কনকপুরের রাজপুত্র এখন রাজা

রতনতনু ঘাটী

এখন কনকপুরের রাজপুত্রই হলেন কনকপুরের রাজামশাই। তাঁর নাম অকুতোভয়। তিনি সবসময় মাথা উঁচু করে চলাফেরা করেন। আশপাশের রাজারা সকলেই তাঁর সাহসের কাছে হার মানেন। রাজ্যের মানুষ বলে, যখন নীল আকাশে সাদা মেঘের ডিঙিনৌকোগুলো তিরতির করে ভাসতে ভাসতে কোথায় উধাও হয়ে যায়, তখন রানিমার পান সেজে রাখা রুপোর পানদানির রঙের চাঁদ ওঠে। তখনই নাকি নয়ন সরোবরের শ্বেতপাথর বঁাধানো ঘাটে বাঘে-গোরুতে একসঙ্গে জল খেতে আসে।

সেআবার হয় নাকি?

হ্যাঁ হয়। এসব রাজা অকুতোভয়ের রাজ্যেই হয়। তাঁর নাকি অমন দাপট!

রাজা রোজ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে রাজপোশাকে সজ্জিত হয়ে রাজপ্রাসাদ থেকে অনেকটা দূরের বনে বেড়াতে যান। মাথায় থাকে হিরে-মানিক-মুক্তো বসানো রাজমুকুট। কোমরের কিংখাবে বঁাধা থাকে সোনার খাপে ভরা রুপোর তীক্ষ্ণধার তরবারি।

তিনি একা একা যান?

না না, রাজার কি একা একা কোথাও যাওয়া মানায়? সঙ্গে থাকে কত কত লোকলশকর, পাইক-বরকন্দাজ। সৈন্যসামন্তও যে থাকে না তা নয়।

কোনো রাজপন্ডিত থাকেন না সঙ্গে?

হ্যাঁ, তাও থাকেন বইকী! একজন প্রবীণ রাজপন্ডিতও থাকেন রাজার সঙ্গে। তিনি রাজার মনের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে পাশে পাশে চলেন। সেখানে যেতে হলে একটা লতাবটের জঙ্গল পেরোতে হয়।

লতাবট আবার কী? বট গাছ কখনো লতানে হয় নাকি?

হয়, হয়। অনেক দিন আগে সেবনে অকুতোভয়ের বাবা রাজা নিরুদ্বেগকুমার একটা অস্ত্রাগার গড়ে তুলেছিলেন। এখন সেটা একটা পোড়োবাড়ি। তারই লম্বা লম্বা দেওয়ালে নীলমণিলতার পাতার মতো দেখতে অমন পাতায় ভরা কত যে লতাবট গাছ লতিয়ে লতিয়ে গোটা পোড়ো অস্ত্রাগারটাকেই ঢেকে ফেলেছে।

সেটা পেরোলে একটা বড়ো কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে। তার একদম গায়ে গায়ে আরও একটা মাঝারি আর একটা ছোটো কৃষ্ণচূড়ার গাছও আছে।

রাজা অকুতোভয়ের অভিষেকের দিন রাজপুরোহিত রাজা নিরুদ্বেগকুমারকে বলেছিলেন, ‘‘মহারাজ, অভিষেকের দিন নিজের হাতে নতুন রাজাকে একটা গাছ লাগাতে হয়!’’

রাজপুত্র অকুতোভয় সেদিন সত্যিই একটা গাছ লাগিয়েছিলেন?

হ্যাঁ, লাগিয়ে ছিলেন তো! সেদিন রাজা এই কৃষ্ণচূড়ার চারাগাছটা নিজের হাতে এখানে লাগিয়ে ছিলেন। এখন তা কত বড়ো বৃক্ষ! তার পাশে আবার দুটো কৃষ্ণচূড়ার গাছও হয়েছে।

এখন বৈশাখের এই গরমে গুচ্ছ গুচ্ছ লাল, হলুদ, কমলা ফুলে নিজেকে সাজিয়ে তুলেছে এই ছায়াময় কৃষ্ণচূড়া। গত কালও রাজা এই তিনটে গাছের নীচে মোহিত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অনেকক্ষণ। ভাবছিলেন গরমের পর বর্ষায় আবারও ফুটবে কৃষ্ণচূড়া। ফুটে থাকবে সেই ভাদ্র মাস পর্যন্ত। রাজা অকুতোভয় হঠাৎ মুখ তুলে তাকিয়েছিলেন রাজপন্ডিতের দিকে।

রাজপন্ডিত সবসময় রাজার মনের প্রশ্ন বুঝতে পারেন।

কারো মনের প্রশ্ন বুঝতে পারা যায় নাকি?

যায়, যায়। যদি তিনি রাজপন্ডিত হন, তিনি রাজার মনের প্রশ্ন বুঝতে পারেন বইকী। রাজপুরোহিত হেসে বলেছিলেন, ‘‘মহারাজ, এই কৃষ্ণচূড়া আসলে পূর্ব আফ্রিকার বনের গাছ। কিন্তু দেখুন, কেমন আমাদের পৌরাণিক পুরুষ শ্রীকৃষ্ণের নামে এর নাম! এ এখন আমাদেরই দেশের গাছ!’’

আজও রাজা অকুতোভয় সকলকে নিয়ে প্রতিদিনের মতো এসেছেন কৃষ্ণচূড়ার রূপ দেখতে। এসে দেখেন, কোনো এক কাঠচোর ন্যাড়ামুড়ো করে দুটো কৃষ্ণচূড়ার গাছই কেটে নিয়ে গেছে! শুধু দাঁড়িয়ে আছে গুঁড়ি থেকে কয়েকটা মোটা ডাল। আর বড়ো যে কৃষ্ণচূড়ার গাছটা ছিল, সেই গাছটা গোড়া থেকে কেটে নিয়ে গেছে!

রাজা মন খারাপ করে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন গাছ তিনটের পাশে। মাঝারি কৃষ্ণচূড়ারই একটা কেটে নিয়ে যাওয়া ডালে একটা নাম-না-জানা দুঃখী পাখি নিঝুম হয়ে বসে আছে।

সেই পাখিও কি রাজার মতো খুব দুঃখ পেয়েছে গাছটা কেটে নিয়ে যাওয়ার জন্যে? পাখিরা কি তবে আমাদের মতো দুঃখ পায়?

হ্যাঁ, গাছ কাটলে পাখিরা দুঃখ পায়ই তো! গাছ কাটলে কার না দুঃখ হয়? মানুষেরও দুঃখ হয়।

রাজার সঙ্গের লোকলশকর, পাইক-বরকন্দাজ, সৈন্যসামন্ত সকলেই মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এমনকী, সেই বৃদ্ধ রাজপন্ডিতও মনমরা হয়ে তাকিয়ে রইলেন গাছটার দিকে।

রাজা অকুতোভয় রাগে হুংকার দিয়ে উঠলেন, ‘‘আমার রাজ্যে একটি গাছও তো কেউ কাটে না? তা হলে কে করল এই কাজ? এর বিহিত চাই!’’

রাজার চারপাশে সৈন্যসামন্তের অস্ত্রের ঝনঝনি উঠল বনের নির্জনতা কাঁপিয়ে। হট্টগোল করে উঠল লোকলশকর, পাইক-বরকন্দাজ। পাশে রাজপুরোহিত দিশেহারার মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।

রাজা অকুতোভয় তাঁর নিজের হাতে লাগানো কৃষ্ণচূড়া গাছটার কাটা গুঁড়ির উপর খুলে রাখলেন তাঁর মাথার মহামূল্য রাজমুকুট! তারপর সোনার খাপ থেকে ঝনঝনাৎ শব্দে টেনে বের করলেন ঝকমকে রুপোর তরবারি। নিঝুম পাখিটির চোখ দুটো তেমনই বিষণ্ণ। মাঝারি কৃষ্ণচূড়ার একটা কাটা ডালের মাথায় তরবারিটা টাঙিয়ে দিয়ে রাজা রাজপন্ডিতের দিকে তাকালেন। তারপর শপথের ভঙ্গিতে ঘোষণা করলেন, ‘‘আজ থেকে আমার রাজ্যে আইন চালু হল পন্ডিতমশাই। এখন থেকে গাছ কাটার শাস্তির বিধানও থাকবে। কেউ আমার রাজ্যে একটিও গাছ কাটতে পারবে না।’’

রাজপুরোহিত, সৈন্যসামন্ত, পাইক-বরকন্দাজ, লোকলশকর সকলেই রাজামশাইয়ের কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়লেন। সকলকে নিয়ে মনের দুঃখে রাজা অকুতোভয় রাজপ্রাসাদের দিকে রওনা দিলেন। কৃষ্ণচূড়ার কাটা গুঁড়ির উপর পড়ে রইল মণিমুক্তোখচিত রাজমুকুট। গাছের ডালে ঝুলে রইল রুপোর রাজতরবারি।

রাজা সেগুলো সঙ্গে নিয়ে এলেন না যে? অত দামি জিনিসগুলো কি অমন করে ফেলে আসতে হয়?

হ্যাঁ হয়। যদি তা পৃথিবীর মঙ্গলের কাজে লাগে। তারপর রাজা অকুতোভয় পথ চলতে চলতে সকলের উদ্দেশে বললেন, ‘‘এই রাজমুকুট আজ থেকে বৃক্ষরক্ষার প্রতীক হয়ে রইল পন্ডিতমশাই! আমি কোনো দিন আর রাজমুকুট পরব না।’’

তারপর কী মনে হতে রাজা পিছন ফিরে একবার তাকালেন। দেখলেন, গাছের ডালে ঝুলছে রুপোর রাজতরবারি। তিনি আপন মনে বললেন, ‘‘আর এই রাজতরবারি আজ থেকে পৃথিবীতে বৃক্ষছেদনের শাস্তির প্রতীক হয়ে থাকল।’’

তখন হঠাৎ কোথা থেকে বঁাশির এক মায়াময় সুর ভেসে এল। কেউ মধুর সুরে বঁাশি বাজাচ্ছে। পিছন ফিরে সকলেই তাকালেন। দেখলেন, একজন পথভোলা পথিক নাম-না-জানা গাছের ছায়ায় আপন মনে বঁাশি বাজাতে বাজাতে এদিকেই আসছে।

রাজা অকুতোভয় কান পেতে মগ্ন হয়ে শুনলেন সেই সুর। তারপর তাঁর চোখ দুটো হিরের মতো চকচক করে উঠল আনন্দে। বললেন, ‘‘রাজপুরোহিত, মনে পড়ছে? যেদিন পৃথিবীতে প্রথম বৃক্ষের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল, সে-দিন এমন সুরই ধ্বনিত হয়েছিল বিশ্বব্রহ্মান্ডে?’’

রাজপুরোহিত গম্ভীর মুখে ঘাড় নাড়লেন শুধু।

দূরে ঝোপজঙ্গলের ভিতর থেকে ‘চিপ চিপ’ করে ডেকে উঠল একটা শাঁখারি মুনিয়া। সূর্য তখন সাদা পারিজাত গাছের মাথার উপর মুখ তুলেছে। রাজা অকুতোভয় পথ চলতে লাগলেন। পিছন থেকে বনতল মুখরিত করে ভেসে আসতে লাগল বৃক্ষবন্দনার সুর।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%