‘MEGALOMANIA, THY NAME IS MAN’

তসলিমা নাসরিন

এক অসভ্য পুরুষ সেদিন বলল, ‘পুরুষের চরিত্রের কালিমা মুছতে চার ইঞ্চি কাপড়ই যথেষ্ট, কিন্তু মেয়েদের চরিত্রের কালিমা বারো হাত কাপড়েও ঢেকে রাখা যায় না।’

এই পুরুষটিকে কিন্তু কেউ অসভ্য বলে না। তার এই অদ্ভুতুড়ে বাক্য শুনে কেউ অসন্তুষ্ট হয় না। এই অসভ্য পুরুষকে লোকে ‘ভদ্রলোক’ বলে জানে। এমন ‘ভদ্রলোক’দের মধ্যে আমাদের বাস, আমাদের বলতে ‘নারীদের’; ন্যুব্জ, নষ্ট, নিৰ্ধন, নির্গুণ, নীচ নারীদের।

চরিত্রের কালিমা নাকি পুরুষেরা চার ইঞ্চি কাপড়েই মুছে ফেলতে পারে। অর্থাৎ বীর্যস্নাত পুরুষাঙ্গকে ছোট কাপড়েই মুছে ফেলা যায়। আর মেয়েদের চরিত্রের কালিমা বারো হাত কাপড়েও ঢেকে রাখা যায় না—এর অর্থ, মেয়েরা গর্ভবতী হলে শাড়ি ফুঁড়ে তা প্রকাশিত হয়, ‘ভদ্রলোকদের মতে মানুষের চরিত্র নিয়ন্ত্রণ করে যৌনসম্পর্ক। যৌনসম্পর্কের কারণে মেয়েরা গর্ভবতী হয়। আর এই গর্ভবতী হওয়াকে আমাদের অসভ্য ভদ্রলোকটি চরিত্রের কালিমা’ বলছেন, বলছেন অবশ্য বৈধ-অবৈধের ছকে ফেলে। কালিমা তখনই লেপন করা হয়, যখন তা অবৈধ বলে চিহ্নিত হয়। বৈধ-অবৈধের রচনাকারী পুরুষেরা অবশ্য তাদের সুবিধেমতোই নারীর বৈধ গর্ভ এবং অবৈধ গর্ভ চিহ্নিত করে। আর সমাজের অসহায়, অনাথ, অবর, অক্ষম নারী পুরুষের বিচারসভায় নিজেকে আসামি বলে মানে। ‘চরিত্র’ কি তুচ্ছ এই সম্পর্ক দ্বারাই মাপা হয়? চরিত্রের আর কোনও বৈশিষ্ট্য নেই? আর কোনও অবলম্বন? ‘ভদ্রলোকেরা’ চরিত্রকে চার-ছ’ইঞ্চি জায়গার মধ্যে এনে দাঁড় করিয়েছে। চরিত্রের উৎপত্তি এবং বিনাশ এখানেই নির্ধারিত হয়।

আসলে চরিত্র এত তুচ্ছ জিনিস নয়, চরিত্রের কালিমা গর্ভস্থ সন্তানের ওপর কখনও পতিত হবার নয়, সন্তানমাত্রই পবিত্র, সুন্দর—তাকে স্পর্শ করা উচিত নয় সমাজের কোনও ক্লেদের। সামাজিক বিবাহবন্ধনের সঙ্গে নারীর সন্তানের যোগসূত্র থাকতেই হবে—এ কোনও সভ্য মতবাদ নয়। নারী যদি ইচ্ছে করে, তার গর্ভে ফুল ফুটুক, তবে তার এবং তার গর্ভের অধিকার আছে ফুল ফোটাবার। ভদ্রলোকেরা বিবাহের দলিল চাইবে দেখতে, সামাজিক চৌকিদারেরা নারীর চরিত্রে কালি ছোড়বার আয়োজন করবে, তারা তাদের বানানো সতীত্বের সংজ্ঞা’ এনে দাঁড় করাবে সামনে, এতে নারী এবং তার সন্তানের কিছুই যায় আসে না। নারী এবং তার সন্তানকে সমাজের ভদ্রলোকেরা নর্দমায় ছুড়বে, গাল দেবে, বেত্রাঘাত করবে, জেলে ভরবে—এতে নারী এবং তার সন্তানের পবিত্রতা সামান্যও ম্লান হবে না। কারণ নারীর এই নিরন্তর স্ট্রাগল একদিন এ-কথা প্রমাণ করবেই, নারীর সর্ব অঙ্গের ওপর নারীরই অধিকার আছে, নারীরই অধিকার আছে তার অঙ্গের সংকোচন এবং প্রসারণ ঘটাবার এবং বারো হাত কাপড়ে নারী-অঙ্গের যে-কোনও প্রসারণই ঢাকতে বাধ্য।

‘Frailty, Thy name is woman’—খুব বিখ্যাত একটি বাক্য। সকলের মুখে মুখে ফেরে। Frail শব্দের অর্থ ভঙ্গুর, পলকা, ক্ষণস্থায়ী, নশ্বর, দুর্বল, অক্ষম, অথর্ব, জরাগ্রস্ত, নৈতিক দুর্বলতাগ্রস্ত, অসচ্চরিত্র, অসতী। Frail থেকে Frailty. কেউ এই বাক্যের প্রতিবাদ করেন না। সকলেই মেনে নিয়েছেন, এমনকী Woman-রাও। Woman-দের জমাট আসরে কোনও ভদ্রলোক তাঁদের কাতুকুতু দিয় হাসান এবং কথায়-কথায় বলে ওঠেন Frailty, Thy name is woman তখন ‘woman’-রা হাসতে হাসতে এ-ওর গায়ে গড়িয়ে পড়েন। তাঁরা ভাবেন, বড় মধুর কথা শোনানো হল তাঁদের। বড় সম্মানিত হলেন তাঁরা।

এই নির্বোধ নারীরা পুরুষদের জন্য কোনও ‘বিখ্যাত’ বাক্য তৈরি করেন না, যে বাক্য ছুড়ে দিয়ে ওদেরও জব্দ করা যায়। পুরুষ কিছুটা জব্দ না হলে দোলনায় পুরুষই কেবল দুলবে, আর নারী তাদের পেছন থেকে দোলা দিয়েই যাবে, তাঁর আর ভাগ্যে হবে না দোলনায় চড়বার, দোল খাবার।

পুরুষ ভাবে, সে তার মাংসল পেশি এবং চার ইঞ্চি পুরুষাঙ্গ দিয়ে পৃথিবী জয় করেছে। সে বিস্তর, বিপুল এবং বিশাল কিছু। আসলে তা কিন্তু সত্য নয়। এখন মেধার যুগ, চার ইঞ্চি জিনিস দিয়ে জগৎ কুপোকাত হবে না, ঘটে যদি বুদ্ধি থাকে তবেই কিছু উপার্জন হবে, নচেৎ ফক্কা। চার ইঞ্চির বাহাদুরি যথেষ্ট হয়েছে। এবার বাপু রাস্তা মাপো।

যা আছে, পুরুষ দেখায় তার দ্বিগুণ। পুরুষ ততটুকু শক্তিধর নয়, যতটুকু দেখায়। পুরুষের জন্য চমৎকার একটি বাক্য উপহার দেবার সময় হয়েছে—‘Megalomania, Thy name is man’। শেকসপিয়রের সময় থেকে সময় নিশ্চয় এগিয়েছে অনেক। যুগ বদলেছে, যুগ আরও বদলাবে। এই বাংলাদেশের কিছু অসভ্য পুরুষ নিয়েই পৃথিবী আবর্তিত হবে না। ‘ভদ্রলোক’দের তৈরি এই নষ্ট ‘সমাজ’ নিয়ে এই গ্রহ কিন্তু পড়ে থাকবে না। সমাজ বদলাবে। সমাজ যারা বদলাবে, তাদের কিছুটা ‘অভদ্ৰ’ না হলে হবে না। ‘অভদ্ররাই পারে ‘ভদ্রলোক’দের শিশ্নের জোর কমাতে।

সকল অধ্যায়
১.
‘আর রেখ না আঁধারে আমায় দেখতে দাও’
২.
আশায় আশায় থাকি
৩.
আমাদের বুদ্ধিজীবীরা
৪.
আগ্রাসন
৫.
নগর-যাপন
৬.
‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’
৭.
‘কার নিন্দা কর তুমি। মাথা কর নত। এ আমার এ তোমার পাপ।’
৮.
‘দুঃখরাতের গান’
৯.
বৃত্ত
১০.
নাগরিক খাঁচা
১১.
‘নিজ বাসভূমে পরবাসী’
১২.
সকল সন্তানই বৈধ
১৩.
‘জারজ’ শব্দের বিলুপ্তি চাই
১৪.
নারীভোজ
১৫.
‘তৃষ্ণার শান্তি সুন্দর কান্তি’
১৬.
‘মুক্ত করো ভয়’
১৭.
‘সখী, আঁধারে একেলা ঘরে মন মানে না’
১৮.
‘নিশিদিন ভরসা রাখিস’
১৯.
‘আমাদের যাত্রা হল শুরু’
২০.
‘খসিল কি আপন পুরনো পরিচয়?’
২১.
‘সীমার মাঝে অসীম তুমি’
২২.
ঝরে পড়া শিক্ষার্থী
২৩.
‘বজ্রানলে বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে’
২৪.
নাস্তিক্যবাদ
২৫.
নিজের পায়ে নিজের কুড়োল
২৬.
গোটা দুই ‘পতিত’, ছ’সাতটি ‘রক্ষিত’ হলে জমত বেশ
২৭.
খারাপ মেয়ের গল্প
২৮.
শব্দবাণবিদ্ধ নারী
২৯.
থ্রি চিয়ার্স ফর হাসিবা
৩০.
‘বড় বিস্ময় লাগে’
৩১.
‘রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে’
৩২.
‘মন কেমন করে’
৩৩.
বিজ্ঞাপনের নারী
৩৪.
‘কে বলেছে তোমায় বঁধু এত দুঃখ সইতে…’
৩৫.
ইসলামি থাবা
৩৬.
নিজের গোলা শূন্য
৩৭.
‘নপুংসক’ বিষয়ক
৩৮.
‘MEGALOMANIA, THY NAME IS MAN’
৩৯.
ধর্মের কাজ ধর্ম করেছে
৪০.
কন্যাজন্মের প্রায়শ্চিত্ত
৪১.
অবদমন
৪২.
গিনিপিগ
৪৩.
হিন্দুর উত্তরাধিকার
৪৪.
বাঙালি মুসলমানের দুর্মতি ও দুর্গতি
৪৫.
রাজনীতির ফাঁকফোকর
৪৬.
নারীর নামপরিচয়
৪৭.
কাজ
৪৮.
পাকিস্তান-প্রীতি, অলৌকিকতা এবং অভিজ্ঞতা
৪৯.
কবরের খবর
৫০.
যদি সত্য কথা বলি
৫১.
সংসার-চিতা
৫২.
অনভ্যাস
৫৩.
যে-কোনও নারীই আজ নুরজাহান
৫৪.
ঘটনা-দুর্ঘটনা
৫৫.
‘উই শ্যাল ওভারকাম’
৫৬.
‘ভাবনার ভাস্কর্য’
৫৭.
‘একলা চলো রে…’
৫৮.
অতঃপর নারী হবে মসজিদের ইমাম
৫৯.
‘ভালবেসে যদি সুখ নাহি…’
৬০.
আইন বদল
৬১.
প্ৰথা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%