তসলিমা নাসরিন
ঢাকা শহরে মেয়েদের চলাফেরায় দুটো উন্নতি ঘটেছে। তারা কাঁচা বাজারে যায় এবং পাকা স্কুলে যায়। বাজারে যায় বাজার করতে, স্কুলে যায় বাচ্চা দিতে অথবা নিতে। এই দুটো কাজ অনেক ‘গৃহিণী’র জন্যই এখন বাঁধা। দুটো কি তার নিজের কাজ? নিজের কাজ বলতে আমার কোনও আপত্তি থাকবে না যদি বাজার করবার টাকাটি তার স্বোপার্জিত হয়, অথবা যে সন্তানকে সে আনা-নেওয়া করছে সে সন্তান তার পরিচয়ের হয়? না, কোনওটিই তার নয়। যে টাকা নিয়ে সে কেনাকাটা করে, সেটি অন্যের টাকা। যে সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেয়, সে অন্যের সন্তান। অন্যের সন্তান মানে তার স্বামীর সন্তান। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যে-কোনও সন্তানই পিতার পরিচয় নিয়ে বাস করে।
অতএব কাজদুটোকে মেয়েদের নিজের কাজ বলতে আমি রাজি নই। মেয়েরা বাজার করে, স্বামী-সন্তানের জন্য রাঁধে, তাদের খাওয়ায়। কারণ পুরুষের সেবা করবার জন্যই তার জন্ম এবং তার বেঁচে থাকা।
লোকে বলে, মেয়েরা এখন যেহেতু বাজার করে বা সন্তানপালনে সহায়তা করে সেহেতু তাদের স্বাধীনতা বেশ হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। অথচ আশ্চর্য যে, কেউ বলছেন না বাজার করা এবং স্কুলে বাচ্চা নেওয়ার কাজ আসলে ভৃত্যের কাজ। বাড়ির ভৃত্যরাই সাধারণত এই কাজগুলোর দায়িত্ব পেত। সম্ভবত গৃহকর্তা এখন হিসেব করে দেখছেন যে, ভৃত্যদের অবিশ্বস্ততার জন্য মাঝে মধ্যে ‘লস’ খেতে হয়, তাই বাড়ির গৃহিণী নামক ‘বিশ্বস্ত ভৃত্য’ দ্বারাই কাঁচা বাজার এবং স্কুলের কাজ করানো যায়, এতে লসের সম্ভাবনা নেই, এদিকে গৃহিণীও ভেবে বসে আছে কাঁচা বাজার এবং স্কুল তাকে মুক্তির পথ দেখাবে। এখানেই তার সকল স্বাধীনতা।
২. প্রাইভেট ফার্মে কাজ করে, এমন ন’জন মেয়ের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। ন’জনই বলেছে তারা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্বারা নিষ্পেষিত। নিষ্পেষিত শব্দটি এখানে এই জন্য ব্যবহার করা হল যে, যেহেতু তাদের বিগ বস প্রায়ই তাদের কাজের ছুতোয় রুমে ডাকেন, মিঠে মিঠে গল্প করেন এবং ‘পেষণ’ করেন। আক্ষরিক অর্থেই পেষণ। ন’জনই বলল, তারা পিষ্ট হতে চায় না কিন্তু এ ছাড়া উপায় নেই, ‘পেষণ’ করতে না দিলে তাদের চাকরিটি যাবে। আর চাকরি গেলে তাদের বিষম ক্ষতি।
পুরুষ এবং নারী চাকরিজীবীর ক্ষেত্রে বড় এক পার্থক্য আছে। চাকরিতে পুরুষের কেবল মেধা ও শ্রম দিলেই হয়, আর নারীকে মেধা ও শ্রম তো দিতেই হয়, তার উপর নিজেকে পিষ্ট হতে দিতে হয়। সুতরাং চাকরিতে নারীর ইনভেস্টমেন্ট সব সময় বেশি।
বেশি দিয়ে তাকে কম পেতে হয়। ঢালাও শ্রমিক নেবার প্রবণতা যে-সব কারখানার, তারা জানে নারীরা দেয় বেশি, পায় কম। শুধু কারখানায় নয়, প্রাইভেট ফার্মে নয়, সমাজের সর্বত্র নারীরা দেয় বেশি, পায় কম।
৩. আমার ছোটবোনের একটি মেয়ে হয়েছে। চমৎকার স্বাস্থ্যবান, সুন্দর একটি মেয়ে। আমার ছোটবোন, তার একটি মেয়ে হোক— এমনই চেয়েছিল। অথচ মেয়ে জন্মাবার পর থেকে তাকে অদ্ভুত সব কথা শুনতে হচ্ছে। যে প্রফেসর সিজার করলেন, তিনিই প্রথম আমার বোনের জ্ঞান ফেরবার পর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন— দুঃখ কোরো না, পরেরবার ছেলে হবে নিশ্চয়। কন্যা নিয়ে যখন বোন এবং বোনের স্বামী আনন্দে আত্মহারা, তখন পড়শিরা এক-এক করে সান্ত্বনা দিতে এলেন, তাঁদের একটিই কথা— মেয়ে হয়েছে, দুঃখ করবেন না ভাই, দুঃখ করে কী লাভ! বোন এবং বোনের স্বামী বলে— দুঃখ তো আমরা করছি না। এতে কিন্তু পড়শিরা মানেন না, তারা নিশ্চিত, কন্যা জন্মালে দম্পতিকে দুঃখ করতেই হয়।
বোনের স্বামী অফিসে গেল, বন্ধুবান্ধবদের আড্ডায় গেল। মেয়ে হবার সংবাদটি পরিবেশন করবার পর বন্ধুবান্ধব এবং অফিসের পিওন থেকে এম ডি পর্যন্ত সকলে বলল— থাক, দুঃখ কোরো না।
বোন এবং বোনের স্বামী বরং দুঃখ করে বলে— আমরা মোটেই দুঃখ করছি না। অথচ সকলে আমাদের আগ বাড়িয়ে দুঃখ না করবার পরামর্শ দিচ্ছে।
এই সান্ত্বনাগুলোই এখন ওদের বিব্রত করে বেশি। ওরা ভয় পেয়ে গেছে মানুষের আফসোস আর চুকচুক দুঃখধ্বনিতে।
৪. আড়ং-এ এবং বেইলি রোডের বেশকিছু শাড়ির দোকানে মেয়েরা সেলস গার্ল অথবা সেলস উইমেন-এর কাজ করে। আমি লক্ষ করেছি, বিক্রেতা হিসেবে মেয়েরা অত্যন্ত ভদ্র, অমায়িক এবং সহিষ্ণু। যেহেতু মেয়েরা কৃতিত্বের পরিচয় দিচ্ছে, মেয়েদের নিশ্চয় তবে এই কাজে খুব বেশি এগিয়ে আসা উচিত।
অনেকে বলে, বিক্রেতা হওয়া মেয়েদের জন্য বড় লজ্জার কাজ। বিক্রেতা হলে তার মানসম্মান লোপ পায়। এ কিন্তু ঠিক নয়, কোনও সৎ কাজেই কোনও মানুষের মান যাবার কথা নয়। অনেক বেকার মেয়ে ঘুরছে কাজের আশায়। অথচ তারা কাজ পাচ্ছে না, যেহেতু লোকে বলে মেয়েদের সেলস গার্ল হওয়া ঠিক নয়। দোকানের মালিকরাও এই কথায় সায় দেয় অথবা প্রভাবিত হয়।
মেয়েদের সেলস গার্ল হওয়া মানাবে কেন, তাদের ‘কলগার্ল’ হওয়া মানায়। মেয়েদের কলগার্ল বানাতে সমাজে যত উৎসাহ, সেলস গার্ল বানাতে তত উৎসাহ নেই।
মেয়েদের অকর্মণ্য করে রাখবার জন্য সমাজ-সংসার বড় তৎপর। তাদের এই অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সময় এখন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন