মামাদের পোষা পরি

রতনতনু ঘাটী

‘‘অনেকদিন আগে আমার মামাদের বাড়ি ছিল পলাশপুরে। পলাশপুর পেরোলেই একটা ধু-ধু মাঠ। মাঠ পেরোলেই একটা এতোলবেতোল নদী। সেই নদী পেরোলেই একটা উলুকঝুলুক বন। সেই বন থেকে আমার মামার দাদু একটা ছোট্ট পরি ধরে এনেছিলেন।’’

কাঁকনকে থামিয়ে দিয়ে লিপি বলল, ‘‘তুই থাম। আগে তো বলতিস তোর মামার বাড়ি হাতিবাগান। আর আজ বলছিস পলাশপুর। কোনটা ঠিক?’’

কাঁকন খুব একচোট হেসে বলল, ‘‘ও মা, তাও বুঝলি না? আমি যে-কথা বলছি, সেতো অনেক অনেকদিন আগের কথা। পরে তো মামার দাদু কলকাতার হাতিবাগানে বাড়ি কিনলেন। আমি তারও আগের কথা বলছি!’’

চুপ করতেই হল লিপিকে। লিপি চুপ করতেই দু-পাশে মাথা নেড়ে উপমা বলল, ‘‘আমি বিশ্বাস করি না।’’

কাঁকন রাগ রাগ ভঙ্গিতে বলল, ‘‘কী বিশ্বাস করিস না?’’

উপমা বলল, ‘‘ওই পরি। পরি কি সত্যি নাকি যে বন থেকে ধরে আনা যায়?’’

কাকন দু-হাত দু-গালে চেপে চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে বলল, ‘‘ওমা, পরি সত্যি না? তা হলে কবে-না-কবে বলে বসিস, ডাইনোসরও সত্যি না। তুই যে কী!’’

সবাই চুপ। একটু পরে কাঁকন বলল, ‘‘ডাইনোসরও যেমন একসময় পৃথিবীতে ঘুরে বেড়োতো, কিন্তু এখন আর নেই। তেমনই পরিরাও একসময় বনে বনে উড়ে বেড়াতো। এখন আর নেই।’’

লিপি, উপমা এ-কথার কোনো উত্তর দিতে পারল না। চুপ করে রইল। দোয়েল বলল, ‘‘বল না কাঁকন, তারপর কী হল?’’

কাঁকনের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘‘শোন তবে। মামার দাদু যে পরিটা এনেছিলেন, সেটা একটা বাচ্চা পরি। একদম ছোট্ট, এইটুকুনি। আর ধবধবে সাদা, ঠিক যেন দুধের মতো। না না, ঠিক যেন কাশফুলের মতো। না না, ঠিক যেন বরফের মতো। আসলে মামার দাদু পরিটা কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। বাচ্চা পরি তো, তাই উড়তে পারত না। এইটুকু দুটো ডানা।’’ বলে হাত দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করল কাঁকন।

ওরা ক্লাস থ্রি-তে পড়ে। স্কুল থেকে বেড়াতে এসেছে। এসেই যে-যার বন্ধুরা মিলে কেউ গল্প করছে, কেউ কানামাছি খেলছে। কেউ-কেউ গেছে ফুলের বাগানে প্রজাপতি আর ঘাসফড়িং ধরতে। দিদিমণিরা সতর্ক চোখে লক্ষ রেখেছেন সকলের ওপর। কাঁকন, লিপি উপমা আর দোয়েল—ওরা চার বন্ধু, ওরা গল্পের পোকা। তাই ওরা বসিয়েছে গল্পের আসর।

কাঁকন ফের শুরু করল, ‘‘পরিটার ডানার পালকে লাল, হলুদ আর সবুজের ছিটে। পালকগুলো কী নরম, তুলতুলে! পরিটার মুখটা দেখতে ঠিক যেন স্বর্গের বাগানে যেসব মালিনীরা ফুল তোলে দেবতাদের পুজোর জন্য, তাদের মতো। পরিটাকে নিয়ে আসার পর তিনতলার বারান্দায় বেঁধে রাখা হল শেকল দিয়ে। উড়তে গিয়ে যদি পড়ে যায় তিনতলা থেকে। এরপর মামার দাদু বসলেন বইপত্র নিয়ে। পরিরা কী খায়, প্রতিদিন স্নান করে কি না, অসুখ হলে কী ওষুধ দেওয়া উচিত—এই নিয়ে শুরু হয়ে গেল গবেষণা।’’

উপমা জিজ্ঞেস করল, ‘‘পরিরা কী খায় রে কাঁকন?’’

কাঁকন একটু হেসে বলল, ‘‘সেই কথাই তো বলছি। মামার দাদু প্রায় দেড়শো বছরের একটা পুরোনো বই থেকে পেয়ে গেলেন পরিদের নানারকম খাবারের কথা। পরিরা সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে ঝরনার জলে মুখ ধুয়ে ঝরনার জল খায়। তারপর একটু বেলা হলে খায় ফুলের মধু। ঝরনার জলে রোজ স্নান করে। মামাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে পাহাড়। সেখানে একটা ঝরনা আছে। মামার দাদু সেই ঝরনা থেকে রোজ জল আনার জন্য লোক ঠিক করলেন। কেউ রোজ পদ্মফুলের কোরক আনার কাজ পেল। কেউ চলল বকুল গাছের খোঁজে। মামার দাদু বারান্দায় সারাক্ষণ পরিটাকে নিয়ে থাকেন। ছোটোদের সেখানে যাওয়া মানা।’’

দোয়েল বলল, ‘‘কেন, ছোটোদের মানা কেন? পরি কি ছোটোদের খামচে দেয়, না কামড়ে দেয়?’’

কাঁকন দু-দিকে বেশ কয়েকবার ঘাড় নেড়ে বলল, ‘‘মোটেও তা না। আসলে পরিটা তো তখনও পোষ মানেনি। দেখতে দেখতে পরিটা পোষ মেনে গেল। আর পায়ে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয় না। যখন খুশি উড়ে যায়। ইচ্ছে মতোন ফিরে আসে। এখন ঝামেলা অনেক কমে গেছে। দূর পাহাড়ের ঝরনা থেকে এখন আর জল আনতে হয় না। সুন্দরবনের মউলেদের কাছ থেকে এখন আর মধু কিনতে হয় না। পরিটা একা একাই ফুলের মধু খেয়ে আসে।’’

কাঁকন একটু থামতেই সকলে ওর মুখের দিকে তাকাল। কাঁকন বলল, ‘‘মামাদের গ্রামের নাম পলাশপুর কেন জানিস? অগুনতি পলাশ গাছ ছিল মামাদের গ্রামে। একবার মামার দাদু গুনতে শুরু করেছিলেন, শেষ করতে পারেননি। মামার দাদু পরিটাকে পলাশ ফুলেরও মধু খাওয়ার অভ্যেস করিয়েছেন। এখন আবার পরিটা মামার দাদুর জন্য ভালো ভালো ফুল-ফল পেড়ে নিয়ে আসে।

‘‘বাড়ির ছোটোদের সঙ্গেও খুব ভাব হয়ে গেছে। পাঁচ-দশটা গ্রামের লোক মামার দাদুর পোষা পরির কথা জেনে গিয়েছিল। অনেকেই পরি দেখতে আসত। ছুটির দিন হলে তো কথাই নেই। ছোটোদের ভিড় উপচে পড়ত। গ্রামে মামার দাদুর বেশ সুনামও হয়েছে। লোকে বলত, পরিটার জন্যে মামার দাদুর যা খরচ হয়েছে, অর্ধেক জমিদারি বিক্রি হয়ে গেছে। তা হোক, তবু মামার দাদুর আনন্দের শেষ নেই। এ-রকম সময় একদিন পোষা পরিটা সকালে যে উড়ে গেল, আর সারদিন ফিরল না। হইচই পড়ে গেল পাঁচ-দশটা গ্রামে। সবাই দুষল মামার দাদুকে। দশটা-বিশটা পরি নয় যে ছেড়ে রাখবেন। বেঁধে রাখলেই হত। কেউ বলল, চিড়িয়াখানায় দিয়ে দিলে পারতেন। সেদিন রাতেও আর ফিরল না পরিটা।’’

লিপি জিজ্ঞেস করল, ‘‘আর কোনোদিন ফিরল না পরিটা?’’

কাঁকন দু-হাত তুলে বলল, ‘‘শোন না বলি। সেদিন ফিরল না। তার পরের দিন ফিরল দুপুর বেলা। সঙ্গে আরও একটা নীল পরির বাচ্চা।’’

দোয়েল বলল, ‘‘তা হলে আর বলছি কী? সঙ্গে সঙ্গে খবর ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। কলকাতার খবরের কাগজে ছাপা হল সেই খবর। কয়েকদিনের মধ্যে আমেরিকা থেকে লোক চলে এল পরি কিনতে। মামার দাদু কিছুতেই রাজি ছিলেন না নীল পরিটা বিক্রি করতে। সাদা পরিটাও তো পোষা। সেটাও বিক্রি করা যায় না। গ্রামে সবাই বোঝালো মামার দাদুকে। অনেক টাকা তো খরচ হয়েছে সাদা পরিটাকে পোষ মানাতে। অতএব নীল পরিটা বিক্রি করলে কিছু টাকা আসবে। তা ছাড়া ভারতের এমন একটা দুর্লভ জিনিস যদি বিদেশে যায় তো ভালোই। পরি তো ভারতের বাইরে আর কোথাও পাওয়া যায় না। সকলের কথা শুনে মামার দাদু নীল পরিটা অনেক টাকায় বিক্রি করে দিলেন।’’

উপমা জিজ্ঞেস করল, ‘‘পোষা পরিটার খুব মন খারাপ হয়ে গেল তো?’’

কাঁকন বলল, ‘‘হ্যাঁ, ক-দিন মন খারাপ করে চুপচাপ বসে রইল। তারপর আবার একদিন উধাও হয়ে গেল পরিটা। সবাই বলল, নীল পরিটা বিক্রি করা ঠিক হয়নি। এই পোষা পরিটা আর ফিরবে না। পরের দিন পোষা পরিটা ফিরে এল। সঙ্গে একটা ছোট্ট লাল পরির বাচ্চা। খবর পেয়ে বিদেশ থেকে আবারও লোক এসে কিনে নিয়ে গেল লাল পরিটা।

‘‘পোষা পরিটা এভাবে মাঝে মাঝেই পরি নিয়ে চলে আসত। আর মামার দাদু সেগুলো বিক্রি করে অনেক টাকা পেতেন। সেই টাকায় হাতিবাগানে একটা বড়ো বাড়িও কিনলেন। বাড়ির নাম রাখলেন ‘পরি’। হঠাৎ একদিন বিদেশ থেকে খবর এল, মামার দাদু যত পরি বিদেশে বিক্রি করেছিলেন, সব পরিই মারা গেছে। মামার দাদু সাতদিন ধরে খুব কাঁদলেন। তারপর পোষা পরিটাকে ফেলে পলাশপুরের পাট চুকিয়ে কলকাতার হাতিবাগানের বাড়িতে চলে এলেন।’’

এমন সময় বাসের হর্ন বাজল। দিদিমণিরা সমস্ত মেয়েকে বাসে উঠতে বললেন। এবার ফেরার পালা। কাঁকন, লিপি, উপমা, দোয়েলও বাসে উঠে পড়ল। উপমা জিজ্ঞেস করল, ‘‘আচ্ছা কাঁকন, সেই পোষা পরিটার কী হল?’’

কাঁকন একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘‘তারপর অনেকদিন পরে মামার দাদুর কাছে খবর এল যে, পোষা পরিটার সঙ্গে একদল পরি এসেছে পলাশপুরের বাড়িতে। মামার দাদু ছুটলেন তড়িঘড়ি। গিয়ে দেখলেন, সেই পোষা পরিটার সঙ্গে সব পরিই উড়ে চলে গেছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না। সেই থেকে পৃথিবীতে কেউ আর কোনোদিন পরির দেখা পায়নি।’’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%