প্রচেত গুপ্ত
বেতের চেয়ারে ঝকঝকে চেহারার যে যুবকটি বসে আছে তার হাতে একটা প্লেট। প্লেটে ডবল ডিমের অমলেট। যুবকটি চামচ দিয়ে অমলেট কেটে কেটে খাচ্ছে আর খাটে বসে থাকা সুশীলবাবুর দিকে তাকিয়ে ফিকফিক করে হাসছে।
সুশীলবাবু মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। এই যুবকটিকে তিনি এমনিতেই সহ্য করতে পারেন না। দেখলেই কেমন একটা অ্যালার্জির মতো হয়, রাগে গা চিড়বিড় করে। তার ওপর এখন আবার হাসছে। চিড়বিড়ানি ভাব বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। যদি ক্ষমতা থাকত তা হলে মুখ একপাশে না ঘুরিয়ে পুরো পিছন দিকে ঘুরিয়ে নিতেন। পুরো তিনশো ষাট ডিক্রি। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। মানুষ মাথা তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরাতে পারে না।
যুবকটির নাম কল্যাণ। সুশীলবাবুর শ্যালক। নমিতাদেবীর একমাত্র ভাই। অতি আদরের ভাই। ফুর্তিবাজ, হাসিখুশি ধরনের ছেলে। সুযোগ পেলেই হইচই আর মজা করে। জামাইবাবুর রাগ, বদমেজাজকে মোটেও পাত্তা দেয় না। মানুষটি যে অঙ্কের মতো একটা সিরিয়াস সাবজেক্টের গুরুগম্ভীর শিক্ষক সেটা যেন তার মাথাতেই নেই! তাঁর সঙ্গেও সমান তালে ঠাট্টা রসিকতা চালায়!
এই কারণেই ছেলেটিকে সুশীলবাবুর এত অপছন্দ। তিনি মনে করেন, কল্যাণ একটি মহা ফাজিল ছোকরা। এই সব ছোকরাকে শায়েস্তা করার পদ্ধতি তাঁর জানা নেই এমন নয়, ভাল করেই জানা আছে। চৌবাচ্চায় নল দিয়ে জল ঢোকা, জল বের হওয়া সংক্রান্ত পাটিগণিতের সঙ্গে চৌবাচ্চা ভরতি হয়ে জল উপচে পড়ার জ্যামিতি মিশিয়ে অঙ্ক দিলেই ছোকরা কাত হয়ে যাবে। হাসি শুকিয়ে যাবে। কিন্তু গিন্নির কারণে সেটা সম্ভব নয়। তার ভাইকে অঙ্ক কষতে বসালে সংসারে একটা কাণ্ড লেগে যেতে পারে।
তাই কল্যাণকে সহ্য করা ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই সুশীলবাবুর। কিন্তু ও এই সাতসকালে কলকাতা থেকে এসে হাজির কেন? কে খবর দিল? তার দিদি? তাই হবে। শুধু খবর দেয়নি, বোঝা যাচ্ছে, ভাই আসছে জেনে সে একেবারে ডবল ডিমের ব্রেকফাস্ট তৈরি করে রেডি ছিল। আসতেই প্লেট হাতে ধরিয়ে বেডরুমে ঢুকিয়ে দিয়েছে।
এবার কল্যাণ বলল, “জামাইবাবু, যা শুনছি, ঘটনা কি সত্যি?”
সুশীলবাবু চমকে উঠলেন। মুখ ঘুরিয়ে শ্যালকের দিকে তাকালেন। কী শুনেছে? ভয়ংকর ঘটনা কি কিছু জানতে পেরেছে নাকি? কল্যাণ সবই শুনেছে। নমিতাদেবী আজ কাকভোরে তাঁর ভাইকে ফোন করেছিলেন। কল্যাণ খাটে শুয়েই মোবাইল ধরেছিল। জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করেছিল, “কী হয়েছে দিদি? এত সকালে ফোন করছিস কেন?” নমিতাদেবী শিউরে উঠেছিলেন, “সর্বনাশ হয়েছে! ভয়ংকর বিপদ হয়েছে। কোন আক্কেলে তুই এখনও ঘুমোচ্ছিস বল তো কলু?”
ভাইকে আদর করে নমিতাদেবী ‘কলু’ বলে ডাকেন। কল্যাণ ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসেছিল, “বিপদ! কার বিপদ? কীসের বিপদ?”
নমিতাদেবী কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছিলেন, “আবার কার? তোর জামাইবাবুর বিপদ।”
“জামাইবাবুর! কী হয়েছে? হার্ট অ্যাটাক?”
কথা বলতে বলতেই কল্যাণ ওদিকে খাট থেকে নেমে পড়েছিল। নমিতাদেবী আরও কঁদো কাঁদো গলায় বলেছিলেন, “হার্ট নয়, গলা অ্যাটাক। গলায় অ্যাটাক করেছে।”
“গলায় অ্যাটাক! সেটা আবার কী! ঘুম ভাঙিয়ে কী যা-তা বলছিস?”
“যা-তা কিনা নিজে এসে দেখে যা। আমার ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে রে কলু।”
কল্যাণ বলেছিল, “মাথা ঠান্ডা কর দিদি, বিপদের সময় মাথা ঠান্ডা করতে হয়। তুই আগে বল কী ঘটেছে? গলায় অ্যাটাক মানে? কাশিটাশি? ঠান্ডা লেগেছে?”
ভাইয়ের কথামতো নমিতাদেবী খানিকটা শান্ত হওয়ার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু কাশির কথা শুনে মাথা আরও গরম হয়ে গেল। রিসিভারটা মুখের কাছে এগিয়ে নিয়ে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, “ওসব কিছু নয়। তোর জামাইবাবু কাল থেকে পাখির ডাক শুরু করেছে। কাক, চড়ুই নয়, একেবারে কোকিলের ডাক। দু’টো কথা বলছে আর কুহু কুহু করছে। আমাকে বলছে, এক কাপ চা দাও কুহু, চায়ে আদা দেবে কুহু, ফ্যানটা ছেড়ে দাও কুহু কুহু, আমার তোয়ালেটা কোথায় কুহু, স্নান করতে যাব কুহু কুহু? কী মারাত্মক!”
ওদিকে কল্যাণ সোফার উপর ধপাস করে বসে পড়ল। মোবাইলটা হাত বদল করে ঢোক গিলে বলল, “দিদি, আর ইউ জোকিং? ভোরবেলা ঘুম ভাঙিয়ে আমার সঙ্গে মজা করছিস? তোর কি মনে হল ভোরবেলাটা রসিকতা করার পক্ষে উপযুক্ত সময়?”
“বললাম তো, মজা কি না এসে নিজের চোখে দেখে যা, সরি, কানে শুনে যা। কাল থেকে শুরু হয়েছে। স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এল, তারপর থেকে… একটু আগে দেখে এলাম, মানুষটা বসে বসে কীসব ছাইভস্ম আওড়াচ্ছে, আর মাঝেমধ্যে কোকিলের ডাক ডাকছে। আমি জিজ্ঞেস করতে বলল, পিথাগোরাস না ডাইনোসরাসের থিয়োরি বলছে। থিয়োরি বলে নাকি দেখছিল, মানুষের গলা ফিরেছে কি না। একটাই রক্ষে, যা করছে নিচু গলায় করছে। পাখির ডাক এখনও পর্যন্ত কেউ শুনতে পায়নি। শুনতে পেলে যে কী কেলেঙ্কারি হবে! উফ!”
কল্যাণ উত্তেজনায় প্রায় সোফার উপর উঠে দাঁড়িয়েছিল। বলেছিল, “দিদি, তুই যা বলছিস, ঘটনা যদি সত্যি হয়, তা হলে মনে হচ্ছে, জামাইবাবুর অ্যাটাক গলায় নয়, অ্যাটাক হয়েছে মাথায়। অঙ্ক করতে করতে মাথার গোলমাল হয়ে গিয়েছে। এরকম যে একটা কিছু হতই, তা আমি আগেই বুঝতে পারছিলাম। যারা সারা জীবন অঙ্ক নিয়ে থাকে তাদের ক্ষেত্রে দু’টো ব্যাপার হতে পারে, হয় ভাল, নয় মন্দ। দুর্ভাগ্য, জামাইবাবু মন্দের দিকটা বেছে নিলেন। ভাল হলে হয়তো দেখতিস, নোবেল-টোবেল পেয়ে একটা কাণ্ড করেছেন। ‘সুশীলস জিরো’ নামে থিওরেম চালু হয়ে গিয়েছে।”
নমিতাদেবী চাপা গলায় আবার ধমক দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “থামবি তুই? ফাজলামি হচ্ছে?”
কল্যাণ বলল, “তাও রক্ষে, জামাইবাবু এখন পাখির ডাক ডাকছেন। এরপর হয়তো বাঘ বা সিংহের ডাক দেবেন। মনে হয় এর পরের স্টেজটাই হবে আঁচড়ে কামড়ে দেওয়ার স্টেজ। আর সেটাই ডেঞ্জারাস।”
নমিতাদেবী টেলিফোনেই আঁতকে উঠলেন। চললেন “অ্যাঁ! আঁচড়ে দেবে? বলিস কী কল্যাণ?”
কল্যাণ শান্ত গলায় বলল, “দেবেনই যে এমন কথা শিওর হয়ে বলছি না। তবে দিতে পারেন, চান্স আছে। তুই রিস্ক নিস না দিদি। জামাইবাবুকে এখন ঘর থেকে মোটে বের হতে দিবি না। আমি সাতটা চল্লিশ বা আটটা কুডির লোকাল ধরে চলে যাচ্ছি। ঘণ্টাখানেকের বেশি তো লাগবে না। তুই ব্রেকফাস্ট রেডি করে রাখ। আজ কোকিলের ডাক শুনতে শুনতে ব্রেকফাস্ট করব।”
নমিতাদেবী বললেন, “চোপ৷ চোপ একদম। এবার কিন্তু একটা চড় খাবি কলু! জামাইবাবুর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে আর তুই মজা করছিস? লজ্জা করে না?”
কল্যাণ গম্ভীর গলায় বলল, “লজ্জার কী আছে দিদি? জামাইবাবু তো গোরুর ডাক ডাকছেন না যে, লজ্জা পাব। কোকিলের ডাক খুবই মিষ্টি। যাক, তুই চিন্তা করিস না, আমি আসছি। তুই শুধু মানুষটাকে ঘরে আটকে রাখ। পারলে দরজায় দুটো তালা মার। দেখবি, পাখি যেন উড়ে না যায়!”
ঘরে আটকানোর আলাদা করে দরকার নেই। সুশীলবাবু কাল থেকে নিজেই নিজেকে ঘরে আটকে রেখেছেন। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় রিকশা নিতে গিয়েও থমকে গেলেন। রিকশাওলার সামনেই যদি ঘটনাটা ঘটে? ভাড়া নিয়ে দরদাম করতে গিয়ে যদি গলা থেকে পাখির ডাক বেরিয়ে আসে? থাক, দরকার নেই। হেঁটেই বাড়ি ফিরছেন। হাঁটতে হাঁটতে ভাবলেন, যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। ঘটনাটাকে একটা অঙ্কের মতোই দেখতে হবে। এমন একটা জটিল অঙ্ক, যার মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝার উপায় নেই, অথচ বুঝতে হবে। সুতরাং মাথা শান্ত করা দরকার। কোন ফর্মুলায় এই জটিল অঙ্ক উদ্ধার করা যায় ভাবতে হবে। এর জন্য সবার আগে দরকার খানিকটা সময় আলাদা থাকা। ইংরেজিতে যাকে বলে আইসোলেশন। বাড়িতে স্ত্রী আর রান্নার লোক মায়া ছাড়া কেউ নেই। বাড়ি ফিরে টুক করে বেডরুমে ঢুকে পড়লেই চলবে। সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কারও সঙ্গে কথা বলা তো দূর অস্ত, দেখা করারও দরকার নেই। ভেবে খানিকটা নিশ্চিন্ত হলেন সুশীল পাত্র। তবে বাড়ির কাছাকাছি এসে মনে হল, স্ত্রীকে ঘটনাটা বলতে হবে। অন্যদের আটকাতে গেলেও তাকে লাগবে। কিন্তু ঘটনা সে কেমন ভাবে নেবে? স্বামী পাখির মতো আচরণ করলে স্ত্রীরা কী করে? অবাক হয়? রেগে যায়? নাকি সুটকেস গুছিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালায়? নমিতা কোথায় পালাবে? তার বাবা-মা মারা গিয়েছেন। বাপের বাড়ি বলতে শুধু একটা ভাই। কলকাতায় তার ফ্ল্যাটে চলে যাবে? কে জানে কী হবে!
নমিতাদেবী ঘটনাটা প্রথমে ঠান্ডাভাবেই নিলেন, “ও তাই নাকি?” বলে এমন একটা ভান করলেন যেন কিছুই হয়নি। আসলে ব্যাপারটা তিনি আমল দিচ্ছিলেন না। ভেবেছিলেন, এটাও অঙ্কের কোনও ব্যাপার। মানুষটি অঙ্ক নিয়ে রাতদিন কত উদ্ভট জিনিসই তো করেন। রবিবারের এক দুপুরে বারান্দায় বসে বেঁটে একটা লাঠিতে তেল মাখাচ্ছিলেন। জিজ্ঞেস করতে বললেন, “তেল-লাঠির অঙ্ক কষছি। সেই যে আছে না, একটা বাঁদর তেলমাখা লাঠিতে দু’ ফুট উঠেই পিছলে এক ফুট নামছে? সেটাই হাতে-কলমে দেখার চেষ্টা করছি। বাঁদর নেই বলে অসুবিধে হচ্ছে, তবে কাজটা হয়ে যাবে।”
পরশু না তার আগের রাতে আধোঘুমের মধ্যেই নমিতাদেবী শুনতে পেলেন, কে যেন বিড়বিড় করছে, “ঝিক, ঝিক, ঝিক…।” ছোটরা যেমন মুখে ট্রেন চলার আওয়াজ করে, সেরকম। চোখ খুলে নমিতাদেবী দেখেন, এ কী কাণ্ড! তাঁর স্বামী খাটের উপর বসে মুখ দিয়ে ট্রেন চালাচ্ছেন।
নমিতাদেবী বললেন, “কী হল? এ আবার কী নতুন জ্বালাতন শুরু করলে?”
“জ্বালাতন নয়, পাটিগণিত।”
নমিতাদেবী ঘুম ভাঙা বিরক্ত গলায় বললেন, “পাটিগণিত! পাটিগণিত করতে গেলে মুখ দিয়ে আওয়াজ করতে হয় নাকি?”
সুশীলবাবু উৎসাহের সঙ্গে বললেন, “আলবাত করতে হয়। একশোবার করতে হয়। এই ধরো না, একটা ট্রেন দশ সেকেন্ডে একশো পঞ্চাশ মিটার লম্বা প্ল্যাটফর্ম অতিক্রম করে। গোটা স্টেশন অতিক্রম করতে তার সময় লাগে বাইশ মিনিট। তা হলে ট্রেনটার দৈর্ঘ্য আর গতিবেগ কত? এই পর্যন্ত অঙ্ক দিলে ক্লাস এইটের অনেকেই পারবে। অঙ্কে মাথাওলা ছেলে ওই ক্লাসে অনেক আছে। কিন্তু এর সঙ্গে যদি আমি ট্রেনের আওয়াজটা যোগ করে শব্দের কম্পাঙ্কটা জানতে চাই, তা হলেই সবাই চিতপটাং হবে। ছেলেগুলো মাথা খুঁড়ে মরবে। কেমন হবে?” কথা শেষ করে বিজয়ীর হাসি দিলেন সুশীল পাত্র।
নমিতাদেবী পাশ ফিরতে ফিরতে বললেন, “খুব খারাপ হবে। পাগলামি বন্ধ করে ঘুমোতে দাও।”
এবারও তাই ভেবেছিলেন, এরকম কিছু হয়েছে। বাড়ি ফিরে সুশীলবাবু স্ত্রীকে নিচু গলায় বললেন, “কুহু, একবার বেডরুমে এসো।”
ঘরে ঢুকতে সুশীলবাবু দরজায় ছিটকিনি দিয়ে খাটের উপর বসে পড়লেন। নমিতাদেবীর কেমন সন্দেহ হল, “কী হয়েছে? তাড়াতাড়ি ফিরে এলে যে বড়? শরীরটরির খারাপ নাকি?”
সুশীলবাবুর হাতের ইশারায় ফ্যানটা জোরে চালাতে বললেন। তারপর নিচু গলায় বললেন, “একটা সমস্যা হয়েছে। তুমি কি কিছু বুঝতে পারছ, কুহু-কুহু?”
নমিতাদেবী এবার রেগে গেলেন। ভরদুপুরে বাড়ি ফিরে এসে মানুষটির এ আবার কেমন রসিকতা? দরজা আটকে কোকিলের ডাক শোনাচ্ছেন! নিশ্চয়ই অঙ্কের কোনও কারসাজি বের করেছেন। এখনই বলবেন, ‘একটা দারুণ অঙ্ক ফেঁদেছি। একটা কোকিল ঘণ্টায় সতেরোবার ডাকে, তা হলে সতেরোটা কোকিল…।’

এই রসিকতা এখনই থামাতে হবে। নমিতাদেবী চড়া গলায় বললেন, “এসবের মানে কী তোমার? অ্যাঁ! কী মানে? একদিন মাঝরাতে ট্রেনের ঝিকঝিক, একদিন ভরদুপুরে কোকিলের কু-কু, পেয়েছটা কী? তুমি কি চাও আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাই? পৃথিবীতে অঙ্কের মাস্টার তো তুমি একা নও, অনেক আছে। তোমার সমস্যাটা কী বলো তো?”
সুশীলবাবু স্ত্রীকে তাঁর সমস্যা বললেন। বললেন, একেবারে ঘটনার গোড়া থেকে। কীভাবে খাতা দেখতে দেখতে স্কুলের পিয়ন নবলালের কাছে জল চাইলেন, তখন কীভাবে কথার বদলে বাজখাঁই গলা দিয়ে কুহু-কুহ বের হল থেকে শুরু করে তেষট্টির নামতা, ‘আমাদের ছোটো নদী’ আবৃত্তি পর্যন্ত সব। নমিতাদেবী চোখ কপালে তুলে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে সব শুনলেন। যতটা ভয় পেলেন, তার চেয়ে ঘাবড়ে গেলেন অনেক বেশি। এ আবার কেমন অসুখ! মানুষটা যে মিথ্যে বলছেন এমনও নয়, একটা-দু’টো কথার পরপরই কু-কু করছেন! সেই কু-কু কোকিলের ডাকের মতোই সুরেলা! পাখি যেন বাড়ির বাগানে, গাছে বসে আছে! যদি বানিয়ে বানিয়ে ডাকও দেন, তা হলেও চিন্তার। যে মানুষটি সারাজীবন গান-বাজনার ধার দিয়ে গেলেন না, তিনি গলায় এত সুর পেলেন কী করে!
আতঙ্কিত মুখে নমিতাদেবী বললেন, “ভাইকে খবর দেব? ও চলে আসুক।”
সুশীলবাবু তাড়াতাড়ি বললেন, “খেপেছ? ওই বিচ্ছু ছেলে কী করবে? তা ছাড়া ঘটনা সবসময় তো ঘটছে না, মাঝেমধ্যে ঘটছে। কুহু-কুহু। দেখছ না, অনেকটা হেঁচকির মতো। মনে হয়, দু’টো দিন রেস্ট নিলেই সেরে যাবে। তবে একটাই ব্যাপার কুহু, ক’টাদিন কুহু-কুহু একটু আলাদা থাকতে হবে। অন্য কেউ শুনলে…।”
নমিতাদেবী চিন্তিত মুখে বললেন, “বলছ এমন কিছু নয়? ক’টা দিনের মধ্যে সেরে যাবে? কী জানি বাবা! আমার তো ভীষণ ভয় করছে। ডাক্তারবাবুকে ডাকব? তোমার এই ডাক যদি আমাদের মায়ার কানে যায়, তা হলে সর্বনাশ! ওই মেয়ে যেমন ভাল রান্না করে, তেমনই কোনও কথা পেটে রাখতে পারে না। একবেলাতেই গোটা কাঞ্চনগড়ে জানাজানি হয়ে যাবে। তুমি এখন দরজা বন্ধ করে বসে থাকো।”
সুশীলবাবু বাকি দিনটা দরজা বন্ধ করেই রইলেন। বিকেলে সাতজন আর সন্ধেবেলা পাঁচজন ছাত্র এসেছিল। সর্দি-কাশি আর গলা ব্যথা বলে নমিতাদেবী বাড়ির গেট থেকেই তাদের বিদায় করলেন। তারা পড়তে হবে না জেনে খুব খুশি মনে চলে গেল। যাওয়ার সময় মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগল, “হে ঠান্ডা লাগার ভগবান, হে সর্দি-কাশির দেবতা, মাস ছয়েকের আগে যেন স্যারের অসুখ না সারে! তুমি দেখো ঠাকুর, আমাদের রক্ষে কোরো।”
বিকেলে একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড করে বসলেন সুশীলবাবু। দরজার ফাঁকে মুখ বের করে হাঁক দিয়ে বললেন, “মায়া, মায়া, চা দাও। কুহু কুহু।”
কাজটা করেই সুশীলবাবু বুঝতে পারলেন ভুল হয়ে গেল। শুধু ভুল নয়, ডাক হয়েছে বেশ জোরে। মায়া তখন ছিল বারান্দায়। সে চমকে মুখ তুলে বাইরে তাকাল। কোকিলের ডাক! এই ভরসন্ধেবেলা কোকিল ডাকে কোথায়? বাড়ির ভিতর নাকি? আওয়াজ যেন বন্ধ ঘরের ভিতর থেকে এল! এল না? চায়ের জল বসিয়ে এসে সে নমিতাদেবীকে জিজ্ঞেস করল, “হ্যা গো বউদি, দাদার শরীর খারাপ নাকি গো? ঘরে দোর দিয়ে আছে কেন?”
নমিতাদেবী গম্ভীর গলায় বললেন, “হ্যাঁ, গলায় গোলমাল। তুমি চা বানিয়ে কাপটা আমায় দিয়ো। আমি ঘরে দিয়ে আসব। চায়ে কয়েক টুকরো আদার কুচি দিয়ো। আদা গলার জন্য ভাল।”
কাল রাত পর্যন্ত এত একা-একা সামলেছেন নমিতাদেবী, কিন্তু আজ ভোরে আর পারলেন না।
প্রতিদিনই ভোরে তাঁর স্বামী অঙ্কের ফর্মুলা, জ্যামিতির সংজ্ঞা, বীজগণিতের নিয়ম ঝালিয়ে নেন। অনেক বছরের অভ্যাস। আজ ঘুম ভাঙতে নমিতাদেবী দেখলেন, মানুষটি জানলার সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছেন আর থেকে থেকে কোকিলের ডাক ডাকছেন, “যদি চারটি বিন্দু দিয়ে একটি কুহু অঙ্কন করা সম্ভব হয়, তা হলে ওই বিন্দুগুলোকে সমবৃত্তস্থ কুহু-কুহু বলা হয় এবং যদি কোনও চতুর্ভুজের চারটি শীর্ষবিন্দু দিয়ে একটি চতুর্ভুজ অঙ্কন করা সম্ভব হয়, তা হলে ওই চতুর্ভুজটিকে বলা হবে কুহু-কুহু চতুর্ভুজ…।”
এটা শোনবার পর সোজা পাশের ঘরে গিয়ে ভাইকে ফোনে ধরলেন নমিতাদেবী। নিঃসন্তান নমিতাদেবী বিপদে-আপদে কল্যাণকেই খবর দেন। তাঁর স্বামী পছন্দ না করলেও দেন।
সেই কল্যাণ এখন সুশীলবাবুর সামনে বসে আছে। অমলেট খাওয়া শেষ করে মাটিতে প্লেট নামিয়ে রাখল। হেসে বলল, “দিদির কাছে যা শুনলাম তা সত্যি না মিথ্যে জামাইবাবু? মুখে বলতে হবে না।আপনি শুধু মাথা নাড়ুন।”
পাশেই নমিতাদেবী দাঁড়িয়ে। তিনি বললেন, “আহা, মুখ ফুটে বলোই না, কল্যাণ তো বাইরের কেউ নয়, পাঁচকান করবে না।”
আর পারলেন না সুশীলবাবু। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে চোখ লাল করে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, “পাঁচকানের আর বাকি কী রেখেছ? কুহু-কুহু। ভাইকে ডেকে এনেছ। এবার কুহু-কুহু মাসি-পিসি সবাইকে ডাকো। সবাই এসে তোমার কাকিল স্বামীকে দেখে যাক। কুহু-কুহু-কুহু।”
কল্যাণ বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে বিড়বিড় করে উঠল, “স্ট্রেঞ্জ! আশ্চর্য! অদ্ভুত! সত্যি, এ যে একেবারে কোকিলকণ্ঠ!”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন