তসলিমা নাসরিন
‘কমলগঞ্জের ছাতকছড়া গ্রামের মানুষেরা নুরজাহানকে পাথর ছুড়ে মেরে ফেলেছে’– এই কথা বললে লোকে বলবে ছাতকছড়া গ্রামের মানুষেরা নয়, মেরেছে মওলানা মান্নান। আমার প্রশ্ন— মওলানা মান্নানের আদেশে নুরজাহানকে যখন পাথর ছুড়ে মারা হয়, তখন ছাতকছড়ার ভালমানুষেরা কোথায় ছিল? তারা মওলানার ফতোয়া শুনেছে, ইসমাইলের বাড়িতে গর্ত খুঁড়েছে, গর্তের মধ্যে নুরজাহানকে দাঁড় করিয়েছে, পাথর মেরেছে অথবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে পাথর ছোঁড়া দেখেছে। তারা মওলানাকে ওই গর্তের মধ্যে পুরে কেন জীবন্ত মাটি চাপা দেয়নি? যেহেতু দেয়নি তাই দোষ একা মওলানার নয়, ছাতকছড়া গ্রামের সকলেই এই দোষে দোষী। মওলানা মান্নানদের চরিত্র বুঝতে এখনও কেন মানুষের দেরি হয়, আমি বুঝি না। যারা মওলানা মান্নানদের ফতোয়া মেনে চলে তারা আর মওলানা মান্নানে আমি কোনও পার্থক্য দেখি না। যদি রোধ করবার শক্তি না থাকে, তবে অন্যায়ের দায় কেবল মওলানাদের নয়, রোধ যারা করতে না পারে— তাদেরও। অনেকে অবাক হয়েছে, বলেছে, ‘এই যুগে পাথর ছুড়ে মারা, ছি ছি।’ শুনে আমি হেসে বলি, পাথর ছুড়ে মারবার দৃশ্য দৃষ্টিকটু লাগছে। পাথর এমন ছোড়াই হচ্ছে নিরন্তর নারীর শরীরে ও মনে— অদৃশ্য পাথর। লোকে তা দেখতে পায় না বলে পত্রিকায় ছাপা হয় না। কাউকে পাথর ছুড়ে মেরে ফেলা— ব্যভিচারের বেলায় শরিয়তি আইন প্রায় এ-ধরনের কথাই বলে। সারা দেশ যখন আধা শরিয়তি আইন মেনে চলছে, প্রতিবাদ করছে না, ছাতকছড়া গ্রামে তখন খানিকটা কড়া করে শরিয়তি আইন যদি প্রয়োগ করা হয়, বাধা কে দেবে? অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে ওঠবার মানুষ দিন দিন কমে আসছে। মানুষ মাথা নত করছে, মানুষ নতজানু হচ্ছে, বাদ্ধ হচ্ছে মৌলবাদীদের সামনে।
মওলানা নুরজাহানকে নিজের ভোগের জন্য কামনা করেছিল। তার কাম চরিতার্থ হয়নি বলে সে এই নৃশংস কাণ্ড ঘটিয়েছে। মওলানারা নুরজাহানদের কামনা করে এবং তাদের সর্বনাশ করে। কিছু সর্বনাশ দেখা যায়, কিছু দেখা যায় না। যে অদৃশ্য পাথর নারীকে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, তা আরও ভয়ংকর, আরও নৃশংস। নারীকে একা তা ভোগ করতে হয়। একা পোহাতে হয় সমাজের সকল সন্ত্রাস, একা তাকে পান করতে হয় সমাজে সবটুকু গরল।
আমি এর আগে বলেছি, হিংস্ৰ জন্তুও এত হিংস্র নয়, পুরুষ যত হিংস্র। পুরুষেরা নারীকে শাস্তি দেবার জন্য নানা রকম আইন, ফতোয়া তৈরি করেছে। এ-সব আরোপ করে তারা নারীর দুঃসহ যন্ত্রণা দেখে আনন্দ অর্জন করে। জন্তুও তার স্বগোত্র জন্তুকে এত কামড়ায় না, যত কামড়ায় পুরুষেরা নারীকে। জন্তুর জীবনে কোনও সভ্যতার বালাই নেই, তবু তাদের চরিত্রেও এ-যুগে এত নির্মমতা, পাশবিকতা, নৃশংসতা দেখা যায় না। মওলানা মান্নানের শাস্তি হবে না। তাকে কেউ এর বিপরীতে পাথর ছুড়বে না, সে চমৎকার থাকবে সমাজে। সে এর পর আরও আরও নুরজাহানের প্রতি লোভ করবে, না পেলে পাথর না হোক, অন্য কিছু ছুড়বে। এরা সমাজের বড় একটি গদিতে বসে নারীর দিকে ছুড়ে দিচ্ছে অবহেলা, অসম্মান, অন্যায়, অত্যাচার, অকথ্য নির্যাতন। নারী মরে যাচ্ছে, কেউ কেউ ধুঁকে ধুঁকে বেঁচেও থাকছে। তার মৃত্যু এবং বেঁচে থাকায় দৃশ্যত পার্থক্য থাকলেও অন্তর্গত কোনও পার্থক্য নেই।
নুরজাহান বেঁচে থাকলে কী এমন সুখ তার? এক স্বামী তালাক দিয়েছিল, আরেক স্বামীও তালাক দিত। লাথিঝাঁটা সে যে কোনও স্বামীর কাছেই পেত। সমাজের মুরুব্বিরা এসে, তাকে দিনের পর দিন যে অত্যাচার সইতে হত, তার সময় কমিয়ে একদিনেই তাকে না হয় মেরে রেখেছে। এও এক ধরনের বাঁচা, নুরজাহানের।
আমরা নারীরা আসলে সকলেই এক-একজন নুরজাহান। আমাদের জন্য গর্ত খোঁড়া হয়েছে। আমাদের জন্য বিচিত্র বিচিত্র সব ফতোয়া জারি করা হয়। আমরা ঘরে বসে থাকবার জিনিস, আমরা পর্দার ভেতরে থাকবার জিনিস, আমরা জন্মের পর একটি পুরুষ-অভিভাবক দ্বারা শাসিত হই, বিয়ে নামক ঘটনা দ্বারা নিবেদিত হই স্বামী নামক অভিভাবকের কাছে, তার ভোগের জন্য শরীর এবং হৃদয় সঁপে দিই, আমাদের তালাক দেওয়া হয়, তালাকপ্রাপ্তদের বাঁচিয়ে রাখবার জন্য আবার খোরপোশও দেওয়া হয়, যেন বেঁচে থেকে আরও আরও পুরুষের ভোগের জন্য সমর্পিত হতে পারি। আমাদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বনির্ভরতা ও সচেতনতার ব্যবস্থা নেই। যা আছে সবই অন্তঃসারশূন্য। সত্যিকার শিক্ষা নয়, স্বাস্থ্য নয়, সত্যিকার চৈতন্য নয়। সব লোকদেখানো।
এইসব ফতোয়া, সমাজের এইসব নীতি ও নিয়মের জালে ফেলে নারীকে অন্ধ, বধির করে রেখে পুরুষের আনন্দ অর্জন— সে অনেকদিনের কাহিনি। দেশের লক্ষ লক্ষ মওলানা এ-রকম লক্ষ কোটি নুরজাহানকে মেরে ফেলেছে। একটি পত্রিকায় ঘটনাচক্রে একটি খবর প্রচার হয়েছে, তার মানে এই নয় যে পত্রিকায় যখন আমরা হাসিনা-খালেদার বক্তৃতা ছাপা হতে দেখি, ক্লিনটনের নির্বাচন বা নির্বাচনোত্তর আনন্দ-উৎসব দেখি বা পড়ি, তখন নুরজাহানরা মরছে না। তখনও কিন্তু আমাদের এই দেশের কোথাও-না-কোথাও কোনও-না-কোনও নুরজাহানকে কোনও কোনও মওলানা গলা টিপে মারছে, ফাঁসি দিচ্ছে, বিষ খাওয়াচ্ছে, পাথর ছুড়ছে, জবাই করছে। যে নারী ভাবে যে, সে নুরজাহানের মতো অত্যাচারিত নয়, সে মিথ্যে ভাবে। বোধোদয় হলে সে একদিন নিশ্চয়ই বুঝবে, সেও আসলে নিতান্তই এক নুরজাহান। আশা করছি, তখনই তার রুখে দাঁড়াবার আসল সময় উপস্থিত হবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন