অষ্টম অধ্যায়

সোমজা দাস

‘পেনড্রাইভটা দিতে আমার আপত্তি নেই, সে তো আগেই বলেছি,’ অকম্পিত কণ্ঠে বলল টাপুরদি, ‘দেখুন, ওই পেনড্রাইভ আমার কোনো কাজে লাগবে না৷ পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটতে আমি আগ্রহী নই মোটেই৷ আমার শর্তও আমি আগেই বলেছি৷ সুবিনয়বাবুকে নিয়ে এখান থেকে সুরক্ষিতভাবে বেরিয়ে যাব আমরা৷ পেনড্রাইভ আপনি পেয়ে যাবেন৷’

‘এখান থেকে বেরোনোর পর পেনড্রাইভ যে আমি হাতে পাব, তার নিশ্চয়তা কোথায়? অম্লান এতে কখনো রাজি হবে না,’ বললেন মনোময়বাবু৷

‘বাজে কথা রাখুন মশাই,’ সামান্য বিরক্ত স্বরে বলল টাপুরদি, ‘অম্লানবাবু? হাসালেন আপনি৷ অম্লানবাবুর এসবের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, সে আমি ভালোমতোই জানি৷ তিনি আপনাদের হাতের পাপেট ছাড়া আর কিছু নন৷ কোথায় তিনি এখন? আপনার লোকদের দিয়ে নিশ্চয়ই তাঁকে ঘরে পাহারায় রেখেছেন, যাতে তিনি এসবের মধ্যে না এসে পড়েন? এসব গল্প আমায় শোনাতে আসবেন না৷ যাই হোক, আপনাদের পেনড্রাইভ চাই, আর আমার চাই সুবিনয়বাবুকে৷ আমাদের সুবিনয়বাবুকে নিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে দিন, পেনড্রাইভ আমি নিজে এনে দেব আপনার হাতে৷’

খুক খুক করে হাসলেন মনোময়বাবু৷ এই প্রথমবার ওঁকে আমি হাসতে দেখলাম৷ বললেন, ‘আমায় এত বোকা ভাবেন টিকটিকি ম্যাডাম? এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে পেনড্রাইভ আপনি এনে দেবেন তার গ্যারান্টি কী? আর তা ছাড়া আপনারা বড়ো বেশি জেনে ফেলেছেন৷ এই অবস্থায় আপনাদের আমি ছেড়ে দিতে পারি না, তাই না?’

‘সে আপনার ব্যাপার৷ তবে আপনাকে আগেও বলেছি, আমরা সময়মতো ফিরে না গেলে আপনারাও বাঁচবেন না৷ পুলিশ জানে আমরা এখানে এসেছি,’ বলল টাপুরদি৷

‘কিচ্ছু প্রমাণ করতে পারবেন না৷ আপনি বোধ হয় ভুলে যাচ্ছেন, অম্লান এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছে, সঙ্গে পুলিশমন্ত্রীও৷ সুতরাং পুলিশ প্রশাসন সব ওরই হাতে,’ বললেন মনোময়বাবু৷

‘তা আমি জানি মনোময়বাবু৷ কিচ্ছু ভুলিনি,’ হেসে বলল টাপুরদি, ‘কিন্তু আমরা না ফিরলে পেনড্রাইভের কন্টেন্ট যখন দেশের সমস্ত নিউজ চ্যানেলে টেলিকাস্ট হবে, তখনও অম্লানবাবু মুখ্যমন্ত্রী বা পুলিশমন্ত্রী থাকবেন তো? তা যাক গে, সেসব আপনাদের ব্যাপার৷ আমার কিছু হারানোর নেই৷ আর মরতে আমি ভয় পাই না৷ কিন্তু আপনাদের অনেক কিছু হারানোর আছে এই মুহূর্তে৷ এবার আপনারা কী করবেন, নিজেরাই ভেবে দেখুন৷ দরকার হলে আপনার বসের সঙ্গে আলোচনা করে আমায় জানান৷ আমি অপেক্ষা করছি৷’

মনোময়বাবু জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকালেন আমাদের দিকে৷ তারপর বললেন, ‘এখানে আমার সিদ্ধান্তই শেষ কথা৷ আমার কোনো বস নেই টিকটিকি ম্যাডাম৷ আপনি ঠিক বলেছেন, অম্লান আমার হাতের পুতুল৷ আমি ওকে বানিয়েছি৷ আমায় ছাড়া অম্লানের কোনো অস্তিত্ব নেই৷ এটা আমার সাম্রাজ্য৷ আর এখানে সেটাই হয় যা আমি চাই৷ আপনি মরতে ভয় পান না, খুব ভালো কথা৷ কিন্তু আপনার সহচরীটি? সেও বুঝি অকুতোভয়?’

টাপুরদি স্থিরদৃষ্টিতে তাকাল মনোময়বাবুর মুখের দিকে৷ মনোময়বাবুর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা খেলে গেল৷ সে হাসি বড়ো নিষ্ঠুর৷ তিনি এবার বললেন, ‘আপনার এই অ্যাসিস্ট্যান্টটি বরং আমাদের জিম্মায় থাকুক৷ আপনি গিয়ে পেনড্রাইভ নিয়ে আসুন৷ আমাদের হাতে তুলে দিন৷ একে নিয়ে যান৷’

টাপুরদি হাসল৷ বলল, ‘আপনার বোধ হয় টেকনিক্যাল নলেজ একটু কম, তাই না মনোময়বাবু? তাই এমন বোকার মতো কথা বলছেন৷ তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই যে আমি আপনার হাতে পেনড্রাইভটা তুলে দিলাম, তাহলেও আমি যে সেটার কপি নিজের কাছে রাখব না সেটা কী করে ভাবলেন? আমি সেটাকে এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করব৷ মিডিয়ার হাতে তুলে দেব৷ জনগণের প্রতিক্রিয়াটা কেমন হবে ভাবতে পারছেন? এটা গণতন্ত্র মশাই৷ যে জনতা সরকারে আপনাদের এনেছে, তারাই টান মেরে আপনাদের উপড়ে ফেলতে দ্বিধা করবে না৷ ’

‘সে যাই হোক, আপনাদের সরকারে থাকা না থাকা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই৷ লঙ্কায় যে যায়, সেই রাবণ৷ আমি শুধু সুবিনয়বাবুকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যেতে এসেছি৷ আমাদের যেতে দিন, আমি কথা দিচ্ছি পেনড্রাইভের কন্টেন্ট সব ডিলিট করে দেব৷ যা গোপন ছিল, তা গোপনই থাকবে৷ দেখুন মনোময়বাবু, আপনাদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা নেই৷ আমি একা মানুষ, যা রোজগার করি তাতে আমার দিব্যি চলে যায়৷ তাই ব্ল্যাকমেল করে টাকাপয়সা বা ক্ষমতা পাওয়ার অভিসন্ধিও নেই৷ আমি এখানে সুবিনয়বাবুকে নিতে এসেছি৷ সুবিনয়বাবুকে নিয়ে চলে যাব৷ আপনাদের যা দরকার সেটা আপনারা পেয়ে যাবেন৷ আপনাকে আমার উপর ভরসা করতেই হবে৷ তা ছাড়া আপনার কাছে আর কোনো অপশন নেই,’ কেটে কেটে বলল টাপুরদি৷

মনোময়বাবু কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাবলেন৷ তারপর বললেন, ‘সুবিনয়কে ছাড়া যাবে না৷ আপনারা চলে যান, আপনাদের কেউ আটকাবে না৷’

টাপুরদি নিঃশব্দে হাসল৷ বলল, ‘আপনারা না একদম হোমওয়ার্ক করেন না৷ আমার সম্পর্কে খবরাখবর ঠিকঠাক করে নেননি দেখছি৷ কেউ আপনাদের বলেননি যে সংঘমিত্রা ব্যানার্জি খুব জেদি৷ আমার বক্তব্য জানিয়েছি৷ আপনারা, মানে আপনি আর আপনার বস এখন আলোচনা করে আপনাদের সিদ্ধান্ত জানান৷ আমার আর কিছু বলার নেই৷’

উঠে দাঁড়ালেন মনোময়বাবু৷ বাঘের মতো মুখটা রাগে গনগন করে জ্বলছে৷ চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘বেশি বাড় বেড়েছে তোর দুই পয়সার টিকটিকি৷ তোর মতো অনেককে পায়ের তলায় পিষে মেরেছে এই মনোময় মজুমদার৷’

টাপুরদি হি-হি করে হেসে বলল, ‘সে আপনি যতই ক্রেডিট নেওয়ার চেষ্টা করেন মনোময়বাবু, আমি জানি আপনার মাথার উপর আসল ছড়িটা কে ঘোরান৷ তাই আর বাজে না বকে এক কাজ করুন, তাঁকেই বরং ডাকুন৷ বাকি কথাবার্তা তাঁর সঙ্গেই সেরে নিই৷ এই ভায়া হয়ে কথা বলাটা আমার নাপসন্দ৷ আর ডাকার বোধ হয় দরকার নেই, তিনি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আমাদের সব কথা শুনতে পাচ্ছেন৷ তাঁর পানমশলার গন্ধটা বড্ড উগ্র, সহজেই তাঁর উপস্থিতি জানান দেয়৷’

চমকে উঠে দরজার দিকে তাকালাম আমি৷ দরজার বাইরে কে আছে? কে মনোময়বাবুর এই বস? টাপুরদি কীভাবে জানল যে তিনি দরজার বাইরেই রয়েছেন, আমি তো টের পাইনি৷ পানমশলার গন্ধ? এতক্ষণে গন্ধটা আমিও পেলাম৷ এই গন্ধ আমার চেনা, অথচ এতক্ষণ এই সম্ভাবনার কথাটা মাথাতেই আসেনি আমার৷

রাজেন্দ্রানির মতো মাথা উঁচু করে ঘরে ঢুকে এলেন সুনয়নাদেবী৷ মনোময়বাবু সসম্মানে উঠে দাঁড়ালেন চেয়ার ছেড়ে৷ সরে গিয়ে দেয়ালে পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ সুনয়নাদেবী উদ্ধত ভঙ্গিতে বাকি লোকজনকে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে ইশারা করলেন৷ আমি স্তব্ধ হয়ে চেয়ে আছি সুনয়নাদেবীর মুখের দিকে৷ সুনয়নাদেবী এই সব কিছুর পেছনে? বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে আমার৷ তাহলে কি টাপুরদি আগে থেকেই এ সব কিছু জানত? জেনেশুনেই এসেছিল এখানে?

মনোময়বাবু ছাড়া বাকি লোকেরা বেরিয়ে গেল ঘর থেকে৷ সম্ভবত দরজার বাইরেই অপেক্ষা করছে তারা৷ বাইরে থেকে দরজা ভেজিয়ে দিল৷ সুনয়নাদেবী বললেন, ‘তোমরা এখনও বেঁচে আছ কেন জানো? কারণ তোমাদের বেশ পছন্দ হয়েছে আমার৷ সংঘমিত্রা, তোমার মধ্যে আমি যৌবনের সুনয়নাকে দেখতে পেয়েছিলাম প্রথম দিনই৷ ঠিক সেরকমই জেদ, কর্মস্পৃহা, লড়াকু মনোভাব, ঠিক আমার মতো তুমি৷ দেখেই বুঝেছিলাম, তুমি হেরে যাওয়ার বা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার মেয়ে নও৷ চাইলে তোমায় সরিয়ে দিতে পারতাম৷ অন্তত এই কেস থেকে তোমাকে সরাতে আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধে হত না৷ কিন্তু আমি দেখতে চেয়েছিলাম, তুমি কতদূর যেতে পারো৷ নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম যে আমার ধারণা ঠিক, তুমি আমারই মতো৷’

টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘তাহলে কী দেখলেন?’

সুনয়নাদেবী মিষ্টি করে হেসে বললেন, ‘দেখলাম, আমার খুব বেশি ভুল হয় না৷ আর সেই কারণেই তোমার উপর আমার কেমন মায়া পড়ে গেছে৷ তুমি চলে যাও৷’

টাপুরদি হাসল৷ বলল, ‘যখন বুঝেই গেছেন আমি অনেকটা আপনারই মতো, তখন বলুন তো আমার জায়গায় আপনি হলে কী করতেন? পিছিয়ে যেতেন? যে কাজ করতে এসেছেন, সেটাকে অসম্পূর্ণ রেখে পালিয়ে যেতেন?’

সুনয়নাদেবীর মুখের শক্ত রেখাগুলি কঠিন হয়ে এল৷ তাঁকে কেমন নিষ্ঠুর দেখাচ্ছে৷ জানি না কেন, ঠিক এ-রকম মুহূর্তে আমার মনে পড়ে গেল, এক রাতে তাঁর গলায় শোনা ‘তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়’, সেদিন তাঁর কণ্ঠস্বরের যে সুতীব্র হাহাকার আমার মর্মস্থল স্পর্শ করেছিল, সেটা কি তবে মিথ্যে ছিল, শুধুই অভিনয় ছিল?

টাপুরদি নরম স্বরে বলল, ‘সুনয়নাদেবী, অনেক তো হল৷ আর কত? নিজের দুর্ভাগ্যের সঙ্গে, হতাশার সঙ্গে লড়াই করতে করতে কবে যে আপনার ভিতরকার মানুষটাকে আপনি নিজে হাতে গলা টিপে মেরে ফেলেছেন, আপনি নিজেই টের পাননি৷ কী পেলেন আপনি, বলুন তো? শুধু ক্ষয়, শুধু ধ্বংস? নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার যূপকাষ্ঠে নিজের সন্তানকেও বলি দিলেন? আপনি না মা?’

‘মিথ্যে কথা!’ ফুঁসে উঠলেন সুনয়নাদেবী, ‘অম্লান বোকা, ওর কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না কোনোদিন৷ আমি মা বলেই আমাকে কঠোর হতে হয়েছে৷ ও নিজের জীবনটা নষ্ট করবে, আর সেটা আমি মা হয়ে চোখ মেলে দেখব অসহায়ের মতো, সেটা তো আমি হতে দিতে পারি না৷ ওর জীবনটা আমি গুছিয়ে দিয়েছি৷ যা করেছি, ওর জন্য করেছি৷ সে নিয়ে আমার কোনো অনুশোচনা নেই৷’

‘মিথ্যে কথা আপনি বলছেন সুনয়নাদেবী, আমাদের কাছে, নিজের কাছে,’ বলে দীর্ঘ একটা নিশ্বাস নিল টাপুরদি৷ তারপর ধীরে ধীরে বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলল, ‘আপনি কোনোকিছুই অম্লানবাবুর জন্য করেননি৷ যা করেছেন, সব নিজের জন্য করেছেন৷ এর মধ্যে অম্লানবাবু কোনোদিনই ছিলেন না৷ ছিল আপনার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আপনার নিজের প্রতিষ্ঠার লড়াই৷ অম্লানবাবুর মাধ্যমে আপনি শুধু নিজের অপূরিত স্বপ্নগুলো পূরণ করতে চেয়েছিলেন৷ আপনার ব্যর্থতা, অমিয়বাবুকে বিয়ে করার আপনার ভুল সিদ্ধান্ত, আপনার স্বপ্নভঙ্গ সব কিছুর দায় সারাজীবন ধরে অম্লানবাবুকে বইতে হয়েছে, সেটা বোঝেন আপনি? ভালোবেসে বিয়ে করেও স্ত্রীকে হারাতে হয়েছে, সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে পারেননি, রাজনীতির জন্য সর্বস্ব হারিয়েছেন তিনি৷ যে নাতনিকে আপনি তার বাবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন অম্লানবাবুর মন দুর্বল হবে ভেবে, সেই নাতনিকেই আবার আপনাদের রাজনৈতিক উত্তরসূরি তৈরি করতে চেয়েছেন আপনি, একটা বাচ্চা মেয়ের নরম মনে নিজের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বীজবপন করতে চেয়েছেন৷ আপনি তো মা? সন্তানের জীবনটা তিলে তিলে এভাবে ধ্বংস করে দিতে আপনার বাঁধল না?’

উঠে দাঁড়ালেন সুনয়নাদেবী৷ তারপর কঠিন কণ্ঠে কেটে কেটে বললেন, ‘শোনো মেয়ে৷ অমিয়কে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত আমার ভুল ছিল না৷ ওকে ভীষণ ভালোবাসতাম আমি৷ ওকে পেতে চেয়েছিলাম, পেয়েছি৷ কিন্তু তারপর যা যা হয়েছে তা অভিপ্রেত ছিল না৷ কাউকে ভালোবেসে প্রতারিত হলে তার প্রতি ঘৃণাটাও বড্ড গভীর হয়৷’

একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন সুনয়নাদেবী৷ তারপর আবার বললেন, ‘আর অম্লানের ভবিষ্যত, মা হিসেবে সুরক্ষিত করা আমার দায়িত্ব ছিল, করেছি৷ আর হ্যাঁ, তোমায় আমি ছেড়ে দিতাম৷ কিন্তু বড়ো বেশি জেনে গেছ তুমি৷ এতটা জানার পর তোমায় আমি যেতে দিতে পারি না৷’

বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল আমার৷ কিন্তু টাপুরদি দেখলাম অবিচল৷ এই অবস্থাতেও হেসে বলল, ‘জেনে তো আমি অনেকদিন আগেই গেছিলাম, সুনয়নাদেবী৷ যেটুকু বা সন্দেহ ছিল মনে, সেটাও দূর হয়ে গেছে দু’দিন আগেই৷ এই সব কিছুর পেছনে কে, এবং সে কী কী করতে পারে সব জেনেই এখানে এসেছি৷ তবে একটা কথা বলি আপনাকে, আপনার আমাকে বুঝতে কিছুটা ভুল হয়েছে৷ আমি আপনার মতো নই৷ আমি নিজের স্বপ্নের জন্য প্রিয়জনের বলি চড়াতে পারি না আপনার মতো৷ আত্মবিশ্বাস আমার আপনার চেয়ে কিছু কম নেই, কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে আমি আমার বিরুদ্ধ পক্ষকে দুর্বল ভাবার ভুল করি না৷ আপনি কী করে ভাবলেন, আমি এভাবে অসহায় নির্বোধের মতো এখানে এসে আপনার এই সিংহের গুহায় মাথা ঢোকাব?’

‘মনোময়,’ গর্জে উঠলেন সুনয়নাদেবী৷

মনোময়বাবু এগিয়ে এসে বশংবদ ভঙ্গিতে দাঁড়ালেন সুনয়নাদেবীর পাশে৷ সুনয়নাদেবী বললেন, ‘এদের ব্যবস্থা করো৷ অনেক নাটক সহ্য করছি৷ কেউ যেন বেরোতে না পারে এখান থেকে৷’

মনোময়বাবুর পকেটে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল৷ সেটা পকেট থেকে বের করে স্ক্রিনে আলগোছে চোখ বুলিয়ে ফোনটা নিয়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালেন মনোময়বাবু৷ কিছুক্ষণ মোবাইল ফোনটা কানে লাগিয়ে চুপচাপ সব শুনলেন৷ তারপর বললেন, ‘ওটা যেন বাইরে না বেরোয় দেখুন৷ অম্লানবাবু তাহলে কিন্তু কাউকে ছাড়বেন না৷’

সুনয়নাদেবী মনোময়বাবুর দিকেই তাকিয়ে ছিলেন৷ ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে মনোময়বাবু হাসিমুখে সুনয়নাদেবীর পাশে এসে দাঁড়ালেন৷ তারপর বললেন, ‘আমার লালবাজার সোর্স জানাল, পেনড্রাইভ এদের কাছে নেই সুনয়নাদি৷ পুলিশের হাতে আছে৷ কোনো কপিও নেই৷ ওটা আমাদের হাতে এসে যাবে৷’

সুনয়নাদেবীর মুখের হাসি ফুটল৷ মনোময়বাবুকে আমাদের দেখিয়ে বললেন, ‘এদের ব্যবস্থা করো মনোময়৷ এই অশান্তি আর ভালো লাগছে না৷’

আমার দৃষ্টির সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে এল৷ বুঝতে অসুবিধে হল না, এখান থেকে বেরোনোর আর কোনো পথ খোলা নেই আমাদের সামনে৷ আমরা সুনয়নাদেবীর মুখোশের নীচে লুকোনো মুখটা দেখে ফেলেছি৷ সুতরাং এখান থেকে বেঁচে থাকতে আমাদের বেরোতে দেওয়া হবে না এটা নিশ্চিত৷ টাপুরদির মুখ দেখে মনের অবস্থা বোঝা যাচ্ছে না৷ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মনোময়বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে টাপুরদি৷

মনোময়বাবু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, সেই মুহূর্তে বাইরে পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ শোনা গেল৷ মনোময়বাবুর দৃষ্টি চঞ্চল হয়ে উঠল৷ দ্রুতবেগে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেলেন তিনি৷ কয়েক মুহূর্ত পরে ফিরে এসে সুনয়নাদেবীর কানের কাছে মুখ নিয়ে মৃদুকণ্ঠে কিছু বললেন৷ সুনয়নাদেবী উঠে দাঁড়ালেন৷ ঠিক সেই মুহূর্তে তড়িঘড়ি ঘরে এসে ঢুকলেন অম্লানবাবু৷

‘পুলিশ বাড়ির গেটে! কী হচ্ছে এসব? আর কত সর্বনাশ করবে তোমরা?’ উত্তেজিত মুখে উচচস্বরে বললেন অম্লানবাবু৷

‘তুই নিজের ঘরে যা বাবু,’ কঠোর কণ্ঠে বললেন সুনয়নাদেবী, ‘মনোময় সব সামলে নেবে৷ তোকে মাথা ঘামাতে হবে না এসবের মধ্যে৷’

‘আমায় মাথা ঘামাতে হবে না? কে মাথা ঘামাবে? তুমি? মনুকাকা? কেন? মা, অনেক সহ্য করেছি৷ আর পারছি না আমি৷ এবার যা করার আমি করব,’ অম্লানবাবুর কণ্ঠস্বর ও শরীরী ভাষায় বিদ্রোহ স্পষ্ট৷

‘কী করতে চাইছিস তুই?’ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করলেন সুনয়নাদেবী৷

‘মনুকাকা,’ সুনয়নাদেবীকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মনোময়বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন অম্লানবাবু, ‘এদেরকে যেতে দিন এখান থেকে৷ আপনি নিজে গিয়ে গেট অবধি পৌঁছে দিয়ে আসবেন৷ আর সুবিনয়কে নিয়ে গিয়ে হসপিটালে ভরতি করার ব্যবস্থা করুন৷ আর একটা প্রেস কনফারেন্স ডাকুন আজ রাতেই৷ পুলিশ কমিশনারকে উপস্থিত থাকতে বলবেন৷’

স্প্রিং-এর মতো তিরবেগে ছিটকে উঠে দাঁড়ালেন সুনয়নাদেবী৷ চোখে উন্মাদিনীর দৃষ্টি৷ রীতিমতো হাঁপাচ্ছেন তিনি৷ হিস্টিরিকের মতো কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘ভুলে যাস না বাবু, অনেক কষ্ট করে তিলে তিলে তোর জন্য সব গড়ে তুলেছি আমি৷ এর জন্য আমাকেও কম মূল্য দিতে হয়নি৷ এই সব কিছু তোকে নষ্ট করে দিতে দেব না আমি, কিছুতেই না৷’

‘ছি মা, বলতে লজ্জা করছে না তোমার? তুমি কেন এমন হলে মা? কেন এভাবে বদলে গেলে? একের পর এক অপরাধ করে যাচ্ছ তোমরা৷ সব কিছু তছনছ করে দিলে৷ আর কত? আমি না হয় তোমার অপদার্থ ছেলে৷ কিন্তু তুমি? এত সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে শান্তি পাও মা?’

কথাগুলো বলতে বলতে শেষের দিকে অম্লানবাবুর গলা বুজে এল৷ নিজেকে সামলে নিতে কিছুটা সময় নিলেন তিনি৷ তারপর বললেন, ‘তুমি তো জানো মা, রাজনীতিতে আসতে আমি কোনোদিনই চাইনি৷ আমি তো শুধু একটা সহজ সুন্দর জীবন চেয়েছিলাম, যেটা তুমি আমায় পেতে দাওনি৷ আজ আরেকবার আমার কাছে সুযোগ এসেছে সব ছেড়ে বেরিয়ে আসার৷ তোমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে, আমি তা জানি মা৷ কিন্তু সেই অন্যায়ের সঙ্গে লড়াই করতে করতে তুমি কবে ঈশ্বরী থেকে দানবীতে পরিণত হয়েছ তুমি নিজেও টের পাওনি৷ কিন্তু আমি তোমাকে আর কোনো অপরাধ করতে দেব না৷ আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তোমার সব অপরাধের দায় আমি নিজের কাঁধে নেব৷ জেলে আমি যাব৷ তুমি এই বাড়িতে একা থাকবে মা, কেউ থাকবে না তোমার পাশে৷ যেভাবে সকলকে তুমি দূরে ঠেলে দিয়েছ, আজ তোমার নিজের হাতে গড়া সেই একাকীত্বের অন্ধকার সাম্রাজ্যের অধীশ্বরী হয়ে বাকি জীবনটা কাটাবে তুমি৷ এই-ই তোমার শাস্তি মা৷’

‘আমি তোকে এ সর্বনাশ করতে দেব না বাবু, কিছুতেই দেব না৷ আমি নিজে যা পাইনি, তোর মধ্যে দিয়ে আমার সব স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছি৷ আজ যখন এত লড়াইয়ের পর সব গুছিয়ে তুলেছি, তোকে আমি কিছুতেই আমার সারাজীবনের সংঘর্ষ ব্যর্থ করতে দেব না৷ কিছুতেই না৷ বার বার হেরেছি আমি ভাগ্যের কাছে৷ এবার হারব না৷ এবার কাউকে আমি আমাকে হারাতে দেব না বাবু, তোকেও না,’ বলে ছুটে বেরিয়ে গেলেন সুনয়নাদেবী ঘর থেকে৷

অম্লানবাবু শূন্যদৃষ্টিতে ধপ করে মায়ের ছেড়ে যাওয়া চেয়ারে বসে পড়লেন৷ তাকে এই মুহূর্তে দেখতে একজন হেরে যাওয়া মানুষের মতো দেখাচ্ছে, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত৷ হাত নেড়ে মনোময়বাবুকে কাছে ডাকলেন তিনি৷ বললেন, ‘মনুকাকা, এদের, বাইরে পুলিশের হেফাজতে ছেড়ে এসো, দেখো যেন কোনো ক্ষতি না হয়৷’

‘ভেবে দেখো অম্লান...!’

আরও কিছু বলতে যাওয়া মনোময়বাবুকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলেন অম্লানবাবু৷ বললেন, ‘তোমাদের কথা সারাজীবন শুনে যাচ্ছি৷ আজ না হয় আমার কথা শোনো মনুকাকা৷ প্লিজ!...’

উঠে দাঁড়ালাম আমরা৷ অম্লানবাবু আমাদের দিকে ক্লান্ত চোখ তুলে তাকালেন৷ তারপর হাতজোড় করে বললেন, ‘ক্ষমা করবেন৷’

টাপুরদি কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে খুব কাছেই কোনো জোরালো কর্ণবিদারক শব্দে বাড়িটা কেঁপে উঠল৷ চমকে উঠলাম ঘরে উপস্থিত সকলে৷ ব্যাপারটা বুঝে উঠতে সময় লাগল কিছুটা৷ টাপুরদির সঙ্গে এতদিন কাজ করার সুবাদে রিভলভারের গুলির শব্দ চিনতে এখন আর অসুবিধে হয় না৷ অম্লানবাবু আর মনোময়বাবু ঘর থেকে তিরবেগে ছুটে বেরিয়ে গেলেন৷ পেছনে পেছনে আমরাও ছুটলাম৷ বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন পড়ল না৷ পাশের ঘরেই দরজা ভিতর থেকে বন্ধ৷ আগেও এসেছি এই ঘরে আমরা, জানি এটা সুনয়নাদেবীর ঘর৷ মনোময়বাবু দরজায় গায়ের জোরে দুম দুম করে ধাক্কা দিতে লাগলেন৷ ভিতর থেকে কোনো সাড়া মিলল না৷ ধুপ করে মেঝের উপর বসে পড়লেন অম্লানবাবু৷ শুধু একটা হাহাকারের মতো কান্না যেন বুক চিরে বেরিয়ে এল, ‘মা গো...’

‘তুমি ঠিক কখন সন্দেহ করেছিলে যে সুনয়নাদেবী আছেন এই সব কিছুর পেছনে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷ আজ অনেকদিন পরে আড্ডা বসেছে টাপুরদির ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে৷ অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যু রহস্য থেকে অব্যাহতি পেয়ে অর্জুনদারও কাজের চাপ এখন কিছুটা কম৷ ক’দিন থেকেই যে প্রশ্নটা ক্রমাগত জ্বালাচ্ছিল, আর অপেক্ষা করতে না পেরে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম আমি৷

টাপুরদি কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে৷ তারপর বলল, ‘সেদিন থেকে এই কথা ভেবেই যাচ্ছিস, বল? আচ্ছা বেশ, আর তোকে দগ্ধে মারব না৷ এবার তাহলে সব খুলেই বলা যাক৷’

‘সুনয়নাদেবীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎকারেই তোর মতো আমারও মনে হয়েছিল, মানুষটা যেন বড্ড বেশি রাজনীতির ভাষায় কথা বলেন৷ সেদিনই বুঝেছিলাম, রাজনীতি থেকে দূরে সরে আসাটা তাঁর বাহ্যিক৷ আদতে রাজনীতি তাঁর রক্তে৷ সেই সময় আমার প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল তন্ময়কে খুঁজে বার করা৷ সদ্য তখন অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুতদন্তে মাথা ঘামানোর সামান্য সুযোগ পেয়েছি৷ প্রথম থেকেই মনে হচ্ছিল, তন্ময়ের অন্তর্ধানের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যু রহস্যের যোগ আছে৷ তারপর সৌরভবাবুর কেবিনে পেনড্রাইভে লুকোনো ফোল্ডারটা দেখে বুঝলাম, আমার সন্দেহ ভুল ছিল না৷’

‘গল্পটার শুরু আজ থেকে কয়েক মাস আগে, যদিও এই কাহিনির বীজ অনেক বছর আগেই বপন করা হয়েছিল৷ যথাসময়ে আমি সেই প্রসঙ্গে আসছি৷ রিদ্ধিমার বাড়ি বদলের সময় ডায়েরিটা তন্ময় কাগজপত্রের মধ্যে থেকে হাতে পেয়েছিল৷ রিদ্ধিমাকে জানিয়ে বা না জানিয়ে সে সেটা সঙ্গে নিয়ে এসেছিল৷ সেই সময় তন্ময় ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেসে একটি বিশেষ প্রজেক্টে কাজ করছে৷ প্রজেক্টের ক্লায়েন্ট ছিল তদানীন্তন সরকারে আসীন দল৷ এবারের ভোটের হাওয়া প্রথম থেকেই অমিয় চক্রবর্তীর পক্ষে ছিল৷ সেই কারণেই ইউনিকর্নকে এই প্রজেক্ট দেওয়া হয়েছিল৷ উদ্দেশ্য ছিল, অমিয় চক্রবর্তীর অতীতের যেকোনো অন্ধকার অধ্যায় কবর খুঁড়ে বার করতে হবে৷ ঠিক সেই সময়েই তন্ময়ের হাতে এল মল্লিকা দাশগুপ্তর সবুজ ডায়েরি৷ ডায়েরিটা উলটেপালটে দেখে চমকে উঠল তন্ময়৷ এ তো সোনার খনি৷ তন্ময় বুঝে গেল, তার প্রমোশন নিশ্চিত৷ উত্তেজিত তন্ময় সেটাকে সফট কপি বানিয়ে নিজের অফিসের কম্পিউটারে সেভ করে রাখল৷ সুবিনয় মুখার্জিকেও সে জানিয়েছিল ডায়েরির তথ্যের ব্যাপারে৷ তিনি ঘাঘু লোক৷ বুঝে গেলেন, এই ডকুমেন্টের দাম ঠিক কত হতে পারে৷ বিনয় বোসের থেকে অমিয় চক্রবর্তীর কাছে এর দাম অনেক বেশি৷ তিনি অম্লানবাবুকে জানালেন এই ডকুমেন্টের ব্যাপারে৷ তবে সুবিনয় মুখার্জিও একটা ভুল করে ফেললেন৷ তন্ময় তাঁর এমপ্লয়ি, তার উপরে বেশি বিশ্বাস করে ফেললেন তিনি৷’

‘সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিল৷ এবার বাধ সাধল তন্ময়৷ ঠিক করল, সে নিজেই অমিয় চক্রবর্তীকে ব্ল্যাকমেল করবে৷ ইউনিকর্নের অফিস থেকে রাতের অন্ধকারে ফোল্ডারটা নিজের সিস্টেম থেকে ডিলিট করে দিল সে৷ তারপর অমিয়বাবুর সঙ্গে দেখা করল সে৷ অমিয়বাবুকে ফোল্ডারটা দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করা শুরু করল৷ পরিবর্তে কী চেয়েছিল, সেটা অবশ্য আমরা জানি না৷’

‘অমিয়বাবুর সেই ব্ল্যাকমেলের কী প্রতিক্রিয়া ছিল আমাদের জানা নেই৷ হয়তো তিনি তন্ময়ের দাবি মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন৷ এদিকে অম্লানবাবুর মুখে সুনয়নাদেবী সব জানতে পারলেন৷ অমিয়বাবুর সিদ্ধান্ত নিতে সময় লেগেছিল হয়তো, সুনয়নাদেবীর লাগল না৷ সিদ্ধান্ত নিলেন, সরিয়ে দিতে হবে অমিয় চক্রবর্তীকে৷ শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি৷ অমিয়বাবুর হত্যার পেছনে মাস্টারমাইন্ড ছিলেন একজনই৷ আর তিনি অম্লান চক্রবর্তী নন৷ তিনি অমিয় চক্রবর্তীর সহধর্মিণী সুনয়না চক্রবর্তী৷ সুনয়নাদেবীর গল্প জানতে হলে আমাদের চলে যেতে হবে অনেক পেছনে৷ সেখান থেকে শুরু করা যাক বরং৷ তবে অনেক লম্বা এই কাহিনি, একটা মানুষের জীবনের একটা বিস্তৃত অধ্যায়৷ পুরোটা শোনার ধৈর্য থাকবে তো?’

‘আরে থাকবে না মানে? শোনার জন্য বসে আছি৷ শিগগির বলো’, বললাম আমি৷ গল্প শোনার জন্য সোফায় পা তুলে বাবু হয়ে বসলাম৷

‘সুনয়না চক্রবর্তীর কাহিনির শুরু আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে৷ কলেজে গ্যাজুয়েশনের ছাত্রী সুনয়না লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেলাধুলাতেও ছিলেন অত্যন্ত ভালো৷ আমি খবর নিয়ে জেনেছি, ইউনিভার্সিটি স্পোর্টস কম্পিটিশনে দুশো মিটার দৌড়, লং জাম্প ও ডিসকাস থ্রোয়িং-এ গোল্ড মেডেল সুনয়নাদেবীর বাঁধা ছিল৷ তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তাঁর রাজনৈতিক প্রতিভা ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি৷ সুন্দরী, আধুনিকা সুনয়না ছিলেন সুবক্তা৷ তাঁর মধুর ব্যবহার, আন্তরিকতা তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছিল অনেকাংশে৷ অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি শুধু কলেজের সহপাঠীদেরই নয়, শিক্ষকদেরও মন জয় করেছিলেন৷ দ্রুত কলেজ রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে উত্তরণ ঘটছিল সুনয়নার৷ সঙ্গে উঠছিলেন আরেকজন৷ তিনি অমিয় চক্রবর্তী৷ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো গেজেট ঘেঁটে দেখেছি, দুজনেই সহপাঠী ছিলেন৷ অমিয় চক্রবর্তীর থেকে সুনয়নাদেবী লেখাপড়া ও রাজনীতি সবেতেই ছিলেন এগিয়ে৷ কলেজ ইউনিয়নে সুনয়নাদেবীর জনপ্রিয়তা অমিয় চক্রবর্তীর চেয়ে অনেক বেশি ছিল৷ তবু সুনয়নাদেবী অমিয়বাবুর প্রেমে পড়েছিলেন৷ প্রেমের রীতি বোঝা দায়৷ অপরিণত বয়সের একটা ভুল সিদ্ধান্ত ডেকে আনে সারাজীবনের অনুশোচনা৷’

‘কলেজ ছাড়ার পর দুজনেই রাজনীতির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন৷ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত উপরে উঠতে থাকলেন দুজনেই৷ রাজনীতির অলিন্দে তাঁদের গতিবিধি বাড়তে বাড়তে অল্পসময়ের মধ্যেই সিঁড়ির উপরের দিকের ধাপে পৌঁছে গেলেন৷ তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী রথীন ঘোষের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন৷ সেই সময় তাঁদের দল দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় আসীন৷ দুজনেই রাজনীতির যুব মুখ, কিন্তু পাল্লা যেন সুনয়নাদেবীর দিকেই ভারী৷ সবাই ধরেই নিয়েছিল, যুবদলের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট সুনয়নাদেবীই হতে যাচ্ছেন৷ হাওয়াও সেদিকেই বইছিল৷ হঠাৎ করেই চেনা সমীকরণ বদলে গেল৷’

‘অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে সুনয়নাদেবীর সম্পর্কের কথাটা গোপন ছিল না কারও কাছেই৷ দুজনেই একই রাজনৈতিক আদর্শের শরিক৷ যৌবনের নিয়মে পঞ্চশরের দহন উপেক্ষা করতে পারেননি দুজনের কেউই৷ কিন্তু সুনয়নাদেবীর তরফে ব্যাপারটা যতটা নিঃশর্ত প্রেম ছিল, অমিয়বাবুর তরফে সেটা কতটা খাঁটি ছিল সে নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে৷ যুবদলের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট পদের ঘোষণার মাসখানেক আগে হঠাৎই অমিয়বাবু সুনয়নাদেবীকে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন৷ তড়িঘড়ি বিয়েটাও হয়ে গেল মাসখানেকের মধ্যে৷ ফলস্বরূপ দেখা গেল, সুনয়নাদেবী নিজেই রথীন ঘোষের কাছে অনুরোধ করলেন, যুবদলের নেতৃত্বের দায়িত্ব তাঁর বদলে অমিয়বাবুর হাতে তুলে দেওয়া হোক৷ আরও তিনি এই বলে আশ্বস্ত করলেন যে তিনি তো অমিয়বাবুর পাশে রইলেনই৷ দলের জন্য, দলের পাশে তিনি সবসময়েই থাকবেন৷ তা যে তিনি ছিলেন, জীবনের শেষ মুহূর্ত অবধি সেই প্রমাণ দিয়ে গেছেন সুনয়নাদেবী৷’

‘এক মিনিট ইন্টারাপ্ট করছি আমি,’ আমি বললাম, ‘তুমি ঘটনাগুলো বিশদে কী করে জানলে?’

টাপুরদি মুচকি হাসল৷ বলল, ‘তুই মাঝে ক’দিন অফিসে গিয়েছিলি৷ ওই ক’দিন আমি বেশ কিছু পুরোনো নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যাপারগুলো সাজাতে চেষ্টা করেছি৷ তবে, এই ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সাহায্য যিনি করেছেন, তিনি মৃণালবাবু৷’

‘আচ্ছা, তুমি বলো,’ বলল অর্জুনদা৷

‘হ্যাঁ, যা বলছিলাম৷ বিয়ের পরে কিছুদিন কাটল স্বপ্নের মতো৷ কিন্তু স্বপ্নভঙ্গ হতেও বেশি সময় লাগল না৷ সুনয়নাদেবী বুঝলেন, তাঁকে ঠকানো হয়েছে৷ বিয়ের পর থেকে দলের অভ্যন্তরে প্রতিদ্বন্দ্বীশূন্য অমিয়বাবুর উত্থান হল দ্রুতগতিতে৷ একইসঙ্গে রাজনীতির অলিন্দে সুনয়নাদেবীর উপস্থিতি কমতে থাকল৷ প্রেমের ঘোর যতদিনে কাটল, তখন মা হতে চলেছেন সুনয়নাদেবী৷ বুঝতে পারলেন, প্রেমটা হয়তো অমিয়বাবুর তরফ থেকে শুধুই নাটক ছিল৷ কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে গেছে অনেক৷ ভিতরে ভিতরে গুমরাতে থাকলেন তিনি৷ ফেরার পথ নিজের হাতে বন্ধ করে দিয়ে অমিয় চক্রবর্তীর সংসারের কারাগারে প্রবেশ করেছিলেন তিনি৷ অমিয়বাবুও তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছিলেন সংসারে৷ চাইলে হয়তো বিয়ে ভেঙে বেরোতে পারতেন, কিন্তু ছেলের মুখ চেয়ে হয়তো সেই পদক্ষেপ নেননি তিনি৷ অন্তর্দহনে জ্বলতে জ্বলতে আবার ভুল করলেন সুনয়নাদেবী; নিজের অপূরিত সমস্ত স্বপ্ন পূরণের দায় তিনি চাপিয়ে দিলেন একমাত্র সন্তানের উপর৷ আর সেখান থেকে অম্লান চক্রবর্তীর জীবনের ট্র্যাজেডি শুরু৷’

‘সুনয়নাদেবী তো বিয়ে ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারতেন৷ সেটা কেন করলেন না?’ অর্জুনদা জানতে চাইল৷

‘মনের গতি বড়ো জটিল অর্জুন,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষণ্ণ মাথা নেড়ে বলল টাপুরদি, ‘এত কিছুর পরেও অমিয়বাবুকে হয়তো সত্যিই ভালোবাসতেন সুনয়নাদেবী৷ এই ব্যাপারে আমার আরেকটা থিয়োরি আছে৷ ততদিনে অনেকটা সময় কেটে গেছে৷ অমিয় চক্রবর্তী তাঁর উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে অনেকটাই উপরে উঠে গেছেন৷ ততদিনে তিনি একটি দপ্তরের পূর্ণমন্ত্রী৷ সুনয়নাদেবী বিয়ে ভেঙে বেরিয়ে এলেও পার্টিতে নিজের ছেড়ে আসা জায়গাটা আর ফিরে পেতেন না৷ বহুদিন রাজনীতি থেকে দূরে থাকার কারণে তাঁর অনুগামী সদস্যরাও তাঁকে ভুলেছে ততদিনে৷ সব মিলিয়ে রাজনীতিতে সুনয়নাদেবীর পায়ের তলায় মাটিটা আর ছিল না তখন৷ আমি জেনেছি, অপোজিশন থেকেও সুনয়নাদেবীর কাছে অফার ছিল৷ কিন্তু সুনয়নাদেবী ছিলেন নিজের দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ৷ তিনি সেই অফার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন৷’

‘আরেকটা ব্যাপার আমি জানতে পেরেছি৷ অমিয় চক্রবর্তী স্ত্রীকে প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিলেও তাঁর রাজনৈতিক বুদ্ধি-বিবেচনার প্রতি প্রবল আস্থা ছিল৷ অমিয়বাবুর রাজনৈতিক কার্যকলাপ অনেকটাই আবর্তিত হত সুনয়নাদেবীর পরামর্শমতো৷ বলা যায়, ঘরের ভিতরে থাকলেও স্বামীর আসল পরিচালিকা শক্তি ছিলেন সুনয়নাদেবী৷’

‘তোমার এই থিয়োরিগুলো কি পুরোপুরি অনুমান নির্ভর, না কোনো ইনফর্মেশন সোর্স আছে?’ অর্জুনদা মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করল৷

টাপুরদি হাসল৷ আমি বলে উঠলাম, ‘এইসময় তো মৃণালবাবু দলে ছিলেন না৷ তাহলে এই কথাগুলো জানলে কী করে তুমি?’

টাপুরদি মাথা নাড়ল৷ বলল, ‘বললাম তো, সেই সময়ের পুরোনো নেতাদের সঙ্গে আমি দেখা করেছিলাম৷ এঁদের মধ্যে অনেকেই পরে দল ছেড়ে বিরোধী দলে যোগ দিয়েছিলেন৷ কিন্তু এসব ভিতরের কথা অনেকেরই জানা ছিল৷’

‘আচ্ছা, তারপর বলো,’ বলল অর্জুনদা৷

‘তার আর পর কী? এটা কি গল্প নাকি?’ চোখ পাকিয়ে বলল টাপুরদি৷

‘গল্পও এত ইন্টারেস্টিং হয় না৷ সত্যিই টাপুরদি, বলো প্লিজ,’ কাতর অনুনয় করলাম আমি৷

‘মনোময়বাবু কলেজে সুনয়নাদেবীর বছর দুয়েকের জুনিয়র ছিলেন৷ কলেজ জীবনে ও পরবর্তীকালেও যখন সুনয়নাদেবী রাজনীতির আঙিনায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, সেই সময় মনোময় মজুমদার ছিলেন সুনয়নাদেবীর দলের একনিষ্ঠ কর্মী৷ সুনয়নাদেবীর প্রতি তাঁর আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত৷ সেই আনুগত্যের প্রমাণ তিনি শেষ দিন অবধি দিয়েছেন৷ আমার ধারণা সুনয়নাদেবী রাজনীতি ছেড়ে দিলেও মনোময়বাবুর সঙ্গে যোগাযোগটা রয়েই গেছিল৷ মনোময়বাবু ছিলেন পার্টির ভিতরে সুনয়নাদেবীর চোখ ও কান৷ ভিতরের সব খবর সুনয়নাদেবী মনোময়বাবু মারফতই পেতেন৷’

‘ঠিক এভাবেই তাঁর কানে এসেছিল মল্লিকা দাশগুপ্তর খবর,’ বলে থামল টাপুরদি৷

মল্লিকা দাশগুপ্তর নাম শুনে নড়েচড়ে বসলাম আমরা৷ মনে পড়ে গেল তন্ময়ের পেনড্রাইভে থাকা স্ক্যান করা ডায়েরির পাতাগুলোর কথা৷ সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালাম টাপুরদির মুখের দিকে৷

টাপুরদি আবার বলতে শুরু করল, ‘মল্লিকা দাশগুপ্তের গল্পটাও কিন্তু সুনয়নাদেবীর থেকে খুব বেশি আলাদা নয়৷ ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন গুজরাটি পরিবারে৷ বিয়ের পর স্বপ্নভঙ্গ৷ গুজরাটি ব্যবসায়ী স্বামী সহধর্মিণীর বদলে ঘরের ‘বহু’ চেয়েছিলেন৷ কয়েক বছর চেষ্টাও করলেন মানিয়ে নিতে, তারপর কোন অজুহাতে জানি না, কলকাতায় ফিরলেন মল্লিকা দাশগুপ্ত৷ বিয়ের আগেই জার্নালিজম নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেছিলেন, টুকটাক ফ্রিল্যান্স জার্নালিজমের কাজও করতেন৷ কলকাতায় ফিরে সেটাই নতুন করে শুরু করলেন৷ মাঝে মাঝে সুরাটে শ্বশুরবাড়িতে ফিরতেন৷ ধরে নেওয়া যেতে পারে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি সেই সময় থেকেই বেড়ে চলেছিল৷’

‘এদিকে মল্লিকা দাশগুপ্তের ইন্টারেস্ট ছিল পলিটিক্স৷ কলকাতায় ফিরেই তিনি রাজ্য রাজনীতির অবস্থা নিয়ে একটি বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিকে আগুন ঝরাতে শুরু করলেন৷ তখনও অমিয়বাবুদের দল ক্ষমতায়৷ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণেই হোক, কিংবা রথীন ঘোষের বার্ধক্য ও অসুস্থতার জন্য, দলের ভিতরে একরকম নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়েছিল সেই সময়ে৷ নীচুতলার নেতা-কর্মীদের উপর রথীন ঘোষের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না৷ বার্ধক্য ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর হাত থেকে দলের রাশ ক্রমেই বেরিয়ে যাচ্ছিল৷ সেইসঙ্গে দলের নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছিল পুরোপুরিভাবে অমিয় চক্রবর্তীর হাতে৷ অন্য বড়ো নেতারা ধীরে ধীরে সাইডলাইন হয়ে যাচ্ছিলেন৷ এদের মধ্যে মৃণালবাবুও একজন৷ আসলে ভদ্রলোক ঠিক অমিয়বাবুর মতো অ্যাগ্রেসিভ পলিটিক্স পারতেন না৷ লেখাপড়া করা মানুষ তিনি, ধীর, শান্ত, লজিক্যাল৷ নিজেকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিচ্ছিলেন৷ দলের আরও কিছু বিশিষ্ট নেতারা হাওয়া বুঝে বিরোধী দলে যোগ দিচ্ছিলেন৷’

‘একদিকে দলের ভিতরে চরম বিশৃঙ্খলা, অপরদিকে মল্লিকা দাশগুপ্ত নিজের রিপোর্টে একের পর এক আঘাত হানছেন৷ এর পরের ঘটনাবলি আমরা মল্লিকা দাশগুপ্তর ডায়েরি থেকে জানতে পারি৷ তোরাও জানিস৷ টাকা দিয়ে মল্লিকাকে কিনতে চাইলেন তিনি৷ কাজ হল না৷ তারপর ভয় দেখানোর চেষ্টা হল৷ সেটাও কাজে এল না৷ মল্লিকা সংসারের অন্ধকূপ থেকে তখন সবে মুক্তি পেয়ে এসেছেন৷ সেখানেও তাঁকে কম লড়াই লড়তে হয়নি৷ সবে সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছেন৷ তিনি নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়েছেন নিছক গৃহবধূর তকমা ঝেড়ে ফেলে নিজেকে আরেকবার প্রমাণ করার জন্য৷ পিছোলেন না তিনি৷ একজন সাহসী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী মেয়ের জন্য সমাজ সবসময়ই নিষ্ঠুর৷ পদে পদে বাধা সৃষ্টি করবে তার চলার পথে৷ তার পরেও যদি সেই মেয়ে না মচকায় তাহলে চরম আঘাত হেনে তাকে ঠেকাতে চেষ্টা করবে৷ আর সেই আঘাতটা কী? তার শারীরিক শুচিতা নষ্ট করা৷ আজ এই একবিংশ শতকে দাঁড়িয়েও আমরা মেয়েরা শুচিতা, পবিত্রতা, সতীত্ব এই শব্দগুলিকে বড্ড বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলি৷ ভুলে যাই, শুচিতা বা পবিত্রতার কোনো ট্যাগ দেহে লাগানো থাকে না, থাকতে পারে না৷ পুরুষশাসিত সমাজ নিজের স্বার্থে এইসব মিথ্যে ধারণার চাষ করে, আর আমরা বোকা মেয়েরা সেটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে প্রজন্মর পর প্রজন্ম কাটিয়ে দিই শরীরকে নিজেদের দুর্বলতা বানিয়ে৷’

টাপুরদি এবার দম নেওয়ার জন্য থামল৷ আজ থেকে অনেক বছর আগে দুজন নারীর সংঘর্ষের কাহিনি ঘরের বাতাসকে ভারী করে তুলেছে৷ টাপুরদি আবার বলতে শুরু করল৷

‘যা হওয়ার তাই হল৷ এক দুর্যোগের রাতে অমিয় চক্রবর্তীর লোকজন মল্লিকা দাশগুপ্তকে তুলে নিয়ে এল পার্টি অফিসে৷ সারারাত জুড়ে ধর্ষণ৷ অমিয় চক্রবর্তী এতদিনের জমা রাগ, ঘৃণায় ছিন্নভিন্ন করলেন মল্লিকার শরীর মন৷ ছবি তুলে রাখা হল সেই ঘটনার, যাতে তাঁকে লোকলজ্জার ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখা যায়৷ ভোরের আলো ফোটার আগে মল্লিকা দাশগুপ্তের ছিন্নভিন্ন মৃতপ্রায় শরীরটাকে নিয়ে ফেলে আসা হল ন্যাশনাল হাইওয়ের ধারে জঙ্গলের মধ্যে৷ ভাব মিতুল, একজন সাহসী মেয়ে যে সংসারের সঙ্গে লড়াই করে চার দেওয়ালের গণ্ডি ছেড়ে এসেছিলেন নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, শত চেষ্টা উপেক্ষা করেও লড়ে যাচ্ছিলেন, তাঁকে পেছোতে হল৷ ঠিক যে কারণে পিছিয়ে এসেছিলেন সুনয়নাদেবীও৷ মাসখানেকের মধ্যে মল্লিকা দাশগুপ্ত অনুভব করলেন তিনি মা হতে চলেছেন৷ সেই রাতের ধর্ষণের বীজ তাঁর গর্ভে অঙ্কুরিত হচ্ছে৷ চাইলে তিনি সেই গর্ভ নষ্ট করতে পারতেন৷ কিন্তু সেটা করলেন না৷ তিনি সুরাটে ফিরে গেলেন৷ স্বামীর কাছে স্বীকার করলেন সব কথা; স্বামীকে অনুরোধ করলেন অনাগত সন্তানকে শুধু পিতৃপরিচয়টুকু দিতে৷ পরিবর্তে তিনি তাঁর জীবন থেকে চিরতরে দূরে সরে যাবেন৷’

‘কোনো অজ্ঞাত কারণে মল্লিকাদেবীর স্বামী ভদ্রলোক রাজি হলেন৷ হয়তো স্ত্রীর প্রতি কিছুটা ভালোবাসা তখনও অবশিষ্ট ছিল ভদ্রলোকের৷ যাই হোক, সন্তান জন্মাল দেশাই সাহেবের পিতৃপরিচয় নিয়ে৷ কন্যাসন্তান; মল্লিকা তার নাম রাখলেন রিদ্ধিমা৷ মিতুল, তুই বলেছিলি মনে আছে, প্রথম দিন দেখে রিদ্ধিমাকে তোর পরিচিত লেগেছিল৷ তার কারণ ও আসার আগেই নিউজে তুই অমিয়বাবুর ছবি দেখেছিলি৷ দুজনের চেহারার সাদৃশ্য তোর অবচেতন মনে ধাক্কা দিয়েছিল৷ আবার তুই একদিন স্বপ্ন দেখেছিলি, অমিয় চক্রবর্তী নন, খুন হয়েছে রিদ্ধিমা৷ আসলে তোর অবচেতন মন বার বার দুজনের যোগসূত্রের দিকে তোর মনযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছিল৷

‘যাই হোক, মল্লিকা কিন্তু ভয় পেয়ে থেমে গেলেন না৷ সদ্যোজাতা মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় ফিরে তিনি আবার সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপালেন৷ তিনি তখন আহত বাঘিনি৷ মনের ভিতর দাউদাউ করে জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন৷ তাঁর কলম সেই আগুন ওগরাতে থাকল৷ সুনয়নাদেবী এই ঘটনা কতটা জানতেন, তা আর এখন জানার উপায় নেই৷ কিন্তু আমার ধারণা তিনি জানতে পেরেছিলেন৷ মল্লিকাদেবীর ডায়েরিতে আমরা পাই যে সুনয়নাদেবী তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন৷ মল্লিকা তাঁর ডায়েরিতে এই সাক্ষাৎকারের বিষয়ে খুব বেশি কিছু না লিখলেও যতটুকু লেখা আছে তাতে কিন্তু সুনয়নাদেবীর প্রতি শ্রদ্ধাই প্রকাশ পেয়েছে৷ তোমরা বোধ হয় দেখেছ, এক জায়গায় তিনি এও লিখেছেন, অমিয় চক্রবর্তীর বদলে যদি সুনয়নাদেবীর হাতে দলের রাশ থাকত, তবে এই রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাস অন্যরকম হত৷’

‘মল্লিকাদেবীর ধারণা ঠিক না ভুল জানি না৷ সেদিন রাতে আমরা সুনয়নাদেবীর যে রূপ দেখেছি, তাতে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়৷ যাই হোক, অমিয়বাবু দলের প্রধান নেতৃত্ব হিসেবে উঠে আসছিলেন সেই সময়৷ রথীনবাবুকে মানুষ শ্রদ্ধা করত, ভালোবাসত৷ কিন্তু অমিয়বাবুর ক্ষেত্রে সেটা হল না৷ এর প্রতিফলন দেখা গেল ব্যালট পেপারে৷ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর অমিয়বাবুর দলকে গদি ছাড়তে হল৷ বিধানসভায় বেশিরভাগ সিট চলে গেল বিজয়ী দলের দখলে, সেইসঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতারাও সেই দলেই যোগ দিলেন৷ বিধানসভার সামান্য কয়েকটি আসনে টিমটিম করে জ্বলে রইল অমিয়বাবুর দল৷ এর আরও বছরখানেক পর রথীনবাবু মারা যান৷ মৃণালবাবু সেই সময়েই রাজনৈতিক সন্ন্যাস নেন৷ অমিয়বাবু একচ্ছত্র নেতৃত্ব চেয়েছিলেন৷ তা তিনি পেলেন, কিন্তু মসনদে বসার স্বপ্ন তার এ জীবনে পূরণ হল না৷’

অর্জুনদা এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল৷ এবার বলল, ‘এ তো গেল সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির গল্প৷ এর সঙ্গে সুনয়নাদেবীর যোগ কোথায়? তিনি তো রাজনীতি ছেড়ে নিভৃত জীবনযাপন করছিলেন৷’

‘হ্যাঁ, তা করছিলেন৷ কিন্তু রাজনীতি ছাড়া এত সহজ নয়৷ রাজনীতি শুধু একটা কেরিয়ার অপশন নয় অর্জুন, রাজনীতি একটা গুণ৷ সবাই পারে না৷ আর যারা পারে, তাদের পক্ষে রাজনীতি থেকে সত্যিকারের দূরে থাকা সম্ভব নয় কখনো,’ বলল টাপুরদি৷

‘কিন্তু মৃণালবাবু তো ছাড়তে পেরেছেন টাপুরদি,’ বললাম আমি৷

‘তাই মনে হয় তোর? না রে, ভদ্রলোকের ঘরে কত রাজনীতির বই, খেয়াল করে দেখেছিস? বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে ভদ্রলোকের অসাধারণ জ্ঞান৷ উনি নিজে না বললেও খোঁজ নিয়ে জানলাম মৃণালবাবুর লেখা পলিটিক্যাল আর্টিকল শুধু দেশে নয়, বিদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকাতেও ছাপা হয় নিয়মিত৷ সত্যিকারের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে তিনিও পারেননি রে মিতুল,’ টাপুরদি হেসে বলল৷

‘সুনয়নাদেবীও পারেননি নিজেকে রাজনীতি থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে৷ আগেই বলেছি অমিয়বাবুকে তিনি বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন৷ স্ত্রীকে রাজনীতি করতে দেবেন না তিনি, কিন্তু চার দেয়ালের ভিতর তাঁর সাহায্য নিতে আপত্তি ছিল না অমিয়বাবুর৷ কারণ মনে মনে তিনি নিজেও জানতেন সুনয়নাদেবীর রাজনৈতিক প্রতিভা তাঁর চেয়ে বেশি৷’

‘সুনয়নাদেবীও স্বামীকে সাহায্য করতেন৷ সুনয়নাদেবী যা কিছু করতেন, তা হয়তো অমিয়বাবুর প্রতি ভালোবাসা থেকে নয়, করতেন দলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও সমর্পণ থেকে৷ জীবনের শেষ দিন অবধি দলের প্রতি তাঁর সেই সমর্পণ একটুও টলেনি৷ সেইসঙ্গে তাঁর অবদমিত উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রবাহিত হয়েছিল সন্তানের মধ্যে দিয়ে৷ নিজের সমস্ত অপূরিত স্বপ্ন অম্লানবাবুকে দিয়ে চরিতার্থ করতে চাইছিলেন সুনয়নাদেবী৷ ফলস্বরূপ, অম্লানবাবুকে তিনি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন নিজের মনের মতো করে৷ নিজে তিনি তাকে রাজনৈতিক শিক্ষা দিয়েছিলেন৷ কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল মায়ের রাজনৈতিক প্রতিভার উত্তরসূরি হলেও সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা অম্লানবাবুর নেই৷ বরং তিনি নিজের ইচ্ছেয় ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করে রাজনীতি থেকে সরে যেতে চাইলেন৷ সুনয়নাদেবী দেখলেন, তাঁর এতদিনের স্বপ্ন, পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বসেছে৷ কোণঠাসা বাঘিনির মতো ফুঁসে উঠলেন তিনি৷’

‘আমি পরে সুনয়নাদেবীকে নিয়ে অনেক ভেবেছি জানিস মিতুল৷ এক চরিত্রে এত স্ববিরোধ খুব বেশি দেখা যায় না৷ হয়তো তাঁর প্রতিভা সঠিক অভিমুখে স্ফুরণের পথ পেলে তিনি হতে পারতেন একজন রাজনৈতিক জিনিয়াস৷ কিন্তু সেটা হয়নি৷ অবদমিত আকাঙ্ক্ষা, অপমানিত বিবাহিত জীবন, স্বামীর অবহেলা, শঠতা, প্রতিভার অপচয় সব মিলে তাঁর মনের অন্ধকার দিকগুলোকে শক্তিশালী করে তুলেছিল৷ অম্লানবাবুকে তিনি নিজের সম্পত্তি মনে করতে শুরু করলেন৷ ভুলে গেলেন তাঁর সন্তান হওয়া ছাড়াও অম্লানবাবুর নিজস্ব কোনো অস্তিত্ব আছে৷ তিনি একজন আলাদা মানুষ৷ তাঁরও নিজস্ব ইচ্ছে-অনিচ্ছে, একান্ত নিজের কিছু স্বপ্ন, ভালো লাগা, মন্দ লাগা আছে৷ অম্লানবাবু হয়ে পড়লেন তাঁর মায়ের স্বপ্ন পূরণের হাতিয়ার৷ যে বা যারা সেই স্বপ্নের মাঝখানে এসেছে, তাদের সুচতুরভাবে সরিয়ে দিতে শুরু করেন সুনয়নাদেবী৷ অম্লানবাবুর স্ত্রী মধুরিমাদেবী ডিপ্রেশনের রোগী জেনেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে থাকেন সুনয়নাদেবী৷ পুত্রবধূকে মানসিকভাবে আঘাত করতে থাকেন অহরহ৷ আত্মহত্যা করলেন মধুরিমাদেবী৷ এই পুরো সময়টা একজনই ছিলেন সুনয়নাদেবীর পাশে৷ তিনি মনোময়বাবু৷’

‘তন্ময় যখন ডায়েরিটা নিয়ে ব্ল্যাকমেল করতে শুরু করল অমিয়বাবুকে, সুনয়নাদেবী দেখলেন বিপদ৷ তাঁর এতদিন ধরে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা স্বপ্নের সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে বুঝি বা৷ অমিয় চক্রবর্তী বেঁচে থাকলে কী করতেন, কী সিদ্ধান্ত নিতেন জানা নেই৷ হয়তো বৃদ্ধ বয়সে তাঁর রক্তের তেজ কিছুটা কমেছিল৷ হয়তো রিদ্ধিমাকে সন্তান হিসেবে মেনে নিতেন তিনি৷ কিন্তু কোনো কিছু করার সুযোগ তাঁকে দিলেন না সুনয়নাদেবী৷ তা ছাড়া, দলকে ক্ষমতায় ফেরানো সুনয়নাদেবীর লক্ষ্য ছিল৷ কিন্তু অমিয়বাবু মুখ্যমন্ত্রী হলে তাতে সুনয়নাদেবীর কিছু লাভ ছিল না৷ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর প্রতি ঘৃণার পাহাড় তৈরি হয়েছিল তাঁর৷ ভালোবাসা কোথাও আর অবশিষ্ট ছিল না এতটুকু৷ সুনয়নাদেবী এক ঢিলে দুই পাখি মারবেন বলে ঠিক করলেন৷

‘ধনঞ্জয় মণ্ডলের ছেলের অসুস্থতার সময় তাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন সুনয়নাদেবী৷ এটা আমি সুবিনয়বাবুর কিডন্যাপিং-এর আগের দিনই জানতে পারি ধনঞ্জয়ের ছেলে যে হসপিটালে ভরতি ছিল, সেখানে কথা বলে৷ হসপিটালের নামটা অবশ্য অর্জুনই জানিয়েছিল আমায়৷ সেখান থেকেই জানতে পারি, ধনঞ্জয়ের ছেলের ডেডবডি হসপিটাল থেকে ছাড়িয়ে নিতেও প্রায় আড়াই লাখ টাকার দরকার ছিল৷ সেটা সুনয়নাদেবী হসপিটালে নিজে গিয়ে নগদ টাকা দিয়ে শোধ করে বডি ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন৷ মানসিক অবসাদগ্রস্ত ধনঞ্জয় এমনিতেই অমিয় চক্রবর্তীকে আঘাত করার সুযোগ খুঁজছিল৷ সেই সুযোগ তার হাতে তুলে দিলেন সুনয়নাদেবী৷ বিষ মাখানো ফ্লাস্ক পাঠালেন ধনঞ্জয়ের কাছে৷ ধনঞ্জয়ও সেটা বদলে দিল অমিয়বাবুর ফ্লাস্কের সঙ্গে৷ সিসিটিভি ক্যামেরা কে ডিসেবল করেছিল জানি না৷ ধনঞ্জয়ও করতে পারে, আবার মনোময়বাবুও করতে পারেন৷’

‘অম্লানবাবুর সিংহাসনে বসার পক্ষে আর কোনো বাধা রইল না৷ সনাতন বিশ্বাস বেগরবাই করছিলেন৷ তাঁর নারীঘটিত দুর্বলতার কথা জানা ছিল সুনয়নাদেবীর৷ সহজেই সনাতন বিশ্বাসকে মাত দেওয়া গেল৷ কিন্তু এদিকে সুবিনয় মুখার্জি সব জেনে বসে আছেন৷ তিনি সফল ব্যবসায়ী৷ অর্থের অভাব নেই৷ তিনি এবার ক্ষমতা পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন৷ মল্লিকাদেবীর ডায়েরির কথা তিনিও জানেন৷ অম্লানবাবুর সঙ্গে তাঁর পুরোনো বন্ধুত্ব৷ সম্ভবত ইশারা ইঙ্গিতে নিজের ইচ্ছের কথা বন্ধুকে জানালেন সুবিনয়বাবু৷ অম্লানবাবু রাজিই ছিলেন৷ কিন্তু সুনয়নাদেবী দেখলেন, বিপদ৷ কারণ অমিয়বাবুর কলঙ্কিত গোপন অতীত সুবিনয়বাবুর জানা তাঁদের এবং পার্টির জন্য বিপজ্জনক৷ পরেও এই ব্ল্যাকমেল করতে পারেন সুবিনয়বাবু৷ একের পর এক অপরাধ করে সুনয়নাদেবীর সাহস বেড়েই চলেছিল৷ অম্লানবাবুর গদি কণ্টকমুক্ত করতে তিনি বদ্ধপরিকর ছিলেন৷ মনোময়বাবুকে দিয়ে সুবিনয়বাবুকে কিডন্যাপ করালেন তিনি৷ আমরা সেদিন ঠিক সময় গিয়ে না পৌঁছোলে হয়তো তাঁকেও বাঁচিয়ে রাখতেন না তাঁরা৷’

‘মাই গড,’ বললাম আমি, ‘এমন তো সিনেমায় হয় টাপুরদি৷ সত্যি একজন মানুষ নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য এভাবে মরিয়া হয়ে উঠতে পারেন ভাবাই যায় না৷ নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না৷’

টাপুরদি বিষণ্ণ হাসল৷ বলল, ‘জীবন অনেক ক্ষেত্রে সেলুলয়েডের চেয়ে অনেক বেশি জটিল, অনেক বিস্ময়কর৷ সুনয়নাদেবীর প্রতিভা ও রাজনৈতিক বুদ্ধি যদি সরল পথে বিকাশের সুযোগ পেত, তিনি যদি নিজেকে প্রমাণ করার, স্বপ্নটুকু নিয়ে বাঁচার সুযোগ পেতেন, তাহলে হয়তো এ-রকম বিকৃতির পথে যেতেন না৷ তাঁর চলার পথে শুধু কাঁটাই বিছিয়েছিলেন অমিয়বাবু৷ স্ত্রীকে ব্যবহার করে নিজের পলিটিক্যাল কেরিয়ারে একের পর এক সিঁড়ির ধাপ চড়েছিলেন তিনি৷ অভিমান, বঞ্চনা, অবহেলায় সুনয়নাদেবীর ভিতরের সুকুমার বৃত্তিগুলো মরে গেছিল রে মিতুল৷ মেয়েরা যেমন ভালোবাসার জন্য সব ত্যাগ করতে পারে, আবার অবহেলা, প্রেমে বিশ্বাসঘাতকতা তাকে ভয়ংকর প্রতিহিংসাপরায়ণ করে তোলে৷’

‘কেলেঙ্কারি করেছে,’ অর্জুনদা মুচকি হেসে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করল৷ টাপুরদি চোখ পাকিয়ে তাকাল অর্জুনদার দিকে৷ আমি গম্ভীর মুখে বললাম, ‘অর্জুনদা, উদাহরণটা মনে রেখো কিন্তু৷’

অর্জুনদা খুব সিরিয়াস মুখে বলল, ‘সে আর বলতে? এমনিতেই আমি মেয়েদের খুব ভয় পাই৷ আর তোমার দিদিকে তো একটু বেশিই পাই৷’

‘আচ্ছা টাপুরদি, তুমি কিন্তু বললে না তুমি সুনয়নাদেবীকে ঠিক কখন থেকে সন্দেহ করেছিলে,’ আমি বললাম৷

‘একদম গোড়া থেকে,’ মুচকি হেসে বলল টাপুরদি৷

আমাদের হাঁ হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে এবার টাপুরদি জোরে জোরে হেসে উঠল৷ বলল, ‘মুখটা বন্ধ কর তোরা৷ মাছি ঢুকে যাবে৷ যেকোনো খুনের ক্রাইমে প্রাইম সাসপেক্ট সবসময়ই হয় রেসপেক্টিভ স্বামী বা স্ত্রী৷ আমিও প্রথম থেকেই সেটা মাথায় রেখেই এগিয়েছিলাম৷ রহস্যের জাল যত ছড়িয়েছে, সাসপেক্টের সংখ্যা বেড়েছে৷ সাময়িকভাবে আমিও ডিসট্র্যাক্ট হয়ে গেছিলাম স্বীকার করি৷ কিন্তু যখন সব লুজ থ্রেডগুলো এসে অম্লানবাবুতে মিলছিল, তখন আমার পুরোনো সন্দেহটা আবার চাগাড় দিয়ে উঠল৷ খবর নেওয়া শুরু করলাম সুনয়নাদেবীর ব্যাপারে৷ সেদিন রাতে যখন আমি সুনয়নাদেবীর বাড়ি গেছিলাম, দেওয়ালের ছবিগুলো খুব মন দিয়ে আবার দেখলাম৷ একদম পুরোনো কিছু ছবিতে দেখলাম বিভিন্ন সভাসমিতিতে সুনয়নাদেবীও উপস্থিত৷ আরেকটা আশ্চর্য ব্যাপার লক্ষ করলাম৷ সেইসব ছবিগুলির সবগুলিতেই মনোময়বাবু কিন্তু সুনয়নাদেবীর পাশে রয়েছেন, অমিয়বাবুর সঙ্গে নয়৷ বুঝতে পারলাম, মনোময়বাবুর বস আসলে কে?’

‘মাই গড, তার মানে সেই সময় থেকেই তুমি জানতে সুনয়নাদেবী এসবের পেছনে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘ধুর বোকা, তাই কখনো জানা যায়! বলতে পারিস সন্দেহটা দৃঢ় হয়েছিল তখন৷ বাকিটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও পোক্ত হয়েছে৷ এরপর যখন মনোময়বাবুর ব্যাপারে নিশ্চিত হলাম, তখনই বুঝলাম এই সব কিছুর পেছনে আসল মাস্টারমাইন্ডটা কে, পুতুলনাচের সুতোগুলো আসলে কার হাতে৷ বাকিরা নেহাতই তাঁর হাতের পুতুল৷’

‘আচ্ছা, একটা শেষ প্রশ্ন৷ সেদিন অমন মোক্ষম সময়ে পুলিশ কীভাবে এল?’

টাপুরদি ও অর্জুনদা দুজনে দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল৷ টাপুরদি কিছু বলতে যেতেই অর্জুনদা বলল, ‘এটা আমি বলি৷ সেদিন যখন তোমাদের ওখানে ছেড়ে বেরিয়ে এলাম, মনে আছে, টাপুরকে বলে এসেছিলাম ওর যেকোনো সিদ্ধান্তে আমি ওর সঙ্গে আছি? তোমরা অম্লান চক্রবর্তীর বাড়িতে ঢোকার আগেই গেটে দাঁড়িয়ে টাপুর আমায় মেসেজ করেছিল সব জানিয়ে৷ সেইমতো তিন-চারজন সাদা পোশাকের পুলিশ ওই বাড়ির আশেপাশে ছিল৷ আমরাও অপেক্ষা করছিলাম একটু দূরে৷ তোমাদের দেরি দেখে চিন্তায় পড়ে গেছিলাম৷ এমন সময় পাহারায় থাকা কনস্টেবল আশিস জানাল, তোমাদের সে ছাদে দেখেছে এক ঝলক৷ সেটা শোনার পরেই আমরা কমিশনার সাহেবের কাছে খবর পাঠাই৷ তাঁর পারমিশন পেতে যেটুকু সময়ের অপেক্ষা, তার পরেই আমরা পৌঁছে যাই অম্লানবাবুর বাড়ি রেইড করতে৷’

টাপুরদি এবার অর্জুনদার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করল, ‘অর্জুন, সুনয়নাদেবীর লালবাজার সোর্সটা কে ছিল? তুমি যাকে সন্দেহ করেছিলে, সেই তো?’

অর্জুনদাকে ব্যথিত দেখাল৷ নীচু গলায় বলল, ‘হ্যাঁ, রজতদাই৷ কিন্তু রজতদার দোষ ছিল না৷ ওকে থ্রেট করা হয়েছিল৷ রজতদার উপর ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারি চলছে৷ সাসপেন্ড করা হয়েছে৷’

‘তুমি জানতে?’ অবাক হয়ে অর্জুনদাকে জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

অর্জুনদা বলল, ‘হ্যাঁ৷ সন্দেহ হয়েছিল৷ আমি যেখানেই যাচ্ছিলাম তদন্তের সূত্রে, কেউ আমায় ফলো করছিল৷ আমি আগে বুঝিনি৷ পরে আমাদের ড্রাইভার কনস্টেবল রতন বলল৷ অথচ আমার গতিবিধির খবর একমাত্র রজতদাই জানত৷’

অর্জুনদা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় কলিংবেলটা বেজে উঠল৷ অর্জুনদা উঠে গিয়ে দরজা খুলল৷ রিদ্ধিমা আর তন্ময় ঘরে ঢুকে এল৷ টাপুরদি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আরে এসো এসো৷’

আমি উঠে দাঁড়িয়ে দুইজনকে সোফায় বসতে দিলাম৷

রিদ্ধিমা বলল, ‘মিস ব্যানার্জি, আপনাকে আমি কী করে যে ধন্যবাদ জানাব, জানি না৷ যদিও সবটা আমি এখনও জানি না, কিন্তু এটুকু জানি আপনি না থাকলে তন্ময়কে আমি ফিরে পেতাম না৷’

টাপুরদি মিষ্টি করে হেসে বলল, ‘সবটা জানার তেমন কোনো দরকার নেই৷ তন্ময় তোমার কাছে ফিরে এসেছে, সেটাই সুসংবাদ৷ তবে এর জন্য ধন্যবাদ আমার প্রাপ্য নয়, এর দাবিদার অন্য একজন যিনি রেখাদেবীর বাড়ি থেকে পালানোর পর তন্ময়কে রীতিমতো ধরে নিয়ে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন৷ তিনি না থাকলে তন্ময়কে আজ তুমি পেতে কি না সন্দেহ৷’

তন্ময় বলল, ‘আমি খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম৷ ভেবেছিলাম আমাকে বুঝি বা মেরেই ফেলা হবে৷ সেজন্যই কিডন্যাপ করা হয়েছে৷ চোখের সামনে মাসিমণিকে যখন লোকগুলো মেরে ফেলল, আমি প্রাণভয়ে পালিয়েছিলাম৷ এয়ারপোর্টের কাছে একটা সস্তা হোটেলে গা-ঢাকা দিয়ে লুকিয়েছিলাম৷ কিন্তু পরের দিনই হোটেলের ঘরে কিছু লোক এসে আমায় জোর করে ধরে নিয়ে গেল৷ চোখ-মুখ বেঁধে দিয়েছিল৷ ভেবেছিলাম মেরে ফেলবে৷ কিন্তু দেখলাম রীতিমতো যত্ন করে জামাইআদরে একটা ফ্ল্যাটে রেখেছিল আমায়৷ হাত-পাও বাঁধেনি৷ শুধু বেরোনোর অনুমতি ছিল না৷ তিনজন ষণ্ডা গোছের লোক চবিবশ ঘণ্টা পাহারায় ছিল, ফোনও ছিল না কোনো৷ আমি সত্যিই এখনও জানি না ওরা কারা? আর কেনই বা আমাকে বিনা শর্তে ছেড়ে দিল৷’

‘তোমার কাছে কিছু জানতে চেয়েছিল ওরা?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘হ্যাঁ, জানতে চেয়েছিল, ডায়েরিটার ব্যাপারে রিদ্ধিমা বা আর কাউকে আমি কিছু বলেছি কি না? আর ওই ডায়েরিটা বা তার কোনো সফট কপি আমার কাছে আছে কি না? আমি দুটোই অস্বীকার করি৷ রিদ্ধিমা সত্যিই জানত না৷ ডায়েরিটা আমি পুড়িয়ে ফেলেছিলাম আর পেনড্রাইভটা রেখামাসির বাড়িতে খাটের নীচে আটকে রেখে এসেছিলাম৷’

‘যাক গে, যা হয়ে গেছে সেসব ভুলে যাও৷ নতুন করে জীবন শুরু করো৷ শুধু একটা প্রশ্ন ছিল৷ অমিয়বাবুকে কেন ব্ল্যাকমেল করেছিলে তুমি? টাকার জন্য?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘না না, টাকার জন্য নয়৷ আমি অমিয় চক্রবর্তীকে শুধু বলেছিলাম, রিদ্ধিমার পিতৃত্ব স্বীকার করতে হবে৷ তিনি প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে রাজি হয়েছিলেন৷ যেদিন তিনি মারা যান, সেদিন রাত দশটার পর আমায় দেখা করতে বলেছিলেন তাঁর অফিসে৷ কিন্তু তার আগেই অমিয়বাবুর মৃত্যুর খবর পেয়ে আর যাইনি আমি,’ তন্ময় বলল৷

‘ভাগ্যিস,’ বলল টাপুরদি৷

‘মানে?’ তন্ময়ের বিস্মিত জিজ্ঞাসা৷

টাপুরদি হেসে বলল, ‘নাহ, কিছু না৷’

রিদ্ধিমা এতক্ষণ প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিতে তন্ময়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল৷ এখন বলল, ‘আমি আপনাকে বলেছিলাম না, তন্ময় আমার জন্য সব করতে পারে৷ আজ আপনাকে আরেকটা সুখবর দিতে এসেছি আমরা৷ এই মাসের বাইশে আমরা কোর্টে রেজিস্ট্রি করছি৷ আমাদের দুজনেরই কেউ নেই৷ তাই আমাদের ইচ্ছে, আপনারা আমাদের বিয়েতে আইনি সাক্ষী হবেন৷ হবেন তো?’

টাপুরদি হেসে বলল, ‘নিশ্চয়ই হব৷ এ তো খুব আনন্দের কথা৷’

রিদ্ধিমা এবার ব্যাগ থেকে একটা এনভেলপ বের করে টাপুরদির হাতে দিল, বলল, ‘আপনি আমাদের জন্য যা করেছেন, তার জন্য কোনোকিছুই যথেষ্ট নয়৷ এটা আমাদের দুজনের তরফ থেকে সামান্য সম্মানদক্ষিণা৷’

‘আমার মা খারাপ মানুষ ছিলেন না, বিশ্বাস করুন মিস ব্যানার্জি,’ বললেন মুখ্যমন্ত্রী অম্লান চক্রবর্তী৷ মাত্র এক সপ্তাহ আগে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তিনি৷ সুনয়নাদেবীর আত্মহত্যার ঘটনার পর সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছিলেন অম্লানবাবু৷ চেয়েছিলেন, রাজনীতি থেকে অবসর নিতে৷ এমনকী প্রেস কনফারেন্স ডেকে সব কথা জনগণের সামনে তুলে ধরার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন৷ সেই সময়, মৃণাল দত্ত না থাকলে তাঁকে সামলানো যেত না৷ সেই ভঙ্গুর মুহূর্তে পরম অভিভাবকের মতো অম্লানবাবুর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি৷ অম্লানবাবুও সেই টালমাটাল অবস্থায় আঁকড়ে ধরে ছিলেন তাঁর ‘জ্যাঠামশাই’কে৷ মৃণালবাবুই তাঁকে ফিরিয়ে এনেছিলেন স্থিত, শান্ত মানসিক অবস্থায়৷ বুঝিয়েছিলেন, তিনি একজন সৎ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিজের কর্তব্যপালন করেই প্রায়শ্চিত্ত করতে পারেন তাঁর মায়ের অপরাধের৷ মৃণালবাবুই তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে সুনয়নাদেবীরও সেটাই স্বপ্ন ছিল৷ অন্যায় তিনি করেছিলেন, কিন্তু করেছিলেন সন্তানের মুখ চেয়ে, দলের মুখ চেয়ে৷ তাঁর পথটা হয়তো ভুল ছিল, কিন্তু দলের প্রতি তাঁর সমর্পণে কোনো খাদ ছিল না৷

আজ অম্লানবাবুর মুখোমুখি বসে মনে হল, এই অম্লান চক্রবর্তী অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী৷ আজ আর পার্টি অফিসে নয়, আমাদের তিনি ডেকে পাঠিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর অফিসে৷ আমাদের ঘরে ঢুকতে দেখে নিজে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন৷ তাঁর এই আন্তরিকতা খুব ভালো লাগল৷ প্রাথমিক কুশল বিনিময়ের পর তিনি একটু দ্বিধান্বিত স্বরে বললেন, ‘মিস ব্যানার্জি, সেদিন সমস্ত ঘটনার আপনি সাক্ষী৷ আপনি মনে করবেন না যেন, যে আপনাকে আমি মুখ বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানোর জন্য আজ এখানে ডেকেছি৷ সত্যি বলতে কী, এই মুখ বন্ধ রাখাটা আমার নিজের মনের উপরেই ভয়ংকর চাপ তৈরি করছে৷’

টাপুরদি শান্ত স্বরে বলল, ‘আপনি ভাববেন না স্যার৷ আমি কাউকে কিছু বলব না৷ অপরাধ সুনয়নাদেবী করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি নিজেই নিজেকে শাস্তি দিয়েছেন৷ এর পরে এ নিয়ে আর কিছু বলার থাকতে পারে না৷’

অম্লানবাবুকে শোকার্ত দেখাল৷ নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললেন, ‘আমার মা যা করেছেন, বাধ্য হয়েই করেছেন৷ সারাটা জীবন ধরে অনেক সহ্য করেছেন তিনি৷ সেদিন যদি বাবার মৃত্যু না হত, তবে তন্ময়ও বাঁচত না৷ বাবার জায়গায় হয়তো অন্য কোনো জায়গা থেকে তন্ময়ের লাশ পাওয়া যেত৷ এর বেশি আর কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷’

‘জানেন তো, ছোটো থেকে মা-ই ছিলেন আমার পৃথিবী৷ আমি ও মা, দুজনে দুজনকে আঁকড়ে বেঁচেছি৷ আজ বলতে আমার দ্বিধা নেই, সেই শৈশব থেকে চোখের সামনে বাবাকে দেখেছি মায়ের উপর মানসিক নির্যাতন করতে৷ কখনো গায়ে হাতও তুলতেন৷ মাকে ঘরের ভিতর বন্দি রাখার সে কি প্রাণপণ প্রয়াস ছিল বাবার৷ মার প্রতিভাকে ভয় পেতেন, ঈর্ষা করতেন বাবা৷ প্রতিটা সমস্যায় মায়ের কাছে থেকে সাহায্য, পরামর্শ নিতে হত, আর সেটাই বাবাকে আরও বেশি হিংস্র করে তুলত৷ আমাকেও মারতেন৷ রাতের পর রাত মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেন৷ ছোটো ছিলাম আমি, সব বুঝতাম না৷ তবু কষ্ট হত৷ মা বলতেন, ‘আমার কীসের দুঃখ? তুই তো আছিস আমার জন্য৷’ মায়ের দুনিয়াটা ছিল আমাকে ঘিরে,’ বলতে বলতে করুণ হাসি হাসলেন অম্লানবাবু, বললেন, ‘জানেন মিস ব্যানার্জি, ছোটো ছোটো বাচ্চারা যে বয়সে ছড়া মুখস্থ করে, আমাকে মা বক্তৃতা করা শেখাতেন৷ রাজনীতির এ বি সি ডি মা হাতে ধরে বুঝিয়েছিলেন আমাকে৷ মা-ই আমার রাজনৈতিক গুরু৷ আজ বুঝি, মায়ের অসাধারণ প্রতিভা অবদমিত হয়ে আমাকে কেন্দ্র করে মুক্তির পথ খুঁজে নিয়েছিল৷ মা যে এসব করে চলেছিল, আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি৷ টের পেলে আমি মাকে এভাবে আগুন নিয়ে কিছুতেই খেলতে দিতাম না৷ টের পেলাম বাবার মৃত্যুর পরে৷ খুব ভয় পেয়েছিলাম৷ মাকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম৷ আপনাকেও বলেছিলাম কেস থেকে সরে যেতে৷ সেও সেই ভয় থেকেই৷’

সারা ঘরে কয়েক মুহূর্তের জন্য পিনপতন স্তব্ধতা৷ তারপর টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘মনোময়বাবুর কী খবর?’

‘মনোময়কাকা রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন৷ আমি বাধা দিইনি৷ মায়ের মৃত্যুতে খুব আঘাত পেয়েছেন তিনি৷ সাময়িক অসুস্থ হয়েও পড়েছিলেন৷ কথাবার্তা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন৷ কাকার বয়স হয়েছে, তাঁর সত্যিই বিশ্রামের দরকার৷ অনেক তো করলেন আমাদের পরিবারের জন্য, মায়ের জন্য৷ আর কত?’ গম্ভীর মুখে বললেন অম্লানবাবু৷

‘হুম, সেই-ই ভালো,’ বলল টাপুরদি৷

‘যাই হোক, আজ যে জন্য আপনাদের ডেকেছিলাম, সেই কথায় আসা যাক৷ ভেবেছিলাম, আমাদের দলের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে আপনাকে নিয়োগের প্রস্তাব রাখব আপনার কাছে, কিন্তু মনে পড়ল আপনি বলেছিলেন আপনাকে কেনা যায় না৷ তাই আপনাকে এমন কোনো প্রস্তাব দেওয়া সমীচীন বোধ করলাম না, যাতে আপনি অপমানিত বোধ করতে পারেন৷ কিন্তু সরকারি প্রয়োজনে, রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার ব্যাপারে আপনার পরামর্শ বা সাহায্য চাইলে ফিরিয়ে দেবেন না তো?’

টাপুরদি মৃদু হাসল৷ তারপর বলল, ‘স্যার আমি একজন সামান্য প্রাইভেট ডিটেকটিভ৷ সরকারি লাইসেন্স পেয়েছি, তাই নিজের প্যাশনটাকে প্রফেশন বানিয়ে কাজ করি৷ যদি সরকারের কোনো কাজে লাগি, রাজ্যের মঙ্গলের জন্য কাজ করতে পারি, সে আমার পরম সৌভাগ্য৷ আমি আদৌ জানি না আমার ক্ষমতা কতটুকু, তবে যদি কাজে লাগতে পারি, সেটাকে নিজের কর্তব্য মনে করে পালন করব৷ তবে ক্ষমা করবেন, কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের জন্য কাজ করতে আমি অপারগ, সেটা আমার ব্যক্তিগত আদর্শের বিরোধী৷ আর আপনাদের দলের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার জন্য সুবিনয়বাবু তো আছেনই৷’

অম্লানবাবু হেসে বললেন, ‘আপনার কাছে এ-রকম উত্তরই আশা করেছিলাম৷ হ্যাঁ সুবিনয় আছে৷ সেদিনের পর বেচারা একটু ভয় পেয়ে গেছিল৷ রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে চেয়েছিল৷ আমার অনুরোধে রয়ে গেছে৷ জানেন নিশ্চয়ই, সুবিনয় এখন আমাদের দলের টিকিটে জয়ী বিধায়ক? শুধু তাই নয়, ক্রীড়ামন্ত্রকের দায়িত্বও ওর৷’

‘হ্যাঁ জানি,’ বলে মাথা নাড়ল টাপুরদি৷

অম্লানবাবু বললেন, ‘আপনার জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইল৷ আর যেকোনো প্রয়োজনে আপনি নির্দ্বিধায় আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন৷’

টাপুরদি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে কিছু ভাবল৷ তারপর বলল, ‘শুধু একটা কথা জিজ্ঞাসা করার ছিল৷’

‘কী কথা?’ অম্লানবাবু কৌতূহলী দৃষ্টিতে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালেন৷

‘তন্ময়কে সুনয়নাদেবীর হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই ওকে লুকিয়ে রেখেছিলেন আপনি, তাই তো? জানতেন অমিয়বাবুর হাত থেকে বেঁচে গেলেও, তন্ময়ের প্রাণের আশঙ্কা তখনও কাটেনি৷ সুনয়নাদেবী আর মনোময়বাবুর অগোচরে আপনার লোকেরাই তন্ময়কে হোটেল থেকে কিডন্যাপ করেছিল, তাই না অম্লানবাবু?’ অম্লানবাবুর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি স্থাপন করে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

কয়েক মুহূর্ত৷ তারপর অম্লানবাবু হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দিলেন টাপুরদির দিকে৷ বললেন, ‘ভালো থাকবেন মিস ব্যানার্জি৷ আজ আমার একটা জরুরি মিটিং আছে৷ আমায় যেতে হবে৷ আবার না হয় পরে কখনো দেখা হবে, কেমন?’

বেরিয়ে এলাম আমরা মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে৷ টাপুরদির মোবাইলে রিং হচ্ছে৷ মর্নিং ডিউ বাজছে, অর্থাৎ অর্জুনদার ফোন৷ পকেট থেকে ফোনটা বের করে হাসিমুখে কানে ছোঁয়াল টাপুরদি৷ ওদিকের কথাগুলো শুনতে পেলাম না৷ শুধু টাপুরদি বলল শুনলাম,

‘হ্যাঁ, বলো... সে কী? কোথায়?... বডি কোথায় ছিল?... মাই গড, আচ্ছা আমায় বডির ছবি পাঠাতে পারবে?’

ফোনটা রাখতে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী হল টাপুরদি?’

‘দমদম স্টেশন পেরিয়ে কিছুটা দূরে লাইনে মনোময়বাবুর ট্রেনে কাটা বডি পাওয়া গেছে রে৷ হাতে সুইসাইড নোট ছিল, লেখা ছিল তাঁর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়,’ গম্ভীর মুখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল টাপুরদি, ‘মনোময়বাবুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রাজ্য রাজনীতির একটা দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল৷’

‘সত্যিই আত্মহত্যাই তো টাপুরদি? নাকি...?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

টাপুরদি কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে, সেই দৃষ্টির অর্থ আমার জানা নেই৷

অধ্যায় ৮ / ৮
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%