বিজ্ঞাপনের নারী

তসলিমা নাসরিন

বিজ্ঞাপনে নারীর ‘জয়জয়কার’। বিজ্ঞাপনে কী করে ব্যবহৃত হয় নারী, কী করে সে বঞ্চিত হয়, আমার প্রসঙ্গ সেটি নয়। প্রসঙ্গ অন্য। বলছি, পত্রিকা অফিসে একজন ‘বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি’র প্রয়োজন হয় এবং এই বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি হিসেবে সাধারণত নারীকেই নির্বাচন করা হয়। কেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীকে নির্বাচন করা হয়, কেন পুরুষকে নয়—এই প্রশ্নটি আমার অনেক দিনের।

আজকাল কালো টাকার মালিকেরা ভিখিরিদের দান-খয়রাত করবার চেয়ে পত্রিকা বার করতেই বেশি আগ্রহী। টাকার পাহাড় যদি উঁচু হতে হতে এমন অবস্থা হয় যে, পাহাড় ক্রমশ আকাশ ফুঁড়ে উঠছে, তখন পাহাড়ের মালিকটি হজ করতে যান। হজ করে এসে বাড়িতে বসে গা চুলকান, ফোনে কথাবার্তা বলেন মন্ত্রী-টন্ত্রির সঙ্গে, তেলে-মশলায় রান্না করা খাবার খান, বিকেলে ক্লাবে মদ খেতে এবং নারী দেখতে যান, ঠিক দেখতে না বলে এখানেও ‘খেতে’ শব্দটি ব্যবহার করা যায়, তাঁর অলস অবসর দেখে কেউ কেউ বুদ্ধি দেয় পত্রিকা করুন, একটা কাজের কাজ হবে। তখন কালো টাকার মালিকটি পত্রিকা বার করেন। পত্রিকা কী জাতের হবে তা নিয়ে এক রাতে হয়তো বন্ধুবান্ধব ডেকে লটারি করলেন, কাগজের এক টুকরোয় ‘রাজনীতি,’ আরেক টুকরোয় ‘সেক্স’। ব্যস, অফিস নেওয়া হল, সাংবাদিক ডাকা হল, কোথায় কোথায় দেশি-বিদেশি নারী-শরীরের ছবি পাওয়া যায়, জোগাড় করো, প্রচ্ছদে সেঁটে দাও, ভেতরে রাখো রগরগে যৌনতা। হিট। লোকে বলবে এ তো দেখি যেখানেই হাত দেয় সেখানেই সোনা। আর বাকিটি হল ‘রাজনীতি’। এও একই কায়দা। কোথায় কী হচ্ছে, কে কাকে গালি ছুড়ছে, কার অনাস্থা, কোনও সংশোধনী, কে জেলে, কে বাইরে ইত্যাদির বর্শা, বল্লম, হুল ছোড়াছুড়ি। আবার পাশাপাশি নানারকম দর্শনের কচকচানো। এতেও লাভ। মালিক রাতারাতি বুদ্ধিজীবী বনে যাবেন। পাটভাঙা পাঞ্জাবি পরে তাঁকে গাড়ি থেকে নেমে সভাসমিতিতে পতির আসন অলংকৃত করতে হবে, লোকে বিবৃতি চাইবে, অসংখ্য পরিচিত-অপরিচিত লোক বাহবা দেবে, বলবে আপনার মধ্যে যে এত গুণ ছিল তা কিন্তু আমাদের জানা ছিল না। মালিক তখন মৃদু হাসবেন। তখন তাঁর ঠা ঠা করে হাসাও চলবে না। যথাসম্ভব গম্ভীর হতে হবে। তখন কালোকে আর লোকে কালো বলবে না, বলবে সাদা।

কালোকে সাদা করবার পদ্ধতি বর্ণনা করা আজ আমার বিষয় নয়। আমার বিষয়, পত্রিকার জন্য বিজ্ঞাপন আনবার কাজ যে মানুষটি করে, সেই নারীটি—সে তার পথে কী করে হাঁটে, সে তার গন্তব্যের দিকে কী করে অগ্রসর হয়, আমি তার যাত্রার দিকে একবার দৃষ্টি ফেরাব।

আমি একজন বিজ্ঞাপন প্রতিনিধির কথা জানি, সে বিজ্ঞাপন আনতে গেলে প্রতিটি কোম্পানির মালিক বা ম্যানেজার দ্বারা তাকে অপদস্থ হতে হয়। সে নিরীহ এক মেয়ে, স্বামী তাকে ফেলে চলে গেছে, পড়াশোনা আই এ পর্যন্ত! চাকরি খুঁজতে গেলে পত্রিকায় এই চাকরিটিই দেওয়া হল, কারণ সম্ভবত তার স্বামী নেই, তাই ভাবা হয়, মেয়েটি খুব একটা ‘সুবিধের’ হবে না, আর ‘সুবিধের’ না হলেই তো বিজ্ঞাপনে ভাল খাপ খাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, স্বামী তালাক দিলেই মেয়েরা বিজ্ঞাপনে খাপ খায়, কথাটি ঠিক নয়। যে প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন দেবে, তাকে সেই প্রতিষ্ঠানের বড়কর্তার সামনে বসে বিজ্ঞাপনের কথাবার্তা বললেই শুধু চলে না, বড়কর্তার ইচ্ছেয় ঘরের দরজা বন্ধ হয়, বড়কর্তা এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন এবং বিজ্ঞাপন দেবার আগে প্রস্তাব করেন—চলুন একদিন কোথাও বেড়াতে যাই সারা দিনের জন্য।

মেয়েটি যদি বলে, কোথায়?

বড়কর্তা চোখ নাচিয়ে উত্তর দেন, কেন, বুঝতে পারছেন না কোথায়?

মেয়েটি বুঝতে পারে কোথায়। কারণ তাকে এর আগেও আরও প্রতিষ্ঠান চিনিয়ে ছেড়েছে এই, ‘কোথায়’টি আসলে কোথায়!

মেয়েটি নিজেকে সংযত করে বলে—না।

বড়কর্তা টোপ ফেলেন, বলেন—অনেক টাকার বিজ্ঞাপন পাবে।

মেয়েটি তবুও ‘না’ বলে। এবার খেপে যান বড়কর্তা। বলেন, তবে এই লাইনে এলে কেন?

এই লাইনে এলে কেন? তা হলে কি ভাবা হয় বিজ্ঞাপন নেবার লাইন খারাপ লাইন?

আর খারাপ লাইন বলে এখানে ‘মেয়েদের’ নিয়োগ দেওয়া হয়। বড়কর্তাদের হাতে শরীর সঁপে দিয়ে মেয়েরা বিজ্ঞাপন এনে দেবে, পত্রিকাওয়ালারা সেই বিজ্ঞাপন ছাপবে আর মেয়ে তার ওপর সামান্য কমিশন পাবে, এই তো?

এও তো এক ধরনের বেশ্যাবৃত্তি, সভ্য বেশ্যাবৃত্তি। শরীরের বিনিময়ে টাকা। যত শরীর এলিয়ে দেবে বড়কর্তার গায়ে, তত বাড়বে বিজ্ঞাপনের মূল্য। অগ্রণী ব্যাংক, সোনালি ব্যাংক, তিতাস গ্যাস, সমবায় ব্যাংক, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ভাইয়া গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, পেট্রোবাংলা, বি সি আই সি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর— কোথাও থেকে বিজ্ঞাপন নিতে যাওয়া মেয়েরা রেহাই পায় না।

আসলে মেয়েরা যে কাজেই এগিয়ে আসে, একেবারে বড় কর্মকর্তার পদ বাদ দিলে বাকি প্রায় সব পেশাকেই নিচু চোখে দেখা হয়। সব পেশায় শরীর-শরীর গন্ধ ছড়ানো থাকে। আমি এক সময় পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের চিকিৎসক ছিলাম।

এই বিভাগের ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ভিজিটর, ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট সকলকেই উপপরিচালক লোকটি স্রেফ তার ভোগের বস্তু বলে ভাবত। প্রতিদিন সে এক-একটি মেয়ের দিকে হাত বাড়াত, তাদের ঘরে নিয়ে দরজা বন্ধ করত, চাকরি যাবার ভয় দেখিয়ে ওদের চিৎকার থামাত। এই সব ঘটনা আমি চোখের সামনে ঘটতে দেখেছি। প্রতিবাদ করেছি বলে আমার কম অসুবিধে হয়নি।

সে পুরনো কথা। এখন বলছি, মেয়েরা যে-কোনও কাজেই এগিয়ে আসতে পারে, এতে তাদের সম্মান যায় না। প্রিন্সেস ডায়নাও এক সময় লোকের বাড়িতে বাসন মাজবার কাজ করত, এতে তার মানমর্যাদা সামান্যও লোপ পায়নি। মেয়েরা যে-কোনও কাজেই দক্ষতা দেখাতে পারে, তবে সমাজের ভদ্রলোকদের তো এইটুকু সহনশীল হতেই হবে— যে মেয়েটি পত্রিকার বিজ্ঞাপন চাইতে এসেছে, তার সঙ্গে বিজ্ঞাপন বিষয়েই আলাপ হোক, বিজ্ঞাপন দেওয়া হোক অথবা না হোক। মেয়েদের আসলে ব্যবহার করছে দু’পক্ষই। একদিকে পত্রিকাওয়ালা, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের মালিক। মাঝখান থেকে কাজ করতে আসা মেয়েরা কাজের ওপর থেকে শ্রদ্ধা হারাচ্ছে, তারা অতঃপর যদি চার দেওয়ালের ঘরেই নিজেদের নিরাপদ ভাবে, তবে লজ্জা কি শুধু আমাদের নারীদেরই? সভ্য, শিক্ষিত পুরুষদের নয়?

কোনও কাজই অসম্মানের নয়। গার্মেন্টস-এর নারী, অফিস-আদালতের কেরানি-নারী, হাসপাতালের নার্স, আয়া, মেথরানি— কেউই অসম্মানের কাজ করেন না। সকলকে শ্রদ্ধা করতে শিখতে হবে। যে বেশ্যা, তারও মর্যাদা আছে, সরকার তাকে বেশ্যাবৃত্তি করবার অনুমতি দিয়েছে, সেও অধিকার রাখে সম্মানিত হবার মেয়েরা চার দেওয়ালের অন্ধকার গুহা থেকে বাইরে বেরিয়েছে কাজ করতে, তাকে কাজ করবার সুযোগ না দিয়ে যারা শরীর কামড়াতে আসে তাদের চিহ্নিত করা হোক। তাদের আজ সতর্ক করা হোক।

সকল অধ্যায়
১.
‘আর রেখ না আঁধারে আমায় দেখতে দাও’
২.
আশায় আশায় থাকি
৩.
আমাদের বুদ্ধিজীবীরা
৪.
আগ্রাসন
৫.
নগর-যাপন
৬.
‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’
৭.
‘কার নিন্দা কর তুমি। মাথা কর নত। এ আমার এ তোমার পাপ।’
৮.
‘দুঃখরাতের গান’
৯.
বৃত্ত
১০.
নাগরিক খাঁচা
১১.
‘নিজ বাসভূমে পরবাসী’
১২.
সকল সন্তানই বৈধ
১৩.
‘জারজ’ শব্দের বিলুপ্তি চাই
১৪.
নারীভোজ
১৫.
‘তৃষ্ণার শান্তি সুন্দর কান্তি’
১৬.
‘মুক্ত করো ভয়’
১৭.
‘সখী, আঁধারে একেলা ঘরে মন মানে না’
১৮.
‘নিশিদিন ভরসা রাখিস’
১৯.
‘আমাদের যাত্রা হল শুরু’
২০.
‘খসিল কি আপন পুরনো পরিচয়?’
২১.
‘সীমার মাঝে অসীম তুমি’
২২.
ঝরে পড়া শিক্ষার্থী
২৩.
‘বজ্রানলে বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে’
২৪.
নাস্তিক্যবাদ
২৫.
নিজের পায়ে নিজের কুড়োল
২৬.
গোটা দুই ‘পতিত’, ছ’সাতটি ‘রক্ষিত’ হলে জমত বেশ
২৭.
খারাপ মেয়ের গল্প
২৮.
শব্দবাণবিদ্ধ নারী
২৯.
থ্রি চিয়ার্স ফর হাসিবা
৩০.
‘বড় বিস্ময় লাগে’
৩১.
‘রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে’
৩২.
‘মন কেমন করে’
৩৩.
বিজ্ঞাপনের নারী
৩৪.
‘কে বলেছে তোমায় বঁধু এত দুঃখ সইতে…’
৩৫.
ইসলামি থাবা
৩৬.
নিজের গোলা শূন্য
৩৭.
‘নপুংসক’ বিষয়ক
৩৮.
‘MEGALOMANIA, THY NAME IS MAN’
৩৯.
ধর্মের কাজ ধর্ম করেছে
৪০.
কন্যাজন্মের প্রায়শ্চিত্ত
৪১.
অবদমন
৪২.
গিনিপিগ
৪৩.
হিন্দুর উত্তরাধিকার
৪৪.
বাঙালি মুসলমানের দুর্মতি ও দুর্গতি
৪৫.
রাজনীতির ফাঁকফোকর
৪৬.
নারীর নামপরিচয়
৪৭.
কাজ
৪৮.
পাকিস্তান-প্রীতি, অলৌকিকতা এবং অভিজ্ঞতা
৪৯.
কবরের খবর
৫০.
যদি সত্য কথা বলি
৫১.
সংসার-চিতা
৫২.
অনভ্যাস
৫৩.
যে-কোনও নারীই আজ নুরজাহান
৫৪.
ঘটনা-দুর্ঘটনা
৫৫.
‘উই শ্যাল ওভারকাম’
৫৬.
‘ভাবনার ভাস্কর্য’
৫৭.
‘একলা চলো রে…’
৫৮.
অতঃপর নারী হবে মসজিদের ইমাম
৫৯.
‘ভালবেসে যদি সুখ নাহি…’
৬০.
আইন বদল
৬১.
প্ৰথা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%