নোলকপুরের রাক্ষস

রতনতনু ঘাটী

আমরা কখনো রাক্ষস দেখিনি। রাক্ষস নিয়ে অনেক গল্প শুনেছি ঠাকুমার মুখে। ঠাকুমা বলে, সেসব নাকি সবই রূপকথার রাক্ষস। সত্যি রাক্ষসের কথা লেখা আছে রামায়ণ-এ। স্বর্ণলঙ্কার রাজা ছিল রাবণ। সেনাকি আমাদের রামচন্দ্রের বউ সীতাকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। সেনিয়ে মানুষের সঙ্গে রাক্ষসের তুমুল যুদ্ধ হয়েছিল। জিতেছিল মানুষই। রাক্ষসেরা সবাই মারা গিয়েছিল। এসব ঠাকুমার মুখে শুনতে শুনতে মেজোকাকুর মেয়ে টিঙ্কা বলে, ‘‘তুমি যে কী বলো ঠাকুমা। শ্রীলঙ্কা বলে তো একটা দেশ আছে ভারতের দক্ষিণে। আমি ভূগোল বইয়ে পরশু পড়েছি।’’

ছোটোকাকুর ছেলে বাবাই সবে ওয়ানে পড়ে। তার খুব বুদ্ধি। সেবলে, ‘‘ঠাকুমা, দেশটা যদি এখনও থাকে, তা হলে এক-আধজন রাক্ষসও কি সেদেশে বেঁচে নেই? আমি বিশ্বাস করি না।’’

বিশ্বাস আমিও করি না। রামচন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধের সময় এক-আধজন রাক্ষসও তো বনেজঙ্গলে লুকিয়ে বেঁচে থেকে যেতে পারে। আর রামচন্দ্র সীতাকে উদ্ধার করার পর অত আঁতিপাতি করে খুঁজে দেখতে গেছেন নাকি? তাই টিভিতে যখন ভারতের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট ম্যাচ হয়, তখন আমি রণতুঙ্গাদের ভালো করে দেখি। এদের মধ্যে কেউ রাক্ষস নয় তো! অবশ্য আমার মাঝে মাঝে সনৎ জয়সূর্যকে রাক্ষস বলেই মনে হয়। ক্রিকেটের রাক্ষস। না হলে অমন কাঁড়ি কাঁড়ি রান পায় কী করে? আর, বাবা-কাকাদের বলতে শুনি, সেলোকটা খুব বদমাশ। আমার মাঝে মাঝে তাকেও রাক্ষস বলে মনে হয়। হয়তো রাবণের মতো তারও মাথায় দশটা মাথা। পৃথিবীতে এমন একজনও রামচন্দ্র নেই, যে তাকে মেরে ফেলতে পারে। সেতো রাক্ষস হলেও হতে পারে। ঠাকুমাকে এসব কথা বললে ঠাকুমা রাবণের বোন সূর্পনখার গল্প বলে। সব কিছু ছাপিয়ে তখন শ্রীলঙ্কার মাঠঘাট, বনজঙ্গল, সব রাক্ষসে রাক্ষসে ভরে যায়। বাবাই, টিঙ্কা, আমি, আমরা সবাই তখন রাক্ষসের গল্পে ডুবে যাই।

ঠাকুমার মুখে রাক্ষসের গল্প শুনতে শুনতে আমাদের চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে। আমি ঘুমচোখ নিয়ে ভাবি, আর একটু বড়ো হলে রামায়ণ বইটা পড়তে হবে।

কিন্তু বড়ো হতে এখনও ঢের বাকি, রামায়ণ পড়তেও অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে। এ-রকম সময় একদিন আমাদের বাড়িতে টুসিদির বড়ো ভাসুরের ছেলে বুকাই এসে হাজির। বুকাই আমারই বয়সি। আমার, টিঙ্কার বা বাবাইয়ের খুব বন্ধু। টুসিদি আমার মেজোকাকুর বড়ো মেয়ে। কিছুদিন হল টুসিদির বিয়ে হয়েছে নোলকপুর গ্রামে। পাঁচ-সাতটা গ্রাম পেরোলে তবে টুসিদির শ্বশুরবাড়ি। ওই অতদূর থেকে কাল বুকাই এসেছে টুসিদির সঙ্গে।

বুকাই এলে আমাদের পড়াশোনার ইতি। তার ওপর সবে পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তাই আমাদের আর পায় কে?

আমাদের বাড়ির পাশে ছোট্ট একটুকরো বঁাশের বন। তার মাঝখানে ছায়াঘেরা একটা ছোট্ট চাতাল। সেটাই আমাদের স্বর্গরাজ্য। বুকাইকে নিয়ে সেখানেই আমরা গল্প করছিলাম। কথায় কথায় বুকাই বলল, ‘‘জানিস তো, আমার মেজোকাকিমা আমার ছোটোকাকুর ছেলে বিটকাইকে বলে রাক্ষস।’’

ব্যস, অমনি আমাদের রাক্ষসের গল্পে পেয়ে বসল। টিঙ্কা বলল, ‘‘হ্যাঁ রে বুকাই, সেকি রাক্ষসের মতোই দেখতে?’’

বাবাই বলল, ‘‘তারও রাবণের মতো অনেক মাথা?’’

বুকাই বলল একটুখানি হেসে, ‘‘না রে, তা নয়। বিটকাই একটু মোটাই বটে। দেখতে অবশ্য বেশ কালোই। আর দুষ্টুমিতে সকলের চেয়ে বেশি।’’

আমি বললাম, ‘‘কালো আর মোটা হলেই কি রাক্ষস হয়?’’

বুকাই ঘাড় নেড়ে বলল, ‘‘মেজোকাকিমা বলে, সেনাকি অনেক খায়। এই ধর তিরিশটা লুচি, পাঁচটা মাছ, দু-বাটি মাংস, অনেক ভাত। সেনাকি কুড়িটা রসগোল্লা খেয়েছিল একটা বিয়েবাড়িতে। আর-একটা বিয়েবাড়িতে পাঁচ-পাঁচটা আইসক্রিম।’’

আমি বললাম, ‘‘দূর, এই খেলেই কেউ রাক্ষস হয়? তুই যে কী বলিস!’’

বুকাই গলায় দৃঢ়তা এনে বলল, ‘‘না রে, মেজোকাকিমা সবসময় আড়ালে-আবডালে তাকে রাক্ষস বলে। আমি একবার মেজোকাকিমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি ওকে অমন রাক্ষস বলো কেন? ওকি সত্যি রাক্ষস নাকি? মেজোকাকিমা বলেছিল, রাক্ষুসির পেটে রাক্ষস হবে না তো কি মানুষ হবে?’’

আমাদের কাছে রাক্ষস ব্যাপারটা কেমন জটিল হয়ে উঠল। তবু আমরা ঠিক করলাম, এবার টুসিদি যখন বুকাইকে সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাবে, আমরাও বায়না ধরব সঙ্গে যাব বলে। আমরা যে রাক্ষস দেখতে যাচ্ছি সে-কথা কাউকেই বলব না।

তাই হল। আমি, টিঙ্কা, বাবাই বায়না ধরে বড়োদের রাজি করিয়ে বুকাই আর টুসিদির সঙ্গে নোলকপুর চললাম রাক্ষস দেখতে।

নোলকপুর পৌঁছোতে পৌঁছোতে আকাশজুড়ে সঙ্গে নেমে এল। সেদিন আর বিটকাইকে দেখা হল না। বুকাইরা সবাই এখন আলাদা বাড়িতে থাকে তো। পরদিন সকালে বিটকাইকে দেখলাম। ওকে আদৌ রাক্ষস বলে মনে হল না। আমরা যে ক-দিন থাকলাম, বিটকাইয়ের সঙ্গে খেললাম, ঘুরলাম; এমনকী, টুসিদির বাড়িতে দু-এক বেলা একসঙ্গে খেলামও। কিন্তু মানুষ ছাড়া বিটকাইকে আর কিছুই মনে হল না।

কয়েকদিন থেকে টুসিদির বরের সঙ্গে আমরা ফিরে এলাম বাড়িতে। টিঙ্কা বলল, ‘‘জানিস তো, রাক্ষস দেখে মোটেও মন ভরল না।’’

আমি বললাম, ‘‘বিটকাইকে দেখে আমার মনে হল, পৃথিবীতে সত্যিই রাক্ষস বলে কিছু নেই, ছিলও না কোনো দিন। সবই বুকাইয়ের মেজোকাকিমাদের রটনা।’’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%