রতনতনু ঘাটী

তখন দেশজুড়ে এমন বনমহোৎসবের ঘটাপটা শুরু হয়নি। এদিক-ওদিক তাকালে বনবাদাড়, ঝোপঝাড় তো চোখে পড়তই। দূরে দূরে বনেরও এমন অভাব ছিল না। আর তখন বাঘেদের জন্যও এত অভয়ারণ্য গড়ে তোলার আইন জারি হয়নি। বাঘ বাঘের মতোই থাকে বনে। রাজারাজড়ারা ঘটা করে বন্দুক আর বরকন্দাজ নিয়ে তখনকার দিনে বাঘ শিকারে যেতেন। কোনো রাজা ক-টা বাঘ মেরেছেন নিজের হাতে, সেই পরিসংখ্যান ছিল গর্বের।
ব্রিটিশরা তখন নিজেদের শাসন কায়েম করেছে, এদেশে। শাসন তো নয়, শুধুই শোষণ। এক-একটা পরগনার দায়িত্ব দিয়েছে এক-একজনকে। ‘রাজা’ উপাধি বিলিয়েছে দু-হাতে। পলাশগড় পরগনাও বাদ পড়েনি এই নিয়মের বেড়াজাল থেকে। পলাশগড়েরও একজন রাজা হয়েছেন, নাম কুমারপ্রসাদ সেন বাহাদুর।
কুমারপ্রসাদরা চার ভাই। মেজো জীবনপ্রসাদ। সেজো বীথিনপ্রসাদ, আর ছোটো কনকপ্রসাদ। রাজবংশ বলে কথা! এক-একজন ভাইয়ের শখও এক-একরকম। বড়ো কুমারপ্রসাদ শিকার ভালোবাসতেন। তিনিই রাজা। মেজো জীবনপ্রসাদ ভালোবাসতেন জমিজমা, টাকাপয়সা। বীথিনপ্রসাদ ওসবের মধ্যে থাকতেন না। তাঁর ছিল গানের জগৎ। লঘু থেকে উচ্চাঙ্গ, সব সংগীতেই তাঁর ছিল প্রাণের আনন্দ। আর ছোটো কনকপ্রসাদের ছিল খেলাধুলোর শখ।
পলাশগড়ের মানুষ ওঁদের ডাকত বড়ো রাজবাহাদুর, মেজো রাজবাহাদুর, সেজো রাজবাহাদুর, ছোটো রাজবাহাদুর বলে। সব রাজবাহাদুরেরই দাস-দাসীর অভাব নেই। বড়ো রাজবাহাদুরেরও অনেক দাস-দাসী। তাদেরই একজন কমল সাঁতরা। রাজার খাস কাজের লোকের হাত ধরেই তার রাজবাড়িতে প্রবেশ। প্রথম যেদিন রাজার মুখোমুখি হল কমল, রাজা জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘কী নাম তোমার?’’
কমল হাত কচলে বলল, ‘‘আজ্ঞে কমল সাঁতরা।’’
রাজা গম্ভীর হলেন। বললেন, ‘‘ওসব সাঁতরা-টাঁতরা পলাশগড়ের রাজবাড়িতে চলবে না।’’
কমল ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে হাতজোড় করে বলল, ‘‘আজ্ঞে।’’
রাজা বললেন, ‘‘তোমার নাম হবে কমলকেতু।’’
কমলও মাথা নেড়ে বলল, ‘‘হ্যাঁ, আজ্ঞে।’’
সেই থেকে কমলকেতু রাজার কাছে বহাল হয়েছে। কিন্তু কমলকেতুর এক বড়ো দোষ আছে। সেরাজার খুব ভুল ধরে। এই যেমন, রাজা বেরিয়ে দরবারে যাবেন, অমনি কমলকেতু বলল, ‘‘রাজামশাই, কোমরে বেল্টটা পরে নিন।’’
রাজামশাই কোমরে হাত দিয়ে দেখলেন, সত্যিই তো! সঙ্গে-সঙ্গে বেল্টটা পরে নিলেন।
কোনোদিন রাজামশাই যাবেন পাশের পরগনার রাজার মেয়ের বিয়েতে। বেরিয়ে পড়েছেন রাজামশাই, পালকিও তৈরি। এমন সময় কমলকেতু দৌড়ে এসে বলল, ‘‘রাজামশাই, আপনার কোমরে তরবারির খাপ আছে, কিন্তু তরবারি নেই।’’
রাজা তাকিয়ে দেখলেন, তাই তো! সঙ্গে-সঙ্গে হাঁকডাক।
তাই রাজা কমলকেতুকে সবসময় কাছে কাছে রাখেন। সব কাজের লোকের চেয়ে এখন কমলকেতুর খুব নামডাক। এমন সময় রাজা একদিন ঠিক করলেন, শিকারে যাবেন। ডাক পড়ল কমলকেতুর। কখন কী ভুলে যান, তাই ঠিক সময়ে ঠিক জিনিসটি এগিয়ে দেওয়ার জন্য কমলকেতু ছাড়া রাজার উপায় কী?
শিকারে গিয়ে গভীর বনে ঘুরে বেড়ালেন কুমারপ্রসাদ। বাঘের দেখা নেই। হতাশ কুমারপ্রসাদ ফেরার কথা ভাবছেন। এমন সময় কমলকেতু আঙুল তুলে দেখাল, ‘‘রাজাবাহাদুর, ওই দূরে দেখুন ডোরা ডোরা দাগ।’’
কুমারপ্রসাদ তাকিয়ে দেখলেন, হ্যাঁ তাই তো! সঙ্গে-সঙ্গে বন্দুক তাক করলেন।
কমলকেতু বাধা দিয়ে বলল, ‘‘রাজামশাই, বন্দুক নামান। ও তো বাঘ নয়, বাঘের বাচ্চা।’’
তারপর সবাই এগিয়ে গিয়ে দেখলেন, সত্যিই, দুটো ফুটফুটে ছোট্ট বাঘের বাচ্চা।
রাজা কুমারপ্রসাদ গর্বিত ভঙ্গিতে ফিরলেন পলাশগড়ে। সঙ্গে দুটো বাঘের বাচ্চা। সবাই ধন্য ধন্য করল রাজার। রাজা কুমারপ্রসাদ কিন্তু মনে মনে ধন্যবাদ জানালেন কমলকেতুকে।

এর পরই দেখা দিল সমস্যা। রাজা বাঘ দু-টির জন্যে সুন্দর ঘরও তৈরি করে দিলেন। কিন্তু বাঘ দুটিকে দেখবে কে? কেউ যদি বাঘের ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে বা বাঘকে খাবার দিতে গিয়ে ভুল করে দরজা না বন্ধ করে, তা হলে? অনেক ভেবেচিন্তে ডাক পড়ল কমলকেতুরই। রাজা বললেন, ‘‘কমলকেতু, তুমিই একমাত্র ঠিক সময়ে ঠিক জিনিসটির কথা মনে করতে পারো। তোমাকেই নিতে হবে বাঘের দায়িত্ব।’’
রাজার হুকুম অমান্য করার উপায় নেই। কমলকেতু ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে বলল, ‘‘আজ্ঞে।’’
তারপর থেকেই কমলকেতুর দিন কাটে বাঘের সঙ্গে। বাঘ ঘরের ভেতরে আর কমলকেতু বাইরে। দেখতে দেখতে বাঘ দুটো বড়ো হল। রাজা কুমারপ্রসাদ বাঘ পোষার গর্বে ঘুরে বেড়ান। মাঝেমধ্যে দেখতে আসেন। কখনো পাশের পরগনার কোনো রাজা এলে কুমারপ্রসাদ গর্বের সঙ্গে পোষা বাঘ দু-টিকে দেখাতে নিয়ে যান।
বাঘ পোষায় রাজার খ্যাতি ছড়ালেও, বাঘের সঙ্গে সম্পর্ক কিন্তু কমলকেতুরই। দেখতে দেখতে বাঘ দুটোর প্রতি মায়া-মমতাও গড়ে উঠেছে কমলকেতুর।
রাজা এখন আগের মতোই ভুলে যান অনেক কিছুই। কেউ মনে করিয়ে দেওয়ার নেই। দরবারে গিয়ে হয়তো খেয়াল হল বেল্টটা পরা হয়নি। তখনই হাঁকডাক পড়ে। এভাবেই চলছিল পলাশগড়ের দিনরাত।
একদিন ছোটো রাজাবাহাদুর কনকপ্রসাদ প্রতিদিনের মতো সকালবেলা জগিং করতে বেরিয়েছেন। রাজপ্রাসাদের চারপাশে পরিখা কাটা। পাঁচ-শো বিঘে জমির ওপর এই রাজপ্রাসাদ। পরিখার মধ্যে চারটে দিঘি, কত ফুলের বাগান, দুটো রাজপ্রাসাদ, একটা পুরোনো, একটা নতুন। সবচেয়ে বড়ো দিঘিটার নাম রানিদিঘি। দোল পুর্ণিমার দিন রানিরা এই দিঘির ঘাটে স্নান করেন। বছরে মাত্র এই একটা দিন। তাই দিঘিটার নাম রানিদিঘি। ছোটো রাজাবাহাদুর জগিং করতে গিয়ে দেখেন, রানিদিঘির পূর্বপাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটা মস্ত বাঘ। দেখা মাত্রই দৌড়। রাজপ্রাসাদে এসে চিৎকার চেঁচামেচি। খবর ছড়িয়ে পড়ল গোটা রাজপ্রাসাদে। খবর গেল রাজা কুমারপ্রসাদের কাছে। বাঘের ঘর থেকে একটা বাঘ কীভাবে বেরিয়ে পড়েছে।
সেই সকালেই রাজাপ্রাসাদের পরিখা পেরিয়ে, নিষেধ টপকে বাঘের বেরিয়ে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ল পলাশগড়ে। কাতারে কাতারে লোক জড়ো হল পরিখার চারপাশে, রাজপ্রাসাদের বাইরে। রাজপ্রাসাদের ছাদে তখন দাস-দাসী, রাজা-রানি, পাইক-বরকন্দাজে কোনো ভেদ নেই।
ডাক পড়ল কমলকেতুর। রাজা কুমারপ্রসাদ বন্দুক দিয়ে বাঘটা মারতেই পারেন। কিন্তু কাজে অবহেলার শাস্তি হওয়া দরকার। কমলকেতু কাজে ফাঁকি দিয়েছে। ঠিকমতো দরজা বন্ধ করেনি। এর শাস্তি তো কমলকেতুকে পেতেই হবে। রাজা রাগে কাঁপছেন। বন্দুক হাতে তিনি ছাদে পায়চারি করছেন।
কমলকেতু গিয়ে রাজার পায়ে পড়ল, ‘‘আমাকে বঁাচান রাজামশাই।’’ হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল কমলকেতু। তাতে কিন্তু রাজার রাগ একটুও কমল না। বড়ো রানি এসে রাজাকে অনুরোধ করলেন, কমলকেতুকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য। রাজা কুমারপ্রসাদ গম্ভীর হয়ে শুধু দু-পাশে মাথা নেড়ে জানিয়ে দিলেন, না।
বাঘটা আপনমনে ঘুরছে। এগিয়ে আসছে রাজপ্রাসাদের দিকে। সকালের সূর্যের আলোও যেন আজ বেশি উজ্জ্বল। রাজপ্রাসাদে এবং রাজপ্রাসাদের পরিখার বাইরে যত মানুষ, ভয়ে সকলেরই গলা শুকিয়ে কাঠ। বাঘের ভয় তো আছেই, কিন্তু রাজার কী হুকুম হয়, সেভয়ও কম নয়। খাটো ধুতি, খালি গা, গলায় গামছা, কাঁচা-পাকা চুলের মাথা নীচু কমলকেতুর। হাউহাউ করে কাঁদছে।
এমন সময় রাজা কুমারপ্রসাদের গলা গর্জে উঠল, ‘‘কমলকেতু, হয় তুমি বাঘটাকে ধরে এনে বাঘের ঘরে বন্দি করবে। নয়তো আমি দুটো গুলি খরচ করব। প্রথমটা তোমাকে, দ্বিতীয়টা বাঘটাকে। এখন ঠিক করো তুমি কী করবে?’’
রাজার তিন ভাই, চার রানি—সবাই বললেন, ‘‘সেই যদি বাঘটাকেই মারেন, তা হলে আর কমলকেতুকে মেরে কী হবে?’’
রাজা কুমারপ্রসাদ অনড়। রাজার আদেশ ছড়িয়ে পড়ল পরিখার বাইরে। পলাশগড়ের মানুষেরও একই মত। কিন্তু কুমারপ্রসাদ আদেশ থেকে সরলেন না।
কমলকেতু তখন গামছার খুঁটে চোখের জল মুছে রাজা কুমারপ্রসাদকে প্রণাম করল ভুমিষ্ঠ হয়ে। তারপর তরতর করে নেমে গেল রাজপ্রাসাদের সিঁড়ি দিয়ে। কমলকেতু ভাবল, রাজাবাহাদুরের গুলিতে প্রাণ দেওয়ার চেয়ে, যাকে ছোটো থেকে বড়ো করে তুলেছি, সেই বাঘের পেটে প্রাণ দেওয়াই ভালো।
কমলকেতু রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে হেঁটে গেল রানিদিঘির দিকে। একটু থমকে দাঁড়াল। বাঘটা দাঁড়িয়ে আছে কমলকেতুর থেকে হাত পঁচিশেক দূরে।
রাজপ্রাসাদে এবং রাজপ্রাসাদের বাইরে পরিখার ওপারে যত মানুষ, সকলেরই শ্বাসপ্রশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে গেছে। বাঘে-মানুষে মুখোমুখি!
কমলকেতু গলার পাকানো গামছাটা গলা থেকে খুলে বাঘটার দিকে হাত তুলে নমস্কার করল যেন। তারপর এগিয়ে গেল বাঘটার দিকে বলতে বলতে, ‘‘চল, ঘরে চল। খিদে পেলেই বুঝি ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে?’’
তারপর গামছাটা বাঘের গলায় জড়িয়ে দিয়ে টানতে টানতে কমলকেতু বাঘটাকে নিয়ে গিয়ে ঢুকিয়ে দিল বাঘের ঘরে। ঘরে ঢুকেই বাঘটা হুংকার ছাড়ল। বাঘের ডাকে কেঁপে উঠল গোটা রাজপ্রাসাদ। বাঘের ঘরের দরজাটি বন্ধ করতে করতে কমলকেতু বলল, ‘‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, বাবা জানি, খুব খিদে পেয়েছে। চিৎকার করিস না। এক্ষুনি খাবার আনছি।’’
কমলকেতু চলে গেল বাঘের খাবার আনতে।
রাজা কুমারপ্রসাদকে সে-দিন একটাও গুলি খরচ করতে হয়নি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন