সোমজা দাস
টাপুরদি চুপ করে আছে৷ আমি জানি টাপুরদি নিজেও মানসিকভাবে কতটা যন্ত্রণার মধ্যে আছে৷ ঘটনাটা শোনার পরেই আমি অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা টাপুরদির ফ্ল্যাটে ফিরে এসেছি সকালে৷ অর্জুনদা গড়িয়া থানায় ফোন করে জেনেছে পাড়াপ্রতিবেশীরা আজ সকালে দেখে বাড়ির দরজা খোলা৷ ভিতরে ঢুকে তারা রেখাদেবীর মৃতদেহ দেখতে পায়৷ বাড়িতে আর কেউ ছিল না৷
অর্জুনদা সামনে এগিয়ে গিয়ে টাপুরদির মুখোমুখি বসল৷ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে নরম গলায় বলল, ‘টাপুর, তুমি বুঝতে পারছ তো, যারা রেখাদেবীকে মেরেছে, তারা খুব ক্ষমতাশালী লোকজন৷ তারা তোমার ক্ষতি করতে পারে, মিতুলের ক্ষতি করতে পারে৷ তুমি আর এসবের মধ্যে থেকো না টাপুর৷ প্লিজ আমি রিকোয়েস্ট করছি তোমায়৷ তুমি যদি আমায় কালই বলতে তন্ময় রেখাদেবীর বাড়িতে আছে, ওকে যদি ওখান থেকে বার করে আনতে পারতাম, আজ হয়তো রেখাদেবী বেঁচে থাকতেন৷ আমরা এখনও জানি না, তন্ময় কেমন আছে, কোথায় আছে, ওদের হাতে ধরা পড়েছে কি না৷ আর যদি সত্যিই অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর সঙ্গে তন্ময়ের বা রেখাদেবীর মৃত্যুর কোনো যোগ থাকে, সেক্ষেত্রে ইউ আর অলসো ইন গ্রেট ট্রাবল৷ তুমি প্লিজ এই কেস থেকে পুরোপুরি সরে এসো৷ পুলিশের কাজ পুলিশকে করতে দাও৷’
টাপুরদির জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে৷ মাথা নীচু করে চুপ করে বসে আছে টাপুরদি৷ তাকে দেখে একটা সম্পূর্ণ হেরে যাওয়া মানুষ বলে মনে হচ্ছে৷ টাপুরদিকে হেরে যেতে দেখতে ভালো লাগে না আমার৷ আমি টাপুরদির পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম৷ কঠিন গলায় বললাম, ‘অর্জুনদা, সব দোষ কি সত্যিই টাপুরদির? টাপুরদি তো তোমায় সব বলেছিল, পুলিশ কেন তন্ময়ের সঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর হত্যার যোগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেনি এতদিন? অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে৷ পুলিশ শুধুমাত্র একমুখী তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে৷ অমিয় চক্রবর্তীর আশেপাশের মানুষের মধ্যে খুনি খুঁজে চলেছে৷ অমিয়বাবুর অতীত ঘেঁটে দেখার সম্ভাবনার কথা কই কারওর তো মাথায় আসেনি এক টাপুরদি ছাড়া৷ এখন যখন রেখাদেবী খুন হয়েছেন, এই খুন ও তন্ময়ের অন্তর্ধানের সঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর খুনের যোগ থাকার সম্ভাবনা দৃঢ় হচ্ছে, তখন তুমি বলছ টাপুরদিকে সরে যেতে?’
অর্জুনদা অবাক দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকাল৷ আমি কোনোদিন এভাবে অর্জুনদার সঙ্গে কথা বলিনি৷ কিন্তু আজ টাপুরদির জন্য শুধু অর্জুনদা কেন, আমি দুনিয়ার সঙ্গে লড়ে যেতে পারি৷ অর্জুনদা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল৷ তারপর উঠে দাঁড়াল৷ গম্ভীর গলায় বলল, ‘বেশ! যা ভালো বোঝো করো৷ আমি আসছি৷’
অর্জুনদা দরজার সামনে গিয়ে জুতোতে পা গলাচ্ছে, টাপুরদি মুখ তুলে মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘যদি সম্ভব হয়, রিদ্ধিমার সিকিউরিটির ব্যবস্থা কোরো৷ ওর বাড়ির সামনে সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন করতে পারলে ভালো হয়৷ আমার ধারণা, শি ইজ অলসো ইন ডেঞ্জার৷’
অর্জুনদা কিছু বলল না৷ গম্ভীর মুখে বেরিয়ে গেল৷ আমি উঠে দরজা বন্ধ করে টাপুরদির পাশে গিয়ে বসলাম৷ বললাম, ‘আমি জানি টাপুরদি, রেখাদেবীর মৃত্যুর জন্য তুমি নিজেকে দায়ী করছ৷ কিন্তু আমি বলব, কোরো না৷ এতদিন ওরা জানতে পারেনি যে তন্ময় রেখাদেবীর বাড়িতে লুকিয়ে আছে৷ জানতে পারলে আগেই ঘটনাটা ঘটত৷ কাল যা ঘটেছে, তন্ময়ের নির্বুদ্ধিতার জন্য ঘটেছে সেটা তুমি নিজেও জানো৷ রিদ্ধিমার ফোন যে ট্রেস হবে, সেটা ওর আগেই বোঝা উচিত ছিল৷ রেখাদেবীকে দিয়ে রিদ্ধিমাকে ফোন করানোটা ওর উচিত হয়নি৷ যেটা হয়েছে, সেটা ইরিভার্সিবল৷ আমি তোমায় বলছি টাপুরদি, তুমি হাল ছেড়ো না৷ পুলিশ যেভাবে এগোচ্ছে এগোক৷ তুমি তোমার মতো করে এগোও৷ অর্জুনদা এখন কিছুটা ডিস্টার্বড৷ মাথা ঠান্ডা হলে নিজেই বুঝবে৷’
টাপুরদি আমার দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ মুখে হাসল৷ তারপর বলল, ‘কবে এত বড়ো হয়ে গেলি রে মিতুল?’ তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘অর্জুন ভুল বলেনি রে৷ রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রীকে যারা হত্যা করতে পারে, তারা পেটি ক্রিমিনাল নয়৷ এরা সত্যিই সাংঘাতিক৷ আমি তোকে এর মধ্যে টানতে পারি না কিছুতেই৷ দুটো খুন করেছে ওরা, তিনটে খুন করতে ওদের বাঁধবে না৷ নিজের জন্য আমি ভাবি না৷ কিন্তু তোর কোনো ক্ষতি হতে দেব না আমি৷ গোয়েন্দাগিরিটা আমি শখে করি৷ এটা আমার নেশা বলে করি৷ কিন্তু নেশা কখনোই কারও জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না৷ এই কেসে পুলিশ যা করে করুক৷ আজ এই মুহূর্ত থেকে আমি এই কেস থেকে সরে এলাম৷’
আমি বললাম, ‘টাপুরদি, কেস তোমার, তাই সিদ্ধান্তও তোমার৷ তুমি তো আমায় ছোটো থেকে চেনো৷ জানো তো, ছোটো থেকে আমার ইমিউনিটি খুব কম ছিল৷ ভীষণ ভুগতাম৷ রোগা শরীরে সামান্য ধকলও সহ্য করতে পারতাম না আমি৷ মাও আমাকে খুব আগলে আগলে বড়ো করেছে৷ পড়াশোনার বাইরে আর কিচ্ছু বুঝতাম না৷ এভাবে চলতে চলতে আমার আত্মবিশ্বাসটাই নষ্ট হয়ে গেছিল৷’
‘তারপর তুমি ইউএসএ থেকে ফিরে এলে৷ তোমার সঙ্গে একটা দুটো করে কেসে কাজ করতে করতে ধীরে ধীরে আমি নিজেই কখন বদলে গেছি, টেরই পাইনি জানো? এতটা শক্তি, এতটা সাহস যে আমার মধ্যে ছিল, আমি নিজেই জানতাম না৷ তুমি আমায় নিজেকে চিনিয়েছ৷ আমার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছ৷ সারাজীবন ধরে হেরে যাওয়া, মুখ লুকিয়ে থাকা আমি জীবনকে চোখে চোখ রেখে চ্যালেঞ্জ করতে শিখেছি৷ ভয়, অসহায়তা নিয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার চেয়ে লড়াই করে বাঁচা, হেরে না গিয়ে মরে যাওয়াও ভালো৷ আমি আর ভয় পাই না টাপুরদি, বিশ্বাস করো৷ তুমিও ভয় পেয়ো না৷ তুমিই তো আমায় শিখিয়েছ, জীবনে যত কঠিন পরিস্থিতিই আসুক, চোখ-কান খোলা রেখে এগিয়ে যাওয়ার সাহসটুকু রাখলে একটা না একটা সমাধান বেরোয়ই৷ আমি নিশ্চিত, এই কেসেও বেরোবে৷ তুমি হাত তুলে নিয়ো না৷ প্লিজ৷ অর্জুনদা তোমায় ভালোবাসে টাপুরদি, তাই ভয় পাচ্ছে৷ যখন তুমি কেসটা সলভ করবে, আমি জানি সবচেয়ে বেশি খুশি অর্জুনদাই হবে৷’
টাপুরদির গাল বেয়ে অশ্রুধারা নামছে৷ এতদিন ধরে এত খুনোখুনি দেখেছি আমরা, কত মৃতদেহকে চোখের সামনে দেখেছি, কিন্তু টাপুরদিকে এ-রকমভাবে ভেঙে পড়তে দেখিনি কখনো৷ গোয়েন্দা টাপুরদি, যে একাই যুযুৎসুর প্যাঁচে একাধিক দুষ্টু লোককে কাবু করার ক্ষমতা রাখে, নির্দ্বিধায় যেকোনো বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, জটিল পরিস্থিতিতেও যে স্নায়ুর উপর নিয়ন্ত্রণ হারায় না এতটুকু, সেই শক্তিশালী মেয়েটির ভিতরে একটি কোমল, নরম মানুষও বাস করে৷ তাকে আমি চিনি৷ সে একজন স্নেহময়ী দিদি, বন্ধু৷ সে যাকে ভালোবাসে তার জন্য সব করতে পারে৷ কিন্তু আজ যদি আমি টাপুরদিকে দুর্বল হতে দিই, তাহলে সারাজীবন আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না৷ আমার মনে হবে আমার জন্য টাপুরদিকে পিছিয়ে আসতে হল৷ হাত বাড়িয়ে টাপুরদির গলা জড়িয়ে ধরে হেসে বললাম, ‘তুমি যদি কেস থেকে সরে আসো, আমি কিন্তু আসব না, এই আমি বলে দিলাম৷ তোমার কাছ থেকে যেটুকু শিখেছি, তাই দিয়েই তদন্ত করব৷ তুমি ভেবে দেখো এবার, একা একা আমাকে এই বিপদের মধ্যে ছেড়ে দেবে কি না৷’
টাপুরদি এবার হেসে ফেলল৷ বলল, ‘খালি দুষ্টু বুদ্ধি না?’ তারপর উদাস গলায় বলল, ‘না রে মিতুল, আমি সাহস পাচ্ছি না৷ ওরা যা কিছু করতে পারে৷’
আমি বললাম, ‘তুমিও যা কিছু করতে পারো৷ তুমি কি কম ভয়ংকর নাকি? সেটা ওরা এখনও বোঝেনি৷ এবার সেটা বোঝানোর সময় এসেছে৷’
‘বলছিস?’ হেসে বলল টাপুরদি৷
‘একদম, বলছি৷’ আমিও হাসলাম৷
‘অর্জুন কিন্তু ভারি রেগে যাবে?’ মুচকি হেসে বলল টাপুরদি৷
‘পরে তুমি না হয় আদর করে রাগ কমিয়ে দিয়ো৷’ হেসে বললাম আমি৷
‘তবে রে,’ বলে হাসতে হাসতে আমায় গাঁট্টা মারার জন্য হাত তুলল টাপুরদি৷ আমি ছিটকে সরে গেলাম৷ টাপুরদি বলল, ‘বেশ, চল তবে৷ না হয় আরেকবার চেষ্টা করা যাক৷’

লাঞ্চে আজ পাউরুটি টোস্ট আর ওমলেট দিয়ে কাজ সারা গেছে৷ সকাল থেকে যা গেল, আর রান্না করা, খাওয়ার মতো মানসিক অবস্থা কারওরই ছিল না৷ এখন দুজনে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে কেস নিয়েই কথা বলছি৷ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তাহলে নেক্সট স্টেপ কী?’
‘সব আবার নতুন করে শুরু করতে হবে রে মিতুল,’ বলল টাপুরদি, ‘যেটুকু এগিয়েছিলাম, তন্ময়ের অন্তর্ধানের সঙ্গে সবটুকু শেষ হয়ে গেল৷ যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেখানেই পৌঁছে গেলাম আবার৷’
‘তাহলে এবার কীভাবে এগোবে কিছু ভাবলে?’ জানতে চাইলাম আমি৷
টাপুরদি বাইরে জানালার দিকে অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ৷ তারপর উঠে গিয়ে একটা কাগজ আর পেন নিয়ে ফিরে এল৷ বলল, ‘এখনও পর্যন্ত আমরা কী কী জানতে পেরেছি? রিদ্ধিমার আমাদের কাছে আসার দিন থেকে শুরু করি৷ রিদ্ধিমা আমাদের কাছে এল ওর বয়ফ্রেন্ড তন্ময়ের খোঁজ পেতে৷ তন্ময় ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেসে চাকরি করত, জানা গেল তন্ময় সেখান থেকে কিছু ডকুমেন্ট চুরি করে পালিয়েছে৷ এই ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেসে গিয়েই আমরা জানতে পারছি তন্ময় একটি হাইলি কনফিডেনশিয়াল প্রজেক্টে কাজ করছিল৷ রূপমের কাছে এর আগেই আমরা জেনেছিলাম, প্রজেক্টটার ব্যাপারে৷ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিরোধী নেতা অমিয় চক্রবর্তীর ইমেজে কালি লাগানোর জন্য তাঁর অতীত ঢুঁড়ে অন্ধকার সত্য খুঁজে বার করার বরাত দেওয়া হয়েছিল সংস্থাটিকে৷ এখন প্রশ্ন হল, কেন তন্ময় ডকুমেন্টস চুরি করে পালাল এভাবে?’
‘বাকি আরও কয়েকজনের সঙ্গে তন্ময়ও এই প্রজেক্টেই কাজ করছিল৷ এ-রকম সময় একদিন তন্ময় নিরুদ্দেশ হল৷ জানা গেল, রাতে অফিসে ঢুকে সে প্রোজেক্টের কিছু কনফিডেনশিয়াল ডকুমেন্টস কম্পিউটার থেকে ডিলিট করে পালিয়ে গেছে৷ আমরা এখনও জানি না কী ছিল সেই ফাইলে৷ সেটা না জানলে এগোনোটা মুশকিল৷ আমাদের জানতে হবে, কী এমন গুরুত্বপূর্ণ নথি ছিল, যার জন্য তন্ময় এতটা ঝুঁকি নিল৷ ও কি ভেবেছিল, সেগুলি দিয়ে অমিয় চক্রবর্তীকে ও ব্ল্যাকমেল করবে? ও কি এতটাই বোকা যে এতবড়ো রিস্ক নেবে? আর একটা ব্যাপার৷ ডকুমেন্টটার ব্যাপারে কে কে জানত? আই মিন, প্রজেক্টটাতে তো তন্ময় ছাড়াও আরও কয়েকজন ছিল৷ রূপমও ছিল৷ ওরা কি জানে ওই ফাইলে কী ছিল? নাকি ডকুমেন্টটা তন্ময় নিজেই সংগ্রহ করেছিল? সেটা সে প্রথমে অফিসের সিস্টেমে সেভও করে রেখেছিল৷ হয়তো পরে নিজের মন বদলায়, সেটাকে সরিয়ে ফেলে সে৷’
‘এবার যেটা হল, ইলেকশনে অমিয় চক্রবর্তী জিতে গেলেন৷ তিনি রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রী৷ কিন্তু শপথগ্রহণের আগের দিন পার্টি অফিসে নিজের কেবিনে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া গেল৷ মৃত্যুর কারণ বিষ প্রয়োগ৷ আচ্ছা মিতুল, তোর মনে আছে নিশ্চয়ই, অমিয় চক্রবর্তী যখন মারা যান, সেইদিন বিকেলের পর তিনি অফিসের সবাইকে ছুটি দিয়েছিলেন৷ একাই ছিলেন অফিসে৷ কেন? আরেকটা ব্যাপার৷ তাঁর মৃতদেহের পাশে লোডেড রিভলভার পাওয়া গেছিল, সাইলেন্সার লাগানো৷ এখানেও সেই একই প্রশ্ন, কেন? সবাইকে অফিস থেকে বার করে একা তিনি কী করতে চেয়েছিলেন? কারও কি আসার কথা ছিল? রিভলভার কেন? কী প্ল্যান ছিল? আত্মহত্যা করার কথা ভাবছিলেন, না খুন?’
‘তন্ময় রেখাদেবীর কাছে লুকিয়ে ছিল৷ ওরা জানতে পেরে গিয়ে সেখানে অ্যাটাক করে৷ এখন প্রশ্ন হল, তন্ময় কোথায়? ও কি ধরা পড়ে গেছে না পালাতে পেরেছে? তন্ময় যদি পালিয়ে গিয়ে থাকে ওরা তন্ময়ের উপর চাপ সৃষ্টি করে ওকে ফিরে আসতে বাধ্য করবে৷ সেক্ষেত্রে রিদ্ধিমা একেবারেই সেফ নয়৷’
‘প্রশ্ন তো পাওয়া গেল,’ বললাম আমি, ‘উত্তর মিলবে কীভাবে?’
‘খুঁজতে হবে৷’ হেসে বলল টাপুরদি৷
‘তার মানে, তুমি মোটামুটি নিশ্চিত যে এই কেস দুটো রিলেটেড৷ তাই তো?’ জানতে চাইলাম আমি৷
টাপুরদি হাসল৷ বলল না কিছু৷
‘কিন্তু টাপুরদি, এর মানে দাঁড়াচ্ছে তন্ময়কে খুঁজে বার করতে হলে তোমায় অমিয় চক্রবর্তীর কেসটার মধ্যে না চাইলেও জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে৷ কিন্তু অমন হাই প্রোফাইল কেসে তুমি ঢুকবে কী করে বলো তো? পুলিশ কোনোভাবেই তোমায় অ্যালাও করবে না৷ তুমি স্পটে যেতে পারবে না৷ কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে না৷ গোপনে কতটুকু তদন্ত সম্ভব?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
টাপুরদি বাইরে জানালার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল৷ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ হেসে বলল, ‘কীভাবে কী সম্ভব হবে আমি সত্যিই জানি না রে মিতুল৷ আদৌ পারব কি না তাও জানি না৷ তবু একবার চেষ্টা না করে হাল ছেড়ে দিতে মন সায় দিচ্ছে না৷ বিশেষ করে যেখানে তন্ময়ের প্রাণসংকটের প্রশ্ন, সেখানে যদি ওকে বাঁচানোর চেষ্টাটুকু না করি, আর ওর যদি সত্যিই কোনো বিপদ হয়, নিজেকে আমি ক্ষমা করতে পারব না কোনোদিন৷’
আমি হাসলাম৷ বললাম, ‘আমি জানি টাপুরদি৷ তন্ময়ের বিপদ জেনেও তুমি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারবে না কখনো৷ আর দেখো, এই কেসটাও তুমি ঠিক ক্র্যাক করবে, সেটাও আমি জানি৷ অর্জুনদা মুখে যাই বলুক, তোমার পাশেই থাকবে৷ কারণ আমার মতো অর্জুনদাও তোমায় সফল হতে দেখতে চায়, সেটা তুমিও জানো৷’
আমার ফোনটা বাজছে৷ উঠে গিয়ে ফোনের স্ক্রিনে নামটা দেখে মুচকি হাসলাম৷ ফোনটা রিসিভ করে কানে ঠেকিয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ, বলো অর্জুনদা৷’
‘মিতুল, টাপুরকে বলে দিয়ো রিদ্ধিমার বিল্ডিং-এ দুজন সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে৷ ওর সেফটির দিকটা দেখা হচ্ছে৷’ গম্ভীর গলায় বলল অর্জুনদা৷
আমি হেসে বললাম, ‘সেটা তো তুমি আমাকে না বলে সরাসরি টাপুরদিকেই বলতে পারতে৷’
‘তুমি বলে দিয়ো,’ বলল অর্জুনদা, ‘আর এটাও বোলো যে পুলিশ অতটাও ইররেস্পন্সিবল নয় যতটা ও ভাবে৷’
ফোনটা কেটে দিল অর্জুনদা৷ আমি সোফায় ফিরে এসে বসলাম৷ বললাম, ‘রিদ্ধিমার বাড়িতে প্লেন ড্রেসড পুলিশ বসানো হয়েছে, অর্জুনদা বলল৷’
‘হুম,’ বলল টাপুরদি৷ তারপর চোখ তুলে জিজ্ঞাসা করল, ‘আর কিছু বলল ও?’
বুঝতে পারলাম, অর্জুনদার অভিমান ওকেও কষ্ট দিচ্ছে৷ টাপুরদি আশা করছে, অর্জুনদা আরও কিছু বলুক, সব আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাক৷ টাপুরদি যতই নিজের অনুভূতিগুলো লুকোনোর চেষ্টা করুক, ভালোবাসলে শক্ত মেয়ের বুকের ভিতরটাও কাদা মাটির মতো তলতলে হয়ে ওঠে৷ সেখানে দুঃখ আনন্দগুলো সহজেই ছাপ ফেলে৷ আর কষ্ট দিতে ইচ্ছে হল না টাপুরদিকে৷ অর্জুনদার অভিমানটুকুও না হয় আমার কাছেই জমা থাক৷
আমি দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বললাম, ‘না, এটাই জানাল৷ তোমাকে বলতে বলল৷ আর কিছু বলেনি৷’

নির্জন অন্ধকার গলি দিয়ে হেঁটে চলেছে একটি মানুষ, শান্ত, ধীর, কিছুটা অবিন্যস্ত পদক্ষেপে৷ মনে হচ্ছে যেন কোথাও পৌঁছোনোর তাড়া নেই তার৷ ক্লান্ত পায়ে নিঃশব্দে এগোচ্ছে সে৷ যেন সে জানে পথের শেষে কোনো আলোর রেখা অপেক্ষা করে নেই তার জন্য৷ যে চোরাবালিতে সে পা রেখেছে, সেখানে ডুবে মরাই তার নিয়তি৷ অথচ জীবনের থেকে খুব বেশি চাহিদা তো তার ছিল না৷ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে সে৷ চারিদিকের জমাট অন্ধকার তাকে যেন আরও বেশি করে ঘিরে ধরছে, পিষে ফেলতে চাইছে তাকে৷ লোকটার দম বন্ধ হয়ে আসছে৷
একটু দাঁড়াল লোকটা৷ পকেট থেকে দেশি মদের বোতলটা বার করে গলায় ঢেলে দিল৷ গলা দিয়ে যেন জ্বলন্ত তরল আগুন নামল৷ আঃ, কী শান্তি৷ যতক্ষণ সে মদে ডুবে থাকতে পারে, ততক্ষণ সে কাউকে ভয় করে না৷ মদ, একমাত্র মদই পারে তার বুকের ভিতর জমে থাকা সব রাগ, দুঃখ, জ্বালা, যন্ত্রণাগুলো জুড়িয়ে দিতে৷ যন্ত্রণা, মৃদু হাসির রেখা ফুটে ওঠে লোকটার ঠোঁটের কোণে৷ যন্ত্রণার সঙ্গে তো তার নিত্য সহবাস৷ পেটের ভিতরটা পচছে রোজ একটু একটু করে৷ শরীরের ব্যথা বেদনা আজকাল আর টেরই পায় না সে৷ শক্ত খাবার গেলা বন্ধ হয়েছে সে অনেকদিন হল৷ হাতে আর সময় নেই, তাও সে জানে ভালো করেই৷ আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকেই চিনতে পারে না৷ একসময়ে এই শরীরটার উপর কত অত্যাচারটাই না সে করেছে৷ আর শরীরটাও ছিল তার জবরদস্ত৷ অসুরের শক্তি ছিল গায়ে, লোহা খেয়ে হজম করতে পারত সে অনায়াসে৷ আর এখন জল খেলেও বমি হয়ে যায়৷
মদটা তবু সে খায়৷ মদ না খেলে এই ক’টা দিনই বা সে বাঁচবে কী নিয়ে? আজকাল বউটার মুখ খুব মনে পড়ে৷ কী মিষ্টিই না দেখতে ছিল তার বউ! বিয়ে হয়ে যখন এসেছিল, কতই বা বয়স ছিল মেয়েটার৷ শহরে ওই বয়সের মেয়েরা ফ্রক পরে ইস্কুলে যায়৷ বছর ঘুরতে না ঘুরতে প্রথমবার মা হল, দুই বছরের মাথায় দ্বিতীয়বার পোয়াতি৷ ডাক্তার বলেছিল, বয়স কম, শরীরে রক্ত কম৷ ভালো-মন্দ খাওয়াতে হবে, যত্ন করতে হবে৷ লোকটা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ সেদিন ডাক্তারের কথার গুরুত্ব বোঝার মতো সময় তার কোথায় ছিল৷ মা শুনে মুখ বেঁকিয়ে বলেছিল, ‘গভভে আমরাও ছেলেপিলে ধরেছি, এত আদিখ্যেতা দেখিনি৷ রক্ত কম আবার কী? বাচ্চাকাচ্চা হওয়ার সময় ওরম সবার হয়৷’ মাকে দোষ দিয়ে কী লাভ? সে নিজে কী করেছিল? পোয়াতি বউকে ঘরে ফেলে পার্টির কাজে ছুটে বেরিয়েছে দিনের পর দিন৷ যেদিন বউয়ের ব্যথা উঠল, সেদিনও সে বারাসাতের জনসভায় পড়ে ছিল৷ যখন বাড়ি ফিরল, ততক্ষণে সব শেষ৷ মা বাচ্চা দুজনের কেউই বাঁচেনি৷
তারপর থেকে নিজেকে সে আরও বেশি করে ডুবিয়ে দিয়েছিল পার্টির কাজে৷ বাড়িতে বৃদ্ধা মা, শিশুপুত্র কারও খোঁজই রাখত না বললেই চলে৷ শুধু মাসের শুরুতে মায়ের হাতে একমুঠো টাকা ধরিয়ে দিয়ে আসত৷ এভাবেই কাটছিল দিনগুলো৷ মাতৃহারা ছেলেটা একা একাই বেড়ে উঠছিল নিজের মতো করে৷ কে জানে কেমন করে লেখাপড়ায় বেশ মাথা খুলেছিল ছেলেটার৷ মাঝখান দিয়ে সময়গুলো বন্ধ মুঠিতে বালির মতো মুঠির ফাঁক গলে সরসরিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল৷ লোকটার মাথার চুলে রুপোলি রেখাগুলি স্পষ্ট এখন তার মাথা ঢেকে ফেলছিল৷ তবু শান্তি ছিল৷ ছেলেটার মুখ দেখলে অকালে চলে যাওয়া বউটার কথা মনে পড়ত খুব৷ একইরকম নাকনকশা, একইরকম হাসি৷ ছেলেটা কোনোদিন মুখ ফুটে কিছু চায়নি৷ বড়ো ভালো ছেলে ছিল সে৷
তারপর একদিন চাইল ছেলে৷ একটা উনিশ বছরের তরতাজা জোয়ান ছেলে তার বাবার হাত ধরে বাঁচতে চাইল৷ কবে কে জানে নিভৃতে তার দেহের কোণে দুরারোগ্য রোগ বাসা বেঁধেছিল, লোকটা বাবা হয়েও খবর রাখার সময় পায়নি৷ ধীরে ধীরে কাজ করা বন্ধ করেছিল ছেলেটার কিডনি৷ ডাক্তার জানালেন ভেলোরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করালে একমাত্র বাঁচার সম্ভাবনা আছে৷ কিডনি বদল করলে বেঁচে যাবে ছেলে৷ এখানে থাকলে বাঁচানো যাবে না৷ যে ছেলের মুখের দিকে কোনোদিন ভালো করে তাকিয়ে দেখেনি লোকটা, এবার তার জন্য প্রথমবার ঈশ্বরের সামনে মাথা নোয়াল৷ টাকা, টাকা, অনেক টাকা চাই তার৷ বউটাকে বাঁচাতে পারেনি, ছেলেকে সে কিছুতেই মরতে দেবে না৷ কে দেবে তাকে টাকা? কেন, পার্টি দেবে? এত বছর ধরে পার্টিকে নিজের রক্ত, ঘাম, জীবন দিয়েছে সে৷ পার্টির জন্য কী-ই না করেছে সে? সংসারের দিকে তাকায়নি, আপনার জনেদের থেকে দূরে থেকেছে, কোনো পদ চায়নি কখনো, নিজের রক্ত ঝরিয়েছে, অন্য লোকেরও৷ নিজেকে নিঃশেষে উজার করে দিয়েছে সে পার্টির জন্য৷ আজ তার প্রয়োজনে পার্টি নিশ্চয়ই তার পাশে দাঁড়াবে৷
ছুটে গিয়েছিল সে৷ দলের শীর্ষনেতাদের ঘরে তার অবাধ যাতায়াত ছিল৷ অমিয় চক্রবর্তীর পায়ে লুটিয়ে পড়েছিল সে কেঁদে৷ বলেছিল, ‘দাদা, আমার ছেলেটাকে বাঁচান৷’ অমিয় চক্রবর্তী মন দিয়ে সব শুনেছিলেন, তারপর দুই হাতে তাকে মেঝে থেকে টেনে তুলে হেসে বলেছিলেন, ‘ওরে পাগল, এভাবে কাঁদছিস কেন? তোর ছেলে আমার ছেলে৷ সে বাঁচবে না, তাও কি হয়? চিন্তা করিস না৷ তোর ছেলের চিকিৎসার সব খরচ পার্টির৷ সব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেল মাথা থেকে৷ সামনের বছর ইলেকশন৷ জান লাগিয়ে দিতে হবে কিন্তু৷ এবার হাওয়া আমাদের অনুকূলে, জিততেই হবে আমাদের৷’
মাথা নীচু করে অমিয় চক্রবর্তীর পা ছুঁয়েছিল সে৷ নেতার সামনে শ্রদ্ধায় নত অনেকবার হয়েছে সে, সেই প্রথম দিন কৃতজ্ঞতায় নত হয়েছিল৷ চোখের জল লুকোতে পারেনি৷ দ্বিগুণ উৎসাহে দলের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল লোকটা৷ ছেলে হসপিটালে, সে নিজে ছুটে বেড়িয়েছে রাজ্যের আনাচেকানাচে৷ দলনেতা তার উপর ভরসা রেখেছেন, ভরসাও দিয়েছেন৷ টান টান মেরুদণ্ডটা কৃতজ্ঞতায় নুয়ে গিয়েছিল তার৷
তারপর এসেছিল সেই দিন৷ ভেলোর যাওয়ার ব্যবস্থা সব পাকা৷ পাওয়া গেছে একই ব্লাড গ্রুপের কিডনি৷ দ্রুত নিয়ে যেতে হবে ছেলেকে, যত দ্রুত সম্ভব ট্রান্সপ্লান্ট করতে হবে৷ খবরটা পেয়ে বিছানায় প্রায় মিশে যাওয়া কঙ্কালসার ছেলেটা তার হাত জড়িয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বলেছিল, ‘বাবা, আমাকে বাঁচাও৷ আমি মরতে চাই না বাবা৷ আরও পড়াশোনা করতে চাই৷ অনেক কাজ করেছ তুমি সারাজীবন ধরে৷ আমি চাকরি পেলে তুমি বিশ্রাম নেবে বাবা৷ তারপর আমরা বাবা-ছেলে মিলে অনেক বেড়াব, অনেক দেশ দেখব৷’
লোকটা সেদিন প্রথমবার ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদেছিল৷ আর সেদিনই শেষবার৷ কারণ ছেলের মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে জল আসেনি লোকটার, শুধু আগুন ঝরেছিল৷ অমিয় চক্রবর্তী তাকে ঠকিয়েছে৷ সব ব্যবস্থা করে টাকা চাইতে পার্টি অফিসে গেছিল সে৷ গিয়ে শুনেছিল, অমিয় চক্রবর্তী দিল্লি গেছেন, এক সপ্তাহ পরে ফিরবেন৷ পাগলের মতো সকলের হাতে-পায়ে ধরেছিল লোকটা৷ বলেছিল, অনেক কষ্টে ফ্লাইটের টিকিট কেটেছে৷ সময় পেরিয়ে যাচ্ছে৷ ফ্লাইট মিস করলে তার ছেলেকে বাঁচানো যাবে না৷ অনেক অনুরোধ উপরোধের পর অমিয়বাবুর অফিস থেকে ফোন লাগিয়েছিল অমিয় চক্রবর্তীকে৷ কিন্তু তিনি ফোন তোলেননি৷ অনেকের হাতে-পায়ে ধরে অনেক অনেক চেষ্টার পরেও যখন ফোন ধরলেন না অমিয় চক্রবর্তী, বটবৃক্ষের মতো দীর্ঘদেহী লোকটা ভেঙেচুরে মেঝেতে বসে পড়েছিল৷ হেরে গেছিল লোকটা৷ সেই মুহূর্তে তার সামনে তার জীবনটা ব্যর্থ বলে মনে হয়েছিল৷ সে একজন ব্যর্থ স্বামী, ব্যর্থ পিতা৷ যে দলের কাজের জন্য পরিবার, পরিজন, সাংসারিক জীবনের যাবতীয় সুখকে উপেক্ষা করেছে সে, নিজেকে যে দলের জন্য, নেতার জন্য সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিয়েছে, আজ তারাই তাকে বিপদে দূরে ঠেলে দিল৷ তার দিকে তাকাল না৷
স্খলিত পদে ফিরে এসেছিল সে পার্টি অফিস ছেড়ে৷ কোথায় যাবে সে, কী করবে, কার কাছে সাহায্য চাইবে! দলে বড়ো, মেজো, সেজো সব নেতাদের কাছে পাগলের মতো সেদিন ছুটে বেড়িয়েছিল এক অসহায় পিতা৷ শেষ অবধি সাহায্য অবশ্য সে পেয়েছিল৷ পেয়েছিল আরও সাহায্যের আশ্বাস৷ কিন্তু ততক্ষণে প্লেন উড়ে গেছে এয়ারপোর্ট ছেড়ে অনেক আগেই৷ শেষ চেষ্টা করেছিল লোকটা৷ নতুন করে প্লেনের টিকিট কেটে ছেলেকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল৷ কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে অনেক৷ রুগণ অসুস্থ ছেলেটা তার আর সেই যন্ত্রণা সহ্য করতে পারেনি৷ তীব্র হতাশাতেই হয়তো হঠাৎ করেই থেমে গেছিল ছেলেটার হৃৎস্পন্দন৷ আর অপেক্ষা করেনি সে, অভিমানী ছেলেটা বাবাকে আর সময় দেয়নি, পাড়ি দিয়েছিল সেই দুনিয়ার উদ্দেশে যেখানে রোগভোগ নেই, অসহায় পিতার কান্না নেই, শরীরের কষ্ট-যন্ত্রণা নেই, জরা নেই, মৃত্যু নেই৷
লোকটা সেদিনই ঠিক করে নিয়েছিল, প্রতিশোধ সে নেবেই৷ অমিয় চক্রবর্তী ফিরে এসে তার মাথায় হাত রেখেছিলেন, বুকে জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চেয়েছিলেন৷ জানিয়েছিলেন, সেই সময়ে তিনি পার্টির জরুরি মিটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন৷ লোকটা কিছু উত্তর দেয়নি, শুধু মাথা নেড়েছিল৷ তারপর আগের মতোই চুপচাপ পার্টির কাজে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিল৷ শুধু অপেক্ষা করে ছিল ঠিক সুযোগের৷ সে তখনও জানত না, আরেকজন মানুষও তারই মতো একই প্রতিশোধস্পৃহা পুষে রেখেছে বুকের ভিতর৷ সেই মানুষটি, যে তাকে বিপদের সময় টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিল৷ সে টাকা তার কোনো কাজে লাগেনি সত্য, কিন্তু তবু সেই সাহায্যের মূল্য সেই মুহূর্তে তার কাছে কম ছিল না৷ তাই যখন সেদিন সেই মানুষটি তার হাতে বিষ মাখানো ফ্লাস্কটা তুলে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল, কীভাবে ক্যান্টিনে সেটা অমিয় চক্রবর্তীর ফ্লাস্কের সঙ্গে বদলে দিতে হবে, নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করতে অসুবিধে হয়নি লোকটার৷ পার্টি অফিসের ভিতর তার অবাধ গতি৷ কেউ তাকে কখনো আটকায় না, আটকাবে না তা তো জানাই ছিল৷
আজ তার কাজ শেষ হয়েছে৷ ক্যান্টিনের ছেলেটা তাকে দেখেছে৷ আজ না হোক কাল ওর মনে পড়েই যাবে ফ্লাস্কটা কে দিয়েছিল৷ ধরা পড়তে ভয় সে পায় না, ফাঁসিকাঠেও ভয় নেই আর৷ ক’দিনই বা আর বাঁচত সে? মদ তাকে ভিতর থেকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে৷ পেটের ভিতর বাসা বেঁধেছে কর্কট৷ এই অবস্থায় জীবনের প্রতিটা দিন শাস্তি বলে মনে হয়৷ কাজ শেষ হয়ে গেছে তার, ঋণশোধও হয়ে গেছে৷ এ পৃথিবীর সমস্ত দেনা-পাওনা কড়ায়-গণ্ডায় মিটিয়ে দিয়েছে লোকটা৷ অন্ধকার গলির এক কোণে রাস্তার উপর বসে পড়ল সে৷ বুকপকেটে রাখা কাগজটা একবার হাত দিয়ে দেখে নিল৷ ঢলঢলে শার্টের নীচ থেকে প্যান্টে গোঁজা অস্ত্রটা বার করে হাতে নিল৷ দেশি কাট্টা, তার বহু পুরোনো সাথি৷ এ দিয়ে কম রক্তক্ষয় করেনি সে৷ পাপ পাপ, হয়তো সেইসব পাপের ফলেই আজ তার এই অবস্থা৷ বুক চিরে একটা অতি দীর্ঘ নিশ্বাস বেরিয়ে এল তার৷ অস্ত্রটার গায়ে হাত বোলাল৷ লোকটার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল হাসির রেখা৷ একবার অগণিত তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকাল, তারপর নলটা মুখের ভিতর ঢুকিয়ে ট্রিগার টেনে দিল সে নির্দ্বিধায়৷

খবরের কাগজের ভিতরের পাতায় খবরটা খুব বেশি গুরুত্ব না পেলেও কলকাতা পুলিশ কেসটাকে যথেষ্টই গুরুত্ব দিয়েছে৷ ডিসিডিডি সৌরভ সান্যালের কেবিনে টিম মিটিংয়ে সান্যাল সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন, ‘ধনঞ্জয় মণ্ডলের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে ডিটেইলড ইনফর্মেশন আমার আজ বিকেলের মধ্যে চাই৷ লোকাল থানাকে কিছু জানানোর দরকার নেই৷ ওদের বলে দেবে যেন রিপোর্টারদের কোনো বাইট না দেয়৷ মিডিয়া একজন পার্টি কর্মীর মৃত্যুকে এখনও তেমন গুরুত্ব না দিলেও সুইসাইড নোটের ব্যাপারটা প্রকাশ্যে এলে ঝাঁপিয়ে পড়বে পুলিশের উপর৷’
অফিসার অর্জুন রায় বলল, ‘স্যার, সুইসাইড নোটটা তো প্ল্যান্টেডও হতে পারে৷ অমিয় চক্রবর্তীর খুনি হয়তো একজনকে হত্যাকারী সাজিয়ে নজরটা তার দিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছে৷’
‘পোস্ট মর্টেম রিপোর্টটা পেলে মার্ডার না সুইসাইড সেই বিষয়ে শিয়োর হওয়া যাবে৷ আর এই ধনঞ্জয় মণ্ডলের সম্বন্ধে এ টু জেড ইনফর্মেশন চাই আমার৷ উইপনটা তো দেশি কাট্টা ছিল, তাই না?’
‘হ্যাঁ স্যার,’ অর্জুন বলল, ‘ওটার ব্যাপারে খোঁজ নিতে বলেছি৷ তবে ইউপি বিহার থেকে চোরাই পথে বেঙ্গলে ঢোকে এগুলো৷ যদিও এখন অনেকটাই কন্ট্রোলে, কাস্টমসে কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু পুরোটা তো অবশ্যই আটকানো যায়নি৷’
‘বডি তুলতে তো অর্জুন আর রজত গিয়েছিলে৷ দেখে কী মনে হল?’ জিজ্ঞাসা করলেন সৌরভ সান্যাল৷
এবার রজত বসু নামের মধ্যবয়সি অফিসার বললেন, ‘দেখে তো সুইসাইডই মনে হল স্যার৷ মুখের ভিতরে নল পুরে ট্রিগার টানা হয়েছে৷ গুলি মাথার পেছন দিকের খুলি ভেদ করে বেরিয়ে পেছনের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে গভীর দাগ পড়েছে, দেয়ালের চলটা খসে পড়েছে৷ বডি দেয়ালে হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় ছিল৷ বডি বা আশেপাশে কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই৷ ছবিগুলো দেখেছেন তো আপনি৷’
‘হুম, পোস্ট মর্টেম রিপোর্টটা আসুক৷ আর হ্যাঁ, আর বেশি দেরি করা যাবে না৷ চাপ বাড়ছে৷ তাই ভেবে দেখলাম, উই হ্যাভ টু বাই সাম মোর টাইম৷’ বলে সৌরভ সান্যাল দুজন অফিসারের মুখের দিকে তাকালেন৷ কেউ মুখে কোনো প্রশ্ন করল না৷ এইসব ক্ষেত্রে চুপ থেকে ওপরওয়ালাকে বলতে দেওয়াই দস্তুর৷ কিন্তু দৃষ্টিতে সকলেরই প্রশ্ন৷
সৌরভ সান্যাল গলা খাঁকরে বললেন, ‘পোস্ট মর্টেম রিপোর্টটা এলে যদি সুইসাইড কনফার্মড হয়, সেক্ষেত্রে একটা প্রেস কনফারেন্স ডেকে মিডিয়াকে জানাতে হবে৷ সুইসাইড নোটে ধনঞ্জয় মণ্ডল নিজের অপরাধ কবুল করেছে৷ আর সেদিন সে পার্টি অফিসে দীর্ঘ সময় ছিল, সেটাও সার্টিফাই করার মতো লোকের অভাব নেই৷ সুতরাং...,’ সৌরভ সান্যাল একটু থেমে বললেন, ‘ধনঞ্জয় মণ্ডল মাস্ট হ্যাভ হিস ওন রিজনস টু কিল অমিয় চক্রবর্তী৷ সেটা একটু হাতড়ে দেখো৷ কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা হয়েছে৷ অফ কোর্স, একটা সুইসাইড নোটের উপর অন্ধভাবে রিলাই করে আমরা কেস ক্লোজ করতে পারি না৷ কিন্তু এই মুহূর্তে উই ক্যান বাই টাইম পোর্ট্রেইং ধনঞ্জয় মণ্ডল অ্যাজ এ প্রোবাবল কিলার অফ চিফ মিনিস্টার৷ কিন্তু ধনঞ্জয় মণ্ডল সুইসাইড নোটে কারণ লেখেনি৷ সেক্ষেত্রে খুব তাড়াতাড়ি পসিবল রিজনস খুঁজে বার করার দায়িত্ব তোমাদের৷ ওকে, নাউ গেট ব্যাক টু ইয়োর ওয়ার্ক অ্যান্ড রিপোর্ট মি অ্যাজ সুন অ্যাজ ইউ গেট এনি ব্রেক থ্রু!’
সৌরভ সান্যালের কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে অর্জুন রিস্টওয়াচের দিকে তাকাল৷ দুপুর দেড়টা বাজে৷ কাল থেকে তার মনটা বিশেষ ভালো নেই৷ অর্জুন জানে নিজের কাজের প্রতি টাপুরের সমর্পণ ঠিক কতটা৷ কিন্তু মাঝে মাঝে ও খুব বেশি রিস্ক নিয়ে ফেলে৷ টাপুরের বুদ্ধিমত্তা বা যোগ্যতা নিয়ে অর্জুনের কোনো সন্দেহ কোনোদিনই ছিল না৷ কিন্তু অর্জুন ভয় পায়৷ অর্জুন বা টাপুরের পেশাটা সহজ নয়৷ প্রতি মুহূর্তে বিপদের সম্ভাবনা থাকে৷ পুলিশের তবু কিছু সরকারি সূত্রে পাওয়া সুরক্ষার সুবিধে থাকে, কিন্তু টাপুরের? অর্জুন নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে পারছে তন্ময়ের কেসটা আর নিছক নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত সাধারণ সমস্যায় থেমে নেই৷ এর শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত, এবং সেই গভীরতা অত্যন্ত বিপজ্জনক৷ যে বা যারা এর পেছনে আছে, তারা ভয়ংকর৷ দুটি মেয়েকে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে তাদের হাত কাঁপবে না মোটেও৷ কিন্তু টাপুর যেন এই সহজ কথাটা বুঝেও বুঝছে না৷ সব ব্যাপারে ওর এত একগুঁয়েমি, কিছুতেই বোঝানো যায় না৷
ভাবতে ভাবতে অর্জুনের ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে ওঠে৷ মনে পড়ে, টাপুরের এই স্বভাবের জন্যই তো তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল সে৷ সেদিনের সেই অনুভূতিটা যেমন সত্যি ছিল, আজকের এই ভয়টাও ততটাই সত্যি৷ হৃদয় যাকে আপন বলে মানে, তার বিপদের সামান্য সম্ভাবনাতেও মন আকুল হয়৷ কিন্তু সেই আশঙ্কায় যদি টাপুরকে তার কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে অর্জুন, তাহলে সেই টাপুরকে অর্জুন কোথায় খুঁজে পাবে যাকে তার মতো করেই ভালোবেসেছিল সে?
লালবাজারের প্রশস্ত বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে টাপুরের নম্বরে ফোন লাগাল অর্জুন৷ ফোন রিং হয়ে যাচ্ছে, কেউ ধরছে না৷ অভিমান হয়েছে ম্যাডামের৷ দ্বিতীয়বার কল করতে ফোনটা তুলল টাপুর৷ ধরেই বলল, ‘খুন না সুইসাইড? কিছু বোঝা গেল?’
হঠাৎ প্রশ্নে সামান্য হতচকিত হয়ে পড়লেও পরমুহূর্তেই হেসে ফেলল সে৷ এই হল টাপুর৷ তার কাজের সামনে তুচ্ছ মান-অভিমান প্রশ্রয় পায় না৷ বলল, ‘সম্ভবত সুইসাইড৷ সুইসাইড নোটও পাওয়া গেছে একটা৷ সেখানে সে অমিয় চক্রবর্তীকে খুনের কথা স্বীকার করেছে৷ পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট এলে বাকিটা বোঝা যাবে৷’
‘অমিয় চক্রবর্তীকে খুন করেছে লোকটা? কিন্তু কেন?’ টাপুরের কণ্ঠস্বরে অবিশ্বাস ও সন্দেহ৷ বোঝা যাচ্ছে এই খুনের থিয়োরিতে সে মোটেই খুশি নয়৷ অমিয় চক্রবর্তীর খুনের মতো হাই প্রোফাইল কেসের এত সহজ সমাধান তার পছন্দ হচ্ছে না৷ কোনো রহস্য নেই, প্যাঁচ নেই, মাথা খাটানোর স্কোপ নেই৷ খুনি নিজে নিজে সাজিয়ে সুইসাইড নোট লিখে সুইসাইড করে বসল৷
অর্জুনের বেশ মজা লাগল টাপুরের হতাশ অভিব্যক্তিতে৷ মনে মনে ভাবল, পুলিশের কাজটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রসকষহীন, রহস্যহীন রুটিন জব হয়ে থাকে৷ বেশিরভাগ ক্রাইমই ঝোঁকের বশে করা ওপেনবুক কেস হয়, মাথা খাটানোর সুযোগ থাকে না৷ মুখে সে মনের ভাবটা প্রকাশ করল না৷ বলল, ‘কেন করল সেটা জানি না৷ জানতে পারলে জানাচ্ছি৷’ তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘আর তন্ময়ের কেস কতদূর?’
‘আমি কী করে জানব?’ গম্ভীর গলায় বলল টাপুর, ‘তুমিই তো বললে ওই কেস থেকে দূরে থাকতে৷’
অর্জুন হেসে বলল, ‘আমি বললাম, আর তুমি মেনে নিলে৷ এত বাধ্য মেয়ে তো তুমি!’
‘জানোই যখন বাধ্য নই, তাহলে বলো কেন?’
টাপুরের অভিমানী মুখটা কল্পনা করে মনটা নরম হয়ে আসে অর্জুনের৷

কোনার্কের সূর্য মন্দিরে যে সান্ধ্য সূর্যদেবের মূর্তিটা আছে, সেটা আমার ভারি ভালো লাগে৷ পরিণত, স্থিতধী, শান্ত৷ যুগান্তের উদয়াস্তের অভিজ্ঞতা যেন সঞ্চিত রয়েছে তাঁর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মৃদু মধুর হাসিতে৷ টাপুরদির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে অস্তগত সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকা দেখে আমার সূর্যদেবের সেই সৌম্য, শান্ত মূর্তির কথা মনে পড়ে গেল৷ আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই মহানগরীরে ইট কাঠ কংক্রিটের প্রাচীরের পিছনে ঢাকা পড়ে যাবে সান্ধ্যতপনের বিজয়যাত্রার রথ৷ টাপুরদি পাশে এসে দাঁড়াল টের পেলাম৷ সূর্যের দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কথা হল অর্জুনদার সঙ্গে?’
‘সে তো সেই দুপুরেই হয়েছে৷ বললাম তো তোকে৷’ পড়ন্ত বিকেলের বিষণ্ণ আকাশে চোখ রেখে বলল টাপুরদিও৷
‘আর কিছু জানায়নি? ওই ধনঞ্জয় মণ্ডলের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে কোনো ইনফর্মেশন?’
‘না৷ লালবাজারের পুলিশ অফিসারের দায় পড়েছে শখের গোয়েন্দাকে ক্ষণে ক্ষণে ফোন করে আপডেট দিতে?’
বুঝলাম টাপুরদির অভিমান কমেনি৷ হেসে বললাম, ‘এখনও রেগে আছ?’
‘না রে,’ একটা মৃদু নিশ্বাস চেপে বলল টাপুরদি, ‘রাগ নয়৷ অর্জুনের কাজটা ওর চাকরি, ওকে ওর প্রতিটা স্টেপের জন্য জবাবদিহি করতে হয়৷ আমি স্বাধীনভাবে কাজ করি৷ অর্জুন আমায় সরকারি তদন্তের ইনফর্মেশন জানাবে, এটা ওর উচিত নয়৷ আমাদেরও আশা করা ঠিক নয়৷ আমি যখন কেস হাতে নিয়েছি, ওর ভরসায় তো নিইনি৷ যদি নিজেদের সামর্থ্যে না কুলোয়, তো কেস ছেড়ে দেব৷ কিন্তু প্রতি পদে পুলিশের উপর নির্ভর করে থাকাটা ভালো লাগছে না রে৷’
বুঝলাম, টাপুরদির অভিমানটা সত্যিই কমেনি এখনও৷ মুখে বললাম, ‘টাপুরদি, তুমি নিজের কৃতিত্বেই অনেক কেস সলভ করেছ৷ সেজন্য কারও সাহায্যের প্রয়োজন হয়নি তোমার৷ কিন্তু এই কেসটা অন্যরকম৷ এখানে আমরা সব জায়গায় ঢুকতে পারব না৷ তাই অর্জুনদার সাহায্য আমাদের দরকার হবে৷ তুমি এইসব ভেবো না এখন৷ তন্ময়কে খুঁজে বার করার জন্য যা করতে হয়, করতে হবে৷’
সূর্যটা কখন উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ের পেছনে মুখ লুকিয়েছে৷ সেদিকে তাকিয়ে টাপুরদি বলল, ‘তুই অনেক বড়ো হয়ে গেছিস মিতুল৷’
টাপুরদি কিচেনে গিয়ে দুই কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসে বসল৷ আর ঠিক সেই সময়ে অর্জুনদার ফোনটা এল৷ ধনঞ্জয় মণ্ডল সম্পর্কে জানা গেছে৷ লোকটা পার্টির পুরোনো কর্মী, খুবই বিশ্বস্ত৷ পার্টির প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পিতপ্রাণ ছিল৷ একদম গ্রাসরুট লেভেল থেকে রাজনীতি শুরু করে অনেক উন্নতি করেছিল৷ নিজে কখনো নেতৃত্বে না এলেও দলের বড়ো নেতা মন্ত্রীদের কাছের লোক হয়ে উঠেছিল৷ এমনকী অমিয় চক্রবর্তীর অফিসেও ছিল তার অবাধ যাতায়াত৷
তবে গত বছর তার একমাত্র ছেলে মারা যায় কিডনি বিকল হয়ে৷ অমিয় চক্রবর্তী আর্থিকভাবে সাহায্য করবেন কথা দিলেও শেষ মুহূর্তে কলকাতায় উপস্থিত না থাকার কারণে কোনো সহায়তা করতে পারেননি৷ চিকিৎসার সুযোগই পাওয়া যায়নি৷ কিডনি ফেলিয়োর হয়, দুর্বল শরীর ধকল নিতে পারেনি৷ হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা যায় ছেলেটি৷ সেই থেকে নাকি খুব চুপচাপ হয়ে গেছিল ধনঞ্জয়৷ পার্টির কাজ করত ঠিকই, কিন্তু তার সহকর্মীদের মতে তার কাজে মন ছিল না৷ কথা কম বলত, অফিসেও কম আসত৷ খুব বেশি মদ খেত লোকটা৷ পুরোনো কর্মী বলে আর তার ব্যক্তিগত ক্ষতির কথা ভেবে তাকে কেউ কিছু বলত না৷ তবে ধনঞ্জয় মণ্ডল যে মনের মধ্যে রাগ পুষে রেখেছিল, তা কেউই আঁচ করতে পারেনি৷ অমিয় চক্রবর্তীকে খুন করে নিজে সুইসাইড করেছে ধনঞ্জয় মণ্ডল৷ পোস্ট মর্টেমে আত্মহত্যা কনফার্মড হয়েছে৷
‘তাহলে তো টাপুরদি, আমাদের ক্যালকুলেশন ভুল ছিল৷ অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুটা একটা সম্পূর্ণ আলাদা অ্যাঙ্গল৷ তন্ময়ের অন্তর্ধানের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই৷’
টাপুরদি কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ উঠে গিয়ে টিভি চালাল৷
নিউজ চ্যানেলে প্রতিবেদক কণ্ঠস্বরের মাপা উত্থানপতনে স্টুডিয়োর সাজানো মঞ্চে বসে চাপা উত্তেজিত ভঙ্গিতে ধনঞ্জয় মণ্ডলের মৃত্যুর সংবাদ পরিবেশন করছে৷ কিছুক্ষণ এভাবেই কাটল৷ এবার দৃশ্যান্তর৷ লালবাজারের বড়ো হলে কলকাতার পুলিশ কমিশনার ও তাঁর পাশে ডিসিডিডি সৌরভ সান্যালকে দেখা গেল৷ সাংবাদিকদের সৌজন্য সম্ভাষণ করে কমিশনার সাহেব বললেন, ‘অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, অমিয় চক্রবর্তী হত্যা রহস্যের সমাধান হয়েছে৷ পার্টির জনৈক সদস্য ধনঞ্জয় মণ্ডল আসল ফ্লাস্কের বদলে বিষ মাখানো ফ্লাস্ক ক্যান্টিনে পৌঁছে দিয়ে এসেছিল৷ ধনঞ্জয় মণ্ডল নিজের অপরাধ স্বীকার করে আত্মহত্যা করেছে৷ প্রসঙ্গত, এক বছর আগে তার ছেলে চিকিৎসার অভাবে মারা যায়৷ অমিয়বাবু সাহায্য করবেন কথা দিয়েও নির্দিষ্ট সময়ে অনুপস্থিতির কারণে সেটা করতে পারেননি৷ দুর্ভাগ্যক্রমে ছেলেটির মৃত্যু হয়৷ এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই ধনঞ্জয় মণ্ডল অমিয় চক্রবর্তীকে হত্যা করে৷’
এক তরুণী সাংবাদিক উঠে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল, ‘প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এতদিন অপেক্ষা করল কেন ধনঞ্জয় মণ্ডল? এত কষ্টই বা করতে গেল কেন? পার্টি অফিসে, মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে যখন তার অবাধ যাতায়াত ছিল, সেক্ষেত্রে সে তো অনেক আগেই মারতে পারত অমিয় চক্রবর্তীকে?’
কমিশনার সাহেবকে একটু যেন দিশেহারা দেখাল৷ কিন্তু সেটা মুহূর্তের ভগ্নাংশ মাত্র৷ তার পরেই তিনি স্বভাবসুলভ কৌতুকপূর্ণ হাসি হেসে জবাব দিলেন, ‘সেটা তো ধনঞ্জয় মণ্ডলই বলতে পারত৷ কিন্তু সমস্যা হল, মৃত ব্যক্তিকে জেরা করার নিয়ম নেই৷’
উপস্থিত সকলে হেসে উঠল৷ কমিশনার সাহেব বললেন, ‘সম্ভবত পুত্রশোকের অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে সময় লেগেছিল৷ তারপর তার মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহা জেগে ওঠে৷ ধনঞ্জয় মণ্ডল নিজেও অসুস্থ ছিল, লিভার ক্যানসারে ভুগছিল৷ একদম লাস্ট স্টেজ চলছিল৷’
সাংবাদিক সম্মেলন শেষ হল৷ টাপুরদি টিভিটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল৷ বলল, ‘রাতে আজ একটু হালকার মধ্য দিয়ে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা সারছি রে মিতুল৷ তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে ঘণ্টা দুয়েক শুয়ে নিতে পারিস৷ রাতে বেরোব৷’
‘রাতে? কোথায় যাবে?’
‘রেখাদেবীর ফ্ল্যাটে৷’ হাসল টাপুরদি৷
‘যাঃ, ওখানে কেমন করে যাবে? মার্ডার স্পটে পুলিশ গার্ড থাকবে৷ ভিতরে ঢুকতেই দেবে না৷’
টাপুরদি হাসল৷ বলল, ‘পুলিশ জানলে অবশ্যই ঢুকতে দেবে না৷ কিন্তু টের না পেলে?’
‘মানে?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
‘মানে পরে বোঝাব৷ আপাতত রাতের খাওয়ার ব্যবস্থা করি৷ রাত একটা নাগাদ বেরোব৷’ বলে আমার চুল ঘেঁটে দিয়ে হাসিমুখে রান্নাঘরের দিকে এগোল টাপুরদি৷

এর আগে দিনের বেলা রেখাদেবীর বাড়িতে এসেছিলাম আমরা৷ রাতের অন্ধকারে জায়গাটা চিনতে আমার একটু অসুবিধে হলেও টাপুরদি সহজেই গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে গেল৷ দেখলাম, রেখাদেবীর বাড়ির গলিতে না ঢুকে পাশের গলিতে গাড়ি ঢোকাল টাপুরদি৷ রাস্তার পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমায় বলল, ‘নেমে আয়৷’
‘এখানে?’
‘এখানে নয়তো কী? রেখাদেবীর বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নেমে পুলিশকে বলবি, আমি একজন শখের গোয়েন্দা৷ গেট খুলে দিন তো দাদা, ভিতরটা একটু ঘুরে দেখি? সে তোকে স্যালুট করে গেট খুলে দেবে আর তুই ভিতরে গিয়ে তদন্ত করবি? তাই ভেবেছিলি বুঝি?’ মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল টাপুরদি৷
কিছু উত্তর দিলাম না৷ টাপুরদির মাথার ভিতরে কী চলছে বোঝা সম্ভব নয়৷ তাই এই মুহূর্তে চুপ করে থাকাই শ্রেয়৷ অন্ধকারে গলির পথে নিঃশব্দে পা ফেলে এগোচ্ছে টাপুরদি৷ অগত্যা আমিও পিছু নিলাম৷ বেশ কয়েকটা বাড়ি ছাড়িয়ে একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল টাপুরদি৷ একবার এগিয়ে একবার পিছিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে বাড়িটার আশপাশটা দেখে নিল৷ চারধারে দেয়াল দেওয়া একতলা বাড়ি৷ দেয়ালের পাশে কচুপাতার জঙ্গল৷ আমায় হাত দিয়ে ইশারা করে পিছে পিছে এগোতে বলল টাপুরদি৷ তারপর দুটি বাড়ির মাঝের সংকীর্ণ কচুপাতার জঙ্গলাকীর্ণ গলিপথ দিয়ে সন্তর্পণে এগোল৷ প্রতি বাড়ির ক্ষেত্রে অন্তত তিন ফিট করে সীমানা ছাড়ার পুরসভার নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দুই বাড়ির দেওয়ালের মধ্যবর্তী স্থান এতটাই সরু যে একজন ছিপছিপে চেহারার মানুষও সহজে হেঁটে যেতে পারে না৷ তার উপরে বিচ্ছিরি জঙ্গল, তেমনি ঘুটঘুটে অন্ধকার৷ দুই বাড়িই বোধ হয় এই জায়গাটাকে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করে৷ পলিথিনের প্যাকেটে মোড়া পচা সবজির খোসা থেকে শুরু করে হরেকরকম আবর্জনার অপূর্ব কালেকশন দেখলে ধাপার মাঠের ক্ষুদ্র সংস্করণ বলে ভুল হওয়া বিচিত্র নয়৷ চড়ুইপাখির সাইজের মশককুল বীরবিক্রমে আমাদের জিনস ট্রাউজার ভেদ করে হুল ফোটাচ্ছে৷ ভাগ্যিস পায়ে স্নিকার পরে এসেছিলাম৷ নইলে এতক্ষণে পায়ে কী কী যে বিঁধত কে জানে?
বেড়ালের মতো টিপে টিপে পা ফেলে নিঃশব্দে এগোলাম৷ বাড়ির পেছনে কিছুটা প্রশস্ত জায়গা৷ এতক্ষণে প্রাণ ভরে একটু খোলা হাওয়ায় নিশ্বাস নিলাম৷ বাড়িটির পেছনের প্রাচীরের পেছনে ফুটচারেক ফাঁকা জায়গা ছেড়েই অন্য একটি বাড়ির দেওয়াল উঠেছে৷ দেওয়ালের পেছনে একটা রাধাচূড়া গাছ৷ টাপুরদি এগিয়ে গিয়ে গাছের নীচে দাঁড়িয়ে গাছটার গায়ে হাত রেখে উপরে কী দেখল৷ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তুমি কি বাই এনি চান্স মাঝরাতে গাছে চড়ার কথা ভাবছ?’
টাপুরদি ফিক হলে হেসে মাথা নাড়ল৷ বলল, ‘শুধু আমি না তুইও চড়বি৷’
আমি সবেগে মাথা নেড়ে বললাম, ‘প্রশ্নই ওঠে না৷ হোয়াই অন আর্থ গাড়ি করে গড়িয়াতে এসে ঘুটঘুটে অন্ধকারে গাছে উঠতে যাব আমি? আর তার চেয়েও বড়ো কথা, আমি গাছে চড়তে পারি না৷’
গাছটা একবার প্রদক্ষিণ করে এসে একটা শক্তপোক্ত ডাল বেছে নিয়ে টেনেটুনে দেখছে টাপুরদি৷ তারপর বলল, ‘সামনে চোখ মেলে দ্যাখ রে হাঁদা, সামনের দেওয়ালটা রেখাদেবীর বাড়ির পেছনের দেওয়াল৷ এই গাছ বেয়েই বাড়ির ভিতরে ঢুকতে হবে আমাদের৷’
এবার ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম৷ এই অন্ধকারে কচুবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের হাত-পা ঠাহর করতে পাচ্ছি না ঠিকঠাক, রেখাদেবীর বাড়ির পেছন চেনার প্রশ্নই ওঠে না৷ হঠাৎ সন্দেহ হতে চোখ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তুমি কীভাবে বুঝলে এটা রেখাদেবীর বাড়ির পেছন দিক? এখানে আসার এই বিচ্ছিরি রাস্তাটাই বা আবিষ্কার করলে কীভাবে? তার মানে তুমি আগে এখানে এসেছ টাপুরদি?’
টাপুরদি হেসে বলল, ‘এসেছি রে৷ তুই যেদিন অফিস গেছিলি, দুপুরে এসে সব দেখে গেছি৷’
‘হুম, ঠিক বুঝেছি৷ নইলে এহেন অন্ধকারে প্যাঁচার মতো নির্দ্বিধায় যেখানে-সেখানে গলে ঢুকে যাচ্ছ, এখন নাকি গাছে চড়বে৷’ ব্যাজার মুখে বললাম, ‘তুমি যাবে যাও৷ আমায় গাছে চড়তে বোলো না৷ আর গাছ বেয়ে দেওয়ালে উঠে বাড়ির ভিতরে লাফ দেবে নাকি? তারপর ঠ্যাং ভেঙে পড়ে থাকতে হবে একমাস৷ বেজে যাবে তোমার গোয়েন্দাগিরির বারোটা৷’
‘ভাঙলেই হল? চোখ মেলে দেখ মিতুল, দেওয়ালের ওপাশে একটা পেয়ারা গাছ আছে৷ দেওয়াল পেরিয়ে পেয়ারা গাছ বেয়ে নীচে নেমে গেলেই হল৷’ বলে হাসল টাপুরদি৷
‘রাধাচূড়া বেয়ে উঠবে আর পেয়ারা গাছ বেয়ে নামবে? কী আশ্চর্য!’ বিস্ময়ে এর বেশি কথা গলা দিয়ে বেরোল না আমার৷
টাপুরদি পেছনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘উঠে পড়৷ আমি ধরছি৷’
আমি কাঁদো কাঁদো মুখে বললাম, ‘প্লিজ টাপুরদি, আমি পারব না৷’
‘কেন পারবি না? ঠিক পারবি৷ আর গাছটা ভালো, ডালগুলোর অ্যালাইনমেন্ট চমৎকার৷ পা দিয়ে দিয়ে টুকটুক করে উঠে যা৷ সফটওয়্যার কোডিং করা থেকে গাছে ওঠা ঢের সহজ৷ সেটা যখন সহজেই পারিস, এটাও পারবি৷ নে, ওঠ ওঠ৷’ বলে টাপুরদি ঠেলা মারল৷ আমি ভয়ে ভয়ে নীচের দিকের একটা ডালে পা রাখলাম৷ শরীরে ঝাকুনি দিয়ে সামান্য উপরের ডালটা হাত দিয়ে ধরে ফেললাম৷ উলটে পড়তে পড়তে সামলে নিলাম নিজেকে৷ তারপর ভয়ে ভয়ে উপরের আরেকটা ডালে পা রাখতেই সেটা মড়মড় শব্দ করে তীব্র আপত্তি জানাল৷ ভয়ে তাড়াতাড়ি পা সরিয়ে নিলাম৷ টাপুরদি নীচ থেকে বলল, ‘বাঁ-দিকের মোটা ডালটাতে ওঠ মিতুল৷
পরবর্তী প্রায় মিনিট বিশেকের যুদ্ধের পর দেওয়ালের সম উচচতায় উঠতে পারলাম৷ নীচ থেকে টাপুরদি তরতর করে এ ডালে ও ডালে পা রেখে পাঁচ মিনিটেরও কম সময়ে আমার কাছের আরেকটা ডালে উঠে এল৷ অন্ধকারে টাপুরদিকে দেখে কপিগোত্রীয় বলে ভ্রম হওয়া অস্বাভাবিক নয় একটুও৷ এক পা গাছে এক পা দেওয়ালে রেখে পেয়ারা গাছের একটা ডাল ধরে ফেলল টাপুরদি৷ আমায় বলল, ‘এই ডালটা ধর মিতুল৷ শক্ত আছে৷’
মোটামুটি আরও পনেরো মিনিট পর আমরা ভূমিতে অবতরণ করলাম৷ রিস্টওয়াচে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না৷ পকেট থেকে মোবাইল বার করে দেখলাম দুটো পঁচিশ বাজে৷ টাপুরদিকে শুধু কাঁদো কাঁদো গলায় একবার জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ফেরার সময়ও কি এভাবেই ফিরতে হবে?’
‘হুম,’ গম্ভীর গলায় ফিসফিস করে বলল টাপুরদি, ‘এবার চুপ একদম৷ আর কোনো কথা নয়৷ পায়ের শব্দ যেন না হয়৷ সাবধান!’
বেড়ালের মতো পা টিপে টিপে অন্ধকারে এগোলাম৷ বুকের ভিতরে হৃৎপিণ্ডটা লাফাচ্ছে রীতিমতো৷ পুলিশের সিল করা মার্ডার স্পটে বেআইনিভাবে ঢুকছি৷ ধরা পড়লে হাজতবাস নিশ্চিত৷ অর্জুনদাও বাঁচাতে পারবে না৷ হে ভগবান! কপালে দুইবার আঙুল ছোঁয়ালাম৷ মনে হল টাপুরদির পাল্লায় পড়ে জেলে গেলে চাকরিটাও যাবে৷ অসহায় দৃষ্টিতে টাপুরদির দিকে তাকালাম৷ ধুর! যা থাকে কপালে ভাবতে ভাবতে এগিয়ে গেলাম৷
বাড়ির পেছনে বারান্দার গ্রিলে তালা লাগানো৷ টাপুরদি ব্যাগ থেকে পরিচিত চাবির গোছা বার করল৷ সস্তার জং ধরা পুরোনো তালা, বিশেষ জ্বালাল না৷ কয়েকবারের চেষ্টাতেই খুট শব্দ করে খুলে গেল৷ টাপুরদি হাতের আলতো চাপে গ্রিলের দরজাটাতে ঠেলা মারল৷ ক্যাঁচ করে মৃদু একটা শব্দ হল৷ বারান্দায় উঠে দাঁড়াল টাপুরদি৷ ভিতরে জমাটবাঁধা ঘন অন্ধকার৷ সামনের কাঠের দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ৷ আমি টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম৷ এবার? টাপুরদি এগিয়ে গিয়ে দরজাটা টেনে দেখল৷ দুই পাল্লার মাঝে সামান্য একচিলতে ফাঁক হল, আঙুল ঢোকার মতো নয়৷ হালকা হাতে নাড়াতে ভিতরে ঝনঝনানি শব্দ শোনা গেল৷ পুরোনো বাড়ি, ছিটকিনির ব্যবস্থা নেই৷ শেকল তুলে দরজা বন্ধ করা আছে৷
বারান্দায় একটা কাঠের টুল রাখা ছিল৷ সেটাকে তুলে আনল টাপুরদি৷ তারপর টুলে চড়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘মিতুল, তোর অস্ত্রশস্ত্র বের কর৷’
আমার ব্যাগে টুকটাক ছোটোখাটো যন্ত্রপাতি থাকে৷ একটা পকেট নাইফ এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘এটা চলবে?’
‘দে দেখি,’ বলে হাত বাড়িয়ে নাইফটা নিয়ে দুই দরজার উপরের দিকের ফাঁক দিয়ে ছুরিটা গলিয়ে দিল টাপুরদি৷ বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর ভিতরে ঝনাৎ করে একটা শব্দ শোনা গেল৷ চিচিং ফাঁক৷

সেদিন আমরা সামনে দিয়ে ঢুকে বসার ঘরে বসেছিলাম৷ এই ঘরটা পেছন দিকে একটা শোওয়ার ঘর৷ আসবাব খুব বেশি নেই৷ মোবাইল ফোনের আলোতে যেটুকু দেখা যায়, তাতে মনে হল এটা সম্ভবত রেখাদেবীর নিজের শোওয়ার ঘর ছিল৷ দেয়ালে তাঁর স্বামীর একটি বাঁধানো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি টাঙানো৷ একটা ডাবল বেডের খাট ছাড়া একটা আলনা, আলমারি আর ড্রেসিং টেবিল রয়েছে ঘরে৷ আলনায় কয়েকটা সাদা শাড়ি পাট করে ভাঁজ করা রয়েছে৷ এই ঘরে ক’দিন আগেই একজন মানুষ থাকতেন৷ আজও তাঁর ব্যবহৃত জিনিসগুলো একইভাবে রয়েছে৷ শুধু তিনি নেই, কোথাও নেই৷ অথচ এই মুহূর্তে এই ঘরের ভিতর দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, এই ঘরের প্রতিটি দেয়ালে, আলনায় সাজানো কাপড়ে, ড্রেসিং টেবিলে রাখা পাউডারের কৌটোয় সর্বত্র তিনি আছেন, ভীষণভাবে আছেন৷ পুত্রতুল্য তন্ময়কে বাঁচাতে দুষ্কৃতিদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন তিনি৷ কে জানে, তন্ময়কে আদৌ বাঁচাতে পেরেছেন কি না?
টাপুরদি ত্বরিতগতিতে ঘরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ জিনিসপত্র উলটেপালটে দেখছে৷ আলমারির দরজা টেনে দেখল একবার৷ তালা লাগানো৷ পুলিশ নিশ্চয়ই এইসব কিছুই সার্চ করে গেছে৷ পকেট থেকে চাবির গোছা বার করে আলমারির কি-হোলে ঢুকিয়ে নাড়াচাড়া করছে টাপুরদি৷ আমায় বলল, ‘মিতুল, ড্রেসিং টেবিলের দেরাজগুলো ভালোভাবে চেক কর৷’
ড্রয়ারগুলো খোলাই ছিল৷ টেনে টেনে দেখলাম৷ বিশেষ কিছু চোখে পড়ল না৷ চুলে বাঁধার কালো সরু ফিতে, কয়েকটা কাঁটা ক্লিপ, একটা কাগজের ঠোঙায় রবারব্যান্ড, আরও টুকিটাকি কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রয়েছে শুধু৷ মাঝের ড্রয়ারটা খালি দেখলাম৷ নীচেরটা খুলতে দেখলাম, একটা খুব পুরোনো অ্যালবাম রাখা৷ টাপুরদিকে ডাকলাম, ‘এটা দেখো৷’
আলমারি খোলার চেষ্টায় ক্ষান্ত দিয়ে টাপুরদি এগিয়ে এল৷ মোবাইল টর্চের আলো ফেলে ছবির পাতা ওলটাতে লাগলাম আমি৷ বেশিরভাগই রেখাদেবীর স্বল্পদৈর্ঘ্যের সংসার জীবনের ছবি৷ পুরোনো হলুদ হয়ে যাওয়া ছবিগুলিতে রেখাদেবীর সুখী দাম্পত্যের কিছু তাজা বাতাস ধরা আছে৷ অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে কয়েকটা ছবি দেখা গেল৷ শেষের দিকে কয়েকটা তাঁর কুমারী জীবনের ছবি, গ্রুপ ফোটো৷ ওলটাতে ওলটাতে এক জায়গায় থেমে গেলাম৷ ছবিটি নিঃসন্দেহে কোনো অনুষ্ঠানের৷ মঞ্চে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছেন রেখাদেবী, বয়স আঠারো-উনিশের বেশি হবে না৷ পাশে সমবয়সি আরেকটি মেয়ে গলা মেলাচ্ছে৷ মেয়েটিকে কেমন চেনা মনে হল৷ কোথাও যেন দেখেছি৷ মঞ্চে অতিথির আসনে বসে আছেন রথীন ঘোষ, একটু দূরে ব্যাক স্টেজের কাছে দাঁড়ানো যুবকটিকে চিনতে অসুবিধে হল না৷ ইনিই অমিয় চক্রবর্তী৷
টাপুরদি চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘চিনতে পারছিস, মিতুল?’
‘অমিয় চক্রবর্তী তো!’ বললাম আমি৷
‘হুম, আর মেয়েদুটি?’
‘ইনি তো রেখাদেবী৷ অপরজনকে চিনতে পারছি না৷’
‘অনামিকা রায়৷ তন্ময়ের মা,’ বলল টাপুরদি, ‘সেদিন তন্ময়ের ফ্ল্যাটে ছবি দেখেছিলি মনে নেই?’
‘ঠিক, সেদিন ছবিটা এক ঝলক দেখেছিলাম৷ চেহারাটা মনে ছিল না৷’
ড্রেসিং টেবিলের পাশের দরজাটা শেকল তুলে বন্ধ করা৷ সেটা নিঃশব্দে খুলে পাশের ঘরে ঢুকলাম আমরা৷ এই ঘরটা অপেক্ষাকৃত ছোটো, একটা সিঙ্গল বেড পাতা, বিছানার চাদরটা অগোছালো, অর্থাৎ শেষবার এই বিছানায় কেউ শুয়েছিল৷ এই ঘরে একটি ছোট আলমারি থাকলেও তাতে তালা লাগানো নেই৷ আলমারিটা খুলে তাতে বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না৷ দুটো ভাঁজ না ভাঙা নতুন বিছানার চাদর, তোয়ালে, একটা টিনের বাক্সে কিছু কয়েন, রেখাদেবীর নামের রেশন কার্ড, নীচের তাকে কিছু পুরোনো পোকায় কাটা বইপত্র, উলটেপালটে দেখা গেল সেগুলি রেখাদেবীর বিয়েতে পাওয়া, আরও কিছু সংসারের ব্যবহৃত অব্যবহৃত জিনিস জমানো আছে আলমারির ভিতর৷ নীচের তাকে রাখা কিছু পেতল ও কাঁসার বাসনপত্র যেগুলি সম্ভবত পুজোর কাজে ব্যবহার হত৷ জিনিসগুলি সরিয়ে দেখতে গিয়ে হঠাৎ আমার হাত লেগে অসাবধানে একটা কাঁসার ঘটি ঝন ঝন শব্দে গড়িয়ে পড়ল৷ শব্দে আমরা নিজেরাই চমকে উঠলাম৷
‘এই যাঃ!’ লাফিয়ে উঠল টাপুরদি৷
ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরের ঘরের দরজায় শব্দ পেলাম৷ কেউ তালা খুলে ঢুকছে৷ সম্ভবত পুলিশের রক্ষী শব্দ পেয়ে চেক করতে আসছে৷
টাপুরদি আমায় এক ধাক্কা মেরে বলল, ‘শিগগির খাটের তলায় ঢোক৷ কুইক!’
আর কিছু ভাবার সময় নেই৷ টাপুরদি দৌড়ে পাশের ঘরে গিয়ে বারান্দার দিকের দরজাটাতে শেকল তুলে দিল৷ বিপদের সময় টাপুরদির মাথা বরফের মতো ঠান্ডা থাকে বরাবর দেখেছি৷ ওই দরজা দিয়ে আমরা ঢুকেছি৷ আমি আর অপেক্ষা না করে প্রায় ডাইভ দিয়ে খাটের তলায় ঢুকলাম৷ টাপুরদি পাশের ঘরে কোথায় লুকোল কে জানে? বুকের ভিতর রীতিমতো দামামা পিটছে৷ ধরা পড়লে কী কপালে আছে কে জানে? হে ভগবান! এই যাত্রায় বাঁচিয়ে দাও গো৷
খাটের তলায় শুয়েই টের পেলাম কেউ একজন টর্চ জ্বেলে ঘরে ঢুকল৷ প্রাণপণে নিশ্বাস বন্ধ করে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছি৷ নিজেকে যতটা সম্ভব পিছিয়ে নিয়ে পেছনের দেওয়ালের সঙ্গে সেঁটে শুয়ে আছি৷ বেশ বুঝতে পারছি লোকটা সারা ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ এবার খাটের তলে টর্চের আলো নেমে এল৷ ভয়ে চোখ বুজে ফেললাম আমি৷ টর্চের আলো আমায় ছুঁল না৷ খাটের তলায় সামনের দিকটাতে বুলিয়ে নিয়ে সরে গেল৷ বন্ধ করে রাখা নিশ্বাসটা এতক্ষণে বুক থেকে বেরিয়ে এল৷ লোকটা দরজা দিয়ে পাশের ঘরে ঢুকল দেখতে পেলাম৷ ওই ঘরে টাপুরদি আছে৷ কে জানে কোথায় লুকিয়েছে টাপুরদি? যদি ধরা পড়ে যায়? কী হবে? কান্না পেয়ে যাচ্ছে আমার৷ এ-রকম বিপদে জীবনে পড়িনি৷ পুলিশের সিলড ফ্ল্যাটে বেআইনিভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে ঢোকার সাজা কী হতে পারে ভেবেই শরীর ঠান্ডা হয়ে এল আমার৷
কতক্ষণ সময় পেরোল হিসেব রাখিনি৷ প্রতিটা মুহূর্ত যেন অনন্তকাল বলে মনে হচ্ছে৷ বাইরের দরজায় তালা লাগানোর শব্দ পেলাম৷ মনে হল লোকটা বাইরে বেরিয়ে গেল৷ কয়েক মুহূর্ত গেল এভাবেই৷ বেরিয়ে আসার সাহস হচ্ছে না৷ এমন সময় টাপুরদির গলা শুনতে পেলাম, ‘বেরিয়ে আয় মিতুল৷’
মেঝের উপর মাথা নীচু করে হামাগুড়ি দিয়ে বেরোলাম৷ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘গেছে?’
‘হুম, তবে বেশিদূর যায়নি৷ বাইরেই আছে৷ শব্দ পেলে আবার আসবে৷ বার বার লুকিয়ে বাঁচা যাবে না৷ চল বাইরের ঘরটা একবার দেখে নিই চট করে৷’ বলে দরজার দিকে এগোল টাপুরদি৷ বাইরের এই ঘরটাতেই সেদিন আমরা এসে বসেছিলাম৷ বাইরের দরজার সামনে মার্ডার স্পট মার্ক করে রাখা আছে দেখলাম, কলকাতা পুলিশের লোগোর ছাপ মারা বেল্ট দিয়ে জায়গাটা ঘেরা৷ মনটা কেমন করে উঠল৷ এই তো সেদিন সম্পূর্ণ সুস্থ দেখলাম রেখাদেবীকে৷ কত কথা হল এই ঘরেই বসে৷ অথচ আজ ঠান্ডা মেঝের উপর শুধু তাঁর শরীরের বহিরাঙ্গের আউটলাইন আঁকা, ভিতরের মানুষটা কোথায় হারিয়ে গেছে৷
দেখা শেষ করে পেছনের দরজা দিয়ে বেরোলাম আমরা৷ পেছনের বারান্দার দিকের দরজাটা, যেটা দিয়ে ভিতরে ঢুকেছিলাম আমরা, সেটা আর বাইরে থেকে বন্ধ করা সম্ভব নয়৷ দরজাটা ঠেলে ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলাম আমরা৷ টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এবার? আবার গাছে চড়তে হবে?’
‘তা ছাড়া আর উপায় কী?’ হেসে বলল টাপুরদি৷
‘টাপুরদি৷’ মৃদুস্বরে ফিসফিস করে ডাকলাম আমি৷
‘বলে ফেল,’ পেয়ারা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে একটা ডাল ধরে বলল টাপুরদি৷
‘এটা ধরো৷’ জিনসের পকেট থেকে হাতটা বার করে টাপুরদির সামনে মেলে ধরলাম৷ টাপুরদি আমার হাতের তালুতে ধরা পেনড্রাইভটার দিকে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকাল৷ বলল, ‘এটা কোথায় পেলি?’
‘খাটের নীচের দিকে তক্তায় সেলোটেপ দিয়ে আটকানো ছিল৷ লুকোলাম বলে চোখে পড়ল এটা৷’ হাসিমুখে বললাম৷
টাপুরদি আমার হাত থেকে পেনড্রাইভ নিয়ে পকেটে চালান করে বলল, ‘এবার গাছে ওঠ৷ ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই৷’

বাড়ি যখন ফিরলাম, পুবের আকাশ ততক্ষণে ফর্সা হতে শুরু করেছে৷ ক্লান্তিতে শরীর যেন আর বইছে না৷ টাপুরদি চাবি ঘুরিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলতেই বসার ঘরের সোফায় শুয়ে পড়লাম৷ মনে হচ্ছে শোওয়ার ঘর অবধি যাওয়ার শক্তিও নেই শরীরে৷ দুইবার করে গাছে চড়া, নামা, দেয়াল টপকানো, পুলিশের নজর এড়িয়ে সিলড মার্ডার লোকেশনে হানা দেওয়া, এক রাতের মধ্যে এমন ঘনঘোর অ্যাডভেঞ্চার জীবনে করিনি কখনো৷
টাপুরদি বলল, ‘ঘরে গিয়ে একটু শুয়ে বিশ্রাম নিয়ে নে৷ অফিস আছে তো?’
‘ইমপসিবল৷ আজ আমি অফিস কাটব৷ তুমি শোবে না?’
‘দেখি রে৷ একটু কাজ আছে৷’ বলল টাপুরদি৷
‘এখন?’ মাঝে মাঝে টাপুরদিকে আমার অতিমানবী বলে মনে হয়৷ বললাম, ‘এত এনার্জি পাও কোথা থেকে বলো তো?’
হাসল টাপুরদি৷ তারপর বলল, ‘সময় খুব কম রে মিতুল৷ এখন প্রতিটা মুহূর্ত খুব ইম্পর্ট্যান্ট৷ তন্ময় কী অবস্থায় আছে আমরা জানি না৷ আমার হাতে এখন শুয়ে বসে নষ্ট করার মতো সময় নেই৷’
সত্যিই তো৷ আমি এক রাত জেগে ভাবছি দুঃসাহসিক অভিযান করে ফিরলাম৷ এবার বিশ্রাম দরকার৷ অথচ তন্ময় না জানি কোথায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে, কীভাবে আছে! উঠে বাথরুমে ঢুকলাম৷ ব্রাশ করে চোখে-মুখে জল দিয়ে কিছুটা ফ্রেশ লাগল৷ বেরিয়ে দেখি টাপুরদি চা বসিয়েছে৷ আমায় দেখে বলল, ‘চা-টা খেয়ে বরং গিয়ে শো৷’
আমি বললাম, ‘এখন আর শোবো না৷ তুমি বলো, আজকের অভিযান কতটা সফল?’
‘কতটা সফল, সেটা এই মুহূর্তেই বলা যাচ্ছে না৷’ চায়ের কাপদুটো ট্রেতে বসিয়ে বসার ঘরে নিয়ে এসে সেন্টার টেবিলের উপর রাখল টাপুরদি৷ তারপর সোফায় বসে বলল, ‘পেনড্রাইভটা দেখতে হবে৷ সেটাই আসল কাজ৷ আমার ধারণা এটা তন্ময়ের পেনড্রাইভ৷ ও জানত, যেকোনো সময় ওর উপর হামলা হতে পারে৷ তাই লুকিয়ে রেখেছিল ওভাবে৷ তাড়াহুড়োতে পালাতে গিয়ে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেনি৷’
‘ভীষণ এক্সাইটেড লাগছে টাপুরদি৷ যে ডকুমেন্টের জন্য এতসব কিছু, সেটা এখন আমাদের হাতে৷’ সোৎসাহে বললাম আমি৷
হাসল টাপুরদি৷ বলল, ‘হুম, কিন্তু আমার কেসে, আই মিন তন্ময়কে খুঁজে বার করার কাজে সেটা কতটা কাজে লাগবে সে নিয়ে সন্দেহ আছে আমার৷ চা-টা খেয়ে মাথাটা খালি করি, তারপর পেনড্রাইভটা নিয়ে বসব৷ তবে তুই দারুণ কাজ করেছিস৷’
‘আচ্ছা টাপুরদি, অ্যালবামে যে ছবিটা ছিল, সেটার মানে তো এই দাঁড়াচ্ছে যে অনামিকা রায় ও অমিয় চক্রবর্তী একে অপরকে চিনতেন৷’
‘চিনতেন তো বটেই৷ তবে কতটা গভীরভাবে চিনতেন, সেটা এই ছবি দেখে বলা সম্ভব নয়৷ সেদিন আমরা যখন রেখাদেবীকে অনামিকা রায়ের পরকীয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি কিন্তু অস্বীকার করেছিলেন৷ সেটা কতটা সত্যি আর কতটা বন্ধুকৃত্য, সেটা জানা যাচ্ছে না৷ রেখাদেবীর সঙ্গে সঙ্গে সেই গোপন সত্যগুলিও হারিয়ে গেল৷ কিন্তু, শুধুমাত্র স্টেজে দুজনের একসঙ্গে ছবি দেখে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো সম্ভব নয় রে৷ তবে চিনতেন, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই৷’ বলল টাপুরদি৷
‘আর তা ছাড়া তোমার বন্ধুও তো জানাল যে অনামিকাদেবীর ট্রান্সফারটাও অমিয় চক্রবর্তীর সুবাদে হয়েছিল৷’ আমি বললাম৷
টাপুরদি একটু ভেবে বলল, ‘আমরা যদি ধরে নিই যে অমিয়বাবু আর অনামিকাদেবীর মধ্যে ভালোরকম আলাপ পরিচয় ছিল, তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে? অমিয়বাবু খুন হলেন৷ অমিয়বাবুর অতীতের কিছু তথ্য এসে পড়ল তন্ময়ের হাতে৷ সে সেটা নিয়ে গা-ঢাকা দিল৷ সেটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে সেটার জন্য খুন হতে হল রেখাদেবীকে৷ তন্ময়ের প্রাণও সংকটে৷ সব মিলিয়ে কী মনে হচ্ছে তোর?’
‘মনে হচ্ছে সব সুতোর জট ওই পেনড্রাইভে আছে৷ ওটা দেখা যাক তাহলে৷ দাঁড়াও তোমার ল্যাপটপটা নিয়ে আসি৷’ বলে উঠে গিয়ে টাপুরদির শোওয়ার ঘর থেকে ল্যাপটপ নিয়ে এসে বসলাম৷ বুকের ভেতরটা ঢিপ ঢিপ করছে৷ কে জানে কী এমন গোপন তথ্য আছে এই পেনড্রাইভে যার জন্য এতসব কিছু ঘটে চলেছে৷ টাপুরদি ল্যাপটপের সুইচ অন করল, পেনড্রাইভের ঢাকনাটা খুলে ল্যাপটপের ইউএসবি পোর্টে ঢোকাল৷ ড্রাইভ খুলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘যেটা ভয় পেয়েছিলাম, সেটাই হল৷ বিটলকার দিয়ে পাসওয়ার্ড প্রোটেক্ট করা আছে৷’
‘যাঃ, তাহলে এবার কী হবে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি, ‘ট্রাই করে দেখবে?’
‘কোনো লাভ নেই রে৷ ওভাবে সিনেমায় পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করা যায়৷ বাস্তবে সম্ভব নয়৷’
‘ইশ, জিনিসটা হাতে পেয়েও কিছু করতে পারব না আমরা?’ আমি হতাশ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম৷
‘পারব না কেন? পারতে তো হবে৷ শুধু একজনের একটু সাহায্য লাগবে!’ মুচকি হেসে বলল টাপুরদি৷
‘অর্জুনদা? নো! নো ওয়ে৷ তুমি এটা পুলিশকে দেবে না, রাইট? এটা তোমার সাকসেস৷ পুলিশ এটার ক্রেডিট নিয়ে নেবে, তা হয় না৷’ মুখ গোঁজ করে বললাম আমি৷
‘এটা তোর সাকসেস৷ তুই যদি পুলিশকে দিতে না চাস, তাহলে দেব না৷’ ল্যাপটপ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল টাপুরদি, ‘কিন্তু ভেবে দ্যাখ বাবু, এটাতে কী আছে জানা না গেলে অনেক কিছু জানা যাবে না৷ তন্ময়কে উদ্ধার করা মুশকিল হয়ে যাবে৷ এবার তুই ঠিক কর, কী করবি!’
হাসলাম আমি৷ বললাম, ‘তোমরা ঝগড়া করো কেন বলো তো? সেই তো তুমি আর অর্জুনদা দুজনেই জানো, তোমাদের দুজনেরই দুজনকে প্রয়োজন, কাজের জন্যেও, এবং অবশ্যই ইমোশনাল ও মরাল সাপোর্টের জন্য৷ ঝগড়া করে তোমরা কেউই ভালো থাকো না৷ অথচ মুখে সেটা স্বীকারও করবে না৷’
টাপুরদি কিছু বলল না, শুধু মুচকি হাসল৷ আমি বললাম, ‘হেসো না৷ খুব রাগ হয় আমার তোমাদের উপর৷ যেভাবেই হোক, তন্ময়কে খুঁজে বার করো৷’
টাপুরদি করুণ মুখে হাসল৷ তারপর বলল, ‘জানিস তো মিতুল, আমাদের প্রাইভেট ডিটেকটিভদের স্বাধীনতা খুব কম৷ আমাদের ক্লায়েন্টরা আমাদের কাছে তখনই আসে, যখন পুলিশের কাছে যেতে পারে না, অথবা গিয়ে লাভ হয় না৷ আমাদের হাতে না আছে পুলিশের মতো সুযোগসুবিধে, না আছে টেকনোলজির সাপোর্ট৷ তারপর প্রতি মুহূর্তে আমাদের আইন বাঁচিয়ে কাজ করতে হয়৷ গল্পের গোয়েন্দাদের মতো অত লাকি আমরা বাস্তবের গোয়েন্দারা নই রে৷ পুলিশের সাহায্য ছাড়া এগোনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুশকিল হয়ে পড়ে৷’
টাপুরদিকে যেন কিছুটা হতাশ দেখাচ্ছে৷ মনটা খারাপ হয়ে গেল৷ বললাম, ‘অমন করে বোলো না টাপুরদি৷ তোমার মতো লজিক, বিশ্লেষণ ক্ষমতা পুলিশ বিভাগেও কম অফিসারের আছে৷ আর সেজন্যই কলকাতা পুলিশও বিভিন্ন কেসে তোমার সাহায্য নেয়৷ স্বয়ং ডিসিডিডি সৌরভ সান্যাল তোমায় যথেষ্ট সম্মান দেন, স্নেহও করেন৷ এর আগে অনেক কেসে তুমি পুলিশের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছ৷ তুমি না থাকলে কার্শিয়াং-এ স্মাগল্ড সোনা ধরা পড়ত না, বিজন চট্টরাজকে তুমিই ধরেছিলে৷ পুলিশ জানে তুমি কী৷ তুমি নিজের ক্ষমতাকে অত আন্ডারএস্টিমেট কোরো না৷ আমার ভালো লাগে না৷’
টাপুরদির মুখে হাসি ফুটল৷ আমার গাল টিপে দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা আমার ঠাকুমা, বলব না আর৷’
টাপুরদির ফোনটা বেজে উঠল৷ টাপুরদি ফোনটা তুলে বলল, ‘হুম, বলো৷’
বুঝলাম অর্জুনদার ফোন৷ কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রাখল৷ বলল, ‘দুটো খবর৷’
‘কী কী?’ জানতে চাইলাম আমি৷
টাপুরদি হাসিমুখে বলল, ‘রেখাদেবীর খুনিরা ধরা পড়েছে৷ আর ডিসিডিডি আমার সঙ্গে দেখা করতে চান৷’

লালবাজারে এসে বসে থাকতে হল বেশ কিছুক্ষণ৷ ডিসিডিডি জরুরি মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন৷ প্রায় চল্লিশ মিনিট অপেক্ষার পর ডিসিডিডির ঘরে ডাক পড়ল৷ ঘরে ঢুকে দেখলাম সেখানে অর্জুনদা ও আরেকজন মধ্যবয়সি অফিসার আগে থেকেই ঘরে উপস্থিত৷ সৌরভবাবু ফোনে কথা বলছিলেন কারও সঙ্গে৷ আমরা ঢুকতে ইশারায় আমাদের বসতে বললেন৷ ফোনে কথা শেষ করে টাপুরদির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সংঘমিত্রা, কেমন আছেন বলুন?’
‘ভালো স্যার৷’ হেসে বলল টাপুরদি৷
‘বেশ,’ হাসলেন ডিসিডিডিও৷ বললেন, ‘পরিচয় করিয়ে দেই৷ অর্জুনকে তো তুমি চেনো৷ আর ইনি সিনিয়ার ইন্সপেক্টর রজত দত্ত৷ আর ইনি হলেন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর সংঘমিত্রা ব্যানার্জি৷ রজত, তোমার বোধ হয় মনে আছে বিজন চট্টরাজের কেসটার কথা৷ সেটা কিন্তু সংঘমিত্রাই ক্র্যাক করেছিলেন৷’
রজতবাবু হাত তুলে নমস্কার করলেন৷ আমরাও প্রতিনমস্কার করলাম৷ সৌরভবাবু বললেন, ‘এবার আর সময় নষ্ট না করে কাজের কথায় আসা যাক৷ অর্জুনের মুখে শুনলাম আপনি রেখাদেবীর মার্ডার কেসটার সঙ্গে অন্য কোনো কেসের ব্যাপারে কোনোভাবে জড়িয়ে গেছেন৷ ব্যাপারটা ঠিক কী, জানতে পারি কি?’
টাপুরদি একবার আড়চোখে অর্জুনদার দিকে তাকাল৷ অর্জুনদা পাথরের মতো গম্ভীর মুখে চেয়ারে বসে আছে৷ সৌরভবাবুর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল টাপুরদি, ‘আপনাকে জানাতেই তো আসা৷ সত্যি বলতে কী, এই কেসের ব্যাপারে আমার পক্ষে যতদূর করার ছিল আমি করেছি৷ আমার হাতে আর তেমন কিছু নেই৷’
‘আগে শুনি, ঘটনাটা কী৷’ বললেন সৌরভ সান্যাল৷
টাপুরদি রিদ্ধিমার প্রথমদিন আসা থেকে শুরু করে আমাদের সুবিনয় মুখার্জির অফিসে যাওয়া, রেখাদেবীর সঙ্গে দেখা করা, রিদ্ধিমার কাছে আসা রেখাদেবীর ফোনের ব্যাপারে সব খুলে বলল৷ তেমনই বেশ কিছু ছোটো অথচ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার পুরোপুরি চেপে গেল সেটা খেয়াল করলাম৷ যেমন আমাদের গত রাতের নৈশ অভিযানের অধ্যায়টা পুরোপুরি এড়িয়ে গেল স্বাভাবিক কারণেই৷ সৌরভ সান্যাল মন দিয়ে শুনলেন সব কথা৷ তারপর বললেন, ‘আচ্ছা সংঘমিত্রা, আপনার কী ধারণা? তন্ময়ের কেসটার সঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর কোনোরকম যোগাযোগ আছে বলে মনে হয় আপনার?’
টাপুরদি বলল, ‘আমি তো অমিয় চক্রবর্তীর মার্ডার কেসের ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্ধকারে৷ টিভিতে দেখে সারা দেশের লোক যেটুকু জেনেছে, সেটুকুই আমিও জেনেছি৷ সেই জায়গা থেকে বলা সম্ভব নয় আদৌ কোনো যোগাযোগ আছে কি না৷ তবে এটুকু বলতে পারি তন্ময়ের অন্তর্ধানের সঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর অতীতের কোনো না কোনো যোগ হয়তো আছে৷’
সৌরভ সান্যাল একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন৷ মনে হল নিজের মনে গভীরভাবে কিছু ভাবছেন৷ তারপর বললেন, ‘দেখুন সংঘমিত্রা, আপনি যথেষ্ট ইন্টেলিজেন্ট৷ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, কেসটা ভীষণ সেনসিটিভ৷ এই ধরনের পলিটিক্যাল কেসে আমাদের অনেক মেপে পা ফেলতে হয়৷ মিডিয়াও শকুনের মতো ওঁত পেতে বসে থাকে একেকটা বাইটের জন্য৷ আর এটা যেকোনো পেটি পলিটিক্যাল কেস নয়৷ খোদ হবু মুখ্যমন্ত্রীর মার্ডার কেস৷ সারা দেশ তাকিয়ে আছে এই কেসের দিকে৷ আপনি নিশ্চয়ই এই কেসের গুরুত্ব বুঝতে পারছেন?’
টাপুরদি মৃদু হেসে বলল, ‘অবশ্যই বুঝতে পারছি৷ কলকাতা পুলিশ মুখ্যমন্ত্রীর মার্ডার কেসে খুব ভালো কাজ করছে৷ ধনঞ্জয় মণ্ডলের ব্যাপারটা...’
‘সংঘমিত্রা,’ টাপুরদিকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠলেন সৌরভ সান্যাল, ‘দেখুন, আপনার বুদ্ধি ও কাজের ধরনের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে৷ তার চেয়েও বড়ো কথা তন্ময়ের ব্যাপারটা নিয়ে এগিয়ে আপনার বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়, ব্যাপারটা অতটাও সহজ নয়, যতটা উপর থেকে দেখাচ্ছে৷ আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই, তন্ময়ের কেসটা নিয়ে আপনি যেমন কাজ করছেন, করুন৷ পুলিশের সবরকম সহযোগিতা আপনি পাবেন৷ তবে দুটো শর্ত আছে৷ প্রথমত, আপনার তদন্তের অগ্রগতি পুলিশের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে, কোনো রিস্কি বা সেনসিটিভ স্টেপ নেওয়ার আগে পুলিশকে জানাতে হবে৷ দ্বিতীয়ত, যদি কেসটা নিয়ে এগোতে গিয়ে কখনো আপনার মনে হয়, তন্ময়ের অন্তর্ধান কেসের সঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর কোনো যোগাযোগ আছে, পুলিশকে সেটা জানাতে হবে৷ সেক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপ আমরা আলোচনা করে ডিসাইড করব৷’
টাপুরদি স্থিরদৃষ্টিতে সৌরভবাবুর দিকে তাকিয়ে রইল৷ মনে হল, মনের মধ্যে শর্তগুলি নিয়ে নাড়াচাড়া করে সেগুলির ওজন মেপে দেখছে টাপুরদি৷ তারপর হেসে বলল, ‘স্যার, আমি প্রাইভেট ডিটেকটিভ৷ পুলিশ ইচ্ছে করলেই আমার তদন্ত বন্ধ করে দিতে পারেন৷ লাইসেন্সও রদ করে দিতে পারেন৷ সেক্ষেত্রে আমি আবার আমার সফটওয়্যারের প্রফেশনে ফিরে যাব৷ কিন্তু এতসব শর্ত মেনে আমার পক্ষে তদন্ত চালানো সত্যিই একটু সমস্যার ব্যাপার৷ তবে এগুলো যদি অনুরোধ হয়, তবে ভেবে দেখতে পারি৷’
টাপুরদির মুখে এহেন বচনামৃত শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম৷ কী ভয়ংর সাহস টাপুরদির! লালবাজারে বসে খোদ ডিসিডিডিকে এই কথা বলছে৷ তাকিয়ে দেখলাম অর্জুনদার মুখ প্রায় ঝুলে পড়েছে বিস্ময়ে, রজতবাবুরও অবস্থা তথৈবচ৷ সৌরভ সান্যাল স্থিরদৃষ্টিতে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন৷ সারা ঘরে পিনপতন স্তব্ধতা৷ হঠাৎই সৌরভবাবু হো-হো করে হেসে উঠলেন৷ আমরা সকলেই বিস্মিত মুখে তাঁর দিকে তাকালাম৷ হাসি থামিয়ে তিনি বললেন, ‘দ্যাটস হোয়াই আই রিয়ালি অ্যাডমায়ার দিস লেডি৷’ তারপর একটু থেমে গম্ভীর মুখে বললেন, ‘বেশ সংঘমিত্রা, অনুরোধই সই৷ অফ কোর্স যদি আপনি এই কেস নিয়ে আর এগোতে চান৷ কারণ এ-রকম সেনসিটিভ কেসের ক্ষেত্রে আমি কোনোরকম রিস্ক নিতে পারব না৷ আমাকেও উপরে জবাবদিহি করতে হয়৷ তবে হ্যাঁ, যদি কেসের কোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে আপনার ও আমাদের মনে হয় যে তন্ময়ের কেসের সঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর খুনের কোনো যোগাযোগ আছে, সেক্ষেত্রে আপনি আনঅফিশিয়ালি অমিয় চক্রবর্তীর কেসে পুলিশের সঙ্গে কাজ করতে পারেন যদি আপনার ইন্টারেস্ট থাকে৷ আপনি চাইলে এই ব্যাপারে কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে পারি৷ এই অফারটা দিচ্ছি, কারণ আমি আপনাকে চিনি৷ আমার ধারণা আপনি অমিয় চক্রবর্তীর কেস নিয়ে কৌতূহলী৷ তবে ব্যাপারটা বাইরের কেউ জানবে না৷ পুরোপুরি কনফিডেনশিয়াল থাকবে৷ মিডিয়ার কাছে এটা কোনোভাবেই ডিসক্লোজ করা যাবে না৷’
টাপুরদির মুখে হাসি ফুটল৷ বলল, ‘আই উড লাভ টু! আমি রাজি৷ তবে আমারও শর্ত, না, অনুরোধ হল, আমি যাতে পুলিশের কাছ থেকে সবরকম সহায়তা পাই, সেটা প্লিজ দেখবেন৷’
‘নিশ্চয়ই,’ হেসে বললেন সৌরভ সান্যাল৷ তারপর অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অর্জুন, মিস ব্যানার্জির সঙ্গে টাচে থেকো৷’
অর্জুনদা বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ল৷ টাপুরদি বলল, ‘স্যার, আমার আপনাদের সাইবার সেলের সাহায্য চাই৷ একটা পাসওয়ার্ড প্রোটেকটেড পেনড্রাইভ খুলতে হবে৷ কাজটা একটু তাড়াতাড়ি হলে ভালো হয়৷’
ডিসিডিডি বললেন, ‘ওকে, আমি কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা বলে আপনাকে জানাচ্ছি৷’
টাপুরদি হাসিমুখে মাথা নাড়ল৷

‘তুমি কি পাগল?’ গম্ভীর মুখে জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা৷ সন্ধেবেলা অর্জুনদা এসেছে টাপুরদির ফ্ল্যাটে৷ সোফায় বসেই প্রথম প্রশ্ন ছুড়ে দিল৷ টাপুরদি কোনো উত্তর না দিয়ে হাসল৷ অর্জুনদা মুখখানা ততোধিক গম্ভীর করে বলল, ‘হেসো না৷ কী কাণ্ডটা করলে আজ ডিসিডিডির সামনে?’
টাপুরদি মুখের হাসি বজায় রেখে বলল, ‘সৌরভবাবু তোমার বস, আমার তো নয়৷ আমার তাহলে ভয়টা কীসের, শুনি? সৌরভবাবুকে আমিও শ্রদ্ধা করি৷ কিন্তু তাঁর শর্তে আমার না পোষালে সেটা বলতে তো হবে, না?’
‘পেনড্রাইভের কেসটা কী?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা৷
টাপুরদি আড়চোখে আমার মুখের দিকে তাকাল, আর আমি টাপুরদির দিকে৷ তারপর টাপুরদি কণ্ঠস্বরকে যথাসম্ভব সহজ স্বাভাবিক রেখে বলল, ‘বললাম তো, একটা পেনড্রাইভ খুলতে হবে৷ পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড আছে৷’
‘সে তো আমি আগেই শুনেছি৷ কিন্তু আছেটা কী সেই ড্রাইভে? কোত্থেকে পেলে?’
‘না খুললে কী করে জানব কী আছে! সেজন্যই তো বলছি খোলার ব্যবস্থা করো৷’ বলল টাপুরদি৷
‘হুম, আগে কমিশনার সাহেব তোমায় কেসে ইনভলভ করার ব্যাপারে গ্রিন সিগনাল দিক৷ সেটা পেয়ে গেলেই কাজ হয়ে যাবে৷ কিন্তু এটা কোত্থেকে পেলে, সেটা তো বললে না?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা৷
টাপুরদি অর্জুনদার চোখের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকাল৷ তারপর বলল, ‘বলব কি না সেটা ডিপেন্ড করে প্রশ্নটা কে করছে তার উপর৷ যদি বন্ধু হিসেবে জানতে চাও, বলব৷ পুলিশ হিসেবে প্রশ্ন করলে উত্তর দেব না৷’
অর্জুনদার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার পেটের ভিতর কুলকুল করে হাসির স্রোত বইছে৷ টাপুরদি মাঝে মাঝে অর্জুনদাকে এমন বিপদে ফেলে, সে আর বলার নয়৷ বেচারার মুখের বিস্ময়, অসহায়তা, জিজ্ঞাসার মিলিত অভিব্যক্তি দেখে মায়া হল৷ টাপুরদি অর্জুনদার মুখের দিকে চেয়ে এবার জোরে জোরে হাসতে শুরু করল৷ আমিও হেসে বললাম, ‘এ কিন্তু তোমার ভারি অন্যায় টাপুরদি৷’
টাপুরদি হাসতে হাসতেই বলল, ‘বোসো, চা বসিয়েছি৷ জল ফুটে গেল বোধ হয়৷ বানিয়ে নিয়ে আসি আগে৷ তারপর সব বলছি৷’
চা খেতে খেতে টাপুরদি আমাদের নৈশ অভিযানের কথা বলল অর্জুনদাকে৷ টাপুরদিকে এতদিন ধরে চেনার পর অর্জুনদা আজকাল টাপুরদির আর কোনো দুঃসাহসিক কাজেকর্মে বিস্মিত হয় না৷ কিন্তু আজ সব শুনে তারও চোখ কপালে উঠল৷ হাঁ করে কিছুক্ষণ টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘ধরা পড়লে কী হতে পারত কোনো আইডিয়া আছে তোমার? নিজে গিয়েছ, সঙ্গে মিতুলটাকেও টেনে নিয়ে গিয়েছ৷ টাপুর, তোমার মাথাটা কি সত্যিই খারাপ হয়ে গেল? দুঃসাহসের একটা সীমা থাকে৷’
টাপুরদি অর্জুনদার কথার উত্তর না দিয়ে হেসে বলল, ‘সাহসই বলো, আর দুঃসাহস, এটুকু না করলে কি পেনড্রাইভটা পেতাম? তোমার অফিসার কি আমায় কেসের ভিতরে ঢুকতে দিত? যদি বলতাম, আমি রেখাদেবীর বাড়ি সার্চ করতে চাই, দিত পুলিশ আমায় তা করতে?’
অর্জুন বলল, ‘সেইজন্য তুমি রাতদুপুরে পুলিশের সিল করা মার্ডার স্পটে গাছে চড়ে দেয়াল টপকে ঢুকবে? হে ভগবান! তুমি সত্যিই পাগল৷’
টাপুরদি এবার বেশ গম্ভীর মুখে বলল, ‘জোকস অ্যাপার্ট, পেনড্রাইভটা খোলানোর ব্যবস্থা করতে হবে৷ আমার মন বলছে এর মধ্যেই আছে সব রহস্যের সূত্র৷ এটা না খুললে এগোনো মুশকিল৷’
অর্জুনদা বলল, ‘সেটা আমি দেখছি৷ আগে দেখি কাল কমিশনার সাহেব কী বলেন৷ যদি থাম্বস আপ করে দেন, তাহলে তো ভালোই, আর না হলে আমায় সাইবার সেলের কাউকে দিয়ে কাজটা করিয়ে নিতে হবে৷ অবশ্য যদি তুমি আমায় ভরসা করো৷’
অর্জুনদার গলায় একটু যেন অভিমানের সুর বাজল৷ আমরা অর্জুনদাকে না জানিয়ে এত কিছু করেছি, সেটাতে স্বাভাবিকভাবেই দুঃখ পেয়েছে অর্জুনদা, সেটা বুঝতে অসুবিধে হল না৷ টাপুরদি দেখলাম অর্জুনদার অভিযোগটা সযত্নে এড়িয়ে গেল৷ বুঝলাম, দুজনের মনেই জমে আছে কিছুটা করে অভিমানের মেঘ৷ সামনাসামনি স্বাভাবিক বন্ধুত্বের অভিনয় করছে দুজনে৷ কিন্তু টাপুরদি ও অর্জুনদার সম্পর্কটা সাধারণ বন্ধুত্বের মধ্যে আর পুরোপুরি সীমাবদ্ধ নেই, মুখে না বললেও সেটা ওরা দুজনেই বোঝে৷ আমি জানি, দুজনেই মানসিকভাবে দুজনের উপর নির্ভর করে৷ সেই নির্ভরতার ভিতটা যেন গত কয়েকদিনের ঘটনায় কিছুটা চিড় খেয়ে গেছে৷ দুজনেই ভিতরে ভিতরে ধিকিধিকি পুড়ছে৷ কিন্তু অহংকার তো কারওরই কম নয়৷ কেউই আগে নত হবে না৷ এই মানুষ দুটোই আমার খুব প্রিয়, খুব কাছের৷ ওদের মন ভালো না থাকলে আমার কষ্ট হয়৷ ঠিক যেমন এখন হচ্ছে৷
টাপুরদি বলল, ‘রেখাদেবীর হত্যাকারীদের মুখ দিয়ে কথা বার করতে পারলে?’
‘পেটি হিস্ট্রি শিটার সব৷ নিয়ম করে জেলে ঢোকে৷ তাই গায়ের চামড়াও মোটা৷ মুখ টিপে আছে৷ কতদিন আর থাকবে? চেপে ধরলেই উগরে দেবে৷’ বলল অর্জুনদা৷
আমি বললাম, ‘কী করবে অর্জুনদা? মারধর করবে? তুমি মারধর করো? আই মিন ওই থার্ড ডিগ্রি-টিগ্রি দাও? ইশ, কী নিষ্ঠুর!’
অর্জুনদা ম্লান হেসে বলল, ‘পুলিশের কাজটা ভদ্রলোকের কাজ নয় গো সখি৷ ক্রিমিনাল, স্মাগলার, খুনি, রেপিস্টদের ভদ্রতা দিয়ে ডিল করা সম্ভব নয়৷’
‘জানি,’ বললাম আমি, ‘সেটা বুঝি৷ কিন্তু তোমার সঙ্গে ব্যাপারটা ঠিক মেলাতে পারি না৷’
‘না পারাই মঙ্গল৷ মনে করো ওটা আমার চাকরির অঙ্গ৷’ বলে টাপুরদির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সে যাই হোক, কাল আমি লোকগুলোকে ইন্টারোগেট করব৷ কী বলে শুনে জানাচ্ছি তোমায়৷ আর পেনড্রাইভের ব্যাপারটাও দেখছি৷ এমনিতেও কালকের মধ্যে আশা করি জেনে যাব কমিশনার সাহেব কী বলছেন৷ আজ উঠি৷’ বলে অর্জুনদা উঠে দাঁড়াল৷ টাপুরদি কিছু বলল না৷ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হল, অনেক কিছু হয়তো-বা বলার ছিল, আরও কিছু শোনার ছিল৷ কিন্তু অভিমান৷ আমি বললাম, ‘এখনই যাচ্ছ? রাতে খেয়ে যাও অর্জুনদা৷’
অর্জুনদা ফিকে হাসল৷ হয়তো অর্জুনদা মনে মনে চেয়েছিল, টাপুরদি অন্যান্য দিনের মতো বলুক, ‘এত তাড়া কীসের?’ মুখে বলল, ‘কাজের খুব চাপ চলছে৷ ক্লান্ত লাগছে৷ আজ বাড়ি যাই৷’
বেরিয়ে গেল অর্জুনদা৷ মনটা খারাপ হয়ে গেল৷ আমি এসব মনের ব্যাপার-স্যাপার কমই বুঝি৷ তবু টাপুরদি ও অর্জুনদার সম্পর্কটাকে চোখের সামনে একটু একটু করে গড়ে উঠতে দেখেছি৷ দুজনের কেউ কখনো একে অপরকে বলেনি, ‘ভালোবাসি’৷ তবু দুজনের মনের কাছেই অপরের মনটা পরিষ্কার ছিল৷ বিজন চট্টরাজের কেসের ক্ষেত্রে দেখেছি, টাপুরদিকে নিয়ে অর্জুনদা কতটা গর্ববোধ করে৷ সেবার মুর্শিদাবাদে গিয়ে টাপুরদির উপর অ্যাটাক হল৷ সারারাত হাসপাতালে অর্জুনদা ঠায় টাপুরদির পাশে বসে থেকেছে৷ আমাকেও থাকতে দেয়নি, কিন্তু নিজে টাপুরদির কাছ থেকে সরেনি৷ আবার অপর দিকে অর্জুনদার প্রতিটি সাফল্যে আমি টাপুরদিকে গর্বিত হতে দেখেছি৷ মানসিকভাবে দুর্বল মুহূর্তেও অর্জুনদার একটা ফোন টাপুরদিকে নতুন করে লড়াই করার শক্তি জোগাতে দেখেছি আমি৷ আজ দুজনের মধ্যে একটা অদৃশ্য প্রাচীর উঠেছে সেটা যতটা সত্যি, ততটাই সত্যি সেইসব মুহূর্তগুলো, যখন একে অপরের পাশে স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে থেকেছে৷ আমি জানি, এসবই সাময়িক৷ টাপুরদি আর অর্জুনদা কখনো একে অপরের উপর অভিমান করে থাকতে পারে না৷
টাপুরদি উঠে গিয়ে রিমোটটা দিয়ে টিভি চালাল৷ নিউজ চ্যানেলে অম্লান চক্রবর্তীর ইন্টারভিউ দেখাচ্ছে৷ অমিয় চক্রবর্তীর স্বপ্ন, রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে কথা বলছে অম্লান চক্রবর্তী৷ অনুষ্ঠানের সঞ্চালক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘অমিয়বাবুর আকস্মিক মৃত্যুতে দলের মধ্যে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, আপনি সেটা কতটা সামাল দিতে পারবেন বলে মনে করেন?’
অম্লান চক্রবর্তী গম্ভীর মুখে বললেন, ‘বাবার শূন্যস্থান কখনোই পূর্ণ হওয়ার নয়৷ আমাদের জীবনে, পরিবারে এবং বাংলার রাজনীতিতে বাবার অভাব সবসময় থাকবে৷ আমি বিশ্বাস করি, বাবার আদর্শ শেষ হয়ে যেতে পারে না৷ একজন হত্যাকারী বাবার নশ্বর দেহকে হত্যা করতে পারে, কিন্তু অমিয় চক্রবর্তীর রাজনৈতিক মূল্যবোধকে হত্যা করা অত সহজ নয়৷ অমিয় চক্রবর্তী বেঁচে থাকবেন আমাদের মননে, চেতনায়৷ আমাদের দলের প্রতিটি কর্মীর হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন তিনি৷’
সঞ্চালক এবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘অমিয়বাবুর কেন্দ্র থেকে উপনির্বাচনের ক্ষেত্রে দলের তরফ থেকে প্রার্থী এখনও ঘোষণা করা হয়নি৷ অনেকরকম সম্ভাবনার কথাই শোনা যাচ্ছে৷ আপনি কি আমাদের দর্শকদের জানাবেন, অমিয়বাবুর জায়গায় প্রার্থী কে হচ্ছেন?’
অম্লানবাবু বললেন, ‘বাবার নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে বাবা গত বাইশ বছর ধরে টানা জিতেছেন৷ তার আগেও জিতেছেন বহুবার৷ কেন্দ্রের মানুষের যেমন আমাদের দলের সিদ্ধান্তের উপর পূর্ণ আস্থা আছে, আমাদেরও তেমন সম্পূর্ণ আস্থা আছে তাদের উপর৷ আমি জানি, যিনিই বাবার জায়গায় প্রার্থী হবেন, তিনি তাঁর কেন্দ্রের মানুষের সার্বিক উন্নতির জন্য সর্বশক্তি দিয়ে বাবার আদর্শকে সামনে রেখে কাজ করবেন৷’
সঞ্চালক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাহলে আমরা, তথা দর্শকেরা কি জানতে পারি প্রার্থীর নাম?’
অম্লানবাবু মুখে হাসি বজায় রেখে বললেন, ‘নিশ্চয়ই পারেন৷ এই রাজ্যের জনতার অধিকার আছে তাদের সম্মানিত প্রার্থীর নাম জানার৷ প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা দুটি ব্যাপার মাথায় রেখেছিলাম৷ প্রথমত, এমন কেউ যে বাবাকে ব্যক্তিগতভাবে জানত, বাবার আদর্শ সম্বন্ধে সম্যক অবহিত, দ্বিতীয়ত, যার দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সাধারণের সন্দেহের অবকাশ নেই৷’
টাপুরদি বিড়বিড় করে বলল, ‘একটু বেশি ফ্যানাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে৷ অম্লান চক্রবর্তীর কথা বলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে প্রার্থী সম্পর্কে তাঁর নিজেরই পুরোপুরি ভরসা নেই৷ জনতা তাকে কীভাবে নেবে সেই নিয়েও সন্দেহ আছে৷ তাই যেন একটু বেশিই যুক্তি সাজাচ্ছে৷’
আমি কোনো উত্তর দিলাম না৷ অম্লান চক্রবর্তী বলে চলেছেন, ‘আমাদের নতুন প্রার্থী রাজনীতি জগতের লোক না হয়েও এই রাজ্যের রাজনীতি জগতে তাঁর অবাধ বিচরণ৷ আমার বাবা অমিয় চক্রবর্তীর স্নেহধন্য ছিলেন তিনি৷ অনেকেই হয়তো চেনেন তাঁকে৷ তিনি হলেন, সুবিনয় মুখার্জি৷ রাজ্য জুনিয়ার দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার সুবিনয় মুখার্জি কলকাতার একটি বিখ্যাত ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান৷ নিজে একটি নামকরা সিকিউরিটি এজেন্সির কর্ণধার৷ আজ আমি বাবার উপনির্বাচন কেন্দ্রের প্রার্থী হিসেবে সুবিনয় মুখার্জির নাম ঘোষণা করছি৷’
প্রচণ্ড বিস্ময়ে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম৷ টাপুরদি হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠল৷ হাসতে হাসতে বলল, ‘মিলে গেছে হিসেব, মিতুল, হিসেব মিলে গেছে৷ সেই থেকে ভেবে যাচ্ছিলাম৷ সুবিনয় মুখার্জির মতো ব্যবসায়ী মানুষ শুধু বন্ধুকৃত্য করার জন্য বিনয় বোসের দেওয়া প্রোজেক্টের কথা অম্লানবাবুকে জানিয়ে দেবেন, সেটা কিছুতেই মানতে পারছিলাম না৷ ভাব, এমন কোনো তথ্য তো সুবিনয়বাবুর হাতে নিশ্চয়ই ছিল, যেটা ইলেকশনের রেজাল্টের হাওয়া বদলে দিতে পারত৷ সেটা বিনয় বোসকে দিলে প্রচুর টাকা পেতেন সুবিনয় মুখার্জি৷ তবে কেন দিলেন না? তন্ময় তার আগে নিয়ে পালিয়েছিল বলে? উঁহু৷ সেটাও যদি হয়, প্রমাণ হয়তো হাত থেকে বেরিয়ে গেছিল তন্ময়ের জন্য, কিন্তু ফ্যাক্টস তো জেনে গেছিলেন সুবিনয়বাবু৷ তাহলে সেটা কেন জানালেন না বিনয় বোসকে? কী এমন গরজ তাঁর? কীসের জোর টাকার থেকেও বেশি? ড্যাম৷ আমি কী বোকা! দ্যাট ইজ পাওয়ার৷ ক্ষমতা, ক্ষমতা রে মিতুল৷ টাকার অভাব নেই সুবিনয় মুখার্জির৷ রাজনৈতিক ক্ষমতা, সম্মান, এসবের লোভ ত্যাগ করা খুব কঠিন৷’
‘কিন্তু ওই কেন্দ্রের লোকেরা অমিয় চক্রবর্তীর জায়গায় সুবিনয় মুখার্জির মতো রাজনীতির বাইরের লোককে মেনে নেবে কেন?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
‘খুব সহজ অঙ্ক রে মিতুল,’ বলল টাপুরদি, ‘অমিয় চক্রবর্তী লম্বা সময় ধরে ওই নির্বাচনী কেন্দ্রের প্রার্থী হিসেবে টানা জিতে এসেছেন৷ তাঁর মৃত্যুতে সারা রাজ্যের মানুষ শোকাহত৷ সুতরাং বুঝতেই পারছিস তাঁর নিজের কেন্দ্রের জনতা কতটা সেনসিটিভ হয়ে আছে এই মুহূর্তে৷ অমিয়বাবুর জায়গায় তাই যাকেই দাঁড় করানো হবে, সিমপ্যাথি ভোট তাঁর দিকেই যাবে৷ জনতা সুবিনয় মুখার্জিকে ভোট দেবে না, দেবে দলকে৷ দেবে এমন একজনকে, যে কিনা তাঁর নিজের ছেলের বয়ান অনুযায়ী অমিয় চক্রবর্তীর স্নেহধন্য৷ সহজ হিসেব৷’
আমি বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালাম টাপুরদির দিকে৷ রাজনীতি ব্যাপারটা আমি বরাবরই কম বুঝি৷ আজ যখন এই কেসের সূত্রে রাজনীতির অলিগলিতে ঢুকতে হচ্ছে, মনে হচ্ছে রাজনীতি কম বুঝে খুব বেশি ক্ষতি আমার হয়নি৷

ফোনটা এল সকাল এগারোটা নাগাদ৷ কমিশনার অমিয় চক্রবর্তীর হত্যার কেসে শর্তসাপেক্ষে টাপুরদিকে গ্রিন সিগনাল দিয়েছেন৷ শর্তগুলি শুনে টাপুরদির মুখে কোনোই ভাব বই লক্ষণ্য দেখলাম না৷ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী শর্ত দিয়েছে, টাপুরদি?’
টাপুরদি খুব স্বাভাবিক অভিব্যক্তিতে বলল, ‘ছাড় তো৷ আগে কাজটা করি৷’
আর কথা বাড়ালাম না৷ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তাহলে হোয়াট নেক্সট?’
‘অর্জুন বলল, পেনড্রাইভটা সাইবার সেলের একজন জুনিয়ার অফিসারকে দিয়েছে৷ ওটা ডিসাইফার করতে পারলেই আমাদের জানাবে৷’ টাপুরদি বলল, ‘আপাতত অর্জুন যাচ্ছে অমিয়বাবুর বাড়িতে৷ জিজ্ঞাসা করছে, আমি যেতে চাই কি না৷’
‘যাবে না?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
‘যেতে তো হবেই৷’ হেসে বলল টাপুরদি৷
দেড় ঘণ্টা পরে যাদবপুরে অমিয় চক্রবর্তীর বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে আছি আমরা৷ জেড ক্যাটাগরির সিকিউরিটি অফিসার আমাদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়েই ভিতরে ঢুকতে দিয়েছেন৷ অর্জুনদা, আমি আর টাপুরদি এসেছি৷ একজন মহিলা এসে ট্রেতে করে তিন গ্লাস জল রেখে গেল৷ মনে হল এই বাড়িতে কাজ করেন৷ বললেন, ‘আপনারা একটু বসুন৷ ম্যাডাম আসছেন এখনই৷’
বেশ বড়ো ঘর৷ একদিকের দেয়ালজোড়া বইয়ের শেলফ৷ টাপুরদি উঠে গিয়ে ঘুরে ঘুরে বইগুলি দেখতে লাগল৷ ঘরে বসার জায়গাতে চারখানা সোফা সাজানো৷ বোঝাই যায় যে এই বাড়িতে যথেষ্ট অতিথি সমাগম হয়৷ দেয়ালে অমিয় চক্রবর্তীর বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন বয়সের ছবি সাজানো৷ মাঝে একটি বেশ বড়ো আকারের ফ্রেম, অমিয় চক্রবর্তীর হাসি মুখের ছবিতে মালা ঝোলানো হয়েছে দেখলাম৷ এটা সম্ভবত অমিয়বাবুর মৃত্যুর পর এখানে লাগানো হয়েছে৷ টাপুরদি বইয়ের দিক থেকে এদিকে হেঁটে এসে ছবিগুলোর সামনে দাঁড়াল৷ আমিও উঠে গিয়ে পাশে দাঁড়ালাম৷ খুব কম বয়স থেকে শুরু করে এবারের নির্বাচনী প্রচারের ছবিও স্থান পেয়েছে সংগ্রহে৷ দীর্ঘ বর্ণময় রাজনৈতিক জীবন৷
মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিলাম, এমন সময়ে পরদা সরিয়ে ঘরে ঢুকলেন সুনয়নাদেবী৷ সঙ্গে এলেন অমিয়বাবুর সেক্রেটারি মনোময় মজুমদার৷ ইনি অমিয়বাবুর দীর্ঘদিনের সঙ্গী, রাজনীতি জীবনের শুরু থেকে অমিয়বাবুর ছায়াসঙ্গী হয়ে আছেন৷ বয়স সত্তরের কাছাকাছি হলেও যথেষ্ট শক্তসমর্থ ভদ্রলোক৷ মুখের ভাব অভিব্যক্তিহীন৷ পূর্ণ দৃষ্টি মেলে আমাদের জরিপ করলেন, তারপর পাশের একটা সোফায় গিয়ে বসলেন খবরের কাগজ মুখের সামনে মেলে৷ আমার কেন জানি না মনে হল, খবরের কাগজে দৃষ্টি রুদ্ধ হলেও কান এদিকে পড়ে থাকবে ভদ্রলোকের৷ সুনয়নাদেবী আমাদের সামনের সোফায় এসে বসলেন৷ এর আগেও দূরদর্শনের পরদায় ভদ্রমহিলাকে দেখেছি৷ এবার প্রথম সামনে থেকে দেখে মনে হল, টিভিতে যেমন দেখায়, বয়স তার থেকে অনেকটাই বেশি৷ এমনও হতে পারে, হয়তো স্বামীর মৃত্যুর শোকে এই ক’দিনে চেহারা ভেঙেছে৷ তবে এক ঝলক দেখলেই তাঁর ব্যক্তিত্বের আন্দাজ পাওয়া যায়৷ সুনয়না চক্রবর্তী নিজে একসময় সক্রিয় রাজনীতি করতেন৷ অমিয় চক্রবর্তী ও সুনয়না চক্রবর্তী, দুজনেরই রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু ছিলেন রথীন ঘোষ৷ রথীন ঘোষের আমলে দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন সুনয়না চক্রবর্তী৷ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দূরে সরে আসেন৷
সোফায় এসে আমাদের মুখোমুখি বসলেন সুনয়নাদেবী৷ আমার ও টাপুরদির দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকালেন একবার৷ অর্জুনদা যেন একটু ইতস্তত করে আমাদের পরিচয় জানাল সুনয়নাদেবীকে৷ তারপর বলল, ‘এঁরা একটি পৃথক কেসে কাজ করছিলেন, যার সঙ্গে অমিয়বাবুর কেসের সম্ভবত কোনো সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে৷ তাই কমিশনার সাহেবের অনুমতিক্রমে মিস ব্যানার্জি এই কেসে পুলিশকে আনঅফিশিয়ালি সাহায্য করছেন৷ এই বিষয়ে আপনার কোনো আপত্তি নেই তো?’
সুনয়নাদেবী এবার আমাদের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন৷ ঠোঁটে হাসি টেনে বললেন, ‘আমার অনুমতির কি কোনো প্রয়োজন আছে? এটা কলকাতা পুলিশের কেস৷ পুলিশ যা ভালো বুঝবে, করবে৷ আর কমিশনার সাহেব যখন এঁকে এই কেসে কাজ করার যোগ্য বলে বিবেচনা করেছেন, তখন সেখানে আমার কী বলার থাকতে পারে?’
তারপর টাপুরদির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘একটা কথা না বলে পারছি না, ইউ রিয়েলি হ্যাভ আ ভেরি প্রিটি ফেস, মাই গার্ল৷ কে বলে সুন্দরী মেয়েরা বুদ্ধিমতী হয় না? আই ওয়ান্ট মোর স্টং অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্ট উইমেন লাইক ইউ টু কাম ফরোয়ার্ড টু বিল্ড দিস স্টেট, দিস কান্ট্রি৷ অমিয়ও তাই চাইত৷ হি অলওয়েস ফট ফর উওমেন লিবারেশন, মোর পার্টিসিপেশন বাই উইমেন ইন পলিটিক্স৷’
শেষের কথাগুলো কিছুটা অন্তঃসারশূন্য বলে বোধ হল আমার৷ সুনয়নাদেবীর বিয়ের পর পলিটিক্স ছাড়ার খবরটা জানা ছিল৷ তাই উইমেন লিবারেশন নিয়ে অমিয়বাবুর ভূমিকায় ঠিক বিশ্বাস রাখতে পারলাম না৷ যা হোক, টাপুরদি দেখলাম শোকার্ত মুখে মাথা নাড়ল৷ বলল, ‘অমিয়বাবুর মৃত্যুতে আমরা সকলেই গভীরভাবে শোকাহত৷ তাঁর মৃত্যু এই রাজ্যবাসীর জন্য সত্যিকারের ক্ষতি৷’
সুনয়নাদেবীর মুখে শোকের ছায়া আরও যেন বেশি করে ঘনিয়ে এল৷ একটু উদাস কণ্ঠে বললেন, ‘অমিয়র শূন্যস্থান কখনো পূর্ণ হওয়ার নয় আমাদের জীবনে৷ কিন্তু লড়াইটা তো থামবে না৷ দ্য শো মাস্ট গো অন৷ আমাদের পরিবার, দলের সদস্যরা সকলেই অমিয়র আদর্শে দীক্ষিত৷ মানুষের সেবাধর্ম এই পরিবারের প্রতিটি মানুষের রক্তে বইছে৷ আমার স্থির বিশ্বাস, অম্লান অমিয়র অসমাপ্ত সমস্ত কাজ সম্পন্ন করবে, অমিয়র স্বপ্নের বাংলা অম্লান গড়ে তুলবে৷’
সুনয়নাদেবীর কথা শুনে আমার মনে হল, রাজনৈতিক পরিবারের লোকেরা কি সহজভাবে কোনো কথা বলতে পারেন না? নিজের বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে কথা বললেও মনে হয় জনসভায় নির্বাচনী বক্তৃতা দিচ্ছেন৷ মনে প্রশ্ন জাগে, এঁরা কি বাড়ির লোকেদের সঙ্গেও এই ভাষাতেই কথা বলেন? কী জানি! অর্জুনদা এবার বলল, ‘আপনার কাছে কিছু কথা জানার ছিল৷ সেই কারণেই আজ এখানে আসা৷’
এবার মনোময়বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন সুনয়নাদেবী, ‘মনোময়, তুমি আজ পার্টি অফিসে যাবে না?’
মনোময়বাবু গম্ভীর মুখে বললেন, ‘সেখানেই যাচ্ছিলাম৷ অম্লান বাড়িতে থাকতে বলল৷ বলল, আপনার প্রেশারটা আবার বেড়েছে৷ ডক্টর সোমকে কল করেছি, আপনার প্রেশার মাপতে আসবেন তিনি এখুনি৷ ডক্টর চলে গেলে যাব অফিসে৷’
‘ও আচ্ছা, ঠিক আছে৷’ বলে অর্জুনদার দিকে ফিরলেন সুনয়নাদেবী৷ বললেন, ‘হ্যাঁ অফিসার৷ কী যেন জানতে চাইছিলেন অমিয়র হত্যার তদন্তের বিষয়ে? অমিয়র হত্যা তদন্তে কলকাতা পুলিশের দক্ষতায় আমরা খুবই সন্তুষ্ট৷ ধনঞ্জয় যে এমন কাজ করবে, আমরা কেউ এখনও ভাবতে পারছি না৷’
অর্জুনদা বলল, ‘ঠিক সেই ব্যাপারেই কিছু কথা জানতে চাই আপনার কাছে৷ ধনঞ্জয় মণ্ডলকে আপনি কবে থেকে চেনেন?’
একটু ভাবলেন সুনয়না চক্রবর্তী৷ তারপর বললেন, ‘সে অনেক বছর হল৷ আমাদের দল তখন ক্ষমতায় ছিল৷ রথীনদা আমাদের নেতা৷ সেই সময় ধনঞ্জয় এসেছিল দলে৷ কতই বা ওর বয়স তখন? বড়োজোর পঁচিশ ছাবিবশ হবে৷ হুগলিতে একটা জনসভায় ওর সঙ্গে প্রথম আলাপ হয়েছিল মনে আছে৷ অল্পবয়সি ছেলে, গরম রক্ত৷ একে হাঁকছে, ওকে ডাকছে৷ পার্টির জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছেলে৷ রথীনদা অমিয়কে বললেন, ছেলেটাকে ওঠা৷ অমিয়ই ধনঞ্জয়কে কলকাতায় নিয়ে এসেছিল৷ ধনঞ্জয় পার্টির জন্য অনেক করেছে৷ বলতে পারেন, পার্টির জন্য প্রাণ দিতে পারত ও৷ ওর বউ মারা গেল, ছেলে মারা গেল৷ পার্টি আঁকড়েই বেঁচে ছিল ধনঞ্জয়৷ বুকের ভিতরটা পুড়েছিল, সন্দেহ নেই৷ হয়তো মানসিকভাবেও সুস্থ ছিল না পুরোপুরি৷ নইলে ধনঞ্জয় অমিয়কে খুন করবে, এ আমার বিশ্বাস হতে চায় না৷’
‘আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন, ধনঞ্জয় মণ্ডলের কাছ থেকে একটি সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে৷ যেখানে সে ছেলের মৃত্যুর জন্য অমিয়বাবুকেই দায়ী করেছে,’ বলল অর্জুনদা৷
‘জানি৷ শুনেছি৷ খুবই দুঃখজনক ব্যাপার৷ ওর ছেলের অপারেশনের ব্যাপারটা হঠাৎই ডিসাইড হয়েছিল৷ অমিয় কিছু জানত না সেই বিষয়ে৷ ও তখন দিল্লিতে ছিল৷ অমিয় এখানে থাকলে নিশ্চয়ই সবরকম সাহায্য করত ধনঞ্জয়কে৷ কিন্তু ধনঞ্জয় ওকে বার বার ফোন করেও পায়নি৷ অমিয় সেই সময় একটা দীর্ঘ মিটিং-এ ছিল৷ অনেকের কাছেই ছোটাছুটি করেছিল ও সেই সময়ে৷ অমিয়র উপরে ও যে রাগ পুষে রেখেছিল, সেটা কল্পনাও করতে পারিনি৷’
টাপুরদি বলল, ‘আমি একটু ইন্টারাপ্ট করছি৷ একটা কথা জানার ছিল৷ অমিয়বাবুকে ফোনে না পেয়ে নিশ্চয়ই ধনঞ্জয় মণ্ডল অম্লানবাবুকে যোগাযোগ করেছিলেন, বা করার চেষ্টা করেছিলেন৷ অম্লানবাবু কি ওকে সাহায্য করেননি?’
সুনয়নাদেবী একটু ভাবলেন৷ তারপর বললেন, ‘আসলে সেই সময়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে সবাই খুব ব্যস্ত ছিল৷ অম্লানের সঙ্গে আমার সেই সময় এই বিষয়ে কোনো কথা হয়নি৷ কিন্তু ধনঞ্জয় সুইসাইড করার পর সমস্ত ঘটনা জানতে পেরে আমি অম্লানকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম৷ ও বলেছিল, ও এই বিষয়ে কিছু জানত না৷ আসলে এ বাড়িতে সকলেই খুব ব্যস্ত থাকে৷ এই নিয়ে আর কথা হয়নি৷’
‘আচ্ছা, অমিয়বাবু কি সিগার খেতেন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি, ‘নিশ্চয়ই শুনেছেন যে অকুস্থলে একটি সিগারের বক্স পাওয়া গেছে?’
‘না, আগে একসময় খুব ধূমপান করত অমিয়৷ তবে গত দুই বছর ধরে ডাক্তারের পরামর্শে ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল৷ ওই সিগারের বাক্সটার ব্যাপারে শুনেছি৷ তবে সেটা কার আমি বলতে পারব না৷’ সুনয়নাদেবী বললেন৷
‘ধন্যবাদ,’ বলল টাপুরদি, ‘আরেকটা কথা জানার ছিল, যদিও এই কেসের সঙ্গে রিলেটেড নয়৷ যদি আপনার আপত্তি না থাকে, তবেই উত্তর দেবেন৷’
সুনয়নাদেবী ভুরু কুঁচকে তাকালেন টাপুরদির দিকে৷ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘অনামিকা রায় নামের কোনো মহিলাকে চিনতেন আপনি?’
আমি আর অর্জুনদা রীতিমতো চমকে তাকালাম টাপুরদির দিকে৷ টাপুরদির দুঃসাহস দেখে আমরা দুজনেই স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম৷ সুনয়নাদেবীর কোঁচকানো ভুরু আরেকটু বেশি কোঁচকাল৷ তারপর বললেন, ‘কে অনামিকা রায়? আমি ঠিক মনে করতে পারছি না৷ পার্টির কেউ?’
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগে দরজা অবধি গিয়ে একবার পেছন ফিরে দেখলাম, সুনয়নাদেবী টাপুরদির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন৷

‘রেখাদেবীর বাড়িতে পাওয়া ফিঙ্গারপ্রিন্টস ম্যাচ করে যাওয়ায় থানায় তুলে এনেছিল লোকগুলোকে৷ সব ক’টা আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে গেছিল৷ গর্তের ভিতর থেকে ঘাড় ধরে টেনে আনতে হয়েছে৷’ বলল অর্জুনদা, ‘এরা সব পুরোনো পাপী৷ আইন আদালতের আটঘাট জানে৷ থার্ড ডিগ্রি গিলে নেয় মুখ বুজে৷ জানে এদের জন্য হিউম্যান রাইটস আছে, পলিটিক্যাল পার্টিগুলো আছে৷ এদের মাথার উপর যারা আছে, তারা বড়ো বড়ো উকিল লাগিয়ে ছাড়িয়ে নেবে এদের৷ বলছে, ডাকাতি করতে গিয়ে ভুল করে খুন করেছে৷ মারতে চায়নি৷ অলরেডি উকিল এসে গেছে থানায়, জামাইআদর করে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে৷ তবে আমার ধারণা, রেখাদেবীকে সত্যিই মারতে যায়নি ওরা৷ শুধু রেখাদেবীকে কেন, তন্ময়কেও হয়তো মারার প্ল্যান ছিল না৷ মোস্ট প্রোব্যাবলি, তন্ময়কে ধরে নিয়ে যাওয়ার প্ল্যান ছিল৷ রেখাদেবী সামনে বাঘিনির মতো রুখে দাঁড়ানোয় তাঁকে সরাতে গিয়ে অতি উৎসাহের বশে চাকু চালিয়ে দিয়েছে৷ সেই ফাঁকে তন্ময় পালিয়েছে৷’
‘সে তো বুঝলাম৷ কিন্তু ওদের অ্যাপয়েন্ট কে করেছিল?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷
‘সেটাই তো বলেনি৷ সেইজন্যই তো ডাকাতির গল্প বানাচ্ছে৷’
‘কোর্টে কবে তুলছ ওদের?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷
‘কাল৷ জামিন যাতে না পায়, তার জন্য গুছিয়ে চার্জশিট বানানো চলছে৷ সহজে ছাড়া পাবে না৷ তবে একটা কথা৷ এদের ইতিহাস ঘেঁটে দেখলাম, এরা সকলেই বিভিন্ন সময়ে পলিটিক্যাল ছত্রছায়ায় থেকেছে৷’
‘কোন পার্টি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷
অর্জুনদা হাসল৷ তারপর উদাস কণ্ঠে বলল, ‘এরা সব ভাড়ার টাট্টু৷ এরা সব রঙের জন্যই অস্ত্র ধরে৷ যখন যে ক্ষমতায় আসুক, যতই গদির রং বদলায়, এদের মুখগুলো কিন্তু একই থাকে৷ আসলে কী জানো টাপুর, এরা সব ক’টা সৈনিক৷ দলের নেতারা সব নিরাপদ থাকে৷ তারা আইন নিজের হাতে নেয় না৷ তাদের হয়ে খুচরো পাপগুলো এই লোকগুলো করে৷ উপরতলায় নিরাপদ দূরত্বে বসে থাকা লোকেরা একটু চুকচুক করে এদের পিঠ থাবড়ে দেয়, এরা ল্যাজ দোলায়, নিজেদের রাজা ভাবে৷ তারপর একদিন নিজেদের মধ্যে লড়াই করে, অথবা পুলিশের গুলিতে মরে৷ ওদের মাথায় হাত রাখা লোকগুলো কিন্তু তখন আর এদের চিনতে পারে না৷ এরা কারও নাম বলবে না৷ সেটুকু দায়বদ্ধতা এদের আছে৷ কিন্তু উপরের লোকগুলো বেকায়দায় পড়লে কিন্তু সবার আগে এদেরই ফাঁসাবে৷ আসলে এরা মরার জন্যই জন্মায় টাপুর৷ মাঝের সময়টুকু এরা রাজা৷’
অবাক হয়ে তাকালাম অর্জুনদার দিকে৷ অর্জুনদা এমন গভীরভাবেও ভাবতে পারে, জানা ছিল না৷ টাপুরদির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, নরম চোখে তাকিয়ে আছে অর্জুনদার মুখের দিকে৷ তারপর চোখের পাতা নামিয়ে নিল৷ চোখের পাতায় ভালোবাসার ছায়া বড়ো সহজেই পড়ে, লুকোনো যায় না৷ মনে মনে হাসলাম আমি৷ যতই অভিমান জমুক মনে, সেসব বড়ো ঠুনকো৷ ভালোবাসার শক্তি অনেক বেশি৷ বরফ গলছে৷
আমি বললাম, ‘আচ্ছা, আজ সুনয়নাদেবীকে কেমন লাগল তোমার টাপুরদি?’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন