রামধনু – ১১

হুমায়ুন কবীর

সকাল সাতটা পঞ্চাশেই বিশ সিটার লাক্সারি বাস নিয়ে গন্তব্যস্থানে পৌঁছে গেল অনুপমা। বাসস্ট্যান্ডের পিছনে বাই লেনে বাস পার্ক করা, উত্তর মুখে বিশ্ববাংলা আইল্যান্ডের দিকে পিছন করে। ড্রাইভার আপত্তি করেছিল দু’বার। সুন্দরবন যেতে হলে বাসন্তী হাইওয়ে ধরতে হবে, সে তো উলটো দিকে। শুধু-শুধু এখানে বাস ঘোরানো কেন? সামনেই হাত বাড়িয়ে বাসন্তী হাইওয়ে দেখিয়েছিল ড্রাইভার, “এই তো, সোজা গিয়ে বাঁদিকে ঘুরলেই বাসন্তী হাইওয়ে।”

“আমি জানি। তবুও তুমি উত্তরমুখে বাসটা পার্ক করো। আমরা দিল্লি ঘুরে সুন্দরবন যাব। তোমার আপত্তি আছে?” অনুপমার হেঁয়ালি বুঝতে না পেরে ড্রাইভার বিরক্তমুখে বাস পার্ক করে ইএম বাইপাসের পশ্চিমে। শর্মিষ্ঠাই বলে দিয়েছে ওখানে গাড়ি পার্ক করতে। আসলে মোটামুটিভাবে বাড়িতে সবাই বলেছে, সেমিনার কিংবা অফিসের মিটিং-এ দিল্লি যাচ্ছে। তাই ওখানে গাড়ি পার্ক করানোটাই যুক্তিযুক্ত। ড্রাইভাররা যাদের ছাড়তে আসবে, সবাই যাতে বুঝতে পারে, মালিক দিল্লি যাচ্ছে আরও কয়েকজন সহকর্মীদের সঙ্গে। মৈনাক গতকাল রাতেই ফোনে সবাইকে লোকেশন কনফার্ম করেছে।

মৈনাক-শর্মিষ্ঠা পৌঁছে যায় আটটার মধ্যেই। “হ্যাঁ ম্যাডাম, সকালের ব্রেকফাস্ট নিয়েছি ভেজ স্যান্ডউইচ, মাফিন, বয়েল্ড এগ আর ফ্রুট জুস,” শর্মিষ্ঠার প্রশ্নে উত্তর দেয় অনুপমা। শর্মিষ্ঠা আর অনুপমা সামনের একটা সিটে বসে পড়ে চেক লিস্ট নিয়ে। মৈনাক বলে, “আমি বরং নীচে নেমে দাঁড়াই, যদি কেউ বাসটাকে লোকেট করতে ভুল করে।”

একে-একে আলাদা-আলাদাভাবে পৌঁছে যায় সুমন্ত-নাজ়িয়া, অরূপ-তনুশ্রী, সুরিন্দর-পূজা, আফরোজ়-অনুশ্রী। সবাইকেই উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় মৈনাক আর শর্মিষ্ঠা। বাসে উঠেই তনুশ্রী জড়িয়ে ধরে শর্মিষ্ঠাকে, “বাব্বা! কতদিন পরে দেখা! আসিস না কেন পার্ক স্ট্রিটে? অনেক গল্প জমে আছে রে! ভাল আড্ডা হবে, তুই বোস, আমি বাকিদের একটু দেখে নিই।” তনুশ্রী তার বড়-বড় চোখে হাসির ঝিলিক ধরে রেখে এগিয়ে যায় বাসের ভিতর, অরূপের সঙ্গে মাঝের দিকের সিটে গিয়ে বসে। ঘড়িতে সাড়ে আটটা, মৈনাক বারবার ঘড়ি দেখে। ওপি স্যার এখনও পৌঁছলেন না! মৈনাক ফোন করতে কন্ট্যাক্টে খোঁজে ওপি সিংহর নাম। ওই তো গাড়ি থেকে নামছে ওপি স্যার! ওর পার্টনার কোথায়? মৈনাক এগিয়ে যায়।

“পার্টনার কাঁহা স্যার?” মৈনাক জিজ্ঞাসা করে।

“রুকিয়ে, ফোন লাগাতা হুঁ।” ওপি একটু সরে গিয়ে ফোন লাগায় সুরিন্দরকে, “অঞ্জলি কাঁহা হ্যায়? বাত ফাইনাল হুয়া থা না তুমসে?”

“হ্যাঁ। বাত পক্কি হ্যায়, ম্যাঁয় অভি ফোন করকে চেক করতা হুঁ।”

সুরিন্দর ফোন করে অঞ্জলিকে।

“আমি প্রায় পনেরো মিনিট দাঁড়িয়ে আছি প্রগতি ময়দান থানার সামনে। ওকে, ওপি স্যার তুলে নিচ্ছেন তোমাকে দিল্লি যাওয়ার পথে, ওখানেই অপেক্ষা করো।”

সুরিন্দর আবার ফোন করে জানিয়ে দেয় ওপি স্যারকে।

ওপি তাকায় মৈনাকের দিকে, “চলিয়ে, পার্টনার প্রগতি ময়দান থানাকে সামনে ওয়েট কর রহি হ্যায়।”

মৈনাক আর ওপি উঠে আসে বাসের ভিতরে। মৈনাক এগিয়ে যায় ড্রাইভারের কাছে, “গাড়ি ঘুরিয়ে উলটো দিকে থানার সামনে চলো, ওখানে উঠবেন এক ভদ্রমহিলা, ওঁকে তুলে দিয়ে সোজা গঁদখালি।’’ সুরিন্দর ওপি-কে দেখেই সিটের পিছনে মুখ লুকোয়, “শালা! দিল্লিটা কি কন্টিনেন্টাল ড্রিফটের ফলে সুন্দরবনে ওভারল্যাপ করেছে! মিথ্যা বলে নিজে ফাঁসল আর আমাকেও ফাঁসিয়ে দিল!”

ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। ফ্লাইওভার পার করে ডাইনে টার্ন নিয়ে অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দেয়, সামনের সিগন্যাল পার করে পৌঁছে যায় প্রগতি ময়দান থানার সামনে। ব্রেক কষে দাঁড়াতেই গেটে দাঁড়ানো ওপি নেমে যায় গেট থেকে, অঞ্জলির মালপত্র সমেত ওঠে বাসের ভিতরে, পিছনে অঞ্জলি।

“হোয়াট দ্য হেল ইজ় দিস?” হিসহিস করে আফরোজ় দাঁতে দাঁত চেপে বলে।

“প্লিজ় কাম ডাউন, রিমেন সাইলেন্ট, লেট নিধি স্পিক ফার্স্ট। ইফ শি ডাজ় নট স্পিক দেন রিমেন কোয়ায়েট ফর গডস সেক!” অনুশ্রী হাত চেপে ধরে আফরোজ়ের।

“হু ইজ় দ্য ওল্ড বাগার? ডু ইউ নো হিম?” অনুশ্রীর মুখের দিকে তাকায় আফরোজ়।

“হাউ ডু আই নো? প্লিজ় রিমেন কোয়ায়েট, এভরিথিং উইল রিভিল ইটসেল্ফ!” অনুশ্রী আরও শক্ত করে চেপে ধরে আফরোজ়ের হাত।

ড্রাইভারের কাছ থেকে সরে এসে মৈনাক হাত বাড়ায় ওপি-র দিকে। হ্যান্ডশেক করে এবার হাত বাড়িয়ে দেয় অঞ্জলির দিকে। মৈনাকের ভুরু জোড়া কুঁচকে যায় এক মুহূর্ত, সামলে নেয় নিজেকে, শর্মিষ্ঠার পাশে গিয়ে বসে।

অ়ঞ্জলি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আফরোজ়ের দিকে। আফরোজ় চোখ সরিয়ে নেয়। আফরোজ়ের মনে হল ওপি-র পাশে সিটে বসার আগে ওর চোখে জল টলটল! আফরোজ়ের মন উত্তাল হয়ে উঠতেই মনে পড়ে যায় ছোটখালার কথা, “মনটাকে কষে চাবুক লাগাবি আর আল্লার কথা, মা-বাবার কথা ভাববি, আল্লা যা করেন ভালর জন্যই, সবসময় আর সবদিন এটা মনে রাখবি।”

নিধিকে সরিয়ে নিয়ে আল্লা ওর কোন ভাল করছেন, তা আল্লাই জানেন। আজ একবছর… ওর কাজ করার ইচ্ছেটাই চলে গিয়েছে, ওর কাজের আউটপুট অর্ধেকের চেয়েও কম, নেহাত অঞ্জনদা আছে তাই! সারাদিন একটা চাপা ক্ষোভ, একটা দুঃখে মনটা ভার হয়ে কাজের ইচ্ছেটাকেই হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে যায়। কেমনভাবে সারাটা দিন কেটে যায় তা আফরোজ়ই জানে না।

ই এম বাইপাসে গাড়ি সামান্য এগিয়েই বাঁদিকে কাট আউট দিয়ে বাই লেনে ঢুকে এগিয়ে যায়। বাঁ হাতে পি সি চন্দ্র গার্ডেন্স পার করে ছুটে এসে বাঁদিকে বাঁক নিতেই বাসন্তী রোডে এসে পড়ে গাড়ি।

সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মৈনাক, গলা খাঁকারি দিয়ে ওর দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করে বলে, “হ্যালো ফ্রেন্ডস, এখন আমাদের এক বন্ধু অনুপমা ব্রেকফাস্ট সার্ভ করবে, আপনারা প্লিজ় সবাই ওকে হেলপ করুন। নিজের নিজের পছন্দের খাবার তুলে নিন। আমাদের পরিচয়পর্ব এখনও সারা হয়নি। তবে গঁদখালি পৌঁছে আমরা তা সেরে নেব। সো নাও হেলপ ইয়োরসেলফ,” মৈনাক সিটে বসে পড়ে।

অনুপমা সিট থেকে উঠে যায় পিছনের সিটে, অনুশ্রী এগিয়ে যায় ওকে সঙ্গ দিতে। দু’জনে খাওয়ার ট্রে হাতে এগিয়ে আসে সকলের কাছে। অনুশ্রী নিজের সঙ্গে আফরোজ়ের খাবারও তুলে নেয় ট্রে থেকে।

গাড়ি ছুটছে বাসন্তী হাইওয়ে দিয়ে, বাঁদিকে নোংরা জলের ড্রেন, প্রায় কালো ড্রেনের ওপারে, লাল-লাল নটে শাক, পালং, ফুলকপি আরও কতরকমের সবজির খেত সরে-সরে যাচ্ছে। আফরোজ়ের এসব চেনা। বেশ কয়েক বছর ধরে এই রাস্তাটা ধরেই বসিরহাট যাওয়া আসা করে। মালঞ্চ ব্রিজের উপর দিয়ে গাড়ি নিয়ে পেরিয়ে যায় বিদ্যাধরী নদী, মুররিশা পৌঁছে বাঁদিকে ঘুরে রাস্তায় উঠলেই সোজা বসিরহাট ত্রিমোহিনী। কখনও-সখনও বারাসত চম্পাডালি মোড় দিয়ে টাকি রোড ধরেও যায় আফরোজ়, আবার রাজারহাটের ভিতর দিয়ে খড়িবাড়ি-শাসন-কাঁচকল হয়েও টাকি রোড ধরে বসিরহাট গিয়েছে কয়েকবার। আফরোজ়ের নিজের মনের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই। হাজার রকমের ভাবনা আর চোখ দিয়ে দেখা রাস্তার ধারে সরে সরে যাওয়া ফোটো ফ্রেম ওর ব্রেন সেল গ্রহণ করছে না। ঘুরে ফিরে সেই এক জায়গাতেই আটকে আছে। নিধি বসে আছে সামনের দু’-তিনটে সিট আগেই।

চার বছরেরও বেশি সময়! কত আনন্দ, শখ-আহ্লাদ, দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো আর একসঙ্গে দেখা স্বপ্ন, সব ভুলে ভেঙে-চুরে একদিন নিঃশব্দে ওর জীবন থেকে বেরিয়ে গেল নিধি। আফরোজ় শুধু চেয়েছিল সন্তান। সব জীব, সব প্রাণী, সব্বাই চায় বংশবিস্তার। নিজের জিনের বিস্তারলাভ জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে সব জীবেরই এক জৈবিক বৈশিষ্ট্য। নিরন্তর এই প্রক্রিয়া পৃথিবীর নিজের অক্ষের চারদিকে ঘুরতে থাকার মতোই বাস্তব আর সূর্যের চারদিকে ইলিপ্টিক্যাল পথে ঘুরতে থাকার মতোই সত্য।

কে এই রুস্তম, যার গায়ে গা ঠেকিয়ে বসে আছে নিধি, যার শয্যাসঙ্গিনী হয় এই নিধি? তাহলে কি আফরোজ়ের সঙ্গে থাকতে-থাকতেই এই মাঝবয়সি লোকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল? শেষের দিকে বছরখানেক ওর বাবাকে নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল নিধি। দুটেো কিডনিই নাকি খারাপ, মাত্র পনেরো পারসেন্ট কাজ করছিল। জলের মতো টাকা খরচ হচ্ছিল ওদের। আফরোজ় কোনওদিন জানার চেষ্টাও করেনি কত টাকা খরচ হচ্ছিল। ওর আলাদা করে কিছু ভাবতই না আফরোজ়, সবটাই ওদের, দায়-দায়িত্বও দু’জনেরই। কাজের চাপে ডাক্তার-হাসপাতাল হয়তো কম করেছে আফরোজ়, তবে চিকিৎসার কোনও ত্রুটি হয়নি টাকাপয়সার অভাবে।

শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পৌঁছেছে আফরোজ় তা-ও প্রায় দেড় দশকের বেশি। কারও সঙ্গে কোনওদিন হাতাহাতি-মারামারি করেছে, এমন ঘটনা মনেই পড়ে না আফরোজ়ের। অথচ এই মুহূর্তে ভীষণ ইচ্ছে করছে নিধির পাশে বসা লোকটার সঙ্গে বক্সিং বা কুস্তি লড়তে। নিদেনপক্ষে ফ্রি হ্যান্ডস আঁচড়ানো-কামড়ানো, ওর সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও ক্ষত-বিক্ষত করতে চায় আফরোজ়। আফরোজ় শৈশব থেকেই ভীষণ ভিতু। ধাক্কাধাক্কি হওয়ার ভয়ে ফুটবল, কবাডি খেলতই না আর ক্রিকেট খেলার জন্য ছোটখালা বা পাড়ার ছেলেরা জেদাজেদি করলেও ভাবত ওই শক্ত বলটা সবাই ওর মাথা লক্ষ করেই ছুড়বে। ভয়টা ছিল একটা মানসিক রোগের মতো। স্কুলে বা পাড়ায় ছেলেপুলেরা সামান্য হাতাহাতি করলেও আফরোজ় ছুটে পালিয়ে যেত ওখান থেকে।

অনুশ্রী খানিকটা হলেও আঁচ করতে পারে আফরোজ়ের মানসিক অবস্থা। তাই ওর হাত চেপে রাখে, গায়ে গা ঠেকিয়ে ঘনিষ্ঠভাবে বসে যাতে ওর মনে হয় সহানুভূতির অভাব নেই এই পৃথিবীতে। আফরোজ় আড়ষ্টভাবে বসে থাকে আর মাথা জুড়ে চলতে থাকে উথাল-পাথাল।

“আমরা ঘটকপুকুর পার করছি, ওই যে বাঁ হাতে ব্রিজ পার করলেই ওপাশে সেই বিখ্যাত ভাঙড়। এরপর আসবে মিনাখাঁ আর মাল়ঞ্চ। এই ঘটকপুকুরের পর বাঁ হাতে যে হাই ড্রেনটা দেখেছিলেন ওটার নাম হাড়োয়া খাল, আর এই খাল কিছু পরই শাখা-প্রশাখার সঙ্গে জুড়ে হয়েছে বিদ্যাধরী নদী। কিছুক্ষণ পরেই দু’পাশেই দেখতে পাওয়া যাবে মাছের ভেড়ি। এইসব ভেড়িতেই চাষ হয় বাগদা চিংড়ি, পার্শে আর ভেটকি মাছের,” একটানা কথাগুলো বলে চলেছে মৈনাক। কানে আসছে আফরোজ়ের, তবে মাথায় ঢুকছে না।

লাক্সারি বাস ছুটছে দ্রুতগতিতে, তবে গতি বোঝার উপায় নেই। জানলার কাচ সব বন্ধ, সঙ্গে দোসর ভারী পর্দা। এসি বাস তার উপর ইউনেস্কো এই রাস্তায় নাক গলাবার পর থেকেই রাস্তা ভাল হওয়া শুরু, তাই ঝাঁকুনি নেই। স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় বাসে চেপে যাতায়াত করেছে বহুবার। জানলার ধারে সিট পাওয়া ছিল এক পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। বাস ছুটছে হু হু করে, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জানলা পেরিয়ে আছড়ে পড়া দমকা বাতাসই জানান দিত বাসের গতি। আফরোজ় কখনও চোখ বুজে কখনও চোখ খোলা রেখে স্পর্শ আর ঘ্রাণ নিত সেই বাতাসের গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত-বসন্ত সব ঋতুতেই। শীতের সময় কোনও সহযাত্রী জানলা বন্ধ করতে বললেই মন খারাপ হয়ে যেত আফরোজ়ের, আজও তা স্পষ্ট মনে আছে। চাকরিতে ঢোকার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই গাড়ি কিনল আফরোজ়। তারও জানলার কাচ সব ঋতুতেই বেশির ভাগ সময়ই বন্ধ। তা-ও আফরোজ় নিজে গাড়ি চালানোর সময় মাঝে-সাঝে জানলা খুলে রাখত। রাস্তায় অনেক ধুলো, অনেক কার্বন মনোক্সাইড, সালফার-ডাই-অক্সাইড আরও কত কী পল্যুটেন্ট এই অজুহাতে নিধি গাড়ির জানলার কাচ বন্ধ করে দিল চিরতরে। আফরো‌জ় সেই অভ্যেস আজও বয়ে বেড়াচ্ছে। ছোট মফস্‌সল শহর বসিরহাটের আফরোজ় রাজারহাটে আড়াই হাজার স্কোয়্যার ফুটের ফ্ল্যাট, লাক্সারি এসইউভি গাড়ি হাঁকিয়ে ঘুরে বেড়ালে কী হবে, মনে মনে ভয়ে কুঁকড়ে থাকত সবসময়। জিভের আড় ভেঙে ইংরেজি বলার মতোই ছিল আত্মবিশ্বাসের অভাব। নিধিই জোগাল আত্মবিশ্বাস আর সাহসের সঙ্গে তার নাগরিক অধিকারবোধ, বুক চিতিয়ে চলা, থেমে-থেমে ওজন বাড়িয়ে কথা বলা আর সঠিকভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে। আকাশের গায়ে জেট প্লেনের সাদা ধোঁয়ার সাপের মতো কিছু সময় থেকে মিলিয়ে গেল নিধি। আজ অন্যের বক্ষলগ্না নিধিকে দেখেই হাহাকার করে ওঠে আফরোজ়ের অন্তরাত্মা।

নিধির সঙ্গী আধবুড়ো এবার উঠে আসছে ওরই দিকে। আফরোজ়ের শরীরের সব স্নায়ুকোষ টানটান হয়ে ওঠে। নাহ্‌ ঠিক ওর কাছে নয়, ওর পিছনের সিটে বসা পুরুষকে লক্ষ করে ফিসফিস কর বলে, “সুরিন্দর, তুমনে বতায়া নহীঁ তুমভি আ রহে হো সুন্দরবন।”

“স্যার আপনে পুছা নহীঁ, আপ তো দিল্লি যানে ওয়ালে থে,” উত্তর দেয় সুরিন্দর।

আধবুড়ো এবার আড়চোখে দেখে নেয় সুরিন্দরের পাশে বসা সঙ্গিনীকে। মুখে বলে, “চলো মস্তি করেঙ্গে বহুত, অচ্ছা হুয়া তুমভি সাথ হো,” ফিরে যায় সামনের দিকে নিজের সিটে।

মস্তি শব্দটার মধ্যে কোথায় যেন একটা যৌনতা আছে। আর এই আধবুড়ো লোকটি আফরোজ়ের প্রেমিকার সঙ্গে মস্তি করতে চায়। তাই কমে আসা ক্ষোভ আবার একবার ইলেকট্রিক শকের মতো চিড়িক করে ওঠে। আফরোজ়ের ভিতু-ভিতু ভাব, আত্মবিশ্বাসের অভাব সবই কাটিয়েছিল নিধিই আর আজ এই নিধিই অন্যপক্ষ। আফরোজ় ভাবে একবার উঠে গিয়ে চ্যালে়ঞ্জ করবে এই লোকটিকে। রাত হলেই ভোগ করবে নিধিকে, তাই যা করার রুমের দরজা বন্ধ করার আগেই করতে হবে।

অনুশ্রীকে মতলবটা বলতে সঙ্গে-সঙ্গেই নাকচ করে দেয় আফরোজ়ের এই প্রস্তাব, “কনসিকোয়েন্সটা একবার ভাবুন স্যার! এমন তো নয় যে আজ সকালে আপনার ফ্ল্যাট থেকে নিধিকে কিডন্যাপ করেছে এই লোকটি। আজ প্রায় একবছর হল নিধি আপনাকে ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। আপনাদের সম্পর্কে লিগ্যাল কোনও বাইন্ডিংস নেই। তা ছাড়া আপনি জানেন না নিধির সঙ্গে এই লোকটির কী সম্পর্ক এবং কতদিনের। সম্পর্ক যে একটা আছে তা তো নিশ্চিত। না হলে আসবে কেন ওর সঙ্গে? তা ছাড়া ও একই প্রশ্ন করতে পারে আপনাকে, আমার সঙ্গে আপনি কেন এসেছেন? ওয়েট করুন স্যার, ও কথা বলবেই।”

সত্যিই রাগের কারণে এই ব্যাপারগুলো মাথায় আসেনি। এতগুলো লোকের মাঝে গাল বাড়িয়ে চড় খাওয়ার মতো ব্যাপার। নাহ্ এভাবে হবে না! তবে একটা বোঝাপড়া চাইই চাই। শান্তভাবে, ভেবেচিন্তে…

দেখতে দেখতে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বাস পৌঁছে যায় মালঞ্চ। মৈনাক উঠে দাঁড়ায়, “এখানে আমরা মিনিট পাঁচেক টি ব্রেক নেব। অনুপমা লিটার দু’য়েক জল ফুটিয়ে নেবে ইলেকট্রিক কেটলিতে। তারপর যে যার পছন্দমতো চা-কফি খেতে পারে। পুরুষরা টয়লেট অ্যাভেল করতে পারে এখানে। কিন্তু আনফরচুনেটলি লেডিস টয়লেট থাকলেও ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় নেই। তবে সামনেই একটা পেট্রলপাম্প আছে, ওখানে টয়লেট থাকবে, খুব প্রয়োজন হলে এনিওয়ান ক্যান ওয়াক, বাট টেক আ কম্প্যানিয়ন।”

আফরোজ় উঠে দাঁড়ায় সিট ছেড়ে। এগিয়ে যায় সামনের দিকে। একঝলক তাকায় নিধির দিকে। নিধি চোখ বন্ধ করে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছে বাসের জানলায় হেলান দিয়ে। ওর পাশে গায়ের সঙ্গে বসে আছে ওর সঙ্গী। আফরোজ় জানে, এর নাম-ঠিকানা দিতে পারে মৈনাক। যদিও বলেছে নাম ঠিকানা আর প্রফেশন সব গোপন থাকবে। নাহ্, মৈনাক ওর অনেক দিনের বন্ধু আর কথা বলতে ভালবাসে, কথা বলতে-বলতেই ঠিক বেরিয়ে যাবে। নিধি ওকে শিখিয়েছে উতলা না হয়ে ধৈর্য ধরতে। বারবার করে ক্রিটিক্যাল ম্যাটারগুলোকে অ্যানালাইজ় করতে। সল্‌ভ না হলে হল না, যা ঘটার চুপচাপ ঘটতে দিতে হবে, পৃথিবী কিচ্ছুটি ওলট-পালট হবে না। ধীর পায়ে আফরোজ় বাস থেকে নেমে আসে।

মালঞ্চ বাজার তার বহুদিনের চেনা। সকাল সাড়ে ন’টাতেই গমগমে ভিড়। পশ্চিম দিকে ডাইনে-বাঁয়ে মাছের বিশাল বিশাল আড়ত। লক্ষ লক্ষ টাকার মাছ কেনাবেচা হয় এই আড়ত থেকে। রাস্তার উপর ফলের ভেন্ডার সারি দিয়ে, কাপড়ের দোকান, ওষুধের দোকান, হার্ডওয়্যারের দোকান সব পাশাপাশি। মিষ্টির দোকান, লুচি, শিঙ্গাড়া আর চপ ভাজা চলছে বেশ কয়েকটি দোকানে। ঠিক মোড়ের মাথাতেই এক অশ্বত্থ গাছ। আফরোজ় তাকায় গাছের দিকে। দুটো শালিক পাশাপাশি বসে হয়তো সারাদিনের প্রোগ্রাম নিয়ে আলাপ-আলোচনা সেরে নিচ্ছে। আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গোটা তিনেক কাক। নিজের অজান্তে কারণ ছাড়াই মাঝে-মাঝে এক-আধবার কালো ঠোঁট দুটো ফাঁক করে ডেকে নিচ্ছে, চোখের চাহনি তীক্ষ্ণ। চোখ ঘুরিয়ে -ঘুরিয়ে মিষ্টির দোকানগুলোর উপর কড়া নজর রাখছে। থার্মোকলের সাদা প্লেট একটু তরকারি, একটু আলু কিংবা লুচি-শিঙ্গাড়ার টুকরো সহ কেউ রাস্তার পাশে রাখা মুখ কাটা ডালডার ড্রামের বাইরে ফেলছে না তো! একটু ব্যালেন্স খারাপ হলেই প্লেট বাইরে গিয়ে পড়বে। সঙ্গে-সঙ্গেই ছোঁ মেরে তুলে নিতে হবে প্লেটে লেগে থাকা উচ্ছিষ্ট খাবার, না হলে পেট ভরাতে অপেক্ষা করতে হবে বারোটা পর্যন্ত যখন প্লেট ফেলার ড্রাম ভর্তি হয়ে প্লেটগুলো উপচে পড়বে।

“কী রে, কী দেখছিস? গাছের দিকে হাঁ করে থাকিয়ে আছিস কেন?” মৈনাক নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আফরোজ়ের।

“এই কাক দেখছি, ওরা গাছের উপর থেকে আমাদের উপর নজর রাখছে,” আফরোজ় হাসে।

“আরে বাসে চিড়িয়ার অভাব হয়েছে নাকি! গাছের চিড়িয়া দেখছিস!” হালকা চোখ টিপে মৈনাক হাসতে থাকে। “কেমন দেখছিস, কাউকে পছন্দ হয়েছে তো বল, রোটেশন সিস্টেমের কথা বলে সবাইকে রাজি করাতে পারি কিনা!”

“এটা আবার কী? কী বলছিস বুঝতে পারছি না!” গাছের কাকের থেকে চোখ সরিয়ে জিজ্ঞাসা করে আফরোজ়।

“ভেরি সিম্পল। যারা রাজি থাকবে তাদের গার্লফ্রেন্ড আর বয়ফ্রেন্ডদের মধ্যে রোটেশনে রাত কাটাবে, পার্টনার চেঞ্জ হতে থাকবে। ভীষণ এক্সাইটিং ব্যাপার,” ফিসফিস করে বলে মৈনাক।

“এরকম অবাস্তব আইডিয়া কোথা থেকে পাস বল তো?” আফরোজ়ের চোখ জোড়া বিরক্তিতে কুঁচকে থাকে কিছুক্ষণ।

“অবাস্তব নয় গুরু, ইউরোপ-আমেরিকায় বেশ প্রচলিত এই সিস্টেম আর আমাদের প্রিয়দর্শিনী কলকাতাও খুব পিছিয়ে নেই বস। এখানেও ওয়াইফ সোয়্যাপিং হয়, গার্লফ্রেন্ড আর এসকর্ট তো কোন ছার! সবাই সব জানে। যারা সিস্টেমে নেই, নেই। আর যারা আছে তারা আছে, দেদার মজা লোটে,” মৈনাক আফরোজ়ের কাঁধে হাত রেখে এগিয়ে যায় পার্ক করা বাসের দিকে, “একটু ভেবে নে তারপর বলিস, আমি লঞ্চে উঠে মিউজ়িক্যাল চেয়ারের মতো কিছু একটা ব্যবস্থা করব।”

পছন্দমতো চা-কফির গ্লাস হাতে তুলে নিতেই ড্রাইভার ক্লাচ টিপে গিয়ারে ফেলে গাড়ি এগিয়ে দেয়। অনুপমা সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, “এবার আমরা একেবারে গঁদখালিতে গিয়ে থামব আনলেস দেয়ার ইজ় এনি সিরিয়াস ইসু। আজকের লাঞ্চ লঞ্চে হবে এবং মেনুতে ভেজ-ননভেজ, ফিশ-মাটন, পনির, মিক্সড ভেজ এবং ডেসার্ট থাকবে। আমরা আজ গোসাবা এরিয়াতে থেকে লঞ্চে করে গোমার, হোগলদুয়ারি, দুর্গা দোয়ানি আর বিদ্যাধরী নদীগুলোতে ঘুরব এবং আশেপাশের ফরেস্টগুলো লঞ্চ থেকেই দেখব। লঞ্চ থেকে নামার স্কোপ পেলে আমরা কিছুক্ষণের জন্য নামতেই পারি। সন্ধেবেলার স্ন্যাক্স এবং ড্রিংকস লঞ্চেই সার্ভ করা হবে, তবে ডিনার হবে সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ রিসর্টে। ওই রিসর্টে সাতটা রুম বুক করা আছে। দ্যাট মিন্‌স সিক্স ফর সিক্স কাপলস অ্যান্ড ওয়ান ফর মি। লঞ্চে ছ’টা কেবিন আছে এবং এটা রিসর্টের কাছেই পিচখালি নদীতে নোঙর আই মিন অ্যাঙ্কর করা থাকবে। কেউ চাইলে রাতে ল়়ঞ্চেও থাকতে পারেন। সব কেবিনেরই সঙ্গে অ্যাটাচ্ড ওয়াশ রুম আছে এবং মোর অর লেস কমফর্টেবল বেড আছে বাট দেয়ার ইজ় নো এসি, ওনলি ফ্যান। আই থিঙ্ক দ্য ওয়েদার ইজ় কমফর্টেবল।”

অনুপমা সিটে বসতেই বাসের মিউজ়িক সিস্টেমে শুরু হয়ে যায় জগজিৎ সিংহর গজ়ল। বাস ছুটছে সোঁ-সোঁ করে। পরপর পেরিয়ে যায় ধামাখালি, সরবেড়িয়া, আমঝরা, মাতলার শাখার উপর সোনাখালি ব্রিজ। বাঁ হাতে রাস্তায় বাসন্তী পিছনে ফেলে পেরিয়ে আসে বাস। গঁদখালি পৌঁছতে প্রায় বারোটা। মৈনাক সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, বলে, “তোমরা গাড়িতেই বোসো, আমি আর অনুপমা নেমে একবার দেখে নিই ঘাটে লঞ্চ লাগানো রয়েছে কি না।”

“স্যার, ল়ঞ্চ লাগানো থাকবে। আমি গুগল ম্যাপে রুট ট্র্যাক করছিলাম। প্রায় আধঘণ্টা আগেই লঞ্চের ড্রাইভার-অপারেটরকে ফোন করে বলে দিয়েছিলাম। ঘাটে পৌঁছে ও আমাকে মিসড কল দিয়ে কনফার্মও করেছে মিনিট পাঁচেক আগে। হোয়াট উই নিড ইজ় ফিউ পিপ্‌ল টু ট্রান্সফার আওয়ার লাগেজ টু লঞ্চ,” এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে অনুপমা।

“বাহ্, ভেরি গুড। আমি আর তুমি নেমে লঞ্চের লোকগুলোকে একবার ডেকে আনি। লাগেজ ট্রান্সফারের পর সবাই বাস থেকে নামবে। এতগুলো সুন্দরী দেখলে লুট হয়ে যেতে পারে, জাস্ট লুট…” মৈনাক রগুড়ে গলায় বলে।

“আমরা কি গুড়ের বাতাসা? লুট হয়ে যাব কেন?” শর্মিষ্ঠা সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, “আমিও নামব।”

“অ্যাজ ইউ উইশ,” কাঁধ ঝাঁকিয়ে নেমে যায় মৈনাক, পিছনে অনুপমা, শর্মিষ্ঠা, আরও কয়েকজন।

বেশ একটা ভিড় জমে যায় ওদের দেখতে। নিজেদের মধ্যেই কেউ কেউ বলে সিনেমার শুটিং হবে। মিনিট দশেকের মধ্যেই বাসের সব লাগেজ লঞ্চে উঠিয়ে নিল লঞ্চ থেকে নেমে আসা জনা পাঁচেক লোক। একে-একে তেরোজন কাঠের সরু পাটাতনে হেঁটে উঠে আসে লঞ্চের ডেকে। ওদের নমস্কার করে অভ্যর্থনা জানায়, সবার হাতে ডাব ধরিয়ে দেয় লঞ্চের সারেঙ মনোরঞ্জন গায়েন।

মৈনাক চেঁচিয়ে বলে,“সো ফ্রেন্ডস, ইউ অল আর ওয়েলকাম অন বোর্ড, গিভ আ বিগ হ্যান্ড টু অনুপমা, উই আর অল সেট টু সেল টু সুন্দরবন। হুররে…” সকলে হাততালি দিয়ে ওঠে, বিশাল এক ভোঁ শব্দ করে এগিয়ে যায় এম ভি অপ্সরা…

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%