রতনতনু ঘাটী

টিকলিদের বাড়ির বাগানের ওপাশটায় বেশ ঝোপজঙ্গল আর আগাছায় ভরতি। ঠাকুরমা একদিন বলেছিলেন, ‘‘গাছ যত না বাড়ে, আগাছা তার চেয়ে বাড়ে অনেক বেশি?’’ তা বাড়ুক! টিকলি বাগানে গেলে একবার-না-একবার ঝোপজঙ্গলের দিকে যাবেই। অবশ্য সঙ্গে মিন্টিও থাকে। মিন্টি ওর বোন। মিন্টি থাকলে টিকলি সাহস পায়। টিকলির বিবেচনায়, ওটা মোটেও আগাছার জঙ্গল না। ওটা একটা রংবাহারি পতঙ্গপল্লি! ওখানে সবুজ, হলদে, ছাই ছাই রঙের গঙ্গাফড়িং থাকবেই থাকবে।
সেদিন তখনও দুপুর হয়নি। ঝোপের পাশে গিয়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল টিকলি। বঁা-হাতে মিন্টির ছোট্ট ডান-হাতটা ধরা। দ্যাখে কী, কবে কবে বনফুলের টুকরো ফেলে দেওয়া ডালটা বড়ো একটা গাছ হয়ে গেছে। আর রংবাহারি ফুলে ভরতি! তারই সবুজ পাতার উপর কী যেন একটা বসে আছে। বাতাসে পাতা নড়ছে তো সেও নড়ছে! দেখতে অনেকটা উদাসী মানুষের মতো। রোগাপটকা বঁাশি-বাজানো হরেনকাকা যেমন, ঠিক অমনি! তবে সবুজ কাপড় পরে বসে আছে। পিঠের উপর হলদে রঙের ওড়নাও যেমন। চারটে লম্বা ডানা একেবারে থির! পিছনের চারটে পা ত্রিভুজের মতো তিনকোনা করে বসে আছে। এই তো একটু আগে টিকলি অঙ্কের বইয়ে পড়ে এসেছে, ত্রিভুজের তিনটি বাহু সমান। আর সামনের পা দুটো স্কুলে ওরা যেমন হাতজড়ো করে প্রেয়ার করে, ওরকম জড়ো করা। তার ডগার দিকটা করাতের মতো খাঁজকাটা। মিন্টি হেসে বলল, ‘‘দিদি, ওদেরও কি আমাদের মতো স্কুল আছে? সেখানে স্কুল শুরুর আগে ওদেরও প্রেয়ার করতে হয় নাকি?’’
টিকলি মন দিয়ে ফড়িং দেখছে, মিন্টির কথার উত্তর দিল না।
মিন্টি তার পাতলা ঠোঁট দুটো উলটে বলল, ‘‘দিদি, ওটা কিচ্ছু না রে। মনে হয় বনফুলের নতুন পাতা গজিয়েছে।’’
টিকলি যেই নীচু হয়ে ধরতে গেল, অমনি ফুড়ুৎ! টিকলি বলল, ‘‘দেখলি তো? ওটা একটা কিচ্ছু! ঠাকুরমা বলেছিল, ওটাই নাকি গঙ্গাফড়িং! দেখলি না, কেমন সবুজ রঙের ধরাচূড়া পরা, রাজারা যেমন পরে রে, আমাদের গাজনতলার যাত্রাপালায় দেখিসনি?’’
তারপর টিকলিরা কখন বাড়ি চলে এসেছে। মা রান্নাঘর থেকে গলা তুলে ডাক দিয়েছিলেন, ‘‘মিন্টি-টিকলি...!’’
কিন্তু তার পরপরই সবুজ রঙের গঙ্গাফড়িংটার বাড়িতে এক কান্ড! নতুন কুটুম এসে হাজির! গঙ্গাফড়িংটা মাথার দু-পাশে উপর দিকের দুটো ‘আকাশ-তার’ খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করল ব্যাপারটা। অবশ্য গঙ্গাফড়িংদের তো আর বাড়ি থাকে না। গাছে-ডালে-পাতায় থাকে, ওটাই ওদের বাড়ি। সেখানেই গঙ্গাফড়িংকে দেখতে এসেছে ওর কোনো এক দূর সম্পর্কের বোনঝি। সবুজ-কালোয় মেশানো ডোরাকাটা ছোট্ট একটা গঙ্গাফড়িং।
এসে বনফুলের আর-একটা পাতার উপর সামনের পা দুটো প্রেয়ারের মতো তুলে ধরে বসল। তারপর বলল, ‘‘কেমন আছ গো বড়ো মাসি? অনেক দিন তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি। আমি কতবার এই ঝোপের কাছে এসে তোমাকে খুঁজেছি। তুমি কি অন্য ঝোপে থাকো এখন?’’
‘‘না না বাছা! এই ঝোপেই তো থাকি। কখনো খাবার খুঁজতে-টুঁজতে এদিক-ওদিক যেতে হয়। তোমাকে চেনা-চেনাই তো মনে হচ্ছে! তা তুমি কী মনে করে?’’
‘‘সেকথাই তো বলতে এসেছি! আমি সেদিন উড়ুৎ-ফুড়ুৎ করতে করতে গেছলাম তিন্নিদের বাড়ির পাশের বাতাবি লেবুর গাছে। ওই যে বোসবাবুদের ছোটো মেয়ে তিন্নি গো? তা তিন্নি তখন জানলায় বসে ইতিহাস বই পড়ছিল। আমি তখন ভাবলাম, একটু ইতিহাসের কথা শুনে যাই। ওসব বইতে নানা রাজারাজড়ার কথা আছে, রাজপ্রাসাদের কথা আছে, রাজসিংহাসনের কথা আছে, দেশজয়েরও কথা লেখা আছে। শুনতে বেশ লাগছিল। তিন্নির পড়ার ফাঁকে কথাটা পেটের মধ্যে সারাক্ষণ গুড়গুড় করে বেড়াচ্ছিল। তুমি তো আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো। তাই তোমাকেই কথাটা বলে হালকা হতে এসেছি। আমরা অমন একটা উপনিবেশ গড়লে কেমন হয় গো মাসি? তা হলে আমাদের পাখি-পতঙ্গদের ডেকে ডেকে বলার মতো একটা ঠিকানাও হয়। একজন আর একজনকে খুঁজতে এলে তা হলে আর হন্যে হতে হয় না। কী বলো?’’
সবুজ রঙের বড়ো ফড়িংটা হল মেয়ে-গঙ্গাফড়িং। দেখতে বেশ বড়োসড়ো, একটা ভারিক্কী ভাব আছে চোখে-মুখে। সেকালো-সবুজ কুটুম্ব গঙ্গাফড়িংটার দিকে তাকালোই না। দুটো বড়ো ডানা মেলল ব্যস্ত হয়ে। চারটে পা দিয়ে পাতার উপর ইকিড়-মিকিড় করল খানিক। তিন-তিনটে সাধারণ চোখ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করল এখন দিন, নাকি আকাশ আঁধার করে রাত নামল বলে? যদি রাত নামতে শুরু করে, তা হলে কুটুম্ব ফড়িংটা আজ তার ঝোপে ফিরে যেতে পারবে না। তাকে কী খেতে দেবে? এমন অসময়ে কোথায় পাবে খাবারের খোঁজ? বড়ো গঙ্গাফড়িংয়ের মাথায় বনের অকূল চিন্তা ঝোঁপে এল। তক্ষুনি ডানা দুটো যেমন গুটোনো ছিল, তেমনই রইল, পিছনের লম্বা পা দুটোয় ভর দিয়ে নিজের চেহারার কুড়ি গুণ দূরে লাফিয়ে চলে গেল এক লাফে।

কুটুম্ব গঙ্গাফড়িং ভয় পেয়ে গেল বলে মনে হল। গলা তুলে চেঁচিয়ে বলল, ‘‘ও মাসি, চললে নাকি গো? আমি যে ঠায় হয়ে রইলাম! উপনিবেশের কথাটা তো কিছুই বললে না?’’
ওই দূরে থলকলমির ঢলোঢলো পাতার উপর সবুজ গঙ্গাফড়িংটা এসে ঝপাং করে বসল বলে পাতাটা সেই থেকে দোল খাচ্ছে। তেমন দোদুল হয়ে সেবলল, ‘‘তুমি যে তখন থেকে উপনিবেশ গড়ার কথা বলছ, লাল আর বাদামি, হলদে ফড়িং-টড়িংদের কথাটা বলেছ কি? নাকি সটান মাসির কাছে এসে হাজির হয়েছ?’’
কুটুম্ব গঙ্গাফড়িংটা ঘাড় দুলিয়ে বড়ো চোখ দুটো ড্যাবাড্যাবা করে বলল, ‘‘ও মা! তা বলিনি আবার? আমি আসছিলাম এদিকেই। অমুদের পেয়ারা গাছের পাতায় বসেছিল ওই যে ধূসর রঙের দেখতে গঙ্গাফড়িং দুটো, গায়ে পুটুর পুটুর পুটকি কালচে দাগ গো! ওদের দুই বন্ধুতে কী পেয়ারা গাছের নরম পাতা খাচ্ছিল। আমি বললাম, ‘শুনছ, তোমাদের একটা কথা বলি?’ ’’
‘‘তারা কী বলল, শুনলে তুমি থ’ হয়ে যাবে মাসি। বলল, ‘তোমার কথা তুমি পোঁটলা বেঁধে রেখে দাও। আমাদের এখন বেজায় খিদে পেয়েছে!’ ’’
‘‘আমি বললাম, ‘তোমরা গাপুস গুপুস করে খাচ্ছ তো! আমি কি বাধা হয়েছি? হইনি তো!’ তারপর উপনিবেশের কথাটা বললাম। ওরা কথাটা শুনে বলল, ‘তোমার ওই উপনিবেশ কথাটা বড্ড ভারী ভারী লাগছে ভাই। তা দিয়ে ভারী মতো একটা কিছু হয়তো হবে, ও আমাদের ফড়িংদের কোনো কাজে আসবে না। একটা হালকামতো কিছু ভেবে এসো। তখন তোমাকে ডেকে কথা বলব।’ শুনেছ কথা?’’
‘‘তুমি সকলের জন্যে অত কিছু ভাবছ। আজ রাতটা এই বনফুলের ঝোপে থেকে যাও-না কেন! রাতে খেতে খেতে কথা হবে? কিন্তু তোমার শরীরটা তো বেশ খারাপ দেখছি!’’
‘‘সেনা হয় থাকলাম! ইশকুলে পড়ে যেসব ছেলে-মেয়েরা, তাদের গরমের ছুটি পড়লে মাসির বাড়ি দু-দশদিন বেড়াতে যায় না? আমি না হয় আজকের দিনটা থাকলামই।’’
‘‘তা হলে বাছা, ওই যে তিন-চারটে ডাল জড়ামড়ি করে আছে, তুমি ওর আড়ালে নিঝুম হয়ে বসে থাকো! এখানে আবার ফিঙে পাখির ঝাঁক আসে। তোমাকে মুখে তুলে নিতে কতক্ষণ?’’
‘‘তুমি কিচ্ছু ভেবো না মাসি! আমি সাবধানে থাকবখ’ন।’’
‘‘আমি তোমার জন্যে এক-আধটা মরা পোকা খুঁজে পাই কিনা দেখি! মরা পোকা খেলে তোমারও খানিক শক্তি হবে গায়ে! আসছি বাছা!’’
তিন-চার লাফে কোথায় যে মিলিয়ে গেল বড়ো গঙ্গাফড়িংটা, কুটুম্ব গঙ্গাফড়িংটা নজরই করতে পারল না!
কুটুম্ব গঙ্গাফড়িং একা পাতার আড়ালে বসে বসে ভাবছিল সেদিনটার কথা। এই তো ক-দিন আগে ঝিমঝিম করে বৃষ্টি সকাল থেকে। খিদেও পাচ্ছিল খুব। পাতার আড়াল ছেড়ে বেরোব না বেরোব না করে শেষে বেরোতেই হল। অমনি একটা শালিখ পাখি শাঁ করে উড়ে এসে ধরে ফেলল আমাকে। ডানায় বৃষ্টির দানা লেগেছিল। তাই পট করে উড়ে পালাতে পারলাম না। তারপর কম ডানার ঝটাপটি করিনি। কিন্তু শালিকের শক্ত ঠোঁট থেকে যখন আর নিস্তার নেই মনে হল, তক্ষুনি কেমন থির হয়ে গেলাম। শালিখ ভাবল ফড়িংটা মরে গেছে। অমনি ঠোঁট আলগা করে দিল। তারপর চোখ পিটপিট করে দেখতে লাগল চুপটি করে। বেশ কিছুক্ষণ মরার মতো পড়ে থাকার পর, যেই শালিখটা অন্য দিকে তাকিয়েছে, অমনি ফুড়ুৎ করে হাওয়া হয়ে গেলাম। আর নাগালই করতে পারল না শালিখটা। ঘাড় বঁাকিয়ে কতবার ঝোপের এদিক থেকে ওদিকে খুঁজল। উঃ, সেদিন খুব বঁাচা বেঁচে গেছি!
তক্ষুনি টপাস করে ফিরে এল বড়ো গঙ্গাফড়িংটা। সামনের দুটো পায়ে সাঁড়াশির মতো করে ধরা একটা মরা পোকা। রাতে খেতে দিল কুটুম্ব গঙ্গাফড়িংকে। ঠিক হল, কাল থেকে যে যখন সময় পাবে, ফড়িংদের বলে বলে বেড়াবে উপনিবেশের কথা। দেখাই যাক-না চেষ্টা করে।
তার পর ক-টা দিন কেটেছে কী কাটেনি, সেদিন সকাল বেলা সূর্য গাছপালা ছাড়িয়ে উঠেছে কী ওঠেনি, অমন সময় সবুজ গঙ্গাফড়িংয়ের বনফুলের ঝোপে এসে হাজির হল একটা টুকটুকে লাল ফড়িং। রামধনুর গায়ের লাল রঙের মতো তার গায়ের রং। যখন ডানা মেলে চুপটি করে পাতার উপর বসল, ডানা দুটোকে দেখে মনে হল, জ্যোৎস্নার চুর্নি দিয়ে বানানো, এমন ঝিরঝিরে! তার উপর চাঁদপরির নিজের হাতে কুটিটুটি করে নকশা করা যেন!
গঙ্গাফড়িংকে দেখেই বলল, ‘‘আমাকে তোমার কুটুম্ব গঙ্গাফড়িং খবরটা দিল। তোমরা নাকি ফড়িংদের জন্যে একটা একসঙ্গে থাকার জায়গা বানাবে? তা যদি হয়, তা হলে আমাকে বাদ দিও না যেন! আমিও তো তোমাদেরই ফড়িংবংশের লালফড়িং। থাকি না হয় খানিক দূরে। দেখতেও নাহয় একটু ভিন্ন। তাতে কী? আমরাও তো ফড়িং কি না বলো?’’
কথাটা শুনে মন ভরে গেল সবুজ গঙ্গাফড়িংয়ের। বলল, ‘‘হ্যাঁ, ওই যে সবুজ-কালোয় ডোরা ফড়িংয়ের কথা বলছ, ও তো আমার দূর সম্পর্কের বোনঝি! কথাটা তো প্রথম ওরই মাথায় এসেছে। ও একটা ইতিহাস বই থেকে কথাটা পেয়েছে। তুমিও যাদের সামনে পাবে, সকলকে বোলো মনে করে। যাদের পারবে কালই সকলকে ডেকে নিয়ে চলে এসো!’’
‘‘বলব গঙ্গাফড়িং দিদি, ঠিক বলব। কাল দেখা হবে!’’ বলেই খুশিতে ডগমগ লালফড়িং ডানা দুটো তিরতির করে কাঁপিয়ে কোথায় উড়াল দিল।
আপন মনে সবুজ গঙ্গাফড়িংটা ঝোপের নয়নতারা গাছের ফুলের পাপড়ি কুটকুট করে খাচ্ছিল। কী মনে হতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, হলদে-কালো রঙের একটা গঙ্গাফড়িং এসে বসেছে ওর থেকে খানিক দূরে। চোখে চোখ পড়তেই সেবলল, ‘‘আমি তোমার কাছে একটা খবর জানতে এসেছি গো বড়ো পিসি! আসব বলে কত সকালে বেরিয়েছিলাম। আসতেই পারলাম না।’’
‘‘কেন? পথে কোনো বিপদে পড়েছিলে? তোমার উসকোখুসকো চেহারা দেখে মালুম হচ্ছে!’’ বলে তিনবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিল চারপাশটা।
হলদে-কালো গঙ্গাফড়িং সামনের গুটিয়ে-রাখা একটা পা মুখের কাছে এনে গালে হাত দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল, ‘‘বিপদে পড়িনি আবার? আসার পথে বনঝোপে ভুল করে মাকড়সার জালে আটকে গেলাম। তারপর কত চেষ্টা করলাম ছাড়ানোর। মাকড়সাটা তখন তার জালের এক কোণে চুপটি করে বসে দেখছিল। আমি ভাবলাম, জালের আঠা ছাড়িয়ে আমি আর বেরোতে পারব না।’’
চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে সবুজ ফড়িং ‘‘মা একবার ছোটোবেলায় গল্প করেছিল, মাকড়সারা নাকি মরা ফড়িং পোকামাকড় খায় না। সে-কথা মনে হতেই আমিও মরার মতো চুপটি করে পড়ে রইলাম জালের মধ্যে। অনেকক্ষণ দেখার পর মাকড়সাটা কাছে এল, আমি সত্যিই মরে গেছি কিনা দেখতে। সুড়সুড় করে এসে থম মেরে বসল। তখনও নড়ছি না দেখে বুঝে গেল, আমি সত্যিই মরে গেছি। অমনি নিজেই জালটা কেটে দিতে আমি ধাঁ করে ফুড়ুৎ!’’
‘‘তোমার বুদ্ধি তো খুব!’’
‘‘বড়ো পিসি, যে খবর জানতে এলাম। তোমার এখানে নাকি সব ফড়িং মিলে একসঙ্গে থাকার একটা ব্যবস্থা হচ্ছে?’’
বড়ো সবুজ গঙ্গাফড়িং ঘাড় নেড়ে বলল, ‘‘হ্যাঁ, হচ্ছেই তো! তুমিও এসো না, কে বারণ করল?’’
একটুখানি এগিয়ে গিয়ে হলদে-কালো গঙ্গাফড়িংটা বলল, ‘‘কালই আসতে হবে কি? যারা আসতে চাইবে সকলকে আনতে তো বারণ নেই?’’
‘‘একসঙ্গে থাকার কথায় বারণের কথা আসবে কেন? কাল সকালেই দল বেঁধে চলে এসো!’’
একথা শুনে ফুড়ুৎ হল হলদে-কালো ফড়িং।
পরের দিন বড়ো সবুজ গঙ্গাফড়িংয়ের ঘুম ভেঙেছে কী ভাঙেনি, সকাল থেকে কত কত রঙের ফড়িং এসে হাজির। ভালো করে চোখ রগড়ে তাকাল সকলের দিকে। সবুজ-কালো কুটুম্ব গঙ্গাফড়িং বলল, ‘‘মাসি, আমরা কতজন এসেছি দ্যাখো! এবার তুমি সকলকে নিয়ে মিটিং করো!’’
বড়ো সবুজ গঙ্গাফড়িংটা ঝোপের সবচেয়ে উঁচু ডালের পাতার উপর উঠে দাঁড়াল। প্রেয়ারের ভঙ্গিতে সামনের পা দুটো জড়ো করে বলল, ‘‘আমরা একসঙ্গে থাকতে চাই। সকলে সকলের মতো থাকব, তবু একসঙ্গে আর কী!’’
ভিড়ের মধ্যে থেকে কে একজন বলল, ‘‘সেআবার কীরকম?’’
বড়ো গঙ্গাফড়িং বলল, ‘‘আমরা এই ঝোপজঙ্গলে ছড়িয়েছিটিয়ে মিলমিশ করে থাকব। যে-যার কাজে যাব, আবার ফিরে আসব। সন্ধেবেলা মন হলে গল্পগুজব হবে। বেশ একটা রাজ্য-রাজ্য ব্যাপার হবে আর কী!’’
সকলেই ঘাড় নেড়ে সায় দিল। হলদে-কালো ফড়িং বলল, ‘‘তাহলে একটা নামও তো দরকার। কী নাম হবে গো সেরাজ্যের?’’
বড়ো গঙ্গাফড়িং বলল, ‘‘রাজ্য বললে তো মানাবে না? আমরা মাত্র গোটা কুড়ি ফড়িং! কুড়িজনে কি আর রাজ্য হয়, না দেশ হয়? বড়োজোর ‘পল্লিটল্লি’ নাম রাখা যেতে পারে!’’
একটা কিশোর গঙ্গাফড়িং, তার এখনও ভালো করে দুটো ডানাই বেরোয়নি। গুটগুট করে কী মনে করে সেএসে দাঁড়িয়েছিল কথার মাঝখানে। সকলে আদর করে তাকে ‘পতঙ্গপরি’ বলে ডাকল। অমনি পতঙ্গপরি নীচু গলায় বলল, ‘‘আমাদের একজন রানিও তো চাই। তুমি আমাদের রানি হবে!’’
বড়ো সবুজ গঙ্গাফড়িং হেসে ঘাড় নাড়ল দু-বার। তারপর বলল, ‘‘আমাদের কোনো রাজা থাকবে না, আমাদের কোনো রানিও থাকবে না। আমরা সকলেই সমান!’’
অমন সময় হুড়মুড় করে এসে হাজির হল লালফড়িং। আসতে তার বড্ড দেরি হয়ে গেছে। সেলাজুক লাজুক মুখে বলল, ‘‘আমি একটা নাম ভেবে এসেছি! বলব?’’
বড়ো গঙ্গাফড়িং বলল, ‘‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলো না!’’
লালফড়িং তেমনই লাজুক মুখে বলল, ‘‘আমাদের এই উপনিবেশের নাম হোক ‘পতঙ্গপল্লি’!’’
ওর দেওয়া নামটা সকলের বেশ মনে ধরল। বড়ো গঙ্গাফড়িং বলল, ‘‘নামটা তো বেশ! আর শোনো, একটা কথা হঠাৎ আমার মনে হল। তোমার যা রূপের বাহার, দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। তুমিই হবে আজ থেকে আমাদের পতঙ্গপল্লির রাজকন্যে!’’
সকলে সায় দিয়ে বলল, ‘‘ঠিক, ঠিক!’’
একথা শুনে লালফড়িংয়ের চোখ-মুখ লজ্জায় আরও লাল হয়ে উঠল। তখনও বিকেল হতে অনেক বাকি। তবুও নীল আকাশের একদম উপরে একটা ছোট্ট তারাকে দিনের আলোতেও ঝিকমিক করতে দেখা গেল। তার মানে, বড়ো গঙ্গাফড়িংটা মনে মনে ভাবল, এবার বুঝি পতঙ্গদের জীবনে সত্যিই একটা সুদিন আসবে!
ছোট্ট পতঙ্গপরি এক পা এক পা করে হেঁটে লালফড়িংয়ের একদম গায়ের কাছে এসে বলল, ‘‘রাজকন্যে দিদি, রাজকন্যে দিদি, তুমি রাগ করবে না তো, আমি যদি তোমার পাশে একটু দাঁড়াই?’’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন