সপ্তম অধ্যায়

প্রচেত গুপ্ত

দরজা খুলে শশাঙ্কশেখর ধরকে দেখে নমিতাদেবী নিশ্চিন্ত হলেন। যাক, তাঁকে আর স্কুলে গিয়ে স্বামীর ছুটির জন্য দরখাস্ত করতে হবে না। কাজটা বাড়িতে হয়ে যাবে।

নমিতাদেবী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, স্বামীর অসুখের খবরটা প্রধানশিক্ষককে বলেই রাখবেন। তিনি জানেন, অন্যরা অপছন্দ করলেও প্রধানশিক্ষকমশাই এই অঙ্কসর্বস্ব, রাগি মানুষটিকে খানিকটা প্রশ্রয়ই দেন। সুতরাং এঁর কাছে আসল ঘটনা গোপন করা ঠিক হবে না।

কাল রাতে সুশীলবাবু ঘুমিয়ে পড়বার পর কল্যাণকে টেলিফোন করেছিলেন নমিতাদেবী, “একটা বিচ্ছিরি কাণ্ড হয়েছে রে কলু।”

কল্যাণ বলল, “কী বিচ্ছিরি কাণ্ড?”

“দরজার সামনে একটা খাঁচা ফেলে গিয়েছে।”

“খাঁচা!”

নমিতাদেবী কঁদো কাঁদো গলায় বললেন, “হ্যাঁ খাঁচা। খাঁচার মধ্যে একটা কাগজে লেখা, ‘কোকিলস্যারকে উপহার’। নিশ্চয়ই স্কুলের বিচ্ছু ছেলেদের কাণ্ড। তোর জামাইবাবু খুব ভেঙে পড়েছে।”

হাসিখুশি ফুর্তিবাজ কল্যাণও ভিতরে ভিতরে খানিকটা ভেঙে পড়েছে। তিন-তিনটে ডাক্তার ফেল করা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু সেটা দিদির কাছে প্রকাশ করা চলবে না, তাতে দিদি আরও দুঃখ পাবে। তাই সে জোর করে হেসে বলল, “খাচা তো ভাল দিদি, এরপর দেখবি, কাকের বাসা বানিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। কোকিল বলে কাকের বাসা।”

ভাইয়ের ঠাট্টা শুনে মনটা একটু হালকা হল নমিতাদেবীর। মুখে যদিও বললেন, “চড় খাবি। মানুষটা মন খারাপ করে রয়েছে, আর তুই ফাজিলের মতো কথা বলছিস? লজ্জা করছে না?”

“করছে দিদি, খুবই লজ্জা করছে! জামাইবাবু অমন চমৎকার ডাক ডাকছেন, অথচ আমাকে দ্যাখ, শিসটা পর্যন্ত দিতে পারি না। লোকে শুনলে ছি ছি করবে। বলবে, এমন জামাইবাবুর কী শ্যালক?”

নমিতাদেবী হেসে বললেন, “এবার কিন্তু সত্যি সত্যি মার খাবি?”

ফোনের ওপাশ থেকে কল্যাণ গলা নামিয়ে বলল, “এবার একটা কাজের কথা শোনো, একটু আগে সেই পক্ষীবিশারদ আমাকে মোবাইলে ধরেছিলেন। কাজ কিছু না পারলেও, দেখলাম, লোকটির পাখিটাখি নিয়ে নলেজ আছে। বললেন, ‘আপনার জামাইবাবুর কোকিলের ডাকটা টেপ করে পাঠান।’ উনি সিঙ্গাপুর না কোথাকার জু-তে ক্যাসেটটা পাঠিয়ে দিবেন। সেখানে খুব বড় বার্ড স্যাংচুয়ারি আছে। বার্ড স্যাংচুয়ারি কি জানিস তো? পক্ষীরালয়।”

নমিতাদেবী আর্তনাদ করে উঠলেন, “জু! মানে চিড়িয়াখানা? তোরা মানুষটাকে চিড়িয়াখানায় পাঠাতে চাইছিস?”

“অসুবিধে কী দিদি? কোনও অসুবিধে নেই। আগে ধর, শুধু ডাকাডাকির ক্যাসেটটা গেল, তারপর জামাইবাবু নিজে গিয়ে ক’টা দিন কাটিয়ে এলেন। জায়গা খারাপ হবে না, খোলামেলাই হবে। পাখিডাক্তার বললেন, ওঁর চেনাজানা আছে।”

নমিতাদেবী দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, “থামবি? নাকি ফোন কেটে দেব?”

কল্যাণ বলল, “আচ্ছা থামছি, তুই একটা সিরিয়াস কথা শোন! জামাইবাবুর স্কুল থেকে একটা লম্বা ছুটি নিয়ে নে! তারপর আমার এখানে এসে ক’টা দিন দুজনে মিলে থাক। কাঞ্চনগড় থেকে কিছুদিনের জন্য জামাইবাবুর চলে আসা দরকার। একটা চেঞ্জ হলে শরীরটা ঠিক হয়েও যেতে পারে।আগেরকার দিনে হাওয়াবদল ছিল না?”

এই কথাটা নমিতাদেবীর মনে ধরেছে। তা ছাড়া কলকাতায় থাকলে আরও চিকিৎসার কথা ভাবা যাবে। এই কারণেই ছুটির দরখাস্ত।

নমিতাদেবী শশাঙ্কশেখর ধরকে বললেন, “আসুন আসুন মাস্টারমশাই, আপনার সঙ্গে কথা আছে। আপনি না এলে আমি নিজেই স্কুলে আপনার কাছে যেতাম।”

জানলার পাশে একটা ইজিচেয়ার নিয়ে বসে আছেন সুশীলবাবু। তাকিয়ে আছে বাইরে। এই জানলাটা কত বছর ধরেই তো দেখছেন, কিন্তু এটা দিয়ে এতখানি আকাশ দেখা যায়, সেটা তাঁর জানা ছিল না। আজ আকাশটা যেন একটু বেশি নীল। নাকি সব সময় এরকমই থাকে? কে জানে। কতদিন যে আকাশের দিকে তাকানো হয় না! ঝাপসা জামরুলগাছটা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে জানলার উপর। পাতায় দুপুরের রোদ পড়ে চকচক করছে। যেন তারা কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলের অঙ্কস্যারের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে! সুশীলবাবু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। বাঃ, ভারী সুন্দর তো! হঠাৎ একটু হাওয়া দিতে কোথা থেকে একটা সবুজ পাতা উড়ে এসে সুশীলবাবুর পায়ের কাছে পড়ল। কোনও কারণ নেই, সুশীলবাবু তবু নিচু হয়ে যত্ন করে পাতাটা কুড়োলেন।

সুশীলবাবু বুঝতে পারছেন, ভিতরে ভিতরে একটা অন্য জিনিস শুরু হয়েছে। পাখির ডাকের প্রথম ধাক্কাটা কেটে যাওয়ার পর থেকে বাইরের ছটফটে ভাবটা যেন কমে যাচ্ছে। শান্ত লাগছে অঙ্কের মতো জটিল বিষয়ের বদলে ছোটখাটো, সহজ জিনিস ভাল লেগে যাচ্ছে। সেদিন যেমন ক্যালুকলাস নিয়ে বসেও খাতা সরিয়ে টিভিতে অনেক রাত পর্যন্ত সিংহশাবকদের খেলাধুলো দেখলেন। কাল ‘থিওরি অফ প্রবালিটি” বইটার বদলে কল্যাণের এনে দেওয়া ‘ডাকাতের গল্প’ অনেক বেসি ইন্টারেস্টিং মনে হল। কল্যাণের জন্যও খারাপ লাগছে। যতই ফাজিল হোক, ছেলেটা তো তাঁর জন্য কম দৌড়াদৌড়ি করছে না। এটাও একটা অন্যরকম ঘটনা। সুশীলবাবু নিজেও জানেন, কল্যাণের জন্য মনখারাপ করার মতো দুর্বল মানুষ তিনি নন। স্ত্রীকে বললে বিশ্বাস করবে না, আর কল্যাণ শুনলে তো হেসে গড়িয়ে পড়বে। কিন্তু ঘটনা সত্যি। মন অন্য দিকেও দুর্বল হচ্ছে। মন দুর্বল না হলে তাঁর মতো একজন জাঁদরেল শিক্ষক এতক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে থাকেন? পায়ের কাছে পড়ে থাকা পাতা কুড়িয়ে নেন। পাখির ডাকের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই তো? থাকতে পারে। পাখির কি মন আছে? সেই মন কেমন? দুর্বল? ডাকের পর তিনি কি পাখির মতো মনও পেয়ে বসছেন? সেটা তো আর একটা ভয়ংকর ব্যাপার হবে। পক্ষীবিশারদকে একবার জিজ্ঞেস করলে হয় না? ওঁর ফোন নম্বরটা কল্যাণের কাছে আছে নিশ্চয়ই।

ঘরে নমিতাদেবী ঢুকলেন। সুশীল পাত্র নড়েচড়ে বসলেন। গলায় মাফলার ঠিক করলেন, “দ্যাখো, তোমাকে দেখতে কে এসেছেন।”

সুশীলবাবু মুখ তুলে শশাঙ্কশেখর ধরকে দেখতে পেলেন।

শশাঙ্কশেখরবাবুর মুখ নার্ভাস। নার্ভাস হওয়ারই কথা। একটু আগে নমিতাদেবী তাঁকে কোকিলের ঘটনা জানিয়েছেন। নবলাল, অর্ক যা বলেছে সেই একই ঘটনা। তবে তিনি বিশ্বাস করেননি। অসম্ভব, হতেই পারে না। এরা অবশ্যই কোনও ভুল করছে। পৃথিবীতে একসঙ্গে অনেকে মিলে ভুল শোনা, ভুল দেখার অজস্র উদাহরণ আছে। মাস হিস্টিরিয়ার ঘটনা তো আকছার শোনা যায়। একজন ভূত দেখলে নাকি অনেকে দ্যাখে! এটাও হয়তো সেরকম। অন্যের বিশ্বাস নিজের মধ্যে সংক্রামিত হয়েছে। এর থেকে বাঁচার একটাই উপায়, কোকিল নিয়ে কোনরকম উৎসাহ না দেখানো। শশাঙ্কশেখরবাবু নিজের মনকে শক্ত করলেন।

ঘরে ঢোকার সময় শশাঙ্কশেখরবাবু ভেবেছিলেন, মানুষটি বিরক্ত হবেন। সুশীলবাবু তা তো হলেনই না, উলটে হাসিমুখে চেয়ার এগিয়ে দিলেন। শশাঙ্কশেখরবাবু দেখলেন, কোকিলের ডাক মিছে হতে পারে, কিন্তু মানুষটির আচরণ বদলে যাওয়ার যে কথা নমিতাদেবী একটু আগে তাঁকে বলেছেন, সেটা সত্যি। সেই হম্বিতম্বি, ছটফটে ভাবটা কই? এই ক’টা দিনেই রাগি মানুষটি যেন অনেকটা নরম হয়ে গিয়েছেন। এটা একটা আশ্চর্যের ঘটনা। তবে বড় আশ্চর্যের কথা হল, অঙ্কস্যারের পাশে যে বইটা পড়ে আছে, সেটা। কোনও পাটিগণিত, বীজগণিত নয়, বইয়ের নাম ‘আবোল তাবোল’। লেখকের নাম সুকুমার রায়।

সুশীল পাত্র ‘আবোল তাবোল’ পড়ছেন? বাপ রে!

শশাঙ্কশেখরবাবুর মনে কথা সম্ভবত বুঝতে পারলেন অঙ্কস্যার। লাজুক হেসে সামনের কাগজ টেনে লিখলেন, ‘কাল বাড়ি ফেরার সময় বইটা কিনলাম।’

শশাঙ্কশেখরবাবু তাড়াতাড়ি বললেন, “ভাল করেছেন!”

সুশীলবাবু লিখলেন, ‘ছেলেবেলায় পড়েছিলাম, তারপর আবার এই পড়ছি চমৎকার লাগছে। এই বই বৃদ্ধ বয়সেও পড়া উচিত। আপনিও পড়বেন।’

শশাঙ্কশেখরবাবু থতমত খেয়ে বললেন, “নিশ্চয়ই পড়ব।”

সুশীলবাবু পাতা উলটে লিখলেন, ‘আপনি আসায় আমি খুব খুশি হয়েছি।’

শশাঙ্কশেখরবাবু গলা নামিয়ে বললেন, “আপনাকে না বলে একটা কাজ করেছি সুশীলবাবু। করাটা ঠিক হয়নি, কিন্তু ক্লাস এইটের ছেলেরা খুব কান্নাকাটি করছিল বলে, করতে বাধ্য হয়েছি।’

সুশীলবাবু অবাক হয়ে খাতার বদলে এবার স্লেট টেনে লিখলেন, ‘কান্নাকাটি! কেন?’

হেডমাস্টারমশাই আমতা আমতা করে বললেন, “অঙ্কে ফেল করেছে, তাই! শুধু ফেল নয়, একেবারে যা-তা রকমের ফেল। আপনি তো জানেনই, নিজেই তো খাতা দেখেছেন, দুই, তিন, চার করে নম্বর পেয়েছে সবাই। এত কম নম্বর পাওয়া খুবই অপমানের বিষয়। সেই অপমানের কারণেই কাঁদছিল। আজ আমি এই অঙ্কপরীক্ষা বাতিল বলে ঘোষণা করে দিয়েছি। বলেছি, আমাদের অঙ্কস্যার সুস্থ হয়ে ফিরলে তিনিই আবার পরীক্ষা নেবেন। নতুন প্রশ্নপত্র তৈরি হবে। কাজটা আপনাকে জানিয়েই করা উচিত ছিল। কিন্তু আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ওদিকে ছেলেরা খুবই মনোকষ্টে ছিল। শুনেছি, অনেকে নাকি রাতে অঙ্ক নিয়ে দুঃস্বপ্ন পর্যন্ত দেখেছে। তাদের নম্বর তাড়া করে আসছে। আমাকে মাপ করবেন সুশীলবাবু!”

শশাঙ্কশেখরবাবু থামলেন। সুশীল পাত্র কী করবেন? কতটা রাগ দেখাবেন? প্রধানশিক্ষককে কতটা রাগ দেখানো যায়? বিশেষ করে তিনি যদি বাড়ি পর্যন্ত এসে ক্ষমা চান?

উলটো দিকে সুশীল পাত্র বসে রইলেন চুপ করে মাথা নামিয়ে। সত্যি তো, এই দুঃখ, অপমানের কথাটা তো মাথায় আসেনি! কঠিন অঙ্ক বানিয়ে ছেলেপুলেদের প্যাঁচে ফেলা যায় তিনি জানতেন, কিন্তু দুঃখেও ফেলা যায় নাকি? ছি ছি! এটা তিনি কী করেছেন এতদিন? মোটেই ভাল কাজ করেননি। অন্যায় হয়েছে। জোর করে বিচ্ছিরি নম্বর দেওয়া আসলে যে একরকম অপমানই করা, এটা বুঝতে এত বছর লেগে গেল? ইস! সুশীলবাবু বুঝতে পারলেন, তাঁর খারাপ লাগছে। ছাত্ররা অঙ্ক না পারলে যে মানুষটি এতদিন খুশি হতেন, আজ তাদের কান্নার কথা শুনে খারাপ লাগছে।

আরও খানিকক্ষণ মাথা নামিয়ে বসে থাকার পর সুশীলবাবু শান্ত ভঙ্গিতে স্লেটে লিখলেন, ‘ঠিক করেছেন, ধন্যবাদ!’

রাগারাগির বদলে ধন্যবাদ-এ শশাঙ্কশেখরবাবু যেমন আশ্চর্য হলেন, তেমন খুশিও হলেন। আচ্ছা, মানুষটি কি জানেন যে, ওঁর স্ত্রী তাঁকে পাখির ঘটনা জানিয়ে দিয়েছেন? যদি না জানেন তা হলেও সবচেয়ে ভাল হয়। বেচারি মিছিমিছি একটা অস্বস্তির মধ্যে পড়বেন। যে অসুখ সত্যি নয়, যে অসুখ মনের মধ্যে মিথ্যে বাসা বেঁধেছে, তাই নিয়ে অস্বস্তি। তিনি বললেন, “সুশীলবাবু, ছুটি নিয়ে ভাববেন না, আমি সব ব্যবস্থা করে রাখব। আপনি নিশ্চিন্তে ক’টা দিন বিশ্রাম নিন। তবে শনিবার একবার স্কুলে যেতে হবে। স্কুলে ইনস্পেক্টর আসবেন। আজই চিঠি পেলাম। বোঝেনই তো, এঁরা আবার সবাইকে না দেখলে রাগারাগি করেন। তবে চিন্তার কিছু নেই, আমি আপনার শরীরের কথা বলে রাখব। মনে হয় না, তারপরেও উনি আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসা করবেন।” কথা শেষ করে শশাঙ্কশেখরবাবু উঠে দাঁড়ালেন, “এবার যেতে হবে।”

অঙ্কস্যার লিখলেন, ‘আবার আসবেন’। একা-একা বন্দি হয়ে আছি, মনে হয় শাস্তি পেয়েছি।’

শশাঙ্কশেখরবাবু ঝুঁকে পড়ে সুশীলবাবুর একটা হাত ধরে বললেন, “বন্দি কেন? বিশ্রাম নিচ্ছেন বলুন! সব ঠিক হয়ে যাবে। আর কেউ আসে না আপনাকে ভয় পায় বলে।”

কথা শেষ করে আবার একটু হাসলেন শশাঙ্কশেখরবাবু। ডাকসাইটে, বজমেজাজি মানুষটির জন্য এখন কেমন যেন মায়া হচ্ছে তাঁর! কেন হচ্ছে? মানুষটির মধ্যে একটা বদল দেখছেন বলে?

সুশীলবাবুও মৃদু হাসলেন। লিখলেন, ‘ভয় নয়, অপছন্দ।’

শশাঙ্কশেখরবাবু বললেন, “আপনি এসব ভাববেন না, শনিবার স্কুলে চলে আসুন। আর হ্যাঁ, গলার মাফলারটা নিতে ভুলবেন না যেন! ইনস্পেক্টর ভদ্রলোক শুনেছি একজন ঝামেলার মানুষ। গোলমেলে খবর পেলে তবে স্কুলপরিদর্শনে আসেন। কোন খবর পেয়ে যে উনি কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুল বাছলেন কে জানে?”

সুশীলবাবু এসব কথা যেন শুনতে পেলেন না। দ্রুত হাতে লিখলেন, ‘আচ্ছা শশাঙ্কবাবু, বলুন তো কোকিলের ডাক শুনলে মন কি শান্ত হয়? শুকনো, কঠিন ভাবটা কাটে?’

চমকে উঠলেন শশাঙ্কশেখরবাবু। এই রে, আবার সেই কোকিল? না,মানুষটি কোকিল থেকে বেরোতে পারছেন না মনে হয়। যাই হোক, কোকিলের ডাক বিষয়ে একটা ভাল সার্টিফিকেট দেওয়া দরকার মনে হচ্ছে। তিনি ঢোক গিলে, ঠোঁটে অল্প হাসি এনে বললেন, “দেখুন সুশীলবাবু, আজকাল সেভাবে তো আর পাখির ডাক শোনা হয় না। বয়স হয়েছে, কাজকর্ম বেড়েছে, বসে-বসে পাখির ডাক শোনবার সময় কোথায়? তবে নির্জন বিকেলে কাজকর্মের ফাঁকে হঠাৎ করে যদি এক-আধটা কোকিল ডেকে ওঠে, মন্দ কী? মন শান্ত হয় কি না জানি না মশাই, তবে বেশ ফুরফুরে লাগে। চমৎকার লাগে মনে হয়…।”

এতক্ষণ পরে সুশীলবাবু না লিখে মুখ খুললেন। গভীর আগ্রহ নিয়ে বললেন, “কী মনে হয়?”

শশাঙ্কশেখরবাবু যেন সামান্য লজ্জা পেলেন। বললেন, “মনে হয়, কাজকর্ম ফেলে দু’ দণ্ড দাঁড়িয়ে শুনে যাই। আপনার মনে হয় না?”

সুশীলবাবু এই প্রশ্নের কোনও উত্তর দিলেন না। তিনি খোলা জানলা দিয়ে তাকালেন বাইরে। এই অভিজ্ঞতা তাঁর নেই। একদিন ডাক বুঝতে তিনি পাটিগণিত, বীজগণিত, জ্যামিতির ডাকই শুধু বুঝেছেন। তাদের ডাকে সাড়াও দিয়েছেন। এমনকী, না ডাকতেও ছুটে গিয়েছেন। বই, খাতা, পেন, পেনসিল নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। মন দিয়ে শোনা তো দূরের কথা, পাখির ডাক বলে যে আলাদা একটা কিছু দুনিয়ায় আছে, সেই ডাক শোনার জন্য মানুষ যে থমকে দাঁড়াতে পারে, এমনটাই তাঁর মাথায় আসেনি কখনও! শশাঙ্কশেখরবাবুর কথা শুনে তিনি চমকে উঠলেন। পাখিরডাক শুনতে ইচ্ছে করে! বাঃ সুন্দর তো! কই, তাঁর কথা শোনবার জন্য তো কারও কখনও ইচ্ছে হয় না! এতদিন এসব খেয়াল হয়নি। আজ হচ্ছে! কেন হচ্ছে? গলায় পাখির ডাক এসেছে বলে? আচ্ছা, তাঁর গলার কোকিলের ডাক শোনার জন্যও কি মানুষ থমকে দাড়াবে?

হেডমাস্টারমশাই চলে যাওয়ার একটু পরেই সুশীলবাবু একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। শান্ত মাথা এবং নরম মনে নেওয়া হলেও সেই সিদ্ধান্ত সাংঘাতিক।

তিনি ঠিক করলেন, আর ডাক্তার-বদ্যি নয়। এমনকী, দুশ্চিন্তাও বন্ধ! গলার কোকিল-অসুখের যা খুশি হোক, মনের কোকিল-অসুখ তিনি সারাবেন না। অসুখ সারানোর ওষুধ জানা না থাকলেও, অসুখ রাখবার উপায় তিনি এই ক’দিনে বুঝে গিয়েছেন। টেবিল থেকে ঘণ্টা তুলে জোরে জোরে বাজাতে লাগলেন সুশীলবাবু। নমিতাদেবী ছুটে এলেন, “কী হল আবার?”

সুশীলবাবু এক গাল হেসে, মাফলারটা গলা থেকে খুলে ছুড়ে ফেললেন খাটের উপর। বললেন, “কিছু হয়নি। আমি কাল থেকে স্কুলে যাব। কুহু-কুহু, কুহু-কুহু… হ্যাঁ গো, ডাকটা ঠিকমতো শোনাচ্ছে তো?”

নমিতাদেবী ঘাবড়ে গিয়ে চোখ বড় করে বললেন, “মানে?”

সুশীলবাবু ফিক করে হেসে বললেন, “মানে আবার কী? কিছুই নয়। তোমার দাঁড়িয়ে শুনতে ইচ্ছে করছে, কি না, সেটা বলো। কুহু- কুহু…।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%