রামধনু – ১২

হুমায়ুন কবীর

লঞ্চের উপর দু’ পাশের দু’ সারিতে প্লাস্টিক চেয়ার পাতা। উপরে মোটা তিরপলে ঢাকা লঞ্চের সামনের দিক। অনুপমা সারেঙের সামনের চৌকো গদিমোড়া চৌকিতে বসে আছে। একঝলক দেখে নেয় কাপলদের মুখগুলো। বাতাসে মেয়েদের বেশির ভাগেরই চুল এলোমেলো, ভুরু কোঁচকানো, চোখ অবশ্য দেখার উপায় নেই, ঢাউস সানগ্লাসে ঢাকা। কিন্তু বোঝাই যায়, সকলেরই দৃষ্টি দূরে প্রসারিত। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহেও রোদের তাপ বেশ চড়া। উজ্জ্বল রোদে স্পষ্ট দূরের দ্বীপ। ওপারের নদীর পাড় ঘন জঙ্গলে ঢাকা। কেউ কেউ মাথায়, গায়ে দোপাট্টা ঢাকা দিয়ে বসে নদীর জলের দিকে তাকিয়ে ডলফিনের ওঠানামায় চোখ রেখে সঙ্গীকে হাতের চাপে জলের দিকে ঘাড় নেড়ে ইশারা করছে। আবার কেউ জলের উপর উড়তে থাকা মাছরাঙার ঝাঁপের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। অনুপমা তাকায় মৈনাকের দিকে। মৈনাক আর শর্মিষ্ঠা ম্যাডাম গায়ে গায়ে বসে ডানদিকে দ্বীপের জঙ্গলে বাইনোকুলার দিয়ে কিছু দেখছে পালা করে। ভীষণ মন খারাপ লাগে অনুপমার, ফোন হাতে নিয়ে ডায়াল করে পলাশকে।

“হ্যালো, হ্যাঁ হ্যালো, বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে এসেছি সুন্দরবনে, তুই কি অফিসে? হ্যাঁ, কী বলছিস, ব্যস্ত আছিস? ওকে ফ্রি হয়েই ফোন কর তাড়াতাড়ি। সুন্দরবনের কাছে নদীতে আছি তাই সবসময় সিগন্যাল না-ও পেতে পারিস। হ্যালো, হ্যালো,” যাঃ ফোন কেটে দিল পলাশ। পরের কথাটা কি শুনতে পেল পলাশ? পুরো একটা সেনটেন্স শোনারও আজ সময় নেই পলাশের। অথচ, শিবপুর বেসু-তে পড়ার সময় কত ঝুলোঝুলি। ডাকলে আসতেই হত শিবপুরে। হয় বোট্যানিক্যাল গার্ডেন, নয়তো কোনও হোটেলে। সবদিন টাকা থাকত না হোটেলের ভাড়া মেটাবার, তখন বোট্যানিক্যাল গার্ডেন। কী ছটফটটাই না করত পলাশ ওর সঙ্গে দেখা করতে, একটু নিভৃতে মিলিত হতে। আজও স্পষ্ট মনে পড়ে অনুপমার। বছর পাঁচেক আগের ঘটনা। পলাশের তখন ফাইনাল ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা। ফোনে ভুল করে অনুপমা বলেছিল সেদিন ঘণ্টা দুয়েকের জন্য বাড়িতে একা থাকবে দুপুরবেলায়। বাবা-মা, পিসি আর ঠাম্মা সবাই একটা বিয়েবাড়িতে যাবে শ্যামবাজারে। আধঘণ্টার মধ্যে রওনা দিল পলাশ তাদের কেয়াতলার বাড়ির উদ্দেশে। অনেকবার অনুপমা মানা করেছিল, “তারও তিনদিন পরে পরীক্ষা। মন দিয়ে পড়াশোনা কর, আমি তো আর পালিয়ে যাচ্ছি না। তোর কাছে টাকা না থাকে আমি টাকা জোগাড় করে হোটেলে থাকব পুরো একটা দিন।” শুনল না। এগারোটাতেই পৌঁছে গেল বাড়ির কাছে। ফোনে জানাল, “বাইরেই আছি। তোর বাবা-মা বেরিয়ে গেলেই ফোন করিস, আমি পাশেই আছি।” ফোন করা পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে পারেনি পলাশ। সাড়ে বারোটা নাগাদ বাড়ির লোক বেরোতেই সঙ্গে সঙ্গেই ঢুকে এল বাড়িতে। আর সে কী দাপাদাপি। আঁচড়ে-কামড়ে ওকে তৃপ্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেল সেদিন।

তিনদিন পরে পরীক্ষা দিল। ভালভাবে পাশ করল। মেদিনীপুর টাউনের ছেলে মেদিনীপুর আর ফিরে গেল না। ইলেকট্রিক্যাল ই়ঞ্জিনিয়ার পলাশ বেঙ্গালুরুতে চাকরি পেল। ক্যাম্পাসিং-এ প্যাকেজ ভাল নয় বলে গেল না। অনুপমার মনে হল ওর জন্যই পলাশ বেঙ্গালুরু গেল না। এই বন্ধু সেই বন্ধুর কাছে ছলে বলে কৌশলে রয়ে গেল ইউনিভার্সিটির হোস্টেলেই। রোজ দেখা করা চাই, তাতে আবার সপ্তাহে একদিন ওর শরীরের খিদে মেটাতে হত অনুপমাকে। চারুচন্দ্র কলেজে ইংরেজি অনার্সের তৃতীয় বর্ষে কম ক্লাস কামাই হয়নি ওর জন্য। অনুপমারও বহু ত্যাগ আর পরিশ্রম আছে ওর ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পিছনে। পলাশ একটা কথা বারবার বলত, “দেখ ফিজ়িক্যাল ইনটিমেসি ছাড়া কনসেনট্রেট করতে পারি না। পড়ব কী করে তুই হেলপ না করলে?” তারপরই চাকরি পেয়ে গেল পলাশ। ফার্স্ট পোস্টিং দিল্লিতে।

“ধুস আর একটু চেষ্টা করি, যদি কলকাতার কাছাকাছি হয়ে যায়।”

“লক্ষ্মী সোনা এমনটা করিস না, তুই দিল্লি চলে যা, মাসে-মাসে একবার করে আসিস আর আমিও যাব মাঝে-মাঝে, তিন-চার দিন করে তোর কাছে থেকে আসব।” প্রায় জোর করেই ওকে দিল্লি পাঠাল অনুপমা।

“কী সুন্দরী, কীসে এত মগ্ন? মন তো মনে হয় এই হেমিস্ফিয়ারেই নেই তোমার। প্লিজ় ল্যান্ড কর আর আমাদের কি একটু বিয়ার সেবনের সুযোগ করে দেবে?” মৈনাকদা ওর বাঁ পাশে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। লজ্জা পেয়ে অনুপমাও উঠে দাঁড়ায়, “সরি, আমি ব্যবস্থা করছি।”

চৌকির সামনেই লোয়ার ডেক। ওখানে পড়ে আছে দুটো অ্যাঙ্করের মোটা এবং ভারী হুক, সঙ্গে মোটা মোটা কাছি। অনুপমা পা বাড়ায়। মৈনাকদার পাশে দু’ ধাপ কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নামতে হবে লোয়ার ডেকে। ওখান থেকে আবার গোটা ছয়-সাত ধাপ কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নীচের তলায় ঢুকে পড়তে হবে। অনুপমা মৈনাকদাকে পাশ কাটাতে গিয়ে ওর পীনোন্নত বুক আলতো করে ছুঁয়ে যায় আড়াআড়ি দাঁড়ানো মৈনাকদার বাহু। খুব সামান্যই, কিন্তু মৈনাকদার না বোঝার মতোও নয়, ওর মুখের অভিব্যক্তি আড়চোখে দেখে নেয় অনুপমা। দূর আকাশের দিকে আনমনে তাকিয়ে আছে, মুখ দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। কত হবে মৈনাকদার বয়স? পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ তো বটেই। জুলপির উপরে দু’-একটা রুপোলি রেখা দেখেছে অনুপমা। ফর্সা মুখে ক্লিন শেভ তাই চট করে বোঝার উপায় নেই দাড়ি-গোঁফ কিছু পেকেছে কি না! পুরো জায়গাটাই সবুজ। মাঝারি হাইটের দোহারা চেহারা। মুখ চৌকো। যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় থেকেই খুব খেলুড়ে বলে দুর্নাম আছে। ফি বছর গার্লফ্রেন্ড বদলায়, শর্মিষ্ঠাদির সঙ্গে কী করে যেন বছর দেড়েক টিকে আছে। আরও অনেক খারাপ-খারাপ কথা শোনা যায় এই মৈনাকদা সম্বন্ধে, হয়তো অতিরঞ্জিত তবুও যদি খানিকটাও সত্যি হয়… জানে না শর্মিষ্ঠাদির ভাগ্যে কী আছে!

কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে লঞ্চের নীচের ফ্লোর বা মেন ফ্লোরে। ডাইনে আর বাঁয়ে দুটো করে চারটে কেবিন, কেবিন পার করে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা। দু’পাশে দুটো করে জানলা। তাই জানলা দিয়ে ফ্রিলের পর্দা টপকে আলো লুটোপুটি খাচ্ছে। তিনটে প্লাস্টিকের ডাইনিং টেবিল পাতা তাতে বারোটা চেয়ার লাগানো আর পাশেই আরও দুটো চেয়ার আলগোছে রাখা। ডাইনিং স্পেস পেরিয়ে মাঝামাঝি একটা দরজা। অনুপমা দরজা খুলতেই মাছভাজার তীব্র গন্ধ। বড় একটা কড়াইতে দু’জনে মিলে ভেটকি মাছ ভাজছে। অনুপমাকে দেখেই মাছভাজা থামিয়ে এক মাঝবয়সি লোক তাকায় অনুপমার দিকে, “আজ্ঞে দিদিমণি, কিছু চাই?”

“হ্যাঁ, দুটো প্লেটে মাছভাজা আর দুটো প্লেটে চিনেবাদাম সঙ্গে শসা আর পেঁয়াজ কুচি দিয়ে উপরে দিন আর এক কার্টন বিয়ারের ক্যান উপরে কাউকে রেখে আসতে বলুন না প্লিজ়।”

অনুপমা খোলা দরজা থেকে মুখ সরিয়ে নেওয়ার মুহূর্তে চোখে পড়ে যায়, ডেনিম আর সাদা টি-শার্ট পরা ঝকঝকে এক যুবক একমনে ছোট একটা কাঠের পাটাতনের উপর বড় একটা ছোরা দিয়ে শসা কাটছে গোল গোল চাকতি করে। দরজায় আবার মুখ ঢুকিয়ে যুবককে দেখে। আরে এ তো মৈনাকদার বন্ধু, ওর ক্লাসমেট। শর্মিষ্ঠাদি গঁদখালিতে বাস থেকে নামার পরই বলেছিল নামটা। কিছুতেই মনে আসছে না। ভীষণ ভীষণ ভাল নাকি ছাত্র ছিল। ইউনিভার্সিটিতে টপার। নামী কোম্পানির বিরাট প্যাকেজের চাকরি ছেড়ে নিজের কোম্পানি খুলে খুব ভাল কাজ করছে। এখন একমনে শসা কাটছে। যা বড় ছুরি, হাত-টাত কাটবে না তো! ও এল কোথা দিয়ে কিচেনে, ওর তো চোখে পড়েনি! দরজা বন্ধ করে এক পা পিছিয়ে ডাইনিং স্পেসে দাঁড়ায় অনুপমা। একবার ভাবে ওকে ডেকে নিয়ে লঞ্চের ডেকে যাবে, বলবে বিয়ার সার্ভ করা হচ্ছে। আচ্ছা, ও নিশ্চয়ই শুনেছে অনুপমার কথা। যতই ইঞ্জিনের গোঙানি থাকুক কিচেনের স্পেসটাতে, কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। একবার মুখ তুলে তাকায়নি পর্যন্ত অনুপমার দিকে। ইচ্ছাকৃত? সামান্য অভিমান হয় অনুপমার। ও ডাকসাইটে সুন্দরী না হলেও যথেষ্টই সুন্দরী। বহু ছেলে-পুরুষ ওর জন্য পাগল। যাক গে চুলোয় যাক। যখন উপরে আসবে তখন বিয়ার খাবে। প্রয়োজন হলে ওর পার্টনার ওকে ডেকে আনবে। অনুপমা উপরে উঠে আসে, সবাই তাকায় ওর দিকে। গলা তুলে বলে, “বিয়ার সার্ভ করা হচ্ছে। সঙ্গে ফিশফ্রাই আর পিনাট।”

কেউ কেউ চেয়ার ছেড়ে উঠে ডেকে পিছনের দিকে পায়চারি করতে যায়। প্রগতি ময়দান থানার সামনে সবচেয়ে শেষে যে বাসে উঠেছে সেই মেয়েটি আর তার পার্টনারকে দেখা যাচ্ছে না, হয়তো উপরের কোনও কেবিনে ঢুকেছে। লভ মেকিং? ধুস অনুপমার মাথাই বিগড়েছে। এই ভরদুপুরে লাঞ্চের আগে কেউ সেক্স করতে এতগুলো চোখের সামনে কেবিনে ঢুকবে না। হয়তো টয়লেট গিয়ে থাকবে। পলাশ আসেনি প্রায় মাস তিনেক আর অনুপমাও দিল্লি যায়নি এরমধ্যে…

অনুপমা একেবারে সামনের দিকে একটা চেয়ার টেনে বসে। ওর পিছনে মৈনাকদা আর শর্মিষ্ঠাদি রেলিং-এর উপর হেলান দিয়ে বসে। লঞ্চের সামনেই একটা ডলফিন পিঠটা দেখিয়েই জলে ডুবে গেল। আচ্ছা পলাশ শেষপর্যন্ত পিঠ দেখাবে না তো? আজ তিরিশ সেকেন্ড কথা বলার সময় নেই অনুপমার সঙ্গে। রাতে যদিও প্রতিদিন নিয়ম করে কথা বলে পাঁচ-সাত মিনিট, কিন্তু অনুপমা বুঝতে পারে সেই টানটার কোথায় যেন অভাব। অথচ বছর ছয়েক আগে ফেসবুকে আলাপ হওয়ার পর রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করত। কথা ফুরোতেই চাইত না। ফেসবুকে আলাপের দু’ মাস পরে অনুপমা পলাশকে ফোন নম্বর দিয়েছিল। তার আরও মাস তিনেক বাদে প্রথম দেখা করেছিল দেশপ্রিয় পার্কে। পলাশ এসেছিল শিবপুর থেকে। প্রায় দু’ ঘণ্টা একসঙ্গে ঘুরেছিল পার্কের ভিতরে। তারপর ধীরে-ধীরে সম্পর্ক এগিয়েছে। অনুপমার পলাশকে ভাল লাগলেও, সম্পর্ক তৈরি করতে পলাশের আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। আরও মাস তিনেক সময় নিয়েছিল অনুপমা ফি‌জ়িক্যাল সম্পর্ক তৈরির আগে, ধীরে-ধীরেই ওদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে পারস্পরিক বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে।

পলাশ আগেই বলেছিল অফিসের কাজে গোয়া যাবে একদিনের জন্য, আগস্টের মাঝামাঝি দিল্লি গেল অনুপমা, হঠাৎই। পলাশকে না জানিয়ে। চমকে গিয়েছিল পলাশ, “আরে আগামীকাল তো আমি গোয়া যাব।”

“আমি তো এজন্যই এলাম। তোমার সঙ্গে যাব বলেই। অফিসে বলে চারদিন ছুটি অ্যাড করে নাও অফিশিয়াল ট্রিপের সঙ্গে, আমার বহুদিনের ইচ্ছা গোয়া বেড়াতে যাব।” শেষপর্যন্ত টানা-হেঁচড়া করে চারদিন ছুটিই পেল পলাশ।

দারুণ সময় কেটেছিল ওই চারটে দিন, স্বপ্নের মতো। অনুপমা একবার কথাটা পেড়েছিল, “কবে বিয়ে করব আমরা?”

“তুমিই বলো কী করে হবে? তুমি কি চাকরি ছাড়তে পারবে এখন?” পলাশ পালটা জানতে চেয়েছিল ওর কাছে। এই মুহূর্তে উত্তর দিতে পারেনি অনুপমা। তাই ফয়সালা হয়নি।

একটা ডিসিশন নিতেই হবে এবার, শর্মিষ্ঠাদিকে বলেই দিল্লিতে একটা কাজ খুঁজে নিতে হবে। কোনও ট্রাভেলস অফিসে হলেই ভাল। এই অফিসে চার বছর কাজের অভি়জ্ঞতাটা কাজে লাগাবে, তবে এবার ও দিল্লি যাবেই। আর ভাল লাগে না একা একা, তা ছাড়া পলাশ এখন ওর সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছে। দিল্লিতে তো আর সুন্দরীর অভাব নেই। ও ঠিক জানে না সেক্স-পাগল পলাশ এতদিন কী করে একা আছে দিল্লিতে! এই কথাটা মনে হতেই বেশ একটা দুশ্চিন্তা ওর ঘাড়ে চেপে বসে। তাইতো, এটা ভাবা উচিত ছিল আগেই। নিজেকে অভিসম্পাত দেয় অনুপমা, কারও সঙ্গে ইনভলভড হয়ে পড়েনি তো?

“এই, তোমাকে বড্ড বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। একটা বিয়ার খাও। দুঃখী দুঃখী ভাবটা কেটে যাবে,” বিয়ারের একটা ক্যানের সিল খুলে ওর দিকেই বাড়িয়ে আছে মৈনাকদা।

“না নাহ্ আমি ঠিক আছি,” বলে ওর হাত থেকে বিয়ারের ক্যান হাতে নেয় অনুপমা। একটু অপ্রস্তুত হাসি হেসে জিজ্ঞাসা করে, “শর্মিষ্ঠাদি কোথায়?”

“ওই তো ওয়াশরুমে গিয়েছে একটু। তা তোমার অ্যারেঞ্জমেন্ট খুব ভাল, সো ফার সো গুড। কেবিন-টেবিনগুলো বেশ ভাল লঞ্চটার, বন্ধুরা সবাই দেখেছে। সবাই বলেছে বেশ ভাল, কেউ কেউ কেবিনেই থাকতে চাইছে রাতে।”

“অ্যাজ় ইউ উইশ স্যার। একটা রাত্রি থেকে দেখতে পারেন আপনারাও,” বিয়ারের ক্যানে হালকা চুমুক দিয়ে অনুপমা বলে।

“তুমিও থাকবে? তুমি থাকলে…আই মিন তুমি থাকলে আমিও শর্মিষ্ঠাকে বলব আজকের রাতটা এখানে থাকতে।”

অনুপমা ভালই বুঝতে পারে মৈনাক মুখার্জি খুব কায়দা করে ওকে টুসকি মেরে দেখছে। মনে মনে ভেবে নেয় একটু খেলাবে, তা ছাড়া সাতাশটা বসন্ত পার করা অনুপমা নিজেকে একটু পুরুষের চোখ দিয়ে যাচাই করে নিতে চায়।

“আমি একটু দেখে নিই সব দিকটা, তারপরে আপনাকে জানাচ্ছি। জলের উপর রাত্রিবাস কেমন হবে তাই ভাবছি, তবে সবাই যদি বলে লঞ্চের কেবিনে থাকব তাহলে আমার জায়গা হবে না।”

এক ক্যান বিয়ার পেটে যেতেই অনুপমার দুঃখী ভাবটা উধাও, হাওয়ায় শরীর দুলিয়ে নীচে নেমে যায়। ডাইনিং স্পেসের ভিতর দিয়ে দরজা খুলে কিচেনে উঁকি মারে, “আঙ্কল, লাঞ্চ রেডি হতে আরও সময় লাগবে?”

“আরও ধরুন অন্তত ঘণ্টাখানেক। আমাকে তো বলেছিলেন আড়াইটা নাগাদ লাঞ্চ করবেন, তা আড়াইটার মধ্যে রেডি হয়ে যাবে সব।”

অনুপমা ফিরে আসে ডেকের উপরে। সারেঙ-এর সঙ্গে আলোচনা করে পাখিরালয় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

“এখন ভাটা চলছে, কোথাও নামতে পারবেন না জেটি ছাড়া। তা পাখিরালয়ে জেটি আছে, ওখানে ভাল ভাবেই নামতে পারবেন,” সারেঙ বলে।

“ওখানে দেখার মতো কী আছে? অনেক পাখি আছে কি?”

“দিদিমণি ওটা একটা দ্বীপ। আলাদা করে কোনও পাখি নেই ওখানে। আগে প্রচুর পাখি ওখানে বসবাস করার জন্য নাম হয়েছিল পাখিরালয়। এখন এত হোটেল, জেনারেটরের আওয়াজ, তাই পাখি আর আসে না। একটা ছোট বাজার আছে আর কয়েকটা রকমারি দোকান। বাজারে মাছ, সবজি, টুকিটাকি মুদিখানার জিনিসপত্র পাওয়া যায় আর সুন্দরবনের মধু। আপনারা ওখানে নেমে একটু ঘোরাঘুরি করতে পারেন, ভাল লাগবে। তবে লাঞ্চ করে নামবেন নয়তো লাঞ্চ করতে দেরি হয়ে যাবে।”

“ঠিক আছে, এখান থেকে কতক্ষণ লাগবে পাখিরালয় যেতে?” খালি বিয়ারের ক্যান চৌকিতে রেখে অনুপমা জিজ্ঞাসা করে।

“এখন ভাঁটার টান, আমরা আছি নদী দুর্গা দুয়ানিতে, এখান থেকে ঘণ্টা দেড়েক তো লাগবেই। ওটা গোমর নদীর ওপারে।”

“ঠিক আছে, আমরা লাঞ্চ করেই নামব।”

ছ’জোড়া শহুরে নারী-পুরুষকে দেখে জেটিতে রীতিমতো ভিড় জমতে শুরু করেছে। এই মানুষদের বেশ চেনে আফরোজ়। সাদাসিধে মানুষ। সুন্দর কিছু, আনকমন কিছু দেখলেই ওখান থেকে সবটা নিংড়ে নিতে চায়। আসলে এদের গতানুগতিক জীবনে বৈচিত্রের পরিধি খুবই সীমিত। অনুশ্রীর হাত ধরে আলাদাভাবে ভিড় থেকে সরে আসে আফরোজ়। অনুপমা বলে দিয়েছে পাঁচটায় লঞ্চ ছাড়বে, তার আগে সবাই ফিরে এলে আগেও বেরিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

“এই, তুমি এগুলো মন দিয়ে তখন থেকে কী দেখছ?”

‌অনুশ্রীর জবাবে আফরোজ়ের টনক নড়ে, “নাহ্ এই আর কী… হাঁসুয়া, দা, কোদাল, লাঙলের ফলা, চাটু, ছাই তোলার করছুল, হাতুড়ি, ছোরা, তলোয়ার এইসব আর কী!”

“এগুলোর মধ্যে বৈশিষ্ট্য কী আছে?” অনুশ্রী অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে।

“না, তেমন কিছু নেই, তবে সবগুলোই লোকাল কামারের বানানো, তা-ও মোটর গাড়ির বাতিল স্প্রিং পাতি থেকে। গরম করে পিটিয়ে পিটিয়ে কেমন শেপ আর ধার দিয়েছে তাই দেখছিলাম,” হঠাৎ করে প্রসঙ্গ পালটে জিজ্ঞাসা করে, “তোমার সঙ্গে নিধির কথা হয়েছে?”

“না, হয়নি। একবার ফাঁকা পেয়ে চেষ্টা করেছিলাম, জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার ফোন নম্বর একই আছে তো? বলল, সব বলব অনুশ্রীদি, আগে টুরটা শেষ হোক!’ এরপরে আর কী করে ওকে জি়জ্ঞাসা করব, ওর এই অদ্ভুত জীবনের রহস্যটা কী!”

“ঠিক আছে, আমার দিকে তো তাকাচ্ছেই না, পরে বুঝে নেব,” আফরোজ় সরে আসে কর্মকারের দোকান থেকে।

“তুমি কাদের সঙ্গে আমাকে নিয়ে এসেছ? তুমি এদেরকে চেনো?” পূজা জানতে চায় সুরিন্দরের কাছে।

“সবাইকে চিনি না, তিনজনকে চিনি। যিনি টুর অ্যারেঞ্জ করেছেন ওই যে মৈনাকদা আর সবচেয়ে সুন্দর যে মেয়েটি আর তার সঙ্গে আসা পুরুষটিকে চিনি,” সুরিন্দর একটা মধুর দোকানের কাছে দাঁড়িয়ে বলে।

“ওহ্, বাসের মধ্যে যে তোমার কাছে এগিয়ে এসে কথা বলেছিল?”

“হ্যাঁ, কেন তোমার খারাপ লাগছে এই ট্রিপটা?”

“না, তা নয়। আমার মনে হচ্ছে লোকগুলো সব হোমরা-চোমরা তাই ভয় করছে, আমি তো আসলে তোমার গার্লফ্রেন্ড নই, আমি এসকর্ট সার্ভিসের,” পূজা ফিসফিস করে বলে।

“তুমি ভয় পেয়ে বা কুঁকড়ে থেকো না, শুধু মনে রেখো তোমার মতো আরও মেয়ে এই গ্রুপে আছে। তা ছাড়া তুমিও শিক্ষিত মেয়ে। তাই পরিস্থিতি অনুযায়ী তুমি মানিয়ে নিয়ো।”

“ঠিক আছে তাই হবে। আমি আগে থেকে বলে রাখছি, আমি কিন্তু রাতে লঞ্চের কেবিনে থাকব না। ভয়ে আমার হাত-পা সব ঠান্ডা হয়ে যায় এইরকম থই-থই জলে, আর বাঘের ভয়ে ভিতরটা শুকিয়ে আছে। আমাকে দোষ দিয়ো না যেন।”

সুরিন্দরের কনুইয়ের ভিতর দিয়ে হাত গলিয়ে পূজা হাঁটতে থাকে নদীর ফাঁকা পাড়ের দিক দিয়ে।

“তোমার বন্ধু মৈনাক মনে হয় তার গার্লফ্রেন্ডকে ছেড়ে অনুপমা মেয়েটিকে টার্গেট করেছে বুঝলে,” নাজ়িয়া মুচকি হেসে সুমন্তকে বলে।

“ওহ্ তাই, তুমি কেমন করে বুঝলে? কিছু বেচাল দেখলে নাকি?” সুমন্ত জিজ্ঞাসা করে।

“আহা বেচাল দেখব কেন? ওর চোখজোড়া দেখেছি, আর ওর কাছে দাঁড়াবার সময় বডি ল্যাঙ্গোয়েজ। তোমার যদি মেয়েদের মতো সিক্সথ সেন্স থাকত, তুমিও বুঝতে।”

“কী জানি তুমি কী করে বুঝলে। তবে ব্যাপারটা অত ইজ়ি হবে না এখানে। এত জোড়া চোখ, তার উপর স্পেস কম। ওর নিজের গার্লফ্রেন্ডও তো আছে, ও কি কিছু বুঝতে পারছে না?”

“বুঝেছে নিশ্চয়ই। চোখে চোখে রাখছে দেখলাম। শুধু তোমার সঙ্গে শেয়ার করলাম আমার অবজ়ারভেশনটা।”

“ছাড়ো ওইসব। আনন্দ করতে এসেছি। চলো সময়টাকে এনজয় করি। সবাই অ্যাডাল্ট এখানে। যে যা করবে বুঝে-শুনে, কনসিকোয়েন্স ভেবে করবে। লঞ্চের জার্নি তোমার কেমন লাগছে বলো?”

“দারুণ। এখনও পর্যন্ত খুব এক্সাইটিং। থ্যাঙ্ক ইউ,” নাজ়িয়া সুমন্তর কাঁধের কাছে মুখ ঝুঁকিয়ে আলতো করে চুমু খায় সুমন্তর গালে।

“ওই দেখো সামনের কাপলটা কী করছে, তুমিও তো এরকম কিছু করতে পার,” অরূপ পিছন থেকে সামান্য ঠেলা দেয় তনুশ্রীর পিঠে।

“ওদিকে না দেখে জেটির দিকে এগিয়ে যাওয়া কাপলটাকে দেখো,” তনুশ্রী অরূপের হাতে সামান্য চিমটি কাটে।

“সত্যিই তো, ওরা ওভাবে লঞ্চের দিকে যাচ্ছে কেন? এখনও তো ঘণ্টাখানেক দেরি আছে পাঁচটা বাজতে, নিশ্চয়ই টয়লেট পেয়েছে…”

“ধুর বোকা, টয়লেট পেলে ওরকম করে কেউ হাঁটে না। তুমি ফলো করো, নির্ঘাত ওদের বিছানা পেয়েছে,” তনুশ্রী এবার অরূপের পেটে জোরে খিমচে ধরে। “বেকার ডাক্তার হয়েছ, বিছানা পাওয়ার সিম্পটম্স জানো না…”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%