হুমায়ুন কবীর
অনেকদিন পর আফরোজ়ের আজ খুব মনে পড়ছে বসিরহাটে নিজেদের বাড়ির কথা। শৈশব আর স্কুলের দিনগুলোর কথা। বসিরহাটে আজও তার পুরো পরিবার, বাবা আজ়িমুদ্দিনের মাছের পাইকারি গদিতে তার বড়ভাই আসাদুর বসে, বাবা ওই গদিতে সপ্তাহে এক-আধবারই যায়। ছোট গদি, কারবারও সীমিত, তাই আসাদুর একাই চালিয়ে নেয়। হজ করে আসার পর থেকে বাবার বেশির ভাগ সময়ই কাটে মসজিদে। সবসময়ে বলে, “যৌবনে আল্লার এবাদৎ সবচাইতে মূল্যবান। তখন চার ছেলে-মেয়ে মানুষ করতে গিয়ে দম ফেলার ফুরসত পেতাম না তো আল্লার এবাদৎ করব কবে?” মা বরং অনেক চুপচাপ থাকে এখন। মুখ বুজে বাড়ির কাজ আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়েই সারাদিন কাটিয়ে দেয়।
আফরোজ় দেখেছে, বাবা-মা নামাজ পড়ে মোনাজাত মাগার সময় কান্নাকাটি করে। শব্দ করে নয়, তবে প্রায়ই ওদের চোখ দিয়ে জল গড়াতে দেখেছে ও। ওরা কি কষ্টে আছে? কোনও দুঃখ কিংবা কোনও কিছু না পাওয়ার যন্ত্রণা? আফরোজ় জিজ্ঞাসা করেছে, আলাদাভাবে বাবা আর মাকে। নাহ্, কোনও কষ্ট নেই। শুধু অনুশোচনা, দীনের কাজ করতে না পারার অনুশোচনা। আফরোজ় ভেবেছে অনেক, ও মাঝে-মাঝে আল্লার এবাদৎ করবে, নামাজ পড়বে আর রোজ়াও রাখবে। কিন্তু আল্লাকে বিপদের সময় ডাকা কিংবা আনন্দের সময় শুক্রিয়া জানানো ছাড়া নামাজ পড়া আর হয়ে ওঠে না। ধীরে-ধীরে নামাজ পড়াও ভুলে গিয়েছে আফরোজ়।
ছোটবেলায় ওর বাবা আজ়িমুদ্দিনকে দেখেছে, ভোর চারটেয় উঠে মাছ আনতে যেত ন্যাজাটে বছরের সবকটা দিন, বিরাট কিছু অঘটন না ঘটলে। মাছ কিনত বিভিন্ন ধরনের, তারপর শেয়ারের ম্যাটাডোরে চেপে সেই মাছ নিয়ে পৌঁছে যেত বসিরহাটে। ঠিক আটটায় ওর পাইকারি গদি থেকে প্রায় দশ-বারোজন মাছ নিয়ে বসত বাজারে। গদির মাছ সব শেষ হলে বাবা বাজারে নেমে যেত খুচরো বিক্রি কেমন হচ্ছে, তার তদারকিতে। মাছ বিক্রি শেষ হতে-হতে প্রায় বারোটা, তারপর মাছ বাঁচলে বড়-বড় থার্মোকলের বাক্সে বরফ দিয়ে সেই মাছ রেখে দিত পরের দিনের জন্য, আর প্রতিদিন কিছু না কিছু মাছ আনতই বাড়ির জন্য। হরেক রকমের মাছ, এক-একদিন এক-একরকম। যেদিন কিছু মাছ বেঁচে যেত বিক্রি না হয়ে, সেদিনটায় শুধু একসঙ্গে দু’দিনের মাছ। ছেলেমেয়েদের মধ্যে আফরোজ়ই সবচেয়ে ছোট, তাই আদরও বেশি। তার উপর আবার মাথা ভাল। স্কুলের শিক্ষকরাও বলত বারবার, “এই ছোট ছেলেটাকে ভাল করে পড়াও আজ়িম। এ ভবিষ্যতে কিছু না কিছু একটা হবেই।”
আফরোজ় একটু বড় হয়ে বুঝতে পারত, বাবার কাছে কম দামে মাছ পাওয়ার আশায় দু’-একজন তারিফ করত বটে আফরোজ়ের। আজ এত বছর পরেও আফরোজ় নিজের বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার মধ্যে বিরাট কিছু বিশেষত্ব খুঁজে পায়নি। আসলে আফরোজ় বরাবরই পরিশ্রমী, সারাদিন লেগে থাকে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত। ছাত্রজীবনে পড়াশোনার সময় এই লেগে থাকাই ওর কাজে দিয়েছে। ক্লাস ফাইভ থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত বসিরহাট টাউন স্কুলে কোনওদিন দ্বিতীয় হয়নি। ওর বরাবরের ইচ্ছে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার আর কম্পিউটর ওর কাছে ছিল এক বিস্ময়ের বস্তু। তাই যাদবপুরে ওই কম্পিউটর নিয়েই ভর্তি হয়ে গেল। আর সেই লেগে থাকার অভ্যেসই ওকে সব ক’টা সেমেস্টারে একেবারে প্রথমে বসিয়ে দিল।
ক্যাম্পাসিং-এর সময়ে ভাল প্যাকেজে ওকে বুক করল এক বিরাট মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানি। নিজেই অবাক হয় আফরোজ়, এত টাকা পাওয়ার ও উপযুক্ত? নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। বাড়িতে বলার সময়ে বাবাকে অর্ধেক প্যাকেজের কথা বলেছিল আফরোজ়। তাতেই ওর বাবার ঠিক যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না, নিশ্চয়ই বাড়িয়ে বলেছে আফরোজ়। বাবার কাছ থেকে শুনে ওদের প্রতিবেশী বা শিক্ষকরাও বিশ্বাসই করেনি।
পে প্যাকেজের অ্যাডভান্স পেতেই নিজেদের ভিটেতেই পুরনো বাড়ির গা ঘেঁষে দু’কামরার দোতলা পাকা বাড়ি বানাল ঝাঁ চকচকে। ছ’মাসের মধ্যেই বানানো সেই বাড়ি প্রতিবেশীরা ঘটা করে দেখতে এল। দোতলায় নিজের জন্য একটা কামরায় চাবি লাগিয়ে দিয়ে চাবি দিল মায়ের হাতে। বাকি পুরো বাড়িটাই বাবা-মাকে দিল ব্যবহারের জন্য। নিজের জন্য রাজারহাট নিউটাউনে বুক করল প্রায় আড়াই হাজার স্কোয়্যার ফুটের চার কামরার ফ্ল্যাট, আঠারো মাসেই ডেলিভারি। যাদবপুরের মেন হোস্টেল ছেড়ে সল্টলেক সেক্টর ফাইভে ছোট্ট ফ্ল্যাট ভাড়া নিল আফরোজ়, নিজের ফ্ল্যাট রেডি হলেই ওটা ছেড়ে দেবে। আফরোজ়ের উত্থান বসিরহাটের যে কোনও ছেলের কাছেই দিনের বেলার স্বপ্নের মতো।
শৈশব-কৈশোরে অবশ্য পড়াশোনা আর কবিতা লেখা ছাড়া আর কিছুই করেনি আফরোজ়। খেলাধুলো বা মেয়েদের নিয়ে আলোচনা-আড্ডা কোনওদিন ওকে আকৃষ্ট করেনি। তবুও ক্লাস টেনে উঠে সরস্বতী পুজোর দিন এক সকালে ঝুপ করে প্রেমে পড়ল। সরস্বতী পুজোর দিন সকাল-সকাল স্নান করে না খেয়ে স্কুলে গেল অঞ্জলি দিতে। অঞ্জলিও দিল ঠাকুরমশাইয়ের সঙ্গে মন্ত্রোচ্চারণ আর ফুল প্রদানের মাধ্যমে। সামান্য কাটা ফল আর সুজির হালুয়া নিয়ে মণ্ডপের বাইরে খেতে বসেছে অন্যদের সঙ্গে, হঠাৎই দমকা হাওয়ার মতো একদল মেয়ে এল ওদের স্কুলের প্রতিমা দেখতে। ওরা বসিরহাট গার্লস হাইস্কুলের, সঙ্গে দু’জন টিচার। ছোট-বড় সব মেয়েই শাড়ি পরে, তাই আফরোজ় ভাল বুঝতে পারে না কোন মেয়েটি কিশোরী আর কোনটি এখনও নেহাতই বাচ্চা। স্কুলের দিদিমণি দু’জন এগিয়ে এসে সবার সঙ্গে ছাত্রীদের আলাপ করাতে লাগলেন। ওরই মধ্যে একজন প্রায় পুতুলের মতো মেয়ে, নাম বলল অনামিকা ঘোষ, ক্লাস ইলেভেন। দিদিমণি বললেন, “আর এ হল আফরোজ় হুসেন, ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত ও ক্লাসে ফার্স্ট ছাড়া কখনও সেকেন্ড হয়নি। দিদিমণি একটু এগিয়ে যেতেই অনামিকা ওর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলেছিল, “ও মা তাই নাকি? তা তুমি পড়াশোনা ছাড়া আর কী জানো?”
প্রথমটা একটু ঘাবড়ে গেলেও সামলে নিয়ে আফরোজ় বলেছিল, “কবিতা লিখতে জানি।”
“ও মা, হাউ সুইট! তা তুমি আমাকে নিয়ে কি একটা কবিতা লিখবে?”
ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল আফরোজ়।
বিস্ময়ে কাজল লাগানো চোখ বড়-বড় করে বলেছিল, “কবিতা পছন্দ হলে তোমাকে পলাশ ফুলের মালা দেব।”
আফরোজ়ের প্রায় তখন পাগল-পাগল অবস্থা। অনামিকা ঘোষকে নিয়ে কবিতা একটা লিখতেই হবে এবং কালকের মধ্যেই ওকে দিতে হবে, তবেই না ওর মন পড়তে পারবে অনামিকা! পড়ার টেবিলে ওর বানানো রুটিন, পেন্ডুলাম, নীলগিরি পাহাড় আর জ্যামিতি সব তালগোল পাকিয়ে গেল। দুপুর থেকে মনের ভাবনাগুলোকে প্রসারিত করে, আবেগের ময়ান দিয়ে অনামিকার সৌন্দর্যের সামান্য ছোঁয়া লাগিয়ে সন্ধের মুখে একটা কবিতা মোটামুটি খাড়া করল, নিজের মনে বারবার আওড়াল, অন্যমনস্কভাবে রাতের ভাত খেল, তারপর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে হ্যারিকেনের বাতি সামান্য বাড়িয়ে কবিতা খুলে বসল যদি ছন্দ আর-একটু মেলানো যায়। নিঃশব্দে ছোটখালা পিছনে এসে বসেছে, “কাকে লিখেছিস রে?”
একই কামরায় এক বিছানায় ওর দুই দিদি আর ছোটখালা ফিরোজ়া ঘুমিয়ে ছিল, আর অন্য বিছানাতে দাদা আসাদুর আর আফরোজ়। কবিতা হাতে বামাল ধরা পড়ে গেল আফরোজ়, তোতলাতে লাগল খালাকে দেখে, “কাউকে না, ওয়াল ম্যাগাজ়িনে লেখা হবে তো, তাই।”
“অ্যাই, মিথ্যা কথা বলবি তো বুবুকে বলে দেব। সত্যি করে বল কাকে লিখেছিস?” খালা ফিসফিস করে ধমক দিল আফরোজ়কে। আফরোজ় ভেঙে পড়ে খালার কাছে আত্মসমর্পণ করল, বদলে খালা কবিতার দু’-একটা শব্দ পালটে দিতে বলল। “একটা বই চেয়ে নিবি অনামিকার কাছ থেকে, তারপর সুযোগ বুঝে কবিতাসহ বইটা ফেরত দিবি, বুঝলি?”
বুঝেছিল আফরোজ়, পলাশ ফুলের মালাও পেয়েছিল পুরস্কার হিসাবে। ইছামতীর নির্জন পাড়ে অনামিকা ওকে জড়িয়ে ধরে চুমুও খেয়েছিল বারতিনেক। খোলাপোতার অমৃতির চাইতে লোভনীয় আর স্বাদে ভরা ছিল ওইসব চুমু। মাস দুই বাদেই দুঃসংবাদ দিল অনামিকা। ওর বাবা হেডমাস্টার হয়ে চলে যাচ্ছে দমদম, ওখানে বাড়িভাড়া পেলেই ওর মা আর ওকে নিয়ে চলে যাবে।
হলও তাই। ছোটখালা মাথার চুলে বিলি-টিলি কেটে সান্ত্বনা দিয়েছিল, “ভাগ্যে থাকলে তুই আবার পেয়ে যাবি অনামিকাকে।”
খালাই ওকে পড়তে দিল শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’। ‘দেবদাস’ পড়ে দুঃখ ওর বেড়ে গেল, অনামিকা আর পার্বতীর জন্য আলাদা করে। একটাই সান্ত্বনা, পার্বতীর বিয়ে হলেও অনামিকা শুধু দূরে চলে গিয়েছে এই যা! “দমদম এমন কিছু পৃথিবীর উলটো পিঠে হন্ডুরাসের কাছাকাছিও নয়। দিনের দিন গিয়ে, ফ্লাইওভারের উপরে দাঁড়িয়ে, লোকের চোখ এড়িয়ে, শুয়ে থাকা খোঁড়া ভিখারির চাহনি অগ্রাহ্য করে এক আধটা চুমু-টুমু খেয়ে এসে সন্ধ্যায় তুই জ্যামিতি-ট্রিগোনোমেট্রি নিয়ে বসতে পারবি।”
নাহ্, অনামিকার সঙ্গে আর দেখা হয়নি আফরোজ়ের। দুঃখে আফরোজ় দিশেহারা হয়ে গেল কয়েকদিন। ইছামতীর পাড়ে-পাড়ে ঘুরল, মাছ কিনতে বাবার সঙ্গে ন্যাজাট গেল, মাছের বাজার ঘুরল, শায়েস্তানগর চলে গেল খালার সঙ্গে, থাকল ক’দিন নানার বাড়িতে, নানার সঙ্গে গোহাটায় গেল, গোরুর দাঁত দেখে ওর বয়সের হিসেব বুঝল, তারপর একদিন ফিরে এল বাড়ি। বইয়ের ভাঁজে শুকিয়ে যাওয়া পলাশ ফুলের মালা বিসর্জন দিল ইছামতী নদীতে। বই-খাতা খুলে বসল আবার। বাংলা ছাড়া সব সাবজেক্টে লেটার মার্কস পেয়ে মাধ্যমিক পাশ করল, স্কুলের সব ভাল ছাত্রদের রেকর্ড ভেঙে চুরমার।
হায়ার সেকেন্ডারির সিলেবাস অনেক বড়, অনেক দুর্বোধ্য, শিক্ষকদের বারবার সাবধানবাণী ওকে বইয়ের মধ্যেই ডুবিয়ে দিল। এর মধ্যেই জেলখানার রাস্তায় একটা পলাশফুলের গাছ আবিষ্কার করল। বসন্তে ফুল ফোটার সময় তো বটেই, মাঝে-মাঝেই সাইকেল চালিয়ে চলে যেত পলাশগাছের তলাতে, ফিসফিস করে বলত, “তোমার সঙ্গে আমার প্রেম কিনা! তাই তো ছুটে আসি।” পলাশগাছ বুঝত ওর প্রেমাস্পদের কথা, ঠান্ডা হাওয়ার প্রলেপ দিত ওর মাথায়, কপালে, আর বিড়বিড় করে আফরোজ় বলত ওর মনের কথা। বসন্তের সন্ধ্যায় সাইকেল চালিয়ে চলে যেত পলাশগাছের কাছে। ফিরে আসত পলাশফুল নিয়ে, ছড়িয়ে রাখত নিজের বইয়ের র্যাকে।
হায়ার সেকেন্ডারিতে পাশ করল স্কুলের রেকর্ড-টেকর্ড ভেঙে, বন্ধুরা বলল, “ও তো রেকর্ড ভাঙবেই, পাগলরাই তো অসম্ভব আর অবাস্তব কিছু করে ফেলে, পলাশফুলের সঙ্গে ওর প্রেম, ও তো পাগল! রেকর্ড ভাঙার জন্যই জন্মেছে!”
ভর্তি হয়ে গেল যাদবপুরে কম্পিউটর সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে। আন্দোলনে নেই, কিন্তু পড়াশোনায় আছে। “আরে এই ল্যাদারাম ছেলে, তুই যাদবপুরে ভর্তি হলি কেন রে? আর জায়গা পেলি না বাছা?” মেকানিক্যালের সুস্মিতা পিঠে চাপ্পড় মেরে ঠাট্টা করল। আফরোজ় জানে, এসব কথার কোনও উত্তর দিতে নেই। কাঁঠালিচাঁপা ফুলের পাপড়ির মতো ঠোঁট দুটোকে একটু বাঁকিয়ে আবার সোজা করে নিল।
“তোর এই নৌকাবিলাস হাসি আমার গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দেয় মাইরি, গাড়ল কোথাকার!” সিগারেট ফুঁকতে-ফুঁকতে তর্ক জুড়তে চায় সুস্মিতা। কিন্তু প্রতিপক্ষ ওয়াকওভার দিয়ে বসে আছে। ‘‘স্টুডেন্ট থাকার সময় চুল্লু খাবি না, সিগারেট ফুঁকবি না, রাস্তায় নেমে হেঁক্করবাজি করবি না তো শালা বসিরহাটে থাকলেই পারতিস!” সুস্মিতা গলগল করে নাক দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে নিদান দেয়।
“তোর এই হেঁক্করবাজির মধ্যে আমি কোনও আনন্দ বা বীরত্ব খুঁজে পাই না, বুঝলি। তাই আমার ব্যক্তিসত্তার বিবেক আর রুচিতে বাধে এমন কোনও কাজ আমি করব না।”
সুস্মিতা হাল ছেড়ে দিয়েছিল।
আফরোজ়ের সেই নৌকাবিলাস হাসি। নিজের পড়াশোনা, ইউনিভার্সিটির নানা আন্দোলন আর বাওয়াল দেখে বেশ কাটছিল সময়।
ফ্রেশার্স, মানে নবীনবরণের দিন প্রোগ্রাম দেখতে গিয়ে ঝামেলায় পড়ল। প্রোগ্রাম শেষে বেশ একটু খিদে নিয়ে পা চালাল হস্টেলে ফিরবে বলে। বেরিয়ে আসার মুখে গেটের কাছে সুস্মিতা ওকে ধরল, বাইরে থেকে ভিতরে ঢুকছিল আরও কয়েকজনের সঙ্গে, “এই যে বিবেকবাবু, কী খবর? শালা দেখা পাওয়া যায় না যে,” ওর শেষের কথাগুলো কেমন যেন জড়িয়ে গেল, মাল টেনেছে মনে হয়।
এড়িয়ে যাওয়ার জন্য মিনমিন করে বলল, “খুব খিদে পেয়েছে রে, তাই হস্টেল যাচ্ছি।”
“পেট থাকলে খিদে তো পাবেই। আরও কিছু তো আছে নাকি! তাহলে তোর যৌনক্ষুধা পায় না? কোনও সেক্সুয়াল ডিজ়ায়ার নেই? তুই ইমপোটেন্ট নাকি রে?” সুস্মিতার পা টলছে, আফরোজ় বুঝতে পারে সুস্মিতার নেশা চড়ে গিয়েছে। সিগারেটের টুকরো ছুড়ে দেয় সুস্মিতা।
আফরোজ় পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ওকে ধরে ফেলল সুস্মিতা, “আরে চল! একটু ঘুরে তারপর না হয় যাবি। আমি তোকে ক্যান্টিনে খাওয়াব।” টানতে-টানতে নিয়ে গেল ঝিলের পাড়ে। শান বাঁধানো গাছের তলায় বসে বলে, “জানিস, মৈনাকটা একটা গান্ডু।” আফরোজ় চুপ করে আছে দেখে আবার বলে, “মৈনাকটা শালা গান্ডু একটা! কেন জিজ্ঞেস করবি না?”
মেকানিক্যালের মৈনাক পড়াশোনায় খুব ভাল। তাই বলে, “তুই বললে তবেই তো জানতে পারব। ও তো এমনিতেই খুব ভাল ছেলে বলেই আমি শুনেছি।”
জিনসের পকেট থেকে সিগারেট আর দেশলাই বের করে ফস করে আবার একটা সিগারেট ধরিয়ে বেশ আয়েশ করে ধোঁয়া ছাড়ে সুস্মিতা। বলে, “ও শালা এখন চন্দ্রিমার পাল্লায় পড়েছে, ভাদ্র মাসের কুকুরের মতো পিছন-পিছন ঘুরছে। ওর গনোরিয়া হবে দেখিস, হতেই হবে…” শেষের কথাগুলো নেশার জন্য, নাকি কান্নার ফলে কেমন যেন জড়িয়ে যায় অভিশাপটা।
সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে সুস্মিতার পিঠে আলতো করে হাত ছোঁয়ায় আফরোজ়। আচমকা আফরোজ়কে জড়িয়ে ধরে সুস্মিতা, নিজের ঠোঁট দুটো দিয়ে আফরোজ়ের ঠোঁট চেপে ধরে। সিগারেট আর মদের মাখামাখি গন্ধে শরীর গুলিয়ে বমি উঠে আসে আফরোজ়ের। সুস্মিতাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিজেকে ওর ওষ্ঠমুক্ত করে উঠে দাঁড়ায়, “ছিঃ! তুই একেবারে মাতাল হয়ে গিয়েছিস, আমি দু’চক্ষে দেখতে পারি না,” আফরোজ় দৌড়তে থাকে গেটের দিকে। ওয়াক উঠে আসে খালি পাকস্থলি মোচড় দিয়ে।
“এই প্রতিজ্ঞা করলাম আমি আর মদ ছোঁব না। দাঁড়িয়ে যা প্লিজ়। তোকে আমার ভীষণ দরকার আফু,” পিছন থেকে বিকারের মতো ভেসে আসে সুস্মিতার গলা। আফরোজ়ের পা দুটো ছুটছে পাগলের মতো।
কম্পিউটর সায়েন্স পড়া পর্যন্ত কম্পিউটরই তার প্রেম। সুস্মিতা ঘটা করে ছাপানো কার্ডে ওকে ‘সরি’ বলেছে, আফরোজ় উপেক্ষা করেছে ওর এই দুঃখ প্রকাশ।
আবারও কয়েকটা রেকর্ড ভেঙে পাশ করল আফরোজ়। ক্যাম্পাসিং আগেই হয়েছিল। সুস্মিতা কোনও ভাল কোম্পানি না পেলেও অবাক হওয়ার মতো রেজ়াল্ট করে সবাইকে চমকে দিল। রেজ়াল্ট নেওয়ার দিন করিডরে দেখা হতেই তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “আর ক’টা দিন আগে থেকে যদি শুরু করতাম পড়াশোনাটা, তাহলে তোকেও শালা দেখে নিতাম। মডার্ন হাইয়ের স্টুডেন্ট ছিলাম এটা মনে রাখিস।”
আফরোজ় জানে সুস্মিতা খুবই বুদ্ধিমতী মেয়ে। আসলে ইউনিভার্সিটিতে পড়তে এসে ওর চারটে পাখনা গজাল আর প্রথমের দিকের সেমেস্টারগুলোতে রেজ়াল্ট খারাপ করল। মুখে তাই বলে, “আমার মতো তুই যদি পড়াশোনায় সময় দিতিস, তাহলে তুই সব্বাইকে টপকে যেতিস, এটা আমরা আগেও আলোচনা করেছিলাম।”
আফরোজ়ের মুখে প্রশংসা শুনে সুস্মিতার গলাটা একটু নরম হয়, বলে, “ওই শালা ভেড়ুয়া মৈনাক চন্দ্রিমাকে ডিচ করেছে জানিস? ও শালা একটা…”
“ক্ষণিক, অল্প সময়ের প্রেমিক বলতে পারিস,” আফরোজ় ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে।
“ঠিক বলেছিস। চাকরিতেও দেখিস কেলো করে বেড়াবে। কোনও স্টেবিলিটি নেই, শালার অ্যাটিটিউড আর লাইফ প্যাটার্নেই গড়বড় আছে,” তারপর গলা নামিয়ে বলে, “আমি মদ আর সিগারেটকে এক্কেবারে তিন তালাক দিয়েছি বুঝলি।”
“খুব খুশি হলাম, এবার তোর ভাল কিছু একটা হবেই। ম্যাকলিন ইঞ্জিনিয়ারিং ভাল কোম্পানি। ভাল করে কাজ কর, ইউ উইল বি রিওয়ার্ডেড।”
“থ্যাঙ্কস, ভাল থাকিস। আর সারাটা জীবন যেন শুধু পলাশ ফুল ভালবেসে কাটিয়ে দিস না,” সুস্মিতা লম্বা করিডর দিয়ে হেঁটে এগিয়ে যায়। আফরোজ়ের খুব ইচ্ছা করে বলতে, আবার দেখা হবে… দৌড়ে গিয়ে কি ওকে বলে আসবে? প্রত্যাখ্যানের স্মৃতি ওর পা দুটোকে ভারী করে আটকে রাখে।
টক-টক করে দরজায় নক হতেই সংবিৎ ফিরে আসে আফরোজ়ের। ডান হাতের ড্রয়্যার টেনে ওয়েট টিসু টেনে নেয় প্যাকেট থেকে, দ্রুত চোখ মুছে বলে, “কাম ইন।”
অনুশ্রী ঢুকে আসে ওর চেম্বারে, “স্যার, অনেকক্ষণ আপনার ঘরের বাইরে এনগেজ্ড লাইট জ্বলছে আর ইন্টারকমের রিসিভার নামানো। আর ইউ ওকে স্যার? জাস্ট খোঁজ নিতে এলাম।”
“ইয়েস আই অ্যাম অলরাইট। রিসিভারটা ভুলে নামিয়ে রেখেছিলাম,” ফোনের উপর রিসিভার ঠিক করে রেখে অনুশ্রীর দিকে তাকায় আফরোজ়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “নভেম্বরের নাইন্থ থেকে টুয়েলফ্থ তুমি আমার সঙ্গে যাবে পারসোনাল একটা টুরে?”
“অফিসে জানাজানি হয়ে যাবে স্যার। তাহলে আমাকে অন্তত একদিন আগে থেকে ছুটি নিতে হবে। আর ফিরে আসব আপনি ফেরার দু’দিন পর। ইজ় ইট ওকে স্যার?”
“তোমার বয়ফ্রেন্ড বা বাড়িতে জানতে পারবে না?”
“স্যার, প্রণব আমার স্টেডি বয়ফ্রেন্ড ছিল না। তা ছাড়া ওর সঙ্গে ব্রেকআপ হয়ে গিয়েছে মাস তিনেক হল। আর বাড়িটা ম্যানেজ করে নেব, বলব অফিশিয়াল টুর,” অনুশ্রী আশ্বস্ত করে আফরোজ়কে। “উইল টক টু ইউ ওভার ফোন,” বলে চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে যায় অনুশ্রী।
“ওকে। ম্যাটার সেটেল্ড,” আফরোজ় নিজেকে বলে। দিনের আলো প্রায় শেষ, টেবিলের উপর লেখা অস্পষ্ট। আফরোজ় চেয়ার ছেড়ে উঠে যায় পশ্চিম দিকের কাচের দেওয়ালে, ব্লাইন্ডের রড ঘুরিয়ে জানলার উপর ভার্টিকালি ছেড়ে দেয়। শেষ বিকেলের কমলা রঙের ছটা ছড়িয়ে পড়ে কামরা জুড়ে। মুখটা সামান্য বাড়িয়ে কাচের জানলায় নাক ঠেকায়। অক্টোবরের শেষ, সূর্য দক্ষিণ হেমিস্ফিয়ারে সরতে শুরু করেছে, তাই সূর্যের আলো তাতিয়ে দেয়নি জানলার কাচ। নিধির সঙ্গে মানসিক দূরত্ব, তাই আফরোজ়ের সঙ্গে ওর সম্পর্ক উত্তাপ তৈরি করতে পারেনি। দু’জন দুই হেমিস্ফিয়ারের না হলেও দূরত্ব ছিল অনেক। নিধির সারসপাখির ডানার মতো লম্বা হাতের আলিঙ্গনে তাই যৌনতাই খুঁজে পেয়েছে বেশি, পেয়েছে উত্তেজনা, তবে উষ্ণতার অভাব থেকে গিয়েছিল কোথাও না কোথাও। চার বছর একসঙ্গে থেকেও আফরোজ়ের বাচ্চা ধারণ করতে অপারগ ছিল নিধি। আফরোজ়ের বারবার অনুরোধেও তাই সাড়া দেয়নি। ব্যাপারটা ঝগড়াঝাঁটির পর্যায়ে পৌঁছলে নিধি আফরোজ়কে অবাক করে বলেছিল, “আমি তোমার বিয়ে করা বউ নই, বুঝলে?”
“বিয়ে করছি না কেন আমরা? আমি এখনই রাজি, দাড়ি কেটে স্নান সেরে জামাকাপড় পরতে যা সময় লাগে,” কাতর মিনতি করেছিল আফরোজ়, “চলো বিয়েটা সেরে ফেলি।”
সুটকেসে জামাকাপড় গুছিয়ে রাজারহাটের বিশাল ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল নিধি, আফরোজ়ের অফিসেও আর আসেনি। জানলায় দাঁড়িয়ে সূর্য ডোবা দেখতে-দেখতে আফরোজ়ের বুকে ছ্যাঁত করে লাগে। আজ প্রায় একবছর শুধু নয়, ওর জীবন থেকেই যেন হারিয়ে গেল নিধি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন