প্রচেত গুপ্ত
আজ একটা ঐতিহাসিক দিন। কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলের ক্লাস এইটের ছেলেরা সকালে স্কুলে এসে দেখল নোটিশবোর্ডে নোটিশ পড়েছে। সেই নোটিশ এইরকম—
‘এ বছর হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার অঙ্ক প্রশ্নপত্রে কিছু ত্রুটি ধরা পড়েছে। সম্ভবত প্রশ্নপত্র ছাপবার সময় যান্ত্রিক কারণেই এই ত্রুটি। ছাপার ভুল। আমাদের অঙ্কশিক্ষক সুশীল পাত্র মহাশয় অসুস্থতার কারণে স্কুলে আসছেন না। ফলে ত্রুটির সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি। তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে এলে অবশ্যই কারণ অনুসন্ধান হবে। তবে তার আগে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এইটের এই অঙ্কপরীক্ষা আপাতত বাতিল। অঙ্কশিক্ষক মহাশয় সুস্থ হয়ে ফিরে এলে এই পরীক্ষা আবার নতুন করে নেওয়া হবে। নতুন করে প্রশ্নপত্রও তৈরি হবে।’
নোটিশের তলায় হেডমাস্টারমশাইয়ের সই। ক্লাস এইটের ছেলেরা তো খুশিতে নাচানাচি শুরু করে দিল। এরকমটা হবে তারা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। চোখের জল দেখে খুব বেশি হলে পাঁচ-দশ নম্বর গ্রেস মার্কস আদায় করা যেত। তাতে যে খুব কিছু লাভ হত এমন নয়। দশ নম্বর যোগ করার পরও অর্ধেকের অনেক বেশি ছাত্র ফেল থাকত। তার বদলে একেবারে পরীক্ষা বাতিল। নিশ্চয়ই বড় ধরনের কিছু ঘটেছে। অন্য স্যারেরাও মুখ খুলছেন না। জিজ্ঞেস করলে কেউ “ওরে বাবা, আমি কিছু জানি না।” বলে চুপ করে যাচ্ছেন, কেউ হাসছেন মিটিমিটি!
টিফিনের সময় কয়েকজন ছেলে অতি উৎসাহে হেডস্যারের ঘরে গেল প্রণাম করতে, পরীক্ষা বাতিলের প্রণাম। এরা কেউই দশের বেশি নম্বর পায়নি। এদের লিডার অর্ক। হরবোলা অর্ক। তার কপালে জুটেছিল ঠিক আড়াই নম্বর। সে শুধু বীজগণিতের একটা ফর্মুলা ঠিকঠাক লিখেছিল, বাকি সব কাটা।
টিফিনের সময় নবলাল হেডস্যারের ঘরে ঢুকে বলল, “স্যার, ছেলেরা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।”
শশাঙ্কশেখরবাবু মাথা নামিয়ে স্যারেদের রুটিন বানাচ্ছেন। মনটা খুঁতখুঁত করছে। অঙ্কপরীক্ষা নিয়ে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, কিন্তু অঙ্কশিক্ষককেই জানানো হল না। একটা দিন অপেক্ষা করা যেত না এমন নয়। প্রথমে সেরকমটাই মনে মনে ঠিক করেছিলেন শশাঙ্কশেখর ধর। একবার অন্তত কথা বলে নেবেন। কিন্তু গোলমাল হল কাল রাতে।
শোওয়ার পর যেই হেডমাস্টারমশাই শশাঙ্কশেখর ধর চোখ বুজেছেন তখনই চোখের সামনে নিজের পরীক্ষা দেওয়া খাতাটা ভেসে উঠল। লাল কালি দিয়ে খাতার উপর লেখা ‘সতেরো’! ভয়ংকর! মারাত্মক! একজন এম এ বি এড প্রধানশিক্ষক অঙ্কে মাত্র সতেরো! তাও ক্লাস এইটের অঙ্ক! এই খবর যদি স্কুলে ছড়িয়ে পড়ে? কেউ যদি ড্রয়ার থেকে ওই খাতা চুরি করে নেয়? এরপরই তিনি ধড়মড় করে উঠে বসলেন। খাট থেকে নেমে পরপর তিন গ্লাস জল খেলেন। গোটা রাত পায়চারি করলেন ঘরের ভিতর এবং ভোররাতের দিকে সিদ্ধান্ত নিলেন, অঙ্কস্যার আসুন বা না আসুন, স্কুলে গিয়ে প্রথমেই তিনি নোটিশ দেবেন। তারপর অন্য কাজ। সেই মতোই নোটিশ পড়েছে। তবে সুশীলবাবু ফিরে এসে অপমানিত যাতে না হন, তার জন্য একটা ‘যান্ত্রিক ত্রুটি’র কথা যোগ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন আবার অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে, বেশি ঝুঁকি নেওয়া হয়ে গেল। ফিরে এসে সুশীলবাবু যদি বেঁকে বসেন? যদি বলেন, না, পরীক্ষা বাতিল নয়। অথবা যদি নতুন করে পরীক্ষা নিতে রাজি না হন? স্কুলে আসার পথে সুশীলবাবুকে একবার সিদ্ধান্তের কথাটা জানিয়ে এলেও মন্দ হত না। অন্তত একটা টেলিফোন করলেও হত। সত্যি কথা বলতে কী, সতেরো নম্বরটা এমনভাবে তাড়া করল যে, আর অপেক্ষা করা গেল না। এখন কি আর সুশীলবাবুকে কথাটা জানানো উচিত হবে? ভেবেছিলেন, আজ একবার বাড়ি গিয়ে দেখা করে আসবেন। মনে হয় না সেটা ঠিক হবে। অসুস্থ শরীরে যদি শোনেন অঙ্ক পরীক্ষাটাই বাতিল, তা হলে নির্ঘাত অপমানে আরও অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তা হলে?
নবলালের দিকে তাকিয়ে শশাঙ্কশেখরবাবু বিরক্ত মুখে বললেন, “আবার কোন ছেলেরা দেখা করবে?”
নবলাল বলল, “স্যার, ক্লাস এইটের ছেলেরা এসেছে।”
“ক্লাস এইট! কেন, তাদের আবার কী হল? পরীক্ষা তো ক্যানসেল করে দেওয়া হয়েছে। নোটিশ পড়েনি?”
নবলাল বলল, “সেই কারণেই তো এসেছে স্যার। আপনাকে প্রণাম করতে চায়।”
শশাঙ্কশেখরবাবু চোখ পাকিয়ে বললেন, “পরীক্ষা বাতিলের প্রণাম? তিন, চার, পাঁচ নম্বর পেয়ে সব প্রণাম করতে এসেছে? বাঁদরগুলোকে কান মলে এখনই ক্লাসে পাঠিয়ে দাও। একটা করে নয়, দু’টো করে কান মলবে। একটা মলবে কম নম্বরের জন্য, আর একটা মলবে প্রণাম করতে এসেছে বলে।”
নবলাল গলা নামিয়ে বলল, “স্যার, অর্ক ছেলেটিও এসেছে।”
শশাঙ্কশেখরবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, “অর্ক! সে কে?”
নবলাল ঝুঁকে পড়ে ফিসফিস করে বলল, “ওই যে হরবোলা স্যার! সুশীলবাবু যাকে বাড়িতে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। ডাকব?”
অঙ্ক পরীক্ষার ঝামেলায় শশাঙ্কশেখরবাবুর অর্কর কথাটা ভুলেই গিয়েছিলেন। তিনি তাড়াতাড়ি বললেন, “হ্যাঁ, ওই ছেলেকে পাঠিয়ে দাও।”
নবলাল ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। বলল, “স্যার, একটা কথা বলব?”
“বলো।”
“স্যার, কথাটা ভুলে গিয়েছিলাম, আজ সকালে হঠাৎ মনে পড়ল।”
শশাঙ্কশেখরবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, “কী কথা?”
নবলাল এক পা এগিয়ে এসে গলা নামিয়ে বলল, “অঙ্কস্যার যেদিন অসুস্থ হয়ে বাড়ি চলে গেলেন, সেদিন একটা কাণ্ড হয়েছিল। সেই সময় টিচার্সরুমে কেউ ছিলেন না। হঠাৎ শুনি ঘরের ভিতর ডাকে…।”

শশাঙ্কশেখরবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, “ডাকে! কী ডাকে?”
“কোকিল, স্যার, কোকিল ডাকে।”
শশাঙ্কশেখরবাবু হাতের পেন টেবিলে রেখে বললেন, “উফ নবলাল, তোমাকে কালই বললাম না, এসব উদ্ভট কথা বলবে না। আমাদের স্কুলের চারপাশে কত গাছপালা রয়েছে, সারাদিনই তো পাখির ডাক শুনছি। রোজ বিকেলেই তো টিয়াপাখির ঝাঁক আসছে। তারা ডাকেও। ডেকে কান একেবারে ঝালাপালা করে দেয়। কোকিলও নিশ্চয়ই অনেক ডেকেছে। আজও হয়তো ডাকবে। তুমি এমন একটা ভান করছ যেন কোকিলের ডাক তুমি সেদিনই প্রথম শুনলে।”
নবলাল গাঢ় গলায় বলল, “স্যার, টিচার্সরুম থেকে প্রথম শুনলাম।”
শশাঙ্কশেখর ধর এবার ধমক দিলেন, “চুপ করো। ওটা তোমার ভুল। কাছেপিঠে পাখির ডাক শুনে মনে হয়েছিল, একেবারে টিচার্সরুম থেকে ডাকছে। অঙ্কস্যারের রান্নার মেয়ে তোমাকে বানিয়ে বানিয়ে কী বলেছে, তারপর থেকে তোমার মাথায় এই উদ্ভট বিশ্বাসটা ঢুকে গিয়েছে। স্কুলে যদি এসব গুজব ছড়ায়, তা হলে একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার হবে। একেই হাজার রকমের ঝামেলা নিয়ে আছি। যাও এখন, ওই অর্ক ছেলেটিকে ডেকে দাও।”
অর্ক বুঝতে পারছে, তার সময় খারাপ যাচ্ছে। সময় খারাপ না হলে কারও এরকম ঘনঘন বাঘের গুহায়, সিংহের ঘরে ডাক পড়ে না। রাগি অঙ্কস্যার, গম্ভীর হেডস্যার ডেকে পাঠানো আর বাঘ-সিংহ ডেকে পাঠানোর মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। অঙ্কস্যারের বাড়িতে যাওয়ার সময় সে একবার ভেবেছিল গুরুজনদের প্রণাম করে যাবে। বিপদ থেকে বাঁচতে হলে গুরুজনদের আশীর্বাদ লাগে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেসব লাগেনি। বরং মিষ্টিমুখেই বিপদ কেটেছিল। এবার কী হবে? নবলালদা চোখ পাকিয়ে সবাইকে ক্লাসে যেতে বলল, শুধু তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি ভিতরে যাবে। স্যার তোমায় ডেকেছেন।”
কেন ডেকেছেন? খাঁচার খবরটা কি জানাজানি হয়ে গিয়েছে? হতে পারে। অসম্ভব কিছু নয়। হয়তো কাল সন্ধেবেলা যখন অঙ্কস্যারের বাড়ির সামনে সে জিনিসটা চুপিচুপি রেখে আসে, তখন কেউ দেখে ফেলেছিল। অঙ্কস্যার নিজেও নালিশ করতে পারেন। কোকিল নিয়ে কথা একমাত্র তার সঙ্গে হয়েছিল। সুতরাং দুয়ে দুয়ে চার করতে আর যার অসুবিধে হোক, অঙ্কস্যারের হবে না। এখন মনে হচ্ছে, ঝোঁকের বশে কাজটা করা ঠিক হয়নি। প্ল্যানটা তার হলেও, কাজটার পিছনে ক্লাসের অনেকেই আছে। অঙ্কস্যার যে তাকে কোকিলডাকের হোমটাস্ক দিয়েছেন, এই গোপন কথা অর্ক পরদিনই বন্ধুদের কাছে ফাঁস করে। গোপনেই করে। কিন্তু কথা খুব দ্রুত গোটা স্কুলে ছড়িয়ে গিয়েছে। ছেলেদের গোপন কথা স্কুলে সাধারণত দ্রুত ছড়ায়। তারপর আবার অঙ্কখাতায় ওই নম্বর! ফলে অঙ্কস্যারকে একটা শিক্ষা দেওয়ার জন্য সবাই মিলে ঠিক করে, বাড়ির সামনে খাঁচা রেখে আসা হবে।
হেডস্যারের ঘরে ঢুকে অর্ক প্রায় কেঁদে ফেলল, “স্যার, আমি কিছু জানি না। সত্যি বলছি স্যার। ওরা বলল… আমি স্যার, বারণ করেছিলাম।”
শশাঙ্কশেখরবাবু রাশভারী গলায় বললেন, “অর্ক, তুমি নাকি মুখ দিয়ে নানাধরনের আওয়াজ করতে পারো? কথাটা কি সত্যি?”
“আর কখনও করব না স্যার।”
শশাঙ্কশেখরবাবু শান্ত গলায় বললেন, “কী ধরনের আওয়াজ করতে পারো?”
অর্ক চোখ মুছল। এসব কী শুরু হয়েছে? মুখ দিয়ে আওয়াজ তো সে অনেকদিনই করতে পারে। স্কুলের সকলেই জানে। কই কেউ তো কখনও এভাবে ডেকে জেরা করেনি! এরপর কি খাঁচার কথা আসবে? সে ঢোক গিলে বলল, “স্যার, আমি একবার জিওগ্রাফি ক্লাসে ভুল করে নৌকোর… স্যার, আমি চাইনি, পিছন থেকে সোমসুন্দর বলল… আর কখনও হবে না স্যার।”
শশাঙ্কশেখরবাবু এবার একটু হাসলেন। বললেন, “আচ্ছা, ও কথা থাক। অর্ক, তুমি কি সুশীলবাবুর বাড়িতে গিয়েছিলে?”
অর্ক চুপ করে রইল। আর বাঁচার পথ নেই। মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে খাঁচা উপহার পাঠানোর জন্য কী শাস্তি হয়? অর্ক মাথা নামিয়ে নিচু গলায় বলল, “গিয়েছিলাম স্যার। অঙ্কস্যারই ডেকেছিলেন আমাকে।”
“কী বললেন?”
অর্ক বলল, “কিছু বলেননি।”
শশাঙ্কশেখরবাবু অবাক হয়ে বললেন, “বলেননি মানে? তোমাকে ডেকে পাঠিয়ে কিছু বললেন না?”
অর্ক এবার সাহস পেল, খাঁচার কথা কিছু আসছে না। বলল, “বলবেন কী করে স্যার? ওঁর গলায় তো অসুখ করেছে, সারাক্ষণ মাফলার জড়ানো। পাশে স্লেট আর চক।”
“স্লেট!”
অর্ক আর সামলাতে পারল না। ফিক করে হেসে ফেলল, “হ্যাঁ স্যার, একেবারে ছোটদের মতো। উনি সব কথা ওই স্লেটে লিখে দেখাচ্ছেন। খাতা, নোটবইও আছে, সেখানেও লিখছেন।”
শশাঙ্কশেখরবাবু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। এটা নিশ্চয়ই ডাক্তার বলেছেন। গলায় সমস্যা হলে ডাক্তাররা অনেক সময় কথা বন্ধ করে দিতে বলেন। প্রেসক্রিপশনের উপর বড় বড় করে লিখে দেন ‘ভয়েস রেস্ট’। তাঁর এক মামাতো বোনকে একবার টানা একমাস এই চিকিৎসার মধ্যে থাকতে হয়েছিল। গলা ভেঙে গিয়ে যাচ্ছেতাই কাণ্ড হয়েছিল তার। সুশীলবাবুর অসুখও নিশ্চয়ই সেরকম। তিনি অর্ককে বললেন, “স্যার তোমাকে লিখে লিখে কী বললেন? অঙ্ক দিলেন নাকি?”
অর্ক এবার পুরোপুরি নিশ্চিত, হেডস্যার খাঁচার কিছুই জানেন না। সে আরও একবার পিছন ফিরে ঘরের দরজার দিকে তাকাল। তারপর গলা নামিয়ে বলল, “না স্যার, অঙ্ক নয়, মুখ দিয়ে আওয়াজ করতে বললেন।”
হেডস্যার ভুরু কুঁচকে বললেন, “আওয়াজ! মানে ওই হরবোলা…?”
“হ্যাঁ স্যার। প্রথমে ভয় পেলেও পরে আমি অনেকরকম আওয়াজ শোনালাম। স্টিমার, রেল, মোটরবাইক। ঘোড়ার গাড়িও শুনিয়েছি। ঘোড়ার গাড়ির আওয়াজ করা খুব কঠিন। একসঙ্গে গাড়ির চাকা আর ঘোড়ার খুরের শব্দ করতে হয় তো, তাই কঠিন।”
শশাঙ্কশেখরবাবুর ভুরু আরও কুঁচকে গেল। তিনি সোজা হয়ে বসলেন। বদমেজাজি, রাগি, অঙ্কসর্বস্ব সুশীল পাত্র ছাত্রকে বাড়িতে ডেকে ঘোড়া ছোটার ঠকঠকানি শুনেছেন! ছেলেটা বানিয়ে বলছে না তো? কিন্তু নবলালও তো এরকমই বলেছিল। সবাই বানিয়ে বলবে কেন? “তারপর? তারপর কী হল?”
অর্ক একগাল হেসে বলল, “তারপর উনি আমাকে হোমটাস্ক দিলেন।”
শশাঙ্কশেখরবাবু নড়েচড়ে বসলেন। বললেন, “হোমটাস্ক! এর মধ্যে হোমটাস্কও দিয়ে ফেললেন? বাপ রে, তোমাদের অঙ্কস্যার তো দেখছি খুব সিরিয়াস। অসুস্থ হয়ে বাড়িতে ডেকে ডেকে ছাত্রদের হোমটাস্ক দিচ্ছেন। উনি কি স্কুলসুদ্ধ সব ছেলেকে এক এক করে ডাকবেন নাকি? তা কী হোমটাস্ক দিলেন? অ্যালজেব্রা না জিওমেট্রি?”
অর্ক মাথা চুলকে বলল, “না স্যার, সেসব নয়। উনি আমাকে পাখির ডাক শিখতে বলেছেন। শিখে পরের শনিবার স্কুল ছুটির পর আবার যেতে হবে।”
শশাঙ্কশেখরবাবুর এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়বার মতো অবস্থা হল। ছেলেটি বলছে কী? তিনি ঠিক শুনেছেন তো? পাখির ডাক!
অর্ক আবার হেসে বলল, “হ্যাঁ স্যার, পাখির ডাক। কোকিলের ডাক। অঙ্কস্যার বললেন, না না, বললেন না, স্লেটে বড় বড় করে লিখলেন, ‘তুই পাখির ডাক পারিস?’ আমি বললাম, ‘পারি না, তবে আপনি বললে চেষ্টা করব। কাক, দোয়েল, টিয়া, এগুলো সোজা। এগুলো চেষ্টা করব?’ উনি লিখলেন, ‘না, ওসব নয়। তুই কোকিলের ডাক শিখবি। এক সপ্তাহ সময়। এটাই তোর হোমটাস্ক। শনিবার স্কুল ছুটির পর আমাকে এসে শোনাবি।’ ”
এতটা বলে থামল অর্ক। কাঁচুমাচু মুখে বলল, “এখনও স্যার তেমন এগোতে পারিনি। মুশকিল হল, কাঞ্চনগড়ে কোকিল মনে হয় খুব একটা বেশি নেই। আমাদের ক্লাসের প্রতিম বলল, ঘোষবাগানের ওদিকটা গেলে হয়তো…।”
অর্ক চলে যাওয়ার পর খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন শশাঙ্কশেখর ধর। তারপর টেলিফোনটা টেনে নিলেন। টেবিলের কাচের তলাতেই শিক্ষকদের ফোন নম্বর লেখা তালিকা রয়েছে। সুশীল পাত্র’র ফোন বেজে গেল। উত্তর নেই। শশাঙ্কশেখরবাবু হাতের রিসিভার নামাতে নামাতে সিদ্ধান্ত নিলেন, ছুটির পর নয়, এখনই একবার ঘুরে আসবেন। নিজের চোখে দেখে আসবেন ঘটনা কী? কাউকে জানাবেন না। গোপনে যাবেন। কাগজপত্র গুছিয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার মুখে নবলাল একটা খাম দিয়ে গেল। মুখবন্ধ খাম। দ্রুত হাতে খাম খুলে চিঠি পড়ে আঁতকে উঠলেন শশাঙ্কশেখরবাবু। মাত্র দু’লাইনের চিঠি। সেই দু’লাইনই মারাত্মক। ‘কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুল পরিদর্শনের জন্য পরিদর্শক বলাইকান্ত সাঁপুই শনিবার যাচ্ছেন। ওইদিন স্কুলের সব ছাত্র, শিক্ষক, কর্মীরা যেন স্কুলে উপস্থিত থাকেন।’
স্কুল পরিদর্শন? এ যে বিনা মেঘে বাজের মতো! শেষ কবে কাঞ্চনগড় স্কুলে পরিদর্শক এসেছিলেন মনে করতে পারলেন না শশাঙ্কশেখরবাবু। তবে আসল ভয়ংকর কথা হল, পরিদর্শকের নাম বলাইকান্ত সাঁপুই। স্কুল পরিদর্শক বলাইকান্ত সাঁপুইয়ের কথা আশপাশের সব স্কুলই শুনেছে।
কোনও কোনও পুলিশ থানার ওসি হয় খুব জাঁদরেল। অনেক দূর পর্যন্ত তাদের নাম ছড়িয়ে পড়ে। সবাই তটস্থ হয়ে থাকে। এই বলাইকান্ত সাঁপুইও তেমনই। পার্থক্য শুধু তিনি থানার ওসি নন, স্কুলের ইনস্পেক্টর। তাঁকে নিয়ে অনেক রোমহর্ষক গল্প রয়েছে। কোনওটা সত্যি, কোনওটা বানানো। উনি পরিদর্শনে যান খুবই কম, কিন্তু যদি যান, সে হয় এক বিচ্ছিরি কাণ্ড। বিচ্ছিরি কাণ্ডটা ঠিক কী হবে আগে থেকে কেউ বলতে পারে না। এই ভদ্রলোক আগে থেকে খবর নিয়ে আসেন। গোলমালের খবর। বড় কোনও গোলমাল নয়, ছোটখাটো সব ব্যাপার। স্বাভাবিক কারণেই এই মানুষটি আসছেন শুনলে স্কুলগুলো তটস্থ হয়ে যায়।
বছর দুয়েক আগে বসাকপাড়া গার্লস স্কুলে গিয়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড হয়েছিল। বলাই সাঁপুইয়ের কাছে খবর ছিল, স্কুলের পূর্ব দিকের বারান্দায় গোলমাল আছে। বারান্দার দেওয়াল অনেকদিন ধরে অপরিষ্কার। কালো দাগ ধরেছে।
স্কুলের সামনে গাড়ি থামতেই সবাই ছুটে এল। বলাই সাঁপুই গাড়ি থেকে নেমে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, ‘আগে দোতলা। পুবের বারান্দা।’
সবাই থ। এত বড় স্কুলবাড়ির সব ফেলে প্রথমেই পুবের বারান্দা?
বারান্দায় পৌঁছে কালো দাগের সামনে থমকে দাঁড়ালেন সাঁপুইবাবু। এক বালতি চুন আর কয়েকটি মোটা মোটা ব্রাশের অর্ডার দিলেন। তারপর ধুতিটাকে মালকোঁচা মেরে নিয়ে নিজের হাতে জলে চুন ভিজিয়ে সেই দেওয়াল হোয়াইটওয়াশ করতে শুরু করলেন। পাক্কা একঘণ্টা ধরে চলল। পিয়ন, বেয়ারা, বড়দি আর অন্য শিক্ষিকারা ছুটে এলেন। ছুটে এল ছাত্রীরা। বলাইকান্ত গর্জন করে বললেন, ‘তফাত যাও।’
ঘটনা এখানেই শেষ নয়। এরপর সাঁপুইবাবু চেয়ার আনিয়ে সেই দেওয়ালের দিকে মুখ করে নাকি আরও ঘণ্টাখানেক বসেছিলেন। চা-বিস্কুট, দুটো শিঙাড়া, একটা সন্দেশ খেলেন। তারপর দেওয়াল শুকিয়ে ঝকঝকে সাদা হয়ে গেলে একগাল হেসে বললেন, ‘এবার চলি, আবার আসব। তখন গোটা স্কুলের সব ক’টা দেওয়ালই দেখব। চিন্তা করবেন না, দাগ থাকলে আমি নিজের হাতে হোয়াইটওয়াশ করে দিয়ে যাব। মনে রাখবেন, স্কুলের দেওয়াল হল পড়ুয়াদের মনের মতো। সেখানে ময়লা থাকলে চলবে না। সব হবে সাদা ফটফটে।’
শোনা যায়। পরের দিন থেকে বসাকপাড়া গার্লস স্কুলে শুরু হয়েছিল সাফাই-অভিযান। বড়দি কোমরে আঁচল জড়িয়ে হাতে ঝাঁটা নিয়ে একবার একতলা, একবার তিনতলা করেছেন। টানা সাতদিন এই সাফাই-কাণ্ড চলেছে। সলতেপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শনের গল্প আরও ভীতিজনক!

সেখানে পৌঁছেই গেমটিচারের খোঁজ করেছিলেন বলাই সাঁপুই। তিনি কাঁপতে কাঁপতে এলেন। বলাইবাবু বললেন, ‘এ কী, আপনার ভুঁড়ি কেন? গেমটিচারের ভুঁড়ি থাকা তো উচিত নয়। তা ছাড়া কমপ্লেন শুনেছি, আপনি নাকি ছেলেদের সঙ্গে মোটেই মাঠে নামেন না। ছায়ায় বসে হুইশল বাজান। ঘটনা কি সত্যি? আপনি গেমটিচার হুইশলটিচার? শিক্ষক নিজে না খেললে ছেলেরা উৎসাহ পাবে কোথা থেকে? এটা ঠিক নয়, নো না।’
গেমটিচারের কাঁপুনি গেল আরও বেড়ে। এবার সাঁপুইবাবু বললেন, ‘ঠিক আছে ফুটবলটা নিয়ে আসুন দেখি! হাওয়া ভরে আনবেন।’
ফুটবল এলে বলাই সাঁপুই গেমটিচারকে নিয়ে সোজা চলে যান স্কুলের মাঠে। তাঁকে দাঁড় করান গোলপোস্টে। পেনাল্টিতে বল রেখে গুনে গুনে কিক মারেন বারোটা। বারোটাই গোল!
গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে পরিদর্শক বললেন, ‘না না, এটা ঠিক নয়। গেমটিচারের এক ডজন গোল খাওয়া খুবই খারাপ একটা ব্যাপার। এটা মোটেই ঠিক নয়।’
এরপর অফিসে বসে হেডস্যার স্কুলের ছাত্রদের ভাল রেজাল্ট, মাস্টারমশাইদের বড় বড় ডিগ্রির ফাইল বের করে পরিদর্শকমশাইকে দেখাতে গেলেন, তিনি বেজার মুখে সেসব সরিয়ে রাখলেন। বললেন, ‘আচ্ছা আপনিই বলুন না, এটা কি উচিত? বারোটা কিকে গেমটিচারের বারোটা গোল খাওয়া কি ভাল দেখায়?
এক সপ্তাহ যেতে না যেতে স্কুলে চিঠি এল। সলতেপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের গেমটিচারকে তিন মাসের ফুটবল প্রশিক্ষণে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি যেন দু’দিনের মধ্যে বাগিচাপুর ফুটবল প্রশিক্ষণ শিবিরে গিয়ে যোগাযোগ করেন। চিঠি হাতে পেয়ে গেমটিচারের প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থা। বাগিচাপুর ফুটবল প্রশিক্ষণ শিবিরে মিলিটারি নিয়ম। প্রতিদিন ভোর চারটের সময় হাফপ্যান্ট আর কেড্স পরে মাঠে পৌঁছে যেতে হয়। দশবার দৌড়ে মাঠ প্রদক্ষিণ দিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু হয়।
সেই মানুষটি এবার এখানে আসছেন, কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলে। রিকশায় বসেই শশাঙ্কশেখরবাবু আরও একবার খাম খুলে চিঠিটা পড়লেন। কী হবে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন