স্বপ্নের রাজবাড়ি

রতনতনু ঘাটী

শীতের ছুটি, গরমের ছুটি বা পুজোর ছুটিতে কয়েক দিনের জন্যে হারিয়ে যায় উপাসনা। এই হারিয়ে যাওয়ার কথা বলে শুধু উপাসনাই। বাবা-মা জানেন, উপাসনা কোথাও হারায় না। শীতের ছুটিতে পুলি-পিঠের বায়না করে, পুজোর ছুটিতে তিলের নাড়ুর ভাঁড়ার শেষ করে দেয় উপাসনাই। গরমের ছুটিতে আচারের বয়াম পাড়তে গিয়ে কতবার যে ধরা পড়েছে উপাসনা, তার হিসেব খাতায় লিখেছে উপাসনার দাদা আহ্নিক।

উপাসনা সকলকে ডেকে ডেকে বলে, সেনাকি মাঝে মাঝে একটা রাজবাড়িতে চলে যায়। সেএক প্রকান্ড দুধসাদা পাথরের রাজবাড়ি। সামনে বিশাল বাগান। আর সেই বাগানে সব স্বর্গের ফুল ফুটে আছে। কোনো ফুলের নাম বৃষ্টিচূড়া, কোনো ফুলের নাম চন্দ্রমণি। একটা ফুল আছে নাকি একদম সাদা, জুঁই ফুলের মতো দেখতে। কী তার গন্ধ। এখনও চোখ বন্ধ করলেই নাকি উপাসনা সেই ফুলের গন্ধ পায়। ফুলটার নাম কেশকণা। শুধু কি ফুল? বাগানজোড়া লাল, সাদা, হলুদ, নীল সব ছোটো ছোটো পরি পাখা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে। কেউ বাগানের পাশের ছোট্ট ঝরনায় ছোট্ট দু-পা ডুবিয়ে ব্রহ্মকমলের ইয়াব্বড়ো মালা গাঁথছে।

পরির কথা শুনলে ভীষণ মজা পায় কেজি ওয়ানের নূপুর। টিফিনে যখন উপাসনা রাজবাড়ির গল্প বলে, পরির কথা এলেই হাঁ করে নূপুর জিজ্ঞেস করে, ‘‘উপাসনাদি, তুমি পরির গায়ে হাত দিয়েছিলে?’’

উপাসনা একটু হেসে বলে, ‘‘দিইনি আবার? কী নরম, কী নরম।’’

নূপুর জিজ্ঞেস করে, ‘‘কোন পরিটা সবচেয়ে ভালো উপাসনাদি?’’

উপাসনা উত্তর দেয়, ‘‘ভালো বলতে গেলে সব ক-টাই। তবে ওই যে ছোট্ট পরিটা, ওটাই সবচেয়ে ভালো।’’

‘‘কী রং তার?’’

জবাব দিতে পারে না উপাসনা। স্কুলে টিফিন ফুরোবার ঘণ্টা পড়ে যায়।

উপাসনার দাদা আহ্নিক ক্লাস থ্রি-তে পড়ে। সেবোনের এইসব রাজবাড়ির গল্প কখনো বিশ্বাস করে, কখনো করে না। উপাসনা যখন রাজবাড়ির গল্প বলে, তখন খুব মন দিয়ে আহ্নিক সব শোনে। তখন কখনো কখনো তার মনে হয়, রাজবাড়ির সব গল্প সত্যি। তারপর দু-চারদিন কেমন ঘোরের মধ্যে কেটে যায়। এর পর আহ্নিক বোনকে বলে, ‘‘রাজবাড়ি-টাজবাড়ি সব মিথ্যে। ওসব আবার সত্যি নাকি?’’

মিথ্যে যে নয়, পুরোটাই যে সত্যি, দাদাকে কী করে বোঝায় উপাসনা? তবু উপাসনা বলে, ‘‘জানিস দাদা, সেবার গরমের ছুটিতে আমি সাতদিনের মতো রাজবাড়িতে গেলাম না, সেটা অন্য একটা রাজবাড়ি।’’

উপাসনাকে থামিয়ে দিয়ে আহ্নিক বলে, ‘‘কোন বার?’’

মাথাটা ঝাঁকিয়ে উপাসনা বলে, ‘‘গত বছর।’’

আহ্নিক কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়। উপাসনা ঘাড় দুলিয়ে বলে, ‘‘যা বলছি শোন না। সেই রাজবাড়ির দু-পাশে দুটো নদী। এক নদীর জলে পাওয়া যায় মুঠো মুঠো হিরে। আর এক নদীর জলে পাওয়া যায় মণি-মাণিক্য। সেই রাজবাড়িতে দু-জন রাজকন্যা। একজনের নাম হিরেমোতি, আর একজনের নাম মাণিক্যমোতি। তারা সারাদিন নদীর চরে হিরে-মণিমাণিক্য নিয়ে খেলা করে। আমি ওদের রান্নাবাড়ি খেলা আর এক্কা-দোক্কা খেলা শিখিয়ে দিয়েছি। ওরা বলে, খোলামকুচির ঝোল রাঁধতে নাকি দারুণ মজা।

আহ্নিক হাত উলটে বলে, ‘‘তোমার মাথা আর মুন্ডু। সেবার তো গরমের ছুটিতে আমরা চাঁদিপুর বেড়াতে গেলাম সাতদিনের জন্য। গাড়ি করে আমরা গেলাম রকেট ওড়ার জায়গা দেখতে। মনে নেই? তারপর দিন গেলাম নীলগিরি পাহাড় দেখতে। সেখানে কী সুন্দর একটা ঝরনা ছিল। সিঁড়ি দিয়ে আমরা কত ওপরে উঠলাম।’’

উপাসনা ঠোঁট উলটে বলে, ‘‘ধুস, চাঁদিপুর? কই, আমার তো মনেই পড়ে না। সেবার আমি গিয়েছিলাম কাঞ্চনগড়ের রাজবাড়িতে। অবশ্য রাজবাড়িতে তো আমি একাই যাই। তুই জানবি কী করে?’’

আহ্নিক কেমন উদাস হয়ে যায়। বলে, ‘‘রাজবাড়ি না হাতি!’’ তবু মনে মনে তারও একটা দোটানা থেকেই যায়। বোন হয়তো সত্যিই রাজবাড়িতে যায়, রাতে আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়লে! কে জানে!

উপাসনা রাজার বাড়ি যায় কেমন করে? সেটাই তো সকলের প্রশ্ন। উত্তরে উপাসনা সকলকেই বলে, ‘‘কী করে যাই? অতশত আমার মনে পড়ে না বাপু। সেইসব রাজবাড়ির রূপ দেখলে দু-চোখ ভরে যায়। তখন কেমন করে গেলাম অত কি আর মনে থাকে?’’

আজ বাবার অফিস থেকে ফিরতে দেরি হবে। কোথায় যেন যাওয়ার কথা অফিসের পর। মা ও দাদার সঙ্গে উপাসনাও বসেছিল পড়ার ঘরে সন্ধেবেলা। চা-পর্ব শেষ হলেই শুরু হবে পড়াশোনা। উপাসনা মাকে বলল, ‘‘জানো মা, এবারের শীতের ছুটিতে যে রাজবাড়িটায় গেলাম না, সেই রাজবাড়িটা গোটাটাই নানা রঙের কাচ দিয়ে তৈরি। সূর্যের আলো বা চাঁদের আলো পড়লে কী সুন্দরই না দেখায়। ওটা ছিল গন্ধগড়ের রাজবাড়ি। রাজবাড়িতে ঢুকলেই দুটো মহলের পর রাজার সভাঘর। সেখানে সোনার সিংহাসনে রাজা বসে ছিলেন। আমি যেতেই আমাকে কাছে ডাকলেন।’’

আহ্নিক বিস্ময়ের গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘‘তুই রাজার সঙ্গে কথা বললি?’’

উপাসনা বলল, ‘‘বললামই তো! আমি রাজাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কেমন করে রাজা হলে? উত্তরে রাজা কী বলল জানো মা? রাজা বলল, ‘কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে যখন জ্যোৎস্নায় চারদিক ভেসে যায়, তখন আকাশে একটা তারা খুব জ্বলজ্বল করে ওঠে। সেই তারার নাম স্বাতী তারা। সন্ধে থেকে সেই তারায় একফোঁটা জল জমে। তারপর ফোঁটাটি পূর্ণ হলে ভোররাতে টুপ করে খসে পড়ে পৃথিবীতে। সেই জলের ফোঁটা আমার মাথায় পড়েছিল, তাই আমি রাজা হয়েছি। যার মাথায় ওই জলের ফোঁটা পড়বে, সেই-ই রাজা হবে। যদি তোমার মাথায় পড়ে, তুমি। আচ্ছা মা, কোজাগরী পূর্ণিমা কবে?’’

উপাসনার কথা শুনে মা কেমন গম্ভীর হয়ে গেলেন। আহ্নিক লক্ষ করেছে, উপাসনা যখনই এইসব রাজবাড়ির কথা বলে, মা-বাবা কেমন গম্ভীর হয়ে যান। অত গম্ভীর হয়ে যাওয়ার কী আছে আহ্নিক বোঝে না। উপাসনা যেসব রাজবাড়ির গল্প বলে, সেগুলো তো খুবই সুন্দর। সব এক-একটি রূপকথার গল্পের মতো। আহ্নিক ভাবে, বোনের মতো সত্যি না হোক, স্বপ্নেও যদি ওরকম দু-একটা রাজবাড়িতে যাওয়া যেত, তবে বেশ হত!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%