প্রচেত গুপ্ত
কল্যাণ মুখে বলেছিল দু’রকম ডাক্তার দেখানো হবে। আসলে সে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রেখেছিল তিনজনের সঙ্গে। এই তিন নম্বর মানুষটির কথা সে তার দিদি-জামাইবাবুকে বলেনি। তার ভয় ছিল, একে নিয়ে একটা গোলমাল হবে। জামাইবাবু রাগারাগি করবেন। ঘটনা তাই ঘটল। তবে জামাইবাবু নন, সমস্যা করল দিদি।
ঠিক ছিল, সকালে দুই ডাক্তারকে দেখানোর পর কল্যাণের ফ্ল্যাটেই দুপুরের খাওয়াদাওয়া হবে। তারপর একটু বিশ্রাম করে বিকেলের ট্রেনে কাঞ্চনগড় ফিরবেন নমিতাদেবীরা। খাওয়ার পর কল্যাণ নমিতাদেবীকে পাশের ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলল, “দিদি, বিকেলের বদলে তোরা সন্ধেবেলা ফিরিস। সেরকম হলে আজকের দিনটা থেকে যা। বিকেলে জামাইবাবুকে আরও একজনের কাছে নিয়ে যাব।”
নমিতাদেবী চিন্তিত এবং বিরক্ত। দু’-দু’জন ডাক্তার তাঁর স্বামীকে পরীক্ষা করেছেন। মাথা এবং গলার ডাক্তার। কিন্তু দু’জনের কেউই অসুখ ধরতে পারেনি। আরও একজনের কাছে যেতে হবে শুনে বিরক্তি বাড়ল। নমিতাদেবী বললেন, “আবার একজন? দু’জন তো হল!”
কল্যাণ আমতা-আমতা করে বলল, “তা হোক, অধিকন্তু ন দোষায়। বেশিতে ক্ষতি নেই। তা ছাড়া দ্যাখ দিদি, মাথা-গলা, দুই ডাক্তারের কেউই কোনও আশার কথা শোনাতে পারলেন না। ওষুধও দিলেন না, শুধু বলেছেন, অবজারভেশনে রাখতে হবে। সুতরাং হাত-পা ছেড়ে বসে থাকাটা ঠিক হবে না। এটাই লাস্ট। প্লিজ দিদি, আপত্তি করিস না!”
কথাটা ঠিক। দু’জন ডাক্তারই ফেল মেরেছেন। সাইকিয়াট্রিস্ট ভদ্রলোকের নাম ডাক্তার দীপঙ্কর মণ্ডল। প্রথমে সবাইকে ঘর থেকে বের করে সুশীলবাবুকে গাদাখানেক প্রশ্ন করলেন। তারপর নমিতাদেবীকে একা ডেকে চিন্তিত মুখে বললেন, “সমস্যাটা জটিল ও ইন্টারেস্টিং। তবে অসুখটা যে গলায় নয়, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। গোলযোগ যা হয়েছে সেটা মাথাতেই। মনের এক ধরনের অসুখ হল, স্পিল্ট পার্সোনালিটি। এই অসুখে নিজের ব্যক্তিত্ব ভেঙে দু’টো সত্তা তৈরি হয়। একটা মানুষ নিজেকে দু’জন মানুষ ভাবতে শুরু করে। এক-একটা সময় এক-একজনের মতো আচরণ করে। আপনার স্বামীর সঙ্গে সমস্যাটার কিছু মিল পাচ্ছি, তবে এক্ষেত্রে মানুষ নয়, উনি নিজেকে পশু-পাখির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন। টু বি ভেরি স্পেসিফিক, পাখির সঙ্গে। কখনও কখনও পাখির মতো আচরণও করছেন। ইচ্ছে করে তার মতো ডাক দিচ্ছেন। আচ্ছা, আপনাদের বাড়িতে কি পোষা কোকিল আছে?”
নমিতাদেবী বললেন, “না না ডাক্তারবাবু, উনি জন্তু-জানোয়ার, পশু-পাখি কিছুই পছন্দ করেন না। একবার কোনও এক ছাত্র দু’টো খরগোশ নিয়ে বাড়িতে এসে হাজির। উনি খরগোশসুদ্ধ ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন।”
“তা হলে কি আপনাদের বড় বাগানটাগান কিছু আছে? সারাক্ষণ পাখির ডাক শোনা যায়?”
নমিতাদেবী বললেন, “বড় না হলেও বাগান অনেক আছে, পাখিও ডাকে, কিন্তু আপনি তো মানুষটার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বললেন ডাক্তারবাবু, ওকে কি আপনার গালে হাত দিয়ে পাখির ডাক শোনার মতো মানুষ বলে মনে হল? রাতদিন অঙ্ক, অঙ্ক আর অঙ্ক। মাথায় যেন অঙ্কের আগুন নিয়ে ঘুরছে!”
“আপনি যতটা বলছেন, পেশেন্টকে ততটা রাগি অবশ্য আমার মনে হল না। হতে পারে প্রবলেমটার পর নার্ভাস হয়ে গিয়েছেন। নার্ভাস হওয়ারই কথা। আচ্ছা, আপনার স্বামী কি কখনও মিমিক হিসেবে পারফর্ম করেছেন? হরবোলা? ওই যে মুখ দিয়ে আওয়াজ করে না?”
“না, ডাক্তারবাবু। ওর ওসব নেই। ছেলেবেলাতেও করেছে বলে শুনিনি। তবে ওর এক ছাত্র পারে। মুখ দিয়ে গাড়ি-ঘোড়ার আওয়াজ করে।”
ডাক্তারবাবু হাতের পেনটা টেবিলে ঠুকতে-ঠুকতে বললেন, “ওঁর যদি হরবোলার গুণ থাকত, তা হলে চিকিৎসাটা অনেক সহজ হত। উনি যে কোকিলের ডাকটা করছেন মনে হচ্ছে, সেটা বেশ পারফেক্ট, ওরিজিনাল ডাকের অনেকটা কাছাকাছি। এতটা পারফেক্ট ডাক উনি শিখলেন কী করে?”
নমিতাদেবী অবাক হয়ে বললেন, “শিখবেন কেন? গলা থেকে তো নিজেই বের হচ্ছে।”
ডাক্তারবাবু একটু হেসে বললেন, “দুঃখিত, এটা সম্ভব নয়। আপনারা মানলেও একথা বিজ্ঞান মেনে নিতে পারবে না। মানুষের গলা কোকিল কেন, কারও মতোই হতে পারে না। সে নকল করতে পারে, তার বেশি নয়। আপনারা বরং একটা কাজ করুন, ওঁকে আজই আমার ক্লিনিকে ভরতি করে দিন। ক’টা দিন অবজারভেশনে থাকুন। ভাল করে আমরা ওঁর কোকিলের ডাক শুনি। আমিও দেশ-বিদেশের জার্নালগুলো হাতড়ে দেখি, এরকম কোনও কেস পাওয়া যায় কি না। এত বড় পৃথিবীতে কোথায় কী ঘটে সব তো আমরা জানতে পারি না!”
দীপঙ্কর মণ্ডলের কাছ থেকে ক’টা দিনের সময় চেয়ে নিয়ে নমিতাদেবী আর কল্যাণ এর পর সুশীলবাবুকে নিয়ে ছুটলেন ই এন টি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার অভিজিৎ মুখোটির কাছে। অভিজিৎ মুখোটি নাক, কান এবং গলার চিকিৎসায় খুব নাম করেছেন। সহজে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া কঠিন। কল্যাণ অনেক কষ্টে জোগাড় করেছে। তার কাছে খবর আছে, এই ডাক্তার গলা সংক্রান্ত অনেক জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারেন। তার অফিসেরই এক সহকর্মীর স্ত্রীর গলা ছিল বিচ্ছিরি রকমের হেঁড়ে। তারও পর তার আবার ছিল গানের অভ্যেস। লোকজনকে বাড়িতে নেমন্তন্ন করে গান শোনাত। সহকর্মীর কল্যাণকেও যেতে হয়েছে দু’-একবার। সে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা! হেঁড়ে গলার গান শুনে বিষমটিষম খেয়ে একাকার কাণ্ড।
সেই গলা ডাক্তার অভিজিৎ মুখোটি বদলে দিয়েছেন। স্রেফ ক’টা ট্যাবলেটে বেসুরো গলায় সুর চলে এসেছে। ইতিমধ্যেই ভদ্রমহিলা টিভির কোনও এক চ্যানেলে অনুষ্ঠান করে ফেলেছেন! সেই আশাতেই কল্যাণের এই ডাক্তারের কাছে আসা। ট্যাবলেটে যদি বে-সুর পালায়, তা হলে সুর পালাবে না কেন? কোকিলের সুর?
গোটা পথ ট্যাক্সিতে জানলার পাশে বসে রইলেন সুশীলবাবু। কাঁধের ব্যাগে কথা বলার কাগজ আর একটা বই। বইটি সংখ্যাতত্ত্বের জটিল বিষয়ের উপর। নাম, ‘থিয়োরি অফ প্রবাবিলিটি, অ্যান আনসলভ্ড মিষ্ট্রি’। বাংলা করলে হয়, ‘সম্ভাবনার তত্ত্ব, একটি অমীমাংসিত রহস্য’। ট্যাক্সিতে যেতে যেতে, ডাক্তারবাবুর চেম্বারে অপেক্ষা করার সময় সুশীলবাবু মাঝেমধ্যে বইটা ব্যাগ থেকে বের করে নাড়াচাড়া করে দেখছেন, কিন্তু কেন যেন পড়তে ইচ্ছে করছে না। অথচ বইটা এক সময় তাঁর প্রিয় ছিল!
নমিতাদেবী ভেবেছিলেন, এত ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটির কারণে মানুষটা খেপে থাকবে। চেঁচামেচি জুড়ে দেবে। তারপর আবার ব্যবস্থায় রয়েছে কল্যাণ। ফলে মেজাজ একেবারে সপ্তমে থাকবে। যদিও সেরকম কিছুই হয়নি! রাগ, বিরক্তি দেখানো তো দূরের কথা, সুশীলবাবু খুবই শান্তভাবে রয়েছেন। স্বামীর এই শান্তভাব কাল থেকেই একটু একটু চোখে পড়ছে নমিতাদেবীর। কাল রাতে খানিকটা ভয়ে ভয়েই বলেছিলেন, “কাল সকালে আমরা একটু বেরোব কিন্তু।”
সুশীলবাবু খাটে বসে টিভি দেখছিলেন। অঙ্কের বই-খাতা সব পাশে সরানো। এটাও একটা অবাক হওয়ার মতো ঘটনা। সুশীল পাত্রকে কেউ কখনও টিভি দেখতে দেখেনি। তিনি মনে করেন, এসব সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই নয়। গণিতচর্চায় টিভির কোনও ভূমিকা নেই। হাতে সময় থাকলে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া দরকার। পরদিন যত ভোরে ওঠা যাবে তত ভাল। পুরনো নামতা, ফর্মুলা, সম্পাদ্য, উপপাদ্য, লগ টেবিল, ক্যালকুলাসের নিয়মাবলি ঝালাই করে নেওয়ার জন্য অনেকটা সময় পাওয়া যাবে। মুখস্থ ঝালাই করবার জন্য ভোরবেলা হল অতি উত্তম সময়। এই বয়সেও তিনি নিয়ম করে এই কাজ করেন। ভোর পাঁচটায় ছাদে পায়চারি করতে করতে সমদ্বিবাহু, সমকোণী, সদৃশকোণী ত্রিভুজের সংজ্ঞা আওড়ান। বয়স হয়েছে বলে জোরে জোরে বলতে পারেন না। আশপাশের বাড়ির লোকজন শুনে ঘাবড়ে যেতে পারে, তাই বিড়বিড় করে বলেন।
সেই মানুষটির টিভি দেখা অবশ্যই অবাক হওয়ার মতো একটা ঘটনা। নমিতাদেবী আড়চোখে দেখলেন, টিভিতে খোলা রয়েছে অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট চ্যানেল। পাখি দেখছে নাকি? না, পাখি নয়, পরদায় সিংহের ছবি। একটা ঘুমন্ত সিংহের দিকে দু’টো সিংহশাবক তেড়ে তেড়ে যাচ্ছে। রাগি অঙ্কস্যার হাসি হাসি মুখে সিংহশাবকের খেলা দেখছেন!
নমিতাদেবী আবার বললেন, “কাল বেরোব কিন্তু! কল্যাণ তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। হেঁচকি বলো আর কাশিই বলো, সারাতে তো হবে!”
সুশীলবাবু মুখ না ফিরিয়ে মাথা নাড়লেন। আজও সেইরকম আছেন। কোনও ঝামেলা করেননি। ডাক্তার অভিজিৎ মুখোটির সামনে প্রথম মিনিট কুড়ি পাখি-ডাক বের হল না। স্বাভাবিক গলায় সব প্রশ্নের জবাব দিতে থাকলেন সুশীলবাবু। গলার জোর কেমন? মাঝেমধ্যেই গলা কি ভাঙে? নাকি চুলকোয়? আরাম কীসে বেশি হয়? ঠান্ডায় না গরমে? পাখির ডাকের আগে-পরে গলায় কোনও বিশেষ অনুভূতি হয় কী? হলে সেই অনুভূতি কেমন? এই সব প্রশ্ন। নমিতাদেবী আর কল্যাণ দুরুদুরু বুকে বসে থাকে। প্রশ্নের দাপটে রেগে না যান মানুষটি। এর পর কপালে আলো লাগিয়ে ডাক্তার মুখোটি সুশীলবাবুর মুখের উপর ঝুঁকে পড়লেন, “আপনার গলার ভিতরটা একবার দেখে নিই। বড় করে হাঁ করুন তো… হ্যাঁ, এই তো, এই তো ঠিক আছে…! এবার আওয়াজ করুন অ্যা অ্যা অ্যা…।”
সুশীলবাবু ‘অ্যা অ্যা’ করলেন ঠিকই, কিন্তু গলা দিয়ে বের হল ‘কুহু কুহু কুহু…।’
ডাক্তার মুখোটির চোখদু’টো জ্বলজ্বল করে উঠল। বিড়বিড় করে নিজের মনে বললেন, “ওয়ান্ডারফুল! ফ্যানটাস্টিক!”
আরও খানিকক্ষণ পরীক্ষার পর ডাক্তার মুখোটি যখন নিজের চেয়ারে এসে বসলেন, কল্যাণ জিজ্ঞেস করল, “ডাক্তারবাবু, এ কখনও সম্ভব?”
“আলবাত সম্ভব, একশোবার সম্ভব। কেন সম্ভব নয়? ময়না, কাকাতুয়া যদি মানুষের গলায় কথা বলতে পারে, মানুষ কেন তাদের মতো ডাকতে পারবে না? অসুবিধে কোথায়? কোনও অসুবিধে নেই।”
কল্যাণ কাঁচুমাচু মুখে বলল, “এটা কী বলছেন ডাক্তারবাবু, অসুবিধে নেই! কাকাতুয়া, ময়না মানুষের গলা নিয়ে থাকতে পারে। তাদের স্কুলে পড়াতে হয় না, দোকান-বাজারে যেতে হয় না, কিন্তু আমার জামাইবাবুকে তো এগুলো করতে হয়। সবচেয়ে মুশকিলের কথা হল, কখন যে ভিতরের কোকিলবাবাজিটি ডাক দিয়ে উঠবেন, কারও জানা নেই। মুশকিল কেন, এটা একটা বিপজ্জনক ব্যাপার। ক্লাসে পড়ানোর সময় বা বাজারে পটল দরাদরির মুহূর্তে যদি ডেকে ওঠেন, কী কাণ্ডটা হবে বুঝতে পারছেন?”
“ঠিকই, এটা একটা সমস্যা। সব সময় ডাকলে একটা কথা ছিল। দেখুন, এখনই আমি কিছু বলতে পারছি না। আগে গলায় একটা অপারেশন করে দেখতে হবে ভোকাল কর্ডটার পজিশন কী। ল্যারিংকস কি তার সেপ বদলেছে? যদি না বদলায় তা হলে কোনও কথা নেই, কিন্তু বদলালে সেটা হবে একটা বিস্ময়কর ঘটনা। যে ঘটনার কথা চিকিৎসাবিজ্ঞানে কখনও শোনা যায়নি…।”
সুশীলবাবু চুপ করে থাকলেন। নমিতাদেবী ভয়ার্ত গলায় বললেন, “ডাক্তারবাবু, আমরা তো কিছু বুঝতে পারছি না।”
অভিজিৎ মুখোটি তাঁর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “আমিও পারছি না। আসলে কী জানেন, মানুষের কথা বলার ব্যবস্থাটা বড় জটিল। আমাদের প্রধান স্বরযন্ত্রটি হল ভোকাল কর্ড। সেখানে আছে মাত্র দু’টো পেশি। এই পেশিতে হাওয়া চলাচল করে বলেই আমরা গলা দিয়ে আওয়াজ করি, কথা বলি। এই দুই পেশি আবার নিজেদের মধ্যে টানাটানি কমিয়ে-বাড়িয়ে রেডিয়োর নবের মতো স্বরের ভলুম কন্ট্রোল করে। আর গলার আওয়াজ কী রকম হবে সেটা ঠিক করার জন্য আছে ল্যারিংকস, মুখ আর নাক। ল্যারিংকসই হল আমাদের আসল ভয়েস-বক্স। কথা বলার বাক্স। মুখ খোলা-বন্ধ, জিভের পজিশন একটা ইম্পর্ট্যান্ট ব্যাপার। তারা কতটা হাওয়া ভিতরে ঢুকতে-বেরোতে অ্যালাউ করছে, কতটা টাইম দিচ্ছে তার উপর অনেকটা নির্ভর করে।”
এই পর্যন্ত বলে একটু থামলেন ডাক্তার মুখোটি। তারপর সুশীলবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি নিশ্চিত নই, তবে মনে হচ্ছে, এই স্বর-ব্যবস্থাতেই কোনও গোলমাল হয়ে গিয়েছে আপনার। গলা না-কাটলে সেটা বোঝা যাবে না।”
সুশীলবাবু চেয়ার থেকে ছিটকে উঠে পড়লেন। ছিটকে ওঠারই কথা। কেউ যদি শান্ত গলায় ‘গলা কাটা হবে’ বলে, তা হলে চুপ করে বসে থাকা যায় না। চেয়ার যতই গদিমোড়া আরামের হোক না কেন!
এই তো দুই ডাক্তারের চিকিৎসা। একজন ধরে রাখতে চান, একজন চাইছেন গলা কাটতে। তাই শেষ পর্যন্ত ভাইয়ের কথা মেনে তিন নম্বর ডাক্তারে সায় দিলেন নমিতাদেবী। ঠিক হল, দুপুরে খাওয়ার পর যাওয়া হবে। তবে নমিতাদেবী যাবেন না। কল্যাণ তার জামাইবাবুকে নিয়ে একাই যাবে। হাসিখুশি কল্যাণও মনে মনে ভেঙে পড়েছে। অন্য সময় রসিকতার মধ্যে থাকলেও এখন সে সিরিয়াস। চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে হাসিঠাট্টা মানায় না। তা ছাড়া বড় বড় দু’জন ডাক্তার ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর। দেখা যাক, এবার এই ডাক্তার কী বলেন? তবে দিদি রাজি হলে শুধু হবে না, এঁর কাছে যাওয়ার আগে রোগীরও একটা অনুমতি নেওয়া দরকার। কারণ, তিন নম্বর ডাক্তার মানুষের ডাক্তার নন।
ফ্ল্যাটে ফিরেই সুশীল পাত্র আগে ব্যাগ থেকে জটিল অঙ্কের বইটা বের করে সরিয়ে রাখলেন। কল্যাণকে ডেকে বললেন, “তোমার কাছে ছোটদের কোনও গল্পের বইটই আছে নাকি হে? এই ধরো, হাসির বা ভূতের? মনে হচ্ছে, থিয়োরি অফ প্রবাবিলিটি একটু ঝামেলা করছে। পড়তে গেলেই মাথাটা টিপটিপ করছে। তাই ভাবছিলাম, হালকা কিছু যদি থাকে, আছে কিছু? কুহু-কুহু।”
কোকিলের ডাক দিয়েই লজ্জা পেয়ে গেলেন সুশীলবাবু, ভুল হয়ে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি খাতা-পেন টেনে নিলেন কাছে। গিন্নি পইপই করে বলে দিয়েছিলেন, ভাইয়ের ওখানে গিয়ে যেন কু-কু না করেন। এটা কাঞ্চনগড়ের নিজের বাড়ি নয়, ফ্ল্যাটবাড়িতে আরও পাঁচটা লোক থাকে। তারা যদি কল্যাণের ওখান থেকে পাখির ডাক শুনতে পায়, সন্দেহ করবে। তাই মুখে কথা একেবারে নয়। যা বলবার লিখে বলতে হবে।
কল্যাণ অবশ্য কোকিলের ডাক খেয়াল করল না। তার জামাইবাবু অঙ্ক সরিয়ে গল্পের বই চাইছেন, এতেই সে যথেষ্ট অবাক হয়েছে। আর গল্প মানে যে-সে গল্প নয়, একেবারে ভূতের গল্প! কিন্তু তার কাছে ছোটদের গল্পের বই তো কিছুই নেই। মানুষটি এ আবার কী নতুন খেলা শুরু করলেন? বড় বয়সে ছোটদের গল্প পড়বেন? কে জানে বাবা, এর পরেই হয়তো বলবেন, ‘কল্যাণ, লুডো আনো তো দেখি, তোমার সঙ্গে একদান খেলি। কুহু-কুহু।’ দরকার হলে তাই আনতে হবে। উনি যে এখনও শান্ত আছেন এটাই আসল কথা। নতুন করে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে যেন মেজাজ বিগড়ে না যায়। কল্যাণ চট করে সামনের ফ্ল্যাটের ছেলেটির কাছ থেকে একটা বই নিয়ে এল। তবে সেটা ভূতের বা হাসির হল না, হল ডাকাতের। ডাকাত ধরার গল্প। দুপুরের খাওয়া সেরে সুশীলবাবু সেই বই নিয়ে পড়তে বসেছেন।
কল্যাণ ভয়ে ভয়ে ঘরে ঢুকল। তিন নম্বর ডাক্তারের কথা শুনে জামাইবাবুর কী প্রতিক্রিয়া হবে? জামাইবাবু কি চেঁচিয়ে উঠবেন? হাতের বইটা তাকে লক্ষ করে ছুড়ে মারবেন না তো?
“জামাইবাবু একটা কথা ছিল।”
সুশীলবাবু হাতের বই সরিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে গেলেন। না, মুখে নয়। খাতায় খসখস করে লিখে দেখালেন, ‘তুমি কি এই বইটা পড়েছ কল্যাণ? জলদস্যুর গল্পগুলো খুবই ইন্টারেস্টিং।’
কল্যাণ ঘাবড়ে গেল। জামাইবাবুর এ কী ব্যবহার! এত নরম! সে তাড়াতাড়ি বলল, “না, আমি পড়িনি জামাইবাবু।”
সুশীলবাবু আবার লিখে খাতা এগিয়ে ধরলেন, ‘অবশ্যই পড়বে।’
কল্যাণ গদগদ মুখে বলল, “নিশ্চয়ই পড়ব, অবশ্যই পড়ব। জামাইবাবু, একটা কথা ছিল।”
সুশীল পাত্র ভুরু কুঁচকে পাতার নীচে লিখলেন, ‘তাড়াতাড়ি বলো। আমি চম্বলের ডাকাত নিয়ে ব্যস্ত আছি।’
পরিস্থিতি গোলমেলে মনে হচ্ছে। মানুষটি যদি বলতেন, ক্যালকুলাস নিয়ে ব্যস্ত আছি, তা হলে অসুবিধে হত না। তার বদলে একেবারে চম্বলের ডাকাত! বাপ রে! কল্যাণ আমতা আমতা করে বলল, “জামাইবাবু, বিকেলে আপনাকে আর-একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। অনেক কষ্টে খোঁজ পেয়েছি। আশা করেছিলাম, বাকি দু’জন ডাক্তারের কেউ না কেউ সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। তা হলে আর এঁর কাছে যাওয়ার দরকার হত না, কিন্তু…।”
“ইনি কে? কীসের ডাক্তার?” সুশীলবাবু লিখলেন।
কল্যাণ এক পা পিছিয়ে গেল, মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বলল, “এটাই একটু মুশকিলের জামাইবাবু, সেই কারণে আপনাকে বলতেও বাধো বাধো ঠেকছে। ভদ্রলোক পশু-পাখির ডাক্তার। তবে পাখিতে স্পেলাইলেজেশন করেছেন। ওনলি বার্ড। আজকাল শুধু পাখির কেসগুলো দেখেন। এই তো সেদিন সিঙ্গাপুরের কোনও এক স্যাংচুয়ারি থেকে ঘুরে এলেন। কাকাতুয়াদের উপর কাজ ছিল, টকিং প্যারট। পত্রিকায় সেই খবর পড়েই… আমি যখন টেলিফোন করলাম, আমার কথা প্রথমে বিশ্বাস করছিলেন না। পরে যখন শুনলেন, আপনি স্কুলশিক্ষক, তখন অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিলেন। মনে হল, শিক্ষকদের জন্য ওঁর একটা আলাদা শ্রদ্ধা-ভক্তি আছে।”
ডাকাতের বই বন্ধ করে সুশীলবাবু স্থির চোখে কল্যাণের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কল্যাণের মনে হল, তার জামাইবাবু এবার হুঙ্কার দিয়ে উঠবেন। ওঠাটাই স্বাভাবিক। একজন মানুষকে যদি চিকিৎসার জন্য পশু-পাখির ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, তা হলে তিনি যে হুঙ্কার দেবেন এ আর আশ্চর্য কী? কল্যাণ একটু সরে এল। হাতের বইটা ছুড়ে মারবেন কি?
না, বই ছুড়ে মারলেন না সুশীলবাবু। বই ভাঁজ করে শান্ত গলায় বললেন, “ঠিক আছে চলো।”
চেম্বারটা দেখতে খুব কায়দার। একটা ঢাউস খাঁচা যেন! আলোগুলো এমনভাবে ঝোলানো মনে হচ্ছে, এক-একটা দাঁড়! খাঁচার একপাশে টেবিল-চেয়ার নিয়ে যে লোকটি বসে আছেন, তাঁর গায়ে ঘন সবুজ গাছপাতা আঁকা জামা। একটা জঙ্গল জঙ্গল ভাব।
চেম্বারের বাইরে ভিড়। বেশিরভাগের হাতেই খাঁচা। পোষা পাখি নিয়ে ডাক্তারের কাছে এসেছে চিকিৎসার জন্য। ডানা ঝাপটানো, ট্যাঁ ট্যাঁ ডাকে চারপাশ একেবারে সরগরম। মোটাসোটা এক মহিলার কাঁধে বসে আছে লম্বা নাকের সবুজ একটা টিয়াপাখি। মহিলা হাতে একটা লাল লঙ্কা নিয়ে তাকে খাওয়ানোর জন্য খুব সাধ্যসাধনা চালাচ্ছে। “খাও বাছা, লক্ষ্মীসোনা, একটা কামড় দাও! সেই সকাল থেকে পেট খালি…।”
টিয়াপাখি মুখ ফিরিয়ে নিল। কল্যাণ তার মালকিনের কাছ থেকে জানতে পেরেছে, বেচারির সর্দি-জ্বর হয়েছে। দু’দিন ধরে মুখে কিছু তুলছে না।
সুশীলবাবুদের অপেক্ষা করতে হল না। একটু বসতেই ভিতরে ডাক পেলেন। চেম্বারে ঢুকতেই পক্ষীবিশারদ উঠে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে সুশীলবাবুর সঙ্গে করমর্দন করে বললেন, “বসুন মাস্টারমশাই। সবাই আমাকে ‘পাখিডাক্তার’ বলেই চেনে। আপনার ব্যাপারে আমার দু’টো ইন্টারেস্ট। এক হল, আপনার অসুখ, আর দু’ নম্বর হল, আপনার পেশা। শুনলাম আপনি স্কুলের শিক্ষক। আমার দূর সম্পর্কের এক মামাও স্কুলের সঙ্গে জড়িত।”
কল্যাণ বলল, “তাই নাকি! বাঃ, কীসের শিক্ষক উনি? কোন সাবজেক্টের?”

পাখিডাক্তার হেসে বললেন, “কোনও সাবজেক্টের নয়, আমার মামা হলেন স্কুল পরিদর্শক। ওই যে স্কুল ঘুরে ঘুরে দেখে না? লেখাপড়া সব ঠিকমতো হচ্ছে কি না, ছেলেদের রেজাল্ট কেমন, মাস্টারমশাইরা ঠিক সময় আসছেন তো, এই সব। শুনেছি, মামা নাকি স্কুলে গিয়ে বেজায় ঝামেলা পাকান।একবার ঠিক করেছি, মামার সঙ্গে ঝামেলা দেখতে যাব। হাঃ হাঃ। যাক, এবার আপনার সমস্যাটা শুনি মাস্টারমশাই।”
শান্তভাবেই ঘটনা বললেন সুশীলবাবু। তবে সমস্যা আলাদা করে বলতে হল না। কারণ, পাখিডাক্তার কথার মাঝখানেই নিজের কানে তাঁর কোকিল ডাক শুনতে পেলেন। বেশি নয়, মাত্র তিনবার। কিন্তু সেটাই তাঁর ভুরু কুঁচকে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। বললেন, “অসম্ভব। ইমপসিবল্। হতেই পারে না।”
কল্যাণ বলল, “কিন্তু হচ্ছে তো, নিজের কানেই তো শুনলেন।”
“শুনলেও বিশ্বাস করব না। অনেক জিনিস আছে যা চোখে দেখলেও বিশ্বাস করতে নেই। বুঝতে হয়, নিশ্চয়ই অন্য কোথাও গোলমাল আছে। মরীচিকা তো জল দেখায়, তা বলে কি জল আছে? নেই। এটাও সেরকম কিছু। কী সেটা বলতে পারছি না, তবে কিছু যে, সেটা নিশ্চিত।” এরপর পাখিডাক্তার সুশীলবাবুর দিকে ফিরে বললেন, “লাস্ট টুয়েন্টি ইয়ার্স পাখি নিয়ে কারবার করছি, যদি কিছু মনে না করেন তা হলে পাখির ডাকের সায়েন্সটা একটু মনে করিয়ে দিই। তা হলে আমার কথাটা যে সত্যি সেটা খানিকটা পরিষ্কার হবে। পাখির ডাকের রহস্য এখনও পুরোটা উদ্ঘাটিত হয়নি। বিজ্ঞানীরা আজও এই বিষয়ে কাজ করে চলেছেন। তবে এখনও পর্যন্ত যতটুকু জানা গিয়েছে তাতে কিছুটা ধারণা স্পষ্ট হবে। বোঝা যাবে, কেন মানুষ পাখির মতো ডাকতে পারে না, ডাকা সম্ভব নয়।”
সত্যি সত্যি এরপর পাখির ডাক নিয়ে ছোটখাটো একটা ভাষণ দিয়ে বসলেন পক্ষীবিশারদ, “পাখির স্বরযন্ত্রটি মানুষের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। মানুষের থাকে ল্যারিংক্স, আর পাখির গলায় তার বদলে আছে সিরিংক্স। এটাই তার স্বর তৈরির জায়গা, যাকে বলে ‘ভয়েস বক্স’। যে পাখির ভয়েস বক্সে পেশির সংখ্যা যত বেশি, তার ডাক তত রকমারি, সুরেলা আর মিষ্টি। এই যন্ত্র পাখির শরীরের অনেক ভিতরে থাকে, একেবারে বুকের কাছাকাছি। ফুসফুসের সঙ্গে দু’ভাবে থাকে যোগাযোগ। আর সেটাই হল পাখির সুর তৈরির আসল কৌশল। দুই ফুসফুস থেকে একই সঙ্গে দু’রকম সুর বের করে দেয়। সুরের ওঠা-নামা, চলাচল সব পারে। তৈরি হয় গান। তবে এটা ঠিক, সব পাখি কিন্তু গাইতে পারে না মাস্টারমশাই।”
এই পর্যন্ত বলে পাখিডাক্তার চুপ করলেন। সুশীলবাবু ফিসফিস করে বললেন, “আর কোকিল?”
“আপনি আসার আগে সেটা নিয়ে কিঞ্চিৎ পড়াশোনা করে রেখেছি। কোকিল অনেকরকম ডাকতে পারে। এখনও পর্যন্ত পাওয়া হিসেবে প্রায় সাতরকমের ডাক আছে ওদের। সাধারণত সকাল আর সন্ধেতেই ওদের যত কু-কু। মজার কথা হল, ধীরে ধীরে শুরু করে কোকিল কিন্তু ডাকের গতি বাড়িয়ে দেয়। ঘন ঘন, একটানা ডেকেই চলে।”
কল্যাণ চোখ বড় বড় করে বলল, “বাপ রে, পাখির ডাকের পিছনে যে এত কিছু আছে কে জানত! আচ্ছা, জামাইবাবুর গলায় যে ডাক শুনলেন সেটা কি অরিজিনাল? পারফেক্ট?”
পক্ষীবিশারদ টেবিলের উপর পেনসিল ঠুকতে ঠুকতে বললেন, “না, পারফেক্ট নয়। ওঁর ডাকের মধ্যে গতি বাড়ানোর ব্যাপারটা দেখলাম না, ডাক একটানাও নয়। উনি জানেন না গলা থেকে এই আওয়াজ কখন বের হবে। যে-কোনও সময় হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। অর্থাৎ ডাকের উপর ওঁর নিয়ন্ত্রণ নেই। আর সেই কারণেই আমি নিশ্চিত, ঘটনা শুধু কোকিলের ডাক নয়, অন্য কিছু আছে। ডাকটা আসল অসুখ নয়, অসুখের লক্ষণ। তবে যদি জিজ্ঞেস করেন, আসল অসুখটা কী? বলতে পারব না। আমি এখনও সেটা বুঝতে পারছি না।”
কল্যাণ হতাশ মুখে বলল, “একটা কথা, অসুখটা কি পাখির?”
পক্ষীবিশারদ হেসে বললেন, “না পাখির নয়, অসুখটা মানুষের, অবশ্যই মানুষের। তবে লক্ষণটা পাখির। কোনও কোনও সময় মানুষ পশুর মতো বিশ্রী আচরণ করে না? তা হলে পাখির মতো সুন্দর করে ডাকতে পারবে না কেন?”
সুশীলবাবু উত্তেজিতভাবে বললেন, “সুন্দর! কোকিলের ডাক দেওয়া সুন্দর বলছেন! কুহু-কুহু-কুহু…।”
“এটা কী বলছেন মাস্টারমশাই, কোকিলের ডাক সুন্দর নয়? অবশ্যই সুন্দর। একবার ভেবে দেখুন তো, কোকিলের বদলে যদি আপনার গলা দিয়ে কাকের ডাক বেরোত? কী সর্বনাশ হত তখন? মাস্টারমশাই কোকিলের ডাক শুনলে আমরা থমকে দাঁড়াই, মনটা নরম আর শান্ত হয়ে যায়। হয় না?”
সুশীলবাবু বিড়বিড় করে বললেন, “মন নরম! মন শান্ত!”
পক্ষীবিশারদ হেসে বললেন, “অবশ্যই হয়। মনে করবেন না পাখি নিয়ে পড়ে আছি বলে তাদের হয়ে কথা বলছি। কথায় বলে, আহা, কোকিলকণ্ঠ। শুনলে মন ভরে যায়। যাক, স্যার, চিন্তা করবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আজই মেলে সিঙ্গাপুরের জুরং বার্ড সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করব। জুরং হল পাখির চিড়িয়াখানা, অনেকটা স্যাংচুয়ারির মতো। পাখি নিয়ে ওখানে গবেষণা চলছে… দেখি, ওরা যদি কিছু বলতে পারে!”
কথা শেষ করে পক্ষীবিশারদবাবু বেলের সুইচ টিপলেন। ঘরের বাইরে হেঁড়ে গলায় কে যেন বলে উঠল, “নেক্সট। এবার পরেরজন ভিতরে আসুন।”
পক্ষীবিশারদ হেসে বললেন, “আমার গলা নয়, গলা আমার পোষা কাকাতুয়ার, তাকে দিয়ে বলিয়ে রেকর্ড করিয়ে নিয়েছি। বেল টিপলেই বলে ওঠে। কেমন হয়েছে?”
সুশীলবাবু উঠে দাঁড়িয়ে খানিকটা যেন নিচু স্বরেই বললেন, “পাখি কেন ডাকে?”
পক্ষীবিশারদবাবু এবার চোখ সরু করে হাসলেন। ভাবটা যেন, এমন সহজ প্রশ্ন তাঁকে কেন? তারপর বললেন, “অনেক কারণেই ডাকে মাস্টারমশাই, বলা যেতে পারে, সব কারণেই ডাকে। খিদে পাওয়া থেকে শুরু করে, নিজে বিপদে পড়লে, অন্যকে বিপদ থেকে বাঁচাতে, রাগে, ঝগড়ায়, আত্মরক্ষায়, লড়াইতে, সবেতেই ওরা ডাকাডাকি চালায়। তবে কিছু পাখি মাস্টারমশাই, স্রেফ আনন্দ পেতেই ডাকে।”
“আনন্দ পেতে!”
পাখিডাক্তার মুচকি হেসে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “হ্যাঁ, মনে আনন্দ পেতে। মাস্টারমশাই, আপনি যাওয়ার আগে আপনার স্কুলের নাম, ঠিকানাটা একটু লিখে দিয়ে যাবেন। বলা তো যায় না, যদি কোনওদিন আমার ইনস্পেক্টর মামা ওদিকে যান…।”
পক্ষীবিশারদের কাছে জামাইবাবুর স্কুলের নাম-ঠিকানা লিখে কল্যাণ ফিরল হতাশ মনে। হতাশ হওয়ারই কথা। অনেক আশা নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু লাভ হল না। মাথা, গলার মতো পাখির ডাক্তারও অসুখ ধরতে পারলেন না। ‘মাস্টারমশাই মাস্টারমশাই’ করে ভাষণ দিলেন অনেক, কিন্তু কাজের কাজ পারলেন না কিছুই। কী হবে তা হলে? কেউ-ই পারবেন না? মনে হয় না পারবেন।
তবে সুশীলবাবু কিন্তু এসব ভাবছেন না। তাঁর মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে, নরম আর শান্ত মন। নরম আর শান্ত মন…। সত্যি কি তাই পাখি ডাকলে মন শান্ত হয়? কঠিন মন কি নরম হয়ে ওঠে?
রাতে কাঞ্চনগড় ফিরে নমিতাদেবী এবং সুশীলবাবু চমকে উঠলেন। কারা যেন বাড়ির সামনে একটা খাঁচা রেখে গিয়েছে! ঠিক দরজার মুখে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট থেকে আসা আলোয় তারের সেই খাঁচা চকচক করছে। দরজার তালা খোলার আগেই সুশীলবাবু নিচু হয়ে সেই খাঁচা তুললেন। খাঁচার ভিতর এক চিলতি কাগজ। তাতে কাঁচা হাতে লেখা, ‘কাঞ্চনগড়ের কোকিলস্যারকে উপহার।’
দরজা খুলে ঢুকতে ঢুকতে নমিতাদেবী বললেন, “নিশ্চয়ই তোমার স্কুলের ছেলেদের কাণ্ড। খবরটা তা হলে ওরা জেনেছে। সে তো জানবেই। এই ঘটনা কি আর চেপে রাখা যায়? তবে তুমি কিছু মনে কোরো না, ছেলেপিলেরা ওরকম একটুআধটু করে।”
সুশীলবাবু অন্যমনস্কভাবে বললেন, “না, আমি কিছু মনে করিনি। কুহু-কুহু…।”
রাতে কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়লেন সুশীল পাত্র।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন