‘বজ্রানলে বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে’

তসলিমা নাসরিন

‘বজ্রানলে বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে’

‘সমীক্ষণ’-এর যে ছেলেটি আমার লেখা নিয়ে যায়, তার নাম পারভেজ। সেদিন পারভেজের সঙ্গে লেখাপ্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল। আমি বললাম, আমি আপনাদের পত্রিকায় লিখি, পত্রিকার লেখক বা কলামিস্টের প্রতি নিশ্চয়ই আপনাদের শ্রদ্ধা থাকা উচিত।’

পারভেজ বলল, ‘হ্যাঁ আপা, তা তো অবশ্যই।’

“তবে যে ভিন্নমত কলামে উদ্ভট এক লেখা ছেপে দিলেন! যে ছেলেটি ওই চিঠি লিখেছে, সে আমার লেখা কিছু পড়েছে বলে মনে হয় না। নারী-স্বাধীনতা বলতে আমি কেবল জরায়ুর স্বাধীনতা বুঝি, অবাধ যৌনমিলনই বুঝি—কিছু না পড়ে, না বুঝে হঠাৎ কেউ এ-রকম এক রায় দিয়ে দেবে। আর আপনারা তা হাইলাইট করবেন?’

আমার লেখা সম্পর্কে যে-কোনও যুক্তিসংগত সমালোচনা আমি গ্রহণ করি, অযৌক্তিক এবং অনর্থক সমালোচনা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলি। সে আমার একেবারেই অন্তর্গত চরিত্র। কিন্তু পত্রিকাগুলোর প্রকৃতি অন্যরকম, আমি বেশ লক্ষ করেছি ‘তসলিমা নাসরিন’ নামটির বিরুদ্ধে কিছু লেখালেখি হলে পাঠক মজা পাবে বলে ধারণা করা হয়। যেন নারীর স্বাধীনতার পক্ষে এই অকপট সত্য উচ্চারণ, নারীর জীবন এবং জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে নিজের অধিকার বিষয়ে সজাগ থাকা, নারীকে দাসত্বের সকল শৃঙ্খল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবার কথা বলা নেহাত তুচ্ছ কিছু, অকিঞ্চিৎকর কিছু! তাই এর বিপক্ষে মন্দ কথা বললে পাঠক মজাই পায়। এই মজা বা আনন্দের আমি কোনও ব্যাকরণ জানি না, এই মজা বা আনন্দের কোনও সরল সমীকরণ আমার জানা নেই।

একবার এক সাপ্তাহিক পত্রিকার অফিসে গিয়েছিলাম। ভাষা নিয়ে এক বিতর্কে আমি অবাক হয়ে লক্ষ করি, আমার লেখার পক্ষে ওই পত্রিকায় কুড়িটি চিঠি এসেছে এবং বিপক্ষে দুটি। পক্ষের চিঠিগুলো যুক্তিতর্ক উপস্থাপনায় এত ঋদ্ধ যে, আমি মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। ভেবেছিলাম এই চিঠিগুলো থেকে দু’-একটি সম্ভবত ছাপা হবে। কিন্তু পরের সপ্তাহে পত্রিকা বের হলে দেখি পত্রিকায় বিপক্ষের দুটো চিঠিই ছাপা হয়েছে।

পক্ষের একটিও নয়। আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। আমি সেইমতো মতান্তর নির্বাচনের নিরপেক্ষতা (!) দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। আমি এখনও জানি না, পক্ষের চিঠি বিলুপ্ত করে বিপক্ষে কিছু অযৌক্তিক ও অশ্লীল চিঠি ছাপলে পত্রিকার কাটতি বাড়ে কি না বা পাঠক মজা পায় কি না। আমি এই মজা বা আনন্দের কোনও অনুবাদ জানি না।

কেন এই বৈরিতা? কেন এই অমূলক বিদ্বেষ? এ অবধি মৌলবাদীরা দু’বার আমাকে ফাঁসি দিয়েছে। এবং প্রগতির পক্ষের পত্রিকায় ফাঁক পেলেই আমাকে অসম্মান করবার কারণ আমি যে একেবারেই বুঝি না তা নয়। মৌলবাদীরা আমাকে নিশ্চিহ্ন করতে চায় আমি ধর্ম মানি না বলে এবং ধর্মের অনাচার ও অসত্য আঙুল তুলে দেখিয়ে দিই বলে। আমার ধর্ম আমি মনে করি মানবতা, আমার ধর্মে কোনও ক্ষুদ্রতা বা স্বার্থপরতার স্থান নেই। আমার ধর্ম আমাকে মনে ও মননে বিশাল ও বিস্তৃত হতে শেখায়।

আমি বুঝি প্রগতির পক্ষে যার যত জোর কণ্ঠস্বর হোক, তারা সকলেই একটি সংস্কারের কাছে বড় নিবিড় করে বাঁধা। সংস্কারটির নাম নারী—লজ্জাবনত, মৃদুভাষী, রূপ ও সাংসারিক গুণে টইটম্বুর দ্বিপদী এক জীব, নারী। এর বাইরেই নারী মানে দেখবার জিনিস, মজার জিনিস, উপভোগের জিনিস এবং ভোগের জিনিস। যে নারী দৌড়োয়, সাঁতার কাটে, লোকে তার দৌড় বা সাঁতারের গতির চেয়ে বেশি দেখে তার সুঠাম ঊরু, তার ছন্দোময় স্তন। যে নারী অভিনেত্রী, লোকেরা তার অভিনয়-দক্ষতার চেয়ে বেশি দেখে আনন্দ পায় তার শরীরের বন্ধুর পথ ও পথের মসৃণতা। বেশি আনন্দ পায় শুনে সনাতন সংস্কার ভাঙা নারীর দুর্ঘটনা, দুঃখ ও দৈন্য। যে নারী গান গায়, যে নারী লেখে—তার গান এবং লেখার সুর এবং শিল্পগুণের চেয়ে লোকে বেশি দেখে নারীর রূপ ও সৌন্দর্য—নারী যদি সংস্কার ভাঙে, নারী যদি বানানো সব নিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবে লোকে তার সবল অস্বীকারকে ‘স্ক্যান্ডাল’ বলে জানে। লোকে তাকে নিয়ে মজা করে মজা দেখে। আমি অস্বীকার করব না, কিছু শিক্ষিত (!) ও প্রগতির সপক্ষে কণ্ঠবাজদের মজার শিকার আমি। এরা কি কুৎসিত মৌলবাদীর চেয়ে ভিন্ন কিছু, পৃথক কোনও অস্তিত্ব? আমার বিশ্বাস হয় না।

আমার প্রথম দোষ আমি নারী। ড. পূরবী বসু আমার আরও এক দোষের কথা বলেন, দোষ—আমি দেখতে ভাল, দেখতে মন্দ হলে লোকের এত আক্রোশ হত না আমাকে আক্রমণ করবার। দেখতে মন্দ হলে আমাকে নিয়ে ওরা মেতে উঠত না পাশবিক উচ্ছ্বাসে। আমার আরও দোষ আছে, দোষ—আমি পুরুষের যাবতীয় আধিপত্য ও হিংস্রতাকে অস্বীকার করতে পারি।

এত সব দোষে আমি দূষিত। পরদা ছেড়ে বেরিয়েছি ধর্মবিমুখ নারী- মৌলবাদীরা আমাকে ধিক্কার দিচ্ছে। নারীর জন্য ‘মাত্রাতিরিক্ত’ স্বাধীনতার কথা বলায় ‘যৌগবাদীরা’ও আমাকে দাঁতে-নখে ছিঁড়তে চায়।

আমি তবু দাঁড়িয়ে আছি। অনেকেই, এই শহর এবং দূরের অনেক শহর থেকে এসে আমাকে বলে যায়, বলে যায়, তসলিমা নাসরিন একটি আন্দোলনের নাম। ওরা কেবল বলেই যায়, গোপনে বলে যায়। আর আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকি, একদিকে বিরুদ্ধ সমুদ্র, অন্যদিকে উদার আকাশ, কেউ আমাকে গ্রাস করে, কেউ আমাকে ছায়া দেয়।

তবু ছায়া আর কত, চোখ বুজলেই টের পাই একশো হাঁ-মুখো হাঙর আসে আমাকে গিলে খেতে। সকল প্রতিবন্ধকতা একাই ঠেকিয়ে বেঁচে আছি। এই যে তবু বেঁচে আছি, এ কি আশ্চর্য নয়? বা প্রতিবাদ নয় সকল নোংরামির বিরুদ্ধে?

সকল অধ্যায়
১.
‘আর রেখ না আঁধারে আমায় দেখতে দাও’
২.
আশায় আশায় থাকি
৩.
আমাদের বুদ্ধিজীবীরা
৪.
আগ্রাসন
৫.
নগর-যাপন
৬.
‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’
৭.
‘কার নিন্দা কর তুমি। মাথা কর নত। এ আমার এ তোমার পাপ।’
৮.
‘দুঃখরাতের গান’
৯.
বৃত্ত
১০.
নাগরিক খাঁচা
১১.
‘নিজ বাসভূমে পরবাসী’
১২.
সকল সন্তানই বৈধ
১৩.
‘জারজ’ শব্দের বিলুপ্তি চাই
১৪.
নারীভোজ
১৫.
‘তৃষ্ণার শান্তি সুন্দর কান্তি’
১৬.
‘মুক্ত করো ভয়’
১৭.
‘সখী, আঁধারে একেলা ঘরে মন মানে না’
১৮.
‘নিশিদিন ভরসা রাখিস’
১৯.
‘আমাদের যাত্রা হল শুরু’
২০.
‘খসিল কি আপন পুরনো পরিচয়?’
২১.
‘সীমার মাঝে অসীম তুমি’
২২.
ঝরে পড়া শিক্ষার্থী
২৩.
‘বজ্রানলে বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে’
২৪.
নাস্তিক্যবাদ
২৫.
নিজের পায়ে নিজের কুড়োল
২৬.
গোটা দুই ‘পতিত’, ছ’সাতটি ‘রক্ষিত’ হলে জমত বেশ
২৭.
খারাপ মেয়ের গল্প
২৮.
শব্দবাণবিদ্ধ নারী
২৯.
থ্রি চিয়ার্স ফর হাসিবা
৩০.
‘বড় বিস্ময় লাগে’
৩১.
‘রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে’
৩২.
‘মন কেমন করে’
৩৩.
বিজ্ঞাপনের নারী
৩৪.
‘কে বলেছে তোমায় বঁধু এত দুঃখ সইতে…’
৩৫.
ইসলামি থাবা
৩৬.
নিজের গোলা শূন্য
৩৭.
‘নপুংসক’ বিষয়ক
৩৮.
‘MEGALOMANIA, THY NAME IS MAN’
৩৯.
ধর্মের কাজ ধর্ম করেছে
৪০.
কন্যাজন্মের প্রায়শ্চিত্ত
৪১.
অবদমন
৪২.
গিনিপিগ
৪৩.
হিন্দুর উত্তরাধিকার
৪৪.
বাঙালি মুসলমানের দুর্মতি ও দুর্গতি
৪৫.
রাজনীতির ফাঁকফোকর
৪৬.
নারীর নামপরিচয়
৪৭.
কাজ
৪৮.
পাকিস্তান-প্রীতি, অলৌকিকতা এবং অভিজ্ঞতা
৪৯.
কবরের খবর
৫০.
যদি সত্য কথা বলি
৫১.
সংসার-চিতা
৫২.
অনভ্যাস
৫৩.
যে-কোনও নারীই আজ নুরজাহান
৫৪.
ঘটনা-দুর্ঘটনা
৫৫.
‘উই শ্যাল ওভারকাম’
৫৬.
‘ভাবনার ভাস্কর্য’
৫৭.
‘একলা চলো রে…’
৫৮.
অতঃপর নারী হবে মসজিদের ইমাম
৫৯.
‘ভালবেসে যদি সুখ নাহি…’
৬০.
আইন বদল
৬১.
প্ৰথা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%