ষষ্ঠ অধ্যায়

সোমজা দাস

‘হ্যাঁ, আমি প্রথমে খেয়াল করিনি৷ পরে দেখলাম, রিদ্ধিমা বার বার আড়চোখে ক্যাফের কাচের দেওয়াল দিয়ে বাইরের দিকে তাকাচ্ছে৷ চোখে-মুখে অস্বস্তি৷ তখনই দেখলাম৷ রিদ্ধিমা বেরিয়ে ক্যাব ধরতেই গাড়িটাও ওকে ফলো করল,’ চিন্তিত মুখে বলল টাপুরদি৷

‘মাই গড৷ ব্যাপারটা যথেষ্ট সিরিয়াস তাহলে৷ কেউ রিদ্ধিমাকে কন্সট্যান্ট ফলো করছে, এবং রিদ্ধিমা সেটা জানে৷ বাই দ্য ওয়ে, গাড়ির নম্বরটা দেখেছিলে তুমি?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

টাপুরদি বিমর্ষমুখে বলল, ‘সেটাই তো দেখতে পেলাম না৷’

আমরা ক্যাফেতেই বসে বসে কথা বলছিলাম৷ রিদ্ধিমা উঠে গেছে মিনিট পাঁচেক আগে৷ লক্ষ করছিলাম, খুব যেন ব্যস্ত ও৷ কথা বলাতেও অনীহা৷ যেন উঠতে পারলে বেঁচে যায়৷ টাপুরদি কথা বাড়ায়নি আর৷ বিল মিটিয়ে উঠে পড়লাম৷

‘বললাম এই কালো গাড়ির খবর কোত্থেকে পাওয়া যাবে এখন?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘দেখি৷ অর্জুনকে মেসেজ করলাম৷ আমাদের সন্দেহভাজনদের তালিকায় কারও কালো এসইউভি আছে কি না দেখতে হবে৷

আমি বললাম, ‘দেখলে তো, অর্জুনদা কত সাহায্য করে তোমায়৷ আর তুমি খালি ঝগড়া করো অর্জুনদার সঙ্গে৷’

‘তবে রে? আমি ঝগড়া করি? আর ও কিছু করে না?’ ছদ্ম রাগ দেখিয়ে বলল টাপুরদি৷

‘যাক, আর কথা নাই বা বাড়ালাম,’ বলে হাসলাম আমি, ‘এবার বলো, নেক্সট কোথায়?’

ফোন বাজছে টাপুরদির৷ অর্জুনদার ফোন৷ ফোন কানে নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ বলো৷’

বার কয়েক হুঁ-হাঁ করে বলল, ‘এখানেই ছিল৷ সম্ভবত রিদ্ধিমাকে ফলো করছে৷’

এর পরে আবার হুঁ-হাঁ৷

‘ঠিক আছে৷ আর হ্যাঁ শোনো, আরেকটা কাজ করতে হবে তোমায়৷ অনিমেষবাবু, মানে অম্লানবাবুর শ্বশুরের ব্যাঙ্ক ডিটেলসের খোঁজ নাও প্লিজ৷ ধনঞ্জয়ের ছেলে যখন মারা যায়, সেই সময় দিয়ে কোনো বড়ো অ্যামাউন্ট ট্রান্সফার বা উইথড্র হয়েছে কি না একটু দেখো,’ বলে ফোন রাখল টাপুরদি৷

‘কী হল?’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম৷

‘অর্জুন বলল, অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর আগের রাতে কেউ একজন ধনঞ্জয় মণ্ডলকে একটা ফ্লাস্ক দিয়েছিল৷ সে কালো এসইউভি করে এসেছিল৷ প্রত্যক্ষদর্শী আছে, যদিও সে গাড়ির ভিতরের লোকটিকে দেখেনি৷’

ক্যাফের বাইরে আবার এগোতে যাব, টাপুরদির ফোনটা আবার বেজে উঠল৷ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে টাপুরদির ঠোঁটের কোণে স্মিতহাসি ফুটে উঠল৷ মিনিটখানেক ফোনে কথা বলে ফোন রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই তো অফিস যাবি!’

‘হ্যাঁ গো, আজ যেতেই হবে৷ জরুরি মিটিং আছে৷ না গেলেই নয়৷ ফিরতে রাত হবে আমার৷ অর্জুনদা আর কিছু বলল?’

‘হুম৷ বলছে, অমিয়বাবুর মৃত্যুর দিন সন্ধে নাগাদ বিনয় বোসের গাড়ি আবার ফিরে এসেছিল পার্টি অফিসের সামনে৷ বিনয়বাবু গাড়ি থেকে নেমে ভিতরে যান৷ পাঁচ মিনিট পরে বেরিয়ে আবার গাড়িতে উঠে চলে যান,’ বলল টাপুরদি৷

‘সে কী? এটা কীভাবে জানা গেল?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘পার্টি অফিস থেকে কিছু দূরে একটা সুপারস্টোর আছে৷ তার গেটের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে দেখা গেছে বলল অর্জুন৷’

‘মাই গড! তাহলে কি বিনয় বোসই...?’

‘জানি না রে৷ কী করে বলি৷ আজ অর্জুন এখন দেখা করতে যাচ্ছে বিনয় বোসের সঙ্গে৷ ওর কথা হলে জানতে পারব,’ একটু চিন্তিত মুখে বলল টাপুরদি৷

‘তুমি যাবে?’ জানতে চাইলাম আমি৷

‘নাহ, আমি অন্য এক জায়গায় যাব এখন,’ টাপুরদি বলল৷

‘কোথায় যাবে?’

‘মৃণালবাবুর বাড়ি,’ বলল টাপুরদি, ‘ফোন করেছিলেন তিনি৷ দেখা করতে চান৷’

‘কেন? কিছু বললেন?’

‘না৷ বললেন, আমরা সেদিন আসার পর থেকে তিনি পুরোনো দিনগুলির কথা ভাবছিলেন৷ কিছু কথা মনে হয়েছে আমাদের জানানো দরকার৷ তাই ডাকলেন,’ বলল টাপুরদি৷

‘ইশ, আমি থাকতে পারব না৷ রাতে এসে সব শুনব,’ মন খারাপ করে আমি বললাম৷

‘আমি তোকে অফিসে ড্রপ করে তারপর যাচ্ছি,’ টাপুরদি বলল৷

‘না না, আমি ক্যাব নিয়ে চলে যাব৷ তুমি দেরি কোরো না, তাড়াতাড়ি যাও,’ আমি বললাম৷

সারাদিন অফিসে কাজে মন বসল না৷ বিকেল নাগাদ টাপুরদিকে ফোন করলাম দু’বার৷ টাপুরদি ফোন ধরল না৷ সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ টাপুরদির ফোন এল৷

‘হ্যাঁ, বলো৷ কী ব্যাপার? কী বললেন মৃণালবাবু?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘সেসব পরে হবে৷ তুই কখন ফিরবি?’

‘কেন বলো তো? একটু দেরি হতে পারে,’ বললাম আমি৷

‘সুনয়না চক্রবর্তী দেখা করতে ডেকেছেন,’ ফোনের ওপার থেকে বলল টাপুরদি৷

‘বলো কী? সুনয়না চক্রবর্তী? কেন? সকালে মৃণাল দত্ত, রাতে সুনয়না চক্রবর্তী, সকলে ডাকাডাকি করছে কেন?’ আমি প্রশ্ন করলাম৷

‘বললেন, সেদিন ভালো করে আলাপ হয়নি আমাদের সঙ্গে৷ আমাদের সঙ্গে আলাপ করতে চাইছেন,’ বলে হাসল টাপুরদি৷

‘অ্যাঁ, সে আবার কী?’

‘আরেকটা খবর দিই তোকে৷ তিনটে কালো এসইউভির খবর পাওয়া গেছে৷ একটা সুবিনয় মুখার্জির নিজস্ব গাড়ি৷ দ্বিতীয়টা অমিয়বাবুর পার্টি অফিসের৷ গাড়িটা যার নামে রেজিস্টারড সেই শ্যামল ঘোষ অমিয়বাবুর পার্টির লোক ছিলেন৷ এখন আর রাজনীতি করেন না৷ গাড়ির রেজিস্ট্রেশন তাঁর নামে থাকলেও গাড়িটা পার্টির টাকায় কেনা, পার্টির কাজেই ব্যবহার হয়৷ এ-রকম আরও কয়েকটা গাড়ি আছে যেগুলি পার্টি অফিসের নিজস্ব গাড়ি৷ আর আরেকটা কালো এসইউভির খবর পাওয়া গেছে, সেটা বিনয় বোসের স্ত্রীর নামে রেজিস্টারড৷ এ ছাড়াও সনাতন বিশ্বাসের বিশ্বস্ত অনুগামী বিধায়ক দিনেশ হাজরার একটা কালো এসইউভি আছে৷’

‘রহস্য সমাধানের তো কোনো লক্ষণই দেখছি না৷ বরং যতদিন যাচ্ছে, আরও যেন জটিল হয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা,’ বললাম আমি৷

‘হুম,’ টাপুরদি বলল, ‘আমি ন’টা নাগাদ বেরোব৷ তুই তার আগে বাড়ি আসতে পারবি?’

‘চেষ্টা করছি,’ বললাম আমি৷

‘অমিয় চক্রবর্তী যেদিন মারা যান, সেদিন আপনি গিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে?’ কলকাতা পুলিশের ডিসিডিডি সৌরভ সান্যাল জিজ্ঞাসা করলেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী বিনয় বোসকে৷ বিনয় বোসের মতো নেতা ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করার দায়িত্বটা ডিসিডিডি নিজেই নিয়েছেন৷ অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আজ তিনি এসেছেন বিনয় বোসের বাসভবনে৷ সঙ্গে আছেন অফিসার অর্জুন রায়৷

‘হ্যাঁ, গিয়েছিলাম৷ সে তো আমি আগেই জানিয়েছি,’ বললেন বিনয় বোস, ‘তা অমিয়র খুনের কেসটা তো মিটে গেছে বলে শুনেছি৷ আবার কী হল?’

‘সেরকম কিছু নয়,’ বললেন সৌরভ সান্যাল, ‘কেস ক্লোজ করার আগে একটু নিশ্চিত হয়ে নেওয়া, এই যা৷’

‘অ, তা কী জানতে চান বলুন,’ জিজ্ঞাসা করলেন বিনয় বোস৷

‘আপনি সেদিন ক’টা নাগাদ গেছিলেন অমিয়বাবুর সঙ্গে দেখা করতে?’

‘ওই সাড়ে চারটে-পাঁচটা হবে,’ বললেন বিনয় বোস৷

‘কী কথা হয়েছিল অমিয়বাবুর সঙ্গে?’

‘সেটার সঙ্গে আপনার কেসের কী সম্বন্ধ?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী বিনয় বোস৷

‘উত্তর দিতে অসুবিধে থাকলে দেবেন না৷ কিন্তু এটা আসলে একটা খুনের কেস কি না, বুঝতেই তো পারছেন, উত্তরটা ঠিকঠাক না দিলে কেস আরও জটিল হয়ে যাবে৷ কে যে কীভাবে কোথায় জড়িয়ে পড়ে, তখন না আপনাকে নিয়েও টানাটানি পড়ে যায়,’ নির্লিপ্ত মুখে বললেন সৌরভবাবু৷

‘আপনি কি আমাকে থ্রেট করছেন? মনে রাখবেন, গদিতে নেই বলে যে আমার হাতে একটুও ক্ষমতা নেই, তা কিন্তু নয়৷ এখনও আমি আমাদের পার্টির নেতা৷ একটা আওয়াজ দিলে লাখে লাখে অনুগামীরা আপনাকে ওই লাল বাড়ি থেকে টেনে বের করে ইউনিফর্ম ছিঁড়বে, সেটা মনে রাখবেন,’ বিনয় বোসের দৃষ্টিতে ক্রুরতা ঝিলিক দিয়ে উঠল৷

সৌরভ সান্যাল ঠান্ডা মাথার লোক৷ সৎ অফিসার বলে ডিপার্টমেন্টে তার যথেষ্ট সুনাম৷ কিন্তু এই মুহূর্তে তার চোখে অবিমিশ্র ক্রোধ দেখতে পেল অর্জুন৷ সৌরভ সান্যাল চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘সেসবই ঠিক আছে বিনয়বাবু৷ সে আপনি করতেই পারেন৷ এর আগেও করেছেন৷ এর আগেও আপনার লোকেরা অমিয় চক্রবর্তী, অম্লান চক্রবর্তীর উপর হামলার চেষ্টা করেছে৷ হলদিয়ার মিটিং-এ যাওয়ার পথে অমিয় চক্রবর্তীর গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে৷ আপনার সেইসব সো-কল্ড অনুগামীরা কিন্তু পুলিশের ডান্ডা খেয়ে স্বীকার করেছে যে সেসব তারা আপনার আদেশেই করেছে৷ এখন যখন বিরোধী দল ক্ষমতায়, তখন সেইসব ফাইল আবার খোলা হতেই পারে৷’

বিনয় বোসের চোখে ভয়ের ছায়া দেখা গেল না বিন্দুমাত্র৷ হেসে বললেন, ‘আরে অফিসার, এর নাম রাজনীতি৷ আমার এখন বয়স তিয়াত্তর৷ পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে রাজনীতি করছি৷ বিনয় বোস আপনার এসব ধমকিতে ভয় পায় না৷ আপনি এর থেকে যত দূরে থাকবেন, ভালো থাকবেন৷ যাই হোক, কী জানতে এসেছিলেন বলুন৷’

‘হুম, সোজাসুজি কাজের কথায় যাওয়াই ভালো,’ বললেন সৌরভ সান্যাল, ‘অমিয় চক্রবর্তী যেদিন খুন হন, সেদিন আপনি পাঁচটা নাগাদ তাঁর অফিসে গেছিলেন৷ তার সাক্ষী অনেক আছে৷ কিন্তু সেদিন আপনি একবার নয়, দুইবার গেছিলেন ওই অফিসে৷ দ্বিতীয়বার গেছিলেন ছ’টা বেজে পঞ্চাশ মিনিটে৷ তখন অফিসে অমিয়বাবু ছাড়া আর কেউ ছিল না৷’

বিনয় বোস একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সৌরভবাবুর দিকে৷ তারপর বললেন, ‘হ্যাঁ গিয়েছিলাম৷ তাতে কী প্রমাণ হল?’

‘এখনও কিছু প্রমাণ হয়নি৷ কিন্তু হতে কতক্ষণ? জানেন বোধ হয়, পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট অনুসারে অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর সময় সন্ধে সাড়ে ছ’টা থেকে রাত সাড়ে ন’টার মধ্যে?’

বিনয় বোস একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘জানি৷’

‘এর আগে আপনাকে যতবার ইন্টারোগেট করা হয়েছে, আপনি একবারও বলেননি দ্বিতীয়বার যাওয়ার ব্যাপারটা৷ কেন বিনয়বাবু?’

‘আমি আমার সিগারের বাক্সটা ফেলে এসেছিলাম অমিয়র অফিসে৷ সেটাই ফেরত নিতে গেছিলাম পরে,’ বললেন বিনয়বাবু৷

নড়েচড়ে বসলেন সৌরভ সান্যাল৷ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তা দেখা হয়েছিল অমিয়বাবুর সঙ্গে?’

দুই পাশে মাথা নাড়লেন বিনয় বোস৷ বললেন, ‘সেদিন দ্বিতীয়বার অফিসে পৌঁছে দেখি, অফিস কেমন খাঁ-খাঁ করছে৷ সরকারি সিকিউরিটি টিমের কাউকে দেখলাম না৷ কাউকে দিয়ে যে ভিতরে খবর পাঠাব, সেরকম কেউ ছিল না৷ আমি নিজেই ভিতরে ঢুকি৷ অমিয়র কেবিনের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল৷ অনেকক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করেও কারও সাড়া পাওয়া যায়নি৷ বাধ্য হয়ে ফিরে আসি আমি৷’

‘এই কথাগুলো আপনার পুলিশকে জানানো উচিত ছিল আগেই,’ বললেন সৌরভ সান্যাল৷

‘শুধুমুধু ঝামেলায় জড়াতে চাইনি আমি,’ বললেন বিনয় বোস৷

‘ঝামেলায় তো আপনি ইচ্ছেয় হোক বা অনিচ্ছেয় হোক, জড়িয়েই গেছেন৷ আপনি যে সেদিন দ্বিতীয়বার অমিয়বাবুর অফিসে গেছিলেন, তার প্রমাণ পুলিশের কাছে আছে৷ শহর ছেড়ে কোথাও যাবেন না৷ আর হ্যাঁ, আপনার দলের লোকেদের বলবেন, পুলিশের ইউনিফর্মে হাত পড়লে তাদের গায়ের চামড়া টেনে ছিঁড়তে পুলিশ বিন্দুমাত্র দয়ামায়া দেখাবে না৷’

আমাদের গাড়ি সুনয়নাদেবীর বাড়ির সামনে পৌঁছোল যখন, ঘড়িতে রাত সাড়ে ন’টা বাজে৷ গেটে একজন নিরাপত্তারক্ষী উপস্থিত, চেয়ারে বসে এফএম-এ ফিল্মি গান শুনছে৷ তাকে আইডি কার্ড দেখিয়ে ভিতরে ঢুকতে পেলাম৷ এই বাড়িতে জেড ক্যাটাগরির সিকিউরিটি থাকার কথা৷ কিন্তু খুব বেশি লোক গেটে অন্তত চোখে পড়ল না৷ বসার ঘরে ঢুকে আমি সোফায় বসলাম৷ টাপুরদি সোজা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল দেয়ালে লাগানো ছবিগুলোর সামনে৷ খুব মন দিয়ে ছবিগুলো দেখতে লাগল ঘুরে ঘুরে৷ এমন সময় উলটোদিক থেকে পরদা সরিয়ে মনোময়বাবু এসে ঢুকলেন ঘরে৷ আমাদের দেখে গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আপনারা এসে গেছেন? বসুন৷ ম্যাডাম আসছেন একটু পরে৷’

আমরা বসে আছি, মনোময়বাবুও বুকের কাছে দুই হাত বদ্ধ করে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন পাথরের মতো গম্ভীর মুখে৷ পরিস্থিতিটা খুবই বিরক্তিকর, মনোময়বাবুর অভিব্যক্তিটাও তাই৷ এভাবে কেউ মুখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে নিজেদের মধ্যে কথা বলাও মুশকিল৷ মা-ছেলের সংসার, সারা বাড়িতে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে৷ কিছুক্ষণ অস্বস্তিকর নীরবতা নিয়ে বসে রইলাম৷ ঘরের চারদিকে চোখ বোলানো ছাড়া কোনো কাজ নেই৷ আগের দিন সকালে এসেছিলাম, তখন দিনের আলোয় ঘরে তবু বুঝি কিছুটা প্রাণের স্পন্দন ছিল৷ আজ রাতের বৈদ্যুতিন আলো এ ঘরের দীর্ঘশ্বাস, বুক চাপা বেদনা যেন মুছে দিতে পারছে না৷

কিছুক্ষণ এভাবেই গেল৷ খুব রাগ হচ্ছিল, ছুটতে ছুটতে অফিস থেকে এসে ফ্রেশ হওয়ারও সময় পাইনি৷ পেটের ভিতর ইঁদুর ডন দিচ্ছে৷ ডেকে এনে এভাবে বসিয়ে রাখার মানে কী?

মিনিট বিশেক পরে পরদা সরিয়ে অম্লান চক্রবর্তী বেরিয়ে এলেন৷ শরীরী ভাষায় অসন্তাোষ স্পষ্ট৷ আমাদের দেখে থামলেন৷ বললেন, ‘আপনারা এখানে? এখন? কী ব্যাপার?’

আমরা উঠে দাঁড়ালাম দুজন৷ হাতজোড় করে নমস্কার করলাম৷ অম্লানবাবু রীতিমতো ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন, ‘এত রাতে কেন এসেছেন এখানে? এটা কি কারও বাড়িতে আসার সময়? কী দরকার বলুন?’

‘ওদের আমি আসতে বলেছি,’ পেছন থেকে বলতে বলতে সুনয়নাদেবী ঘরে ঢুকলেন৷

‘তুমি? কেন? এঁদের সঙ্গে তোমার কী দরকার মা?’ অম্লানবাবু অসন্তুষ্ট স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন৷

‘কিছু না রে৷ একটু গল্পগুজব করব৷ তুই যা না যেখানে যাচ্ছিলি,’ বললেন সুনয়নাদেবী৷

‘মা, এটা কারও সঙ্গে গল্পগুজব করার সময়? প্লিজ, এসব বন্ধ করো৷ আর ভালো লাগছে না আমার৷ না না, আপনারা এখন যান৷ কাল সকালে আসবেন না হয়,’ অম্লানবাবু বললেন৷

‘আ হা, তুই যা না৷ তোর দেরি হচ্ছে৷ তুই তো সারাদিন কাজে কাজে বাইরেই থাকিস৷ আমার একা একা সময় কাটতে চায় না৷ নাতনিটা থাকলে তবু গল্পগুজব করে সময় কেটে যেত৷ যাক গে৷ তুই অত মাথা গরম করিস না, যা তো এখন,’ বললেন সুনয়নাদেবী৷

অম্লানবাবু একবার আমাদের দিকে একবার সুনয়নাদেবীর দিকে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকালেন৷ মনে হল, মা ও ছেলেতে চোখে চোখে কিছু কথা হল৷ মনোময়বাবু এগিয়ে এসে বললেন, ‘চলুন, দেরি হয়ে যাচ্ছে৷’

অম্লানবাবু আর কোনো কথা না বলে গটগট করে পা ফেলে বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে৷ সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সুনয়নাদেবী৷ তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘চলো তোমরা, উপরে বসে কথা বলা যাক৷’

সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম আমরা৷ সুনয়নাদেবী বললেন, ‘চলো বরং ব্যালকনিতে বসি৷ এই ব্যালকনিটা দক্ষিণমুখী৷ ভালো হাওয়া আসে৷ যা প্যাচপ্যাচে গরম পড়েছে৷’

আমরা কিছু না বলে ব্যালকনির দিকে এগোলাম৷ আগের দিনের সুনয়নাদেবীর সঙ্গে আজকের মানুষটির যেন অনেকটা পার্থক্য৷ দিনের আলো ফুরোনোর সঙ্গে সঙ্গে যেন ক্ষমতার খোলস ছেড়ে ভিতরের মানুষটি বেরিয়ে এসেছেন৷ আজ অম্লানবাবু যেভাবে কথা বলছিলেন সুনয়নাদেবীর সঙ্গে, আমার সত্যিই খারাপ লাগছিল খুব৷ বয়স হলে মানুষ বুঝি বা নিজের সন্তানের কাছেও বাতিলের পর্যায়ে পড়ে যায়৷ সদ্য স্বামী হারিয়েছেন তিনি৷ মায়ের প্রতি অম্লানবাবুর ব্যবহার দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল৷

ব্যালকনিটা বেশ চওড়া৷ একটা বেতের সোফা আর দুটো চেয়ার রাখা৷ মাঝে একটা বেতের গোল কফি টেবল৷ মাঝখানে গোলাকৃতি একটা কাচ বসানো৷ তার উপর একটা পানমশলার কৌটো আর একটা বই খোলা অবস্থায় উলটো করে রাখা দেখলাম৷ বোধ হয় সুনয়নাদেবী পড়ছিলেন৷ তারপর ওভাবে রেখে উঠে এসেছেন৷ ইংরেজি বই, নাম ‘দাস ক্যাপিটাল’৷ বইটি সম্পর্কে জানা আছে আমার, যদিও পড়া হয়নি৷ কার্ল মার্ক্সের লেখা এই বইয়ে তিনি রাজনীতি, অর্থনীতি ও দুইয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন৷

টাপুরদি বইটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করছিল, ‘দাস ক্যাপিটাল?’

সুনয়নাদেবী টেবিলের উপর রাখা কৌটো থেকে পানমশলা বের করে মুখে পুরলেন৷ বেশ উগ্র কস্তুরীর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল৷ বইটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, কী আর করব? সারাদিন বই পড়েই সময় কাটে আর কী৷ তুমি পড়েছ বইটা?’

টাপুরদি বলল, ‘পড়েছিলাম৷ যদিও অনেক বছর আগে৷ কলেজ জীবনে একটু রাজনীতি বোঝার শখ হয়েছিল৷ তখন একটু পড়াশোনা করেছিলাম, যদিও খুব বেশি নয়৷’

সুনয়নাদেবী আমাদের সোফায় বসতে ইশারা করলেন, নিজে বসলেন একটা বেতের চেয়ারে৷ বললেন, ‘খুব ভালো৷ রাজনীতি বুঝতে গেলে পড়াশোনা করতে হয়৷ এই পৃথিবীতে কত রকম ইজম, কত মতবাদ, কতরকম রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ৷ আজ আমি ‘দাস ক্যাপিটাল’ পড়ছি৷ আগেও বহুবার পড়েছি৷ গতকাল চরম দক্ষিণপন্থী আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে পড়ছিলাম৷ ডান বাম সবরকম রাজনৈতিক মতবাদ সম্পর্কে পড়াশোনা করেছি৷ রাজনীতিটা শুধু ক্ষমতার জন্য করিনি৷ রাজনীতি বুঝে, ভালোবেসে রাজনীতিতে এসেছি৷ অথচ আজকাল ছেলে-মেয়েরা বিন্দুমাত্র পড়াশোনা না করে, সারা পৃথিবীর রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে না জেনে খুব সহজে সব পেয়ে যেতে চায়৷ তারা তো কোনো আদর্শকে ভালোবেসে রাজনীতিতে আসে না৷ তারা পার্টি করতে আসে৷ যেখানে সুবিধা পায়, দল বদলে সেখানেই যায়৷ দলের মতাদর্শ সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই৷’

টাপুরদি মুগ্ধ হয়ে শুনছিল সুনয়নাদেবীর কথা৷ এবার বলল, ‘আপনি রাজনীতি ছেড়ে দিলেন কেন?’

সুনয়নাদেবীর চোখে যেন বেদনার আভাস ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল৷

‘আমি আর অমিয় একসঙ্গে রাজনীতি শুরু করেছিলাম৷ আমি ছিলাম কলেজ ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি৷ টানা তিন বছর জিতেছি, জানো?’ সুনয়নাদেবী গর্বিত কণ্ঠে বললেন৷

‘তারপর?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘তারপর আর কী? কলেজে থাকতেই তরতর করে পলিটিক্যাল কেরিয়ারে উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলাম দুজনেই৷ কলেজ থেকে পাশ করে বেরোলাম৷ ততদিনে রাজনীতিতে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েছি৷ পড়াশোনা আর কন্টিনিউ করা হল না৷ মাস্টার্স করার ইচ্ছেটা ততদিনে মন থেকে বিদেয় নিয়েছে৷ রথীনদার যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ ছিলাম আমি আর অমিয় দুজনেই৷ যুব রাজ্য দলের সভাপতি হিসেবে আমার মনোনয়ন হল৷’

‘আর অমিয়বাবু?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

সুনয়নাদেবী এবার লাজুক হাসলেন৷ বললেন, ‘আমাদের বিয়েটা কিন্তু প্রেমের বিয়ে৷ সেই কলেজের প্রথম দিন থেকে ভালো লাগা, তারপর আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের মিল থেকে মনও জুড়ে গেল৷ একসঙ্গে দুজনে রাজনীতি করেছি৷ আমি রাজ্য যুব দলের সভাপতি মনোনীত হওয়ার পরেই অমিয় আমায় বিয়ের প্রস্তাব দেয়৷’

‘আপনি কি বিয়ের পরেই রাজনীতি ছেড়ে দিলেন?’ জানতে চাইল টাপুরদি৷

‘না৷ ঠিক তা নয়৷ কিন্তু তখনও আমার শাশুড়ি বেঁচে৷ তিনি পছন্দ করতেন না আমার রাজনীতি করা৷ বিয়ের ছয়মাসের মাথায় প্রেগন্যান্ট হলাম৷ অম্লান এল৷ ওকে নিয়ে আরও সংসারে জড়িয়ে গেলাম৷ রাজনীতি থেকে বাধ্য হয়েই সরে আসতে হল৷’

টাপুরদি বলল, ‘কিছু মনে করবেন না৷ আমি শুনেছি, আপনার রাজনৈতিক প্রতিভা অমিয়বাবুর চেয়ে অনেক বেশি ছিল৷ অনেক সম্ভাবনা ছিল আপনার মধ্যে৷ তাহলে কেন বরাবরের মতো রাজনীতি ছেড়ে দিলেন আপনি?’

‘কে বলেছে একথা? মৃণালদা, তাই না? তোমরা তো মৃণালদার কাছে গেছিলে খোঁজখবর নিতে,’ মুচকি হেসে বললেন সুনয়নাদেবী৷

টাপুরদি উত্তর দিল না৷

সুনয়নাদেবী হেসে বললেন, ‘এসব খবর চাপা থাকে না৷’

টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম৷ সুনয়নাদেবী তার মানে আমাদের সব গতিবিধি জানেন৷ টাপুরদির মুখের রেখা অভিব্যক্তিহীন৷

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘তবে মৃণালদা ভালোমানুষ৷ অমিয়র উত্থানে ওঁর পলিটিক্যাল কেরিয়ারটা নষ্ট হয়ে গেল৷ কী আর বলব? মৃণালদা খুব আবেগপ্রবণ মানুষ৷ অত আবেগ দিয়ে রাজনীতি হয় না৷ অমিয়ও ওঁর সঙ্গে কখনো সম্মুখ সংঘাতে যায়নি, বরং শ্রদ্ধাই করত ও মৃণালদাকে৷ আমিও করতাম৷ তবু অভিমান করে রাজনীতি ছেড়ে দিলেন৷’

‘কী করে জানলেন মৃণালবাবু অভিমান করে রাজনীতি ছেড়েছেন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘সব কি বলে দিতে হয়? যোগাযোগ রাখেননি আমাদের সঙ্গে অনেকদিন৷ তারপর যখন সুপর্ণার ছেলেটা অসুস্থ হল, একদিন পার্টি অফিসে এসেছিলেন মৃণালদা৷ নাতির রক্ত বদলাতে হত, অনেক টাকার ব্যাপার৷ অমিয়র কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন৷ অমিয় মেডিক্যাল কলেজে ব্যবস্থা করেও দিয়েছিল৷ কিন্তু তাতে বোধ হয় মৃণালদা খুশি হতে পারেননি৷ হয়তো তিনি আর্থিক সাহায্য আশা করেছিলেন৷ ভদ্র মানুষ তো, মুখ ফুটে চাইতে পারেননি৷ তবে এরপর থেকে আর যোগাযোগ রাখেননি আমাদের সঙ্গে৷

টাপুরদি প্রসঙ্গ বদলে বলল, ‘আপনার রাজনীতি ছাড়ার ব্যাপারে কি অমিয়বাবুর তরফে কোনো চাপ ছিল?’

সুনয়নাদেবী চুপ করে তাকিয়ে রইলেন টাপুরদির মুখের দিকে৷ তারপর মৃদু হাসলেন৷ বললেন, ‘তুমি খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে৷ সব মেয়েদের জীবনেই বোধ হয় এমন একটা বাঁক আসে, যখন নিজের জীবন সম্পর্কে একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়৷ ইচ্ছে থাক বা না থাক, কিছু ছাড়তে হয়৷ আমিও ছেড়েছি৷’

‘সেজন্য কোনো দুঃখ নেই আপনার?’ টাপুরদির জিজ্ঞাসা৷

সুনয়নাদেবী মিষ্টি করে হাসলেন৷ উত্তর দিলেন না কিছু৷ একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘ভালোবাসার মানুষটার জন্য সব ছাড়া যায়, বুঝলে মেয়ে? ভালোবেসেছ কখনো কাউকে? অমিয় আমায় খুব একা করে চলে গেল৷’

তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘যাই, হোক, তোমরা মৌয়ের সঙ্গে দেখা করেছ শুনেছি৷ আজ তোমাদের সেইজন্যই ডাকা৷ একটা অনুরোধ আছে তোমাদের কাছে, মৌকে এসবের মধ্যে জড়িয়ো না৷ ও বাচ্চা মেয়ে৷ এসব জটিলতার কিছু বোঝে না ও৷’

টাপুরদি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল৷

সুনয়নাদেবী চুপচাপ বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ৷ মনে হল, গভীরভাবে কিছু যেন ভাবছেন৷ তারপর হঠাৎ যেন চটকা ভেঙে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা, অনেক রাত হল৷ তোমরা এসো এখন৷’

সিঁড়ি দিয়ে নেমে বসার ঘরের দরজা দিয়ে বাইরে বেরোলাম৷ শুনতে পেলাম সুনয়নাদেবী উপরে ব্যালকনিতে বসে আত্মমগ্ন হয়ে গাইছেন, ‘তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়৷’ আমার জানি না কেন মনে হল, সেই গানের সুর যেন সব হারানোর হাহাকার তাঁর চার দেয়ালের ব্যর্থ জীবনে মাথা কুটে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে৷

কলকাতার বুকে মধ্যরাত আসে অপ্সরার সাজে৷ মহানগর ঘুমোয় না কখনো৷ রাত বাড়ে, নির্জনতার মাঝে তিলোত্তমার মোহিনী রূপ আবেশ ছড়ায়৷ কোলাহল স্থিমিত হয়ে আসে৷ সারাদিনের কর্মচঞ্চল শহর তখন যেন রাতের বাসরসাজে স্থিতা প্রেয়সী৷

মা ফ্লাইওভার দিয়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলে৷ আজ এই মুহূর্তে ড্রাইভিং সিটে আমি৷ টাপুরদি জানালার দিকে মুখ করে চুপ করে আছে৷ গাড়িতে ওঠার পর থেকে একটা কথাও বলেনি৷ ওর মনের মধ্যে যে ঝড় চলছে, সেই ঝড়কে ওকে নিজেকেই শান্ত করতে হবে৷ সব প্রশ্নের উত্তর অন্য কেউ খুঁজে দিতে পারে না৷ নিজের মনের গহনে ডুব দিতে হয়৷ দিক, আজ বরং ভাবুক টাপুরদি৷ শুধু আজ? নাকি কাল, পরশু, আরও কত দিন কে জানে?

রাতের কলকাতার রাস্তায় ড্রাইভ করার একটা আলাদাই অনুভূতি আছে৷ এক অন্যরকম ভালো লাগা৷ পাশ দিয়ে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী ট্রাকগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে আপনমনে৷ আমি এগোই গন্তব্যের দিকে, বাড়ির উদ্দেশ্যে৷ একসময় মনে হল টাপুরদি বোধ হয় কাঁদছে৷ কী জানি, আমার ভুলও হতে পারে৷ গাড়ির ভিতর অন্ধকারে মুখের অভিব্যক্তি বোঝা যায় না৷ দীর্ঘশ্বাসের শব্দ কানে আসে না৷ তবু বললাম, ‘অর্জুনদা, অমিয় চক্রবর্তী নয় টাপুরদি৷ অর্জুনদার মতো মানুষকে ভালোবেসে কিছু ছাড়তে হবে কাউকে, এ আমি বিশ্বাস করি না৷ এতদিনেও চিনলে না মানুষটাকে?’

সকালে বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা আমার স্বভাব৷ কিন্তু আজ সকাল সাতটার আগেই উঠতে হল৷ টাপুরদি টেনে তুলল৷ বসার ঘরে টিভি চলছে৷ ঘুম চোখে হাই তুলতে তুলতে এসে টিভির সামনে দাঁড়ালাম৷ বললাম, ‘কী ব্যাপার? আবার কী হল?’

টাপুরদি টিভির দিকে আঙুল দিয়ে নির্দেশ করল৷ দেখলাম, টিভিতে একটি অল্পবয়সি মেয়ে কেঁদে কেঁদে কিছু বলছে৷ মেয়েটি আমাদের পূর্বপরিচিত৷ দুই দিন আগে সনাতন বিশ্বাসের বাড়িতে তাঁর ঘর থেকে রাতের অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে বেরোতে দেখেছি মেয়েটিকে৷ আজ টিভিতে চারপাশে ঘিরে থাকা সাংবাদিকদের সামনে সে কেঁদে কেঁদে যা বলছে, তার সারমর্ম হল সনাতন বিশ্বাসের কাছে সে তাদের জমি সংক্রান্ত একটা ব্যাপারে ফয়সালার জন্য গিয়েছিল৷ সনাতন বিশ্বাস ব্যস্ত ছিলেন বলে তাকে রাতে আসতে বলেন৷ তারপর রাতে একা অফিসঘরে মেয়েটির সম্মানহানি করেছেন সনাতন বিশ্বাস৷ মেয়েটি এখন তার বিচার চাইছে৷ পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেদিনকার দাড়িওয়ালা ফেজ টুপি পরা বৃদ্ধ৷ জানা গেল, মেয়েটির নাম অঞ্জুমা বিবি, সে এই বৃদ্ধের স্ত্রী৷

আমি আর টাপুরদি একে অপরের মুখের দিকে বিস্মিত চোখে তাকালাম৷ বললাম, ‘এসব কী টাপুরদি? মেয়েটি তো একা যায়নি৷ তাকে জোর করে কিছু করা হয়েছে বলেও সেদিন মনে হচ্ছিল না৷ বরং মনে হয়েছিল, খেলাটা শুধু একদিনের নয়৷’

সংবাদ সঞ্চালক বলছেন, ‘এবার সনাতন বিশ্বাসের পার্টি কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই দেখার বিষয়৷ দল কি একজন ধর্ষণকারীকে আশ্রয় দেবে? সেরকম হলে অমিয় চক্রবর্তীকে যে ভরসা ও বিশ্বাসের সঙ্গে জনগণ ক্ষমতায় এনেছিল, অম্লান চক্রবর্তী হয়তো সেই বিশ্বাসের জায়গাটা হারাবেন৷ চলুন দেখে নিই সনাতন বিশ্বাস নিজে এই বিষয়ে কী বলছেন?’

একজন তরুণী সাংবাদিক সনাতন বিশ্বাসের বাড়ির সামনের উঠোন দিয়ে বারান্দায় উঠছেন দেখা গেল৷ সনাতন বিশ্বাসের অফিসঘরে লোকজনকে ঠেলে ঢুকে সোজা সনাতন বিশ্বাসের মুখের সামনে মাইক ধরে বলল, ‘অঞ্জুমা বিবি আপনার নামে যে অভিযোগ এনেছেন, আপনি সে ব্যাপারে কী বলবেন?’

সনাতন বিশ্বাসের চোখ-মুখ বসে গেছে, মাথার চুল উশকোখুশকো, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি৷ হাতের ঝটকায় মাইক সরিয়ে দিয়ে গর্জন করে উঠলেন, ‘কার পারমিশন নিয়ে এই ঘরে এসেছেন?’

মেয়েটি অকুতোভয়৷ জিজ্ঞাসা করল, ‘জনগণ আপনার বক্তব্য জানতে চায়৷ অঞ্জুমা বিবির অভিযোগ কতটা সত্যি?’

সনাতন বিশ্বাস রাগে কাঁপছেন৷ চিৎকার করে বললেন, ‘যান যান, যান এখান থেকে৷ কে অঞ্জুমা বিবি? কাউকে চিনি না আমি৷ বেরোন ঘর থেকে৷’

‘চিনি না বললে তো চলবে না সনাতনবাবু! অঞ্জুমা বিবি আপনার নামে গুরুতর অভিযোগ এনেছে৷ তার অভিযোগ, আপনি কাজের অছিলায় এই বাড়িতে ডেকে তাকে ধর্ষণ করেছেন৷ আপনার কী মনে হয়, এবার দল আপনার ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেবে?’

সনাতন বিশ্বাসের মুখ-চোখ লাল হয়ে উঠেছে৷ এদিকে সাংবাদিক তরুণী প্রবল উৎসাহে মাইক এগিয়ে একের পর এক প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করে চলেছে৷ বয়স কম, উৎসাহ প্রচুর৷ সনাতন বিশ্বাস এবার সংযম হারালেন৷ প্রচণ্ড রাগে কাঁপতে কাঁপতে মেয়েটির প্রতি একটি অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করে এক ঝটকায় মাইক সরাতে গেলেন৷ ধাক্কায় মাইকটা মেয়েটির হাত থেকে ছিটকে উড়ে গিয়ে লাগল ক্যামেরাম্যানের মুখে৷ ক্যামেরা দুলে উঠল৷ পরবর্তী দৃশ্যপট সমুদ্রে প্রবল ঝঞ্ঝাবায়ের মধ্যে খড়কুটোর নৌকোর মতো দোদুল্যমান৷ ওদিকে স্টুডিয়ো থেকে সূত্র-সঞ্চালক মহাশয় চেঁচিয়ে যাচ্ছেন, ‘রেশমি, তোমরা ঠিক আছ? রেশমি? আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, কীভাবে সনাতন বিশ্বাস স্পটে আমাদের সাংবাদিক রেশমি সেন ও ক্যামেরাম্যান অভীকের উপর আক্রমণ করেছেন৷’ দোদুল্যমান ক্যামেরা স্থির হল কয়েক মুহূর্ত পরে৷ রেশমি সেন হাঁপাচ্ছে রীতিমতো৷ কতটা সত্যি, কতটা অভিনয় বোঝার উপায় নেই৷ নিজেই এগিয়ে গিয়ে ক্যামেরা হাতে নিয়ে দেখাচ্ছে, ক্যামেরাম্যান অভীকের ঠোঁট নীল হয়ে ফুলে উঠেছে৷ রেশমি সেন বলছে, ‘আমাদের দর্শকেরা নিজেরাই দেখতে পাচ্ছেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে সনাতন বিশ্বাসের ব্যবহার৷ অভীক, এই যে, এদিকে, তোমার ঠোঁটটা দেখাও, আরে ধ্যাত্তেরি, এটা জুম কীভাবে করে, যাক গে এই যে দেখুন, আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন সনাতন বিশ্বাস, যাঁর উপর অঞ্জুমা বিবি ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন, সেই জনপ্রতিনিধির সত্যিকারের চেহারা৷ এই অভীক, ক্যামেরাটা ধরো, হ্যাঁ এই যে, ক্যামেরায় অভীক বসুর সঙ্গে আমি রেশমি সেন, চ্যানেল আনন্দসংবাদ৷’

‘কী বুঝলি?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল৷

‘কেসটা কী হল?’ আমি বিস্ময়াহত৷

জোরে জোরে হেসে উঠল টাপুরদি৷ বলল, ‘যে বা যারা এর পেছনে আছে, তারা সনাতন বিশ্বাসের দুর্বলতাগুলোকে খুব ভালো করে জানে৷ তাই নির্ভুলভাবে ফাঁদ পেতেছে৷ যে স্বামী জমির সমস্যা সমাধানের জন্য মাঝরাতে স্ত্রীকে এমএলএ-এর সঙ্গে শুতে পাঠাতে পারে, সে আরও বেশি কিছুর জন্য স্ত্রীর সম্মানহানিকে জনসমক্ষে ভাঙিয়ে রোজগার করতে দ্বিধা করবে না, এ তো জানা কথাই৷ পুরো ব্যাপারটাই প্রিপ্ল্যানড৷’

‘কী সাংঘাতিক৷ কিন্তু কারা আছে এর পেছনে? বিরোধী দল?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

টাপুরদি বলল, ‘হতে পারে৷ আবার নাও হতে পারে৷ ভুলে যাস না, সনাতন বিশ্বাস অম্লান চক্রবর্তীকে ব্ল্যাকমেল করছিলেন৷ তাঁকে মন্ত্রীত্ব দেওয়া না হলে সে তাঁর অনুগামীদের নিয়ে দল ছেড়ে বিরোধী দলে যোগ দেবেন বলে ভয় দেখাচ্ছিলেন৷

‘কিন্তু অম্লান চক্রবর্তী তো রাজিও হয়েছিলেন, যদ্দূর শুনেছি,’ বললাম আমি৷

‘হয়েছিলেন হয়তো, দায়ে পড়ে৷ নইলে সনাতন বিশ্বাসের যা রেপুটেশন, তাকে গদিতে বসানোর ভুল কোনো দলই সহজে করবে বলে মনে হয় না,’ টাপুরদি বলল, ‘এবার দেখার বিষয় হল দল কী অ্যাকশন নেয়৷’

দলের তরফ থেকে ‘রিঅ্যাকশন-অ্যাকশন’ সব জানা গেল বেলা ন’টার মধ্যে৷ প্রেস কনফারেন্স ডেকে অম্লান চক্রবর্তী জানালেন, সনাতন বিশ্বাসকে দল থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে৷ তাঁর সম্পর্কে যে অভিযোগ উঠেছে, তারপর দল তাঁর সঙ্গে কোনোরকম সম্পর্ক রাখতে রাজি নয়৷ বিধায়ক হওয়ার জন্য আলাদা কোনো সুযোগ তাঁকে দেওয়া হবে না৷ পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত করে অভিযোগকারিণীর ন্যায় সুনিশ্চিত করার৷ বিরোধী দলনেতা বিনয় বোসও জানালেন, তাদের দলে সনাতন বিশ্বাসের মতো নারী নির্যাতনকারীর কোনো জায়গা নেই৷ তার ফলে দলবদলের আশাটুকুও মিলিয়ে গেল৷ অনুগামীরাও যে মুখ ফিরিয়েছে, বোঝা গেল অচিরেই৷

‘আচ্ছা টাপুরদি, তাহলে তো সনাতন বিশ্বাস আর এমএলএ থাকবেন না, না?’ ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘কেন থাকবেন না? নির্দল হিসেবে থাকতেই পারেন৷ অন্য কোনো দলেও যোগ দিতে পারেন৷ চাইলে নিজেও দল বানাতে পারেন, তবে এই মুহূর্তে যেমন পরিস্থিতি, ছোটো বড়ো কোনও নেতাই তাঁর সঙ্গে থাকবে বলে মনে হয় না,’ বলল টাপুরদি৷

‘একজন ক্রিমিনাল এমএলএ হবে?’ আমার বিস্মিত প্রশ্ন৷

‘প্রথমত আমাদের দেশের সংবিধান অনুসারে কেউ ততক্ষণ ক্রিমিনাল নয়, যতক্ষণ না আদালত তাকে দোষী ঘোষণা করছে, তা সে যতই গুরুতর অফেন্স হোক৷ এমনকী হাতেনাতে ধরা পড়লেও না৷ দ্বিতীয়ত, কারও উপর হাজারটা কেস চললেও তার ইলেকশনে দাঁড়ানো বা জনপ্রতিনিধি হওয়াতে কোনো বাধা নেই৷ এ দেশে এমন অনেক নেতা মন্ত্রী আছে যাদের উপর অনেক কেস চলছে৷ এই সনাতন বিশ্বাসের উপরেই আছে অনেক কেস ঝুলছে,’ বলল টাপুরদি৷

‘তোমার কী মনে হয় টাপুরদি? কে আছে এসবের পেছনে?’ জানতে চাইলাম আমি৷

‘তোর কী মনে হয়?’

‘অম্লান চক্রবর্তী,’ বললাম আমি৷

টাপুরদি হাসল৷ কিছু না বলে টোস্টে কামড় বসাল৷

‘মিতুল, টাপুর কোথায়?’ ফোনের ওপারে অর্জুনদা৷

‘স্নানে ঢুকেছে৷ বেরোলে তোমায় ফোন করতে বলছি,’ বললাম আমি৷

‘আমি যাচ্ছি তোমাদের ওখানে৷ রেডি হয়ে থাকো৷ একটা ব্যাপার হয়েছে৷ গিয়ে বলছি,’ বলেই অর্জুনদা ফোনটা রেখে দিল৷ আমি অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম৷ এমন অবস্থায় আর যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না৷ ভাগ্যিস আমার অফিসে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর সুবিধে আছে৷ নইলে গোয়েন্দাগিরির চক্করে পড়ে চাকরিটা কবেই যেত আমার৷

টাপুরদি বাথরুম থেকে বেরোতেই ওকে বললাম অর্জুনদার কথা৷ মুখে কিছু না বলে ঘরে ঢুকে গেল৷ কিছুক্ষণের মধ্যে দেখি সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে৷ আমায় দেখে বলল, ‘তোর অফিস?’

‘চাকরিটা ছেড়ে দেব ভাবছি,’ হেসে বললাম৷

টাপুরদিও হাসল৷ বলল, ‘অফিসে অসুবিধে না হলে চল আমার সঙ্গে৷ অনেক কাজ আজকে৷ আগে দেখি অর্জুন কী বলে৷’

অর্জুনদা এল আধ ঘণ্টার মধ্যেই৷ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘কী ব্যাপার?’

‘সুবিনয় মুখার্জি কিডন্যাপড,’ গম্ভীর মুখে বলল অর্জুনদা৷

‘হোয়াট?’ বিস্ময়ে থমকে গেলাম আমি আর টাপুরদি দুজনেই৷

‘পুরো পুলিশ ফোর্স লাগিয়ে দিয়েছেন কমিশনার সাহেব, যদিও নিউজটা এখনও অফিশিয়ালি ডিজক্লোজ করা হয়নি৷ তোমায় ডিসিডিডি ডাকছেন, আর্জেন্ট৷ আমায় বললেন, তোমায় সঙ্গে করে নিয়ে যেতে,’ অর্জুনদা বলল৷

‘চলো৷ আমি রেডি আছি৷’

দ্রুতবেগে ছুটল অর্জুনদার গাড়ি৷ আজ অর্জুনদা যেন খুব গম্ভীর, মুখটা বড়ো বেশি থমথমে৷ গাড়ির মধ্যে পিনপতন স্তব্ধতা; কেউ কোনো কথা বলছে না৷ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্যই হয়তো টাপুরদি বলল, ‘তদন্তের কত দূর অর্জুন?’

অর্জুনদা নিঃশব্দে মাথা নাড়ল৷ তারপর মৃদুস্বরে মাথা নীচু করে ভাঙা গলায় বলল, ‘হেরে গেলাম টাপুর৷ কাল কেসের রিপোর্ট জমা হবে৷ তারপর কেস ক্লোজ৷’

উলটোডাঙা পেরিয়ে কিছুটা এগোতেই দেখলাম রাস্তার পাশে জটলা৷ সকালে অফিসযাত্রীদের ভিড় রাস্তায়৷ অর্জুনদা ড্রাইভারকে বলল, ‘গাড়ি থামাও৷’

অর্জুনদার পিছে পিছে আমরা নামলাম৷ ভিড় সরিয়ে সামনে গিয়ে দেখি রাস্তার ধুলোর উপর এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলা পড়ে কাতরাচ্ছে, চিৎকার করে কাঁদছে গর্ভযন্ত্রণায়৷ প্রসব সময় আসন্ন তার৷ জরায়ুর জল ভেঙে প্রসবযন্ত্রণা শুরু হয়েছে৷ পুলিশের পোশাকে অর্জুনদাকে দেখে লোকজন সসম্ভ্রমে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে সরে দাঁড়াল৷

‘কে আছে এঁর সঙ্গে?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা৷

‘জানি না৷ কাউকে তো দেখিনি৷ এভাবেই পড়ে আছে,’ একজন বলল৷

অর্জুনদা এগিয়ে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসল মহিলার পাশে৷ জিজ্ঞাসা করল, ‘কেউ আছে আপনার সঙ্গে?’

মহিলা কথা বলার অবস্থায় নেই৷ মাথা নেড়ে ‘না’ বলল৷

অর্জুনদা দেখলাম এক মুহূর্ত দ্বিধা করল৷ তারপর নীচু হয়ে মহিলাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল৷ গাড়িতে তুলে ড্রাইভারকে বলল, ‘আগে হাসপাতাল চলো৷ কুইক৷’

পেছনের সিটে মহিলাকে শোয়ানো হয়েছে৷ আমি আর টাপুরদি যথাক্রমে পায়ের আর মাথার কাছে বসেছি৷ টাপুরদি মহিলার হাতটা শক্ত করে ধরে মাথায় হাত বোলাচ্ছে৷ আর মুখে বলছে, ‘একটুখানি ধৈর্য ধরুন৷ এক্ষুনি পৌঁছে যাব হসপিটালে৷’

মহিলা এখন বোধ হয় চিৎকার করে কাঁদার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে৷ নেতিয়ে পড়ে আছে গাড়ির সিটের উপর৷ অর্জুনদা ট্র্যাফিক কন্ট্রোলে সমানে ফোন করে যাচ্ছে পরের ট্রাফিক খোলা রাখার জন্য৷ অফিসটাইমে গ্রিন করিডর করা খুব মুশকিল৷ তবু কলকাতা পুলিশ চাইলে সব সম্ভব, আরেকবার প্রমাণিত হল৷ অল্পসময়ের মধ্যেই আমরা হসপিটালে পৌঁছোলাম৷ অর্জুনদার আদেশে সেখানে আগে থেকেই পুলিশ উপস্থিত ছিল৷ তাদের দায়িত্বে মহিলাকে দিয়ে অর্জুনদা ফিরে এল৷ টাপুরদির মুখের দিকে চেয়ে দেখলাম, অর্জুনদার মুখের দিকে কোমল দৃষ্টিতে চেয়ে মুখ নীচু করল৷ আপাত কঠিন নারীও বুঝি ভালোবাসলে নরম হয়৷ পৃথিবীতে অন্তত একজনের কাছে সকলেই বোধ হয় শক্ত থাকার দায় থেকে অব্যাহতি চায়৷ টাপুরদির মুখ ঝলমল করছে৷ টাপুরদিকে আমি চিনি৷ আজ এই মুহূর্তে আমি নিশ্চিত জানি, মেঘ কেটে গেছে৷

অর্জুনদা বলল, ‘ভদ্রমহিলার বাড়ির লোকের খোঁজ চলছে৷ আশা করি খবর পেয়ে যাব৷’

টাপুরদি নরম গলায় বলল, ‘কী খবর হয় আমায় জানিয়ো৷’

‘সংঘমিত্রা, সুবিনয় মুখার্জির ব্যাপারটা কি আপনি শুনেছেন অর্জুনের মুখে?’ জিজ্ঞাসা করলেন ডিসিডিডি সৌরভ সান্যাল৷

টাপুরদি উপর-নীচে মাথা নাড়ল৷ অর্জুনদা পাশ থেকে বলল, ‘আমি বলেছি কিছুটা৷’

সৌরভ সান্যাল বললেন, ‘বেশ, তাহলে তো ভালোই হল৷ আজ সকালে মর্নিংওয়াক করতে বেরিয়েছিলেন তিনি রোজকার মতো৷ তারপর আর বাড়ি ফেরেননি৷ বাড়ির লোক দেরি দেখে খোঁজখবর শুরু করেন৷ কিছু খবর না পেয়ে পুলিশকে জানান তাঁরা৷ ঠিক তিনদিনের মাথায় উপনির্বাচন, যেখানে সুবিনয় মুখার্জি একজন প্রার্থী৷ এই মুহূর্তে তাঁর এভাবে হারিয়ে যাওয়াটা রাজ্য রাজনীতিতে একটা বিশাল ক্রাইসিস৷ বুঝতেই পারছেন, পরিস্থিতি কতটা গুরুতর৷’

‘আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

সৌরভবাবু অর্জুনকে বললেন, ‘রজতকে পাঠিয়েছি সুবিনয়বাবুর বাড়িতে ইন্টারোগেশনের জন্য৷ অর্জুন, তোমার ব্যাপারে আমি পরে আসছি৷ আগে মিস ব্যানার্জির সঙ্গে ক’টা দরকারি কথা সেরে নিই৷’

তারপর টাপুরদির দিকে ঘুরে তাকিয়ে সৌরভবাবু বললেন, ‘সংঘমিত্রা, ব্যাপারটা খুব সিরিয়াস৷ আমি আপনাকে একটু বুঝিয়ে বলি৷ আপনি তো অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যু সংক্রান্ত জটিলতা সবই জানেন৷ অমিয়বাবু মারা গেলেন৷ তাঁর কেন্দ্র থেকে সুবিনয় মুখার্জি ভোটে দাঁড়ালেন৷ এখন তিনিও মিসিং৷ এ রকম অবস্থায় আমরা পুলিশের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব চেষ্টা করছি তাঁকে যথাসম্ভব দ্রুত খুঁজে বের করার৷’

‘আপনি বুদ্ধিমতী৷ আপনাকে নিশ্চয়ই বুঝিয়ে বলতে হবে না যে আমরা শত হলেও সরকারি কর্মচারী৷ এই ধরনের হাই প্রোফাইল পলিটিকাল কেসে আমাদের কিছু ক্ষেত্রে হাত-পা বেঁধে যায় পুরোপুরি৷ কেসের প্রতি স্টেপের মাইনিউট ডিটেইলস আমাদের উপর মহলে জানাতে হয়৷ ফলে, কেসের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের কান অবধি খবর পৌঁছে যাওয়া অসম্ভব নয়৷ অনেক স্টেপ আমরা ইচ্ছে থাকলেও নিতে পারি না৷ কারণ সেই একই৷ আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রিত হয়৷ আজ এত বছর চাকরি করার পর এসব মুখে স্বীকার করতে লজ্জা করে৷ যাই হোক, এখন আমাদের হাতে সময় খুবই কম৷ তাই আমি চাই, আপনি পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে সুবিনয় মুখার্জিকে খোঁজার কাজে যোগ দিন৷ অফিশিয়াল পারমিশনের জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই৷ সে আমি বার করে নেব৷ আপনাকে আমাদের প্রয়োজন কারণ, যা অফিশিয়ালি পুলিশ করতে পারবে না, আপনি সেটা পারবেন, এবং সবচেয়ে বড়ো কথা হল, আপনার বুদ্ধি, বিবেচনা ও ক্ষমতার উপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে৷’

এবার অর্জুনের দিকে ঘুরলেন সৌরভবাবু৷ বললেন, ‘এই কেসে তুমি ও রজত কাজ করবে৷ আপাতত বাকি সব ছেড়ে সুবিনয় মুখার্জিকে খোঁজার দিকে মন দাও৷ অমিয় চক্রবর্তীর মার্ডার কেস নিয়ে ভেবে লাভ নেই৷ ওটা ভুলে যাও আপাতত৷ এই কেসে তোমায় সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া রইল৷ পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে৷ সংঘমিত্রাকে প্রয়োজনমতো সাপোর্ট দেবে৷ ওঁদের সুরক্ষা আমাদের দায়িত্ব৷ সেরকম কোনো বিপদ দেখলে ওঁদের সেফলি সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে স্পট থেকে৷ আমায় আপডেট দিতে থাকবে৷ নাউ গেট ব্যাক টু ওয়ার্ক৷’

এবার টাপুরদি বলল, ‘স্যার, একটা পেনড্রাইভ দিয়েছিলাম অর্জুনকে৷ সেটা পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড ছিল৷ সেটা খোলা খুব দরকার৷’

‘সেই তোমার গড়িয়ার মহিলার মার্ডার কেস সংক্রান্ত, তাই না? বলেছিলে তুমি আমায় পেনড্রাইভটার কথা৷ সেটা এখনই কী দরকার? পরে ভাবা যাবে ওটা নিয়ে না হয়,’ বললেন সৌরভবাবু৷

‘দরকার স্যার,’ টাপুরদি বলল, ‘ওটা খুলতে পারলে এই কেসেরও গিঁট খুলবে৷ আপনি প্লিজ তাড়াতাড়ি ওটা ক্র্যাক করার ব্যবস্থা করুন৷’

‘আচ্ছা বেশ, আমি দেখছি৷’

আমরা তিনজনেই বেরিয়ে এলাম ডিসিডিডির ঘর ছেড়ে৷

বাইরে বেরোতেই অর্জুনদার মোবাইলে ফোন এল৷ ফোনে কথা বলা শেষ করে আমাদের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল, ‘রজতদার ফোন৷ আজ সকালে সুবিনয় মুখার্জি রোজকার মতো মর্নিংওয়াকে যান ভোর পাঁচটায়৷ অত সকালে খুব কম মর্নিংওয়াকারই থাকে রাস্তায়৷ একজন ভবঘুরে গোছের ফুটপাথবাসী বয়ান দিয়েছে যে সে একটা কালো এসইউভিকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে৷ তারপর সেটা জগার্স পার্কের দিকে চলে যায়৷ কিছুক্ষণ পরেই আবার সেই রাস্তা দিয়ে ফিরে এসে তিরের বেগে বেরিয়ে যায় সেটা৷ তবে কাউকে কিডন্যাপ করতে সে দেখেনি৷ গাড়ির নম্বরও বলতে পারেনি৷’

‘আবার সেই কালো এসিউভি?’ কপালে চোখ তুলে বলল টাপুরদি৷

‘হুম, খবর এখানেই শেষ নয়৷ আজ সকালে একটা কালো এসইউভি অতিরিক্ত বেগের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ন্যাশনাল হাইওয়েতে একটা ট্রাকে ধাক্কা দেয়৷ সিসিটিভি ক্যামেরাতে রেকর্ডেড আছে পুরো ব্যাপারটা৷ গাড়িটার সামনের দিকটা দুমড়ে গেলেও সেই অবস্থাতেই না থেমে গাড়িটা বেরিয়ে যায়৷ ভিতরে কেউ ইনজিয়োর্ড ছিল কি না বোঝা যায়নি৷ পুলিশ পোস্টে অ্যালার্ট করা হয়৷ কিছুক্ষণের মধ্যে বেশ কিছুটা দূরে হাইওয়ে থেকে নীচে নেমে আলের ধারে গাড়িটাকে লোকেট করেছে পুলিশ৷ গাড়িতে কেউ ছিল না৷’

‘বলো কী? কার গাড়ি? আইডেন্টিফাই হয়েছে?’ উত্তেজিত টাপুরদি প্রশ্ন করল৷

‘হুম,’ বলে মাথা নাড়ল অর্জুনদা৷

‘কার?’

‘পার্টি অফিসের সেই কালো এসইউভিটা,’ টাপুরদির দিকে তাকিয়ে বলল অর্জুনদা৷

টাপুরদি প্রায় লাফিয়ে উঠল৷ শূন্যে ঘুসি মেরে বলল, ‘ইয়েস৷ আমি সেটাই সন্দেহ করেছিলাম৷ আচ্ছা আমরা পুরো কেসটা সাজিয়ে নিয়ে যদি ভাবি, তাহলে কী পাচ্ছি? প্রথমে অমিয় চক্রবর্তী খুন হলেন৷ তন্ময়, যার কাছে অমিয় চক্রবর্তীর অতীতের কোনো দলিল ছিল, সে হারিয়ে গেল৷ সনাতন বিশ্বাস, যে দল থেকে অনুগামীদের নিয়ে বেরিয়ে বিরোধী দলে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন, তাঁর রাজনৈতিক জীবন মোটামুটিভাবে শেষ করে দেওয়া হল৷ শেষমেষ সুবিনয় মুখার্জি, যিনি জানতেন তন্ময়ের কাছে কী তথ্য আছে, এবং সেই তথ্যের জোরে পার্টির টিকিট পেয়ে অমিয় চক্রবর্তীর সিট থেকে ভোটে দাঁড়াচ্ছেন, তাঁকেও গায়েব করে দেওয়া হল, এখন অমিয় চক্রবর্তীর হত্যার জন্য ধনঞ্জয় মণ্ডলকে ফ্রেম করে তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, এইসবে কার সবচেয়ে বেশি লাভ?’

অর্জুনদা কিছু বলার আগেই আমি বললাম, ‘অফ কোর্স অম্লান চক্রবর্তীর৷’

‘কিন্তু একটা প্রশ্ন তাহলেও থেকেই যায় টাপুরদি৷ সুবিনয়বাবুকে কিডন্যাপ কেন করা হল? খুন করে ফেললেই তো ল্যাটা চুকে যেত,’ বললাম আমি৷

‘খুন করা অত সহজ নয় রে৷ অলরেডি কেসটা অনেকটা জট পাকিয়ে গেছে৷ যেখানে কিডন্যাপ করলেই কাজ হাসিল হতে পারে, সেখানে খুন কেন করতে যাবে৷ আমি শিয়োর, সুবিনয় মুখার্জিকে এমনভাবেই কিডন্যাপ করা হয়েছে, যাতে তিনি ছাড়া পেলেও কিডন্যাপারকে আইডেন্টিফাই করতে পারবেন না৷ স্মৃতিশক্তি কতটুকু অবশিষ্ট থাকবে তাঁর, আই রিয়েলি ডাউট৷ আর কিডন্যাপ হয়েছেন বলেই যে সুবিনয়বাবুর লাইফরিস্ক নেই, তাও জোর দিয়ে বলা যায় না,’ বলল টাপুরদি৷

আমি বললাম, ‘টাপুরদি, মনে করে দেখো, আমরা যেদিন রাতে সুনয়নাদেবীর সঙ্গে দেখা করতে গেছিলাম, সেদিন অম্লানবাবু চাইছিলেন না আমরা ওঁর সঙ্গে কথা বলি৷ মায়ের সঙ্গে খুব রূঢ়ভাবে কথা বলছিলেন৷ যেন আমাদের তাড়াতে পারলে বাঁচেন৷ হয়তো, সুনয়নাদেবী এইসব ব্যাপার কোনোভাবে জানতে পেরেছিলেন৷ সুনয়নাদেবী যে জানেন, সেটা অম্লান চক্রবর্তী জেনে ফেলেছেন৷ তাই আমাদের সঙ্গে কথা বলতে দিতে চাইছিলেন না৷ ভয় পাচ্ছিলেন যে সুনয়নাদেবী তোমায় হয়তো সব বলে দেবেন৷ আর সুনয়নাদেবীও হয়তো তোমাকে সব বলতেই ডেকেছিলেন৷ কিন্তু ছেলের হুমকিতে পরে মন পরিবর্তন করেন৷’

অর্জুনদা ও টাপুরদি দুজনেই প্রশংসাসূচক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল৷ অর্জুনদা বলল, ‘টাপুর, সুবিনয় মুখার্জি ইজ ইন হাই রিস্ক৷ তিনি এমন কিছু জেনে ফেলেছেন, যা অম্লানবাবুর পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্মানহানির কারণ হতে পারে৷ এমনকী হয়তো-বা তা দলের ভাবমূর্তির জন্যেও ক্ষতিকর হতে পারে৷ আমরা এখনও জানি না কোন ইনফর্মেশন ছিল তন্ময়ের কাছে, কিন্তু সেটা যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু তা বুঝতে অসুবিধে হয় না, যখন তন্ময়কে ধরার জন্য রেখাদেবীকে খুন করতেও পিছপা হয় না অপরাধী বা তাঁর লোকেরা৷’

‘তার মানে কি অম্লান চক্রবর্তীই কালপ্রিট?’ বললাম আমি৷

টাপুরদিকে কিছুটা অন্যমনস্ক দেখাল৷ যেন মন দিয়ে কিছু ভাবছে৷ আমাদের কথা কতটা কানে গেল কে জানে৷ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী ভাবছ টাপুরদি?’

চিন্তার ঘোর ছিঁড়ে গেল টাপুরদির৷ চটকা ভেঙে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, কী যেন বলছিলি?’

‘বলছি, যে কী ভাবছ?’

অর্জুনদার দিকে ফিরে তাকিয়ে টাপুরদি বলল, ‘কালো গাড়িটা সম্পর্কে আর কী কী খোঁজ পেয়েছ অর্জুন? কে কে ব্যবহার করে গাড়িটা?’

মাথা নাড়ল অর্জুনদা৷ বলল, ‘পার্টি অফিসের গাড়ি৷ অফিসের নীচে পার্কিং-এই থাকে৷ যার যখন দরকার পড়ে, ব্যবহার করে৷ চাবি থাকে মনোময়বাবুর কাছে৷’

‘এই মনোময়বাবুকে আমার তেমন সুবিধের মনে হয় না,’ বললাম আমি৷

অর্জুনদা বলল, ‘লোকটা অমিয়বাবুর রাজনৈতিক জীবনের একদম শুরু থেকে সঙ্গে আছেন৷ ওঁদের পরিবারের, দলের ভীষণ বিশ্বস্ত৷ রাজনীতির ব্যাপারে খুব একটা মাথা গলান না৷ কিন্তু ছায়ার মতো ওঁদের পরিবারকে প্রোটেক্ট করেন সবসময়ে৷’

‘কেন? এতে তাঁর স্বার্থটা কী?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘তা জানি না,’ মাথা নেড়ে বলল অর্জুনদা৷

‘অর্জুন, এই মনোময়বাবুর সম্পর্কে খবর নাও৷ যদিও জানি হাতে সময় খুব কম, কিন্তু লোকটা অনেক কিছু জানেন৷ ক্র্যাক করার চেষ্টা করো,’ টাপুরদি বলল৷

‘হয়তো জানেন৷ কিন্তু মনোময়বাবুকে মেরে ফেললেও মুখ খুলবেন না৷ ওই পরিবারের প্রতি সমর্পিত প্রাণ ভদ্রলোক,’ অর্জুনদা বলল৷

‘নিজে হয়তো বলবেন না৷ কিন্তু তাঁর অতীত সম্পর্কে জানে, অমিয় চক্রবর্তীর পরিবারের প্রতি তাঁর ডেডিকেশনের কারণ জানে এমন তো কেউ থাকবে নিশ্চয়ই,’ টাপুরদি চিন্তিত মুখে বলল৷

‘সেরকম লোকও পাওয়া মুশকিল৷ যতদূর শুনেছি, গত প্রায় ছয় বছর ধরে লোকটা অমিয়বাবুর বাড়িতেই থাকেন৷ নিজের কেউ আছে বলে মনে হয় না,’ অর্জুনদা বলল৷

টাপুরদি ভুরু কুঁচকে চিন্তা করল একটুক্ষণ৷ তারপর বলল, ‘একজন আছেন, যিনি বলতে পারবে হয়তো৷’

‘কে?,’ আমি আর অর্জুনদা সমস্বরে জিজ্ঞাসা করলাম৷

‘মৃণাল দত্ত,’ হাসিমুখে বলল টাপুরদি৷ তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে সিরিয়াস মুখ করে বলল, ‘সেটা আমি দেখছি কথা বলে৷ কিন্তু সময় খুব কম৷ আমাদের পরিকল্পনা মাফিক এগোতে হবে৷ এক মিনিট সময়ও নষ্ট করা যাবে না৷ যতক্ষণ না আমরা সুবিনয় মুখার্জিকে উদ্ধার করতে পারছি, প্রতিটা মুহূর্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ৷’

‘ওহ আরেকটা কথা তোমায় বলতে ভুলে গেছিলাম টাপুর৷ অনিমেষবাবুর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কোনো সাসপিশাস ট্রানজ্যাকশন বা উইথড্রয়াল পাওয়া যায়নি৷ ওঁর সার্ভিস রেকর্ড, স্বভাব সম্পর্কে সব রকম খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে৷ একদম ক্লিন৷ ধনঞ্জয়ের সঙ্গেও যোগাযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি৷ তবে তিনি যে সেদিন পার্টি অফিসে গিয়েছিলেন, সেটা ঠিক৷ ওই সুপারস্টোরের সিসিটিভি রেকর্ডিংয়ে সেটা দেখা গেছে৷’

আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে ব্যস্ত শহরের রাস্তা দিয়ে৷ ঘড়ির কাঁটায় এখন সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা ছুঁই ছুঁই৷ পুলিশের গাড়িতে চলেছি এখন৷ আমাদের আশপাশ দিয়ে পথচলতি মানুষ, গাড়িঘোড়া নিরুদবেগে চলেছে নিজ নিজ গন্তব্যে৷ অফিসফেরত ক্লান্ত জনতার ঢল নেমেছে রাস্তায়৷ তেরো ঘণ্টার বেশি হল সুবিনয়বাবু অপহৃত হয়েছেন৷ তাঁর ফোন সেই থেকে সুইচ অফ৷ তাঁর বাড়ির লোকেরা র‌্যানসম কলের অপেক্ষায় ফোনের সামনে বসে আছে দিনভর৷ তাঁরা এখনও জানেন না এই অপহরণ র‌্যানসমের জন্য করা হয়নি৷ সুবিনয়বাবুকে সুস্থ ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা পুলিশের কাছে এখন সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ৷ এখনও মিডিয়া জানে না কিছু৷ আজই সকালে সনাতন বিশ্বাসের খবরটা প্রথমে এল৷ তারপর এই সুবিনয়বাবুর খবর৷ আজকের দিনটা সত্যিই বড়ো বেশি ঘটনাবহুল৷ অনেক বিশ্বাস, অনেক ভরসা নিয়ে মানুষ অমিয় চক্রবর্তীর দলকে ক্ষমতায় এনেছিল৷ সেই ক্ষমতা ভোগ করতে পারলেন না তিনি৷ একটা মানুষ সারাটা জীবন ছুটে চললেন একটা লক্ষ্যের পেছনে৷ অথচ সেই স্বপ্ন যখন করায়ত্ত হল, তিনিই রইলেন না৷

সেটা তবুও মেনে নেওয়া গেল, কিন্তু তার বদলে ক্ষমতা যাঁর হাতে যাচ্ছে, তিনি যদি সত্যিই পিতৃহত্যার অপরাধী হন, তাহলে তাঁর হাতে রাজ্যের দায়িত্ব দিয়ে কীভাবে নিশ্চিন্তে থাকা যায়! অথচ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তিনি৷ টাপুরদি নিবিষ্টমনে কিছু ভাবছে৷ চোয়াল শক্ত৷ অর্জুনদা তার টিম নিয়ে বেরিয়ে গেছে আলাদাভাবে৷ টাপুরদির কী প্ল্যান আছে এখনও জানি না আমি৷ শুধু বেরিয়ে আসার আগে অর্জুনদাকে ডেকে আলাদা করে কীসব বলল দেখলাম৷ এখন কিছু জিজ্ঞাসা করাও যাবে না জানি৷ তাই চুপচাপ জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি৷

লালবাজার থেকে বেরিয়েই টাপুরদি মৃণাল দত্তকে ফোন করেছিল৷ তিনি কী বলেছেন জানি না৷ কিন্তু ফোন রাখার পর থেকেই দেখছি টাপুরদি অস্বাভাবিক গম্ভীর৷ একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘কী বললেন মৃণালবাবু?’

টাপুরদি উত্তর দেয়নি কোনো৷ শুধু অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে হেসেছিল৷ বলেছিল, ‘এই রাজনীতির দুনিয়ায় বড়ো অন্ধকার রে মিতুল৷ এ এক অতল কৃষ্ণগহ্বর৷ কেউ কেউ সেই অন্ধকারে ডুবে থেকেও মুক্তির পথ খুঁজে মরে, কেউ বা সেই অন্ধকারের মোহে জড়িয়ে তাতেই ডুবে কাটিয়ে দেয় সারাটা জীবন৷ অদ্ভুত এক মোহ৷ সেই অন্ধকার তাকে টেনে নিয়ে চলে আরও গভীরে৷ সেই মোহগ্রস্ত চোখ বন্ধ করে তলিয়ে যেতে থাকে রাজনীতির অন্ধকূপে৷ তাতেই তার সুখ, তাতেই তার তৃপ্তি৷’

টাপুরদির এইসব দার্শনিক উক্তির মর্মোদ্ধার করা আমার কম্ম নয়৷ শুধু জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘তুমি কি শিয়োর, অম্লানবাবুই আছে এসবের পেছনে?’

টাপুরদি হেসেছিল৷ তারপর বলেছিল, ‘শিয়োর? না, শিয়োর অবশ্যই নই৷ এখনও অন্ধকারেই পথ হাতড়াচ্ছি আমরা৷ তবে এটাও ঠিক, যেটুকু এগিয়েছি, সেটা মৃণালবাবুর সাহায্য ছাড়া সম্ভব হত না৷’

‘কিন্তু এসবের পেছনে যে মৃণালবাবু নেই, তিনি যে তদন্তকে গোড়া থেকেই ভুল পথে চালনা করছেন না, সেটা কী করে বুঝলে? সুনয়নাদেবীর কাছে আমরা শুনেছি, নাতির চিকিৎসার ব্যাপারে সাহায্য চেয়েও সেরকম সাহায্য পাননি তিনি অমিয়বাবুর কাছ থেকে৷ রাগ তো তাঁর থাকাই স্বাভাবিক,’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম৷

‘সন্দেহের বাইরে কেউই নয় রে৷ মৃণালবাবুরও যথেষ্ট স্টং মোটিভ আছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই৷’

‘তাহলে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘কী তাহলে?’ ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘ধুর, আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছে৷ অম্লানবাবু, মৃণাল দত্ত, বিনয় বসু, অনিমেষবাবু, মোটিভ তো সবারই আছে৷ খুনটা তাহলে করলটা কে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘আমি কী করে জানব? জেনে গেলে আর এত খেটে মরতাম কেন?’

‘তবু? তোমার কিছু তো মনে হচ্ছে নিশ্চয়ই?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘মৃণালবাবুর সঙ্গে কথা হয়েছে আমার এই নিয়ে৷ তিনি স্বীকার করেছেন, অমিয়বাবুর উপর তিনি খুশি ছিলেন না৷ অমিয়বাবু চাইলে তাঁর নাতির চিকিৎসার ভালো ব্যবস্থা করে দিতে পারতেন৷ আফটার অল, অতীতে মৃণালবাবু রাজনীতি থেকে সরে এসে জায়গা ছেড়ে না দিলে অমিয়বাবুর উত্থান এত সহজ হত না৷ এমনকী নাতির মৃত্যুর পর তিনি চূড়ান্ত হতাশায় ডুবে গেছিলেন৷ ভেবেওছিলেন, অমিয়বাবুর সঙ্গে দেখা করে নিজের মনের জমা ক্ষোভগুলো উগড়ে দেবেন৷’

‘তাহলে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘মৃণালবাবু আমায় জানিয়েছেন, সেই সময় সুপর্ণা তাকে বাধা দিয়েছিল৷ মৃণালবাবুও তার কথা রাখতে আর এগোননি৷ পরে যখন এ নিয়ে ভেবেছেন তিনি, বুঝতে পেরেছেন সুপর্ণাই ঠিক ছিল৷ জন্ম মৃত্যুর উপরে কারও হাত থাকে না৷’

‘এতটা উদারতা কেমন যেন অবিশ্বাস্য ঠেকে টাপুরদি,’ বললাম আমি৷

আর কিছু বলেনি টাপুরদি, আমিও আর কিছু জানতে চাইনি৷ বুঝলাম, কালো গাড়িটা পুরো কেসটাকে একটা নির্দিষ্ট অভিমুখ দিয়েছে৷ গাড়িটার অ্যাক্সিডেন্ট না হলে হয়তো অম্লানবাবুকে সন্দেহ করার এতটা শক্তিশালী প্রমাণ হাতে আসত না৷ অম্লান চক্রবর্তী যে কতটা ক্ষমতাবান, তা আর কাউকে বলে দেওয়ার দরকার নেই৷ তাঁকে অ্যারেস্ট করা সহজ নয়৷ তাঁর পুলিশ, তাঁর প্রশাসন তাঁর হাতে কী করে হাতকড়া পরাবে? এমনিই এই কেসে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে পদে পদে পুলিশকে বাধা পেতে হচ্ছে৷ যে কারণে বাধ্য হয়ে টাপুরদির মতো প্রাইভেট ডিটেকটিভের শরণ নিতে হয়েছে কলকাতা পুলিশকে৷ এটা সত্যি, পুলিশের যত টেকনিকাল সুযোগ সুবিধে আছে, টাপুরদির তা নেই, তেমনি এটাও ঠিক টাপুরদির হাত পুলিশের মতো বাঁধা নয়৷ টাপুরদি স্বাধীন৷ তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, সাহস আর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাই টাপুরদির অস্ত্রশস্ত্র৷ পুলিশ অম্লান চক্রবর্তীকে অ্যারেস্ট করতে পারবে কি না জানা নেই, কিন্তু টাপুরদি হারবে না সেই বিশ্বাসও আমার আছে৷

আমাদের গাড়িটা অম্লানবাবুর বাড়ির বেশ কিছুটা আগে থেমে গেল৷ টাপুরদি আর আমি নেমে এলাম গাড়ি থেকে৷ গাড়িতে আমরা ছাড়াও আছেন কলকাতা পুলিশের দুজন কনস্টেবল৷ আমরা নামতেই একজন বললেন, ‘ম্যাডাম, আমরা কাছেই থাকব৷ আপনি কোনো রিস্ক নেবেন না৷’

টাপুরদি মিষ্টি করে হেসে মাথা নাড়ল৷ মনে মনে ভাবলাম এঁরা এখনও টাপুরদিকে চেনেননি৷

অম্লানবাবুর বাড়ির উলটোদিকের ফুটে দুটো বাড়ির পরেই একটা ছোট্ট ক্যাফে আছে আগের দিনই দেখেছিলাম৷ একটা বাড়ির গ্যারেজে বেশ ঘরোয়া মতো ব্যবস্থা৷ সেখানে গিয়ে ঢুকলাম আমরা দুজন৷ এক কোণে একটা টেবিলে বসে দুটো কফি অর্ডার দিল টাপুরদি৷ এখান থেকে অম্লানবাবুর বাড়ি পরিষ্কার দৃষ্টিগোচর হয়৷ টাপুরদির কানে একটা ওয়্যারলেস ব্লুটুথ ইয়ারফোন গোঁজা৷ চুল দিয়ে ঢাকা বলে চোখে পড়ছে না৷ সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুসারে অম্লানবাবু পার্টি অফিস থেকে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছেন আধ ঘণ্টা আগে৷

দুটি সুদৃশ্য কাপে করে কফি এল৷ সঙ্গে একটি ছোট্ট সেরামিকের দুধসাদা বাটিতে কয়েক টুকরো মার্শমেলো৷ ছোট্ট ক্যাফে হলেও আতিথেয়তা বড়ো ভালো লাগল৷ কফিটাও যথেষ্ট ভালো৷ টাপুরদির দৃষ্টি বাইরের দিকে৷ অম্লানবাবুর বাড়ির গেটে বেড়ালের মতো দৃষ্টি মেলে বসে আছে৷ আর ধৈর্য ধরতে না পেরে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমরা এখানে অপেক্ষা করছি কেন?’

টাপুরদি মাথা নীচু করে বলল, ‘এই বাড়ির উপর নজর রাখতে হবে৷ অম্লানবাবু যেকোনো সময় আসবেন এখানে৷’

‘তাতে কী হবে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

টাপুরদি কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই দেখলাম বাড়ির গেট থেকে একটা সাদা রঙের টয়োটা সেডান বেরিয়ে আসছে৷ ক্যাফের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ভিতরে দৃষ্টি চালিয়ে ধূসর কাচের ভিতর থেকে মনোময়বাবুকে চিনতে অসুবিধে হল না৷ গাড়িটা ক্যাফে পেরিয়ে এগোতেই টাপুরদি মাথা নীচু করে ইয়ারফোনে কাউকে কিছু নির্দেশ দিল৷

আমি বললাম, ‘কী ব্যাপার টাপুরদি? মনোময়বাবুর তো এখন অম্লানবাবুর সঙ্গে থাকার কথা, যতদূর জানি তিনি প্রায় সবসময়ই অম্লানবাবুর সঙ্গে থাকেন৷’

‘থাকেন, কিন্তু আজ নেই৷ মনোময়বাবুকে পুলিশ ফলো করবে, আমাদের গাড়ি অপেক্ষা করছে৷ আমাদেরও যেতে হবে৷ ওঠ,’ বলেই উঠে দাঁড়াল টাপুরদি৷

ঝটিতি বিল মিটিয়ে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়৷ টাপুরদি ইয়ারফোনে টানা কথা বলে চলেছে৷ দৌড়োতে গিয়ে সেদিকে কান দিতে পারছি না৷ আমাদের গাড়িটা দেখলাম উলটোদিক থেকে এগিয়ে আসছে৷ প্রায় লাফিয়ে গাড়িতে উঠলাম৷ ঠিক সেই মুহূর্তে টাপুরদির ফোনে ফোনটা এল৷ অর্জুনদার ফোন৷ পেনড্রাইভটা অবশেষে খোলা সম্ভব হয়েছে৷

‘আমায় মেইলে পাঠাও,’ বলল টাপুরদি৷

ওদিক থেকে অর্জুনদা কী বলল শোনা গেল না৷ টাপুরদি উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘অসম্ভব৷ আমরা এখন মনোময়বাবুকে ফলো করছি৷ এখন লালবাজারে যাওয়া সম্ভব নয়৷’

অর্জুনদা আবার কিছু বলল৷ টাপুরদি অসন্তুষ্ট মুখে বলল, ‘ঠিক আছে, আসছি৷’

আমাদের গাড়ি লালবাজারের দিকে ঘুরল৷

‘কী হল টাপুরদি? অর্জুনদা কী বলল?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘বলল, পেনড্রাইভে যা আছে সেটা নাকি এভাবে পাঠানো সম্ভব নয়৷ হাইলি কনফিডেনশিয়াল৷ ডিসিডিডি আমাদের ডেকেছেন এখুনি৷ আর্জেন্ট,’ অসন্তুষ্ট মুখে বলল টাপুরদি৷

লালবাজারের গেট দিয়ে গাড়ি ঢুকল আমাদের৷ গাড়ি থেকে নেমে প্রায় ছুট লাগালাম৷ সৌরভবাবুর কেবিনের বাইরে অর্জুনদার সঙ্গে মুখোমুখি প্রায় ধাক্কা লাগল৷ আমাদের দেখে বলল, ‘এসে গেছ? চলো, স্যার অপেক্ষা করছেন৷’

ভিতরে গিয়ে দেখলাম সৌরভ সান্যালের মুখে যেন কেউ এক পোঁচ কালি ঢেলে দিয়েছে৷ আমাদের দেখে ইঙ্গিতে বসতে বললেন৷ তারপর গম্ভীর মুখে বললেন, ‘এই পেনড্রাইভ নিয়মমতো আমার দেখানো উচিত নয় কাউকে৷ কিন্তু যেহেতু এটা আপনারাই এনেছেন, তাই মনে হল, আপনাদের জানার অধিকার আছে এতে কী আছে৷ কিন্তু আপনাকেও সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে৷ আপনার উপর আমার সেই বিশ্বাস আছে বলেই এটা আপনাকে দেখাচ্ছি৷’

নিজের ল্যাপটপটা আমাদের দিকে ঠেলে দিলেন সৌরভবাবু৷ স্ক্রিনের উপর একটাই ফোল্ডার রয়েছে দেখতে পেলাম৷ সেটায় ক্লিক করতে দেখা গেল বেশ ক-টি পিডিএফ ফাইল৷ একে একে সব কটি পিডিএফ খুলে দেখলাম আমরা৷ উত্তেজনায় আমাদের মুখ-চোখ লাল হয়ে উঠেছে৷ বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে একের পর এক ফাইল খুলে দেখছে টাপুরদি৷ সবগুলো ফাইল দেখা শেষ করে ল্যাপটপটা সৌরভবাবুর দিকে এগিয়ে দিল টাপুরদি৷ বলল, ‘এবার কী?’

‘রিদ্ধিমা দেশাইয়ের বিল্ডিং-এর আশেপাশে সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে৷ এখনই আর কিছু অ্যাকশন নেওয়া হচ্ছে না৷ এখন মোটামুটিভাবে তাকে হাউজ অ্যারেস্টে রাখা হবে৷’

‘ঠিক আছে,’ চিন্তিত মুখে বলল টাপুরদি, ‘এখন আর এই ব্যাপারে কিছু করারও নেই৷ তন্ময়ের জন্য চিন্তা হচ্ছে৷’

সৌরভবাবুর মুখে দুশ্চিন্তার কালো ছায়া৷ তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আপনি যখন আমাকে বলেছিলেন, তন্ময়ের ব্যাপারটা অমিয় চক্রবর্তীর খুনের সঙ্গে রিলেটেড, আমি স্বীকার করছি সেই কথাটাকে আমি বিশেষ গুরুত্ব দিইনি৷ সেটা আমারই ভুল৷ তখন তন্ময়কে খুঁজে বার করার উপর আরেকটু বেশি জোর দিলে বোধ হয় এত কিছু ঘটত না৷ এমনকী অর্জুন না বললে আপনাকে এই কেসে ইনভলভ করার কথা আমার মাথাতেও আসত না৷ এনিওয়ে, ইট ওয়াজ আ গুড ডিসিশন ইনডিড৷’

টাপুরদি একবার বিস্মিত মুখে অর্জুনদার মুখের দিকে তাকাল৷ অর্জুনদার মুখ পাথরের মতো শক্ত ও অভিব্যক্তিহীন৷ টাপুরদি এবার বলল, ‘স্যার, একটা কালো এসইউভি রিদ্ধিমাকে ফলো করে, আমি দেখেছি৷ দূরত্বের জন্য গাড়িটার নম্বর দেখতে পারিনি৷ আজ সুবিনয়বাবুকে কিডন্যাপের ব্যাপারেও কালো এসইউভি জড়িয়ে আছে৷ যে গাড়িটা উদ্ধার হয়েছে সেটা পার্টি অফিসের গাড়ি,’ বলল টাপুরদি৷

এবার অর্জুনদা বলল, ‘একটা কথা৷ যে বা যারা এসবের পেছনে আছে, তারা তন্ময়কে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে আছে৷ হাতে পেলে হয়তো বাঁচবে না ও, যদি না এখনও ধরা পড়ে গিয়ে থাকে ওদের হাতে৷ কিন্তু তারা রিদ্ধিমাকে কিছু করল না কেন?’

টাপুরদি অর্জুনদার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘আমার ধারণা একটু অন্যরকম৷ সম্ভবত তন্ময় অলরেডি ওদের কবজায় আছে৷ আর ওরা তন্ময়ের কাছেই জেনেছে যে রিদ্ধিমা এই ডায়েরির ব্যাপারে কিছু জানে না৷ তাই রিদ্ধিমাকে কিছু করেনি৷ অযথা রিস্ক নিতে চায়নি৷ যদিও আমি শিয়োর নই, রিদ্ধিমা জানে কি না৷’

‘আপনি বলছেন তন্ময়কেও কিডন্যাপ করেছে ওরা?’ সৌরভবাবু জিজ্ঞাসা করলেন৷

টাপুরদি একটু চিন্তা করে বলল, ‘তাই তো দাঁড়াচ্ছে স্যার৷ নইলে এতদিনে রিদ্ধিমা সেফ থাকত না৷ ওরা রিদ্ধিমাকে কিডন্যাপ করে তন্ময়ের উপর প্রেশার তৈরি করত৷’

‘তাহলে এবার ভাবতে হবে, কে কে জানত এই গোপন কথা? কার কার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল? স্যার, এখন সময় কম৷ এদিক-ওদিক অন্ধের মতো দৌড়ে লাভ নেই৷ আগে ভাবা দরকার৷ ধনঞ্জয় মণ্ডলের কাছে অমিয় চক্রবর্তীকে হত্যা করার কারণ ছিল৷ তবে সে ছাড়াও আর কিছু মানুষের কাছে সেরকম কারণ ছিল৷’

‘এখন প্রশ্ন হল, কার কারণটা সবচেয়ে জোরদার? এই পেনড্রাইভটা না খুললে আমরা অন্ধকারেই থেকে যেতাম৷ কিন্তু এখন এটা স্পষ্ট যে, অমিয় চক্রবর্তীর এই ইতিহাস বাইরে এলে পার্টির ইমেজে কালি লাগত৷ এত দিনের লড়াইয়ের পরে পাওয়া কুর্সি হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল৷ সেক্ষেত্রে কার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হত? অমিয়বাবুর মৃত্যুতে কে সবচেয়ে বেশি লাভবান হল?’

‘আপনি কীভাবে শিয়োর হচ্ছেন, যে খুনটা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নয়?’ জিজ্ঞাসা করলেন সৌরভ সান্যাল৷

‘আমি শিয়োর হচ্ছি না স্যার,’ বলল টাপুরদি, ‘জাস্ট সম্ভাবনাগুলোকে খতিয়ে দেখছি৷ ট্রায়াল অ্যান্ড এরর মেথড ব্যবহার করছি, বলতে পারেন৷’

‘কীরকম?’ জানতে চাইলেন সৌরভবাবু৷

‘দেখুন স্যার, প্রথমে আমরা ভাবি, কে কে খুন করতে পারে অমিয়বাবুকে৷ অনিমেষবাবু ওই পরিবারের জন্য নিজের মেয়েকে হারিয়েছিলেন৷ এবার নাতনিকে নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন৷ রাগ ছিল ওই পরিবারের উপর৷ কিন্তু অনিমেষবাবুর যা বয়স, আর যা রেকর্ড, তাতে তিনি এতটা রিস্ক নেবেন বলে মনে হয় না আমার৷ তা ছাড়া ধনঞ্জয় মণ্ডলের সঙ্গেও কোনো যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি৷’

‘এবার আসি মৃণালবাবুর প্রসঙ্গে৷ মৃণাল দত্ত ধনঞ্জয়কে টাকা দিয়েছিল৷ কিন্তু আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করে জেনেছি, সেটা মাত্র পঁচিশ হাজার টাকা৷ তা দিয়ে ধনঞ্জয় মণ্ডলের খুব বেশি লাভ হত না৷ অমিয় চক্রবর্তীর উপর রাগ হয়তো ছিল মৃণালবাবুর৷ কিন্তু এতদিন পরে প্রতিশোধ নিতে যাওয়ার লজিকটা আমার তেমন যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে হচ্ছে না৷ প্রসঙ্গত, মৃণালবাবুর বয়স ও স্বাস্থ্যও ঠিক খুন করার উপযোগী নয়৷’

‘এবার আসি বিনয় বোসের কথায়৷ ভোটে হেরে রাগের মাথায় হবু মুখ্যমন্ত্রীকে খুন করার মতো বোকা লোক বিনয় বোস নন৷ তিনি পোড়-খাওয়া রাজনীতিবিদ৷ জানেন, অমিয়বাবু খুন হলে সন্দেহের আঙুল তাঁর দিকেই প্রথমে উঠবে৷ অমিয়বাবুকে খুন করে তাঁর কোনো লাভ নেই৷’

‘তাহলে বাকি থাকল কে, স্যার? অমিয়বাবুকে মারার মোটিভ আর কার বেশি ছিল বলে আপনার মনে হয়?’

সৌরভ সান্যাল একদৃষ্টিতে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ৷ তারপর বললেন, ‘আপনি কী বলতে চাইছেন, আমি বুঝতে পারছি মিস ব্যানার্জি৷ কিন্তু আপনি ভাবতে পারছেন সেটা যদি সত্যি হয়, রাজ্য রাজনীতিতে কী তুমুল ঝড় উঠতে চলেছে? এ ব্যাপারে নেক্সট অ্যাকশন প্ল্যান করার আগে আমায় কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে হবে৷ ব্যাপারটা আর আমার হাতে নেই৷ আমি এই ব্যাপারে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে পারব না৷’

অর্জুনদা এগিয়ে এল এবার৷ বলল, ‘স্যার, এই কেসটা নিয়ে আমরা অনেকদিন ধরে লড়ছি৷ দিনরাত ছুটে বেড়াচ্ছি৷ যত এগোনোর চেষ্টা করছি, রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করে পিছিয়ে আসছি৷ পুলিশের চাকরিতে জয়েন করার আগে শপথ নিয়েছিলাম, আইনের রক্ষা করব যেকোনো মূল্যে৷ আজ যদি রাজনৈতিক রক্তচক্ষুকে ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসি, অম্লান চক্রবর্তীকে অপরাধী জেনেও ছেড়ে দিই, কাল যখন তিনি মসনদে বসে এই রাজ্যের কয়েক কোটি মানুষের হর্তা-কর্তা-বিধাতা হবেন, রাজ্যের ভাগ্যনিয়ামক হয়ে আরও অনেক কেসে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করবেন, তখন নিজের উপর আমাদের লজ্জা হবে না স্যার? যে মানুষ নিজের স্বার্থে নিজের বাবাকেও খুন করতে পারে, নিখুঁত প্ল্যানিং করে সনাতন বিশ্বাসের মতো পথের কাঁটা দূর করতে পারে, তন্ময়কে, সুবিনয় মুখার্জিকে কিডন্যাপ করাতে পারে সে ক্ষমতা পাওয়ার পর আর কী কী করতে পারে ভাবতে পারেন?’

সৌরভ সান্যাল অর্জুনদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ৷ তারপর বলল, ‘লেটস গেট ব্যাক টু ওয়ার্ক৷ আমি কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা বলে পারমিশনের ব্যবস্থা করছি৷ কিন্তু মনে রেখো, সলিড প্র&ফ ছাড়া কিন্তু অম্লান চক্রবর্তীর মতো পাওয়ারফুল লোককে অ্যারেস্ট করা যাবে না৷’

‘ইয়েস স্যার৷ আমাদের একটা গাড়ি মনোময়বাবুকে ফলো করে ডেস্টিনেশনে পৌঁছে গেছে৷ সোনারপুরের দিকে একটা জায়গায় অপেক্ষা করছে ওরা৷ রজতদাও আছে ওখানে৷ আমাদের তাড়াতাড়ি সেখানে যাওয়া দরকার,’ অর্জুনদা বলল৷

‘যাও৷ আমার প্রতি মিনিটের আপডেট চাই৷’

‘ইয়েস স্যার,’ স্যালুট ঠুকল অর্জুনদা৷

ঝড়ের বেগে আমাদের গাড়ি টালিগঞ্জ ছাড়িয়ে ছুটে চলেছে আরও দক্ষিণের দিকে৷ কামালগাজি পেরোতে রিং হল অর্জুনদার ফোনে৷ ফোন তুলে কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে টাপুরদির দিকে তাকাল অর্জুনদা৷ বলল, ‘রজতদার ফোন৷ সোনারপুরে একটা পুরোনো বাগানবাড়ির ভিতর ঢুকেছে মনোময়বাবুর গাড়ি৷ রজতদা খোঁজখবর নিয়ে জেনেছে, ওই বাড়িতে এক বুড়ো কেয়ারটেকার ছাড়া আর কেউ থাকে না৷ শীতের কয়েক মাস পিকনিকের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়৷ অন্য সময় খালিই পড়ে থাকে৷ বাড়ির মালিক প্রবাসী, কালেভদ্রে কলকাতায় আসেন৷ মনোময়বাবু ঢোকার পর ভিতর থেকে তালা লাগানো হয়েছে গেটে৷ ভিতরে কী হচ্ছে বোঝার উপায় নেই৷ ওরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে৷’

‘সুবিনয় মুখার্জিকে কি ওরা ওখানে বন্দি করে রেখেছেন?’ ভুরু কুঁচকে টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল৷

‘হি মাস্ট বি দেয়ার,’ দাঁতে দাঁত চেপে বলল অর্জুনদা৷ ড্রাইভারের সামনের গ্লাভ বক্স থেকে একটা রিভলভার বার করে টাপুরদির হাতে দিল অর্জুনদা৷ বলল, ‘এটা ধরো৷ লোডেড আছে৷’

টাপুরদি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ক’দিন আগেই পেয়েছে৷ রিভলভারটা জিনসের পকেটে ঢুকিয়ে নিল টাপুরদি৷ চোখে-মুখে প্রত্যয়ের ছাপ৷

অল্পসময়ের মধ্যে সোনারপুরের বাগানবাড়ির সামনে পৌঁছে গেলাম আমরা৷ উঁচু পাচিল দিয়ে ঘেরা বাড়ি, সামনে বড়ো লোহার গেটে জায়গায় জায়গায় মরচে পড়েছে৷ আমাদের গাড়ি থামতেই রজতবাবুদের গাড়িও এগিয়ে এল৷ আমাদের গাড়িতে বসতে বলে অর্জুনদা নেমে গেল৷ লোহার গেটে দুম দুম করে ঘুসি মারতে থাকল অর্জুনদারা৷ বেশ কিছুক্ষণ ধাক্কাধাক্কির পর একজন ছোটোখাটো চেহারার লোক এসে দরজা খুলে দিল৷ পরনে ছিটের শার্ট আর লুঙ্গি৷ সম্ভবত এই বাড়ির কেয়ারটেকার, পুলিশ দেখে তার দুই চোখে বিস্ময় ঝরে পড়ছে৷ তাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে পুলিশের দল ভিতরে গেল৷ আমরা বসে রইলাম গাড়িতেই৷

‘আমরা ভিতরে যাব না টাপুরদি?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘এটা হাই রিস্ক পুলিশ অপারেশন মিতুল৷ এখানে তো আমাদের যাওয়ার পারমিশন নেই,’ বলে চিন্তাগ্রস্ত মুখে গেটের ভিতরে যতদূর দৃষ্টি প্রসারিত করা যায়, সেইভাবে সতৃষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে বসে রইল টাপুরদি৷ যতই স্থৈর্য বজায় রাখার চেষ্টা করুক, ভিতরে ভিতরে টাপুরদি যে কতটা উত্তেজিত তা কেউ না জানুক, আমি জানি৷

প্রায় কুড়ি মিনিট পর ফিরে এল পুলিশের দল, এবং সেটা খালি হাতে৷ টাপুরদি এবার লাফিয়ে গাড়ি থেকে নামল৷ উত্তেজিত ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হল?’

অর্জুনদা হতাশ মুখে হাত নেড়ে বলল, ‘কেউ নেই এখানে৷ পুরোটাই পুলিশকে বোকা বানানোর ফন্দি ছিল৷ গাড়ি সামনের গেট দিয়ে ঢুকে পেছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে গেছে৷ কেয়ারটেকার কিছুই জানে না৷ ব্যাটা মালিকের অনুপস্থিতিতে বাড়ি টুকটাক ভাড়া-টাড়া দিয়ে কিছু রোজগার করে৷ কিছু টাকার বিনিময়ে গেট খুলে দিয়েছিল শুধু৷’

‘ভালো করে খুঁজে দেখেছ তোমরা?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘রীতিমতো চিরুনিতল্লাশি করা হয়েছে৷ কেউ নেই৷’

‘এর মানে দাঁড়াচ্ছে, মনোময়বাবু জানতেন তাঁদের গতিবিধির দিকে, বাড়ির দিকে নজর রাখা হচ্ছে৷ সেজন্য পুলিশকে ল্যাজে খেলানোর জন্য এই ফন্দি এঁটেছেন৷ জানেন, পুলিশ ফোর্স এদিকে তাকে ফলো করতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে৷ সেই সুযোগে কাজ উদ্ধার করবেন,’ রজতবাবু এগিয়ে এসে বললেন৷

‘ঠিক তাই,’ বলল টাপুরদি, ‘এটা একটা আইওয়াশ ছিল৷ মাই গড, আমাদের আগেই বোঝা উচিত ছিল, অপরাধী যেভাবে প্রতিটা স্টেপ এক্সিকিউট করেছে, তাতে মনে হচ্ছে ওর জন্য এসব নেহাতই খেলা, সাম সর্ট অফ ফান৷ একে একে পথের কাঁটা সরিয়ে চলেছে সে, কোনো সাক্ষী না রেখে৷ যারাই দলের কাছে থ্রেট হয়ে দেখা দিচ্ছে, তাদেরই চতুরভাবে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে৷ অপরাধী ভীষণরকম বুদ্ধিমান৷ অথচ আমরা ভেবে নিয়েছিলাম, এত সহজে ধরে ফেলব তাকে৷ ভুলটা আমাদেরই ছিল৷’

‘আচ্ছা এমনও তো হতে পারে, অপরাধী বিরোধী দলের কেউ৷ সরকারে আসীন দলের উপর দায় চাপানোর জন্য, তাদের বদনাম করার জন্য এসব করছে,’ আমি বললাম৷

‘সেটা হতেও পারে, আশ্চর্য কিছু না,’ বললেন রজতবাবু৷

‘আমার তা মনে হয় না রজতদা৷ সব সাক্ষ্য অম্লানবাবুর দিকেই নির্দেশ করছে৷ কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই৷ ধনঞ্জয়ের ফোন রেকর্ডেও অম্লানবাবু বা মনোময়বাবুর দেখা পাইনি৷ নিখুঁত পরিকল্পনা, সব বুঝেও তাঁকে হাতকড়া পরানোর কোনো উপায় নেই, শুধু হাতেনাতে ধরা ছাড়া,’ বলল অর্জুনদা৷

অনেকক্ষণ ধরে বড্ড অন্যমনস্ক লাগছে টাপুরদিকে৷ এবার বলল, ‘মনোময়বাবু আর অম্লানবাবুর মোবাইল টাওয়ার লোকেশন চেক করতে বলুন৷ ফাস্ট৷’

পুলিশের কল সেন্টারে ফোন লাগালেন রজতবাবু৷ কথা সেরে ফিরে এসে উত্তেজিত ভঙ্গিতে বললেন, ‘মনোময়বাবুর ফোন এখন কসবার কাছে৷ অম্লানবাবুর টাওয়ার লোকেশন তাঁর বাড়িতেই দেখাচ্ছে৷ আমাদের মনোময়বাবুকে ফলো করা উচিত৷’

‘ওরাও এটাই চায় রজতবাবু,’ শান্ত গলায় বলল টাপুরদি, ‘মনোময়বাবুও চান যে আমরা ওঁকে ফলো করি৷ পুলিশকে বোকা বানানোর জন্য উনি আমাদের সারা কলকাতা ঘোরানোর প্ল্যান ভেঁজেছেন৷ কোনো লাভ নেই৷’

‘আপনি কী করে এত শিয়োর হচ্ছেন?’ গম্ভীর মুখে জিজ্ঞাসা করলেন রজতবাবু৷ একটু যেন বিরক্ত দেখাল তাঁকে৷

‘এ রকম পরিস্থিতিতে আমরা কেউই কোনো ব্যাপারে শিয়োর নই৷ তবু যেভাবে মনোময়বাবু এখানে আমাদের বোকা বানালেন, সেই কথা ভেবেই বলছি, মনোময়বাবু অত বোকা খেলোয়াড় নন যে মোবাইল ফোন অন করে নিজেকে রেডহ্যান্ডেড ধরিয়ে দেবেন৷ নাহ, পসিবল নয়,’ মাথা নেড়ে বলল টাপুরদি৷

‘তাহলে এখন?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা৷

‘আমার মন বলছে সুবিনয়বাবুকে ওরা এমন জায়গায় রাখবে যেখানে কেউ সন্দেহ করবে না,’ টাপুরদি বলল৷

‘সেটা কোথায়?’ অর্জুনদা জিজ্ঞাসা করল৷

টাপুরদি একটু ভেবে বলল, ‘ভেবে দেখো, মনোময়বাবু জানেন, ওঁকে আমরা ফলো করব৷ ফলে যদি এমন কোনো জায়গায় সুবিনয়বাবুকে রাখা হয় যেখানে তাঁকে যাওয়া-আসা করতে হবে, তাহলে তাকে ফলো করে আমরা ধরেই ফেলব৷ অম্লানবাবু বা মনোময়বাবু কেউই তাই এমন ভুল করবেন না৷ আবার এই বিষয়টা বেশি লোক জানাজানিও তিনি করবেন বলে মনে হয় না৷ কারণ, রাজনীতিতে কেউ কারও নিজের নয়৷ অন্য কাউকে দিয়ে অপহরণটা করালে একদিন না একদিন সেই ব্যক্তি মুখ খুলতেই পারে৷ সুতরাং, কাজটা যথাসাধ্য গোপনে করা হয়েছে একান্ত নিজের লোককে দিয়ে, যাকে অম্লানবাবু চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারেন৷ সেরকম লোক বলতে আমরা কাকে পাচ্ছি?’

‘মনোময়বাবু,’ বলল অর্জুনদা৷

‘রাইট, মনোময়বাবু৷ কারণ মনোময়বাবুর প্রভুভক্তি সন্দেহাতীত৷ এবার আমাদের ভাবতে হবে, সুবিনয়বাবুকে অপহরণ করে কোথায় রাখতে পারেন৷ এমন জায়গায় যেখানে অম্লানবাবু যাওয়া-আসা করলেও কেউ তাকে সন্দেহ করবে না৷ সেই জায়গা কোথায় হতে পারে?’ অর্জুনদা ও রজতবাবুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘পার্টি অফিস?’ অর্জুনদার চোখ জ্বলে উঠল৷

‘পার্টি অফিস হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট,’ বলল টাপুরদি, ‘কিন্তু সেখানে সারাদিনে অনেক লোকের যাতায়াত আছে৷ সেরকম জায়গায় একজনকে অপহরণ করে লুকিয়ে রাখা কি আদৌ সেফ?’

‘তাহলে?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা৷

‘অম্লানবাবুর নিজের বাড়ি,’ চোয়াল শক্ত করে বলল টাপুরদি, ‘সেফেস্ট প্লেস৷ কেউ ভাবতেও পারবে না সুবিনয়বাবু সেখানে থাকতে পারেন৷ পুলিশ হন্যে হয়ে সারা কলকাতায় ঘুরে মরবে৷ সুবিনয়বাবু যে অম্লানবাবুর বাড়িতে থাকতে পারেন, কেউ ঘুণাক্ষরেও আন্দাজ করতে পারবে না৷ তা ছাড়া অম্লানবাবুর নিজের সরকারি সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে৷ তাঁর বাড়িতে বিনা অনুমতিতে কেউ চট করে ঢুকতেও পারবে না৷ পুলিশেরও ঢুকতে গেলে অনেক পারমিশনের দরকার পড়বে৷ সেটা অম্লানবাবুর কানে পৌঁছেই যাবে৷’

‘মাই গড!’ লাফিয়ে উঠল অর্জুনদা, ‘লেট’স গো দেয়ার৷’

রজতবাবু এবার অর্জুনদার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘অর্জুন৷ অম্লানবাবুর বাড়িতে আমরা এভাবে রেড করতে পারি না৷ সেজন্য আমাদের কমিশনার সাহেবের থেকে পারমিশনের দরকার হবে৷ কোনো প্রমাণ ছাড়া, প্রপার কাগজপত্র ছাড়া শুধু একটা ধারণার বশে ওখানে ঢুকতে পারব না আমরা৷’

‘তাহলে?’ অর্জুনদা হতাশ দৃষ্টিতে তাকাল রজতবাবুর দিকে৷

‘তাহলে আমি আছি কী করতে?’ টাপুরদি মুচকি হেসে বলল৷

‘তুমি?’ রজতবাবুর উপস্থিতি ভুলে চেঁচিয়ে উঠল অর্জুনদা, ‘তুমি একা ওই বাড়িতে লুকিয়ে ঢুকবে? ইমপসিবল! এটা কত রিস্কি জানো? অম্লানবাবুর জেড সিকিউরিটি আছে৷ মুহূর্তে ধরা পড়ে যাবে তুমি৷ আমি সেটা কিছুতেই হতে দিতে পারি না৷’

রজতবাবু অবাক চোখে একবার অর্জুনদার দিকে একবার টাপুরদির মুখের দিকে তাকাল৷

‘আহ অর্জুন, এখন এসব ভাবার সময় নয়৷ সুবিনয়বাবুকে রেসকিউ করাটা আমাদের প্রাথমিক দায়িত্ব৷’ টাপুরদি বলল৷

‘আমি সব জানি৷ তোমার, আমার, আমাদের সকলের দায়িত্ব সম্পর্কে তোমার চেয়ে আমার চিন্তা কিছু কম নয়৷ তবু আমি তোমাকে ওখানে এভাবে যেতে দিতে পারি না৷ ওরা যেভাবে পথের কাঁটা সরাতে উঠে-পড়ে লেগেছে, তাতে টের পেলে ওরা তোমাকেও ছাড়বে না টাপুর,’ অর্জুনদা বলল৷

রজতবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, তিনি এতক্ষণে অর্জুনদা ও টাপুরদির মধ্যে সম্পর্কের রসায়নটা ধরে ফেলেছেন৷ হাজার হোক, পুলিশের লোক তো৷

টাপুরদি বলল, ‘অর্জুন, ভুলে যেয়ো না আমাকে এই কেসে সৌরভবাবু ইনভলভ করেছেন এই শর্তে যে যেখানে পুলিশের হাত নিয়মে আটকে যাবে, সেখানে আমায় কাজ করতে হবে৷ এবং এই কেসে সেই সম্ভাবনাটা তৈরি হবে সে বিষয়ে সৌরভবাবু নিশ্চিত ছিলেন৷ ঠিক সেই কারণেই প্রাইভেট ডিটেকটিভের শরণাপন্ন হওয়া৷ নইলে কলকাতা পুলিশে দক্ষ অফিসারের অভাব তো ছিল না অর্জুন৷’

অর্জুনদা আরও কিছু বলত হয়তো, রজতবাবু বললেন, ‘লেটস গো৷ গাড়িতে যেতে যেতে ডিসিডিডি স্যারের পারমিশন নিয়ে নেওয়া যাবে৷’

‘রজতদা, এটা কি ঠিক হবে?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা৷

‘এর চেয়ে বেটার চয়েস তোমার কাছে আছে অর্জুন?’ ঠান্ডা গলায় বললেন রজত দত্ত, ‘সংঘমিত্রা ম্যাডাম যোগ্য বলেই স্বয়ং ডিসিডিডি স্যার ভরসা করেছে ওঁর উপর৷’

অর্জুনদা কিছু না বলে এগিয়ে গেল গাড়ির দিকে৷

‘তুমি অম্লানবাবুর বাড়িতে ঢুকবে কী করে? জেড ক্যাটাগরির সুরক্ষা ভেঙে ঢোকা অসম্ভব৷ তা ছাড়া মনে রেখো ওখানে একজন বৃদ্ধা মহিলা আছেন যিনি সদ্য স্বামীকে হারিয়েছেন৷ সেদিকটাও খেয়াল রাখতে হবে,’ বলল অর্জুনদা৷

‘ওই বাড়িতে লুকিয়ে ঢোকার মতো কোনো সুযোগ নেই সংঘমিত্রা ম্যাডাম৷ যেভাবেই ঢুকতে যান, ধরা পড়েই যাবেন,’ রজতবাবু বললেন৷

টাপুরদি মুচকি হাসল৷ তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘লুকিয়ে তো ঢুকব না৷ কারণ সেটা অসম্ভব৷ অম্লানবাবুর পারমিশন নিয়ে সবার সামনে দিয়েই ঢুকব৷’

‘মানে?’ বিহ্বল আর্তনাদ করে উঠল অর্জুনদা, ‘মানেটা কী? অম্লানবাবু তোমায় ঢুকতে দেবেন কেন? সত্যিই যদি তোমার আন্দাজ ঠিক হয়, যদি সুবিনয়বাবু অম্লানবাবুর বাড়িতে থাকেন, তাহলে বাইরের কাউকেই ঢুকতে দেবেন না সেখানে৷’

‘দেবেন দেবেন৷ দিতে বাধ্য তিনি৷ ভুলে যেয়ো না পেনড্রাইভ এখন আমাদের কাছে,’ বলে হাসল টাপুরদি৷

‘আপনি কি, বাই এনি চান্স, অম্লান চক্রবর্তীকে ব্ল্যাকমেল করে ঢোকার প্ল্যান করছেন নাকি?’ রজতবাবু এবার বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন৷

টাপুরদি আড়চোখে অর্জুনদার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঠিক তাই৷’

‘ইমপসিবল,’ দাঁতে দাঁত চেপে বলল অর্জুনদা, ‘অকারণ দুঃসাহস দেখানোতে কোনো বাহাদুরি নেই টাপুর৷ এতদিনে নিশ্চয়ই বুঝে গেছ, ওরা সাংঘাতিক লোক৷ একা ওই বাড়িতে ঢোকা আর ক্ষুধার্ত বাঘের মুখে মাথা গলানো একই ব্যাপার৷’

এতক্ষণ চুপচাপ উভয় পক্ষের চাপানউতোর শুনছিলাম৷ এবার আমি বললাম, ‘একা কেন যাবে টাপুরদি? আমি যাব সঙ্গে৷’

‘নো ওয়ে! তুই যাচ্ছিস না মিতুল,’ চোখ পাকিয়ে বলে উঠল টাপুরদি৷

‘তুমি যদি বিপদ ঘাড়ে করে যেতে পারো, আমিও পারি টাপুরদি৷ এর আগেও অনেক বিপজ্জনক মিশনে আমি তোমার সঙ্গে থেকেছি৷’

‘এবারের মিশনটা যথেষ্ট বিপজ্জনক মিতুল৷ আমি এখানে তোকে সঙ্গে নিতে পারব না,’ টাপুরদি বলল৷

‘তুমি যদি যাও, আমিও যাব৷ ব্যস৷ অর্জুনদার মতো আমিও তোমাকে এইরকম বিপজ্জনক মিশনে একা ছাড়তে পারব না৷ আমি যাব তোমারসঙ্গে,’ বললাম আমি৷

টাপুরদি কাঁধ ঝাঁকিয়ে হতাশ চোখে তাকাল অর্জুনদার দিকে৷ অর্জুনদা কিছু বলল না৷ পাথরের মতো মুখ করে সামনের দিকে তাকিয়ে বসে আছে৷ যেন হাল ছেড়ে দিয়েছে৷ রজতবাবু এবার বললেন, ‘আমি সৌরভ স্যারের পারমিশন ছাড়া আপনাদের অ্যালাও করতে পারব না৷ স্যারকে ফোন করছি আমি৷’

পরবর্তী কিছুক্ষণের মধ্যে রজতবাবু সমস্ত পরিকল্পনা বিশদে জানালেন সৌরভবাবুকে৷ ফোন রাখার পর বললেন, ‘স্যার একা এই ডিসিশন নিতে পারবেন না৷ কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা বলে জানাবেন৷’

উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে কাটল প্রায় মিনিট বিশেক৷ আমাদের গাড়ি অম্লান চক্রবর্তীর বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে৷ এমন সময় রজতবাবুর ফোনে ফোন এল৷ বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে রজতবাবু ফোনটা টাপুরদির হাতে বাড়িয়ে দিলেন স্পিকার অন করে৷

‘মিস ব্যানার্জি?’

‘হ্যাঁ স্যার! বলুন৷’

‘রজতের থেকে আপনার প্ল্যান শুনলাম আমি৷ আই রিয়েলি অ্যাপ্রিশিয়েট ইয়োর সেন্স অব রেসপন্সিবিলিটি অ্যান্ড কারেজ৷ বাট আই অ্যাম সরি, আই ক্যানট গিভ ইউ পারমিশন৷ কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা হয়েছে৷ তিনি একেবারেই রাজি নন আপনাকে আর ইনভলভ করার ব্যাপারে৷ দিস ইস আ হাই রিস্ক মিশন৷ আমি এভাবে আপনাকে এর মধ্যে ঢুকতে দিতে পারি না৷ দিস ইস বিয়ন্ড মাই অথরিটি৷’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%