প্রচেত গুপ্ত
কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলে আজ এমন একটা ঘটনা ঘটেছে যা কখনও কোনও স্কুলে ঘটেনি। স্কুলের প্রধানশিক্ষক শশাঙ্কশেখর ধর আজ পরীক্ষা দিচ্ছেন! ক্লাস এইটের অঙ্ক পরীক্ষা। তাঁর ঘরের দরজা বন্ধ। দরজার বাইরে গম্ভীর মুখে টুল পেতে বসে আছে নবলাল। গম্ভীর হওয়ার কারণ, সে এই পরীক্ষা দেখভালের দায়িত্ব পেয়েছে। পুরো দায়িত্ব নয়, শুধু সময় দেখার দায়িত্ব। একঘণ্টা পর হেডস্যারের বন্ধ দরজায় সে প্রথম টোকা দেবে। আরও দশ মিনিট পর দেবে ফাইনাল টোকা। ফাইনাল টোকা শুনে হেডস্যার খাতা বন্ধ করবেন। নবলাল এতেই বিরাট খুশি। সে মাস্টারমশাইদের জন্য চা-জল, টিফিন এনে দেয়, কিন্তু এরকম গুরুতর দায়িত্ব সে তার চাকরি জীবনে কখনও পায়নি। একটাই আপশোশ, এই মুহূর্তে স্কুলে কেউ নেই। ঘণ্টাখানেক হল স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছে। ফলে নবলালকে কেউ দেখতে পেল না।
গোলমালের শুরু আজ সকালে, হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার অঙ্কখাতা বিলি হওয়ার পর। নম্বরের অবস্থা মারাত্মক! সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ক্লাস এইটের। একেবারে বিপর্যয় যাকে বলে। অনেকেই একশোর মধ্যে তিন, চার পাঁচ করে নম্বর পেয়েছে। খাতা হাতে পেয়ে ক্লাস এইটের ছেলেরা একেবারে ভেঙে পড়েছে। ভেঙে পড়বারই কথা। যে ছেলে অন্য বিষয়ে একাশি, বিরাশি, তিরাশি নম্বর পেয়েছে, সে যদি অঙ্কে তিন পায়, তা হলে ভেঙে পড়বে না তো কী হবে? শুধু মনে ভেঙে পড়া নয়, ছেলেরা নম্বর দেখে কান্নাকাটিও জুড়ে দিল। এই নম্বর নিয়ে তারা বাড়ি ফিরবে কি করে? বাবা, মা, ছোটকাকা, কি বুঝবেন প্রশ্ন কত কঠিন এসেছিল? কিছুতেই বুঝবেন না।
শশাঙ্কশেখরবাবু পড়লেন বিরাট সমস্যায়। তাঁর কাছে ছেলেদের কান্নাকাটির খবর পৌঁছেছে। অঙ্কস্যার স্কুলে আসেননি। তিনি নিজেও অঙ্কে তেমন সড়গড় নন। সারাজীবন ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, অঙ্ক তাঁর কাছে চিরকালই ঝামেলার ব্যাপার। দূরে দূরে থেকেছেন। এদিকে অন্য মাস্টারমশাইরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা সব বিষয়ে আছেন, কিন্তু অঙ্কে নেই। কাঞ্চনগড় স্কুলে ওটি খুবই গোলমেলে জিনিস। এই স্কুলের অঙ্কস্যার আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করেন! প্রশ্ন যত দুর্বোধ্য হয় তত তিনি খুশি হন। যেন অঙ্ক নয়, কঠিন ছন্দে কবিতা লিখছেন। এ বিষয়ে অন্য মাস্টারমশাইদের কোনওরকম মতামত শুনতে তিনি নারাজ। বেশি বললে চটে ওঠেন। চোখ-মুখ লাল করে বলেন, “দেখুন মশাই, আমি কি আপনাদের বলেছি আলেকজান্ডার আর পুরুর যুদ্ধটা শক্ত না করে সহজ করে ফেলুন? একবেলাতেই হারজিতের ফয়সালা হয়ে যাক? বলেছি কখনও? নাকি বলেছি, বিপাশা আর শতদ্রু নদীগুলো অত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে না নিয়ে হাইওয়ে আর ফ্লাইওভার টপকে সোজা সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে ফেলতে হবে? আমার মুখে শুনেছেন এমন কথা? তা হলে আপনারাই বা জ্যামিতি আর বীজগণিত নিয়ে খামোকা মাথা ঘামাচ্ছেন কেন মশাই? এইজন্যই বলি, স্কুলে অঙ্ক ছাড়া আর কোনও সাবজেক্টেরই দরকার নেই।”
এই অপমানের পর আর কিছু বলা যায় না। সুতরাং অঙ্কের মধ্যে তাঁরা একেবারেই ঢুকবেন না বলে হেডস্যারকে জানিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরা কেঁদে ভাসালেও নয়।
শশাঙ্কশেখর ধর বুঝতে পারছেন কথাটা মিথ্যে নয়। গত বছরই এরকম ঘটনা ঘটেছিল। সেবার ছিল অ্যানুয়াল পরীক্ষা। নম্বর পর্যন্ত এগোল না, অঙ্ক-প্রশ্ন হাতে পেয়ে পরীক্ষার হলেই ক্লাস সিক্সের এক ছাত্র মাথা ঘুরে পড়ে গেল। হাতে প্রশ্নপত্র, মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ আওয়াজ উঠছে। মাথায় জলটল দিয়ে শান্ত করার পর জানা গেল, খাল কাটা আর জল আনা বিষয়ের একটা পাটিগণিতই এর জন্য দায়ী। অঙ্কটা ছিল এরকম—
১,৫০০ মিটারের লম্বা একটা খাল কাটার ১৭ দিনের মাথায় দেখা গেল কাজ হয়েছে তিন চতুর্থাংশ। এই কাটা অংশের অর্ধেক জল ভরতে সময় লাগল সাড়ে তিনদিন। এবার সেই কাটা খাল দিয়ে যদি একটা কুমির ঢুকে পড়ে তা হলে তার দৈর্ঘ্য কত? ঘণ্টা প্রতি তাঁর সাঁতারের গতিবেগই বা কী হবে?
সেদিনই শশাঙ্কশেখরবাবু অঙ্কস্যারকে ডেকে পাঠালেন। নবলালকে চা আনতে বলে ঠান্ডা গলায় বললেন, “আচ্ছা, এটা আপনি কী করেছেন সুশীলবাবু? একেবারে কাটা খাল দিয়ে কুমির ঢুকিয়ে দিলেন?”
সুশীলবাবু একটা লাজুক ধরনের হাসি দিয়ে বললেন, “একটা এক্সপেরিমেন্ট করলাম।”
শশাঙ্কশেখরবাবু চোখ কপালে তুলে বললেন, “এক্সপেরিমেন্ট!”
মুখের হাসি মুছে ভারী গলায় সুশীল পাত্র’র উত্তর, “হ্যাঁ, এক্সপেরিমেন্ট। অঙ্কের সঙ্গে বাংলা প্রবাদ মেশানোর এক্সপেরিমেন্ট। শশাঙ্কবাবু, আপনি তো জানেনই, খাল কেটে কুমির আনা খুবই প্রচলিত একটা প্রবাদ। পরের বছর অঙ্কে হিস্ট্রিও ঢোকাব ভাবছি!”
শশাঙ্কশেখরবাবু আঁতকে উঠলেন। মানুষটা কী শুরু করেছেন!
“হিষ্ট্রি! ম্যাথমেটিক্সে হিস্ট্রি ঢোকাবেন মানে?”
সুশীলবাবু উদাসীন ভঙ্গিতে বললেন, “মানে আর কী? কিছুই নয়। মমির বয়স দিয়ে একটা অনির্দিষ্ট সংখ্যার অ্যালজেব্রা যদি করা যায়। অনির্দিষ্ট সংখ্যা কাকে বলে জানা আছে? ধরুন, একটা মমির বয়স ধরলাম এক্স বছর…।”
হেডমাস্টারমশাই হাত তুলে থামালেন। বললেন, “থাক, অ্যালজেব্রাটা না হয় পরেই শিখব সুশীলবাবু, তার আগে বরং যে কারণে আপনাকে আজ ডেকেছি, সেটা সেরে ফেলি। আপনি নিশ্চয়ই জানেন আপনার অঙ্ক-প্রশ্ন হাতে নিয়ে আজ ক্লাস সিক্সের একটি ছেলে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছে। দেখুন, আপনি সিনিয়র টিচার, আপনাকে এই বিষয়ে কিছু বলা ঠিক নয়, কিন্তু আজ না বলে পারছি না। পরীক্ষায় এরকম মাথা ঘোরা প্রশ্ন না দিলেই কি নয়? ছেলেদের পাশ তো করতে হবে। তাই না?”
সুশীলবাবু গমগমে গলায় বললেন, “অঙ্কে সকলেই পাশ করবে এরকম আপনি ভাবলেন কেন শশাঙ্কবাবু? সত্যি আমার মনে হচ্ছে, বেশি সংখ্যক ছেলের অঙ্কে ফেল করাটাই ভাল।”
শশাঙ্কশেখরবাবু চোখ কপালে তুলে বললেন, “মানে? ফেল করা ভাল মানে? আপনি কী বলছেন আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আপনি চাইছেন, ছেলেদের রেজাল্ট খারাপ হোক!”
নাক-মুখ দিয়ে ফোঁস-ফোঁস করে দু’টো আওয়াজ করলেন সুশীলবাবু। একটা বিরক্তি, একটা রাগ। বললেন, “না বুঝতে পারাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আপনি যদি আমার মতো সর্বক্ষণ অ্যালজেব্রা, অ্যারিথমেটিক্স, জিওমেট্রির মধ্যে থাকতেন, আপনিও বিষয়টা জলের মতো বুঝতে পারতেন। কঠিন বিষয় বুঝতে হলে সর্বক্ষণ অঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়, পৃথিবীর সব জটিল বিষয়ের সমাধানই অঙ্ক। যাই হোক, ইদানীং আমার মনে হচ্ছে, ছেলেরা যত অঙ্ক ভুল করে তাদের অঙ্কের প্রতি আগ্রহ তত বাড়ে। সেই আগ্রহ থেকে তৈরি হয় আকর্ষণ। আকর্ষণ তুলে আনে জেদ। আর সেই জেদই তাদের এক সময় এগিয়ে নিয়ে চলে। আজ যেটা ফেলিয়োর দেখছেন, সেটাই একদিন হবে পিলার অফ সাকসেস।”
হেডমাস্টার বিরক্ত হলেন। বিরক্তি গোপন করে বললেন, “দেখুন, এত বড় কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। মনে হয় না ছেলেরাও বুঝতে পারবে।”
সুশীলবাবু বাজখাঁই গলায় বললেন, “আসল ঘটনাটা তা হলে আপনাকে জানিয়ে রাখি। ক্লাস সিক্সের ছেলেগুলো অঙ্কে খুবই চৌকশ। আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, মাঝেমধ্যে একম হয়। এক-একটা ক্লাসে গাদাখানেক ভাল ছেলে জুটে যায়। অন্য সময় পাজিগুলো হাড়জ্বালিয়ে খায়, কিন্তু লেখাপড়ায় দুর্দান্ত। এরাও সেরকম। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে যেভাবেই অঙ্ক দিই না কেন, বিচ্ছুগুলো বেশিরভাগ সময়ই ঝটপট করে ফেলে। তাই এবার প্রশ্ন তৈরির সময় আমি ঠিক করেছিলাম, এদের সহজে ছাড়ব না। সেই জন্যই চাপ দিয়েছি। ভবিষ্যতে এই চাপ আরও বাড়বে। এখন একজন মাথা ঘুরে পড়েছে, তখন ক্লাসসুদ্ধ সকলে মাথা ঘুরে পড়বে।”
এই মানুষের অঙ্ক পরীক্ষার দায়িত্ব অন্য শিক্ষকরা নেবেন কী করে? তবে প্রধানশিক্ষককে তা বললে চলে না। তাঁকে সকলের দায়িত্বই নিতে হয়। ছেলেদের কান্নাকাটি থামাতে হয়। ভাল হত যদি সুশীলবাবু নিজে থাকতেন। তাঁকে দিয়েই একটা সমাধানের পথ বের করা যেত। সবচেয়ে বড় কথা হল, প্রশ্ন কতটা কঠিন হয়েছে সেটা আগে জানা। শুধু ছেলেরা বললেই তো হবে না, শিক্ষককেও বলতে হবে। সে চেষ্টাও হয়েছে, লাভ হয়নি। অঙ্কস্যারের বাড়িতে ফোন বেজে গিয়েছে। সুশীলবাবু মোবাইল ফোন রাখেন না। মোবাইল ফোন নাকি মনঃসংযোগ ব্যাহত করে। বাধ্য হয়ে নবলালকে তাঁর বাড়িতে পাঠানো হল। সুশীলবাবু নেই। স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতায় ডাক্তার দেখাতে গিয়েছেন। তার উপর নবলাল সুশীলবাবুর বাড়ি থেকে ফিরে এসে যে খবর বলেছে তার কোনও মাথামণ্ডু নেই। মাথামুণ্ডুহীন সেই খবর দিয়েছে সুশীলবাবুর বাড়ির রান্নার মেয়ে। স্কুলে পিয়নের পদে কাজ করার কারণে সব মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতেই নবলালের যাতায়াত আছে। হাজারটা কাজে যেতেই হয়। মাস্টারমশাইদের বাড়ির কাজের লোকদের সঙ্গেও তার চেনাজানা বিস্তর। অঙ্কস্যারের বাড়ির রান্নার মেয়েকেও সে চেনে। সেই মেয়ে নাকি সুশীলবাবুর ডাক্তারের কাছে যাওয়ার খবর দিতে গিয়ে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ফিকফিক করে হেসেছে। এতেই সন্দেহ হয় নবলালের। সে কড়া গলায় বলে, “হাসছ কেন? অসুস্থ স্যার ডাক্তারের কাছে গিয়েছেন, আর তুমি হাসছ! ডাক্তারের কাছে যাওয়াটা কি কোনও হাসির ঘটনা?”
মেয়েটি তখন আরও হাসতে থাকল। বলল, “অবশ্যই হাসির ঘটনা। এ তো আর জ্বর, পেটব্যথা নয়, কোকিল-অসুখ নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে হাসব না তো কী করব? কাঁদব? ডাক্তারও হাসবে। ঠিক হয়েছে, বেশ হয়েছে। সেদিন আমাকে পর্যন্ত অঙ্ক নিয়ে পাকড়াও করেছিল। ধমক দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা মায়া, তিনটে পটল আর দু’টো ঝিঙে সমান যদি একটা কাঁচকলা আর আড়াই খানা বেগুন হয়, তা হলে কতটা বরবটি আর শিম নিলে…’ মাসিমা এসে তাড়াতাড়ি বাঁচাল। বলল, ‘ওকে অঙ্ক বলছ কেন? মায়া কি তোমার ইস্টুডেন্ট?’ যাক, এখন বোঝো ঠেলা। কোকিল-অসুখ নিয়ে গলায় মাফলার লাগিয়ে বসে থাকো দরজা-জানলা আটকে। আর সকাল-সন্ধে গলা বের করে ডাক দাও। অন্যকে ধমক-ধামক দেওয়া আর অঙ্কের কাদায় ফেলার সাজা টের পাও।”
নবলাল চোখ বড় বড় করে বলল, “কোকিল-অসুখ! সেটা আবার কী?”
মায়া চট করে চারপাশ দেখে নিয়ে গলা নামিয়ে বলল, “কী বলতে পারব না। তবে লক্ষণ ভাল নয়। খুবই খারাপ। আজকাল মাঝেমধ্যেই তোমাদের স্যারের হাঁড়িচাঁচার মতো গলা থেকে কোকিলের ডাক শোনা যাচ্ছে গো! আমি নিজে শুনেছি। সর্বক্ষণ মানুষটার ঘর বন্ধ। এই গরমেও গলায় একটা মাফলার জড়িয়ে, হাতে স্লেট-পেনসিল নিয়ে বসে আছে।”
নবলালের এবার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়, “স্লেট-পেনসিল! অঙ্কস্যার স্লেট-পেনসিল নিয়ে কী করছেন?”
“বিশ্বাস না হলে নিজের চোখে এসে দেখে যেয়ো। যাতে মুখে কথা বলতে না হয় তার জন্য লেখালেখির ব্যবস্থা। কাগজ-পেনও আছে। তবে আমি বন্ধ দরজায় কান পেতে সব শুনে নিয়েছি।”
“কী শুনেছ?”
“শুনেছি, উনি একটা করে কথা বলেন আর দু’টো করে ডাক মারেন, কু-কু, কু-কু। স্কুলের একটা ছেলেকেও তো ডেকে পাঠালেন। জানো না কিছু? কী যেন নাম… হরবোলা অর্ক না কী যেন। আমিই তো বাপু তার বাড়ি গিয়ে খবর দিয়ে এলুম।”
এই পর্যন্ত বলে মায়া নিজেকে থামিয়ে দিল গাড়িতে হঠাৎ ব্রেক কষার মতো। লম্বা জিভ কেটে বলল, “এই রে বলে ফেললাম! না না বাবা, আমি কিছু জানি না। তুমি এখন যাও দেখি। হাতে মেলা কাজ।”
নবলাল স্কুলে ফিরে এল গম্ভীর মুখে। ঘটনা হেডস্যারকে রিপোর্ট করল। শশাঙ্কশেখর ধর বিরক্ত হয়ে বললেন, “কী বলছ নবলাল? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। একেই পরীক্ষা নিয়ে বিরাট গোলমালে পড়েছি, তার মধ্যে এসব কী প্রকারের হাবিজাবি কথা? মানুষের গলায় কোকিলের ডাক হবে কী করে? ওই মেয়ে তোমাকে বানিয়ে বানিয়ে যা-তা বলল, আর তুমি তাই নিয়ে নাচতে শুরু করে দিলে? খবরদার, স্কুলের ভিতর এসব গুজব যেন কেউ না ছড়ায়।”
বকুনি খেয়ে নবলাল মাথা নামিয়ে বলল, “তাই হবে স্যার। মায়া খুব বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে। একবার…।”
হেডমাস্টারমশাই হাত তুলে নবলালকে থামিয়ে দিলেন। এখন বাজে কথা শোনার সময় নেই তাঁর। ইতিমধ্যেই তিনি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। ঠিক করেছেন, অন্য কাউকে দরকার নেই, ক্লাস এইটের অঙ্কের প্রশ্নপত্র নিয়ে তিনি আজ নিজেই পরীক্ষায় বসবেন। পরীক্ষা হবে ছুটির পর, গোপনে। বন্ধ দরজার বাইরে নবলাল পাহারায় থাকবে। হাতে-কলমে দেখবেন, কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলের অঙ্কস্যারের প্রশ্ন কত কঠিন। তারপর ঠিক করবেন ছেলেদের কান্নাকাটি কীভাবে থামানো যায়।
সেই পরীক্ষা চলছে।
হেডমাস্টারমশাইয়ের অঙ্ক-পরীক্ষা শেষ হল ঠিক এক ঘণ্টা দশ মিনিট পর। উশকোখুশকো চুলে তিনি দরজা খুলে নবলালকে পরপর দু’গ্লাস ঠান্ডা জল আনতে বললেন। ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে কপালের ঘাম মুছে ফিরে এসে বসলেন নিজের চেয়ারে। সুশীল পাত্রের অঙ্ক আজ তিনি হাতে-কলমে নয়, একেবারে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। বাপ রে, এ কী কাণ্ড! এগুলো অঙ্ক না থান ইট? মাটির ইট নয়, লোহার থান ইট! হাতুড়ি দিয়ে হাজার পেটালেও কিছু হবে না। ভাঙা তো দূরের কথা, চিড়ও ধরছে না। এতদিন শশাঙ্কশেখরবাবু অন্যদের মুখেই শুধু শুনেছেন, আজ নিজেই বুঝতে পারলেন, কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলের অঙ্কস্যার একজন ভয়ংকর মানুষ। ভয়ংকর মানুষ না হলে এমন অতি ভয়ংকর অঙ্ক-প্রশ্নপত্র তৈরি করা সম্ভব নয়। ওঁর সঙ্গে কথা বলতে হবে। অসুখ সেরে ফিরে এলেই বলতে হবে। এরকম আর চলতে দেওয়া যায় না।
টেবিলের বই-খাতা, কাগজপত্র গোছাতে-গোছাতে শশাঙ্কশেখরবাবু ঠিক করলেন, একটা কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। গ্রেসমার্ক দিয়ে ছেলেদের পাশ করিয়ে দিলে কেমন হয়? কিন্তু সেই নম্বরটাই বা কত হবে? দশ-কুড়ি না তিরিশ? তা হলেও কি তিনি নিজে পাশ করবেন? একেবারেই নয়। তিনি নিশ্চিত, আজ যে পরীক্ষা তিনি দিয়েছেন, তাতে মেরেকেটে পনেরো নম্বর পেতে পারেন। খুব বেশি হলে সতেরো। না না, ওসব নম্বর বাড়ানোর ঝামেলায় গিয়ে দরকার নেই, তার চেয়ে পরীক্ষাটাই বাতিল ঘোষণা করা ভাল। স্কুলের হেডমাস্টারমশাই যেমন পরীক্ষা নিতে পারেন, তেমন নিশ্চয়ই পরীক্ষা বা তিলও করতে পারেন। এ ক্ষমতা তাঁর কি নেই? নিশ্চয়ই আছে। ছেলেদের মুখের দিকে তাকিয়ে এ কাজ তিনি অবশ্যই করবেন।
দ্রুত হাতে নিজের পরীক্ষার খাতা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে ফেললেন শশাঙ্কশেখরবাবু। যাতে কেউ দেখে না ফেলে। স্কুলের হেডমাস্টারমশাই অঙ্কে সতেরো পেয়েছেন জানাজানি হয়ে গেলে একটা বিচ্ছিরি কাণ্ড হবে। নবলালকে ডেকে তিনি আরও একবার সাবধান করে দিলেন, “দেখবে, এই পরীক্ষার কথা যেন কেউ জানতে না পারে।”
নবলাল হাত কচলে বলল, “কী যে বলেন স্যার! মুখে কুলুপ মেরেছি। কাক-পক্ষীও টের পাবে না। তবে একটা কথা জানতে পারি স্যার?”
শশাঙ্কশেখরবাবু বিরক্ত গলায় বললেন, “কী?”
নবলাল হাসি হাসি মুখে বলল, “আপনার পরীক্ষা কেমন হল স্যার? ভাল হয়েছে?”
নবলালের দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে ড্রয়ারে তালা দিলেন শশাঙ্কশেখর ধর। চিন্তিত, ক্লান্ত শশাঙ্কশেখরবাবু যখন স্কুল ছেড়ে বের হচ্ছেন, তখন সন্ধে হয় হয়। দূরে কোথায় যেন কোকিল ডেকে উঠল, কুহু কুহু কুহু…।
শশাঙ্কশেখরবাবু থমকে দাঁড়ালেন। বাঃ, সুন্দর তো! নবলাল কী বলছিল যেন? সুশীলস্যার কোকিলের মতো ডাকছেন! যত্ত সব উদ্ভট গল্প! কাল স্কুলে এসে একবার ওই অর্ক ছেলেটিকে ডেকে কথা বলতে হবে। সেরকম হলে টিফিনের সময় সুশীলবাবুর বাড়ি থেকে ঘুরে আসা যায়। তখন না হয় পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তটা জানিয়ে দেওয়া যাবে। যতই হোক পুরনো শিক্ষক!
কোকিলটা ফের ডেকে উঠল। এবার যেন আরও কাছে। শশাঙ্কশেখরবাবু মুচকি হেসে বাড়ির দিকে রওনা দিলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন