হুমায়ুন কবীর
“স্যার, ওয়্যারলেসে খবর দিয়েছি, আমাদের বিট অফিসার বিদ্যুৎবাবু ভুটভুটিতে করেই আবার ফিরে আসছেন এখানে। ফিরে আসতে-আসতে হয়তো রাত এগারোটা বাজবে, তবে উনি ছোট মোল্লাখালি থেকে রওনা দিয়েছেন। এখন জোয়ারের বেগটা ফেভারে পাবেন, তাই একটু তাড়াতাড়িই হবে,” এক বন্দুকধারী গার্ড আশ্বস্ত করে মৈনাককে, “কিন্তু এখানে আর থাকাটা ঠিক হবে না। চলুন আমরা লঞ্চে গিয়ে অপেক্ষা করি উনি না আসা পর্যন্ত।”
অগত্যা ফরেস্ট গার্ড আর লঞ্চের স্টাফ নিয়ে লঞ্চে ফেরত আসে মৈনাক।
লঞ্চের ডেকে উঠে আসতেই সকলে গোল করে ঘিরে ধরে মৈনাককে, “কী হল?” হতাশা চেপে রেখে মৈনাক বলে, “এখনই পাওয়া গেল না, তবে বিট অফিসার বিদ্যুৎবাবু ফিরে আসছেন। উনি এলে একটা বুদ্ধি বের করা যাবে।”
সবার গলাতেই উদ্বেগ, এতক্ষণ কোথায় আছেন? কী অবস্থায়?
“দেখো, অনেক অ্যানালিসিস করে যা বুঝেছি, দৌড়বার সময় হয়তো ওপি সাহেব অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনও ভুল ডাইরেকশনে চলে গিয়েছেন। দিক ঠিক করে আর ফিরতে পারছেন না। বড় একটা সমস্যা ফরেস্টের ভিতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার সূর্য ডুবতে না ডুবতেই। আমরা সবাই মিলে প্রায় দু’কিলোমিটার রেডিয়াসে টিন বাজিয়ে-বাজিয়ে খুঁজেছি, কোনও সাড়া-শব্দ পাইনি। তবে আমরা আশাবাদী, কয়েকটা মশাল তৈরি করব লঞ্চের ছেঁড়া চট, শতরঞ্জি আর ডিজ়েল দিয়ে। আবার বেরোব খুঁজতে। লঞ্চের ছেলেরা মশাল বানাতে গিয়েছে। এখনই মিনিট দশেকের মধ্যে বেরিয়ে যাব, মশালের আলো রাতে দূর থেকে দেখা যাবে, আশা করছি ওপি সাহেব দেখতে পাবেন।”
“গাছগুলো এত গায়ে-গায়ে আর নিউম্যাটোফোর, মানে শ্বাসমূল আর সাপোর্টিং রুট এত ডেন্স যে সামনের দিকে এগোনোই যাচ্ছে না। তার উপর এক জায়গায় দেখলাম গোটাতিনেক বড়-বড় শাঁখামুটি। আমাদেরই একজন রাসেলস ভাইপারও দেখেছে একটা। তা ছাড়া আফরোজ়কে একটা কিং কোবরা চেজ় করেছিল। নভেম্বর মাস, হাইবারনেশনে যাওয়ার আগে পেট পুরে খেয়ে ফ্যাট অ্যাকুমুলেট করছে।”
“আজেবাজে বকবক ছেড়ে আসল কথাটা বলো তো এবার, ওপি সাহেব সত্যিই বেঁচে আছেন বলে বিশ্বাস হয় তোমার?” মৈনাকের হাত ধরে লঞ্চের একধারে টেনে গিয়ে গিয়ে শর্মিষ্ঠা জিজ্ঞাসা করে ফিসফিস করে।
“দেখো, এই ফরেস্ট ভীষণই ডেঞ্জারাস, জীবজন্তু, সাপ ইত্যাদি মিলেমিশে ভয়ংকর এক পরিবেশ। তাই এখন বনবিবিই আমাদের ভরসা। বুদ্ধি করে শক্তপোক্ত হেঁতাল বা ওই ধরনের কোনও গাছে চেপে বসলে খানিকটা ভরসা করা যায়। দেখা যাক, ইটস নাও ম্যাটার অফ লাক। গাছে আবার সাপ, বনবেড়াল, লেপার্ড বিড়ালের বাস, গোদের উপর বিষফোঁড়া গাদা-গাদা মৌমাছিদের বাস এই বড় বড় গাছগুলোতে। এখানে আবার খলসি গাছের সংখ্যা বেশি। ফরেস্ট গার্ডদের একজন বলল, যত খলসি গাছ, মৌচাকও তত বেশি। অতএব বনবিবির কৃপা ছাড়া…”
“স্যার চলুন, মশাল রেডি,” এক ফরেস্ট গার্ডের ডাকে ডেকে সামনের দিকে চলে আসে মৈনাক।
বনবিবিকে নমস্কার সেরে, গোটা তিনেক টর্চ, গোটা পাঁচেক মশাল জ্বালিয়ে, টিন পিটিয়ে, মৈনাকরা আবার বেরিয়ে পড়ে ওপি সাহেবের সন্ধানে।
এগারোটা নয়। বিদ্যুৎবাবু যখন নারায়ণতলায় লঞ্চের কাছে পৌঁছলেন ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে বারোটা।
“দু’-দু’বার বিস্তর খোঁজাখুঁজি করেও সাহেবের যখন কোনও সন্ধান পাওয়া গেল না, তাহলে থানায় একটা ইনফরমেশন দেওয়া দরকার, রাতে আর খোঁজাখুঁজি না করে কাল সকাল থেকে আবার তল্লাশি শুরু করা যেতে পারে,” বিদ্যুৎবাবু সাফ জানিয়ে দেন।
প্রত্যেকের মধ্যে এত হাহাকার দেখেও ওপি সাহেবের পার্টনার নিধি কিন্তু অস্বাভাবিক রকমের শান্ত, তা আর সকলের চোখ এড়িয়ে গেলেও আফরোজ়ের চোখে কিন্তু ব্যাপারটা ধরা পড়ে। আফরোজ় মনে করার চেষ্টা করে মৈনাক বলেছিল সুন্দরবন ট্রিপটা হবে শুধু গার্লফ্রেন্ডদের নিয়ে, নো ওয়াইফ অ্যান্ড নো বাগদত্তা বা এনগেজড। যদি হারিয়ে যাওয়া মানুষটার গার্লফ্রেন্ডও হয় নিধি, তবুও চোখে লাগার মতো নির্বিকার, অন্তত আফরোজ়ের চোখে। আফরোজ়ের মনটা ধীরে ধীরে…
“কী স্যার, আপনি গেলেন না বন্ধুর সঙ্গে? আমার একবার যেন মনে হল হারিয়ে যাওয়া ভদ্রলোকের পিছনে আপনি ছিলেন। আমরাও একটু কনফিউজ়ড ছিলাম আপনাদের সঙ্গে যাব কি না। তবে ফরেস্ট গার্ডরা ততক্ষণে চলে এসেছেন আমাদের কাছে, তাই আপনাদের পিছন ছেড়ে গার্ডদের উপরই ভরসা রাখলাম,” সুরিন্দর পূজার কাছ থেকে উঠে এসে আফরোজ়ের কাছে বসেছিল, দ্বিতীয়বার যখন মশাল জ্বালিয়ে জঙ্গলে ঢুকছে মৈনাকরা।
“আমি টেনশনে অতশত দেখিনি সামনে কে ছিল আর পিছনে কে, তারপর আবার সাপের তাড়া খেয়ে দৌড়তে গিয়ে পড়ে গেলাম নয়ানজুলিতে।”
এই ছেলেটা একবার নিজের সিট ছেড়ে উঠে গিয়ে বসেছিল নিধির পাশের চেয়ারটাতে। অন্যদিকে চোখ থাকলেও যে নিধির সঙ্গে কথা বলছিল সেটাও আফরোজ়ের চোখে পড়েছে। আফরোজ় নিশ্চিত হয় হারিয়ে যাওয়া মানুষটির সঙ্গে এই ছেলেটি পূর্বপরিচিত এবং ও ঠিকই দেখেছে, নিধির পার্টনারের পিছনেই দৌড়চ্ছিল আফরোজ়।
মৈনাক বেশ বুঝতে পারে, ওপি-কে খুঁজে না পাওয়া গেলে থানায় জানাতে হবে আর তাহলে সঙ্গে-সঙ্গেই সকলের আসল পরিচয় জানাতে হবে থানায়। বেড়াতে আসা এবং পার্টনারদের সম্বন্ধেও বিশদে তদন্ত করবে পুলিশ, কেলেঙ্কারির একশেষ। খবরের কাগজগুলোতে আগামী পরশু নিজেদের কুকীর্তির কথা বেশ পড়া যাবে! কলকাতায় পরিচিত লোকেদেরই বা কী বলবে আর পুলিশকেই বা কী বলবে।
সম্ভাব্য কী-কী হতে পারে ওপি সাহেবের সঙ্গে, তা ভাবতে গিয়ে শিউরে ওঠে মৈনাক, হতাশভাবে তাকিয়ে থাকে সহযাত্রীদের মুখের দিকে। বাকিরা বিদ্যুৎবাবুকে ঘিরে তাদের বাঘের লাফ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা, জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসার গল্প আর সন্দেহের কথা বলছে। আফরোজ় একা ডেকের পিছন দিকে চেয়ারে বসে জঙ্গলের উপর আকাশ দেখছে। মৈনাক উঠে যায় আফরোজ়ের কাছে, কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করে, “কী রে, তোর কী মনে হয়?”
“সম্ভবত বেঁচে নেই। এইরকম ফরেস্টে একা একা এতক্ষণ এত প্রতিকূল অবস্থায় নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা খুব টাফ। তা ছাড়া তোরা তো দু’বার করে খুঁজে এসেছিস, গাছের উপরে উঠে থাকলে কিংবা ঝোপে-ঝাড়ে লুকিয়ে থাকলে ঠিক বেরিয়ে আসত,” আফরোজ় মৈনাকের চোখে চোখ রেখে কথাগুলো বলে। “আচ্ছা, তুই আমাকে একটা কথা বল, ওর যে পার্টনার সে কিন্তু কান্নাকাটি করছে না। বরং বেশ কম্পোজ়ড আর কোয়ায়েট আছে।”
“হ্যাঁ, ওই মেয়েটার নাম অঞ্জলি, খুব হাই-সোসাইটির কলগার্ল,” মৈনাক আফরোজ়ের দিকে তাকিয়ে থাকে আবছা অন্ধকারে, “তাই ওর মানসিক কোনও বিকার নেই।”
“তুই শিয়োর? মেয়েটি কলগার্ল? এরকম মেয়ে কলগার্ল হতে পারে?”
“হতে পারে কী রে পাগল! হয়েছে। তুই বরং এখানে বসে-বসে আমাদের কী-কী কনসিকোয়েন্স হতে পারে তাই নিয়ে ভাব, আমি বাকিদের সান্ত্বনা দিই,” মৈনাক আফরোজ়কে ছেড়ে ডেকের সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
“সুমন্ত, তুই তো সরকারি উঁচু পোস্টে চাকরি করিস। তুই বল আমাদের কী করা উচিত এই সিচুয়েশনে?” মৈনাক সুমন্তর কাছে চেয়ার টেনে নিয়ে বসে।
“ব্যাপারটাতে আমাদের কারও কোনও হাত নেই। কারও ফল্ট নেই। জাস্ট আ মিসহ্যাপ বলতে পারিস। তবে আমরা সবাই নিজেদের বিপদ নিয়ে ভাবছি অথচ যে ভদ্রলোক মিসিং, তাকে নিয়ে ভাবছি না! ওটা আমাদের প্রায়োরিটি হওয়া উচিত।”
“এগজ়্যাক্টলি, আমিও তাই বলছিলাম। আমাদেরটা পরে ভাবলেও চলবে, আপাতত এই মিসিং ভদ্রলোক ওমপ্রকাশ সিন্হাকে খুঁজে বের করতে হবে। ওর স্ত্রী আর মেয়েকে না হলে কী বলব আমি? জলজ্যান্ত একটা লোক জাস্ট গায়েব? তোর কি মনে হয় থানায় ব্যাপারটা এখনই জানানো উচিত? নাকি কাল সকালে আর এক দফা খোঁজাখুঁজির পর জানাব? বিট অফিসার আমাদের সঙ্গে আছেন। উনি তো বলতে গেলে আই উইটনেস, যদি ফরম্যালি ইন রাইটিং চান তাহলে একটা দেওয়া যাবে। তবে কাল সকালে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখি, তারপর না হয় ফরম্যাল…”
“তাই কর। আমি ভাবছি কাল সকাল পর্যন্ত আমরা কী করব? মেয়েদের বলি ঘুমিয়ে পড়ুক, ভোর পাঁচটার পর প্ল্যানিং করা যাবে। যা হওয়ার তা হবেই তাই শুধু শুধু টেনশন করে সবাই মিলে শরীর খারাপ করে কী হবে?”
“তুই জিজ্ঞাসা করছিলি না সুন্দরবনে জোনাকি আছে কি না? জঙ্গলের দিকে একবারটি তাকিয়ে দেখ, আকাশের গায়ে যেমন তারারা ঝিকমিক করে, জঙ্গলের গায়ে পিটপিট করে জ্বলছে হাজার হাজার জোনাকি।”
“হ্যাঁ তাই তো। খেয়াল করিনি। গতকাল রাতে দয়াপুরের রিসর্টে যেখানে ছিলাম, ওখানে লক্ষ করেছিলাম, কিন্তু জোনাকি দেখতে পাইনি। তবে অজস্র পোকার ডাক শুনেছিলাম, অজানা সব ডাক। আমার ধনেখালিতে শৈশবের কথা খুব মনে পড়ছিল জানিস। এখন কলকাতায় থেকে শৈশবটাকে ভীষণ মিস করি। এখানে এসেছিলাম চারটে দিন আবার বনেজঙ্গলে আকাশ আর মাটির মাঝামাঝি থাকব বলে, বর্তমান অবস্থার কমফর্ট সমেত। অসাধারণ কাটল প্রথম রাতটা। আজকে বেশি ঝুঁকি নিতে গিয়ে সব তালগোল পাকিয়ে গেল। এখন এক অজানা ভয় চেপে বসেছে, মানুষটা মনে হয় সত্যিই হারিয়ে গেল বুঝলি,” সুমন্ত একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে নারায়ণতলা জঙ্গলের দিকে। আকাশে একফালি চাঁদ আর কিছু বিষণ্ণ তারা জঙ্গলের অন্ধকারকে যেন আরও প্রকট করে তুলেছে। আকাশ জুড়ে হালকা আলো তার নীচে জঙ্গলের জমাট অন্ধকার। সুমন্তর মনে হয় ওই জমাট অন্ধকারে ওপি সাহেবের হাহাকার কোথাও যেন হারিয়ে গেছে। মন বলছে বেঁচে নেই, আবেগের কথা অবশ্য আলাদা। ধনেখালির বাড়ির বারান্দায় বসে দেখা কৈশোরের কথা খুব মনে পড়ছে আজ। বিশেষ করে সন্ধ্যার হরিধ্বনি দিয়ে খই ছড়াতে-ছড়াতে মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া আর বারান্দার নীচে বিশাল দিঘির অপর পাড়ে আমড়া গাছের নীচে কাঠের চিতায় মৃতদেহ দাহ, বারবার এই দৃশ্যপট মনে পড়লেই সুমন্ত দেখেছে মৃত্যুসংবাদ পায়। আজ পর্যন্ত অন্যথা হয়নি। তাই অদ্ভুত এক ভয়ে কুঁকড়ে থাকে সুমন্ত, হাত-পা অবশ। মৈনাকদের মশাল জ্বালিয়ে ক্যানেস্তারা পিটিয়ে ওপি সাহেবকে খুঁজতে যাওয়ার সময় থেকেই সুমন্তর মনে পড়ল সন্ধ্যা নামছে পায়ে-পায়ে আর আমড়া গাছের নীচে কাঠের চিতায় পুড়ে পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেল আর-একটা মানুষ। নাহ্, মন চাইছে আজ যেন ব্যতিক্রম হয়…
“কী রে ভয় পেয়েছিস? লোকলজ্জার? মর্যাল টারপিটিউড? লোকে কী বলবে? ডিপার্টমেন্টের কী রিঅ্যাকশন হবে? সত্যিই তোকে এখানে ডেকে বিপদে ফেললাম, তাই না রে?”
“আগেই তো বললাম, এখন দরকার লোকটিকে খুঁজে বের করা, জীবিত বা মৃত। চল ভোরে আমিও যাব, বিদ্যুৎবাবু বলছিলেন দক্ষিণরায় ছাড়া একটা মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আর কারও নেই এই জঙ্গলে। আর বাঘ তুলে নিয়ে গেলে পাগমার্ক দেখে ট্রেস করলে আধ খাওয়া হলেও ডেডবডি পাওয়া যাবে। মানসিক প্রস্তুতিটা থাক সবচেয়ে খারাপ কিছুর জন্য। চল মেয়েদের বলি ওরা টেনশন না করে শুয়ে পড়ুক,” মৈনাক আর সুমন্ত নীচে নেমে যায় ডাইনিং স্পেসে বসা মেয়েদের কাছে।
বিদ্যুৎবাবুকে ঘিরে একটা ছোট্ট জটলা। মৈনাক জটলায় যোগ দিতেই লঞ্চের রাঁধুনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। মৈনাক হাতের ইশারায় ওকে বসতে বলে একটা খালি চেয়ার দূর থেকে তুলে এনে বিদ্যুৎবাবুর মুখোমুখি বসে। “আমি হলদিবাড়ি ক্যাম্পে খবর পাঠিয়েছি ওয়্যারলেসে। ভোরের আগেই ওখান থেকে জনা পাঁচ-ছয় গার্ড আর কিছু বাউলি, যারা চুরি করে জঙ্গলে কাঠ কাটে, ওদের নিয়ে পৌঁছবে। আশা করছি কিছু একটা খবর সকালবেলায় পেয়ে যাবে।”
সুন্দরবন কোস্টাল থানায় পৌঁছতে প্রায় চারটে বাজল। বিদ্যুৎবাবুই পরামর্শ দিলেন, এতগুলো লোক সবার থানায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই, ‘‘আমি যাচ্ছি আর আপনাদের দু’-তিনজন আমার সঙ্গে চলুন থানায়, একটা ফরম্যাল ইনফরমেশন দিতে হবে।’’
থানার বড়বাবু দীপক পাল অমায়িক ভদ্রলোক, ওঁর সঙ্গে ভাব হতে সময় লাগল না। কথায় কথায় বললেন, এইসব থানায় ব্যস্ততা অনেক কম, তাই অবসর সময় কবিতা লিখে কাটান। মিনিট পনেরো আলাপ আর কথাবার্তার পরই চা আর শিঙাড়ার অর্ডার দিয়ে টেবিলের ড্রয়্যার টেনে লাজুক মুখে নিজের কবিতার ডায়েরি বের করে টেবিলের উপর রাখলেন। মৈনাকবাবুকে বললেন, “ছোট করে দু’লাইন ইনফরমেশন লিখে দিন। আর হ্যাঁ, আপনারা হারিয়ে যাওয়া মানুষটিকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেছেন, সেটা মেনশন করবেন।”
মৈনাক কিছু বলার উপক্রম করতেই বিদ্যুৎবাবু ওকে থামিয়ে দেন হাতের ইশারায়, বলেন, “আজ ভোরে আমরা যখন এলাকাটাতে তন্নতন্ন করে খুঁজছি, বললে বিশ্বাস করবেন না, অন্তত তিনখানা পূর্ণবয়স্ক বাঘের পাগমার্ক দেখেছি। অবিশ্বাস্য ব্যাপার,” একটু দম নেন বিদ্যুৎবাবু, বলেন, “বাঘেদের এরিয়া নির্দিষ্ট থাকে, একা একটা বাঘ কিছুটা এরিয়া জুড়ে রাজত্ব করে, ওই এরিয়ায় অন্য বাঘ ঢোকে না…”
দীপকবাবু বলেন, “অনেকটা আমাদের থানার জুরিসডিকশনের মতো আর কী! জ়োনাল টাইগার!”
ঘণ্টাখানেক পরে চা-শিঙাড়া যোগে কবিতা পাঠ শুনে মৈনাক, সুমন্ত, আফরোজ় আর সুরিন্দর যখন লঞ্চে ফিরে এল, সকলের মধ্যেই দারুণ এক উদ্বেগ, “এত দেরি? আমরা তো ভাবলাম থানার লকআপেই বোধহয় ঢুকিয়ে দিয়েছে বড়বাবু।”
“আরে না না, আমরা কবিতা শুনছিলাম,” মৈনাক মুচকি হেসে বলে।
“কী কবিতা?” শর্মিষ্ঠা গম্ভীরভাবে জিজ্ঞাসা করে, “আমি তো ফোনও করলাম একবার, তুমি কেটে দিলে। আর সুমন্তবাবু ফোন রিসিভই করলেন না। অথচ বলছ কবিতা শুনছিলে। হেঁয়ালি ছেড়ে পরিষ্কার করে বলো না কী কবিতা শুনছিলে?”
“আরে কী কবিতা আবার কী! লাশ, রক্ত, সুরতহাল নিয়ে কবিতা, বড়বাবুর লেখা! বড়বাবু বললেন, ‘এই বাদাবনের মানুষের লোকগীতির প্রতি যা প্রেম, কবিতার প্রতি ছিঁটে-ফোঁটাও নেই,’ শহুরে লোক পান না যে কবিতা শোনাবেন, ডায়েরি বন্দি করে রাখলে কি আর কবিতার আবেগ শেষ হয়! অগত্যা আমাদের শুনিয়ে ছাড়লেন। মিসিং পারসনের ব্যাপারে গদগদভাবে বললেন, কাগজে কলমে যতখানি যা সাহায্য করা সম্ভব সবই করবেন। ঘাট পর্যন্ত আমাদের এগিয়ে দিলেন। আমি তো আমার অফিসের অ্যাড্রেসটা পর্যন্ত দিলাম, নতুন কবিতা লিখলেই আমাকে শুনিয়ে যাবেন কলকাতা এসে, আমাকে কথা দিয়েছেন বড়বাবু।”
“আমাদের কোনও বিপদ নেই তো?”
“বিপদ আবার কী? কবিতার আবেগ ভেন্ট আউট করার নিশ্চিত একটা জায়গা হলাম আমি। আমার মনে হয় না আমাদের আর বিপদ আছে। বিপদ যা কিছু ওপি সাহেবকে নিয়ে… মাথার চুল ছিঁড়ছি কাল রাত থেকে।”
“আচ্ছা শোনো, অনুপমা ফোন করে দিয়েছে ওই বাসটাকে। যত রাত্রিই হোক আজই আমরা কলকাতা ফিরে যাচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যে কলকাতা থেকে বাস রওনা দেবে গঁদখালির উদ্দেশে।”
গঁদখালি থেকে যখন কলকাতার দিকে বাস রওনা দিল, ঘড়ির কাঁটা জানান দিল রাত দুটো।
অনুশ্রী ফিসফিস করে আফরোজ়কে জিজ্ঞাসা করে, “রিসর্টে তোমার সুটকেসের সাইড পকেট থেকে হাওয়াই চপ্পল বের করার সময় দেখলাম বেশ ধারালো বড় একটা ছুরি। কলকাতা থেকে এনেছিলে?”
“না তো, লঞ্চের কিচেন থেকে লুকিয়ে নিয়েছিলাম। কলকাতা থেকে আনব কেন? কোনও দরকার ছিল না তো!”
“আজ আবার সুটকেস গোছাবার সময় ওটা দেখলাম না তো?” অনুশ্রী চোখে বিস্ময় নিয়ে আধো অন্ধকারে তাকিয়ে থাকে আফরোজ়ের দিকে।
“নাহ্ নেই, নারায়ণতলার পাঁকে ওটা পুঁতে দিয়েছি,” ভাবলেশহীন মুখে আফরোজ় বলে।
“তোমাকে কি সত্যিই সাপে তাড়া করেছিল?” অনুশ্রী তাকায় আফরোজ়ের মুখের দিকে।
“হ্যাঁ, সাপটা তো কলকাতা থেকেই তাড়া করছিল,” ওর মুখের মাংসপেশিগুলোতে কোনও পরিবর্তন নেই।
কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে আরও একবার ফিসফিস করে বলে, “নিধির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, ও তোমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়েছে। তুমি কথা বলবে?”
“হ্যাঁ, আমি রাজি,” আফরোজ়ের মুখ একই রকম ভাবলেশহীন।
অনুশ্রী বাসের সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। হেঁটে যায় সামনের দিকে বসে থাকা নিধির সিটের পাশে।
নিধি উঠে আসে আফরোজ়ের পাশে, “আমি বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনরের ক্যারিয়ার। আমি চাইনি তোমার সন্তানের শরীরে খুঁত থেকে যাক। আমি আগে জানতাম না, বাবাকে একটা কিডনি দেওয়ার জন্য ব্লাড টেস্ট করাতে গিয়ে জানতে পারলাম।”
“আমি তো তোমাকে যে-কোনও অবস্থাতেই অ্যাকসেপ্ট করতে চাই। তুমি বলে দেখতেই পারতে, আমার উপর এটুকু বিশ্বাস তোমার থাকা উচিত ছিল।”
বাসন্তী রোড ধরে হু-হু করে ছুটছে এসি বাস। আফরোজ়ের কাঁধ ভিজছে নিধির চোখের জলে।
***
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন