প্রচেত গুপ্ত
স্কুলপরিদর্শক বলাই সাঁপুই একটা মারাত্মক কাজ করেছেন। কাজটা করে এখন প্রধানশিক্ষকের ঘরে বসে মিটিমিটি হাসছেন।
কাজটা হল, তিনি একদিন আগেই চলে এসেছেন। কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলের প্রধানশিক্ষকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। তিনি কী করবেন বুঝতে পারছে না। প্ল্যান ছিল, আজ স্কুল ছুটির পর ঝাড়পোঁছই শুরু হবে। গেটে ফুল দিয়ে সাজানো হবে। ফুলের অর্ডার হয়ে গিয়েছে। গাঁদাফুলের মালা। কাল খুব ভোরে সেই মালা আসছে। এমনকী, কলকাতা থেকে মিষ্টি এসে পৌঁছবে আজ রাতে। সব পরিকল্পনাই ভেঙে গেল! কেলেঙ্কারির এখানেই শেষ নয়, আরও আছে। আজ দু’জন শিক্ষক কামাই করেছেন। জিওগ্রাফি আর ড্রয়িংটিচার। তারপর নাইন-বি আর সিক্স-এ’র ক্লাসে ছাত্রদের উপস্থিতি ভাল নয়। সেভেনের কয়েকটা ছেলের জামা পর্যন্ত ইস্তিরি নেই। হতচ্ছাড়া নবলালটাও আজ জুতোর বদলে চটি পরে এসেছে। ছি ছি।
কী হবে শশাঙ্কশেখরবাবু কল্পনাও করতে পারছেন না। অত বড় মানুষটির মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। বলাই সাঁপুই ফিরে গিয়ে কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলের নামে যে কী জঘন্য রিপোর্ট জমা করবেন তা বোঝাই যাচ্ছে।
সাঁপুইবাবু বসে আছেন শশাঙ্কশেখরবাবুর ঘরেই। এখন অন্যরা খবর পাননি। তাঁকে গরম চা দেওয়া হয়েছিল, তিনি খাননি। তার বদলে এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত চেয়েছেন। স্কুলের বাগান থেকে লেবু পেড়ে এনে নবলাল শরবত করে দিয়েছে। বলাই সাঁপুই খুশি মনে সেই শরবত খাচ্ছেন এবং এখনও মিটিমিটি হাসছেন। যেন বলতে চাইছেন, হুট করে এসে পড়ে কেমন বিপদে ফেলেছি?
শরবত খাওয়া শেষ করে বললেন, “ভাল হয়েছে মাস্টারমশাই। আপনাদের বাগানের লেবুর স্বাদ খুবই উত্তম।”
শশাঙ্কশেখর ধর গদগদ গলায় বললেন, “ধন্যবাদ স্যার, আপনি যদি চান আর-এক গ্লাস শরবত খেতে পারেন।”
বলাই সাঁপুইকে দেখলে মনে হয় মজার মানুষ। চেহারা মোটার দিকে। গোঁফটাও বড়। সেই গোঁফে আলতো করে একটা হাসি ঝুলছে সব সময়। কে বলবে মানুষটি কড়া?
“না, আমি আর শরবত চাইছি না। আমার হাতে সময় খুবই কম। আজ আমি কাঞ্চনগড় স্কুলের দু’জন শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। এঁদের সঙ্গে সামান্য কথা বলেই আমি চলে যেতে চাই।”
বুকটা ধক করে উঠল শশাঙ্কশেখর ধরের। কোন দু’জন? যাঁরা কামাই করেছেন তাঁরা নয় তো? তাঁরাই হবেন। বলাই সাঁপুই খবর না নিয়ে আসেন না। তিনি ভয়ে ভয়ে বললেন, “কোন দু’জন স্যার? কাদের ডাকব?”
উত্তরে সাঁপুইবাবু যা বললেন তাতে শশাঙ্কশেখরবাবুর হাত-পা ঠান্ডা হওয়ার জোগাড়। এই দুই শিক্ষকের নাম নাকি পরিদর্শকবাবু জানেন না। তবে দু’জনের সম্পর্কেই খবর পেয়েছেন। একজনের কথা শুনেছেন স্কুল সিলেবাস কমিটির কর্তাদের কাছ থেকে। কাঞ্চনগড়ের এই শিক্ষক নাকি সিলেবাস কমিটির কাছে একটা গা ছমছমে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। সেই প্রস্তাবের মোদ্দা কথা হল, এখনই উচিত, স্কুলে সব সাবজেক্ট তুলে দিয়ে শুধু অঙ্ক চালু করা! এই ভয়াবহ মানুষটির সঙ্গে দেখা করতে চান পরিদর্শকমশাই। অন্যজনের খবর পেয়েছেন ব্যক্তিগতভাবে, দিয়েছেন তাঁর এক ভাগনে। ভাগনে একজন গুণী মানুষ। পশুপাখির চিকিৎসায় বিশেষ নাম করেছেন। গোরু-ছাগলের জ্বরজারি সারিয়ে বিখ্যাত হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। সাঁপুইবাবু গর্বের সঙ্গে জানালেন, পাখির ট্রিটমেন্টে তাঁর ভাগনে একজন পথপ্রদর্শক। ডানাভাঙা পাখিকে তিন দিনে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য কায়দা জানে। সেই পক্ষীবিশারদ ভাগনেই মামাকে কাল না পরশু খবর দিল, কাঞ্চনগড় স্কুলের এক মাস্টারমশাইয়ের গলায় কোকিল ঢুকেছে! জ্যান্ত কোকিল। সেই কোকিল ইচ্ছে হলেই ‘কু-কু’ করে ডাক দিচ্ছে। তিনি নাকি পক্ষীবিশারদের সঙ্গে দেখাও করেছিলেন। গলার কাঁটা তোলার মতো করে কোকিলটিকেও বের করতে চান। কিন্তু এখনই তা সম্ভব হয়নি।
এই কোকিলমাস্টারকেও একবার দেখতে চান বলাইবাবু। একজন শিক্ষক স্কুলে গলায় কোকিল নিয়ে ঘুরে বেড়াবেন, আর তাঁর সঙ্গে স্কুলপরিদর্শক এসে দেখা করবেন না, এটা কখনও হতে পারে?
শশাঙ্কশেখরবাবু কী উত্তর দেবেন বুঝতে পারছেন না। মহাবিপদ! ভীষণ কেলেঙ্কারি! দু’জনে তো একজন মানুষ। অঙ্কস্যার সুশীল পাত্র। সিলেবাস বদলের প্রস্তাবটা জানলেও, ভদ্রলোক যে সত্যি-সত্যি ওই জিনিস সিলেবাস কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেবেন, কে ভাবতে পেরেছিল? আর পক্ষীবিশারদদের কাছে যাওয়ার ঘটনা তো কিছুই জানেন না তিনি! সুশীলবাবু পাখির ডাক্তারের কাছেও গিয়েছিলেন নাকি? উফ! এখন কী হবে? সুখবর একটাই, অঙ্কস্যার কাল থেকে স্কুলে আসতে শুরু করেছেন। শুধু আসছেন না, একেবারে বাড়ি থেকে ক্লাস এইটের জন্য অঙ্কের প্রশ্নপত্র তৈরি করে এনেছিলেন! বাতিল হয়ে যাওয়া পরীক্ষার প্রশ্ন। সেই প্রশ্ন দিয়ে কালই টিফিনের পর তিনটে ক্লাসের সময় নিয়ে পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে।
পরীক্ষা বাতিলের ঘটনা যে এতটা সহজভাবে উনি মেনে নেবেন শশাঙ্কশেখরবাবু ভাবতেও পারেননি। আজ সকালেই দেখে এসেছেন, ভদ্রলোক টিচার্সরুমে বসে মন দিয়ে খাতা দেখছেন। গলায় মাফলার। মুখে কথা নেই। শশাঙ্কশেখরবাবু পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “পরীক্ষা দু’দিন পরে নিলেই কিন্তু হত! আপনি ছুটিতে যাওয়ার আগে না হয় নিতেন। এত তাড়াহুড়োর কোন দরকার ছিল কি?”
পাশে রাখা নোটবইয়ে সুশীল পাত্র লিখলেন, ‘হ্যাঁ, দরকার ছিল। দয়া করে আপনি যদি এখন কথা না বলেন, আমি খুশি হব। আজই ছেলেদের নম্বর জানাতে হবে কিনা!’
স্কুলে এলেও অঙ্কস্যার এখনও মুখ কথা বলা শুরু করেননি। ক্লাসে ব্ল্যাকবোর্ড আর অন্য সময় নোটবই। নবলালকে ডাকছেন হাতছানি দিয়ে।
কিন্তু এই জাঁদরেল পরিদর্শকমশাই কি লিখে কথা মেনে নেবেন?
বলাই সাঁপুই ভুরু কুঁচকে বললেন, “কী হল? ওঁরা নেই? দু’জনেই অ্যাবসেন্ট নাকি? এ আপনার কেমন স্কুল মশাই? আপনি কেমন হেডমাস্টার? দেখলেন তো, কেন আগেই হুট করে চলে আসি? এটা আমার স্কুলপরিদর্শনের একটা কায়দা। সাঁপুই স্পেশ্যাল বলতে পারেন। কে কেমন কামাই করেন, ধরা যায়।”
শশাঙ্কশেখরবাবু আমতা আমতা করে বললেন, “না, না, অ্যাবসেন্ট নন। তবে…।”
বলাই সাঁপুই এবার চাপা গলায় গরগর করে উঠলেন, “তবে কী? শশাঙ্কশেখরবাবু, আপনি কি আপনার ওই দুই শিক্ষককে আড়াল করতে চাইছেন? এটা করবেন না। সব সাবজেক্ট তুলে স্কুল যেমন অঙ্ক-আতঙ্ক তৈরির জায়গা নয়, তেমনই গলায় কোকিল ঢুকেছে বলে গল্প ছড়ানোর জায়গা নয়। আপনি দু’জনকেই খবর দিন, আমি আলাদা-আলাদা করে কথা বলব। দরকার হলে এঁদের দুজনের বিরুদ্ধেই আমাকে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
শশাঙ্কশেখরবাবু বুঝলেন, আর কিছু করার নেই। বেচারি সুশীলবাবু একটা বড় ঝামেলার মধ্যে পড়তে চলেছেন। ইস, ভদ্রলোক কেন যে এসব ঝামেলার মধ্যে জড়ালেন? রাগ আর বদমেজাজ নিয়ে নিজের মতো ছিলেন। সিলেবাস বদলের প্রস্তাব আর পাখির ডাকের গল্পটা কি না করলেই হত না?
শশাঙ্কশেখরবাবু এবার বলাই সাঁপুইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দু’জন কিন্তু একজনই মানুষ।”
এবার সাঁপুইবাবুর ঘাবড়ানোর পালা। অস্ফুট গলায় বললেন, “অ্যাঁ, একজন মানুষ?”
“হ্যাঁ, উনি আমাদের অঙ্কস্যার সুশীলবাবু। সুশীল পাত্র। দাঁড়ান, আমি ওঁকে খবর পাঠাচ্ছি। ভদ্রলোকের শরীরটা ভাল নয়, ক’দিন হল গলার অসুখে…।”
পরিদর্শকমশাই এবার উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “থাক, ডাকতে হবে না। চলুন, আমরা নিজেরা গিয়ে দেখা করি। উনি এখন কোথায়?”
নবলাল ছুটে গিয়ে খবর আনল, অঙ্কস্যার তিনতলায়। ক্লাস এইটে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলাই সাঁপুই বললেন, “শুনেছি, আপনাদের ওই টিচারকে নাকি ছেলেরা খুবই ভয় পায়। শক্ত অঙ্ক দেওয়ায় উনি নাকি সিদ্ধহস্ত। ঘটনা কি সত্যি?”
শশাঙ্কশেখর ধর একটু চুপ করে থেকে বললেন, “হ্যাঁ, সত্যি।”
তিনতলায় পৌঁছতেই ক্লাস এইটের ঘর থেকে হইচই ভেসে এল। শশাঙ্কশেখরবাবু চমকে উঠলেন। সুশীলবাবুর ক্লাসে হইচই! টানাবারান্দা ধরে কয়েক পা এগোতেই বোঝা গেল, হইচইয়ের মধ্যে হাসি, হাততালি আর বেঞ্চ চাপড়ানো!
পরিদর্শকমশাই থমকে দাঁড়ালেন। চোখ বড় বড় করে বললেন, “এসব কী হচ্ছে শশাঙ্কবাবু? কী হচ্ছে এসব? আপনার স্কুলে ছেলেরা কি পড়তে পড়তে ক্লাসে হাততালি দেয়? বেঞ্চ বাজায়?”
শশাঙ্কশেখরবাবু বিড়বিড় করে বললেন, “অবিশ্বাস্য, অঙ্কস্যারকে সবাই বাঘের চেয়েও বেশি ভয় করে। ছেলেপিলেরা টুঁ শব্দ করতে ভয় পায়। আজ কী হচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না!”
রক্তচক্ষু করে সাঁপুইবাবু হুঙ্কার দিলেন, “কিচ্ছু বুঝতে হবে না। আমি আজই এর একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়ব। তার আগে আড়াল থেকে ঘটনাটা দেখতে চাই।”
ক্লাস এইটের কাছে পৌছে দু’জনে আড়াল থেকে যা দেখলেন তা সত্যি অবিশ্বাস্য! নিজের চেয়ারে হাসি-হাসি মুখে বসে আছেন সুশীল পাত্র। টেবিলের উপর পরীক্ষার খাতা। ছেলেরা এসে খাতা হাতে নিজের নম্বর চিৎকার করে সবাইকে জানাচ্ছে। বাকিরা খুশিতে হয় হাততালি দিচ্ছে, নয় টেবিল চাপড়াচ্ছে।
শুধু খুশি নয়, হাততালি না দিয়ে কোনও উপায় নেই। অঙ্কস্যারের নির্দেশ সেরকমই। তিনি পিছনের ব্ল্যাকবোর্ডে বড়-বড় করে লিখে দিয়েছেন, ‘আশির ঘরে নম্বর পেলে দু’বার হাততালি, নব্বইয়ের উপর নম্বর পেলে তিনবার টেবিল চাপড়ানো।’ নীচে সই করা ‘কোকিলস্যার’!
আশ্চর্যের কথা হল, দেখা যাচ্ছে, বাতিল হয়ে যাওয়া পরীক্ষা নতুন করে দিয়ে ক্লাস এইটের ছেলেরা কেউ আশি-নব্বইয়ের কম নম্বর পায়নি! প্রশ্ন এতই সোজা হয়েছে যে, একজন একশোয় একশো পর্যন্ত পেয়ে বসে আছে!
শশাঙ্কশেখরবাবু এগোতে যাচ্ছিলেন পরিদর্শকমশাই তাঁকে টেনে ধরে রাখলেন দরজার পিছনে। এরকম ঘটনা দেখা তো দূরের কথা, তিনি কখনও শোনেননি। চিরকাল বলাই সাঁপুই সব ক্লাসকে ঘাবড়ে দিয়েছেন, আজ কাঞ্চনগড় স্কুল তাঁকে ঘাবড়ে দিয়েছে। দারুণ! একমুখ হেসে তিনি ফিসফিস করে বললেন, “দাঁড়ান হেডমাস্টারমশাই, শেষ পর্যন্ত দেখি। আচ্ছা, ওই বোর্ডে লেখা ‘কোকিলস্যার’ ব্যাপারটা কী? অঙ্কের কোনও বিষয়?”
শশাঙ্কশেখরবাবু গলা নামিয়ে বললেন, “অঙ্ক কি না বুঝতে পারছি না। তবে হাতের লেখাটা যে অঙ্কস্যারের সেটা চিনতে পারছি।”
খাতা বিতরণ হয়ে যাওয়ার পর সুশীল পাত্র চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। হাত তুলে ছাত্রদের শান্ত হতে বললেন। তারপর ঝরঝরে গলায় বলতে শুরু করলেন, “শোনো ছেলেরা, নতুন করে নেওয়া অঙ্ক পরীক্ষায় তোমাদের পারফরমেন্সে আমি খুবই খুশি। শুধু যে তোমরা বেশি নম্বর পেয়েছ বলে আমি খুশি হয়েছি এমন নয়। খুশি হয়েছি তোমাদের আনন্দ দেখে। সম্প্রতি একটি ঘটনায় আমি অনুভব করেছি, খাতায় নম্বর যেমন দরকার, তেমনই মনে আনন্দও দরকার। সেই কথা মাথায় রেখেই আমি নতুন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করেছিলাম। সহজ প্রশ্ন তৈরিতে সময় লাগল। বুঝতে পারলাম, সহজ প্রশ্ন তৈরি করাটা অত সহজ কথা নয়। কাজটা বেশ কঠিন। ছেলেরা, দেরিতে হলেও কথাটা বুঝতে পেরেছি আমি। এটা কোনও লজ্জার কথা নয়! শুধু তোমাদের মতো ছোটরা নয়, অনেক কিছু বড়রাও পরে বুঝতে পারেন। মনে রাখবে, বুঝতে পারাটাই আসল।”
সব কথার অর্থ স্পষ্ট না হলেও ক্লাস এইটের ছেলেরা কিন্তু অঙ্কস্যারের মেজাজটা ধরতে পারল। কথার মাঝখানেই তারা ঝটাপট হাততালি দিয়ে উঠল। শশাঙ্কশেখরবাবু আড়াল থেকে দেখতে পেলেন, সত্যি-সত্যি আনন্দে ছেলেদের মুখ ঝলমল করছে! ভাগ্যিস এই ক্লাসরুম একটু দূরে, অন্যরা কিছু শুনতে পাচ্ছে না।
সুশীলবাবু আবার শুরু করলেন, “আমি ঠিক করেছি, এবার থেকে যে ছেলে অঙ্কপরীক্ষায় ফুলমার্কস পাবে, তাকে আমি পুরস্কার দেব। প্রথমে ভেবেছিলাম, জ্যামিতি বক্স দেব। সেই সিদ্ধান্ত বদল করেছি, এখন ঠিক করেছি, জ্যামিতি বক্সের বদলে বই দেব। আমার মনে হয়েছে, কবিতা, ছড়া, গল্প পড়ার জন্য তোমরা সকলেই এবার থেকে অঙ্কে ফুলমার্কস পাওয়ার চেষ্টা করবে। আমিও চেষ্টা করব, ফুলমার্কস দেওয়ার। কী, তোমরা রাজি তো?”

ক্লাসসুদ্ধ ছেলেরা হইহই করে উঠল, “রাজি স্যার, খুব রাজি!”
শশাঙ্কশেখরবাবু আড়চোখে তাকিয়ে দেখলেন, সাঁপুইমশাইয়ের চোখ কপালে উঠে গিয়েছে। পলক পড়ছে না। তাঁর নিজের অবস্থাও তো একই রকম। এসব কী ঘটছে? কী করছেন অঙ্কস্যার? সবচেয়ে বড় কথা, উনি কথা বলেছেন ! যে মানুষটি পাখির ডাক বেরিয়ে আসার ভয়ে গত কয়েকটা দিন একেবারে চুপ করে গিয়েছিলেন, সেই ডাক কোথায় গেল? কোকিলকণ্ঠ পালাল নাকি? নাকি মিথ্যে ভয়টাই পালিয়েছে?
হ্যাঁ পালিয়েছে, শশাঙ্কশেখরবাবু জানেন না। কেউই জানে না। খানিক আগে সুশীলবাবু নিজে শুধু বুঝতে জানতে পেরেছেন। যে অঙ্ক খাতা দেখতে দেখতে তাঁর গলায় কোকিলের ডাক এসেছিল, সেই খাতা দেখার সময়ই ডাকটা চলে গিয়েছে। পার্থক্য একটাই সেবার খাতার নম্বর ছিল খুব খারাপ। তিন, চার, পাঁচ। আর এবার আশির কমে নম্বরই নেই। আজও সেই সময় টিচার্সরুম ছিল ফাঁকা। খাতা দেখা শেষ করে অন্যমনস্কভাবে নবলালকে ডেকে ফেলেছিলেন সুশীলবাবু।
“নব, নবলাল, একবার এদিকে এসে খাতাগুলো ক্লাসে পৌঁছে দাও তো।”
কই, কোকিল কই! গলা তো পরিষ্কার! আগের মতো বাঁজখাই না হলেও, স্বাভাবিক!
সুশীলবাবু সোজা হয়ে বসলেন, আরও পরীক্ষা চাই। তবে এবার আর বাথরুমে গিয়ে নয়, নিজের চেয়ারে বসেই নিচু গলায় নামতা আওড়াতে শুরু করলেন তিনি। তেষট্টির মতো কঠিন নামতায় না গিয়ে তেরোর মতো সহজ নামতা আউড়েই পরীক্ষা চলল। একবার, দু’বার, তিনবার। না, নেই। সেই ডাক নেই! উত্তেজনায় সুশীলবাবু উঠে দাঁড়ালেন। গলা খুলে বললেন, “হাঁস ছিল, সজারু (ব্যাকরণ মানি না), হয়ে গেল ‘হাসজারু’ কেমনে তা জানি না।”
নবলাল ঘরে ঢুকে বলল, “কিছু বলছেন স্যার?”
সুশীলবাবু একগাল হেসে বললেন, “না, মাই ডিয়ার বয়। কিছু বলছিলাম না ছড়া কাটছিলাম।”
তারপর এক টানে গলার বদখত কুটকুটে মাফলারটা খুলে ছুড়ে দিলেন উপরে। সেই মাফলার ফ্যানের হাওয়ায় উড়ে দিয়ে পড়ল অষ্টম আশ্চর্যের ছবিওলা ক্যালেন্ডারের উপর, পিরামিডের ছবির একপাশে।
নবলাল থ’!
সুশীলবাবু শান্ত গলায় ছাত্রদের বললেন, “এবার তোমাদের ছুটি। তার আগে একটা ছোট্ট জিনিস আমার জানার আছে। সেদিন তোমাদের মধ্যে কেউ একজন আমার বাড়ির সামনে একটা খাঁচা রেখে এসেছিলে। আমি জানি কাজটা কার। যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ করে তার নাম আমি বের করে ফেলেছি। তবু আমি চাই, সে নিজেই স্বীকার করুক। অন্যায় নিজে স্বীকার করার মধ্যে একটা আলাদা তৃপ্তি আছে।”
সবাই চুপ। ঘর নিঃশব্দ। দরজার আড়ালেও দু’টো মানুষ দমবন্ধ করে আছেন। যেন উইংসের পাশে লুকিয়ে মঞ্চের নাটক দেখছেন। শুধু মুখে হাসি সুশীলস্যারের।
এক মিনিট, দু’ মিনিট, তিন মিনিট। পিছনের বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল হরবোলা অর্ক। ছলছলে চোখে বলল, “ভুল হয়ে গিয়েছে স্যার। আর হবে না।”
সুশীলবাবু এবার হো হো শব্দে হেসে উঠলেন, বললেন, “ঠিক ধরেছিলাম, জানতাম এ কাণ্ড তোর, দূর বোকা, কাঁদছিলি কেন? একটু-আধটু দুষ্টুমি না করলে অঙ্কে আশি পেতে হত না, গতবারের মতো আড়াই নিয়ে খুশি থাকতে হত। তবে আমার বাড়ি যাওয়ার কথাটা ফাঁস করা তোমার ঠিক হয়নি। এর জন্য তোমায় শাস্তি পেতে হবে। রাজি তো?”
অর্ক চোখ মুছে হেসে বলল, “রাজি স্যার।”
হরবোলা অর্ক এর পর অঙ্কস্যারের আদেশে মুখে হাতচাপা দিয়ে ক্লাসের সকলকে কোকিলের ডাক ডেকে শোনাল, “কুহু, কুহু, কুহু..।”
ভারী সুন্দর সেই ডাক! অবিকল কোকিলের মতো! এক টানা, ঘনঘন।
সকলেই হাততালি দিয়ে উঠল। এমনকী, দরজার আড়ালে লুকিয়ে থাকা হেডমাস্টারমশাই শশাঙ্কশেখর ধর এবং ডাকসাইটে স্কুলপরিদর্শক বলাই সাঁপুই পর্যন্ত !

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন