ধন ছাড়া আর কোনও কাজ করছে বলে আমার মনে হয় না।
এই দেশ মেয়েদের শিক্ষিত করাবে না, এই দেশ মেয়েদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করবে, মেয়েদের সমাজ-সংসারে মানুষের মতো চলতে দেবে না, এই দেশ মেয়েদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে, তার কাজ করবার, রাজনীতি করবার, সমাজের মাথা হবার বড় বাধা হবে এবং অবশেষে মেয়ে নামক ডেকোরেশন পিস এনে সংসদে সাজাবে।
এই যদি হয় দেশের অবস্থা তবে মেয়েদের সত্যিকার কোনও উত্থান যে সরকার চায় না, এ সম্বন্ধে নিশ্চয়ই সকলে নিঃসন্দেহ।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মেয়েরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে যোদ্ধা ছিল। মেয়েরা ঘোড়ায় চড়ে সম্মুখ সমরেও নেমেছে। তবে এখন কোনও যুদ্ধ দূরে থাক, দেশের অতি সাধারণ নির্বাচনে মেয়েরা দাঁড়াবার উপযুক্ত পরিবেশ পায় না? পরিবার ও সমাজ তাদের সংসার-খাঁচায় আটকে রাখে। মেয়েরা কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া জয়ের সিংহাসনে বসলে এবং হাত-পা-মাথা ঢেকে ডেকোরেশন পিসের ভূমিকা পালন করলে মেয়েদের যত অপমান করা হয়, তত অপমান মেয়েদের চাবকে, ঠেঙিয়ে, গলা কেটে কিংবা ফাঁসিতে ঝুলিয়েও হয় না।
ওই তিরিশ অলংকারের কোনও অধিকার নেই মেয়ে হয়ে মেয়েদের অপমান করবার এবং দেশের ভোটে জেতা দলেরও অধিকার নেই দেশকে, এমনকী পুরো জগৎকে দেখিয়ে মেয়েদের উপহাসের বস্তু বানাবার
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন