রতনতনু ঘাটী

চয়ন রাজা-রানির গল্প শুনতে খুব ভালোবাসে। স্কুলের ছুটিতে দাদু বাবাকে বললেন, ‘‘চলো, আমরা এবার চয়নকুমারের রাজবাড়ি দেখতে যাই।’’
বাবা বললেন, ‘‘সেটা কোথায়? এখন তো রাজাই নেই, তায় রাজবাড়ি?’’
দাদু বললেন, ‘‘আমরা এবার ত্রিপুরা বেড়াতে যাব। ওখানে তো অনেকদিন ধরে রাজারা রাজত্ব করতেন। এখন রাজা নেই বটে, কিন্তু অনেক রাজবাড়ি আছে।’’
চয়ন ছবি আঁকছিল। কাল ওদের পাড়ার ‘ইচ্ছেখুশি’ ক্লাবে ‘বসে আঁকো’ প্রতিযোগিতা আছে। এবারও প্রথম পুরস্কারটা আনতেই হবে, ঠামি বলে দিয়েছেন। দাদুর কথা শুনে চয়ন ‘‘ইয়া’’ বলে লাফিয়ে উঠল। তারপর তো প্লেনের টিকিট কাটা আর চারজনে মিলে আগরতলায় টুপ। ওখানে বাবার এক বন্ধু আছেন, দেবাশিসকাকু। তিনি আবার টুরিজমে চাকরি করেন। সব ব্যবস্থা করেই রেখেছিলেন। ওরা গিয়ে উঠল ‘গীতাঞ্জলি’ গেস্টহাউসে। সেদিন বিকেলেই দেখা হয়ে গেল ত্রিপুরার রাজাদের উজ্জয়ন্ত প্যালেস। দুধসাদা প্রাসাদটা কী সুন্দর। সামনে লেক, কতরকম ফুলের বাগিচা। তখন আবার বইমেলা চলছিল ত্রিপুরায়। সন্ধে বেলা ঘোরা হল বইমেলায়, ফুচকাও খাওয়া হল ঠামির কাছে বায়না করে।
পরের দিন ওঁরা চললেন রুদ্রসাগর লেকের মাঝখানে ‘নীরমহল’ প্রাসাদ দেখতে। গরমের সময় রাজা বীরবিক্রমকিশোর মাণিক্য রানির সঙ্গে গিয়ে ওখানে থাকতেন। দাদু গাড়িতে যেতে যেতে ওই প্রাসাদের অনেক গল্প বললেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই প্রাসাদের নামকরণ করেছিলেন ‘নীরমহল’।

ওঁদের পৌঁছোতে পৌঁছোতে বিকেল গড়িয়ে গেল। ওঁরা সাগরমহল টুরিস্ট লজে গিয়ে উঠলেন। বারান্দায় গিয়ে চয়ন লাফিয়ে উঠল, ‘‘ঠামি, দেখবে এসো, ওই তো সেই প্রাসাদটা।
সব্বাই বারান্দায় গিয়ে সত্যিই অবাক। দাদু বললেন, ‘‘দেবাশিস থাকার জায়গাগুলো দারুণ বেছেছে।’’
সূর্য তখন ডুবি ডুবি করছে। সন্ধ্যের সময় নীরমহলে লাইট অ্যাণ্ড সাউণ্ড হয়। ওঁরা একটা ছোটো স্পিডবোটে উঠে বসলেন। চারপাশে জল। মাঝখানের প্রাসাদে যেতে লেগে গেল প্রায় কুড়ি মিনিট। কী সুন্দর আলোয় সাজানো হয়েছে। চোখ চকচক করছে চয়নের। লেকের জলে পড়েছে আলো ঝলমল প্রাসাদের ছায়া।
প্রাসাদে নেমেই ছুট দিল চয়ন। আরও অনেক লোকও গিয়েছে। অনেক ঘর। কোনোটায় রাজা লোকজনের সঙ্গে দেখা করতেন, কোনোটা নাচঘর, কোনোটা রানিমা-র শোওয়ার ঘর, কোনোটা দাসদাসীদের। হঠাৎ চয়ন কুড়িয়ে পেল একটা চাবির রিং। দাদুর কাছে ছুট্টে গিয়ে বলল, ‘‘দ্যাখো দাদু, আমি এটা কুড়িয়ে পেয়েছি!’’ দাদু দেখলেন একটা রিংয়ে জং-ধরা একটা মাত্র ছাবি। অনেক দিন আগে প্রাসাদ দেখতে আসা কারো হবে হয়তো। দাদু মজা করে বললেন, ‘‘ও মা, দেখি দেখি। এটা মনে হয় রানিমা-রই সিন্দুকের চাবি।’’
সেই থেকে তিন মাস হয়ে গেল, চয়ন চাবিটা কাছছাড়া করেনি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন