‘রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে’

তসলিমা নাসরিন

‘ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল, লাগলো যে দোল, স্থলে জলে বনতলে লাগলো যে দোল’—গানটি শুনতে শুনতে ঘুম ভাঙল। সেদিন দোলের দিন, শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসব। আমরা গৃহবাসী দ্বার খুলে আম্রকুঞ্জের দিকে এগিয়ে গেলাম। যেন ঋতুরাজ এসে আম্রকুঞ্জেই আজ বসেছে। তাকে নিয়ে হবে আনন্দ-উৎসব আমাদের। আমার মুগ্ধ চোখ কোনও বনতল, বৃক্ষ, গানে ও রঙে নিমগ্ন মানুষ থেকে সরেনি। আমি বাহির থেকে কেবলই অন্তরের দিকে এগোচ্ছি। মানুষের মধ্যে এখনও এত সুস্থতা, এখনও এত সৌন্দর্য আমাকে বড় অবাক করে দেয়। আমরা তৃতীয় বিশ্বের কঙ্কালসার জাতি, আমরা কী করে ধারণ করি এত অমল আনন্দ? ভোরবেলা থেকে বসন্তের গান, বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে নাচ, লক্ষ মানুষ সেই সুরে ও ছন্দে মেতে আছে। আমিও মিশে আছি স্রোতে, রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে দাঁড়িয়ে আমারও মনে লেগেছে দোলের দোলা; এত গভীর করে এর আগে বসন্তকে গ্রহণ করিনি। এর আগে বসন্তের উতল হাওয়া এমন লাগেনি গায়ে। এমন বাসিনি ভাল আগে পৃথিবীর আলো, হাওয়া, মাটি ও মানুষ।

গা পেতে সকলে সকলের আবির নিয়েছে। মাঠে, আম্রকুঞ্জে, কলাভবনে, সংগীত ভবনে আবির ছড়ানোর উৎসবে সকলের কণ্ঠে ছিল গান, সকলের শরীরে ছিল নৃত্য। আহা, যারা এই সুখের স্বাদ পায়নি, তাদের জন্য বড় মায়া হয় আমার।

শান্তিনিকেতনের আলাদা একটি ঘ্রাণ আছে। আমি জানি না কোত্থেকে এক ঘ্রাণ এসে প্রাণ ভাসিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথকে এত কাছ থেকে দেখতে কেমন জানি লাগে। তাঁর স্মৃতি ও স্বপ্নের গভীর নিকটে দাঁড়িয়ে আমি ভুলে গিয়েছি আমার সারা জীবনের শোক। আমি আবির ছড়িয়ে দিয়েছি আমার মনে। নানা রঙের আবিরে আমি এখনও প্লাবিত।

রাতে কোপাই নদীর ধারে পূর্ণিমার জলে ডুবেছি। আমার সারা শরীরের বেদনা ধুয়ে দিয়েছে সাদা জ্যোৎস্নার জল। চাঁদের সঙ্গে আমরা খেলেছি অপরূপ খেলা। কে বলে কোপাই-এ জল নেই, শুকিয়ে কাঠ? জ্যোৎস্না এত জল ফেলেছে কোপাই-এ! এত জল, এত স্নিগ্ধ, স্বচ্ছ জল। কোপাই-এর জলেও আমি ডুবেছি শতবার।

বসন্ত উৎসবকে বলেছি, আবার দেখা হবে, আবার আমি আবির ছড়িয়ে দিতে, বোলপুরের দগ্ধ মাটিতে ভালবাসার জল ছিটোতে আসব, দেখা হবে। উত্তরায়ণকে বলেছি, দেখা হবে। ছাতিমতলাকে বলেছি, দেখা হবে। উপাসনালয়, আশ্রম, আম্রকুঞ্জ— সকলকে বলেছি, দেখা হবে। রামকিঙ্করের সাঁওতাল রমণীকে বলেছি, দেখা হবে। বুদ্ধকে বলেছি, ‘সুজাতাকে বলেছি। কালোর দোকান, সুবর্ণরেখাকে বলেছি—দেখা হবে। দেখা হবেই। যদি গান ভালবাসি, দেখা হবে। ঝাউবনকে বলেছি, সাইকেলে চেপে ছুটে যাওয়া রবীন্দ্র-তরুণীকে বলেছি, দেখা হবে। ধুলো, বালি, ঘাস, পাথরকুচিকে বলেছি, দেখা হবে। দেখা তো হবেই। কোপাই, তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে। আবার পূর্ণিমায় আমরা অমন আনন্দে মাতব। আবার সব দুঃখ ধুয়ে দিতে জ্যোৎস্নার জলে জীবন পেতে দেব।

রবীন্দ্রনাথকে আমি ঈশ্বর বলে মানি। আমার চোখের সামনে ঈশ্বরের যে ছবিটি হঠাৎ হঠাৎ ভেসে ওঠে, সে তার রক্তমাংস শিল্পস্বপ্নসহ কেবলই রবীন্দ্রনাথ। এই আমার ধর্ম, আমি এই এক ঈশ্বরের কাছে পরাজিত। আর কোনও ঈশ্বর-দোষ, আর কোনও লৌকিক বা পারলৌকিক মোহ আমার নেই। জগতে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া সামনে কোনও দেওয়াল রাখিনি, আর কোনও গন্তব্য নেই আমার যাবার।

বসন্ত উৎসবের আবিররাঙা দুপুরে সুনীলদা’র বাড়ির শীতল মেঝেয় বসে সমরেন্দ্র সেনগুপ্তর সঙ্গে কথা বলছিলাম। সমরেন্দ্র বললেন, ‘আমি তাঁর সংগীতের দাসানুদাস।’ তখন বাড়ির পুকুরে সাঁতার দিচ্ছেন সুনীলদা, আর আমার ভেতর-ঘরে বাজছে ‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান, তোমার হাওয়ায় হাওয়ায়…’

না, আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না, বাড়িয়ে বলছি না যে, তাঁর পূর্ণিমায় ভিজে আমি শুদ্ধ হয়েছি। বাড়িয়ে বলছি না, তাঁর সংগীতের দাসানুদাস হবার জন্য আমার আরও সহস্র বছর বাঁচতে ইচ্ছে করে। কবি সমরেন্দ্রর হাতে কোনও পানপাত্র ছিল না। সুনীলদার হাতেও নয়। সুনীলদার হাতে ছিল আবির, যে আবির ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তিনি উৎসবে হেসেছেন। আমরা তাঁর সংগীত পান করেছি সারা দিন, সারা জ্যোৎস্না। এই পানে কার না নেশা হয়!

যে কখনও গান গাইতে জানে না, সেও গেয়েছে। এই আমি, আমার কণ্ঠে সুর ওঠে না বলেই জানি। অথচ আমিও গানে মেতেছিলাম। শান্তিনিকেতনের সবকটি বৃক্ষ গেয়েছিল, সবকটি ফুল, পাতা, পাখি, সবকটি হু হু হাওয়া, নদীর সবকটি ঢেউ। সন্ধ্যার ‘শ্যামা’য় দাঁড়িয়ে চৈতালি গেয়েছিল, কোপাই-এর দিকে যেতে যেতে উর্মিলা গেয়েছিল, গৌতম গেয়েছিল, ভর জ্যোৎস্নার মাঠে বসে দীপেন গেয়েছিল, সুপর্ণাদি গেয়েছিল। ছাদে বসে খোলা রাতে গেয়েছিল রেখা মৈত্র, সৌমিত্রদা, অশেষ, মৃদুল। আহা, এমন গানের জীবন রেখে কে ফিরতে চায় ইট-কাঠ-সুরকির নিরালোকে!

আমার ফিরতে ইচ্ছে করেনি। আমি তাঁর পায়ের কাছে নতজানু বসতে চেয়েছি। আমি তাঁর সুধারসে ভেসেছি, আমি আকণ্ঠ ডুবেছি তাঁর অতলে। এখনও, ঢাকায় ফিরে, প্রতি ভোরে আমি খুব গোপনে গোপনে লক্ষ করি, কে যেন ডাকে আমাকে। সূর্য ওঠার আগে আমাকে কেউ ডাকে, খুব নিবিড় করে ডাকে, ডেকে বলে ‘ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল…’। আমি দ্বার খুলে ভোরের সূর্যোদয় দেখি। আমার কাছে সবকিছু, এই আলো, হাওয়া, বৃক্ষ, নদী, মাটি ও মানুষ সব বড় আপন আপন লাগে। সব বড় স্নিগ্ধ মনে হয়, বড় স্বপ্নময়, সুন্দর।

এ কি ভেতরে-বাইরে শুদ্ধ হওয়া নয়? আমি এক সুন্দরের দিকে যাচ্ছি জানি, অসুন্দরের খোয়া পাথর ডিঙিয়ে আমার সুন্দরের দিকে। আমার ঈশ্বরের দিকে। কে আছে আমাকে ফেরায়? কোনও ধর্মযুদ্ধ, কোনও আধিভৌতিক অপশক্তির সাহস আছে আমাকে ফেরায়?

সকল অধ্যায়
১.
‘আর রেখ না আঁধারে আমায় দেখতে দাও’
২.
আশায় আশায় থাকি
৩.
আমাদের বুদ্ধিজীবীরা
৪.
আগ্রাসন
৫.
নগর-যাপন
৬.
‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’
৭.
‘কার নিন্দা কর তুমি। মাথা কর নত। এ আমার এ তোমার পাপ।’
৮.
‘দুঃখরাতের গান’
৯.
বৃত্ত
১০.
নাগরিক খাঁচা
১১.
‘নিজ বাসভূমে পরবাসী’
১২.
সকল সন্তানই বৈধ
১৩.
‘জারজ’ শব্দের বিলুপ্তি চাই
১৪.
নারীভোজ
১৫.
‘তৃষ্ণার শান্তি সুন্দর কান্তি’
১৬.
‘মুক্ত করো ভয়’
১৭.
‘সখী, আঁধারে একেলা ঘরে মন মানে না’
১৮.
‘নিশিদিন ভরসা রাখিস’
১৯.
‘আমাদের যাত্রা হল শুরু’
২০.
‘খসিল কি আপন পুরনো পরিচয়?’
২১.
‘সীমার মাঝে অসীম তুমি’
২২.
ঝরে পড়া শিক্ষার্থী
২৩.
‘বজ্রানলে বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে’
২৪.
নাস্তিক্যবাদ
২৫.
নিজের পায়ে নিজের কুড়োল
২৬.
গোটা দুই ‘পতিত’, ছ’সাতটি ‘রক্ষিত’ হলে জমত বেশ
২৭.
খারাপ মেয়ের গল্প
২৮.
শব্দবাণবিদ্ধ নারী
২৯.
থ্রি চিয়ার্স ফর হাসিবা
৩০.
‘বড় বিস্ময় লাগে’
৩১.
‘রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে’
৩২.
‘মন কেমন করে’
৩৩.
বিজ্ঞাপনের নারী
৩৪.
‘কে বলেছে তোমায় বঁধু এত দুঃখ সইতে…’
৩৫.
ইসলামি থাবা
৩৬.
নিজের গোলা শূন্য
৩৭.
‘নপুংসক’ বিষয়ক
৩৮.
‘MEGALOMANIA, THY NAME IS MAN’
৩৯.
ধর্মের কাজ ধর্ম করেছে
৪০.
কন্যাজন্মের প্রায়শ্চিত্ত
৪১.
অবদমন
৪২.
গিনিপিগ
৪৩.
হিন্দুর উত্তরাধিকার
৪৪.
বাঙালি মুসলমানের দুর্মতি ও দুর্গতি
৪৫.
রাজনীতির ফাঁকফোকর
৪৬.
নারীর নামপরিচয়
৪৭.
কাজ
৪৮.
পাকিস্তান-প্রীতি, অলৌকিকতা এবং অভিজ্ঞতা
৪৯.
কবরের খবর
৫০.
যদি সত্য কথা বলি
৫১.
সংসার-চিতা
৫২.
অনভ্যাস
৫৩.
যে-কোনও নারীই আজ নুরজাহান
৫৪.
ঘটনা-দুর্ঘটনা
৫৫.
‘উই শ্যাল ওভারকাম’
৫৬.
‘ভাবনার ভাস্কর্য’
৫৭.
‘একলা চলো রে…’
৫৮.
অতঃপর নারী হবে মসজিদের ইমাম
৫৯.
‘ভালবেসে যদি সুখ নাহি…’
৬০.
আইন বদল
৬১.
প্ৰথা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%