প্রচেত গুপ্ত
“ভোঁ, ভোঁ, ভোঁ…।”
“এটা কীসের আওয়াজ?”
“স্যার, এটা স্টিমারের আওয়াজ।”
“পরেরটা কর।”
“গুমগুম, গুমগুম, গুমগুম।”
“এটা?”
“এটা মেট্রো রেল।”
“তারপর?”
“শাঁই-ই-ই, শাঁই-ই-ই, শাঁই-ই-ই।”
“এটা প্লেন?”
“না স্যার, প্লেন নয়, এটা হোভারক্রাফট।”
“হোভারক্রাফট কী?”
“জলেও চলে, মাটিতেও চলে স্যার। ক্যাঁ-অ্যা-আ-অ্যা-চ৷”
“এটা গাড়ি চলছে?”
“না, গাড়ি চলছে না, গাড়ি ব্রেক কষল।”
হাতের স্লেটটা খাটের উপর নামিয়ে চুপ করে বসে রইলেন সুশীলবাবু। তাঁর একপাশে কাগজের তাড়া, নোটবই আর একটা স্লেট। অন্য পাশে একটা ঘণ্টা। বড় নয়, ছোট পুজোর ঘণ্টা। নাড়লে টুং টুং করে বাজছে।
এসবের ব্যবস্থা কল্যাণ করে গিয়েছে। বলে গিয়েছে “জামাইবাবু, যতক্ষণ না আপনার এই কোকিল-অসুখ সারছে, ততক্ষণ আপনাকে অলটারনেটিভ সিস্টেমের মধ্যে দিয়েই যেতে হবে।”
“অলটারনেটিভ সিস্টেম! সেটা আবার কী? কুহু।” ভুরু কুঁচকে তাকালেন সুশীল পাত্র।
কোকিলের ডাক শুনে আবার ফিচ করে হেসে ফেলল কল্যাণ। গুরুগম্ভীর একটা মানুষ কথায় কথায় সুরেলা গলায় ‘কু-কু’ করলে হাসি না পেয়ে উপায় কী? হাসি মুখেই সে বলল, “অলটারনেটিভ সিস্টেম হল, বিকল্প ব্যবস্থা। কথা বলবার বিকল্প ব্যবস্থা। আপনি তো মানুষের সঙ্গে কোকিলের ভাষায় কথা বলতে পারবেন না। কোকিলের ভাষা শুধু কোকিলই বুঝবে। তাই না?”
সুশীলবাবুর মাথা ঝাঁ-ঝাঁ করে উঠল। ইচ্ছে করল বিচ্ছু ছেলেটিকে ধরে একটা চড় লাগান। তিনি চোখ পাকিয়ে কল্যাণের দিকে তাকালেন।
কল্যাণ সেই পাকানো চোখকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে বলল, “কেউ যদি আপনার এই কুহুধ্বনি শোনে, মারাত্মক ঘাবড়ে যাবে। সামনে থেকে শুনলেও ঘাবড়াবে, আড়াল থেকে শুনলেও ঘাবড়াবে। কুহু-কুহু ডাক বাগানে মানায়, বেডরুমে নয়। এই যেমন আপনার বাড়ির রান্নার, মেয়ে, খবরের কাগজের হকার, দুধের সাপ্লায়ার যদি ঘটনা জানতে পারে, কী হবে? তারা ভয়ে সবাই কাজ ছেড়ে পালাবে। সেটা দিদির পক্ষে খারাপ হবে। বেচারির উপর প্রচণ্ড চাপ পড়বে। সুতরাং এখন আপনাকে যতটা সম্ভব চুপ করে থাকতে হবে জামাইবাবু। একদম স্পিকটি নট যাকে বলে। আপনার উপস্থিতিতে ক্লাসে ছেলেদের যেরকম অবস্থা হয়, সেরকম।”
নমিতাদেবী ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কাঁচুমাচু গলায় বললেন, “তা হলে কী হবে কলু?”
কল্যাণ হেসে বলল, “কী আর হবে দিদি? কেউ এলে তুই বলে দিবি, জামাইবাবুর ভোকাল কর্ডে ইনফেকশন হয়েছে। কু-কু-জ ইনফেকশন। ডাক্তারবাবু অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছেন। খাওয়ার পর দিনে তিনটে করে। দু’বেলা নুন জলে গার্গল চলছে। ক’দিন কথা বলা একদম বারণ। উনি লিখে লিখে কথা বলবেন। যাওয়ার আগেই আমি সে ব্যবস্থা করে যাচ্ছি।”
সুশীলবাবু ভুরু কোঁচকালেন। লিখে-লিখে কথা! এই ছেলে তো বিরাট ঝামেলা শুরু করে দিয়েছে। এখনই উচিত সমকোণী চৌপল আর লম্বা বৃত্তাকার চোঙ মেশানো একটা অঙ্ক দিয়ে একে বসিয়ে দেওয়া। ঠেলা বুঝবে তখন। জামাইবাবুকে লিখে কথা বলার জ্ঞান দেওয়া বেরিয়ে যাবে।
কল্যাণ পেরিয়ে গিয়ে মোড়ের দোকান থেকে একগাদা কাগজ, একটা নোটবই, দুটো বাঁধানো খাতা, একটা স্লেট, হাফ ডজন চক আর ডাস্টার কিনে আনল।
“এই নিন জামাইবাবু। এগুলো সঙ্গে রাখুন। খাতা, পেন, স্লেট, যখন যেটা খুশি ব্যবহার করবেন। ছোট ছোট বাক্যে লিখবেন। যেমন ধরুন, মান্যিগন্যি কেউ আপনার সঙ্গে দেখা করতে এল, আপনি তখন লিখলেন, ‘নমস্কার বসুন। কেমন আছেন? চা খাবেন?’ ছাত্ররা এলে লিখবেন, ‘চোপ, চড় খাবি, কান ধরে ওঠবোস কর।’ গলায় একটা মাফলার জড়িয়ে নিন। মাফলার দিলে ইনফেকশনের গল্পটা বিশ্বাসযোগ্য হবে। দিদি তোর কাছে ঘণ্টা আছে?”
নমিতাদেবী অবাক হয়ে বললেন, “ঘণ্টা! কীসের ঘণ্টা? স্কুলের?”
সুশীলবাবু এবার উঠে দাঁড়ালেন। ছেলেটা তো খুব বাড়িয়েছে। চক-ডাস্টারের পর ঘণ্টা! কল্যাণ হাসতে হাসতে বলল, “আরে বাবা, সেরকম ঘণ্টা নয়। পুজোর জন্য একটা ছোট ঘন্টা ছিল না তোদের? সেটা তুই জামাইবাবুর কাছে রেখে দে। বেলের মতো কাজ করবে। ঘণ্টা নাড়লে তুই চলে আসবি। কেমন প্ল্যান?”
ঘণ্টা শুনলে ছুটে আসবার পরিকল্পনা একেবারেই পছন্দ হল না নমিতাদেবীর। তবু তিনি ঘণ্টা এনে দিলেন। কল্যাণ চলে যাওয়ার সময় শুকনো মুখে জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যাঁ রে, কিছু বুঝলি?”
কল্যাণও গম্ভীর মুখে বলল, “হাসি-ঠাট্টা করলাম বটে, কিন্তু অবস্থা মোটেই ভাল নয়। এখনই চিকিৎসার প্রয়োজন। তবে কাঞ্চনগড়ের ডাক্তার দেখিয়ে লাভ হবে না। উলটে ঘটনা ছড়িয়ে একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার হয়ে যাবে। কলকাতায় নিয়ে গিয়ে বড় ডাক্তার দেখাতে হবে। খুব তাড়াতাড়ি দেখাতে হবে। রক্ষে একটাই, ডাকটা সব সময় হচ্ছে না। কোনও কোনও সময় হচ্ছে। ওই সময়টা ধরতে পারলে হত!”
নমিতাদেবী কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, “কীসের বড় ডাক্তার দেখাবি কলু? গলার?”
কল্যাণ বলল, “শুধু গলার কেন হবে? মাথার ডাক্তারও হতে পারে। আমার মনে হয়, জামাইবাবু কাজটা ইচ্ছে করে করছেন।”
“ইচ্ছে করে! ওমা! ইচ্ছে করে করবেন কেন?”
“সেটা জানি না। যাক, তুই চিন্তা করিস না দিদি! ব্যাপারটা আমার উপর ছেড়ে দে।”
সুশীলবাবু কল্যাণের পরিকল্পনা মতোই চলেছেন। লিখে কথা বলছেন, গলার মাফলার জড়িয়ে বসে আছেন। খয়েরি রঙের বদখত এই মাফলারটা একেবারেই সুবিধের নয়। কুটকুট করে। তবু জড়িয়ে আছেন। নমিতাদেবীকে ঘন ঘন ঘণ্টা বাজিয়ে ডাকছেন। দরজার ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে বাজাচ্ছেন, টিং, টিং-টিং…। সাড়া দিতে দেরি হলে ঘণ্টা নাড়ছেন জোরে। নমিতাদেবী এতে খুবই বিরক্ত। ঘণ্টা বাজিয়ে ডাকাটা তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না। অথচ উপায়ও নেই। মায়া রান্না সেরে বাড়ি যায় অনেক রাতে। কাজ শেষ হয়ে গেলে ড্রয়িংরুমে মোড়া টেনে বসে টিভিতে পরপর দু’-দু’টো সিরিয়াল দেখে। এই মেয়ের আবার কৌতূহল বড্ড বেশি। ইতিমধ্যে সে নমিতাদেবীকে জিজ্ঞেস করেছে, “দাদা, এমন ঘণ্টি বাজায় কেন?”
নমিতাদেবী সতর্ক হয়ে বললেন, “উফ মায়া, তোমাকে বললাম না গলায় ব্যথা হয়েছে? এর মধ্যে ভুলে গেলে? ডাক্তারকে আমার ভাই টেলিফোন করেছিল। তিনিই বলেছেন।”
মায়া চোখ বড় করে বলল, “ঘণ্টি বাজাতে বলেছে! বউদি, গলায় ব্যথা হলে হাতে ঘণ্টি বাজাতে হয় এমনটা তো কখনও শুনিনি?”
নমিতাদেবী আরও সাবধান হলেন। শান্ত গলায় বললেন, “তা নয়, ডাক্তারবাবু কথা বলতে বারণ করেছেন। সেই জন্য তোমার ঘণ্টি বাজিয়ে ডাকাডাকি করছেন। তাঁকে কাগজ, স্লেটও এনে দেওয়া হয়েছে। কল্যাণই এনে দিয়েছে। ইস, ছেলেটার একগাদা খরচ হয়ে গেল!”
খুন্তি নাড়ানো বন্ধ করে মায়া আঁতকে উঠে বলল, “অ্যাঁ, স্লেট! অত বড় মানুষটাকে স্লেট এনে দেওয়া হয়েছে? বলেন কী বউদি!”
নমিতাদেবী এবার চাপা গলায় ধমক দিলেন। বললেন, “আঃ, সেই স্লেট নয়, তুমি থামো দেখি মায়া। উনি স্লেটে লেখাপড়া করছেন না, লিখে লিখে কথা বলছেন।”
“কথা! কী কথা?”
“কী কথা আবার। খাতা কই? পাটিগণিত বইটা কোথায় রাখলাম? এই সব কথা। তোমার মতো ডাল, আলুভাজার কথা তো উনি বলবেন না। উনি অঙ্কের মাস্টার, অঙ্কের কথা বলবেন।”
মায়া চুপ করে গেলেও নমিতাদেবী বুঝলেন, এই মেয়ে আরও ঝামেলা করবে। আচ্ছা, একে ক’টা দিন ছুটি দিয়ে দিলে কেমন হয়? রান্না নিজেই সামলে নেওয়া যাবে। মন-মেজাজ ভাল নেই। এই অবস্থায় খাওয়া-দাওয়ার ইচ্ছেও চলে গিয়েছে। রান্না অল্প একটু করলেই চলবে। অসুবিধে কিছু হবে না। কিন্তু কাজটা কি ঠিক হবে? মায়া যদি সন্দেহ করে? যদি কেন, নিশ্চয়ই করবে। কথা নেই বার্তা নেই, হুট বলতে দু’দিন ছুটি! না থাক, ঝুঁকি নিয়ে দরকার নেই।”

শোবার ঘরের দরজায় আবার ঘণ্টি বেজে উঠল, “টিং টিং টিং…।”
নমিতাদেবী দ্রুত পায়ে এসে বললেন, “এতবার ঘণ্টা বাজাচ্ছ কেন?”
সুশীলবাবু রেগে গিয়ে বললেন, “তা হলে কী করব? তোমার বিচ্ছু ভাই তো ঘণ্টার কথাই বলে গেল। কুহু-কুহু।”
নমিতাদেবী রাগ করে বললেন, “আমার ভাইকে নিয়ে কিছু বলবে না কিন্তু। সে কী করেছে? পাখির ডাক তো সে ডাকছে না, তুমি ডাকছ।”
সুশীলবাবু আরও রেগে গেলেন। তিনি পায়চারি করতে করতে বললেন, “কুহু-কুহু-কুহু। আমি ডাকছি মানে? তুমি এমন করে বলছ যেন আমি ইচ্ছে করে কুহু-কুহু-কুহু…।”
নমিতাদেবী তাড়াতাড়ি মুখে হাত দিয়ে বললেন, “এই চুপ চুপ। আস্তে বলো। মায়া কিন্তু কান খাড়া করে আছে। ইচ্ছে করে না তো কী, তুমি কী বলতে চাইছ, সত্যি সত্যি তোমার গলায় কোকিল ঢুকেছে? তা ছাড়া তুমি অমনভাবে ঘরময় পায়চারিই বা করছ কেন? কীরকম একটা লাগছে।”
সুশীলবাবু থমকে দাঁড়ালেন। ঘাড় ঘুরিয়ে স্ত্রীর দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে বললেন, “কেমন লাগছে?”
“মনে হচ্ছে, সত্যি সত্যি তুমি একটা খাঁচার পাখি। খাঁচার মধ্যে একবার এদিক, একবার ওদিক করছ।”
কথা শেষ করে নমিতাদেবী মুখে শাড়ির আঁচল চাপা দিয়ে হাসলেন। সুশীলবাবু আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। খুব জোর একটা ধমক দিতে গেলেন। একেবারে ঘর ফাটিয়ে ধমক। কিন্তু গলা দিয়ে সেই ধমক বের হল না। বের হল, ‘কুহু-কুহু-কুহু…’। ভারী সুন্দর! খুব সুরেলা সেই ডাক।
সুশীলবাবু ধপাস করে জানলার পাশের চেয়ারটায় বসে পড়লেন। বসেই রইলেন অনেকক্ষণ। আর বা রাগ বিরক্তি নয়, হতাশ লাগছে। অঙ্কের মাস্টার যদি ধমক দেওয়ার বদলে সুরেলা গলায় ডেকে ওঠেন, তখন হতাশ হওয়া ছাড়া আর উপায় কী? তা ছাড়া খানিকক্ষণ হল সুশীলবাবু লক্ষ করেছেন, রেগে গেলে, উত্তেজিত হলে ডাকটা যেন বেশি করে হচ্ছে। এটা কেন? রাগের সঙ্গে পাখির ডাকের কী সম্পর্ক? পাখি কি রাগতে পারে?
নমিতাদেবী বললেন, “চা খাবে? আদা-চা খাও এক কাপ, গলায় আরাম পাবে?”
সুশীলবাবু আবার রেগে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলালেন। না, শান্ত হতে হবে। মাথা ঠান্ডা করতে হবে। রাগলে হতচ্ছাড়া ডাকটা পেয়ে বসছে যেন! তিনি এরপর নিচু গলায় স্ত্রীকে অর্কর কথা বললেন।
অর্ক কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলের ক্লাস এইটের ছাত্র। নাম অর্ক হলেও স্কুলের সকলে তাকে ‘হরবোলা অর্ক’ বলে চেনে। হরবোলারা মুখ দিয়ে খুব সুন্দর পশু-পাখির ডাক নকল করে। সিংহের গর্জন, কুকুরের ঘেউ ঘেউ থেকে শুরু করে কাকের কা কা, শালিকের ঝগড়া পর্যন্ত অনেক কিছু পারে। অর্ক ঠিক কী কী আওয়াজ করতে পারে সুশীলবাবু জানেন না, তবে অনেক কিছু পারে সেটা শুনেছেন। একবার ভূগোল ক্লাসে সে নাকি ঝামেলা পাকিয়ে ছিল। ভূগোলস্যার সেদিন নদ-নদীর উৎস এবং গতিপথ পড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ শোনা গেল ছলাৎ ছলাৎ… ঠিক যেন নৌকো চলছে! জলের উপর বইঠার আওয়াজ ছলাৎ-ছলাৎ…! ভূগোলস্যার চমকে পড়া থামিয়ে দিলেন। খোঁজ খোঁজ। কে এমন করছে? অল্পক্ষণের মধ্যেই ধরা পড়ে গেল হরবোলা অর্ক। বইয়ের ভিতর মুখ লুকিয়ে নৌকো চালাচ্ছে। স্যার চোখ পাকিয়ে বললেন, “কেন করলি?”
অর্ক কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, “স্যার, আপনি নদী পড়াচ্ছেন বলে নৌকো করলাম। সমুদ্র নিয়ে পড়ালে জাহাজের ভোঁ দিতাম।”
ভূগোলস্যার হেসে ফেলেছিলেন।
এই হাসির খবর শুনে সেদিন খুবই বিরক্ত হয়েছিলেন সুশীলবাবু। এটা যদি তাঁর ক্লাসে হত, তা হলে ওই ছেলেকে তিনি অবশ্যই সারাদিন বসিয়ে রেখে এক হাজার গুণ-ভাগ করাতেন। হরবোলাগিরি পালাবার পথ পেত না! কিন্তু আজ কেন জানি হরবোলা ছেলেটির কথা বারবার মনে পড়ছে। ওই ছেলে কি পাখির ডাকও ডাকতে পারে? কোকিলের ডাক? ডাকলে কেমন করে ডাকে? এমনও তো হতে পারে তাঁর নিজের মধ্যেও হঠাৎ করে হরবোলা হওয়ার ক্ষমতা দেখা দিয়েছে। হতে পারে না? এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই ওই অর্ক দিতে পারবে। মুখ থেকে নানা ধরনের আওয়াজ করার ক্ষমতা তার কীভাবে হয়েছিল? নিজে থেকে হঠাৎ একদিন? নাকি শিখতে হয়েছে? ওকে এখনই ডেকে পাঠাতে হবে। যতদূর মনে পড়ছে, অর্কর বাড়ি বেশি দূরে নয়। বাজারের কাছাকাছি কোথাও একটা হবে।
সুশীলবাবুর কথামতো নমিতাদেবী মায়াকে ডেকে বললেন, “তোমার দাদাবাবুর এক ছাত্রকে খবর দিতে হবে। বলবে স্কুল ছুটির পর সে যেন একবার তার অঙ্কস্যারের বাড়ি ঘুরে যায়। ওই ছেলেটি কাছেই থাকে। বাজারের মুখে হরবোলা অর্কর বাড়িটা কোথায় জিজ্ঞেস করলেই সকলেই দেখিয়ে দেবে।”
মায়া চোখ-মুখ কুঁচকে বলল, “কী অর্ক?”
নমিতাদেবী গলা আরও নামিয়ে বললেন, “আস্তে কথা বলো। হরবোলা, হরবোলা অর্ক। আরে বাবা, ওই যে মুখ দিয়ে পশু-পাখির ডাক দেয় না?”
মায়া শাড়ির আঁচলে হলুদ মাখা হাত মুছে একগাল হেসে বলল, “চিন্তা করবেন না। এক্ষুনি যাচ্ছি।”
আসলে মায়া ভিতরে ভিতরে খুবই উত্তেজনা অনুভব করছে। মজার উত্তেজনা। এ বাড়িতে অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটছে। বাড়ির কর্তা এই গরমে গলায় একটা কুটকুটে মাফলার জড়িয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে আছেন। মাঝেমধ্যে বন্ধ দরজা ফাঁক করে পুরুত ঠাকুরের মতো ঘণ্টা বাজাচ্ছেন। সেই আওয়াজ শুনলেই গিন্নি পড়ি মড়ি করে ঘরের দিকে ছুটছেন। কাকভোরে গিন্নির ভাই তার বৃদ্ধ জামাইবাবুর জন্য স্লেট কিনে নিয়ে এসেছে। আর এখন সে যাচ্ছে হরবোলার খোঁজে। এর পরে উত্তেজনা না হলে আর কবে হবে?
সেই হরবোলা অর্ক এখন ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে সে যখন খবর পেল, অঙ্কস্যার বাড়িতে ডেকেছেন, তখন থেকেই তার ডান পায়ের হাঁটু কাঁপতে শুরু করল। প্রায় আধঘণ্টা হতে চলল সেই কাঁপা থামেনি। এখানে পৌঁছতেই স্যারের স্ত্রী তাকে একপাশে ডেকে নিয়ে গলা নামিয়ে বললেন, “শোনো বাবা, তোমাদের স্যারের গলায় একটা সমস্যা হয়েছে। মনে হয় ঠান্ডা লেগেছে, গরমও লাগতে পারে। অনেক সময় বেশি গরমেও সমস্যা হয়। যাই হোক, ক’টা দিন ওঁর কথা বলা বারণ। উনি এখন লিখে লিখে কথা বলছেন। যাও, তুমি ভিতরে যাও! যা জানতে চাইবেন তার উত্তর দেবে ভেবেচিন্তে। একদম ভয় পাবে না। ভয়ের কিছু নেই।”
অর্ক কাঁদো কাঁদো গলায় জিজ্ঞেস করল, “স্যার কি বকবেন?”
নমিতাদেবী বললেন, “বকতে পারেন। তবে লিখে বকা তো, খুব একটা জোরে হবে বলে মনে হয় না।”
ঘরে ঢুকে বেজায় ঘাবড়ে গেল অর্ক। সে বুঝতে পারল, একটা নয়, তার দু’টো পায়ের হাঁটুই কাঁপছে। এ কী কাণ্ড রে বাবা! মানুষটির কী হয়েছে? সুশীল পাত্র তার দেখা সবচেয়ে রাগি মানুষ। শুধু তার নয়, তাদের ক্লাসের সকলেই এ বিষয়ে একমত। যে মানুষটি কথা বললেই মনে হয় গরগর করে বাঘ ডাকছে, তিনি মাফলার, হাতে স্লেট! ভয়ংকর ধরনের কোনও অঙ্ক বানাচ্ছেন না তো? ঘণ্টার শব্দতরঙ্গের সঙ্গে মাফলারের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ জড়িয়ে কোনও অঙ্ক? হতে পারে। সুশীলস্যার অঙ্ক দিয়ে ছেলেদের ফাঁদে ফেলার জন্য সবকিছু করতে পারেন। ফাঁদে ফেলার জন্য শুধু মাফলার কেন, সেরকম হলে এই গরমে উনি কম্বল মুড়ি দিয়েও বসতে পারেন।
সুশীলস্যার স্লেটে লিখলেন, “অর্ক, আমি লিখে লিখে প্রশ্ন করব, তুমি মুখে মুখে জবাব দেবে, কেমন?”
নার্ভাস অর্ক একপাশের বদলে দু’পাশেই মাথা নাড়ল।
অঙ্কস্যার লিখলেন, “তুমি নাকি মুখ দিয়ে আওয়াজ করতে জানো?”
অর্ক বাঁ হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলল, “পারি স্যার, আর কখনও করব না।”
সুশীলবাবু ডাস্টার দিয়ে স্লেট মুছে আবার লিখলেন, “আমাকে কয়েকটা শোনাতে পারবে?”
অর্ক কাঁপা গলায় বলল, “পারব স্যার! ভয় করছে!”
অঙ্কস্যার লিখলেন, “ভয় পেয়ো না!”
এটা খুবই ভয়ের কথা। অর্কর অভিজ্ঞতা বলছে, রাগি মানুষ ‘ভয় পেয়ো না’ বলা মানে বেশি ভয়ের। অভয় দিয়েই তারা বড় বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়। এবারও হয়তো তাই হবে। মাফলার জড়ানো অঙ্কস্যার নিশ্চয়ই তাকে আয়তক্ষেত্রের পরিসীমা অথবা দৈঘ্যের সংখ্যমান সংক্রান্ত দুটো অঙ্ক দিয়ে বসিয়ে দেবেন। যাই হোক, আওয়াজের আদেশ যখন এসেছে তখন না করে উপায় কী? অর্ক মনে সাহস আনার চেষ্টা করল। সে মুখের পাশে দু’ হাত তুলে আওয়াজ শুরু করল। স্টিমার, মেট্রোরেল, হোভারক্রাফট, গাড়ির ব্রেক কষার আওয়াজ শোনার পর সুশীলবাবু স্লেট নামিয়ে অল্পক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর লিখলেন, “অর্ক, তুমি কি পাখির মতো ডাকতে পারো?”
এতক্ষণে অর্ক সহজ হয়েছে। ভয়ও কমেছে। স্যার মুখে কথা না বললেও, হাবভাবটাও অন্যরকম লাগছে। বকুনি তো দূরের কথা, রাগ দেখানোর লক্ষণও নেই। এটা একটা আশ্চর্য ঘটনা। নিয়মমতো এতক্ষণে বাজখাঁই গলায় সতেরোবার ধমক হয়ে যাওয়ার কথা। গলার কারণে ধমক না হোক চোখ পাকানো তো হতে পারত। কিন্তু সেটাও হয়নি। ব্যাপারটা সন্দেহজনক। অতি সন্দেহজনক। কোনও গোলমাল হয়েছে নাকি?
অর্ক বলল, “পারি স্যার, আমি কাক, ফিঙে, বিড়াল পারি!”
ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবলেন সুশীলবাবু। তারপর স্লেটে লিখলেন, “আর কোকিল?”
অর্ক মাথা চুলকে বলল, “না, পারি না স্যার।”
সুশীলবাবু লিখলেন, “কেন? পারো না কেন?”
অর্ক বলল, “তা জানি না স্যার। কখনও চেষ্টা করিনি। আপনি যদি বলেন, চেষ্টা করে দেখব।”
সুশীলবাবু লিখলেন, “চেষ্টা করলে কি কোকিলের ডাক শেখা যাবে?”
অর্ক উৎসাহ পেল। মনে হল, এই মানুষটি যেন সেই বদমেজাজি, ধমক দেওয়া, চোখ পাকানো অঙ্কস্যার নন! অন্য কেউ।
“কেন শেখা যাবে না? অবশ্যই শেখা যাবে। আমি তো সব চেষ্টা করেই শিখেছি স্যার। শুনে শুনে শিখেছি। তারপর কষে প্র্যাকটিস করেছি। একেবারে রাত জেগে প্র্যাকটিস। নৌকোর ছলাৎ-ছলাৎ তুলতে স্যার আমার পাক্কা এক মাস সময় লেগেছিল। গোটা গরমের ছুটিটা…।”
সুশীলবাবু মুখ ফেরালেন। এটাই তিনি জানতে চাইছিলেন। তা হলে গলা থেকে অন্যরকম আওয়াজ বের করতে হলে মানুষকে প্র্যাকটিশ করতে হয়। পরিশ্রম করতে হয়। অথচ তাঁকে কিছুই করতে হয়নি! একেবারে আচমকাই কোকিলের মতো ডাকছেন! মিষ্টি, সুরেলা ডাক! যে ডাকে তাঁর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। সে আসছে নিজের ইচ্ছেমতো। কথার আগে, পরে, মাঝখানে যখন যেখানে খুশি! ভয়ংকর!
সুশীলবাবু এবার গোটা গোটা হরফে স্লেটে লিখলেন, “অর্ক তুমি কোকিলের ডাক শিখবে। শিখে এসে শোনাবে আমাকে। এক সপ্তাহ টাইম। এটাই তোমার হোমটাস্ক। তুমি এবার যেতে পারো।”
এতক্ষণ অর্কর পা কাঁপছিল ভয়ে, এবার কাঁপতে লাগল আনন্দে। কোকিলের ডাক শেখার হোমটাস্ক! তাও আবার কে দিচ্ছেন, না খোদ অঙ্কস্যার! কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলের রাগি, খিটখিটে মেজাজের অঙ্কস্যার! কথাটা ঠিক শুনল তো? ঠিক শুনলেও ক্লাসের কেউ বিশ্বাস করবে না। অঙ্কস্যার এবার স্লেটে লিখলেন, “যাওয়ার আগে অবশ্যই দুটো রসগোল্লা খেয়ে যাবে। তোমার মাসিমা তোমার জন্য আনিয়ে রেখেছেন?”
ঘরের বাইরে এসে দুটো নয়, একেবারে চারটে রসগোল্লা নিয়ে বসল অর্ক। নমিতাদেবী তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “দেখো বাছা, আজকের এসব কথা যেন কাউকে বলতে যেয়ো না। তোমার স্যার শুনলে রাগ করবেন।”

অর্কর মুখভরতি রস। সে ঘাড় অনেকখানি কাত করল। আর ঠিক তখনই কাছাকাছি কোথায় যেন কোকিল জোরে ডেকে উঠল মিষ্টি গলায়, কুহু-কুহু…।
হরবোলা অর্ক ঠিক করল, আজ থেকেই সে কোকিলের ডাক প্র্যাকটিস করবে এবং কাল স্কুলে গিয়েই বন্ধুদের কাছে সব ঘটনা ফাঁস করে দেবে। চারটে কেন, চল্লিশটা রসগোল্লা খেলেও এমন রোমাঞ্চকর ঘটনা সে চেপে রাখতে পারবে না। এমন মনের জোর তার নেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন