রামধনু – ২

হুমায়ুন কবীর

একটা অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে যায় আফরোজ়ের। তলপেটে সামান্য চাপ অনুভব করে। মনে করার চেষ্টা করে রাতে ঘুমোবার আগে কতটা জল খেয়েছিল। নাহ্, মনে পড়ছে না! নিজের সেন্সটা পুরো না এনে ঘুমটাকে জড়িয়ে রাখার চেষ্টা করে। পাশ ফিরে শোয়, বিরক্ত হয় বালিশটা মাথা থেকে সামান্য সরে যাওয়ার জন্য। গোল পাশবালিশটাকে ভাল করে জাপটে ধরে, মাথাটাকে চিন্তাশূন্য করার জন্যই কাবাশরিফের কালো কাপড়ে ঢাকা চৌকো মসজিদটাকে হালকা করে মাথার মধ্যে ভাসিয়ে নেয়।

আবার মাথার বালিশটা পিছলে পিছিয়ে যায় সামান্য। সিন্থেটিক তুলোর বালিশের এই সমস্যা, দেখতে-শুনতে বেশ নরম-সরম আর আদুরে টাইপের, কিন্তু আস্তে-আস্তে মাথা থেকে সরে যায় খাটের হেডবোর্ডের দিকে, উঁচু হয়ে হেডবোর্ডের গায়ে লেপটে থাকতে চায়। ম্যানেজ করা ঝামেলা। বালিশটাকে নীচের দিকে নামিয়ে এনে মাথাটা মাঝখানে রাখে। নাহ্! ঘুমের রেশ পাতলা হতে-হতে কেটে যায়। আসলে তলপেটের চাপটা বাড়ছে। খুলব না-খুলব না করেও অর্ধেকটা চোখ খুলে মশারিতে টান মেরে বিছানার বাইরে হাওয়াই চপ্পলে পা রাখে। আলো না জ্বেলে, আন্দাজে কমোডের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। চোখ অর্ধেক খোলা, পুরো খুললেই ঘুমের দফারফা। বাথরুমের লুবারের ফাঁক দিয়ে রাস্তার ভেপার ল্যাম্পের আলো ভালই পড়ে, তবুও আধখোলা চোখে সন্দেহ থেকেই যায়। হাঁটুর নীচে শিনবোনের কাছটা দিয়ে কমোডের একটা পাশ ছুঁয়ে দেখে নেয় কমোডটা সেন্টারে আছে কিনা। না হলেই ঝামেলা! পায়ে ছিটে পড়বে, আবার জল দিয়ে ধোওয়ার কষ্ট, ঘুমের আর কী বাকি থাকবে! চাপ হালকা হতেই আধখোলা চোখ ঘোরায় বাথরুমের লুবারের দিকে, বোঝার চেষ্টা করে কত রাত। বাইরের পরিবেশ গম্ভীর, পথে কুকুরের কেঁউ-কেঁউ নেই— মানে মাঝরাত!

টয়লেট থেকে বেরিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে মশারি সরিয়ে, ঘুমোবার চেষ্টা করে প্রায় অন্ধকার ঘরে। পরদার পিছনে ব্ল্যাকআউট লাইনিং লাগানো, তাই পরদা ভেদ করে আলো আসা সম্ভব নয়। তবুও পরদার পাশ দিয়ে আলো চুইঁয়ে ঘরে পড়ে সামান্য হলেও। পাশ ফেরে আফরোজ়, কাবার ভিতরটা মনের মধ্যে আবার হালকা করে ভাসিয়ে নেয়। তিন পিলার আর সাদা দেওয়ালের কিউবিক বিল্ডিং অল্ হারাম। মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে পবিত্র মসজিদ। পূর্ব দিকের কোণে লাগানো স্বর্গীয় কালো পাথর অল্ অসওয়াদ, যা মহম্মদ নিজের হাতে স্থাপন করেছিলেন। কথিত আছে পাথরটি ছিল সাদা, পৃথিবীর পাপ শুষে নিতে-নিতে কালো হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানীরা সন্দেহ করেন ওই আট টুকরো কালো পাথর আসলে মেটিওরাইট। এই পাথরকে চুম্বন ইসলাম ধর্মে এক বিশাল সৌভাগ্যের বিষয়। মনে-মনে কালো পাথরের সামনে িসজদা করে আফরোজ়। কাল্পনিক চুম্বন এঁকে দেয় রুপোর পাতে মোড়া কালো পাথরে। সৌদি রাজপরিবার আর কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষ ছাড়া কাবা মসজিদের ভিতরে প্রবেশাধিকার নেই কারও। হজ করার সময় ঘড়ির কাঁটার বিপরীত নির্দেশে সাতবার পাক মারে মুসলমানেরা। চেষ্টা করে পাথরের কাছাকাছি যাওয়ার, হাওয়ায় ভাসিয়ে দেয় চুম্বন। নিজেকে শূন্যে ভাসিয়ে নেয়, কাবা মসজিদের উত্তর ঘেঁষে পূর্ব দিকের দেওয়ালে সোনার বাবুত তওবা (যাকে বলা হয় অনুশোচনার দরজা) পেরিয়ে সাদা মার্বলের উপরে দাঁড়ায়… দেওয়ালে কোরাণের আয়াত, ছাদ থেকে ঝুলছে সোনার লন্ঠন… নাহ্, ঘুমটা মনে হয় ভেঙেই গেল। মনটা অল্ হারামের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে বারবার। যত্তসব হিজিবিজি ভাবনা শিশির পড়ার মতো করে নিঃশব্দে ওর মাথায় ঢুকছে, খুলির ভিতর, ছড়িয়ে পড়ছে সেরিব্রামের ভাঁজে-ভাঁজে, উত্তেজিত করছে টেমপোরাল রিজিয়নের স্মৃতির কোষগুলোকে, কান দুটো আস্তে-আস্তে তাই গরম হয়ে উঠছে… নিধি ঠিক কতদিন হল চলে গেছে? ওর মাথা হিসেব কষছে, প্রায় এক বছর। উনিশে নভেম্বর এলেই এক বছর পূর্ণ হবে, আর বাকি বাইশ দিন… আফরোজ় জোর করে মনটাকে ফিরিয়ে নিতে চায় অল্ হারামের ভিতরে। ছোটখালা বলেছিল, “মনে চাবুক লাগাস যখনই বেয়াড়াপনা করবে… মন হল ছুটন্ত ঘোড়া, সবসময় ছুটতে দিস না, শক্ত করে লাগাম টেনে দিবি। আব্বা-আম্মাকে নিয়ে ভাববি, ভাববি ওরা কত অসহায়, তোর মুখ চেয়েই বসে থাকে। আর ভাববি অল্ হারাম নিয়ে।”

ওর যা কিছু ধর্মীয় শিক্ষা সবই ওই ছোটখালার কাছ থেকে। কতদিন কথা হয়নি খালার সঙ্গেও, শেষ কথা হয় সেই মে মাসে ইদের দিন। আফরোজ়ই ফোন করে ইদ মোবারক জানিয়েছিল ওর এক সময়ের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছোটখালা ফিরোজ়াকে। সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে কেমন যেন পালটে যায় মানুষের সঙ্গে মানুষের ইকুয়েশন। অকপটে যাকে সব কথা বলত একসময়, এমনকি ওর প্রথম প্রেমপত্রের কারেকশন যে করে দিয়েছিল, সেই ছোটখালার সঙ্গে দেখাই হয়নি বছর দুই হল। আরও বেশি হবে হয়তো, মনেই পড়ছে না শেষবার কবে দেখা হয়েছিল।

“স্যার, আপনি একা-একা দাঁড়িয়ে কী ভাবছিলেন? আমি প্রায় পাঁচ মিনিট হল আপনার চেম্বারে এসেছি, আপনি বুঝতেই পারেননি। কোনও সিরিয়াস ভাবনায় আমি ইন্টারাপ্ট করলাম না তো?”

“ওহ্‌ নিধি! নাহ্‌ না, নাথিং সিরিয়াস। সরি আই ডিড্ন্ট নোটিস ইউ। অ্যাকচুয়ালি আই ওয়জ় এনজয়িং দ্য বিউটি অফ সাইলেন্স,” অপ্রস্তুত আফরোজ় উত্তর দেয়।

“সরি, স্যার। ইজ় দেয়ার এনি বিউটি ইন সাইলেন্স? আমার তো খুব বোরিং লাগে, তা ছাড়া কী রকম একটা গম্ভীর ব্যাপার-স্যাপার,” নিধি কল-কল করে তর্ক জুড়ে দেয়।

“ইয়েস অফ কোর্স, ইউ নিড টু ফিল ইট সাইলেন্টলি,” আফরোজ় গম্ভীরভাবে উত্তর দেয়।

“সরি স্যার, আমার চুপ করে থাকতে ভাল লাগে না। মাথার মধ্যে যা-যা ভাবছি, তাই বলে ফেলতে ইচ্ছে করে। হাউ কুড আই কন্ট্রোল মাইসেলফ?”

নিধি এমনটাই। ওর মন আর মুখের মধ্যে কোনও ফারাক নেই। হড়হড় করে সব বলে দেয়। আফরোজ়ের তাই নিধিকে বেশ পছন্দ। ওর লম্বাটে মুখের গড়নকে লম্বা ঝকঝকে চুল চারদিক দিয়ে ঘিরে রাখে, তাই লম্বাটে মুখ ততটাও লম্বা লাগে না। তবে কখনও-সখনও চুল টেনে যখন পনিটেল বাঁধে, তখন মুখটা লম্বাটে আর ধারালো লাগে, চিবুকের মাঝে গভীর খাঁজ আর ওর চোখ দুটো মুখাবয়বের মধ্যে এক অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরি করে দেয়। ঘূর্ণিঝড়ের মতো। ওকে কেন্দ্র করেই পুরুষের মন ঘুরপাক খেতে পারে অজস্রবার। বছর পাঁচ আগে বাগুইআটি অফিসে সবে মাস ছয়েক হল জয়েন করেছে নিধি। শেষ বিকেলে কমলা রঙের সূর্য মাখানো আলোর ছটা তখন আফরোজ়ের ঝকঝকে অফিস জুড়ে। একটা নামী কোম্পানির তৈরি করা বাড়ির বারো তলায় আফরোজ়ের অফিস। আলোর কমতি নেই ওর কুড়ি ফুট বাই পনেরো ফুটের আধুনিক অফিসে। আসলে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের এই কামরার পশ্চিম দিকে কোনও দেওয়াল নেই, মাঝে একটা পিলার। মেঝে থেকে লিনটেল পর্যন্ত পুরু কাচের দেওয়াল, আর ওই দেওয়াল লাইনিং আর ব্লাইন্ড দিয়ে ঢাকা। আফরোজ় তাই সন্ধের আগে আলো জ্বালতে বারণ করে দারোয়ানকে। প্রাকৃতিক আলো ভাল, ইলেকট্রিক বিল সাশ্রয়ের সঙ্গে-সঙ্গে রেডিয়েশনও কম। অল্প ফাঁক করে রাখে কয়েকটা ব্লাইন্ড দিনভর, আর এই শেষ বিকেলে যখন সূর্য ডোবার পালা, আফরোজ় নিজে উঠে সব ব্লাইন্ডস কাচের উপর ভার্টিকল পোজ়িশনে ছেড়ে দেয়। এমনই এক দিনে কমলা রঙে মাখামাখি হয়ে নিধি কথাগুলো বলল। আসলে আফরোজ় দেখছিল সূর্য ডোবা। ওর মধ্যেই নিধি নিঃশব্দে ঢুকে এসেছে ওর কামরায়। আফরোজ়ই ইন্টারকমে ডেকেছিল ওর শাড়ির জন্য তৈরি করা গ্রাফিক্স ডিজ়াইন নিয়ে। নিধি বলেছিল, “স্যার, মিনিট দশেক লাগবে। ফিনিশিং টাচ দিয়েই আসছি আপনার চেম্বারে।”

তাই নক না করেই ঢুকে পড়েছিল নিধি। হয়তো নক করত ও, কিন্তু শাড়ির ডিজ়াইনটা মনঃপুত হওয়ায় বেশ উত্তেজিত ছিল। তাই মুহূর্তের ভুলে ঢুকে পড়েছে। কর্পোরেট রুলস-এর কিছু ভুলভ্রান্তি মাঝে-সাঝে হয়েই যায়।

আফরোজ় যখন ফিরল নিধির দিকে, গাঢ় কমলা রঙে মাখামাখি ওর মুখ, ওর সারস পাখির ডানার মতো লম্বা হাত দুটো, গলা আর চওড়া বক্ষ বিভাজিকা। কমলা রং ছিটকে বেরোচ্ছে ওর কানের বিশাল গোল-গোল দুটো রিং থেকে আর কণ্ঠনালির নীচে ছোট্ট হিরের টুকরো থেকেও।

“হ্যাঁ, কী যেন বলছিলে?” আফরোজ় সংবিৎ ফিরে পেয়ে জিজ্ঞাসা করে।

“সাইলেন্স স্যার। সাইলেন্স ইজ় বোরিং স্যার, ইজ়ন্‌ট ইট?” পালটা প্রশ্ন করে নিধি।

“নট অলওয়েজ়,” আফরোজ় চোখ সরিয়ে নেয় নিধির দিক থেকে। হেঁটে গিয়ে গদি আঁটা রিভলভিং চেয়ারে বসে, সরাসরি মুখের দিকে তাকায় নিধির, “তোমার কাজ কমপ্লিট হল?”

“ইয়েস স্যার, হিয়ার ইট ইজ়,” নিধির মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। হাতের দু’আঙুলে ধরা পেনড্রাইভ দেখায়, “উড ইউ লাইক টু সি ইট রাইট নাউ?”

“ইয়েস,” মাথা দোলায় আফরোজ়, “আজকেই মেল করার কথা মুম্বইয়ের কোম্পানিতে, আই হোপ ইউ রিমেম্বার?”

নিধি হাই হিল জুতোর আওয়াজ তুলে হেঁটে আসে আফরোজ়ের চেয়ারের কাছে। অল্প ঝুঁকে পেন ড্রাইভ গুঁজে দেয় কম্পিউটরে, মাউসের ক্লিকে কম্পিউটারের পর্দায় বিচিত্র সব শাড়ির ডিজ়াইন আর নানা রঙের ছটা। ওর চোখ মুখ খুশিতে উজ্জ্বল, আফরোজ়ের দিকে তাকায় প্রশংসা পাওয়ার আশায়।

আফরোজ়ের দিকে কোণাকুণি সামান্য ঝুঁকে আছে নিধি। আর সেটাই হয়েছে যত কাল! নিধির পুরুষ্টু বুকের উপচে পড়া আফরোজ়ের চোখের সামনে প্রকট, কম্পিউটর স্ক্রিনের রং-বেরঙের শাড়ির ডিজ়াইনের চেয়ে যেটা অনেক বেশি আকর্ষক। সঙ্গে হালকা পারফিউম আর নিধির শরীরের গন্ধ মিলেমিশে একাকার। নেশা ধরিয়েছে আফরোজ়ের মনে। আফরোজ়ের চোখ ফলো করে নিধি। চট করে সোজা হয়ে দাঁড়ায় না নিধি, সেটা একধরনের অসভ্যতা। তাই সময় নেয়, জিজ্ঞাসা করে, “স্যার, আর ইউ স্টিল এনজয়িং দ্য বিউটি অফ সাইলেন্স?”

“নো মোর,” সামান্য অপ্রস্তুত আফরোজ়। চোখ জো়ড়া সরিয়ে নেয় নিধির অনেকখানি অনাবৃত শরীরের ঊর্ধ্বাংশ থেকে। হাতের ডান পাশে ছোট্ট টুলে রাখা ব্রিফকেস টেবিলে তুলে নেয় আফরোজ়। ইশারায় টুল দেখিয়ে নিধিকে টুল টেনে নিয়ে বসতে বলে।

“আই অ্যাম কমফর্টেবল স্যার,” নিধি মুখে বললেও, আফরোজ়ের চেয়ারের পিছন দিক দিয়ে ঘুরে গিয়ে টুল তুলে নিয়ে ওর চেয়ারের পাশাপাশি বসে। মাউসের ক্লিকে পর-পর সরে যায় স্ক্রিনের ছবি।

‘‘বাহ! বেশ হয়েছে,” আফরোজ়ের প্রশংসা পেয়ে হালকা করে বারকয়েক তালি বাজিয়ে নেয় নিধি।

মাউস হাতে নিয়ে কমলা রং বেছে নেয় কারসারে, হাইলাইটের উপর সামান্য করে কমলা রং ছোঁয়ায়। চোখ জো়ড়া গোল হয়ে মুখটা হাঁ হয়ে যায় নিধির, দু’হাতের চেটো দু’গালের পাশে উঠে আসে ওর। বিস্ময়ভরে তাকায় আফরোজ়ের দিকে, “ইউ আর জিনিয়াস স্যার! আই অ্যাম শিয়োর কোম্পানি অফ মুম্বই উইল অ্যাকসেপ্ট অল দিজ়।”

“লেট আস হোপ সো।

“ইউ হ্যাভ ডান আ সপ্লেনডিড জব। তুমি শাড়ি পর নিধি?”

ঠোঁট উলটে বাচ্চাদের মতো আদর কাড়ার ভঙ্গিতে নিধি বলে, “নো স্যার। মাই মম ওয়্যার্‌স রেগুলারলি।”

আফরোজ়ের হাতে মাউস, প্রত্যেকটা ডিজ়াইন ধরে-ধরে সামান্য কারেকশন করে ফাইনালাইজ় করে চলেছে। পাশে বসে মুখে নানা প্রশংসাসূচক আওয়াজ করছে নিধি। “তা তুমি যে সব ড্রেস পর ওগুলোকে কী বলে? আমরা কি এ ধরনের ড্রেস কিছু ডিজ়াইন করতে পারি না?” কম্পিউটর স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই আফরোজ় জিজ্ঞাসা করে।

“অফ কোর্স উই ক্যান মেক ডিজ়াইনস অফ সাম ট্রেন্ডি ড্রেসেস। আই ক্যান ট্রাই স্যার, শুড আই?” আফরোজ়ের দিকে সামান্য ঘুরে জিজ্ঞাসা করে নিধি।

“ওকে, গো অ্যাহেড। ট্রাই সাম, হাউ ইউ ওয়ান্ট টু বি ড্রেসড, শো সাম ডি়জ়াইনড ড্রেসেস ইউ লাইক,” নিধির কাঁধের কাছে নিশ্বাস আর টেবিলের উপর হাতের মাউস ছেড়ে দেয় আফরোজ়।

“এনি স্পেশ্যাল ফিচার? আই মিন কিছু অ্যাডভাইস স্যার? কোনও সাজেশনস?” সামান্য পিছনে ঘাড় ঘোরায় নিধি। ওর মুখ আফরোজ়ের মুখের খুব কাছে চলে আসে। নিধি মাথা ঝাঁকিয়ে চুলের গোছা পিঠের দিকে নিয়ে গিয়েছে, তাই ওর মুখ খুব ধারালো লাগে আফরোজ়ের।

“ইট শুড বি অফ-শোলডার, ডিপ কাট ডাউন দ্য নেক অ্যান্ড কনস্ট্রিকটেড অ্যাট ওয়েস্টলাইন,” আফরোজ় নিধির ধারালো মুখ আর বড়-বড় মাসকারা লাগানো চোখে তাকিয়ে বলে।

“সামথিং লাইক আই অ্যাম ওয়্যারিং স্যার?” নিধির ঠোঁটে হালকা হাসি।

“ইয়েস, সামথিং লাইক ইয়োর ড্রেস, বাট মেক ইট লঙ্গার,” শেষের কথাটা বলে দিয়েই একটু অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে আফরোজ়। নিধিকে ও সামান্য হাঁটু ছাপানো ড্রেস নিয়ে কিছু ইঙ্গিত করতেই চায়নি, কিন্তু নিধি ভাবতেই পারে ওকে ওর বস ছোট ড্রেস নিয়ে খোঁচা দিচ্ছে। চট করে তাই সামলে নিয়ে আফরোজ় বলে, “অল গার্লস ডোন্ট হ্যাভ সাচ পলিশ্ড অ্যান্ড বিউটিফুল লেগ্‌স লাইক ইউ,” বলেই আবার অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে আফরোজ়। যে কোনও একটা বিশেষণ দিলেই ব্যাপারটা বোঝানো যেত, কিন্তু দু’-দুটো বিশেষণ জুড়ে দিতেই যত বিপত্তি। আসলে একেবারে কোলের কাছে বসে আছে নিধি। ওর ঝকঝকে চেস্টনাট ব্রাউন লম্বা চুল, মসৃণ কাঁধ, লম্বা-লম্বা হাত আর বুকের ঊর্ধ্বাংশ ওকে একটু প্রগল্‌ভ করে দেয়। শ্বাস-প্রশ্বাস বাড়লেই জিভের নিয়ন্ত্রণ হারায় মানুষ। খেলার মাঠে তাই এত শ্লীল-অশ্লীল কথার ফোয়ারা ছোটে খেলোয়াড়দের মুখে। বাড়তি অ্যাড্রিনালিনের ক্ষরণ।

“থ্যাঙ্ক ইউ ফর দ্য কমপ্লিমেন্টস,” কথাটা দ্রুত ক্যাচ করে নিধি উত্তরও দিয়ে দিয়েছে। আর কারেকশনের কোনও সুযোগ নেই।

ওর দিকে তাকায় আফরোজ়, বোকার মতো সামান্য হাসে।

“স্যার, আমি ভাবি, আপনার সাবজেক্ট আলাদা— কম্পিউটর এঞ্জিনিয়ারিং। সেটাতে আপনি এক্সপার্ট। কিন্তু গ্রাফিক্সেও আপনার নলেজ দেখে অফিসের সবাই স্তম্ভিত।”

“থ্যাঙ্ক ইউ,” বলে মুখে সামান্য হাসি ঝুলিয়ে রাখে আফরোজ়।

“স্যার, আমি তাহলে অনুশ্রীদিকে এগুলো দিই আর পাঠিয়ে দিতে বলি?” নিধি জানতে চায় আফরোজ়ের কাছে।

“ও হ্যাঁ, পাঠিয়ে দাও। আই হোপ অ্যাকসেপ্ট করবে কোম্পানি,” আফরোজ় ঘাড় নে়ড়ে সম্মতি জানায়। কোনও ছুতোয় নিধিকে আরও খানিকক্ষণ বসিয়ে রাখতে ইচ্ছে করছে আফরোজ়ের। মাথার মধ্যে জুতসই কোনও ছুতো না পেয়ে অগত্যা ছেড়ে দেয় নিধিকে।

চেম্বারের পরিবেশে তরঙ্গ তুলে বেরিয়ে যায় নিধি, ওর হেঁটে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে আফরোজ়। চেম্বারের দরজার কাছেই আছে আট ফুট উঁচু আয়না। ওই আয়নায় কোণাকুণি তাকালে আফরোজ়কে দেখতে পাওয়া যায় তেরছাভাবে। নিধি তাকাচ্ছে আয়নায় সোজাসুজি। নিজেকে দেখার জন্য নাকি আফরোজ়ের উপর ও কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে তা দেখার জন্য? কথাটা ভাবতেই আফরোজ় ওর পিঠ থেকে চোখ সরিয়ে নেয় দ্রুত। নিধি বেরিয়ে যায় দরজা দিয়ে।

আসলে নিধি এসেছিল কারও এক সুত্র ধরে, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ডিগ্রি নিয়ে প্রাইভেট কলেজ থেকে। আফরোজ় প্রথমেই বলে দিয়েছিল ওর ‘ড্রিমলাইনার’-এ প্রোগ্রামিং আর সফটওয়্যারের কাজ হয় কেবল, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারের কোনও কাজ নেই। তবুও সেই সূত্র চেপে ধরেছিল, কারণ ওকে ছোটখালা রেকমেন্ড করেছিল। ছোটখালার প্রভাব ওর উপর নেই বললেই চলে এখন। যাদবপুরে সেকেন্ড বা বড়জোর থার্ড সেমেস্টার পর্যন্তই ছিল। আফরোজ় অনিচ্ছাসত্ত্বেও বলেছিল, “পাঠিয়ে দিন একবার, যদি অন্য কোনও কাজে লাগানো যায়!” মনে-মনে ভাবে জুতসই অজুহাত তো মজুত, কাটিয়ে দিলেই হল। আর যা-ই হোক, কম্পিউটর ইঞ্জিনিয়ার তো নয়।

নিধি হেঁটে এল এক দমকা হাওয়ার মতো। আফরোজ়ের চেম্বারে ইন্টারভিউ হল পনেরো মিনিট। মার্কেটিং-এর অনুশ্রী, সফটওয়্যার আর পার্সোনেল সেকশনের অঞ্জনদা আর আফরোজ় নিজে ছিল ইন্টারভিউ বোর্ডে। টুঁ শব্দটি কেউ করতে পারল না ওকে ‘না’ বলে দেওয়ার ব্যাপারে। সব রকম কাজ করতে এবং যে-কোনও শর্তে রাজি, স্যালারি আপনারা যা দেবেন, ছ’মাস পরে রিভিউ করবেন প্যাকেজের ব্যাপারে।

“ওর এক্সপার্টিজ় যদি কাজে না-ও লাগাই, স্রেফ মার্কেটিং আর ম্যানেজমেন্টেই মাত করে দিতে পারে এই মেয়ে। ওর হাজার ওয়াটের হাসি আর পজ়িটিভিটিই হয়ে উঠতে পারে যে-কোনও কর্পোরেট কোম্পানির অ্যাসেট।” তাই বহাল হল নিধি অগ্রবাল। অনুশ্রী বলল, “আমার সঙ্গে জুড়ে দিন স্যার, ক’দিন শিখুক মার্কেটিংটা।”

অঞ্জন আবার চায় নতুন একটা উইং খুলতে, হোক না সেটা টেক্সটাইল ডিজ়াইনিং। “আমাদের অনেক অফার আসে স্যার। আমরা ইন্টারেস্ট দেখালে কাজের অভাব হবে না।” অঞ্জনদা এই ‘ড্রিমলাইনার’ অফিসটার নিউক্লিয়াস। সাদামাটা গোবেচারা ধরনের দেখতে। আফরোজ়ের চার বছর সিনিয়র, একই সাবজেক্ট। কম্পিউটর ইঞ্জিনিয়ারিং যাদবপুর ইউনিভার্সিটির। কাজে দক্ষ, কিন্তু ব্যক্তিগত উচ্চাশা নেই।

বছর আটেক আগে আফরোজ় একদিন বলল, “অঞ্জনদা, আমাদের নিজেদের একটা কোম্পানি খুললে হয় না!”

“তুমি উদ্যমী ছেলে। অন্যের কোম্পানিতে কাজ করতে যে তুমি জন্মাওনি সেটা মাসখানেক পর থেকেই আমরা ক’জন বলাবলি করছি। তা-ও তুমি চার বছর কাটিয়ে দিলে এখানে, এটাই যথেষ্ট।’’ নামকরা একটা আইটি কোম্পানির সেকশন সিনিয়র অঞ্জন সেনগুপ্ত আফরোজ়কে সেদিন উত্তর দিয়েছিল, “তুমি যদি ঠিকঠাক ভাবে কাজ দাও তো আমি আছি তোমার সঙ্গে। তবে ওটা হবে তোমার কোম্পানি, আমি তোমার এমপ্লয়ি হতে রাজি।”

বাগুইআটিতে ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে ‘ড্রিমলাইনার’ খুলল আফরোজ় হুসেন। সঙ্গে আনল অল্ হারাম আর খাজা মইনুদ্দিন চিশতির দরগার ফ্রেমে বাঁধানো ফোটো, টাঙিয়ে দিল ওর বসার চেয়ারের মাথার উপর।

কাল সন্ধ্যায় ফোন করেছিল মৈনাক। অনেকদিন পর হঠাৎই। টুকটাক কথা বলার পর বলল, “তোর মাথাটা শালা আর কাজ করছে না! চল না ক’দিন সুন্দরবন ঘুরে আসি। আমি অর্গ্যানাইজ় করছি, তোকে হিসেবে ধরছি কিন্তু,” আফরোজ় কোনও জবাব দেওয়ার আগেই ফোন কেটে দিল মৈনাক।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%